সিরিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন আগ্রাসন

0
113

১৯৬৭ সালে যুদ্ধের সময় ইসরাইল সিরিয়ার ভূখণ্ড গোলান হাইটস দখল করেছিল। সেই থেকে গোলান ইসরাইলের দখলে আছে। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে এই দখলের স্বীকৃতি কোনো দেশই দেয়নি।

তারা সবাই একমত যে, গোলান সিরিয়ার ভূখণ্ড এবং ইসরাইলকে এই ভূখণ্ড ফেরত দিতে হবে। জাতিসংঘও এই মর্মে একাধিক প্রস্তাব পাস করেছে ও নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চক্রান্তমূলক তৎপরতার কারণে ইসরাইল আজ পর্যন্ত সিরিয়াকে গোলান ফেরত দেয়নি এবং দাবি করেছে যে, গোলান হল ইসরাইলের অংশ।

এই পরিস্থিতিতে সিরিয়া থেকে আইএস সম্পূর্ণভাবে উৎখাত হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন এ অঞ্চলে নতুন করে এক সংকটজনক অবস্থা সৃষ্টি করেছে। ২৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম হঠাৎ করে এক ঘোষণায় স্বাক্ষর করে বলেছেন যে, গোলান হল ইসরাইলের।

গোলানের ওপর ইসরাইলের সার্বভৌমত্বকে এভাবে স্বীকৃতি দিয়ে তিনি দীর্ঘদিনের একটি ঝুলে থাকা সমস্যার ‘সমাধান’ করেছেন! মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ঔদ্ধত্য যে কোন পর্যায়ে আছে এটা হল তার সাম্প্রতিক উদাহরণের একটি।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ২৫ মার্চ তারিখেই হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তার উপস্থিতিতেই ট্রাম্প উপরোক্ত ঘোষণায় স্বাক্ষর দেন।

এখানে বলা দরকার যে, ইসরাইল কর্তৃক ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের সময় শুধু গোলান দখল করাই নয়, তারপর ১৯৮১ সালে তারা গোলানকে নিজস্ব ভূমি হিসেবে ঘোষণা করে। সেই ঘোষণা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিকভাবে কেউই তাকে আজ পর্যন্ত স্বীকৃতি দেয়নি।

এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুনকে চরম ঔদ্ধত্যের সঙ্গে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গোলানের ওপর ইসরাইলের সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করলেন। ইসরাইলের পক্ষে এই তার প্রথম কীর্তি নয়।

২০১৭ সালে তিনি জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এক ঘোষণা জারি করেন। এটাও ছিল আন্তর্জাতিক রীতিনীতির সম্পূর্ণ বরখেলাপ। তা সত্ত্বেও জেরুসালেমকে এই স্বীকৃতি দেয়ার পর কয়েকটি সাম্রাজ্যবাদী দেশও এ কাজ করেছে, যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কোনো দেশ এই স্বীকৃতিকে সমর্থন করেনি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন এত উলঙ্গভাবে তাদের সাম্রাজ্যবাদী আচরণ শুরু করেছেন, যা পূর্ববর্তী মার্কিন আগ্রাসনের মধ্যে খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, যদিও বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে তাদের আগ্রাসী তৎপরতার কোনো শেষ থাকেনি।

কিন্তু ট্রাম্প এখন বেশ খোলাখুলিভাবেই অর্থাৎ বেপরোয়াভাবে পশ্চাৎপদ ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রদেশ মনে করে ইচ্ছেমতো কাজ করছেন। তিনি প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েই বলছেন যে, প্রত্যেক দেশেই হস্তক্ষেপ করার অধিকার তার আছে, যদি দেখা যায় সেই দেশ দ্বারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

এক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অর্থ অন্য দেশকে ইচ্ছেমতো শোষণ করতে না পারা, তার ওপর নিজেদের নীতি চাপিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে অসুবিধা হওয়া। এভাবেই এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ করছেন, এমনকি হুমকি দিচ্ছেন তার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটি দখল করার। এভাবেই তিনি উত্তর কোরিয়াকে বলছেন, তার সব পারমাণবিক আয়োজন মার্কিন যুক্তফ্রন্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হব।

এভাবেই তিনি আফগানিস্তানে সেখানকার সরকারকে ডিঙিয়ে সোজাসুজি তালেবানদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সেখানে তাদেরকে ক্ষমতায় বসানোর চক্রান্ত করছেন। তিনি মনে করছেন, এসব কাজের অধিকার তার বা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আছে। এ সবই তাদের এখতিয়ারভুক্ত।

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, ১৯৬৭ সালের পর থেকে প্রায় অর্ধশতাব্দী কাল ধরে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও সেখানে ইসরাইলের অধিকার মেনে নেয়নি এবং এ সমস্যার সমাধান সিরিয়ার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে হওয়ার কথা বলে এসেছে।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও সর্বসম্মতভাবে এই অবস্থানই গ্রহণ করেছে। তা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন গোলানকে ইসরাইলের ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, অর্থাৎ তিনি গোলানকে তুলে দিয়েছেন ইসরাইলের হাতে। এ প্রসঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কার ভূখণ্ড কাকে হস্তান্তর করছেন তার ঠিক নেই। তার অবস্থা দেখে মনে হয় সিরিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রদেশ, কোনো স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ নয়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গোলান সম্পর্কিত ঘোষণার পর সিরিয়া জাতিসংঘের কাছে চিঠি দিয়ে এখনই নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক আহ্বানের দাবি জানিয়েছে। গোলানে সিরিয়া ও ইসরাইলের সীমান্তে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীর অবস্থান নিয়েও নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা হওয়ার কথা।

ইতিমধ্যে ব্রিটেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জার্মানি ও পোল্যান্ড প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাজের বিরোধিতা করে বিবৃতি দিয়ে বলেছে, তারা গোলান হাইটসকে মনে করে ইসরাইল কর্তৃক অধিকৃত ভূখণ্ড। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রস্তাবে যে আন্তর্জাতিক নীতি অনুসরণের কথা বলা আছে, সেই অনুযায়ী গোলান মালভূমি ইসরাইল কর্তৃক সিরিয়ার কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

সিরিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর চক্রান্তের বিষয় সবারই জানা। দীর্ঘদিন ধরে সিরিয়ায় তারা ‘regime change’-এর কথা বলে আসছে বেশ প্রকাশ্যেই।

