পোশাক খাতে অস্থিরতা‘ ২৭ কারখানায় ৭ হাজার ৫৮০ শ্রমিক ছাঁটাই’: রয়টার্সের প্রতিবেদন

0
82

বেতন বাড়ানোর দাবিতে টানা আন্দোলনের মুখে পরিস্থিতি কিছুটা শীতল হলেও ছাঁটাইয়ের কবলে পড়েছে পোশাক খাত। এ নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, পোশাক খাতের কর্মীদের গণহারে ছাঁটায়ের কারণে যে কোন সময় শ্রমিক অসন্তোষ দানা বাঁধতে পারে। ‘শ্রমিক আন্দোলনের পর ২৭ কারখানায় ৭ হাজার ৫৮০ শ্রমিক ছাঁটাই’-শীর্ষক রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বেতন বাড়ানোর দাবিতে বাংলাদেশে সম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলন শেষ হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২৭ কারখানা থেকে সাড়ে সাত হাজারেরও বেশি শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। শ্রমিক আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণেই এ রকম ছাঁটাই হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পোশাক শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারা।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের প্রধান বাবুল আখতার বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ২৭ কারখানা থেকে অন্তত সাত হাজার ৫৮০ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, আন্দোলনের অংশ নেওয়ায় এইচ এন্ড এম ও নেক্সটসহ অন্তত তিনটি ইউরোপীয় ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরি কারখানাতেও সম্প্রতি শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।

প্রসঙ্গত, গত ডিসেম্বরের শেষের দিকে মজুরি বাড়ানোর দাবিতে রাজধানী ও এর আশপাশের অঞ্চলগুলোতে আন্দোলনে নামে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা। বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারের প্রধান কাজী রুহুল আমিন জানান, যেসব শ্রমিক স্লোগান দিয়েছে বা আন্দোলনের সময় কাজ বর্জন করেছে, মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে ও যাদের কোন রকম শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, তারা এখন চাকরি হারাচ্ছে।

পোশাক খাত নিয়ে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর উদ্বেগ-উৎকন্ঠা রপ্তানি আয়সহ গার্মেন্টখাতে প্রভাব পড়বে কিনা জানতে চাইলে গার্মেন্ট ম্যানুফেকচারস এন্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিজিএমই) সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বিদেশী সংগঠনগুলো সবসময়ই একটু বাড়িয়েই বলে থাকে। তিনি জানান, আমাদের কারখানা আছে ৩ হাজারের কিছু বেশি অথচ সংগঠনগুলো বলছে ৭ হাজারের বেশি। শ্রমিক আন্দোলনের পর ৪ হাজারেরও কম শ্রমিক চাকুরিচ্যুত হয়েছে। এটা হতেই পারে।

তিনি বলেন, কাউকে ছাঁটাই করা হয়নি। শ্রম আইনের ৫টি ধারা আছে, এই ধারা মেনে কেউ যদি শ্রমিককে বাদ দেয় তাহলে কিছু করার নেই। তিনি বলেন, একটি ফ্যাক্টরিতে যদি লোক না লাগে, আগামী মাসে বেতন দিতে না পারা এবং শ্রমিক যদি কোনো অন্যায় করে তাকে শোকজ করে, শোকজের উত্তর সন্তোষনজনক না হলে তাকে বাদ দিতে পারে। মোটকথা শ্রম আইনের বাইরে গিয়ে কোন কিছু করার সুযোগ নেই ফ্যাক্টরিগুলোর।

যেসব শ্রমিকের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় ভাঙচুর ও অন্যান্য ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে। নিরীহ শ্রমিকদের বিরুদ্দে কোন মামলা হবে না বলে উল্লেখ করেন সিদ্দিকুর রহমান।

নিরীহ শ্রমিকদের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধেও মামলা-হয়রাণি করা হচ্ছে এ বিষয়ে সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এ রকম খবর আমার জানা নেই। যদি হয় তাহলে শ্রমিকরা বিজিএমইএ/কোর্ট অথবা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য নিতে পারে।

