তাবলিগের বিরোধের প্রভাব কওমি শিক্ষা বোর্ডেও, তোলড়পাড়

0
131

তাবলিগ জামাতের দুই গ্রুপের বিরোধের প্রভাব পড়ছে কওমি মাদরাসার শিক্ষা বোর্ডগুলোর সমন্বয়ে গঠিত সর্বোচ্চ শিক্ষা বোর্ড ‘আল হায়আতুল উলয়া’য়ও। তাবলিগের সা’দপন্থী হওয়ার অভিযোগে মুফতি ইজহারুল ইসলামের পরিচালনাধীন চট্টগ্রামের লালখান বাজার মাদরাসা ও ঢাকার অপর একটি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষাকেন্দ্র বাতিল এবং মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদের অবস্থান জানার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করার পর বিষয়টি সামনে এসেছে। এ নিয়ে কওমি ঘরানার কিছু অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

বেফাকারুল মাদারিসুল আরাবিয়ার (বেফাক) মহাপরিচালক মাওলানা যোবায়ের আহমদের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাবলিগের বিরোধ কওমি শিক্ষা বোর্ডে ঢুকে যাওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে সেটি যেতে পারে। শিক্ষা বোর্ডের পরও আমাদের একটা পরিচয় আছে- আমরা উলামায়ে হক্কানি এবং মুসলমান। শুধু শিক্ষা বোর্ড বলে বিষয়টি ধামাচাপা দিলে চলবে না। শিক্ষা বোর্ডের বাইরে আমাদের ঈমানিয়ত ও মুসলমানিত্ব রয়েছে। মুফতি ইজহার সাহেবের সা’দপন্থী হওয়ার বিষয়টি আমাদের মুরব্বিদের কাছে ক্লিয়ার হয়ে যাওয়ার কারণে তাকে কোনো শোকজের প্রয়োজন পড়েনি বলেও জানান তিনি।

গত বছর দশম সংসদের শেষ অধিবেশনে ‘কওমি মাদরাসাগুলোর দাওরায়ে হাদিসের (তাকমিল) সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান আইন, ২০১৮’ পাসের মধ্য দিয়ে ‘আল-হায়আতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ নামে যে সর্বোচ্চ বোর্ডের অধীনে কওমি শিক্ষাক্রমের দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের মানের সনদ প্রদানের দায়িত্ব দেয়া হয়। সেই আইন পাস হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা শুরু হবে আগামী ৮ এপ্রিল। এই পরীক্ষাকে সামনে রেখে গত ১৭ মার্চ আল হায়আতুল উলয়া’র কমিটির বৈঠকে সা’দপন্থী হওয়ার অভিযোগে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষনেতা নেজামে ইসলাম পার্টির চেয়ারম্যান মুফতি ইজহার পরিচালিত চট্টগ্রামের লালখান বাজার মাদরাসা ও রাজধানীর ভাটারায় মাওলানা আতাউর রহমান পরিচালিত আল মাদরাসাতুল মুঈনুল ইসলামের দাওয়ারায়ে হাদিসের পরীক্ষাকেন্দ্র বাতিল এবং বেফাকুল মাদারিসিদ্দীনিয়্যা বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদের বিরুদ্ধেও মাওলানা সা’দপন্থী হওয়ার অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়।

‘আল-হায়আতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মুফতি ইজহারুল ইসলাম তাবলিগের মাওলানা সা’দের পক্ষে নিজের অবস্থানই পরিষ্কার করেননি, বাংলাদেশের আলেমদের পক্ষ থেকে মাওলানা সা’দের কাছে ক্ষমা চেয়ে একটি চিঠি লিখেছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তার পরিচালিত মাদরাসার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

তবে মুফতি ইজহারুল ইসলামের ছেলে ও মাদরাসার শিক্ষক মুফতি হারুন ইজহার পরদিন ১৮ মার্চ ফেসবুক লাইভে বলেন, বর্তমানে আমাদের মাদরাসাকে নিয়ে একটি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আমরা বিভিন্ন নিউজ পোর্টালের মাধ্যমে জানতে পারি আমাদের মাদরাসায় হায়আতুল উলইয়ার কেন্দ্রীয় পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। যেহেতু কোনো আইনানুগ ধারাকে সামনে রেখে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি এবং তা সাংগঠনিক নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কোনো নোটিশের মাধ্যমে আমাদেরকে জানানো হয়নি, সে জন্য আমরা এ সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক মনে করি। অসাংবিধানিক মনে করি। এমন অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসার জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