লিবিয়া ধ্বংস ও অধিকার করার পর তারা সিরিয়ায় যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, তাকে তারা গৃহযুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করলেও আসলে সেটা কোনো গৃহযুদ্ধ ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেখানে আইএসের সন্ত্রাসীদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সিরিয়ার বিরুদ্ধে নিযুক্ত করেছিল।

তার সঙ্গে ছিল মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের পরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিকটতম সহযোগী ও হুকুমবরদার সৌদি আরব। তারা সিরিয়ায় আইএসকে প্রভূত অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিল। এছাড়া সিরিয়ায় শিয়া-সুন্নি সংঘর্ষ চাগিয়ে তোলার জন্য তারা অন্যান্য সন্ত্রাসী গ্রুপও খাড়া করেছিল।

তারা সবাই সিরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে দেশটিকে অস্থিতিশীল করে সেখানে ধ্বংসযজ্ঞ করে। এসবের বিরুদ্ধে সিরিয়া সরকার ব্যাপক সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে শেষপর্যন্ত তাদেরকে পরাজিত করে।

পরে আইএসের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার কারণে সিরিয়ায় মার্কিন সৈন্য নামানো হয় এবং তারা আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করে। মাত্র কয়েকদিন আগেই সে লড়াইও শেষ হয়েছে এবং সমগ্র সিরিয়ায় এখন প্রেসিডেন্ট আসাদের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়েছে সিরিয়ার বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন চক্রান্তমূলক তৎপরতা। সেই তৎপরতার ফলই হল তার দ্বারা হঠাৎ করে গোলানকে ইসরাইলের ভূখণ্ড হিসেবে তার ঘোষণা। এই ঘোষণা তিনি স্বাক্ষর করেছেন হোয়াইট হাউসে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর উপস্থিতিতে।

এর একটা অতিরিক্ত কারণ হল, ইসরাইলের আসন্ন নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে সাহায্য করা। কারণ ব্যাপক আকারে লুটপাট ও চুরি-দুর্নীতির কারণে ইসরাইলে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে মামলা চলছে। তার নানা অপকর্মের বিরুদ্ধে ইসরাইলের জনগণও তার অপসারণ চাইছেন।

কিন্তু ট্রাম্প নেতানিয়াহুর একজন শক্তিশালী সমর্থক। তিনি চান নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জয়। এক্ষেত্রে সহায়তার জন্যই তিনি আগে জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং এখন গোলানকে তুলে দিতে চেষ্টা করছেন ইসরাইলের হাতে।

গোলান সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণা আপাতদৃষ্টিতে হঠাৎ মনে হলেও এটি সিরিয়ার বিরুদ্ধে তাদের দীর্ঘদিনের চক্রান্তেরই অংশ। এজন্য দেখা যাবে সিরিয়ার যুদ্ধে ইসরাইলের ভূমিকা ছোট করে দেখার নয়। তারা সিরিয়ায় আহত আইএস সৈন্যদেরকে ইসরাইলে নিয়ে এসে তাদের হালকাভাবে চিকিৎসা করে আবার সিরিয়ায় ফেরত পাঠিয়েছে।

এছাড়া অন্য নানাভাবেও তারা আইএসকে সাহায্য করেছে। এর কারণ হিসেবে তারা বলে এসেছে যে, আইএস বা আল-কায়দা ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোনো আক্রমণ করেনি। অর্থাৎ তারা হল ইসরাইলের এক ধরনের বন্ধু। কাজেই সিরিয়ায় তাদের কথিত গৃহযুদ্ধে ইসরাইল সবসময়েই চেয়েছে প্রেসিডেন্ট আসাদের সরকারের বিরুদ্ধে আইএসের জয়।

এবার আশা যেতে পারে অন্য একটি বিষয়ে। ইসরাইল সরকার গোলানে তেলের রিজার্ভের সন্ধান পেয়েছেন। এই তেল যাতে সিরিয়ার হাতে কোনোভাবেই না যায়, সেটাও তড়িঘড়ি করে গোলানকে ইসরাইলের হাতে তুলে দেয়ার চক্রান্তের অন্যতম মূল কারণ।

সিরিয়ার পুনর্নির্মাণের জন্য তেল খুব প্রয়োজন। সিরিয়াকে তাদের নিজেদের তেল থেকে বঞ্চিত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইউফ্রেটিস নদীর পূর্বদিকের কিছু এলাকা নিজেদের দখলে রেখেছে। সেখান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করেনি। গোলানে তেলের সন্ধানের কথা দুনিয়ার কাছে গোপন থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তা ভালোভাবেই জানা।

এই তেল যাতে সিরিয়ার হাতে না যায় সেজন্য তারা ইতিমধ্যে গোলানে বেহরব ঊহবৎমু নামে একটি তেল কোম্পানি খাড়া করেছে, যার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হলেন ব্রিটিশ প্রতিপত্তিশালী ব্যাংকার রথসচাইল্ড, সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি, সংবাদপত্র ব্যারন রুপার্ট মারডক এবং সিআইএ’র সাবেক ডিরেক্টর জেমস উলসি।

গোলানে যে তেল আছে সেটা মার্কিনের প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। কাজেই সেখানে এ ধরনের কোনো স্বার্থ তাদের নেই। তাদের মূল লক্ষ্য হল সিরিয়াকে এই তেল থেকে বঞ্চিত রাখা।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উন্মাদের মতো একের পর এক যেসব গণবিরোধী, বিভিন্ন দেশবিরোধী, এমনকি ধরিত্রীবিরোধী সিদ্ধান্ত তার দুই বছরের শাসনকালে নিয়েছেন, তার প্রতিটিরই ফলাফল মারাত্মক হতে বাধ্য।

গোলান মালভূমি সিরিয়াকে ফেরত দেয়ার পরিবর্তে সেটা ইসরাইলকে দেয়ার যে ঘোষণা তিনি দিয়েছেন, এর ফলও যে মারাত্মক দাঁড়াবে এতে সন্দেহ নেই। এর ফলে শুধু যে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে তাই নয়, এর দ্বারা জাতিসংঘের কার্যকারিতা সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে দুনিয়াজুড়ে নানান দেশে বিপর্যস্ত অবস্থা তৈরি হবে।

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ বেদনা বিধুর গ্রানাডা ট্রাজেডি ও মুসলিম উম্মাহর শিক্ষা


ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্য মুসলমানদেরকে আবারো বিশ্বে শন্তি প্রতিষ্ঠার তরে নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হওয়ার প্রেরণা দেয়। মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইতিহাস-ঐতিহ্যে সর্বকালের সেরা জাতি হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষীরা মুসলমানদের জগৎজোড়া সকল যশ-খ্যাতিকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে যুগে যুগে নানামুখী ফন্দি এঁটেছিল। তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়ে চলছে একের পর এক। সে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। গ্রানাডা ট্র্যাজেডি তার একটি উপাখ্যান মাত্র।

মুসলমানদের ওপর গ্রানাডার সে লোমহর্ষক ঘটনার ধারাবহিকতা এখনো ঘটে চলছে পৃথিবীর দিকে দিকে। মুসলমানরা কোন ঘটনা থেকেই শিক্ষা গ্রহন করতে পারেনি। মহান আল্লাহ চেষ্টা ছাড়া কোন জাতির ভাগ্যের পরিবর্তন করেন না। যেখানে বান্দার চেষ্টা শেষ সেখানে আল্লাহর সাহায্য শুরু। নেতৃত্ব, দূরদর্শী পরিকল্পনা ও অবিরাম লক্ষ্য অর্জনে পথচলার ব্যত্যয় ঘটায় ইসলাম বিরোধীদের আক্রমনের তীব্রতা যেন বেড়েই চলছে। গ্রানাডা ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তির যাঁতাকলে মুসলমানদের আর কতকাল নিষ্পেষিত হতে হবে? এর উত্তর যেন কারো জানা নেই। এরপরও শোককে শক্তিতে পরিণত করে দূরদর্শী পরিকল্পনা নিয়ে মুসলমানরা এগিয়ে গেলে নিঃসন্দেহে একদিন সুদিন ফিরে আসবেই। এখনও সারা বিশ্বের সিংহভাগ সম্পদ ও জনবল মুসলমানদেরই। তাই মুসলমানদের পক্ষেই সব সম্ভব।

বেদনা বিধুর গ্রানাডা ট্রাজেডি

ইসলামের সুমহান সৌন্দর্য্য বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল রাসুল (সঃ) এর সময় থেকেই। কালের পরিক্রমায় সে আলো আছড়ে পড়ে ইউরোপের মাটিতেও। উমাইয়া সালতানাতের বীর সেনাপতি তারেক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে স্পেনের মাটিতে ইসলামের পতাকা উড়তে শুরু করে অষ্টম শতাব্দীর শেষের দিকে। ১৪৯২ সালের আগ পর্যন্ত প্রায় আটশত বছর ধরে স্পেনে মুসলমানদের স্বর্ণযুগ ছিল। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য, চিকিৎসা, রাজনীতি, স্থাপত্যশিল্প ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে সে সময়কালে স্পেনই ছিল একমাত্র স্পেনের উদাহারণ। মুসলমানদের এমন উন্নতি খৃষ্টানরা মোটেও পছন্দ করলো না। মুসলমানদের অভ্যন্তরে বিভেদ সৃষ্টি করে সাজানো বাগানকে তছনছ করার জন্য খৃষ্টান রাজা ফার্ডিন্যান্ড এক ভয়ঙ্কর ফন্দি এটেছিল।

রাসুলের (সা) যুগে যেভাবে মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মুসলমানদের কাতারে থেকে মুসলমানদেরই ক্ষতি করত, তেমনি আবু দাউদ নামক জনৈক গাদ্দার স্পেনের গ্রানাডার শেষ সুলতান আবুল হাসানের ছত্রছায়ায় থেকে খৃষ্টান রাজা ফার্ডিন্যান্ডের স্পেন ধ্বংসের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখলো। তার সাথে যোগ দিল রাজ্যের আরো কিছু ক্ষমতালোভী ব্যক্তিবর্গ। সে হত্যাযজ্ঞের মিশনকে পাকাপোক্ত করতে পার্শ্ববর্তী দেশের রানী ইসাবেলাকে হাত করতে ফার্ডিন্যান্ড তাকে বিয়ে করে। এরপর ষড়যন্ত্রের বীজ বুনিত হলো সারা স্পেনে। মুসলিম নেতৃবৃন্দের অন্তঃকোন্দোলে যখন এমনিতেই অবস্থা বিপর্যস্ত, ঠিক সে সময়ই ফার্ডিন্যান্ড হামলে পড়ল মুসলমানদের উপর। ইতিহাস বলে সে অভিযানে মুসলমানদের খুনের দরিয়া বয়ে গিয়েছিল স্পেনের চারদিকে। নেতৃত্বহীন মুসলমানরা জীবন বাঁচানোর জন্য যখন দিশেহারা, ঠিক তখন ফার্ডিন্যান্ড এর পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হলো- যারা মসজিদে ও জাহাজে আশ্রয় নিবে, শুধু তারাই রেহাই পাবে। খৃষ্টানদের ছলনাময়ী প্রস্তাবে রাজী হয়ে সবাই মসজিদে ও জাহাজে আশ্রয় নিল।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যারা মসজিদে আশ্রয় নিয়েছিল তাদেরকে তালাবদ্ধ করে দাহ্য তেল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে এবং জাহাজে আশ্রিতদের সাগরে ডুবিয়ে করুণ মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছিল। আশ্রিতদের একটি বড় অংশ ছিল শিশু-বৃদ্ধ, অসুস্থ ও অসহায়। আগুনে পুড়ে লাখো বনী আদম যখন প্রাণ হারাচ্ছিল, আর্তচিৎকারে যখন আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওষ্ঠাগত, ঠিক তখন মানব ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকারী কুখ্যাত ঘাতক ফার্ডিন্যান্ড ও তার স্ত্রী ইসাবেলা হামযা (রাঃ) এর কলিজা ভক্ষণকারী আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দার মত আত্মতৃপ্তিতে বিকৃত অট্টহাসিতে মাতোয়ারা হয়ে বলতে থাকল- হায় এপ্রিল ফুল (এপ্রিলের বোকা)! এরপর পর সকল মসজিদে আযান বন্ধ হয়ে গেল। সবাইকে খৃষ্টধর্ম গ্রহনে বাধ্য করা হল। ফজরের সময় যারা নামায পড়তে উঠত বা যে সকল ঘরে সে সময় বাতি দেখা যেতো, নামাজ পড়ার অভিযোগে তাদের করুন মৃত্যু নিশ্চিত করা হতো। এভাবেই একটি সাজানো বাগান নিঃশেষ হয়ে যায়।

এপ্রিল ফুল!