এদিকে কয়েকজন শ্রমিক বলেছেন, তারা শান্তিপ‚র্ণভাবে বিক্ষোভ করেছেন। কিন্তু অন্যান্য শ্রমিকদের একজোট করার প্রচেষ্টা চালানোর কারণে তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী শ্রমিক বলেন, (ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের) তালিকায় আমার নাম শীর্ষে দেখে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। তিনি বলেন, বিক্ষোভের সময় আমি প্রতিদিন কাজে গেছি। আমি কখনোই কোন ভাঙচুর বা অপরাধকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। আমার ও আমার সহকর্মীদের নাম তালিকায় আসার পেছনে কারণ ছিল, আমরা একটি জোট গঠনের চেষ্টা করছিলাম। বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তার কাছে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

সূত্র মতে, বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক শিল্প রফতানিকারক দেশ। বাংলাদেশের রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। প্রতি বছর গড়ে পোশাক শিল্পের পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশের আয় হয় আনুমানিক তিন হাজার কোটি ডলার।

এদিকে শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বলেন, ক্রোনি গ্রুপ, ইস্ট ওয়েস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক লিমিটেড ও মেট্রো নিটিং এন্ড ডায়িং মিলস লিমিটেড থেকে সম্প্রতি শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো সুইডেন-ভিত্তিক এইচ এন্ড এম ও ব্রিটিশ ব্র্যান্ড নেক্সটের জন্য পোশাক তৈরি করে থাকে। শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিষয়ে জানতে চেয়ে ক্রোনি ও মেট্রোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

ইস্ট ওয়েস্টের প্রধান প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, আন্দোলনের সময় ৭ই জানুয়ারি বেশ কয়েকজন শ্রমিক কারখানায় হামলা চালিয়েছে ও ভাঙচুর করেছে। তিনি বলেন, ওই ঘটনার পর সব মিলিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠানের ৮শ’রও বেশি শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে।

ইস্ট ওয়েস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান হারুন উর রশিদ জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান কোন অবৈধ বা অন্যায্য কাজ করছে না। তিনি বলেন, আমরা জানি, এমনটা করলে আমাদের ক্রেতারা এটা হালকাভাবে নেবে না। তারা এটা পছন্দ করবে না। বিদেশি ব্রান্ডগুলো জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এক ই-মেইল বার্তায় নেক্সট ব্র্যান্ড জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি স¤পর্কে অবগত। বাংলাদেশে তাদের নিজস্ব অডিট কর্মচারীরা এ বিষয়ে তদন্ত করছে। এ ছাড়া জারা, ম্যাঙ্গো, গেস ও সাকসসহ অন্যান্য ইউরোপীয় ও মার্কিন ব্রান্ডগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

নতুন মজুরি কাঠামো নিয়ে দেশের পোশাক শ্রমিকদের সাম্প্রতিক আন্দোলন এবং ছাঁটাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক রিটেইল চেইন ‘এইচ অ্যান্ড এম’ বলেছে, তারা কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির পক্ষে হলেও ভাংচুর-সহিংসতাকে সমর্থন করে না। পোশাক খাতের নামি এই ব্র্যান্ড গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং এইচ অ্যান্ড এমের পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের কল্যাণে তারা সব পক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।

বছরের শুরুতে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ-ভাঙচুরের ঘটনার পর বিভিন্ন কারখানার কয়েক হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রেক্ষাপটে এইচ অ্যান্ড এমের এই বিবৃতি এল। যেসব কারাখানায় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে কয়েকটি গার্মেন্ট এইচ অ্যান্ড এম এর জন্যও পোশাক তৈরি করে।

বিবৃতিতে বলা হয়, শ্রমিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টায় কারখানা কর্তৃপক্ষ, ইন্ডাস্ট্রিঅলসহ সংশ্লিষ্ট ট্রেড ইউনিয়ন এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এইচ অ্যান্ড এম বলছে, কারখানা থেকে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিষয়ে তারা অবগত এবং সব পক্ষের সঙ্গে তারা নিবিড়ভাবে কাজ করছে, যাতে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য ও সঠিক কারণ নিশ্চিত করার বিষয়ে ওই চুক্তির সব পক্ষ সম্মত হয়। এ বিষয়টিতে আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি এবং গার্মেন্ট কারখানা, শ্রমিক সংগঠন ও ক্রেতাদের সঙ্গে আমরা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছি।

বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা সব পক্ষকে সব সময় শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানাচ্ছি এবং তা যাতে সম্ভব হয়, সেই চেষ্টায় নিয়োজিত আছি।

জানা গেছে, বিভিন্ন এলাকায় পোশাক খাতের শ্রমিকরা আবার আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার কিছুটা আভাস পাওয়া গেছে, গতকাল রোববার গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধের ঘটনায়। অথচ এ বিষয়ে একেবারেই নীরব ভ‚মিকা পালন করছেন মালিকপক্ষ। এতে বিক্ষোভের আগুন আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এই খাতের সংশ্লিষ্টরাই।

গতকাল সকালে গাজীপুরের মহাসড়ক প্রায় এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে পোশাক শ্রমিকরা। তাদের দাবি, গত কয়েক বছর ধরে শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধির দাবি করে আসছেন। কিন্তু মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দাবি কর্ণপাত করেননি। এতে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

গাজীপুর পোশাক শিল্প ও টেক্সটাইল শিল্প অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় বাড়ি ভাড়া তুলনাম‚লক বেশি। তাছাড়া নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষের দামও আগের থেকে বেড়েছে। বারবার মালিকপক্ষের কাছে বেতন বৃদ্ধির দাবি জানায় টেক্সটাইল শ্রমিকরা।

এ বিষয়ে বিটিএমএ এর সভাপতি ম্যাকসন্স স্পিনিং মিলস লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী খোকন একাধিক বৈঠক করেছেন সদস্যদের সাথে। তবে এসব বিষয়ে একেবারেই চুপ রয়েছেন মালিকপক্ষ। বিটিএমইএ এর সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী বলেন, স্যার এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না। তিনি মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন ওয়েবওয়্যার-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেতন বাড়ানোর দাবিতে সাম্প্রতিক আন্দোলনের পর শ্রমিক ছাঁটাইয়ে বাংলাদেশে পোশাক খাতে অস্থিরতার আশংকা করা হচ্ছে। এতে ‘আনরেস্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, পোশাক শ্রমিক ফেডারেশনের নেতাদের মতে, এজন্য বেতন ও কর্মপরিবেশ নিয়ে অস্থিরতার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রয়োজন। একই সঙ্গে কারখানা কর্তৃপক্ষ, শ্রমিক ইউনিয়ন, খুচরা ক্রেতা, সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে মিলে সংঘাতময় পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে। গার্মেন্ট শ্রমিকদের হতাশা পরিষ্কারভাবে দেশে শিল্প সংশ্লিষ্ট সম্পর্ককে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়কে জোরালোভাবে তুলে ধরে। যখন শ্রমিকদের কথা শোনা হবে, যখন শ্রম বাজারের পক্ষগুলো শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধের সমাধান নিয়ে কাজ করবে এবং যখন নিয়মিতভাবে শ্রমিকদের সর্বনিম্ন বেতন কাঠানো পর্যালোচনা (রিভাইস) করা হবে। তখনই এরকম পরিস্থিতির মতো একটি পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব। যাই হোক, গার্মেন্ট শ্রমিকদের হতাশার বিষয়টি আমরা যদিও বুঝি এবং তাদের প্রতি পূর্ণ সহানুভ‚তিশীল, তবুও আমরা ভাঙচুর ও সহিংসতাকে শেষ উপায় হিসেবে উৎসাহিত করতে পারি না।

