টাকার দাপটে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক চক্রকে ম্যানেজ করে চলতেন সিরাজ (ভিডিও সহ)

0
228

সোনাগাজী সিনিয়র ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার মূল হোতা অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দৌলার যৌন হয়রানি ও নানা অপকর্মের কথা জানতেন মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা। তবে টাকার দাপটে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক চক্রকে ম্যানেজ করে চলতেন সিরাজ।

এই চক্রের ভয়ে তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পেতেন না শিক্ষক ও অভিভাবকরা। নানা সময়ে অভিযোগ করলেও ম্যানেজ হয়ে যেত প্রশাসন, উল্টো বিপদে পড়তেন অভিযোগকারীারা। গত কয়েক দিনে মাদরাসা শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্য ও স্থানীয় জনগণের সাথে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে। মাদরাসার তিন তলা মার্কেট, পুকুর, নানা অনুদান-তহবিল এবং ওয়াজ মাহফিল থেকে বছরে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন অধ্যক্ষ। অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের সুবিধার লোভ দেখিয়ে ভেড়াতেন নিজের দলে।

ভিডিওঃ ‘ব্রেকিং নিউজঃ পিবিআই’র তদন্তে বেরিয়ে এলো নুসরাত ঘটনার চাঞ্চল্যকর সব তথ্য! (ভিডিও সহ)’


[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

২০০১ সালে শতবর্ষী এই মাদ্রাসায় উপাধ্যক্ষ পদে যোগ দেবার পর থেকে নানা সময়ে জেলা প্রশাসনের কাছে যৌন হয়রানি, অর্থ আত্মসাৎ ও হত্যার হুমকির মতো অভিযোগ জমা হয় তার বিরুদ্ধে।

তবে, মাদরাসার তহবিলের টাকা নয়ছয় করে অর্থের জোরে ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদ ও স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ফেলতেন সিরাজ উদ দৌলা। সবশেষ গত ২৭ই মার্চ নুসরাতকে যৌন হয়রানি এবং ৬ই এপ্রিল আগুনে পোড়ানোর পরও চলেছে সেই টাকার খেলা।

ভিডিওঃ  ‘থানার ওসির কাছে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

যে কারণে শুরুর দিকে যৌন হয়রানির ঘটনাটিতে ষড়যন্ত্র ও আগুনে পোড়ানোকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছিল স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। এমনকি সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনও শুরুতে ঘটনাকে আত্মহত্যা বলেই উল্লেখ করেন। প্রায় দুই দশক ধরে যৌন হয়রানি, মাদ্রাসার টাকা আত্মসাৎ ও হত্যার হুমকির মতো অপরাধে অর্থের জোরে পার পেয়ে যায় সিরাজ উদ দৌলা। গত বছরের ৩রা অক্টোবর নুসরাতের আরেক বান্ধবীকে যৌন হয়রানি করেন সিরাজ। ওই ঘটনায়ও মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আক্তার উন নেছা শিউলির কাছে অভিযোগ দেয়া হয়। তবে নারী শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির মতো ওই ঘটনায় শুধু একটি নোটিশ পাঠিয়ে দায় সারে জেলা প্রশাসন।

ভিডিওঃ  শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করবোঃ নুসরাত (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

অভিযুক্ত মাদরাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। ওই শিক্ষার্থীর বাবা পূর্বধলী মদিনাতুল উলুম দাখিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, ঘটনার পর মেয়ে আমাদের কিছু জানায়নি। পরে বিষয়টি জানতে পেরে পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যকে বিষয়টি জানাই। ভয়ে আর জেলা প্রশাসনে কোন অভিযোগ দেইনি। তবে এর মধ্যে তার নামে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর একটি অভিযোগ জমা দেয়া হয়।

অভিযোগের পর অধ্যক্ষ সিরাজকে শোকজ করা হলে তিনি ক্ষেপে যান। অভিযোগের কারণে তিনজন শিক্ষককে উল্টো হেনস্তা করেন সিরাজ। তাদের ডেকে নিয়ে হুমকি দেয়া হয় এবং অপমান করা হয়। পরে আর জেলা প্রশাসন কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় আমরাও বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করিনি। শুনেছি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করায় প্রশাসন আর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এদিকে, ২০১৬ সালে মাদরাসার তহবিলের অডিটে গরমিল ও টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে পরের বছর অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি কে এনামুল করিমকে লিখিতভাবে জানান স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সদস্য শেখ আবদুল হালিম মামুন।

ভিডিওঃ  নুসরাতের আগে সিরাজউদ্দৌলার শ্লীলতাহানির শিকার হন আরও এক ছাত্রী বল্লেনঃ প্রভাসক আবুল কাশেম (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

ওই বছর মাদরাসার বেশ কিছু তহবিল থেকে অধ্যক্ষ প্রায় ৫৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ করেন শেখ মামুন। সেখানে দেখা যায়, ক্যাশ থেকে ৬ হাজার ২৬৫ টাকা ব্যাংকে জমা না দেয়া, মাদ্রাসার মার্কেটের দোকান ভাড়া ৪১ হাজার ১০০ টাকা, মাহফিলের অপ্রদর্শিত ১ লাখ ১১ হাজার ৬৯৩ টাকা, ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭২৫ টাকা ব্যাংকে জমা না দেয়া, ক্যাশের ৯০ হাজার ২৯২ টাকা ব্যাংকে জমা না দেয়া, পরের মাসে ৬ লাখ ২৭ হাজার ৮০৩ টাকা জমা না দেয়া, তহবিলের ৮৩ হাজার ২০০ টাকা ব্যাংকে জমা না রাখা, অভ্যন্তরীণ আয় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৯৮ টাকা আত্মসাৎ করা, ছাত্র ফির ৬৮ হাজার ৭৫০ টাকা ব্যাংকে জমা না দেয়া, বছরের শেষের দিকে ক্যাশ থেকে আরো প্রায় ৫০ হাজার টাকাসহ মোট ২২ লাখ ৫২ হাজার ১০০ টাকা আত্মসাতের করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন শেখ মামুন। এসব প্রমাণ ছাড়ানো আরো কয়েকটি খাত থেকে ২০১৬ সালে সর্বমোট প্রায় ৫৬ লাখ টাকা অধ্যক্ষ সিরাজ নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেন বলেও অভিযোগ ছিল শেখ মামুনের। তবে, এমন অভিযোগের পর তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি কে এনামুল করিম অধ্যক্ষকে শুধু নোটিশ দিয়েই দায় সারেন।

অভিযোগের পর উল্টো পরের বছর পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয় শেখ আবদুল হালিম মামুনকে। তিনি মানবজমিনকে বলেন, মাদরাসার তহবিলের টাকা আত্মসাৎ করার সুস্পষ্ট প্রমাণসহ অভিযোগ করলেও প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নেয়নি। পরের বছর বরং আমাকে পরিচালনা পর্ষদ থেকে ষড়যন্ত্র করে বাদ দিয়ে দেয়া হয়। শেখ মামুন বলেন, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল এসব টাকার ভাগ পেতেন। যারা অধ্যক্ষের হয়ে প্রশাসনের কাছে তদবির করতো। এদিকে সোনাগাজী পৌরসভার মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন মানবজমিনকে বলেন, আর্থিক সুবিধা দিয়ে অধ্যক্ষ স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। অনেক অস্বচ্ছল ও গরিব শিক্ষার্থীদের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করতেন। পরে এদের নিজের দলে ভিড়িয়ে গড়ে তোলেন ক্যাডার বাহিনী।