মুসলমানেরা তাদের সেদিনের করুণ আর্তনাদের ইতিহাস ভুলে গেলেও খৃষ্টান সম্প্রদায় তাদের প্রতারণাকে স্মরণীয় করে রাখতে আজো সে দিনটিকে জমকালোভাবে জমিয়ে রেখেছে। ‘এপ্রিল ফুল’ নাম বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়ে। আর সারা দুনিয়ার মুসলিম তরুণ-তরুণীরাও নিজেদের পূর্বসূরীদের করুণ আর্তনাদের দিনকে পরস্পরকে ধোঁকায় ফেলে চরম মজায় লুটোপুটি খায়! সেলুকাস! সেই বোকাতত্ত্বে মুসলমানরা এখনো ধরাশায়ী। আগামী প্রজন্মের কাছে নিজেদের করুন পরিণতির কথা অজানার তিমিরে ধামাচাপা রয়ে যাওয়া একটি জাতির জন্য কত দূর্ভাগ্যের তা বলে বা লিখে আদৌ ব্যক্ত করা কি সম্ভব? তা জানার ও অনুধাবন করার সুযোগ তৈরি করে দেয়ার দায়িত্ব মুসলিম শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের, এই দায়িত্ব উম্মাহর সব সদস্যের! তবেই কেবল নিজেদের করুণ আর্তনাদের দিনের শোককে শক্তিতে পরিণত করা সম্ভব।

মুসলিম শাসনের স্বর্ণযুগ কালান্তরে নিঃশেষের পথে

শুধু গ্রানাডা ট্র্যাজেডি স্পেনের মুসলমানদের সোনালী দিনগুলোকে করুণ ইতিহাসের ফ্রেমে বন্দি করে রেখেছে তাই নয়, ভিন্ন ভিন্ন কায়দায় অভিন্ন লক্ষ্য হাসিলের হীন লক্ষ্যে মুসলিম স্বর্ণকালগুলোকে ইসলাম বিদ্বেষীরা প্রতিনিয়ত কফিন বন্দি করে চলছে। এইতো সেদিন ইরাকে স্বৈরাচারী সাদ্দাম নিধনের ছুঁতোয় মুসলমানদের শতশত বছরের ঐতিহ্যের লীলাভূমিকে তারা ধুলোয় মিশিয়ে দিল। সাম্প্রতিক কালে মিশরের কথা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে? ইসলাম বিরোধী শক্তি তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সম্ভবনাময়ী মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত করে রেখেছে। কখনো মুসলিম দেশের ভেতরে সংকট তৈরি করে, আবার কখনো পার্শ্বদেশ দ্বারা সংকট তৈরি করে। ইরান, তিউনিশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দিকেই এখন তাদের লোলুপ দৃষ্টি। এ সকল দেশের সম্পদ লুন্ঠন করতে পারলেই বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদীদের শক্তির আর দ্বিতীয় কোন প্রতিদ্বন্দী থাকেনা।

ঘটনার ধারাবাহিকতা

খৃষ্টানরা ৮৯৮ হিঃ ১৪৯৩ সালের পয়লা এপ্রিলে ধোঁকা দিয়ে মুসলমানদের সলিল সমাধি ঘটিয়েছিল, ঠিক একই কায়দায় পৃথিবীর নানাপ্রান্তে মুসলমানদেরকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ষড়যন্ত্র এখনো অব্যহত রেখেছে । ১৯৯৩ সালের এই দিনে ৫০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে খৃষ্টান সম্প্রদায়ের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা মিলিত হয়ে “হলি মেরী ফান্ড” গঠন করে। বৈঠক করে তারা এ সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা মুসলমানদেরকে কোথাও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দিবে না। মুসলিম দেশে দেশে শুধু ঘটেই চলছে একের পর এক ঘটনার পূনারাবৃত্তি। বিট্রিশ কলোনাইজের সাবেক মন্ত্রী গ্লাসস্টোন এর একটি বক্তব্যে বলেছিলেন, “মুসলমানদেরকে ধ্বংস করার দু’টি প্রক্রিয়া রয়েছে। প্রথমত: তাদের কাছ থেকে কুরআন কেড়ে নিতে হবে, কিন্তু তা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত: তারা যেন কুরআনের প্রতি ভালবাসা হারিয়ে ফেলে! সে কাজ করতে হবে কৌশলে; আর তা হবে কার্যকরী। বছরের পর বছর মায়ানমারে মুসলমানদেরকে গ্রানাডার আদলে পুড়িয়ে, গুলি করে পাখির মত মারা হচ্ছে। হয়তোবা সময়ের পরিক্রমায় মায়ানমারও হবে আরেক স্পেন। মুসলমানদের নিধন করতে ইহুদী-খৃষ্টান, হিন্দু- বৌদ্ধ ও জয়নবাদীরা একজোট।

মায়ানমারে শুধু নয়, একই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চলছে ফিলিস্তিন, বসনিয়া, ইরাক, আফগানিস্থান, কাশ্মীর, সিরিয়াসহ বিশ্বের নানা অঞ্চলে। আমাদের দেশও সে নারকীয় হত্যাকান্ড থেকে নিষ্কৃতি পায়নি। বাংলাদেশে ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্ত্বরে আলেম-ওলামাদের সমেবেত করে আগাম কোন সতর্কবাতা না দিয়ে ঘুমন্ত, ইবাদতরত আলেম-ওলামা-মুসল্লীদের ওপর চলে এক বর্বর নারকীয় হত্যাকান্ড। এই হত্যাকান্ডের পরিসংখ্যান এখনো দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট নয়, বরং যারাই এ হত্যাযজ্ঞের ব্যাপারে মুখ খুলতে চেষ্টা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে নানামুখী নির্যাতন। মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলতে গেলে মানবাধিকার সংস্থা “অধিকারের” পরিচালককে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘদিন জেলে পুরে অধিকারের অধিকার সরকার নির্লজ্জভাবে হরণ করেছে।

