নির্বাচনে ভোট জালিয়াতিতে ধরা খেয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে দূরত্ব কমাতে চায় সরকার

0
100

সদ্য অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট ডাকাতি, ভোট দানে বাঁধা প্রধান,বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও মামলা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন কারণে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সরকারের কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘও ভোটের পর নেতিবাচক মন্তব্য করেছে।। তবে, ভুল বোঝাবুঝির কারণে এই দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করে সরকার। এবার এই ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সৃষ্ট দূরত্ব ঘোচাতে উদ্যোগ নিচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একাধিক কূটনৈতিক সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি ডেভিড হ্যালির সঙ্গে বৈঠকে বসবেন পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক। ওই বৈঠকে ওয়াশিটনকে বিস্তারিত জানাবে ঢাকা।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সদ্য অনুষ্ঠিত ভোটের পর ভারত, চীন, মরক্কো, ভিয়েতনাম, কোরিয়া, কানাডাসহ অনেক দেশই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছে। একাধিক বিশ্ব নেতাই শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম বড় শক্তি ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অন্যতম সহযোগী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ একাধিক পশ্চিমা দেশ এখনো নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানায়নি।

পরন্তু ভোটের পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-মুখপাত্র রবার্ট পালাদিনো বলেন, ‘হয়রানি, হুমকি, সহিংসতা ও ভোটারকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখা নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়ে দেয়।’ পাশাপাশি সহিংসতা পরিহার করতে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অসাধারণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের কদরকে আরও এগিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারি ও বিরোধী দলের সঙ্গে কাজ করবে।’

ব্রিটেনের কমনওয়েলথ বিষয়ক মন্ত্রী মার্ক ফিল্ড বলেন, ‘নির্বাচনের আগে গ্রেফতার, বিরোধী দলগুলোর নির্বাচনি প্রচারণায় বাধা দেওয়া, ভোটের দিনের অনিয়মের কারণে কিছু মানুষকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখাসহ নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে আমরা খবর পেয়েছি। নির্বাচনে এই অনিয়মগুলোর পূর্ণাঙ্গ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য সমাধান করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান থাকবে।’

এদিকে, ভোটের দিনের সহিংসতায় হতাহতের ঘটনা ও নির্বাচনি প্রচারণার সময়ের ভয়-ভীতি ও সহিংসতার ঘটনা দুঃখজনক উল্লেখ করে মার্ক ফিল্ড বলেন, ‘কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য মুক্ত, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের জনগণের উন্নয়নের জন্য এখন সঠিক পথের সন্ধান করা সরকারসহ সব রাজনৈতিক দলের জন্য জরুরি।’

ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুখপাত্র মাজা কোচিজানসিস বলেন, ‘এবারের নির্বাচন নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। গত ১০ বছরের মধ্যে এবারের নির্বাচনে সবগুলো দলের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখ করার মতো। তবে নির্বাচনের দিনে সহিংসতা ও বিভিন্ন স্থানে নির্বাচন-পূর্ব প্রচার-প্রচারণায় ভোটের মাঠে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিতে প্রতিবন্ধকতা ছিল।’

জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার হাইকমিশনারের মুখপাত্র রাভিননা সামদাসানি বলেন, ‘৩০ ডিসেম্বর ভোটের দিন এবং তার আগে-পরে সংগঠিত সহিংসতা, অনিয়ম ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন উদ্বেগজনক। ভোটের দিনে বিরোধী দলের ওপর প্রতিহিংসামূলক আচরণ যেমন অবাধে গ্রেপ্তার, শারীরিক আক্রমণ, হয়রানি উদ্বেগজনক ঘটনা। ক্ষমতাসীন দল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মিলে ভোটের দিনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নিযার্তনসহ অনিয়ম করেছে, যা দুঃখজনক।’ তিনি আরও বলেন, ‘৩০ ডিসেম্বর ভোটকে কেন্দ্র করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কমপক্ষে ২ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশে বাধা দেওয়া হয়েছে। ভোটের আগে ৫৪টি অনলাইন সংবাদমাধ্যম বন্ধ করা হয়। এছাড়া ভোটের দিনে ইন্টারনেট এ অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মত-প্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা দেওয়া হয়।’

ভোটের অনিয়ম নিয়ে মানুষকে মুখ খুলতে দেওয়া হচ্ছে না উল্লেখ করে রাভিননা সামদাসানি বলেন, ‘মানবাধিকারকর্মী ও বিরোধীদলের রাজনীতিকদের মত-প্রকাশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দিয়ে দমন-পীড়ন ও মত-প্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা দেওয়া হচ্ছে।’

ঢাকায় অবস্থান করা ইউরোপ-আমেরিকার একাধিক কূটনীতিক জানান, ভোটের আগে-পরে যেসব অনিয়ম হয়েছে, সেসব অনিয়মের বিষয়ে সুষ্ঠ তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল ইউরোপ-আমেরিকাসহ জাতিসংঘ। বৈশ্বিক এই আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনকে এখনো কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।

এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা কয়েকটি দেশের সঙ্গে দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি সত্য। তবে, এজন্য আমরা দায়ী নই। তারা নিজেরাই ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর করে এই দূরত্ব সৃষ্টি করেছে।‘

ভোট পর্যবেক্ষণে পশ্চিমা দেশগুলোর সক্ষমতার অভাব ছিল উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘একটি জাতীয় নির্বাচনকে পর্যবেক্ষণ করতে হলে যে পরিমাণ লোকবল ও আনুষঙ্গিক বিষয় প্রয়োজন, বাংলাদেশে পশ্চিমা দেশগুলোর সেই প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল।’

সম্পর্কের দূরত্ব কমাতে উদ্যোগ নেওয়া হবে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলব, সঠিক তথ্য দেব।’

সুত্রঃ ‌সারাবাংলা

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here