তিনি আরো বলেন, যে অভিযোগের ভিত্তিতে আমাদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেয়া হলো এ ব্যাপারে আমাদের সম্মিলিত বক্তব্য হলোÑ মাওলানা সা’দ ও তার অনুসারীদের সাথে জামিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া লালখান বাজারের কোনো ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবক ও শুভানুধ্যায়ীর কোনো সম্পর্ক নেই। মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী যে বক্তব্য দিয়েছেন এটি একান্ত তার ব্যক্তিগত বক্তব্য। পুরো মাদরাসা একটি কার্যনির্বাহী কমিটি দ্বারা পরিচালিত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী এসব কাজে জড়িত থাকেন না। মাদরাসার আর্থিক, প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত সব সিদ্ধান্ত কার্যনির্বাহী কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে। তাই মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীর ব্যক্তিগত কোনো মতামত রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে এই মাদরাসাকে মূল্যায়ন করা জঘন্যতম ভুল।

‘আল-হায়আতুল উলয়ার অফিস সম্পাদক মাওলানা মু: অসিউর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, এখনো সিদ্ধান্তটি লিখিতভাবে জানানো হয়নি, মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া সিদ্ধান্ত পুনঃবিবেচনার জন্যও কোনো অনুরোধপত্র আসেনি। তিনি জানান, লালখান বাজার মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের ২৬ জন এবং ভাটারার মুঈনুল উলুমের ২১ জন পরীক্ষার্থী রয়েছেন। কেন্দ্র বাতিল হলেও তাদেরকে অন্য কেন্দ্র থেকে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। লিখিত কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বেফাকের মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে মুরব্বিরা কেন্দ্র বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বেফাকুল মাদারিসুল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) মহাপরিচালক মাওলানা যোবায়ের আহমদ চৌধুরী এ ব্যাপারে বলেন, বেফাকের অভিযোগ ছিল, এটাও ঠিক আছে; কিন্তু লালখান বাজার মাদরাসার ব্যাপারে সব বোর্ডের প্রতিনিধিদের অভিযোগের ভিত্তিতে মুরব্বিরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আত্মপক্ষ সমর্থন বা শোকজ নোটিশ না দিয়ে এভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়ে মুফতি হারুন ইজহারের আপত্তির ব্যাপারে তিনি বলেন, মুরব্বিরা মনে করেছেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম ওপেনলি অবস্থান নিয়েছেন। শোকজ করা হয় যখন বিষয়টি ক্লিয়ার থাকে না। যেহেতু এখানে বিষয়টি ক্লিয়ার- এ জন্য শোকজে যাননি। ফাইনাল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এখনো লিখিতভাবে না জানানোর ব্যাপারে তিনি বলেন, আল হায়আতুল উলায়ার পক্ষ থেকে লিখিতভাবে জানানো হবে। তবে তিনি বলেন, উনারা যদি অফিসিয়ালি ডিক্লারেশন দেন যে, আমরা সাদ সাহেবের সাথে নেই, আমাদের সাথে আছেন- এটা লিখিতভাবে দিলে বিবেচনা করা হবে। তিনি বলেন, হারুন ইজহার হয়তো ফেসবুকে তার বক্তব্য দিয়েছেন। অফিসিয়ালি এখনো দেননি। দিলে বিবেচনা করা হবে।