নিশ্চিতভাবে এখন ব্রিটিস কলোনাইজের সাবেক মন্ত্রী গ্লাসস্টোনের বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী এখন কুরআনের অবমাননা করে চলছে ইহুদী খৃষ্টানদের পাশাপাশি নামধারী মুসলমানরাও। কিন্তু যারা নিজেদের মুসলমান দাবি করে, কুরআনের প্রেমিক অথবা কুরআনের কর্মী দাবি করে, তারা কি এর বিরুদ্ধে কোন কর্মসূচী পালন করতে বা প্রতিবাদ করতে সক্ষম হয়েছে? ইসলাম বিরোধীরা ইসলামকে সেকেলে, জঙ্গী, সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী বলে নানা প্রকার বিকৃত প্রচারণা চালাচ্ছে। মুসলিম তরুণদের মস্তিকে পচন ধরাতে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিতে সহজলভ্যভাবে বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যার মাধ্যমে ইসলামের বিরুদ্ধে সন্তর্পনে মগজ ধোলাইয়ের বীজ বোপন করে দেয়া হচ্ছে। যার ফলে ইসলামের প্রতি তরুণদের আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছে, দায়িত্ব ভুলে তারা নিজেদের অজান্তেই নিজেরা ভোগবাদী জীবনে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে। যা মুসলিম মিল্লাতের জন্য বড় অশনি সংকেত বৈ কি বলা চলে?

লক্ষ্যহীন যাত্রা…

আত্মবিস্মৃতির ইতিহাস আমাদের বিবেককে শুধু গ্রানাডা ট্র্যাজেডির দিন পয়লা এপ্রিলে ভাবিয়ে তুললেও আমরা কোন শিক্ষাই যেন গ্রহন করতে পারিনি। গ্রানাডা ট্র্যাজেডির পর মুসলমানদের ওপর আরো কত ট্র্যাজেডি বয়ে গেছে তার ইয়াত্তা নেই। ইহুদী-খৃষ্টান ও জায়নবাদীরা মুসলিম শক্তিকে নিধন করতে অবিরত মরিয়া হয়ে একের পর এক ট্র্যাজেডির জন্ম দিয়ে চলেছে। মুসলমানদের দিয়ে মুসলমানদের হত্যা করে চলছে। এরপরও মুসলিম নেতৃবৃন্দ অজানা উদ্দেশ্যে ইসলাম বিদ্বেষীদের গোলামী করেই চলছে। যত দিন আমরা শিক্ষা গ্রহন করব না, হয়তো তত দিন এ দূর্দশা স্কন্ধে নিয়ে মুসলমানদের চলতে হবে।

যে কোন সচেতন মানুষকে জিজ্ঞেস করলে অকপটে বলতে পারে- ইহুদী ও খৃষ্টান দুনিয়ার স্বার্থ রক্ষায় কারা নেতৃত্ব দিচ্ছে। তবে মুসলমানদের নেতৃত্ব কে দিচ্ছে, তা কেউ বলতে পারে না। এ যেন লক্ষ্যহীন যাত্রা, মাঝিহীন তরী। যে যার মত করে অগোছালো, অপরিপক্ক পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে। নিজেদের ভেতর নানা জাতের বিভেদে। ইসলাম বিদ্বেষীদের গোলামী করতে মুসলিম শাসকরা ব্যতিব্যস্ত। কৌশলের নামে নিজেদের আত্মপরিচয় জলাঞ্জলি দিয়েই যেন আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলছে।

প্রয়োজন আত্মোপলদ্ধি ও সময়োপযোগী কার্যকর পরিকল্পনা

আমরা নগদ পেতে চাই। আর যখন নগদ মিলে না, তখন হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিই। অথচ আল্লাহ নামায ও ধৈর্য্যের মাধ্যমে তার সাহায্য কামনার নির্দেশ দিয়েছেন। মুসলমানরা এখন আত্মকেন্দ্রিক; মুসলিম জনগোষ্ঠির স্বাথের্র চেয়ে তাদের কাছে সাম্রাজ্যবাদীদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন মুখ্য বিষয়। বিশ্বব্যাপী সস্তা কিছু শ্লোগান দিয়ে আরো ভিন্ন রকমের গ্রানাডা ট্র্যাজেডি সৃষ্টির পায়তারা চলছে। এখন নতুন শ্লোগান হল- গ্লোবালাইজেশান “বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়”। বাস্তবে এ সকল সস্তা শ্লোগান দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী খৃষ্টান শাসক ও যায়নবাদীরা দূর্বল শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্রগুলোকে অশান্ত করে তুলে ফায়দা লুটতে চায়। নিজেরা কাজীর আসনে বসে আমাদের সর্বনাশ করতে চায়। ইতিহাস বলে, আমেরিকা রাশিয়াকে টুকরো টুকরো করার জন্য তালেবানদের প্রয়োজনীয় রসদ দিয়েছিল। স্বার্থ শেষে সে তালেবানদেরকে সন্ত্রাসী গোষ্টি হিসেবে দাবি করে তাদের নিধনে আমেরিকা সর্বশক্তি নিয়োগ করে একটি স্বাধীন দেশকে তছনছ করে দিয়েছে। লাদেন সৃষ্টি তাদেরই পরিকল্পনার অংশ। স্বার্থ শেষে লাদেনকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে তারাই নির্মম ভাবে হত্যা করেছে।

এ সকল সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নিজেদের স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে যে কোন স্বাধীনতাকামী জনগোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী বানায়, আবার কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে স্বার্থ হাসিলের জন্য স্বাধীনতাকামী বা নিপীড়িত জনগোষ্ঠি হিসেবে দুনিয়ার কাছে উপস্থাপন করে। দুনিয়ার যত বড় বড় ঘটনা ঘটেছে সকল ঘটনাই তাদের পরিকল্পনা মাফিক এগিয়েছে। ৯/১১ এর ঘটনা দিয়ে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের এক নম্বর সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যে ঘটনার সাথে ইহুদীদের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে বলে প্রমাণিত ।

বর্তমানে সিরিয়াতে আসাদ বিরোধীদেরকে স্বাধীনতাকামী বলে আমেরিকার মিত্র শক্তিগুলো সার্বিক সহযোগিতা করছে, এ যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা। এখন কেউ জানেনা এর সমাধান কবে হবে। মিশরে ইসলামপন্থীদের হাজার হাজার সমর্থককে হত্যা করেছে তাদের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। সম্প্রতি প্রায় পাঁচ শতাধিক নেতাকে বিচারের নামে অযৌক্তিকভাবে ফাঁসির রায় দিয়েছে। এই প্রক্রিয়া তারা অব্যাহত রেখেছে। আমাদের দেশেও সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন চলছে পুরোদমে। এরপরও কি আমাদের আত্মোপলদ্ধি হবে না? এরপরও কি মিল্লাতের স্বার্থরক্ষায় মুসলিম নেতাদের কোন কার্যকরী পরিকল্পনা থাকবে না?