এছাড়া, মাদরাসায় দুপুর ও রাতে লঙ্গরখানার মতো খানাপিনার আয়োজন করতেন অধ্যক্ষ। অনেকেই তার কাছ থেকে এসব সুবিধা নিতেন। এদিকে, ফেনী জেলা প্রশাসনের একজন সাবেক কর্মকর্তা মানবজমিনকে জানান, ক্ষমতাসীন স্থানীয় রাজনীতিবিদদের প্রভাবে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি জেলা প্রশাসন। অভিযোগের বিষয়ে কেন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি পি কে এনামুল করিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার সময়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আসেনি। তবে এডিএম আক্তারুন্নেছা শিউলির সময় একটি অভিযোগের কথা স্মরণ করেন। ওই শিক্ষার্থী ও তার পরিবারকে ডাকা হলে তারা বিষয়টি অস্বীকার করে বলে দাবি করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক।

এছাড়া, অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয় বলেও জানান এনামুল করিম। কিন্তু সেই তদন্তে অর্থ আত্মসাতের কোন প্রমাণ মিলেনি বলেও দাবি করেন জেলা প্রশাসনের এই কর্মকর্তা। তবে, পি কে এনামুল করিমের এমন বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করে অভিযোগকারী শেখ আবদুল হালিম মামুন বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এমন কোন লিখিত কাগজ বা প্রমাণ আমাদের দেয়া হয়নি। মূলত তদন্ত না করেই অধ্যক্ষ সিরাজকে বাঁচিয়ে দিতে এমন ভূমিকা নেয়া হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সাথে ২০১৮ সালে মাদরাসা থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সই জাল করে একটি চেক ইস্যু করা হয় বলেও মানবজমিনকে জানান শেখ মামুন। এই ঘটনায় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি বলেও জানান তিনি। মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সদস্য থাকাকালীন ২০১৭ সালে পুরো মাদরাসা এলাকা ক্লোজসার্কিট ক্যামেরার আওতায় আনার দাবি তুলতে তা পর্ষদে পাস হয় বলে জানান শেখ মামুন। তবে, নিজের অপকর্ম ঢাকতে পরিচালনা পর্ষদকে ম্যানেজ করে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসাতে দেননি অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাহ। ওই বছর পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা বসালে নুসরাতের মতো আর কেউ যৌন হয়রানির শিকার বা আগুনে পুড়ে মারা যেতো না বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

রহস্যের উদঘাটনে সন্তুষ্ট পরিবার, অপেক্ষা বিচারের: নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার রহস্য উন্মোচন, মূল পরিকল্পনাকারী শনাক্ত ও আসামিদের গ্রেপ্তার করায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে নুসরাতের পরিবারের সদস্যরা। পুরো কিলিং মিশন নিয়ে ধোঁয়াশা পরিষ্কার করায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) ধন্যবাদ জানান নুসরাতের বাবা এ কে এম মূসা। গতকাল শনিবার দুপুরে নিহত নুসরাতের বাসায় গেলে তার বাবা মানবজমিনকে বলেন, সকলের প্রচেষ্টায় ঘটনার রহস্য উন্মোচন হয়েছে। আর বাকি আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করার তাগিদ দেন নুসরাতের বাবা।

ভিডিওঃ  ‘অধিকাংশ খুনিকে গ্রেফতার করায় পিবিআইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞ নুসরাতের বাবা। খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেখার অপেক্ষায়… (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

একই সঙ্গে দ্রুত সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেয়ার জন্যও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। পিবিআই কম সময়ের মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার ও হত্যার রহস্য উন্মোচন করায় তাদের ধন্যবাদ দেন নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। তিনি বলেন, আমি শুরু থেকেই বলেছি নূর উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করলে সব ঘটনা জানা যাবে। তবে শুরুর দিকে সোনাগাজী থানার ওসি ও প্রভাবশালী মহল আগুনে পোড়ানোর ঘটনাকে ভিন্ন অবস্থানে নেয়ায় তাদেরও শাস্তির দাবি করেন নুসরাতের ভাই। এদিকে, মামলার আরো দুই আসামি শাহাদাত হোসেন শামীম ও জাবেদ হোসেনকে গতকাল ময়মনসিংহ ও ফেনী থেকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। গতকাল বিকালে এজাহারভূক্ত আসামি জাবেদ হোসেনকে ফেনী আদালতে হাজির করে দশ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। পরে তার বিরুদ্ধে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন বিচারক জাকির হোসাইন।

উৎসঃ ‌মানবজমিন

আরও পড়ুনঃ চাঞ্চল্যকর এই নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ছক ঠিক হয় কারাগারে (ভিডিও সহ)


তিন মিনিটেই মিশন শেষ করে দুর্বৃত্তরা। মুহূর্তের মধ্যেই আগুনে দগ্ধ হয়ে যায় নুসরাত জাহান রাফি। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও নুসরাত ঘাতকদের চোখে চোখ রেখে বলেছেন, মারা গেলেও মামলা তুলে নেব না। আমি অধ্যক্ষ সিরাজের শাস্তি চাই। আর একটুও দেরি করেনি ঘাতকরা। দ্রুত ওড়না দিয়ে তার হাত-মুখ বেঁধে ফেলে। কেরোসিন ঢেলে দেয় শরীরজুড়ে। তারপর আগুন ধরিয়ে ছাদ থেকে সরে যায় তারা। এর মধ্যেই চিৎকার করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামেন নুসরাত।

দাউ দাউ করে শরীরজুড়ে তখন আগুন জ্বলছে। মাদরাসা শিক্ষার্থী ও এক পুলিশ সদস্যের সহযোগিতায় গায়ের আগুন নেভানো হয়। ততক্ষণে ঝলসে গেছে নুসরাতের গোটা শরীর। এই ফাঁকে নির্বিঘ্নে মাদরাসা থেকে পালিয়ে যায় ঘাতকরা। তাদের ধারণা ছিলো ঘটনাস্থলেই আগুনে পুড়ে মারা যাবে নুসরাত। বিষয়টি কেউ টের পাবে না।

ভিডিওঃ ‘ব্রেকিং নিউজঃ পিবিআই’র তদন্তে বেরিয়ে এলো নুসরাত ঘটনার চাঞ্চল্যকর সব তথ্য! (ভিডিও সহ)’


[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

সরাসরি কিলিং মিশনে বোরকা পড়ে নেতৃত্ব দেয় শাহাদাত হোসেন শামীম। চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য। ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকান্ডে এ পর্যন্ত ১৩ জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ। এজাহার নামীয় সাত জনকে গ্রেপ্তার করার পর গতকাল সংবাদ সম্মেলন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই’র প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, নুসরাত জাহান রাফির গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়ার সময় বোরকা পরা চারজন ছিলো। তাদের চার জনই ছিল মাদরাসার শিক্ষার্থী। এদের একজন ছাত্রী ছিল। নুসরাত জাহান রাফির শরীরে আগুন দেয়ার একদিন আগে ৫ই এপ্রিল বৈঠক করে নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, হাফেজ আব্দুল কাদের, জাবেদ হোসেনসহ পাঁচ জন। ওই দিন সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার দিকে মাদ্রাসার কাছের হোস্টেলের পশ্চিম অংশে এই বৈঠক হয়। সেখানেই নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। বৈঠকে নুর উদ্দিন জানায়, নুসরাতকে শায়েস্তা করার নির্দেশ দিয়েছে মাদরাসা অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা। সিরাজের নির্দেশেই হত্যা পরিকল্পনা করে তারা। এসময় আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার প্রস্তাব দেয় বৈঠকে উপস্থিত শাহাদাত হোসেন শামীম।