সব পরিস্থিতিতে সব পক্ষকে সংঘাতময় অবস্থার শান্তিপূর্ণ সমাধান বের করতে আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে উৎসাহিত করি। আমরা এমন ঘটনায় নিজেদের এভাবেই দেখতে চাই। এ জন্যই আমরা গ্লোবাল ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টের অধীনে গ্লোবাল ইউনিয়ন ইন্ডাস্টিয়াল ও সুইডেনের ট্রেড ইউনিয়ন আইএফ মেটঅল-এর সঙ্গে সৃষ্টি করেছি ন্যাশনাল মনিটরিং কমিটি। সংঘাতময় পরিস্থিতির একটি শান্তিপূর্ণ প্লাটফর্ম এটি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন আইএলও এবং বৈশ্বিক ইউনিয়নগুলোর নির্দেশনার অধীনে আমরা গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধিকে সমর্থন করি। এসব নির্দেশনায় প্রয়োজনে শ্রমিক ও নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সমন্বিত দর কষাকষির বিষয়ে জোর দেয়া হয়েছে। সেই দর কষাকষি হলো শ্রমিকদের বেতন ও কর্মপরিবেশ নিয়ে।

উৎসঃ ‌ইনকিলাব

আরও পড়ুনঃ ভিন্নমত ও বিভিন্ন প্রতিবাদ আন্দোলন দমনের কারণে পদক পেল পুলিশ বাহিনী!


ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নিহত সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সহসম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর মায়ের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে লুটিয়ে পড়ার ছবিটি দেখে অপরাধীরা ছাড়া আর সবারই বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠার কথা। এর আগে ২০১৭ সালের নভেম্বরেও দিয়াজের মা ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে আমৃত্যু অনশনে বসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। হত্যার বিচারের আশ্বাসে তখন তিনি অনশন ভেঙেছিলেন। কিন্তু ২০১৬ সালের নভেম্বরের সেই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি গোষ্ঠীর প্রকাশনায় হত্যায় অভিযুক্ত একজনের বাণী ছাপা হয়েছে। অর্থাৎ দলীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অভিযুক্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক পুনর্বাসন অনেকটাই সাধিত হয়েছে।

বিচারপ্রার্থী দিয়াজের মা যখন দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে লুটিয়ে পড়েছেন, ঠিক তখনই ঢাকায় সুপ্রিম কোর্টের আঙিনায় অসহায় অজ্ঞাতনামাদের অবিচার থেকে মুক্তি চাওয়ার আর্তি। ধান বিক্রি করার টাকা খরচ করে পুলিশি হয়রানি থেকে রেহাই পেতে জামিনের জন্য দেশের সর্বোচ্চ আদালতে ধরনা দিয়ে বসে আছেন শত শত মানুষ। এঁদের অনেকেই হয়তো এর আগে কখনো ঢাকায় পা ফেলেননি। বছরের শুরু থেকে দেশের নানা প্রান্ত থেকে জামিনের আশায় ভিড় করছেন ৪ হাজারের বেশি গায়েবি মামলার আসামি শত শত মানুষ। এঁদের মধ্যে আছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, সত্তরোর্ধ্ব প্রায় চলনশক্তিহীন মানুষও, যাঁরা দলবাজির রাজনীতির ধারেকাছেও নেই। এ রকম গায়েবি মামলায় কতজন কারাগারে বন্দী আছেন, সেই হিসাব কারও কাছেই নেই। তবে মানবাধিকার সংগঠক সুলতানা কামাল বলেছেন, দেশের কারাগারগুলোতে বন্দীদের প্রতি তিনজনের দুজনই বিনা বিচারে আটক রয়েছেন। অবিচারের শিকার নির্দোষ জাহালমের তিন বছর কারাভোগের পর মুক্তিলাভের খবরের পটভূমিতে এসব বিনা বিচারের বন্দীর দুর্ভোগের বিষয়টি মোটেও উপেক্ষণীয় নয়।

ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই বিশ্ব গণমাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও সংবাদ শিরোনামে ফিরে এসেছে। নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয়টি নিয়ে জানুয়ারিজুড়ে নানা ধরনের বিচার-বিশ্লেষণের পর ফেব্রুয়ারির শুরুতে আলোচনায় এসেছে হারকিউলিস। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা কথিত ক্রসফায়ারের অভিযোগ কয়েক বছর ধরে বেড়েই চলেছে। এই পটভূমিতে ধর্ষণের অভিযোগে কয়েকজন সন্দেহভাজনের সাম্প্রতিক রহস্যজনক হত্যাকাণ্ড এই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ রকম কয়েকটি শিরোনাম হচ্ছে: ‘হারকিউলিস ভিজিল্যান্টে কিলস্ সাসপেক্টেড রেপিস্টস ইন বাংলাদেশ’ (আল-জাজিরা, ৬ ফেব্রুয়ারি), ‘ডেথস অব অ্যাকিউজড রেপিস্টস ইন বাংলাদেশ টায়েড টু সাসপেক্টেড ভিজিল্যান্টে’ (ইউপিআই, ৬ ফেব্রুয়ারি), ‘ইন বাংলাদেশ, এ সিরিয়াল কিলার কলড হারকিউলিস ইজ টার্গেটিং অ্যালেজড রেপিস্টস’ (জি নিউজ, ৫ ফেব্রুয়ারি), ‘হারকিউলিস সাইনস ডেথ ওয়ারেন্টস অব অ্যালেজড রেপিস্টস ইন বাংলাদেশ’ (টিআরটি ওয়ার্ল্ড, ৫ ফেব্রুয়ারি)। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এসব সংবাদ শিরোনাম বাংলাদেশে আইনের শাসনের দুর্বলতার করুণ প্রতিফলন।

এই সপ্তাহেই সাড়ম্বরে পালিত হয়েছে পুলিশ সপ্তাহ। এ সময়ে পুলিশের প্রায় ৪০০ কর্মকর্তা পেশাগত কাজে কৃতিত্ব প্রদর্শনের জন্য পদক ও প্রণোদনামূলক পুরস্কার পেয়েছেন। কেউ কেউ দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারের মতো পুরস্কৃত হয়েছেন। যাঁরা পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে যোগ্য কেউ ছিলেন না, তা নয়। তবে অনেক পুরস্কারের ক্ষেত্রে কারণগুলো স্পষ্টতই গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের মূল্যবোধের পরিপন্থী। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী বাহিনীর কথিত সাফল্য ও ব্যর্থতার প্রকট বৈপরীত্যের প্রতিফলন আর কী হতে পারে? নিরীহ কাউকে হয়রানি না করতে পুলিশের প্রতি নির্দেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে গাছের ছায়ায় জামিনের অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলোর কানে কি পরিহাসের মতো শোনায়নি?

যাঁরা পদক পেয়েছেন তাঁদের কৃতিত্বের যেসব বিবরণ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে আছে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন ও কোটাবিরোধী আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ, কথিত ‘রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণামূলক’ সাক্ষাৎকারের জন্য (আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে) গ্রেপ্তারে ‘পেশাগত দক্ষতা’র স্বীকৃতি, ডিজিটাল মাধ্যমে কথিত অপপ্রচার বন্ধে সাফল্য ইত্যাদি। প্রতিবাদ-বিক্ষোভের বৈধ নাগরিক অধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা চর্চার বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও দমন-পীড়নের স্বীকৃতি দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের পদক দেওয়ার ঘটনা এক নতুন দৃষ্টান্ত। দৃশ্যত এর উদ্দেশ্য: ১. পুলিশকে দমনমূলক নীতি অনুসরণে উৎসাহ দেওয়া; ২. সরকারবিরোধী সব দল, গোষ্ঠী ও ব্যক্তির মধ্যে ভীতি ছড়ানো, যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলন দানা বাঁধতে না পারে।

রাজনৈতিক দলগুলো যে প্রতিবাদ জানানোর শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছে, তাতে সন্দেহ নেই। এর ফলে নাগরিক সমাজে সৃষ্ট উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছে বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে যে তারা উদ্বিগ্ন। কেননা, যেসব সাফল্যের জন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের পদক দেওয়া হয়েছে, সেসব ঘটনার প্রতিটির ক্ষেত্রেই পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘নিষ্ক্রিয়তা’, ‘পক্ষপাতিত্ব’ বা ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের’ অভিযোগ সর্বজন বিদিত।

টিআইবি আরও বলেছে, পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরে শুদ্ধাচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি চর্চা সব নাগরিকের নিরাপত্তা ও আইনের সমান সুযোগ লাভের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য। তাই শান্তি ও জনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ আইন লঙ্ঘনকারীকে বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীকে সর্বোচ্চ পেশাদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময় পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের যেসব অভিযোগ উঠেছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। এই বাহিনীর প্রতি জনগণের নির্ভরশীলতা প্রতিষ্ঠায় এই মুহূর্তে এটাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।