মুসলিম উম্মাহর শিক্ষা

গ্রানাডা এখন শুধুই ইতিহাস। মুসলমানদের অনুভূতি জাগ্রত করার এক ঐতিহাসিক ইমারত। এর আসল ইতিহাস ব্যাপকভাবে সবখানে ছড়িয়ে দিতে হবে। আমরা গ্রানাডা থেকে শিক্ষা নিতে পরিনি, শিক্ষা নিতে পারিনি আরো অনেক ঘটনার পর ঘটনার। এভাবে আর চলতে দেয়া যায় না। আমাদেরকে আল্লাহর ওপর আস্থাশীল হয়ে মজবুত কদমে এগিয়ে যেতে হবে। সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা আর ইসলাম বিদ্বেষীদের পাতানো ফাঁদে নিজেদের জলাঞ্জলি দিব না। এখন নিজের পায়ে নিজেরা দাঁড়িয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নেতৃত্বে এগিয়ে যেতে হবে। জনবল ও সম্পদে মুসলমানরা এখনো এগিয়ে আছে। তৈরি করতে হবে দক্ষ জনবল এবং সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

এখন বড় প্রয়োজন বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, সুষ্ঠু ও দূরদর্শী পরিকল্পনা। এমন নেতা প্রয়োজন যে নেতা শক্তিধর গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় কাজ করবে না, যাদের উদ্দেশ্যই থাকবে নিপীড়িত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা। দুনিয়ার কাছে তারা নিজেদের পদানত করবে না, বরং দুনিয়া তাদের কাছে পদানত হবে। আর এমন সুষ্ঠু দূরদর্শী সুবিন্যাস্ত পরিকল্পনা নিতে হবে যা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাতিলের সকল পরিকল্পনাকে কাবু করে মুসলিম মিল্লাতকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন করা সম্ভব হবে। যার ফলে চলমান অশান্তির দাবানল নির্বাপিত হয়ে পৃথিবী বাসযোগ্য শান্তির নীড়ে পরিণত হবে। যেখানে থাকবে না জুলুম, মজলুমের বুকফাঁটা চিৎকার। যেখানে সকল ধর্মমতের অধিকার হবে সুনিশ্চিত। হতাশার সকল গ্লানি ঝেড়ে ফেলে এগিয়ে যেতে হবে মুসলিম উম্মাহর নেতৃবৃন্দকে। তাই সময় এসেছে আর নয় পিছুটান, কবির কন্ঠে কন্ঠ মিলাই-

‘সাহসের সাথে কিছু স্বপ্ন জড়াও,তারপর পথ চলো নির্ভয়ে

আঁধারের বুক চিরে আসবে বিজয়, মুক্তির পথ সেতো নিশ্চয়।’

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

উৎসঃ ‌অ্যানালাইসিস বিডি

আরও পড়ুনঃ যে ১৫ বক্তার ওয়াজ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আপত্তি


ওয়াজ-মাহফিলের বক্তাদের বয়ানে বিভিন্ন বিষয় আমলে নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ (ইফাবা), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ সরকারি কয়েকটি দফতরকে প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রবিবার (৩১ মার্চ) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এসব তথ্য পাওয়া যায়। খবর বাংলাট্রিবিউনের।

সূত্রে জানা গেছে, এই মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এতে মাহফিলের ১৫ জন বক্তার নাম উল্লেখ করে জানানো হয়েছে— ‘এই বক্তারা সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মবিদ্বেষ, নারী বিদ্বেষ, জঙ্গিবাদ, গণতন্ত্রবিরোধী ও দেশীয় সংস্কৃতিবিরোধী বয়ান দেন বলে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা রেডিক্যালাইজড হয়ে উগ্রবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে বিশেষ করে শীত মৌসুমে আলেম-ওলামাদের ইসলামি বক্তব্য শোনানোর জন্য ওয়াজ মাহফিল হয়ে থাকে। এসব আয়োজন ফেসবুক ও ইউটিউবে প্রচার হয়।’

মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনটিতে ১৫ জন বক্তার নাম উল্লেখ করা হয়। তারা হলেন আবদুর রাজ্জাক বিন ইউসূফ (সালাফি), মাওলানা মুফতি মাহমুদুল হাসান (মুহতামিম, জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া, মোহাম্মদপুর), আল্লামা মামুনুল হক (যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস), মুফতি ইলিয়াছুর রহমান জিহাদী (প্রিন্সিপাল, বাইতুল রসূল ক্যাডেট মাদ্রাসা ও এতিমখানা, ক্যান্টনমেন্ট), মুফতি ফয়জুল করিম (জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির, ইসলামী আন্দোলন), মুজাফফর বিন বিন মুহসিন, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন (যুগ্ম মহাসচিব, ইসলামী ঐক্যজোট), মতিউর রহমান মাদানী, মাওলানা আমীর হামজা, মাওলানা সিফাত হাসান, দেওয়ানবাগী পীর, মাওলানা আরিফ বিল্লাহ, হাফেজ মাওলানা ফয়সাল আহমদ হেলাল, মোহাম্মদ রাক্বিব ইবনে সিরাজ।

প্রতিবেদনে বক্তাদের বিভিন্ন সময় মাহফিলে দেওয়া বক্তব্যের ভিডিও লিংক রয়েছে। আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসূফের বিষয়ে এতে জানানো হয়— ইউটিউবে ইসলামী বাণী চ্যানেলে প্রচারিত এক বয়ানে তিনি বলেছেন, ‘মূর্তির আস্তানায় যাওয়া হারাম। আমরা মুসলিম, মূর্তি ভাঙতে জন্ম নিয়েছি, মূর্তি গড়তে জন্ম নিইনি। মনে রেখো, আমি সেই জাতি, যে জাতির রক্তের সঙ্গে মিশে আছে মূর্তি ভাঙার নীতি।’ এ বিষয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করলে আব্দুর রাজ্জাকের মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মাহমুদুল হাসান সম্পর্কে জানানো হয়— এক বয়ানে তিনি জিহাদ সম্পর্কে বলেছেন, ‘জিহাদকে বলি দেওয়ার কারণে আজ মুসলমানদের এই অবস্থা আল্লাহ বলেছে। এই ফেতনা থেকে দূর হওয়ার একমাত্র রাস্তা যেখানে পাবি, সেখানে শয়তানদের কূপা। এদের কোপাতে হবে। আল্লাহ রাসূলকে গালি দিবি, তোরে কোপামু, ইসলামের বিরুদ্ধে আইন করবি, তোর কপালে কোপ আছে। গণতন্ত্র ইসলামে নেই।’