পরে তারা আরও পাঁচজনকে তাদের পরিকল্পনার কথা জানায়। যাদের মধ্যে দু’জন ছিলো ওই মাদরাসার ছাত্রী। তাদের একজনকে দায়িত্ব দেয়া হয় তিনটি বোরকা ও কেরোসিন সংগ্রহের। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরদিন ৬ই এপ্রিল শাহাদাত হোসেন শামীমের কাছে মাদরাসার সাইক্লোন সেন্টারে তিনটি বোরকা ও পলিথিনে করে কেরোসিন সরবরাহ করে মেয়েটি। ওই দিন সকাল ৯টার আগেই বোরকা পরে শামীমসহ তিন ছাত্র মাদরাসার টয়লেটে লুকিয়ে ছিলো। পরীক্ষা শুরুর কিছু সময় আগে শম্পা বা চম্পা নামের মেয়েটি নুসরাত জাহান রাফিকে ডেকে নেয়। সে রাফিকে জানায়, ছাদে তার বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে। খবর শুনেই রাফি দৌঁড়ে ছাদে যায়। সেখানে যাওয়ার পরই শামীমসহ বোরকাপরা চার শিক্ষার্থী রাফিকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ প্রত্যাহার করতে চাপ দেয়। এতে নুসরাত রাজি না হওয়ায় তার হাত বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়।

ঘটনার পর নুসরাত নিজে ছাদ থেকে নামল কীভাবে জানতে চাইলে পিবিআই প্রধান বলেন, সাইক্লোন সেন্টারের ছাদ ৪ ফুট ১০ ইঞ্চি উচ্চতার দেয়াল দিয়ে ঘেরা। ওপর থেকে কেউ চিৎকার করলেও নিচে কেউ শুনতে পারবে না। আবার ছাদের দেয়ালের উচ্চতার কারণে কেউ টপকিয়ে নিচে নামতে পারবে না। ছাদ থেকে নামতে চাইলে তাকে একমাত্র সিঁড়ি দিয়েই নামতে হবে। তারা আগুন ধরিয়ে দিয়ে ছাদ থেকে নেমে মাদ্রাসায় অবস্থান করে। গায়ে আগুন লাগানো অবস্থায় নুসরাত সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসলে অনেক মানুষ জড়ো হয়। এরপরই ওই চার জন সবার সঙ্গে মিশে যায়।

পরিকল্পনা অনুসারে ওই সময়ে নূর উদ্দিনের নেতৃত্বে হাফেজ আব্দুল কাদেরসহ পাঁচজন ছিলো বাইরে। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, গেট পাহারা ও স্বাভাবিক রাখার কাজ করে। মিশন শেষে অংশগ্রহণকারীরা নিরাপদে যাতে বের হয়ে যেতে পারে এজন্য তৎপর ছিলো তারা।

ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, নুসরাতের চোখে এর আগেও চুন মারা হয়েছিলো। এতে পাহাড়তলির একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিল নুসরাত। যে কারণে হত্যাকারীরা মনে করেছিল নুসরাতকে মারাটা কঠিন কোনো বিষয় নয়। ঘটনার পরই পিবিআই ছায়া তদন্ত শুরু করে। তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর পিবিআইয়ের ছয়টি ইউনিট অংশ নেয়। ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৩ জনের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে। এরমধ্যে এই মামলার এজহারভুক্ত আট আসামির মধ্যে পরিকল্পনাকারী শাহাদাত হোসেন শামীম, নুর উদ্দিন, পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, জোবায়ের আহমেদ, জাবেদ হোসেন ও আফছার উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

একই ঘটনায় আগে শ্লীলতাহানির অভিযোগে গ্রেপ্তার সিরাজ-উদদৌলাকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এজহারভুক্ত অপর আসামি হাফেজ আব্দুল কাদের পলাতক রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে নুর উদ্দিন হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকার করে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে বলে জানান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার। তিনি বলেন, নুসরাতকে যৌন হয়রানির অভিযোগে সিরাজ-উদ-দৌলাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। তারপর অধ্যক্ষ সিরাজের লোকজন তার মুক্তির জন্য বিভিন্ন জায়গায় স্মারকলিপি দেয়। ৪ঠা এপ্রিল কারাগারে সিরাজের সঙ্গে সাক্ষাত করে নুর উদ্দিন ও শাহাদাতসহ চার জন। সেখানেই কিছু একটা করার নির্দেশনা দেয় সিরাজ। বনজ কুমার মজুমদার জানান, চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার তদন্তে জড়িতের সংখ্যা বাড়তে পারে।

ইতিমধ্যে পাঁচজনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আরও একজনকে রিমান্ডের জন্য আবেদন করা হবে। একজনের রিমান্ড শেষ হয়েছে। এ ঘটনায় আরও পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

মিশনে সরাসরি অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে শাহাদাত হোসেন শামীমকে শুক্রবার রাতে ময়মনসিংহ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে শাহাদাত হোসেন শামীমকে এখনো আনুষ্ঠানিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। শামীমকে গ্রেপ্তার করে ঢাকায় নিয়ে আসেন পিবিআই কর্মকর্র্তারা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই সে ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয় স্বীকার করেছে। তাকে সঙ্গে নিয়ে অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে পিবিআই।

সম্পৃক্ত ১৩ জনের মধ্যে জড়িত অন্য ৬ জনকে গ্রেপ্তারের জন্য শামীমকে নিয়ে পিবিআই টিম অভিযান চালাচ্ছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরাা জানান, ওই ৬ জনকে গ্রেপ্তার করে সারাদেশে পিবিআইয়ের জেলা অফিসগুলোতে ছবি পাঠানো হয়েছে। তাদের বিস্তারিত পরিচয় অতীত রেকর্ড সংগ্রহ করে সেগুলো তদন্ত চলছে। ৬ জন গ্রেপ্তার হলে এ হত্যাকান্ডের সঙ্গে কার কি ভূমিকা ছিলো আরও কেউ জড়িত আছে কি-না তা বেরিয়ে আসবে। বনজ কুমার মজুমদার বলেন, এ ঘটনায় জড়িতরা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন আইনের আওতায় নিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন পিবিআই’র বিশেষ সুপার (ঢাকা মেট্টো) আবুল কালাম আজাদ, এসপি বশির আহমেদ, মিনা মাহমুদা, পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা ও জনসংযোগ কর্মকর্তা কামরুল আহছান প্রমুখ।

