পুলিশের কাছে দেয়া নুসরাতের জবাববন্দির ভিডিও প্রকাশ

0
340

মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা পিয়ন দিয়ে নিজ কক্ষে ডেকে নেয় নুসরাতকে। এরপর তার শ্লীলতাহানীর চেষ্টা করে সিরাউদ্দৌলা। একই সাথে তার সাথে থাকার জন্য নুসরাতকে প্রস্তাব দেয় অধ্যক্ষ।
এই ঘটনার পর পরই পুলিশের কাছে এমন জবানবন্দি দেয় ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত। মোবাইলে ধারণ করা হয়েছিলো সেই জবাববন্দিটি।

ভিডিওঃ  ‘নুরুদ্দিনকে অ্যারেস্ট করলে সব তথ্য বের হয়ে যাবেঃ নুসরাতের ভাই (ভিডিও সহ) ’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ নুসরাতের আবেগঘন সেই চিঠি পুলিশের হাতে, বেরিয়ে আসছে অনেক তথ্য


ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার হাতে যৌন হয়রানির পর সহপাঠি বান্ধবীদের উদ্দেশ্যে নুসরাত জাহান রাফির লেখা চিঠি মঙ্গলবার বাড়ি থেকে উদ্ধার করেছে সোনাগাজী মডেল থানা পুলিশ। চিঠিতে দিন-তারিখ লেখা না থাকলেও বিষয়বস্তু বিবেচনায় এটি কয়েকদিন আগের লেখা বলে মনে করছে তদন্তকারি সূত্র।

ওই সূত্র জানায়, তার পড়ার টেবিলে খাতায় দুই পাতার ওই চিঠিতে তামান্না ও সাথী নামের দুই বান্ধবীকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছে। গত ২৭ মার্চ ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনাও দিয়েছে রাফি। ওই চিঠিতে রাফি আত্মহত্যা করবে না বলেও উল্লেখ করে সে। তবে যৌন হয়রানির ঘটনার পর সিরাজ উদদৌলা গ্রেফতার হলে তার মুক্তির দাবিতে বান্ধবীদের অংশগ্রহণে ক্ষোভ প্রকাশ করে রাফি। তাকে নিয়ে বান্ধবীদের বিভিন্ন কটুক্তিতেও তার মর্মাহত কথা উল্লেখ করা হয় চিঠিতে।

চিঠিটিতে রাফি উল্লেখ করেছে, ‘তামান্না, সাথী। তোরা আমার বোনের মতো এবং বোনই। ঔ দিন তামান্না আমায় বলেছিল, আমি নাকি নাটক করতেছি। তোর সামনেই বললো। আরো কি কি বললো, আর তুই নাকি নিশাতকে বলেছিস আমরা খারাপ মেয়ে। বোন প্রেম করলে কি সে খারাপ??? তোরা সিরাজ উদ দৌলা সম্পর্কে সব জানার পরও কীভাবে তার মুক্তি চাইতেছিস।

তোরা জানিস না, ওইদিন রুমে কি হইছে? উনি আমার কোন জাগায় হাত দিয়েছে এবং আরো কোন জায়গায় হাত দেওয়ার চেষ্টা করেছে, উনি আমায় বলতেছে- নুসরাত ডং করিসনা। তুই প্রেম করিসনা। ছেলেদের সাথে প্রেম করতে ভালো লাগে। ওরা তোরে কি দিতে পারবে? আমি তোকে পরীক্ষার সময় প্রশ্ন দেবো। আমি শুধু আমার শরীর দিতাম ওরে। বোন এই জবাবে উত্তর দিলাম। আমি একটা ছেলে না হাজারটা ছেলে…। আমি লড়বো শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত। আমি প্রথমে যে ভুলটা করেছি আত্মহত্যা করতে গিয়ে। সেই ভুলটা দ্বিতীয়বার করবো না। মরে যাওয়া মানে তো হেরে যাওয়া। আমি মরবো না, আমি বাঁচবো। আমি তাকে শাস্তি দেবো। যে আমায় কষ্ট দিয়েছে। আমি তাকে এমন শাস্তি দেবো যে তাকে দেখে অন্যরা শিক্ষা নিবে। আমি তাকে কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তি দেবো। ইনশাআল্লাহ।’

এদিকে গত ৬ এপ্রিল নুসরাত জাহান রাফিকে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার পর থেকে কেউ কেউ ঘটনাটিকে আত্মহত্যার চেষ্টা বলেও ধারণা করেছেন। তবে উদ্ধার হওয়া চিঠিটিতে রাফির ভাষ্য ভিন্ন।

মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা ও সোনাগাজী মডেল থানার ওসি (তদন্ত) মো. কামাল হোসেন চিঠিটি উদ্ধারের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এটিও ওই ঘটনার আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখিতদের প্রয়োজনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে তিনি জানান।