টিআইবির এই দাবি নতুন নয়। বরং পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো তদন্তের জন্য একটি আলাদা ও স্বাধীন তদন্ত সংস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি অনেক দিনের। পুলিশে যেসব সংস্কারের জন্য ২০০৯ সালে সরকার জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সঙ্গে সমঝোতা করেছিল, তাতে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কথা ছিল। পুলিশ কমপ্লেইন্টস কমিশন বা পুলিশ কমিশন গঠিত হলে পুলিশের কর্তাব্যক্তিদের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা কিছুটা খর্ব হবে বলে তাঁরা এ বিষয়ে ছাড় দিতে রাজি নন, এটা জানা কথা। কিন্তু রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা দুর্ভাগ্যজনক।

গত এক দশকেও আমাদের রাজনীতিকেরা ওই সুপারিশটি বাস্তবায়নের পথে পা বাড়াননি। এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা পুলিশকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার ছাড়া আর কী হতে পারে? রাজনীতিকেরা এটা ভালোই জানেন যে এ রকম স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জবাবদিহির ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হলে পুলিশকে দলীয় কাজে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়বে। ৩০ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে দলীয় স্বার্থে নজিরবিহীনভাবে পুলিশকে কাজে লাগানো অথবা নিষ্ক্রিয় করায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। নির্বাচনের মাত্র এক মাসের মাথায় পুলিশ কর্তাদের পুরস্কারের বিষয়ে তাই প্রশ্ন ওঠা মোটেও অস্বাভাবিক নয়।

পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সদস্যদের বীরত্বপূর্ণ কাজ কিংবা জনস্বার্থমূলক ব্যতিক্রমী ভূমিকার স্বীকৃতি দেওয়ার রীতি সব দেশেই আছে। সাধারণত স্বাধীনতা দিবস বা জাতীয় দিবসগুলোতে এসব পদক দেওয়া হয়। সমাজ-সংস্কৃতির অগ্রযাত্রায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের যেভাবে সম্মান জানানো হয়, পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও তাঁদের দায়িত্ব পালনে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য এ ধরনের স্বীকৃতির ন্যায্য দাবিদার। কিন্তু জনমনে যদি এমন ধারণা হয় যে এই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক স্বার্থ, বিশেষত দলীয় বিবেচনার ছায়া পড়েছে, তাহলে তা বিতর্কের জন্ম দিতে বাধ্য। এবারের পুলিশ সপ্তাহে বিদেশে দূতাবাসে পদায়ন ও আলাদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মতো বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবিগুলোও এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে পুলিশের সাম্প্রতিক ভূমিকা ও তাদের পুরস্কার ও প্রণোদনার পদক্ষেপগুলো সেই বিতর্ক বাড়িয়েই দিয়েছে।

লেখক: সাংবাদিক কামাল আহমেদ

উৎসঃ ‌প্রথম আলো

আরও পড়ুনঃ আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ বেড়েছে ছয়গুণ


এ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে জানুয়ারি মাসে দেশে মোট ৬৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে ধর্ষণ ৪৮টি ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ১৯টি। গত বছরের একই সময়ে দেশে ১৯টি ধর্ষণ ও তিনটি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ ২০১৮ সালের জানুয়ারির তুলনায় এ বছরের জানুয়ারিতে দেশে ধর্ষণের ঘটনা তিনগুণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা প্রায় ছয়গুণ বেড়েছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের গবেষণায় উঠে আসা এই পরিসংখ্যানের বিষয়ে নারী নেত্রী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বিচারহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতির কারণে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। তাদের ভাষ্য, ধর্ষণ মামলা তদন্তে বা ভিকটিমের অভিযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও গাফিলতি হচ্ছে কিনা, তা মনিটরিং থাকতে হবে। কেননা, বিচার ব্যবস্থা সার্বিকভাবে জেন্ডার সংবেদনশীল না হওয়ায় পাওয়ার ম্যানুপুলেশনের সুযোগ থাকে।