এজাহারের বাইরে গ্রেপ্তারকৃত ৭ জনও জড়িত: এদিকে নুসরাত হত্যায় যে মামলা হয়েছিলো সেই মামলায় মাদরাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, ছাত্র নুর উদ্দিন, সাহাদাত হোসেন শামিম, পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, জোবায়ের আহমেদ, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আব্দুল কাদের এবং আফসার উদ্দিনের নাম এজাহারে থাকলেও পুলিশ ঘটনার পর আরো ৭ জনকে গ্রেপ্তার করে। এর মধ্যে মো. আলাউদ্দিন, কেফায়েত উল্লাহ জনি, সাইদুল ইসলাম, আরিফুল ইসলাম, উম্মে সুলতানা, নূর হোসেন ওরফে হোনা মিয়া রয়েছে। এই ৬ জনেরও বিভিন্নভাবে হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে। পিবিআইয়ের ডিআইজি জানান, হত্যা মামলার সঙ্গে শ্লীলতাহানীর মামলার যোগসূত্র থাকায় শ্লীলতাহানীর মামলাটিও তদন্ত করবে পিবিআই। মূলত ম্লীলতাহানীর ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নুসরাতকে হত্যা করা হয়।

গত ৬ই এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ফাজিল মাদরাসা কেন্দ্রে গিয়ে অগ্নি সন্ত্রাসের শিকার হন নুসরাত জাহান রাফি। এর আগেই এই মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার হাতে শ্লীলতাহানির শিকার হয়ে মামলা করেছিলেন নুসরাত। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজের অনুগতরা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে পরীক্ষার আগে ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। গুরুতর দগ্ধ নুসরাতকে প্রথমে সোনাগাজী হাসপাতাল ও পরে ফেনী সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় পরে তাকে আনা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। গত বুধবার রাত সাড়ে নয়টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নুসরাতের সব ধরনের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।

সম্ভব হলে তাকে বিদেশ নিয়ে যাওয়ারও নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার নুসরাতকে সোনাগাজীর চরচান্দিয়া গ্রামে দাদীর কবরের পাশে দাফন করা হয়। এর আগে সোনাগাজী সাবের মোহাম্মদ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত স্মরণকালের বৃহৎ জানাজায় হাজার হাজার মানুষ নুসরাত হত্যার বিচারের দাবি জানান। এদিকে নুসরাত হত্যাকাণ্ডে দেশব্যাপি প্রতিবাদের ঝড় বইছে। হত্যাকারীদের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করছে বিভিন্ন সংগঠন।

উৎসঃ ‌মানবজমিন

আরও পড়ুনঃ সিরাজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (হিসাব) থেকে ১৮ লাখ টাকা তোলেন স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার (ভিডিও সহ)


সিরাজের হিসাব থেকে স্ত্রী তুললেন ১৮ লাখ টাকা!সেই টাকা অধ্যক্ষ মুক্তির আন্দোলন ও রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা করতে খুনিদের দেয়া হয় * হত্যার আগের দিন ‘সাইক্লোন শেল্টারের’ ঘটনাস্থল রেকি করে ছবি তোলে পরিকল্পনাকারী শামীমসহ পাঁচজন

নুসরাত জাহান রাফিকে শ্লীলতাহানির মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা যখন জেলে, তখন তার (সিরাজ) ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (হিসাব) থেকে ১৮ লাখ টাকা তোলেন স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার।

২৭ মার্চ রাফির মা শিরিন আক্তারের করা ওই মামলায় সিরাজ জেলে যাওয়ার পরদিন ২৮ মার্চ জনতা ব্যাংকের সোনাগাজীর শাখার সিরাজের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে এই মোটা অঙ্কের অর্থ উত্তোলন করা হয়।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র যুগান্তরকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের সোনাগাজী শাখার ম্যানেজার জহিরুল ইসলাম শনিবার দুপুরে যুগান্তরকে বলেন, ‘২৮ মার্চ সিরাজের স্ত্রী তার অ্যাকাউন্ট থেকে মোটা অঙ্কের টাকা উত্তোলন করেন। টাকার পরিমাণটি এই মুহূর্তে বলতে পারছি না।’

ভিডিওঃ ‘ব্রেকিং নিউজঃ পিবিআই’র তদন্তে বেরিয়ে এলো নুসরাত ঘটনার চাঞ্চল্যকর সব তথ্য! (ভিডিও সহ)’


[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

জেলে থাকার পরও সিরাজের অ্যাকাউন্ট থেকে কিভাবে ১৮ লাখ টাকা উত্তোলন করা হল এ বিষয়ে জহিরুল ইসলাম শনিবার রাত ৮টার দিকে যুগান্তরকে বলেন, টাকা উত্তোলনের বিষয়টি আমি শুনেছি। টাকা চেকের মাধ্যমে তুলে থাকতে পারে। ব্যাংক বন্ধ থাকার কারণে আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না কিভাবে টাকাটা তুলেছে। এমনও হতে পারে সিরাজের স্বাক্ষর করা চেকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করেছে। ব্যাংক খোলা হলে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত বলতে পারব।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা ওই টাকা প্রথমে অধ্যক্ষ মুক্তির আন্দোলন, পরে রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার কাজে ব্যয় করা হয়। আর সিরাজের নির্দেশেই এই টাকা তোলেন তার স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার। পরে এর একটি অংশ স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, ছাত্রদল নেতা নুরুদ্দিন, ছাত্রলীগ নেতা শাহাদাত হোসেন শামীমকে দেন তিনি। এই টাকা পাওয়ার পরই তিনজনের নেতৃত্বে ‘সিরাজ উদ্দৌলা সাহেব মুক্তি পরিষদ’ গঠন করা হয়। তারা অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশও করে। এই কমিটিকে প্রত্যক্ষভাবে মদদ দিয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন। তারা দলে টেনে নেন সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকেও। তারপরও অধ্যক্ষকে তারা মুক্ত করতে পারেনি। এতে অধ্যক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে রাফিকে হত্যার পরিকল্পনা করে। এমনকি রাফির গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়ার আগের দিন (৫ এপ্রিল) বিকালে অন্যতম পরিকল্পনাকারী শাহাদাত হোসেন শামীমসহ পাঁচজন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ছবি তোলে। ওইদিনের তোলা একটি ছবি যুগান্তরের হাতে এসেছে।

ওই ছবিতে দেখা গেছে, বাঁ থেকে যুবলীগ নেতা নূর হোসেন হোনা, পাঞ্জাবি পরা ছাত্রলীগ নেতা শাহাদাত হোসেন শামীম, উপজেলা আওয়ামী লীগের কথিত দেহরক্ষী আবদুল হালিম সোহেল, ছাত্রলীগ কর্মী আরিফুল ইসলাম সাকিব, মোহাম্মদ জোবায়ের ও অজ্ঞাত একজন। এর মধ্যে শাহাদাত হোসেন শামীম রাফি হত্যা মামলার তিন নম্বর আসামি ও হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী, জোবায়ের আহম্মেদ মামলার পাঁচ নম্বর আসামি। তারা দু’জন এরই মধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন। নূর হোসেন হোনা মামলার আসামি না হলেও তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে।

রাফিকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে করা মামলায় ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর তার মুক্তির দাবিতে ২০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির আহ্বায়ক করা হয় নুরুদ্দিনকে। যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয় শাহাদাত হোসেন শামীমকে। তারাই রাফির সমর্থকদের হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তাদের পরিকল্পনায় রাফিকে নির্মমভাবে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