এই বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রবিবার (৩১ মার্চ) সন্ধ্যায় মাওলানা মুফতি মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘আমি তো ওয়াজ তেমন করি না। এমন কোনও বক্তব্য আমি দিইনি। কেন এমন বলা হলো বলতে পারবো না।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় তিন নম্বরে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকের নাম রয়েছে। কওমি মাদ্রাসায় জাতীয় সংগীত গাইতে না দেওয়াসহ চারটি বিষয়ের ওপর তার মন্তব্য যুক্ত রয়েছে প্রতিবেদনে।

জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার হাদিসের শিক্ষক মাওলানা মামুনুল হক জাতীয় সংগীত বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন এভাবে, ‘দেশের একজন নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত নিয়ে আমার কোনও মন্তব্য নেই। তবে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে সেটি ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশি মুসলিম জাতিসত্তাবিরোধী একটি সাম্প্রদায়িক কবিতা।’

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন এই শিক্ষকের কথায়, ‘ঢাকার ওপর কলকাতার দাদাবাবুদের আধিপত্য খর্ব হতে দেখে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কবিতা রচনা করেছিলেন। ইসলামি চেতনার শিক্ষাগার কওমি মাদ্রাসাগুলো কখনোই রবীন্দ্রনাথের চেতনাকে মেনে নিতে পারে না।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে ইসলামী ঐক্যজোটের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি সাখাওয়াত হোসাইনের নাম রয়েছে। তার দেওয়া ‘মিয়ানমারের বাহিনীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুসলমানদের ওপর জিহাদ ফরজ’ শীর্ষক বক্তব্য সংযুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া কাদিয়ানী প্রসঙ্গেও তার বয়ানের লিংক দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।

রবিবার (৩১ মার্চ) রাতে মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, ‘আমরা সবসময় জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ওয়াজ মাহফিলে কথা বলে এসেছি। দেশে যখন জেএমবির উত্থান ঘটে তখন থেকেই প্রতিবাদ করে বক্তব্য রাখছি। সারাদেশে বিভিন্ন স্থানে মাদকের বিরুদ্ধেও বক্তব্য রাখি ওয়াজ মাহফিলে। যারা প্রতিবেদন তৈরি করেছে তারা কী আমার এসব বক্তব্য শোনেননি।’

মিয়ানমার প্রসঙ্গে মুফতি সাখাওয়াত হোসাইনের ব্যাখ্যা, ‘মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন নিয়ে প্রতিবাদ করেছি। মিয়ানমার যখন আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছিল, তখনও প্রতিবাদ করেছি। বলেছি, আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ব্যবস্থা নিক। বিভিন্ন সময়ে বলেছি, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ ও বাংলাদেশ সীমান্তে অস্থিরতা দূর করতে সেনাবাহিনী যদি যুদ্ধ করে আমরাও সহায়তা করবো।’

মুফতি সাখাওয়াত হোসাইনের উল্টো প্রশ্ন, ‘এখানে উগ্রতা কোথায়? আমি নিজের দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা আর দেশপ্রেম থেকেই বলেছি।’

প্রতিবেদনে উল্লিখিত বক্তাদের আরও কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে।

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গবেষণা বিভাগের পরিচালক নূর মোহাম্মদ আলম। তিনি বলেন, ‘আমরাইসলামিক ফাউন্ডেশনের গবেষকদের সঙ্গে কথা বলছি। এ ব্যাপারে কী করা যায়, বক্তাদের ডাকবো নাকি তাদের চিঠি দেবো; এসব বিষয় সভায় ঠিক হবে। এরপর আমরা পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করবো।’

এই রকম সংবাদ আরো পেতে হলে এই লেখার উপরে ক্লিক করে আমাদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন। সংবাদটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে হলে এই পেইজের নীচে মন্তব্য করার জন্য ঘর পাবেন

উৎসঃ ‌ournewsbd

আরও পড়ুনঃ ওয়াজ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৬ সুপারিশ, বক্তাদের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব


ওয়াজ মাহফিলের মঞ্চওয়াজ মাহফিলে বক্তাদের বয়ানে সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদে উৎসাহ দেওয়া, ধর্মের নামে বিভিন্ন উপদল ও শোবিজ তারকাকে নিয়ে বিষোদ্গার, নারীদের পর্দা করা নিয়ে কটূক্তিসহ বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা গ্রহণের অংশ হিসেবে ছয়টি সুপারিশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ (ইফাবা), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও সব বিভাগীয় কমিশনারের কাছে এটি পাঠানো হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের মধ্যে মাহফিলে বক্তাদের মধ্যে যারা চুক্তিভিত্তিক অর্থগ্রহণ করেন তারা আয়কর দিচ্ছেন কিনা তা দেখা ও দেশবিরোধী বক্তব্য দিলে আইনের আওতায় আনার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। একইসঙ্গে উচ্চশিক্ষিত বক্তাদের নিবন্ধনের আওতায় আনতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে জরুরি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ইতোমধ্যে তা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে ইফাবা।

সুপারিশ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওয়াজ মাহফিলে কী ধরনের বক্তৃতা হয় তা সবসময় আমাদের কাছে প্রতিবেদন আকারে আসে। আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করি। আর বক্তারা কীভাবে করের আওতায় আসবেন তা দেখবে আয়কর বিভাগ।’

গত ১৯ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ ওয়াজ মাহফিল নিয়ে বাংলা ট্রিবিউন সিরিজ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এগুলোর শিরোনাম: ওয়াজ মাহফিল কি পেশায় পরিণত হচ্ছে?, ‘আল্লাহ বলেন নো-নো, মুসা বলেন ইয়েস-ইয়েস’, ওয়াজ মাহফিলের যত ধারা, ওয়াজ রাজনীতি একাকার এবং ওয়াজ মাহফিল কীভাবে প্রভাব ফেলছে, শ্রোতা কি বাড়ছে?