বাংলা ট্রিবিউনের গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে দেশে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে মোট ৬৭টি। ২০১৮ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২২টি। ২০১৯ সালে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন ১৯ জন, এ সংখ্যা ২০১৮ সালের একই সময়ে ছিল তিনটি।

তিনটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের উপাত্ত নিয়ে এ গবেষণা করে বাংলা ট্রিবিউন। গবেষণায় পাওয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় এ বছরের শুরুতেই বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এ বছর ছাত্রী ও গৃহবধূরা ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বেশি। কর্মজীবী নারীদের মধ্যে পোশাক শ্রমিকরা বেশি ধর্ষণের শিকার হন। এই সহিংসতার শিকার হয়েছেন শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী নারীরাও।

২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ধর্ষণের খবর পাওয়া যায় ১৬টি জেলা থেকে, ২০১৯ সালের একই সময়ে ৩৫টি জেলা এ ধরনের সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।

গবেষণায় পাওয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার তুলনামূলক চিত্রও বেশ উদ্বেগজনক। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ৩১ জন শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয় ২১ জন, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয় তিন জন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭ জনকে। অন্যদিকে, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে সাতটি শিশু এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়, এর মধ্যে দু’টি শিশুকে হত্যা করা হয়।

নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর মনে করেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে ধর্ষণের ঘটনা কমছে না। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে যে ধর্ষণের খবরগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তার কয়টির বিচার হয়েছে। ধর্ষণের মতো ফৌজদারি অপরাধ করে যখন ধর্ষক পার পেয়ে যায়, তখন তা অপরাধকে উৎসাহিত করে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ধর্ষণ কমবে— এমনটা আশা করা ঠিক না।’

রোকেয়া কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রথমত, ধর্ষণের ঘটনার বিচার হতে হবে। দ্বিতীয়ত, ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে ভিকটিম যেন নির্ভয়ে বিচার চাইতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সংখ্যাগতভাবে ধর্ষণ বাড়ছে দুটো কারণে। এক. আগে ধর্ষণের সংবাদ পত্রিকায় কম আসতো। আরেকটি হলো সমাজে অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিচারহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতির কারণে অপরাধপ্রবণতা বেড়েছে। এমন অপরাধের (ধর্ষণ) ক্ষেত্রে বিচার না হওয়া, অপরাধী পার পেয়ে যাওয়ার পরিমাণ বাড়ছে।’

ধর্ষণ ঘটনার খুব কমই বিচার হয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, বিচার হলেও অভিযুক্ত খালাস পেয়ে যাচ্ছে। সাক্ষীর অভাব, বাদীর অনীহা, পুলিশের গাফিলতিতে দুর্বল চার্জশিট দেওয়া ইত্যাদি কারণে ধর্ষণ প্রমাণ কঠিন হয়। সমাজের মধ্যে এ ধরনের অপরাধের ব্যাপারে মানুষ সোচ্চার হলেও ভিকটিমকে ইতিবাচকভাবে দেখা হয় না। নারীকে অবহেলার চোখে দেখা হয়।’

বেশ কিছু করপোরেট অফিস থেকে নারী নির্যাতনের খবর আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নারীরা আসলে রাস্তা-বাড়ি-কর্মক্ষেত্র কোথাও নিরাপদ না। এটি ব্যাপকতা পেয়েছে। একজন নারী, সে যদি অফিসেও যৌন হয়রানির শিকার হন, সেখানেও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম বলেন, ‘পিতৃতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা নারীকে সম্মানের জায়গায় অধিষ্ঠিত হতে বাধা দেয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ধর্ষণরোধে আইন হতে হবে এবং ধর্ষণের সংজ্ঞা নিয়ে বর্তমান বাস্তবতাকে মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। বিচার না হওয়ার কারণে অপরাধ দ্বিগুণ-তিনগুণ হবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিচার হবে কী করে, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। সাক্ষীর নিরাপত্তার কোনও জায়গা আমরা রাখিনি। অথচ, ভিকটিমের সাক্ষী লাগবে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার মেডিক্যাল পরীক্ষা হতে হবে, কিন্তু আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সবসময় সেই সহযোগিতা নিশ্চিত করা যায় না। তাহলে কীভাবে প্রতিকার মিলবে?’