এদিকে রাফি হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের পর শনিবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার বলেন, অধ্যক্ষের নির্দেশে শাহাদাত হোসেনের পরিকল্পনায় রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার সঙ্গে এখন পর্যন্ত ১৩ জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, অধ্যক্ষের স্ত্রী ফেরদৌস আরা জনতা ব্যাংক থেকে ১৮ লাখ টাকা তুলে অধ্যক্ষের সহযোগীদের হাতে তুলে দেন। তারপরই মূলত সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনের প্রত্যক্ষ মদদে স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, নুরুদ্দিন, শাহাদাত হোসেনের নেতৃত্বে অধ্যক্ষ সিরাজের মুক্তির আন্দোলন শুরু হয়। এমনকি যারা শ্লীলতাহানির অভিযোগে গ্রেফতার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিচারের দাবিতে আন্দোলন করছিলেন তাদের সঙ্গে মাকসুদের হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষের বিচারের দাবিতে আন্দোলনকারী স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর ও সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবদুল হালিম মামুন যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম নিপীড়ক অধ্যক্ষের বিচার করতে। কিন্তু উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন এবং পৌর কাউন্সিলর মাকুসদ আলম আমাদের আন্দোলন করতে বাধা দিয়েছিলেন।’
অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন বলেন, আমি কাউকে মদদ দিইনি। আমিও চাই যারা অপরাধী তাদের যেন বিচার হয়। প্রসঙ্গত, ৬ আগস্ট সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে যায় রাফি। দুর্বৃত্তরা কৌশলে তাকে ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে ২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা করেন ওই ছাত্রীর মা। মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। ওইদিনই গুরুতর আহতাবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। বুধবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাফি মারা যান।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ ব্রেকিং নিউজঃ পিবিআই’র তদন্তে বেরিয়ে এলো নুসরাত ঘটনার চাঞ্চল্যকর সব তথ্য! (ভিডিও সহ)


ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে দুই কারণে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে জানিয়েছেন পিবিআইয়ের ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার।

শনিবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। এ সময় পিবিআই এবং পুলিশ সদর দফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পিবিআই প্রধান জানান, দুই কারণে রাফিকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। প্রথমত হলো- অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা করে নুসরাত আলেম সমাজকে হেয় করেছে বলে মনে করে তারা। দ্বিতীয় কারণ হলো অধ্যক্ষের ঘনিষ্ঠ শামীম দীর্ঘদিন ধরে রাফিকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। রাফি তা বারবারই প্রত্যাখ্যান করছিল। এই ক্ষোভ থেকে শামীম তাকে হত্যা করার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়।

তিনি বলেন, অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ্দৌলার নির্দেশেই আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় ওই মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে। বোরকা এবং হাত মোজা পরে তার শরীরে যারা আগুন দেয় তারা রাফিরই সহপাঠী। এদের মধ্যে অন্তত দুইজন ছাত্র এবং দুইজন ছাত্রী।

ভিডিওঃ ‘ব্রেকিং নিউজঃ পিবিআই’র তদন্তে বেরিয়ে এলো নুসরাত ঘটনার চাঞ্চল্যকর সব তথ্য! (ভিডিও সহ)’


[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

সংবাদ সম্মেলনে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে এ পর্যন্ত ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে এজাহারভুক্ত ৮ আসামির মধ্যে ৭ জন রয়েছে। এজাহারের বাইরে থেকে ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারের বাইরে থাকা এজাহারভুক্ত একমাত্র আসামি হাফেজ আব্দুল কাদেরসহ আরও কমপক্ষে ৬ জনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

তথ্য অনুযায়ী, গ্রেফতারকৃত এজাহারভুক্ত আসামিরা হলো- মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা (৫৫), মাদ্রাসার ছাত্র নূর উদ্দিন (২০) ও শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম (৪৫), মাদ্রসার সাবেক ছাত্র জোবায়ের আহম্মেদ (২০) ও জাবেদ হোসেন (১৯) এবং মাদ্রাসাটির শিক্ষক আফসার উদ্দিন (৩৫)।

সন্দেহভাজন হিসেবে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তারা হলো- আলাউদ্দিন, কেফায়েত উল্লাহ জনি, সাইদুল ইসলাম, আরিফুল ইসলাম, উম্মে সুলতানা পপি, নূর হোসেন ওরফে হোনা মিয়া।

পিবিআইয়ের ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, গত ৪ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার সঙ্গে কারাগারে দেখা করে কয়েকজন। এদের মধ্যে ছিল শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আবদুল কাদেরসহ কয়েকজন। এ সময় রাফিকে হত্যার নির্দেশ দেয় সিরাজ। রাফিকে পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব দেয় শামীম। কীভাবে পোড়ানো হবে সে বিষয়ে নূরউদ্দিন ও শামীমের নেতৃত্বে তার বিশদ পরিকল্পনা করা হয়।

পিবিআই প্রধান জানান, গত ২৭ মার্চ নূরসাতকে শ্লীলতাহনির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ কারাগারে যান। তাকে বাঁচানোর জন্য মাকসুদ আলম, নূর উদ্দিন এবং শামীমসহ অনেকে নানা প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় স্মারকলিপি দেয়ার পর ৪ এপ্রিল নূর উদ্দিন, শামীম, জাবেদ এবং কাদেরসহ কয়েকজন কারাগারে গিয়ে সিরাজ উদ্দৌলার সঙ্গে দেখা করেন। পরদিন ৫ এপ্রিল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টায় মাদ্রাসার পশ্চিম হোস্টেলে বসে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করে।

তিনি বলেন, সেখানেই রাফিকে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই বৈঠকে যারা ছিলেন তারা বিষয়টি আরও ৫ জনের কাছে শেয়ার করে। এদের মধ্যে দুইজন মাদ্রাসা ছাত্রী এবং দুইজন মাদ্রাসা ছাত্রী ছিলেন। এদের মধ্যে এক ছাত্রীয় দায়িত্ব পড়ে ৩টি বোরকা আনা এবং কেরোসিন সরবরাহ করা। ঘটনার দিন ৬ এপ্রিল তিনটি বোরকা এবং পলিথিনে করে কোরোসিন এনে ওই ছাত্রী সকাল ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত বাথরুমে লুকিয়ে রাখে। পরে এগুলো ছাদে গিয়ে শামীমের কাছে হস্তান্তর করেন। ওই সময় শামীমের সঙ্গে আরও দুইজন ছিলেন।

পিবিআইয়ের ডিআইজি বলেন, পরীক্ষার শুরুর কিছুক্ষন আগে পরিকল্পনা অনুযায়ী চম্পা বা শম্পা গিয়ে রাফিকে খবর দেয়া যে তার (রাফি) বন্ধবী নিশাদতে ছাদে মারধর করা হচ্ছে। এই খবর শোনার পর রাফি ছাদে গেলে তাকে তার (রাফি) ওড়না দিয়ে বেঁধে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ঘটনার বিষয়ে মৃত্যর আগে রাফি তার ভাইয়ের কাছে যে বর্ণনা দিয়েছেন হাসপাতালে ডাক্তার-নার্সদের কাছেও একই ধরনের বর্ণনা দিয়েছে। মুমূর্ষু অবস্থায় তিনি বারবার একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন। সেটি হলো ‘ওস্তাদ’। আমরা ওই ওস্তাদকেও খুঁজছি।