দেওবন্দের নীতি-আদর্শের কারণে মুফতি ইজহারের মাদরাসার কেন্দ্র বাতিল করার কথা বলা হচ্ছে; কিন্তু দেওবন্দ মাদরাসায় তো তাবলিগের উভয় গ্রুপের কাজ নিষিদ্ধ এবং তারা প্রকাশ্যে কারো পক্ষ নেননিÑ এমন প্রশ্নের জবাবে মাওলানা যোবায়ের বলেন, মাওলানা সা’দের ব্যাপারে দেওবন্দ শঙ্কিত, উনি সঠিক লাইনে আছেন কি না। বারবার বলেছেন, রুজুও করবেন, কিন্তু করেননি। উনারা ভারতে অবস্থান নেননি। সেখানে মাইনরি হিসেবে মাঝামাঝি চলেন। বাংলাদেশের অবস্থা ওই রকম না। তবে তারা তাদের অবস্থান অনেকটা ক্লিয়ার করে ফেলেছেন। তারাও কিতাব দেখে বলবেন। আমরা কিতাব দেখেই বলছি।

তাবলিগের বিরোধ শিক্ষা বোর্ডেও প্রভাব ফেলার বিষয়ে তিনি বলেন, এখন সরকার যদি ইসলামবিরোধী কাজ করে আমরা কি শিক্ষা বোর্ড হিসেবে চুপ থাকব? শিক্ষা বোর্ডের পরও আমাদের একটা পরিচয় আছে, উলামায়ে হক্কানি এবং মুসলমান। শুধু শিক্ষা বোর্ড বলে বিষয়টি ধামাচাপা দিলে চলবে না। শিক্ষা বোর্ডের বাইরে আমাদের ঈমানিয়ত ও মুসলমানিত্ব রয়েছে। সরকার দুই গ্রুপকে নিয়ে ইজতেমা আয়োজনের পরও এখন সা’দপন্থী বলে সরকারি সনদের পরীক্ষার কেন্দ্র বাতিলের বিষয়টি সরকারের অবস্থানের বিরুদ্ধে যায় কি নাÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকার শেষ পর্যন্ত দুই গ্রুপের ইজতেমা একসাথে করেনি। আলাদা আলাদ করেছে। এ ব্যাপারে সরকারের সাথে আমাদের কিছু বোঝাপড়া বাকি রয়েছে। উনারা সাময়িকভাবে করলেন না স্থায়ীভাবে করলেন এটা বোঝার ব্যাপার রয়েছে। তিনি বলেন, দেওবন্দ ক্লিয়ার মতামত দেয়নি সা’দপন্থীদের ব্যাপারে। কিন্তু আমরা এবারত যতটুকু বুঝি অন্যরা বুঝবে না। আমাদের তাদের সাথে যোগাযোগ আছে। উনারা আলেম, আমরা তো আওয়াম না, আমরা এটা বুঝি।

উল্লেখ্য, আগামী ৮ এপ্রিল থেকে অনুষ্ঠেয় দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষায় সারা দেশের এক হাজার ২৪৪টি মাদরাসার ২৬ হাজার ৭২১ জন পরীক্ষা দেবেন। এর মধ্যে বেফাকের অধীন মাদরাসাগুলোর ছাত্রসংখ্যা সর্বোচ্চ ২১ হাজার ৫৫৩ জন।

উৎসঃ নয়াদিগন্ত

আরও পড়ুনঃ আল্লামা কাসেমীর জিজ্ঞাসা,ছাত্রলীগ মুসলিম নারীদের পর্দাকে নিষিদ্ধ মনে করে কিনা?


গত ১৩ মার্চ বুধবার মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিএস গোলাম রাব্বানী কর্তৃক বেগম রোকেয়া হলের গেটে ছাত্রীদের সাথে বাকবিত-ার এক পর্যায়ে বোরকা ও হিজাবধারী ছাত্রীদেরকে ঢালাওভাবে জামায়াত-শিবিরের কর্মী বলে আখ্যায়িত করায় গভীর উষ্মা প্রকাশ করেছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ’র মহাসচিব শায়খুল হাদীস আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী। তিনি বলেন, ছাত্রীদের বোরকা ও হিজাব পরা এবং পরপুরুষের কাছ থেকে মুখ ঢেকে চলা- ফেরার সাথে জামাত-শিবিরের কী সম্পর্ক রয়েছে?

মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী আরো বলেছেন, মুসলিম সাবালক নারীদের জন্য ঘরের বাইরে চলাফেরার সময় সাবালক পরপুরুষের দৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়ালে রাখতে পর্দা করে চলা ফরয তথা ইসলামের অপরিহার্য বিধান। ইসলামের এই অপরিহার্য পর্দার বিধান পালন করার জন্যই ধর্মভীরু মুসলিম ছাত্রীরা বোরকা, হিজাব ও নেকাব পরে থাকেন। এই বোরকা, হিজাব, নেকাবের সম্পর্ক তো ইসলামের সাথে।

আল্লামা কাসেমী প্রশ্ন তুলে বলেন, ছাত্র নেতা গোলাম রাব্বানীকে বলতে হবে, তার সংগঠন বোরকা, হিজাব বা নিকাবের বিরোধী কিনা? তাদের ছাত্রী সংগঠনের নেত্রী ও কর্মীদের হিজাব পরতে বাধা আছে কিনা? সেই রাতের ঘটনায় তো মনে হচ্ছে, গোলাম রাব্বানীর সংগঠন নারীদের জন্য ইসলামের অপরিহার্য পর্দা বিধানের বিপক্ষে। অন্যথায় গোলাম রাব্বানীর এমন গর্হিত বক্তব্যের জন্য তো তাকে সাংগঠনিকভাবে শোকজ করার কথা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে একজন হিজাবধারী ছাত্রীকে পদে পদে যে পরিমাণ নাজেহাল হতে হয়, ইউরোপ-আমেরিকার মতো পশ্চিমা অমুসলিম দেশেও প্রকাশ্যে এতটা নাজেহাল হতে হয়, শুনি না। বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে হিজাব পরা নারীদের এতটা অসম্মান ও এতটা বাধাগ্রস্ত করা বাস্তবিকই অনেক বেদনাদায়ক ও হতাশার। ইসলামী নেতৃবৃন্দ, রাজনীতিবিদ, মানবাধিকারকর্মী এবং সর্বোপরি প্রশাসনের প্রতি দেশের সকল স্তরে মুসলিম নারীদের হিজাবের স্বধীনতা নিশ্চিতের বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নেওয়ার জন্য জমিয়ত মহাসচিব আহ্বান জানান। বিজ্ঞপ্তি।

উৎসঃ নয়াদিগন্ত

আরও পড়ুনঃ সরকারের কাছে মেননের বিচার চাইলেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী


জাতীয় সংসদে কওমি মাদ্রাসা ও ইসলামি শাসনব্যবস্থা নিয়ে ‘কটূক্তির’ অভিযোগ তুলে সাবেক মন্ত্রী এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিচার দাবি করেছেন হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী। এ সময় তিনি সরকারের কাছে মেননের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

মঙ্গলবার বিকালে মাদারীপুরে এক মহাসম্মেলনে বক্তব্য দেন আল্লামা শফী। মাদারীপুর ইমাম-মুয়াজ্জিন সমাজ কল্যাণ পরিষদ এই সম্মেলনের আয়োজন করে।

গত ৩ মার্চ জাতীয় সংসদে মেনন রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে হেফাজত আমিরের সমালোচনা করেন। এছাড়া তিনি কওমি মাদরাসাকে ‘বিষবৃক্ষ’ বলে আখ্যায়িত করেন। তার সেই বক্তব্যের কড়া প্রতিবাদ জানায় হেফাজতে ইসলামসহ আলেম-উলামা ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা।

জাতীয় সংসদে মেনন কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে সমর্থন করেছেন এমন অভিযোগও তোলা হয় হেফাজতের পক্ষ থেকে।

মেননের দিকে ইঙ্গিত করে আল্লামা শফী বলেন, ‘কাদিয়ানিরা আমাদের শেষ নবী হজরত মোহাম্মদ সা.কে শেষ নবী হিসেবে মানে না। তাই ওরা কাফের। ওদের সঙ্গে আত্মীয়তা ও মেলামেশা করবেন না।’

উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে আহমদ শফী বলেন, ‘আপনারা নিয়মিত নামাজ পড়বেন, লম্বা দাড়ি রাখবেন, অন্যের গিবত-শেকায়েত করবেন না।’

তাবলিগের সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আলেম-উলামাদের সাথে মিলেমিশে তাবলিগ করবেন। আলেমদের ছাড়া কোনো তাবলিগ হতে পারে না।’