আয়েশা খানম বলেন, ‘ধর্ষণ মামলা তদন্তে বা ভিকটিমের অভিযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও গাফলতি হচ্ছে কিনা, সেই বিষয়ে মনিটরিং থাকতে হবে। বিচার ব্যবস্থা সার্বিকভাবে জেন্ডার সংবেদনশীল না, ফলে পাওয়ার ম্যানুপুলেশনের সুযোগগুলো থাকে। নারী ভিকটিম হলে তাকে ইতিবাচক সহায়তা দেওয়ার বদলে কোন কোন কারণে তার ধর্ষণ জায়েজ, সমাজ এখনও সেদিকেই বেশি মনোযোগ দেয়। এসব বদলাতে অপরাধকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে তার বিচার হতে হবে।’

উৎসঃ ‌banglatribune

আরও পড়ুনঃ জামালপুরে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খেয়ে এক শিশুর মৃত্যু, ৫ শতাধিক অসুস্থ


জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খেয়ে সুনিত রায় নামে ১৫ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার সকালে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ার পর শিশুটির বমি ও পাতলা পায়খানা শুরু হয়। বিকেলে তার মৃত্যু হয়। মৃত শিশু সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার সুরভিত রায়ের পুত্র। আরো ৫ শতাধিক শিশু অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকরা সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

শনিবার সকাল ১১টার দিকে সরিষাবাড়ীর গণময়দান এলাকায় অস্থায়ী ক্যাম্পে শিশু সুনিত রায়কে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। শিশুটি নিয়ে বাড়ি ফেরার পর থেকেই বমি ও পাতলা পায়খানায় শুরু হয়। বিকালে তাকে দ্রæত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। বিকাল ৩টা ৫৫ মিনিটে শিশু সুনিত রায়ের মৃত্যু হয় বলে জানা যায়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তার ও কর্মচারীরা প্রথমে বিষয়টি গোপন করার চেষ্টা করলেও এক পর্যায়ে শিশু মৃত্যুর খবর চার দিকে ছড়িয়ে পড়লে জেলা জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।

এলাকাবাসী জানায়, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ার পর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অনেক শিশুর বমি, কোন কোন শিশুর পাতলা পায়খানা হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে পাঁচ শতাধিক অভিভাবক আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসতে শুরু করে। গতকাল রাত ১০টা পর্যন্ত আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে ভিড় ছিল। জামালপুর স্বাস্থ্যবিভাগ ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খেয়ে এক শিশু মৃত্যুর ঘটনা স্বীকার করলেও আক্রান্ত অন্যান্য শিশুদের চিকিৎসা ও অভিভাবকদের কাউন্সেলিং চলছে বলে জানিয়েছে। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ার পর এক শিশু মারা যাওয়ায় জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ তৎপর হয়ে উঠেছে।

জামালপুরের সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে ডাক্তারদের একটি বিশেষ টিম বিকেল থেকে সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দিচ্ছে। খবর পেয়ে নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনাল সংস্থার প্রতিনিধি মাহফুজা রুমা বিকেল থেকে সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অবস্থান করছে। স্থানীয় সাংবাদিকরা রাতে তথ্য সংগ্রহের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঢুকার চেষ্টা করলে স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রভাবশালীরা তাদেরকে বাঁধা দেয়।

জামালপুরের সিভিল সার্জন ডাক্তার গৌতম রায় বলেন, শিশু সুনিত রায়কে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ার পরই তার বমি ও পাতলা পায়খানা হয়। শিশুটি আমাদের এক স্টাফের সন্তান। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তির পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। আর কোনো শিশু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি নেই বলে দাবি করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, এক শিশু মৃত্যুর ঘটনা জানাজানি হলে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়া শিশুর অভিভাবকদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ার পর কি কারণে এমন হলো তা আমরা খতিয়ে দেখছি। তবে এই মুহূর্তে কিছুই বলা যাচ্ছে না।

উৎসঃ ‌amadershomoy

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here