তিনি বলেন, ঘাতকদের ধারণা ছিল হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তারা তা সামাল দিতে পারবে। এর আগেও তারা একাধিক ঘটনা সামাল দিয়েছিল। চুন হামলার কারণে রাফি একবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। সেটি তারা (হামলাকারীরা) সামলে নিয়েছেন। শ্লীলতাহানির ঘটনাটিও তারা সামলে ফেলছিলেন। এসব কারণে তারা মনে করেছিল, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটিও তারা ‘ম্যানেজ’ করে ফেলবে।

সংবাদ সম্মেলনে ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা শুরুর আগে থেকেই ওই মাদ্রাসায় লুকিয়ে ছিল হত্যাকারীরা। মাদ্রাসা কমপ্লেক্সের সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে দুটি টয়লেটে লুকিয়ে ছিল তারা। চার হত্যাকারীর মধ্যে একজন মেয়ে বাকি তিনজনকে বোরকা ও কোরোসিন এনে দেয়। আর চম্পা বা শম্পা নামের একটি মেয়ে (পঞ্চম জন) পরীক্ষার হলে গিয়ে নুসরাতকে বলে তার বান্ধবী নিশাতকে ছাদে মারধর করা হচ্ছে। এই কথা শুনে নুসরাত দৌড়ে ছাদে যান।

তিনি বলেন, এরপর তার হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। অগ্নিসংযোগের পরপরই ঘাতকরা সবার সামনে মাদ্রাসার মূল গেট দিয়ে পালিয়ে যায়। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া চারজন এবং নুসরাতকে ডেকে ছাদে নিয়ে আসা চম্পা অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর সবার সামনে দিয়েই মাদ্রাসার মূল গেট দিয়ে পালিয়ে যায়। গেট নিরাপদ রাখতে আগে থেকেই সেখানে পাহারা ও গেট স্বাভাবিক করার কাজে ছিল নূর উদ্দিন ও হাফেজ আবদুল কাদেরসহ পাঁচজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর সবাই গা ঢাকা দেয়।

বনজ কমুার মজুমদার আরও বলেন, আমরা এখন পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাটি তদন্ত করছি। এর আগে শ্লীলতাহানির অভিযোগে যে মামলাটি হয়েছিল সেটিও তদন্ত করব। কারণ একটি ঘটনার সঙ্গে আরেকটি ঘটনা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

উল্লেখ্য, ১০৮ ঘণ্টা চিকিৎসাধীন থাকার পর ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রাফি।

৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। পরিকল্পিতভাবে তাকে ছাদে নিয়ে বোরকা পরা ৪-৫ জন তাকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে করা শ্লীলতাহানির মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়।

অস্বীকৃতি জানালে তারা রাফির গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। অগ্নিদগ্ধ রাফিকে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। সেখান থেকে ফেনী সদর হাসপাতালে এবং পরে ওইদিন রাতে ঢামেক হাসপাতালে নেয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এ ঘটনায় ৮ এপ্রিল রাতে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা ও পৌর কাউন্সিলর মুকছুদ আলমসহ ৮ জনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন অগ্নিদগ্ধ রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।

এর আগে ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা। এ ঘটনায় ছাত্রীর মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। আগুনে পোড়ানোর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে পৃথক সময়ে ৯ জনের ৫ দিন করে এবং অধ্যক্ষ সিরাজের ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

একজনের (জাবেদ হোসেন) রিমান্ড শুনানি আগামি সোমবার অনুষ্ঠিত হবে। তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। অন্য দুইজনকে (শামীম এবং নূর উদ্দিন) শনিবার সন্ধা পর্যন্ত আদালতে হাজির করা হয়নি।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ পিবিআই’র তদন্তে বেরিয়ে এলো নুসরাত ঘটনার তথ্য!নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব দেয় শামীম (ভিডিও সহ)


ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব দেয় শাহাদাত হোসেন শামীম।

শনিবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান পিবিআইয়ের ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার।

এ সময় পিবিআই এবং পুলিশ সদর দফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বনজ কুমার মজুমদার জানান, গত ৪ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার সঙ্গে কারাগারে দেখা করে কয়েকজন। এদের মধ্যে ছিল শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আবদুল কাদেরসহ কয়েকজন। এ সময় রাফিকে হত্যার নির্দেশ দেয় সিরাজ। রাফিকে পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব দেয় শামীম। কীভাবে পোড়ানো হবে সে বিষয়ে নূরউদ্দিন ও শামীমের নেতৃত্বে তার বিশদ পরিকল্পনা করা হয়।

ভিডিওঃ ‘ব্রেকিং নিউজঃ পিবিআই’র তদন্তে বেরিয়ে এলো নুসরাত ঘটনার চাঞ্চল্যকর সব তথ্য! (ভিডিও সহ)’


[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

পিবিআই প্রধান জানান, গত ২৭ মার্চ নূরসাতকে শ্লীলতাহনির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ কারাগারে যান। তাকে বাঁচানোর জন্য মাকসুদ আলম, নূর উদ্দিন এবং শামীমসহ অনেকে নানা প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় স্মারকলিপি দেয়ার পর ৪ এপ্রিল নূর উদ্দিন, শামীম, জাবেদ এবং কাদেরসহ কয়েকজন কারাগারে গিয়ে সিরাজ উদ্দৌলার সঙ্গে দেখা করেন। পরদিন ৫ এপ্রিল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টায় মাদ্রাসার পশ্চিম হোস্টেলে বসে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করে।

তিনি বলেন, সেখানেই রাফিকে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই বৈঠকে যারা ছিলেন তারা বিষয়টি আরও ৫ জনের কাছে শেয়ার করে। এদের মধ্যে দুইজন মাদ্রাসাছাত্রী। এদের মধ্যে এক ছাত্রীর দায়িত্ব পড়ে ৩টি বোরকা আনা এবং কেরোসিন সরবরাহ করা।

এরআগে শুক্রবার রাতে নুসরাত হত্যা মামলার অন্যতম আসামি শাহাদাত হোসেন শামীমকে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে আটক করে পিবিআই। সে মাদ্রসাছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলার তৃতীয় আসামি।

জানা গেছে, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম। নুসরাত হত্যা মামলায় সে সরাসরি জড়িত।

তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে এ পর্যন্ত ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে এজহারভুক্ত ৮ আসামির মধ্যে ৭ জন রয়েছে। এজহারের বাইরে থেকে ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারের বাইরে থাকা এজাহারভুক্ত একমাত্র আসামি হাফেজ আব্দুল কাদেরসহ আরও কমপক্ষে ৬ জনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ নুসরাত হত্যা: আগুন দিয়ে তারা মাদ্রাসার দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়


মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে (১৮) যৌন নিপীড়নের পর কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়োর পর হত্যাকারীরা মাদ্রাসার পূর্ব অথবা দক্ষিণ দিকের দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্রে জানা গেছে, যখন সবাই রাফির শরীরের আগুন নেভাতে ব্যস্ত তখন হত্যাকারীরা বোরকা খুলে মাদ্রাসার পূর্ব অথবা দক্ষিণ দিকের দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়।

এছাড়া সূত্র আরও জানায়, গত ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা কেন্দ্রে রাফিকে পুড়িয়ে মারতে বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার সহযোগীরা অংশ নিয়েছে- এটা এক রকম নিশ্চিত। এমনকি এ ঘটনাটি পুরোপুরি পরিকল্পিত। ঘটনার আগের দিন স্থানীয়রা মামলার এজাহারভুক্ত দুই আসামি এবং অধ্যক্ষের দুই সহযোগী নুরুদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীমকে মাদ্রাসার আশপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখেছেন।

অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার দুই সহযোগী ছিলেন নুরুদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম। তারা দুইজনই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। ইতিমধ্যে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত যে চারজন বোরকা পরা ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ এবং একজন নারী ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। তাকে প্রত্যাহারের পর তার বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করেছে প্রশাসন।

গত বুধবার রাতে না ফেরার দেশে চলে যান ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি (১৮)। চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টার পরও তাকে বাঁচানো গেল না। টানা ১০৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে হার মানেন এই ছাত্রী।

প্রসঙ্গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজীতে পরীক্ষাকেন্দ্রের ভেতর ওই ছাত্রীর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যাচেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। শনিবার সকালে সোনাগাজী পৌর এলাকার ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসাকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। ওই ছাত্রী ওই মাদ্রাসা থেকেই আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন।

পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত কক্ষ থেকে ছাদে ডেকে নিয়ে কয়েকজন বোরকাপরা নারী পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ করেছেন ওই শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যরা।

তারা জানান, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে দায়ের করা মামলা তুলে না নেয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে। এ তথ্য ফেনী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্থানীয় পুলিশকেও জানিয়েছেন নুসরাত।

তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় এদিন বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের ১০২ নম্বর কক্ষে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। তাকে লাইফ সাপোর্ট দেয়া হয়। এরপর না ফেরার দেশে চলে যান মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ আগের রাতেই কেরোসিন ও ম্যাচ রেখেছিল হত্যাকারীরা!


মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে (১৮) যৌন নিপীড়নের পর কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় আগের রাতেই কেরোসিন ও ম্যাচ রেখে এসেছিল হত্যাকারীরা।

অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার দুই সহযোগী নুরুদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম আগের রাতে কেরোসিন ও ম্যাচ রেখে এসেছিল।

তারা দুইজনই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। ইতিমধ্যে নুরুদ্দিন এবং শামীমকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র যুগান্তরকে জানায়, গত ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা কেন্দ্রে রাফিকে পুড়িয়ে মারতে বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার সহযোগীরা অংশ নিয়েছে- এটা এক রকম নিশ্চিত। এমনকি এ ঘটনাটি পুরোপুরি পরিকল্পিত।

ধারণা করা হচ্ছে, তারা দু’জন পরীক্ষার আগের দিন রাতে ঘটনাস্থল ‘শেল্টার হাউস’র ছাদে কেরোসিন এবং ম্যাচ রেখে এসেছিল। এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত যে চারজন বোরকা পরা ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ এবং একজন নারী ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যখন সবাই রাফির শরীরের আগুন নেভাতে ব্যস্ত তখন তারা বোরকা খুলে মাদ্রাসার পূর্ব অথবা দক্ষিণ দিকের দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় শুরু থেকে সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। তাকে প্রত্যাহারের পর তার বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করেছে প্রশাসন।

এদিকে মানবাধিকার কমিশনের সংশ্লিষ্টরা শুক্রবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছে, আগে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হলে রাফিকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা হয়তো ঘটত না।

এদিকে মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেছে তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় শুক্রবার অধ্যক্ষের ঘনিষ্ঠ সহযোগী নুরুদ্দিন ও কাউন্সিলর মাকসুদ আলমকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী জেলা পিবিআইর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, এখন এই মামলায় ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলায় যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। আশা করছি শিগগিরই এ মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে।

প্রসঙ্গত, অগ্নিদগ্ধ শিক্ষার্থী এবং তার পরিবারের অভিযোগ, ৬ আগস্ট সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে যায় ওই শিক্ষার্থী। দুর্বৃত্তরা কৌশলে তাকে ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে ২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা করেন ওই ছাত্রীর মা।

মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। ওইদিনই গুরুতর আহতাবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। বুধবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাফি মারা যান।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ পিবিআইয়ের দাবি জেল থেকে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেন অধ্যক্ষ সিরাজ


অধ্যক্ষ সিরাজউদৌলা জেল থেকে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেন বলে দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

শনিবার (১৩ এপ্রিল) দুপুর সাড়ে ১২টায় রাজধানীর ধানমণ্ডির ৪ নম্বর রোডে অবস্থিত নিজ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করে পিবিআই।

সংবাদ সম্মেলনে নুসরাত হত্যার ঘটনা তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা তুলে ধরেছেন মামলার তদন্তকারী সংস্থা পিবিআইয়ের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার।

সাংবাদিকদের বনজ কুমার বলেন, ‘ঘটনার দিন আনুমানিক সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টায় ঘটনাস্থলে ছিলেন নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আবদুল কাদের এবং আরও কয়েকজন।’

তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম বলেননি পিবিআইপ্রধান।

তিনি বলেন, ‘যৌন নির্যাতনের মামলা হওয়ায় আলেম সমাজকে হেয় করা হয়েছে- এই ধরনের যুক্তি দিয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ জেলে থেকেই তার সাঙ্গপাঙ্গোদের নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেন।’

বনজ কুমার আরও বলেন, ‘নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার আরও একটি কারণ আমরা জেনেছি। তা হলো- নুসরাতকে মামলার এজহারভুক্ত তৃতীয় আসামি শাহাদাত প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে সে প্রস্তাব নুসরাত ফিরিয়ে দেয়। বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি শাহাদাত। মনে মনে প্রচণ্ড ক্ষোভ জন্মে তার। নুরসাতকে পুড়িয়ে মারার পেছনে সেই আক্রোশটাও কাজ করেছে। ’

সংবাদ সম্মেলনে নুসরাত হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত নয় আসামির মধ্যে আটজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে তথ্য দেন তিনি।

গ্রেফতারদের মধ্যে নূর উদ্দিন হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকার করে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে বলে জানান বনজ কুমার।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ যেভাবে নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যাকারী সিরাজের উত্থান


ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ ও রাফি হত্যা মামলার প্রধান আসামি সিরাজ উদ্দৌলা একজন জামায়াত নেতা। তবে নিজের সুরক্ষা নিশ্চিতে ২০০১ সাল থেকেই ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তিনি গড়ে তুলেছিলেন সুসম্পর্ক।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিনি ম্যানেজিং কমিটিতে সোনাগাজী পৌর বিএনপির সভাপতি আলাউদ্দিন এবং তার সহযোগী জামায়াত নেতা ও পৌর জামায়াতের সাবেক সভাপতি আবদুল মান্নানকে সদস্য করেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সে বিপাকে পড়ে যায়।

পরে ২০১২ সালে আলাউদ্দিন ও আবদুল মান্নানকে বাদ দিয়ে ম্যানেজিং কমিটিতে সদস্য করেন আওয়ামী লীগের উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবদুল হালিম মামুনকে। জামায়াত নেতা আবদুল মান্নানকে ম্যানেজিং কমিটি থেকে সরিয়ে দেয়ার কারণে ব্যাপক ক্ষুব্ধ হন জামায়াতপন্থী শিক্ষকরা।

তখন শেখ মামুনকে হাতে রেখে অন্যদের ঘায়েল করতে ব্যাপক তৎপর হয়ে ওঠেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা। ২০১৫ সালে মাদ্রাসার অর্থনৈতিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে অধ্যক্ষের সঙ্গে মনোমালিন্য শুরু হয় মামুনের। পরে অধ্যক্ষ তার দলে টেনে নেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে।