এ সময় আল্লামা শফী সরকারের কাছে ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। ছয় দফার মধ্যে রয়েছে কোরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করা; সাংসদ মেননকে ইসলাম বিদ্বেষী বক্তব্যের কারণে গ্রেপ্তার ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা করা; কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করা; উলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে দীনি কাজ করা ও সাদপন্থীদের সব কার্যক্রম বন্ধ করা; নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলার তীব্র নিন্দা ও হত্যাকারীর ফাঁসির দাবি এবং কোরআন-সুন্নাহ অবমাননাকারী ও মহানবীকে নিয়ে কটূক্তিকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি।

পুরান বাজার বড় মসজিদের ইমাম মাওলানা কারী বোরহান উদ্দিন খানের সভাপতিত্বে মহাসম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন বাহাদুরপুর দরবারের পীর আবদুল্লাহ মোহাম্মদ হাসান, গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার মুহতামিম মুফতি রুহুল আমিন, সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, পৌর মেয়র খালিদ হোসেন ইয়াদ প্রমুখ।

উৎসঃ ঢাকাটাইমস

আরও পড়ুনঃ বাকশাল থাকলে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠতো না: শেখ হাসিনা

শেখ মুজিবুর রহমান প্রবর্তিত শাসন ব্যবস্থা (বাকশাল) কার্যকর থাকলে নির্বাচন নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকতো না দাবি করে শেখ হাসিনা বলেছেন, বাকশাল ছিলো সর্বোত্তম পন্থা।

‘‘আমি বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধু যে পদ্ধতিটা (বাকশাল) করে গিয়েছিলেন সেটা যদি কার্যকর করতে পারতেন তাহলে এসব (নির্বাচনী অস্বচ্ছতা) প্রশ্ন আর উঠতো না।’’

সোমবার শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

শেখ মুজিবুর রহমান সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন জানিয়ে শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘শুধুমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে বাংলাদেশ তার প্রবৃদ্ধির ৭ ভাগে উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছিল। তিনি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন, আজ নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা উঠে; আর আমাদের বিরোধী দল বাকশাল বাকশাল করে গালি দেয়, তারা যদি একবার চিন্তা করতেন, শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন একটা বিপ্লবের পর যেকোন দেশে একটা বিবর্তন দেখা দেয়। সেই বিবর্তনের ফলে কিছু মানুষ হঠাৎ ধনী শ্রেণীতে পরিণত হয় আবার ভালো উচ্চবিত্ত মানুষ তাদের ধন-সম্পদ ধরে রাখতে পারে না। কাজেই এ ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ধারা সুনিশ্চিত করা এবং ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা একান্তভাবে দরকার। সব বিবেচনায় শেখ মুজিবুর রহমান সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে আমি বিশ্বাস করি।

‘‘পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ধারা ছিল না, আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা দিল, সে গণতন্ত্রের ফর্মুলা দিল বেসিক ডেমোক্রেসি! মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হলো। আর শেখ মুজিবুর রহমান চাইলেন মানুষ যেন তার ভোটের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে। যে অধিকার তিনি দিয়েছিলেন ৭২ এর সংবিধানে। জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করে শেখ মুজিবুর রহমান এমন একটি পদ্ধতি এনেছিলেন যেখানে কেউ অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে পারবে না। সরকারের পক্ষ থেকে যে যে প্রার্থী হবে সকলের নাম একটি পোস্টারে দিয়ে প্রচার করা হবে। যে ব্যক্তি যত বেশি জনগণের কাছে যেতে পারবে, জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে সেই শুধু নির্বাচিত হবে।’’

বাকশালের স্বচ্ছতা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন: এ পদ্ধতিতে দুটি নির্বাচন হয়। সে নির্বাচনের একটি হয়েছিল কিশোরগঞ্জে, সেখানে সৈয়দ নজরুল ইসলামের ভাই দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু জনগণ ভোট দিয়েছিল একজন স্কুল মাস্টারকে। আর একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় পটুয়াখালীতে।

