৯৭০০ কোটি টাকা দিয়েও পতন ঠেকানো যাচ্ছে না রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের

0
96

সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়েও এসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ভালো করা সম্ভব হচ্ছে না। গত পাঁচ বছরে এই ব্যাংকগুলোকে মোট ৯ হাজার ৭০০ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে মূলধন সহায়তাখাতে। চলতি বছরে এ খাতে রাখা হয়েছে আরো দেড় হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এত কিছুর পরও এই ব্যাংকগুলোতে একদিকে যেমন খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে তেমনি ধারাবাহিকভাবে পতন হয়েছে ব্যাংকগুলো ব্যবস্থাপনার গুণগত মান। আর এসব কিছুই ঘটেছে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর চরম অনিময় ও দুর্নীতির কারণে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত পাঁচ অর্থবছরে মূলধন সহায়তাখাতে সবচেয়ে বেশি অর্থ দেয়া হয়েছে সোনালী ব্যাংককে। রাষ্ট্রীয় মালিকানার সবচেয়ে বড় এই ব্যাংককে পাঁচ বছরে দেয়া হয়েছে মোট তিন হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেয়া হয়েছে এক হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭১০ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কোনো অর্থ দেয়া হয়নি, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেয়া হয়েছে ৭০০ কোটি টাকা এবং গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেয়া হয়েছে আরো ৪০০ কোটি টাকা। একইভাবে গত পাঁচ অর্থবছরে জনতা ব্যাংককে দেয়া হয়েছে এক হাজার ২১৪ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংককে এক হাজার ৮১ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংককে ৬১০ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংককে দেয়া হয়েছে তিন হাজার ৩৯০ কোটি টাকা।

প্রতি বছর এমন বিপুল পরিমাণ মূলধন প্রদান করেও রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা ভালো করা সম্ভব হয়নি। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ, জনতার ২১ দশমিক ৫৬ শতাংশ, অগ্রণীর ১৮ দশমিক ১৫ শতাংশ, রূপালীর ২২ দশমিক ৬৪ শতাংশ, বেসিকের ৫৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ এবং বিডিবিএলের ৫৫ দশমিক ১৫ শতাংশ। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ থাকার কারণে এই ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতিও বেড়ে গেছে। চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত জনতা, অগ্রণী ও বিডিবিএল এই তিন ব্যাংকের কোনো প্রভিশন ঘাটতি না থাকলেও এ সময়ে সোনালী ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ছিল তিন হাজার ৫২০ কোটি টাকা, রূপালীর এক হাজার ৩৫১ কোটি টাকা এবং বেসিকের ঘাটতি ছিল তিন হাজার ২২২ কোটি টাকা।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই ব্যাংকগুলোকে শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির কাছ থেকে ঋণ আদায়ের এক টার্গেট দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই টার্গেটের ধারেকাছেও ব্যাংকগুলো যেতে পারেনি। ছয় মাসে শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির কাছ থেকে সোনালী ব্যাংক অর্থ আদায় করেছে টার্গেটের ৩ দশমিক ২২ শতাংশ। জনতা ব্যাংক ১৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংক শূণ্য দশমিক ৩৭ শতাংশ, রূপালী ব্যাংক শূন্য দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং বেসিক ব্যাংক আদায় করেছে টার্গেটের শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ।

চলতি বছর রাষ্ট্র্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংককে ২০ শীর্ষ ঋণ খেলাপি বাদে অন্য খেলাপিদের কাছ থেকেও আদায়ের টার্গেট দেয়া রয়েছে। সে অনুযায়ী এই ঋণ খেলাপিদের কাছ থেকে সোনালী ব্যাংকের আদায়ের টার্গেট এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা, কিন্তু ছয় মাসে আদায়ের হার ১৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ; জনতার টার্গেট এক হাজার ১০০ কোটি টাকা। ছয় মাসে আদায়ের হার ২১ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অগ্রণী ব্যাংকের টার্গেট ৮০০ কোটি টাকা, ছয় মাসে আদায়ের হার ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ, রূপালী ব্যাংকের টার্গেট ৬০০ কোটি টাকা, ছয় মাসে আদায়ের হার মাত্র ১১ শতাংশ এবং বেসিক ব্যাংকের আদায়ের টার্গেট রয়েছে ৭১৫ কোটি টাকা, ছয় মাসে আদায়ের হার ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।

ঋণ আদায়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের আরো ব্যর্থতার পরিচয় পাওয়া গেছে ঋণ অবলোপন থেকে আদায়ের পরিমাণ বিশ্লেষণ করে। এখানে যে প্রক্রিয়ায় ঋণ অবলোপন হচ্ছে তা হলো, ব্যাংকগুলো তাদের ব্যালেন্স শিট ভালো দেখানোর জন্য অনেক কু-ঋণ তাদের মূল হিসাব থেকে বাদ দিয়ে দেয়। এর ফলে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখানো যায়। কিন্তু এরপরও ব্যাংকগুলো এই অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ের চেষ্টা করে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরে অবলোাপনকৃত ঋণ থেকে সোনালী ব্যাংকের আদায়ের টার্গেট ছিল এক হাজার ৭৮ কোটি টাকা। এই হিসাবে ছয় মাসে (জুন পর্যন্ত) আদায় হওয়ার কথা ছিল ৫০০ কোটি টাকার কিছু বেশি। কিন্তু ছয় মাসে প্রকৃত আদায় হয়েছে মাত্র দুই কোটি ৫৪ লাখ টাকা। একইভাবে জনতা ব্যাংকের টার্গেট ৩২৮ কোটি টাকা। ছয় মাসে আদায় ১৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের টার্গেট ৮১০ কোটি টাকা, ছয় মাসে আদায় ৩৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। রূপালী ব্যাংকের টার্গেট ছিল ১৫৩ কোটি টাকা, ছয় মাসে আদায় হয়েছে মাত্র দুই কোটি ৫৩ লাখ টাকা।

খেলাপি ঋণ আদায়ে চরম ব্যর্থতার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের, জুন পর্যন্ত যার পরিমাণ আট হাজার ৯ কোটি টাকা। এরপরই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্তখাতের সবচেয়ে বড় ব্যাংক সোনালীর। এ সময় ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ছিল ছয় হাজার ৬০১ কোটি টাকা। বেসিক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি তিন হাজার ১০৬ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংকের দুই হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, গত বছর একই সময় এই ব্যাংকের মূলধন উদ্বৃত্ত ছিল ১৭ কোটি টাকা। ছয় মাসে অগ্রণী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি এক হাজার ৪১৯ কোটি টাকা এবং রূপালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল এক হাজার ২৯৩ কোটি টাকা।

উৎসঃ nayadiganta

Facebook Comments

comments