২০১৮ সালে রুহুল আমিনকে মাদ্রাসা ম্যানেজিং কমিটির সহ-সভাপতি ও তার সহযোগী পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমকে ম্যানেজিং কমিটির সদস্যপদ থেকে সরিয়ে দিয়ে রুহুল আমিনকে সদস্য করেন।

আর এভাবেই কৌশলে প্রভাবশালীদের কব্জা করে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা শিক্ষার্থীদের বছরের পর বছর যৌন হয়রানিসহ নানা অপকর্ম করে পার পেয়ে গেছেন।

এই অধ্যক্ষ নিজে টিকে থাকতে এবং লুটপাট করতে সব সময় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করে অপকর্ম চালিয়ে যেতেন।

উৎসঃ ‌poriborton

আরও পড়ুনঃ নুসরাতের হত্যার ঘটনায় ফেঁসে যাচ্ছেন সেই সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন (ভিডিও সহ)


ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ঘটনায় ফেঁসে যাচ্ছেন সেই সময়ের সোনাগাজী মডেল থানা পুলিশের ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, যৌন নিপীড়নের ঘটনাকে ‘নাটক’ ও পরবর্তীতে অগ্নিদগ্ধের ঘটনাকে ‘আত্মহত্যার’ রূপ দিতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়েছিলেন।

এছাড়া দুটি ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদৌলাসহ তার সহযোগীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এ ধরনের আরও অসংখ্য অভিযোগে ১০ এপ্রিল বুধবার সোনাগাজী মডেল থানা থেকে তাকে প্রত্যাহার করা হয়।

ভিডিওঃ  ‘থানার ওসির কাছে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

৬ এপ্রিল শনিবার সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা কেন্দ্রে নুসরাত জাহান রাফি অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘটনাকে নানাভাবে ‘আত্মহত্যা’ বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। ঘটনার পর থেকে প্রকাশ্যে না বললেও আকারে-ইঙ্গিতে এ ঘটনাকে আত্মহত্যা হিসেবে রূপ দেয়ার চেষ্টা করেছেন বলে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।

ওই সময়ে তার রহস্যজনক আচরণে ক্ষুদ্ধ হয়ে পড়লেও ভয়ে কেউ মুখ খুলেননি। পরে ৯ এপ্রিল এ ঘটনা তদন্তে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইডি খন্দকার গোলাম ফারুক সোনাগাজীর ওই মাদ্রাসায় এলে ওসির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ডিআইজি গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাব না দিলেও ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন উত্তেজিত হন। পরদিন দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তাকে প্রত্যাহার করা হয়।

ভিডিওঃ  শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করবোঃ নুসরাত (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

এর আগে ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে অধ্যক্ষ শ্রেণিকক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠলে দুজনকে থানায় নিয়ে যান ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। ওসি নিয়ম ভেঙে জেরা করতে করতেই নুসরাতের বক্তব্য ভিডিও করেন। মৌখিক অভিযোগ নেয়ার সময় দুই পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেলেও সেখানে নুসরাত ছাড়া অন্য কোনো নারী বা তার আইনজীবী ছিলেন না। ভিডিওটি প্রকাশ হলে অধ্যক্ষ ও তার সহযোগীদের সঙ্গে ওসির সখ্যতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

ভিডিওতে দেখা যায়, থানার ওসির সামনে অঝোরে কাঁদছিলেন নুসরাত। আর সেই কান্নার ভিডিও করছিলেন সোনাগাজী থানার ওসি। নুসরাত তার মুখ দু’হাতে ঢেকে রেখেছিলেন। তাতেও ওসির আপত্তি। বারবারই ‘মুখ থেকে হাত সরাও, কান্না থামাও’ বলার পাশাপাশি তিনি এও বলেন, ‘এমন কিছু হয়নি যে এখনও তোমাকে কাঁদতে হবে।’

থানার ভেতরে নুসরাতকে জেরা করে ওসি বলেন, ‘কিসে পড়া? ক্লাস ছিল?’ ঘটনা জানাতে গিয়ে নুসরাত বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। সে সময় তাকে জিজ্ঞেস করা হয়- ‘কারে কারে জানাইসো বিষয়টা?’

নুসরাত যখন জানায়- তাকে অধ্যক্ষ ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। তখন প্রশ্ন করা হয়- ‘ডেকেছিল, নাকি তুমি ওখানে গেছিলা?’ পিয়নের মাধ্যমে ডেকেছিল বলে নুসরাত জানালে প্রশ্ন করা হয়- ‘পিয়নের মাধ্যমে ডেকেছিল? পিয়নের নাম কী?’ নুসরাত সে সময় পিয়নের নাম বলেন- ‘নূর আলম।’

পুরো ভিডিও জুড়েই নুসরাত কাঁদছিলেন। একসময় ভিডিওধারণকারী তাকে ধমকের সুরে বলে- ‘কাঁদলে আমি বুঝবো কী করে, তোমাকে বলতে হবে। এমন কিছু হয়নি যে তোমাকে কাঁদতে হবে।’

ভিডিও’র শেষে নুসরাতের কথা বলা শেষ হলে ধারণকারী বলেন- ‘এইটুকুই?’ আরও কিছু অশালীন উক্তির পাশাপাশি তাকে উদ্দেশ করে বলেন- ‘এটা কিছু না, কেউ লিখবেও না তোমার কথা। আমি আইনগত ব্যবস্থা নেব। কিছু হয়নি। রাখো। তুমি বসো।’

নুসরাতের জেরা করার সময় ভিডিও করা কতটুকু আইনসম্মত এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সর্বমহলে। এ বিষয়ে আইনজীবীরা বলছেন, যৌন হয়রানির অভিযোগ করার সময় ওসির ভিডিও ধারণের ঘটনায় ওসির বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা করার সুযোগ রয়েছে নুসরাতের পরিবারের।

ওসির এ ধরনের আচরণের বিষয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষ বলছে, আইন না মেনে অভিযোগ করতে যাওয়া কারোর ভিডিও করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ আছে।

এর আগে বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় না ফেরার দেশে চলে যান ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি (১৮)। চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টার পরও তাকে বাঁচানো গেল না। টানা ১০৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে হার মানেন এই ছাত্রী।

ভিডিওঃ  নুসরাতের আগে সিরাজউদ্দৌলার শ্লীলতাহানির শিকার হন আরও এক ছাত্রী বল্লেনঃ প্রভাসক আবুল কাশেম (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

প্রসঙ্গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজীতে পরীক্ষাকেন্দ্রের ভেতর ওই ছাত্রীর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যাচেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। শনিবার সকালে সোনাগাজী পৌর এলাকার ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসাকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। ওই ছাত্রী ওই মাদ্রাসা থেকেই আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন।

পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত কক্ষ থেকে ছাদে ডেকে নিয়ে কয়েকজন বোরকাপরা নারী পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ করেছেন ওই শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যরা।

তারা জানান, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে দায়ের করা মামলা তুলে না নেয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে। এ তথ্য ফেনী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্থানীয় পুলিশকেও জানিয়েছেন নুসরাত। তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় এদিন বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের ১০২ নম্বর কক্ষে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। তাকে লাইফ সাপোর্ট দেয়া হয়। এরপর না ফেরার দেশে চলে যান মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here