এ পদ্ধতি চালু নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে শেখ হাসিনা প্রশ্ন করেছিলেন জানিয়ে আলোচনা সভায় তিনি বলেন, আমি তাকে (বঙ্গবন্ধু) জিজ্ঞেস করেছিলাম আপনি এ পদ্ধতি করলেন কেন? তিনি আমাকে বলেছিলেন, আমাদের দেশে একটি বিপ্লব হয়েছে। এখানে গেরিলা যুদ্ধ হয়েছে; একটা বিপ্লবের পর কিছু মানুষের হাতে অর্থ চলে আসে। আমি চেয়েছি নির্বাচন যেন অর্থ এবং লাঠি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়। জনগণের কাছে যেন ভোটের অধিকারটা থাকে, প্রতিনিধি নির্বাচন করার অধিকারটা থাকে। তা নিশ্চিত করবার জন্যই আমি এই পদ্ধতিটা শুরু করেছি।

বাকশাল বাংলাদেশের জন্য উপযোগি ছিলো দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন: এটা বাংলাদেশের জন্য যে কতটা উপযোগী ছিল একসময় বাংলাদেশের মানুষ তা ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি। বঙ্গবন্ধু যে পদ্ধতিটা করে গিয়েছিলেন সেটা যদি কার্যকর করতে পারতেন তাহলে এসব প্রশ্ন (নির্বাচনে অস্বচ্ছ্বতা) আর আসতো না। সব থেকে জনদরদি যে ব্যক্তিটি জনসেবা যে করে সেই নির্বাচিত হয়ে আসতে পারতো।

উৎসঃ channelionline

আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশে গুম: ফিরে আসা ব্যক্তিদের থেকে কিছু জানা যায়না কেন?


প্রায় ১৫ মাস নিখোঁজ থাকার পর গতকাল নিজ বাড়িতে ফিরে এসেছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। তবে তিনি কোথায় কি অবস্থায় ছিলেন এবং ফিরলেন কিভাবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কিছু জানা যায়নি।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাত ১টার দিকে মারুফ জামান একা একাই তার ধানমন্ডির বাসায় ফিরে আসেন। বাড়ির ম্যানেজার তাকে দেখতে পেয়ে ওপরে নিয়ে যান। এ সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন বলে জানা গেছে।

মিস্টার জামানের মেয়ে গতকাল তার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে বাবার ফিরে আসার খবরটি নিশ্চিত করলেও এ বিষয়ে আর কিছু জানতে না চাওয়ার অনুরোধ করেন। এমনকি পুলিশের সঙ্গেও এখন কথা বলছেন না তারা।

পুলিশ কি বলছে?

ধানমন্ডি থানার ওসি আব্দুল লতিফ বলেন,”মারুফ জামানের মেয়ে আমাদেরকে জানিয়েছেন যে তার বাবা ফিরে এসেছেন। তাদের ভবনের ম্যানেজার তাকে দেখতে পেয়ে বাসার ভেতরে নিয়ে আসেন।”

মিস্টার মারুফের মেয়ে তার বাবার সঙ্গে কাউকেই এখন পর্যন্ত দেখা করতে দেননি। তাই তিনি কিভাবে ফিরেছেন, কোথা থেকে এসেছেন, কে দিয়ে গেছেন- কোন কিছুই জানা সম্ভব হয়নি।

ওসি আব্দুল লতিফ বলেন,”মারুফ জামানের খোঁজ নিতে আমার দুইজন লোক ওনার বাসায় গেলে তার মেয়ে বলেছেন যে উনি অসুস্থ। কোন কথা বলবেন না। একটু সুস্থ হওয়ার পর কথা বলবেন।”

মিস্টার জামান কিছু জানালে যদি কোন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ থাকে তাহলে পুলিশ সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে বলে জানান ওসি আব্দুল লতিফ।

গুম হওয়া ব্যক্তিদের অনেক পরিবারের অভিযোগ তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোন সহযোগিতা পাননা।

আশার আলো দেখছেন নিখোঁজদের পরিবার:

২০১৭ সালের চৌঠা ডিসেম্বর মারুফ জামান নিজ বাড়ি থেকে বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন।

তারও চার বছর আগে জাতীয় নির্বাচনের সময় আরো কয়েকজনের সঙ্গে নিখোঁজ হয়েছিলেন সাজেদুল ইসলাম নামে বিএনপির এক সংগঠক।