সূত্রে জানা গেছে, মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এতে মাহফিলের ১৫ জন বক্তার নাম উল্লেখ করে জানানো হয়েছে— ‘এই বক্তারা সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মবিদ্বেষ, নারীবিদ্বেষ, জঙ্গিবাদ, গণতন্ত্রবিরোধী ও দেশীয় সংস্কৃতিবিরোধী বয়ান দেন বলে লক্ষ করা যাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা রেডিক্যালাইজড হয়ে উগ্রবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বর্তমান সময়ের বক্তাদের আলোচ্য বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে নারী সম্পর্কিত বয়ানে কী কী আলোচনা করা হয়, মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ পহেলা বৈশাখে নববর্ষ পালন নিয়ে বক্তাদের মন্তব্যের সারাংশ ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ নিয়ে বক্তাদের কিছু বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। ‘মূর্তি ভাঙা ধর্মীয় কাজ’, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাফের’, ‘অমুসলিমদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে ঈমান নষ্ট হয়ে যায়’ প্রভৃতি মন্তব্য রয়েছে প্রতিবেদনে।

রাষ্ট্রের আইনবিরোধী মন্তব্য হিসেবে মাহফিলের বিভিন্ন বক্তাদের মন্তব্য যুক্ত করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এর মধ্যে রয়েছে— ‘গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ধর্মনিরেপক্ষতাবাদ মুশরিকদের কাজ’, ‘শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া, প্রতিমূর্তিতে ফুল দিয়ে নীরবতা পালন করা শিরক’, ‘গণতন্ত্র ইসলামে নাই, ইহা হারাম’ এবং ‘জাতীয় সংগীত কওমি মাদ্রাসায় চাপিয়ে দেওয়া যাবে না’ ইত্যাদি। জঙ্গিবাদকে উসকে দেওয়া বক্তব্য হিসেবে বক্তাদের ‘আল্লাহর রাস্তার প্রতিষ্ঠায় উত্তম জিহাদ হচ্ছে সশস্ত্র জিহাদ’, ‘আল্লাহ রাসূলকে গালি দিলে কোপাতে হবে’, ‘ইসলামের বিরুদ্ধে আইন করলে কোপাতে হবে’ মন্তব্যগুলো প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘ওয়াজের বক্তারা প্রযুক্তির নানাবিধ ব্যবহারের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষ করে ইউটিউবে বিভিন্ন নামে চ্যানেল খুলে তাদের বিদ্বেষপূর্ণ ও উগ্রবাদী ওয়াজ প্রচারণা চালিয়ে আসছে।’

প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, ‘এ ধরনের ওয়াজ লাখ লাখ দর্শক এবং ওয়াজকারী ও শেয়ারকারীদের অধিকাংশই সরলমনা ধর্মপ্রাণ তরুণ মুসলিম। সেজন্য ওয়াজকারীদের উগ্রবাদী কথাবার্তা ও মনোভাব অবিরত দেশের তরুণ মুসলিম সমাজে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করছে। তারা দেশীয় সংস্কৃতি পালনে বিভ্রান্ত হচ্ছে। ফলে কিছুসংখ্যক লোক প্রতিশোধপরায়ণ ও জঙ্গিবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছয়টি সুপারিশ হলো:

১. ওয়াজি হুজুররা যেন বাস্তবধর্মী ও ইসলামের মূল স্পিরিটের সঙ্গে সংহতিপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন, সেজন্য তাদের প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণের ব্যবস্থা করা। এক্ষেত্রে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন ও কমিউনিটি পুলিশের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ।

২. যারা ওয়াজের নামে হাস্যকর ও বিতর্কিত বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে ধর্মের ভাবগাম্ভীর্য নষ্ট করার চেষ্টা চালান তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণসহ প্রো-অ্যাকটিভ উদ্বুদ্ধকরণ করা।

৩. অনেক আলেমের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রির মতো উচ্চশিক্ষা ব্যতীত যারা ওয়াজ করে তারাই জঙ্গিবাদ ও বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তাই মাদ্রাসায় উচ্চশিক্ষিত ওয়াজকারীদের নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসা।

৪. অনেকেই আছেন, যারা হেলিকপ্টারযোগে ওয়াজ মাহফিলে যোগ দেন এবং ঘণ্টাচুক্তিতে বক্তব্য দিয়ে বিশাল অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করেন। তারা নিয়মিত ও সঠিকভাবে আয়কর প্রদান করেন কিনা তা নজরদারির জন্য আয়কর বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগে কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি করা।

৫. ওয়াজি হুজুরদের বক্তব্য স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক সংরক্ষণ ও পর্যালোচনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া এবং উস্কানিমূলক ও বিদ্বেষ ছড়ানোর বক্তব্য দিলে তাদের সতর্ক করা। প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে তাদের ওয়াজ করার অনুমতি না দেওয়া।

৬. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে ও রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য প্রদানকারীদের আইনের আওতায় আনা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গবেষণা বিভাগের পরিচালক নূর মোহাম্মদ আলম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের মহাপরিচালক স্যার বৈঠক ডেকেছেন। আজ (রবিবার) এটি হওয়ার কথা। আমরা গবেষকদের সঙ্গে কথা বলছি। এ ব্যাপারে কী করা যায়, বক্তাদের ডাকব নাকি তাদের চিঠি দেব; এসব বিষয় সভায় ঠিক হবে। এরপর আমরা পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করব।’

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, রবিবার (৩১ মার্চ) সন্ধ্যা পৌনে ৬টা নাগাদ একটি বৈঠক শুরু হয়েছে। এটি সোমবার (১ এপ্রিল) আবারও হতে পারে।

আগামী ৪ এপ্রিল ইফাবার মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজালের চিকিৎসার কাজে সিঙ্গাপুর যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে তিনি ফিরে এলে বক্তাদের বিষয়ে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবে ইফাবা।

সামীম মোহাম্মদ আফজাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখনই এ বিষয়ে কথা বলব না। যেখান থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে সেখানে বলুন।’

উৎসঃ ‌banglatribune

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here