গত ছয় বছর ধরে প্রিয়জনের খোঁজ না পেলেও মিস্টার জামানের ফিরে আসা নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে সাজেদুলের পরিবারে।

তবে হাইকোর্টের রুল জারি সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত ভাইয়ের সন্ধানে কোন অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ জানান নিখোঁজের বোন সানজিদা ইসলাম।

“এটা আমাদের জন্য আশা যে ১৫ মাস পরে যদি মারুফ জামান ফিরে আসেন, তাহলে নিখোঁজ অন্যরাও ফিরতে পারেন।”

“আমরাও ভাইয়ের সন্ধানের দাবিতে অনেক সংবাদ সম্মেলন করেছি। মন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রশাসন আশ্বাস দিয়েছে তারা দেখবেন। কিন্তু তারা কোন তদন্ত করেনি।”

কেন তারা নীরব?

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৩১০জন গুমের শিকার হয়েছেন৷ তাদের মধ্যে ৩৩ জন ফেরত এসেছেন৷

তবে যারা ফিরে এসেছেন তাদের সঙ্গে কি ঘটেছিলো সে ব্যাপারে প্রায় কেউই মুখ খোলেননি।

রাষ্ট্রযন্ত্র ও আইনি কাঠামোর ওপর আস্থাহীনতা এই নীরবতার বড় কারণ বলে মনে করেন মানবাধিকার কর্মী এবং গুম পরিস্থিতির গবেষক নূর খান।

“রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা-বাহিনীর পক্ষ থেকে এমন কোন উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখা যায়না, যার কারণে তারা ছাড়া পাচ্ছেন এবং যারা তাদের আটক করেছে তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে।”

এছাড়া এতো দীর্ঘ সময় কাউকে আটক রাখা কোন দুষ্কৃতিকারী দলের পক্ষে সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এটা কেবল তাদের পক্ষেই সম্ভব যারা অনেক শক্তিশালী এবং নির্দেশিত পন্থায় কাজ করে।”

এ পর্যন্ত যারা ফিরে এসেছেন তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন নূর খান।

তিনি জানান প্রত্যেকের বক্তব্যে এটাই স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে তাদেরকে এমন জায়গায় রাখা হতো যেখানে সাধারণ মানুষের চলাচলের সুযোগ নেই এবং আটককারীরা প্রশিক্ষিত গ্রুপের সদস্য।

তবে তারা এই কথাগুলো প্রকাশ্যে আনতে চান না, আরেকটি বিপর্যয় ঘটতে পারে এমন আশঙ্কায়।গুম ঠেকাতে কি প্রয়োজন?

তবে এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ফিরে আসা প্রত্যেকের অভিজ্ঞতাগুলো সামনে আনা জরুরি বলে মনে করেন মানবাধিকার-কর্মী সুলতানা কামাল।

যেসব আশঙ্কা ও হুমকির কারণে এই মানুষগুলো মুখ খুলতে ভয় পান সেই ভয় দূর করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর আরও জোরালো ভূমিকা নেয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

সুলতানা কামাল বলেন, “এর আগে যারা হারিয়ে গিয়েছিলেন, পরে ফিরে এসেছেন, তাদের কাছে আমরা প্রশ্ন রেখেছিলাম, তার মধ্যে একটি উত্তর এমন ছিল যে, ছেলেমেয়ের ওপর যখন হুমকি আসে তখন মুখ খোলা কঠিন। তার মানে নিশ্চয়ই তাদেরকে এমনই কোন শর্ত দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। যার জন্য তারা মুখ খুলতে ভয় পান।”

“কিন্তু এটা আমি মনে করি তাদেরও একটা দায়িত্ব জানানো যে কি হয়েছিল না হয়েছিল। তাহলে আমরাও হয়তো এটা সুরাহা করার একটা পথ পেতাম। তাছাড়া আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তারাই বা এটার সুরাহা করেননা কেন?”

নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনের অভিযোগ, তারা প্রিয়জনের খোঁজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ করলেও এখনও কোনটির তদন্ত শুরু করা হয়নি।

এমন অবস্থায় প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।

উৎসঃ বিবিসি

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here