চার আসামি ৫ দিনের রিমান্ডে

সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার ৪ আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ড আদেশ দিয়েছে আদালত। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট শরীফ উদ্দিন আহমেদ গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে এ আদেশ দেন।

কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক গোলাম জিলানি জানান, রিমান্ডে দেওয়া চার আসামি হলেন আলাউদ্দিন, কেফায়েত উল্লাহ, নূর হোসেন ও শহীদুল ইসলাম। এ মামলায় এ পর্যন্ত ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি তিনজনকে আদালতে হাজির করা হয়নি বলে তাদের রিমান্ড শুনানি হয়নি বলে জানান জিলানি।

গত শনিবার সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসায় নুসরাত জাহান রাফির গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিলে দ্বগ্ধ হন। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে লাইফসাপোর্টে রাখা হয়েছে। নুসরাত ওই অধ্যক্ষর বিরুদ্ধে দায়ের করা শ্লীলতাহানির মামলা তুলে না নেওয়ায় অধ্যক্ষর স্বজনরা তাকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করে বলে পরিবারের অভিযোগ। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারে অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ-উদ-দৌলা সহ ৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য আসামীরা হলেন পৌর কাউন্সিলর মাকসুল আলম, প্রভাষক আবছার উদ্দিন, সাবেক ছাত্র শাহাদাত হোসেন শামীম, সাবেক ছাত্র নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন, জোবায়ের আহম্মদ ও হাফেজ আবদুল কাদের।

উৎসঃ ‌নয়াদিগন্ত

আরও পড়ুনঃ ‘নিপীড়ক’ অধ্যক্ষকে আইনি সহায়তা, আ’লীগ নেতা বুলবুল বহিষ্কার


নুসরাত জাহান রাফি হত্যাচেষ্টা মামলার প্রধান আসামি নিপীড়ক অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার পক্ষে মামলা পরিচালনা করায় ফেনীর কাজীরবাগ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট কাজী বুলবুল সোহাগকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুর রহমান বিকম।

তিনি বৃহস্পতিবার সকালে যুগান্তরকে বলেন, কেন্দ্রের নির্দেশে বুলবুলকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আবদুর রহমান বলেন, সিরাজউদ্দৌলাসহ অন্য আসামিদের আইন সহায়তা দেয়ায় তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

এদিকে কেন্দ্রের এ সিদ্ধান্তের আগেই বুধবার বুলবুলকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় উপজেলা আওয়ামী লীগ। ফেনী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট নূর হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, বুধবার উপজেলা কমিটি বসে অ্যাডভোকেট বুলবুল সোহাগকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়। বিষয়টি তাকে (বুলবুলকে) জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুসারে, দলের যেকোনো নেতাকে বহিষ্কারের এখতিয়ার রাখে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ। শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে কাউকে সাময়িক বহিষ্কারের সুপারিশ করার ক্ষমতা তৃণমূলের আছে। এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার কেন্দ্রীয় কমিটিরই। কেন্দ্র বুলবুলকে বহিষ্কারের চিঠি দেয়ায় সেটি কার্যকর হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।

১০৮ ঘণ্টা আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় মারা যান ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি। বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের চিকিৎসক অধ্যাপক রায়হানা আউয়াল যুগান্তরকে জানান, মৃত্যুর আগে তিনি লাইফসাপোর্টে ছিলেন।

৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। মাদ্রাসাছাত্রী তার বান্ধবী নিশাতকে ছাদের ওপর কেউ মারধর করছে, এমন সংবাদে তিনি ছাদে যান। সেখানে বোরকাপরা ৪-৫ জন তাকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে করা শ্লীলতাহানির মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়।

অস্বীকৃতি জানালে তারা রাফির গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় সোমবার রাতে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা ও পৌর কাউন্সিলর মুকছুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন অগ্নিদগ্ধ রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।এই মামলায় আসামিদের আইনি সহায়তা দেন বুলবুল।

এর আগে ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা। এ ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। ওই দিনই অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে আটক করে পুলিশ। সে ঘটনার পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ বা‌ড়ির প‌থে নুসরা‌তের লাশ


ময়নাতদন্ত শেষে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ফেনীর পরীক্ষা কেন্দ্রে দগ্ধ মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির লাশ। আজ বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে নুসরাতের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক) থেকে রওয়ানা হয়।

এর আগে আজ সকাল ৯টায় নুসরাতের লাশ মর্গে নেয়া হয় ময়নাতদন্তের জন্য। তার আগে নুসরাতের সুরতহাল প্রতিবেদন সম্পন্ন করে শাহবাগ থানা পুলিশ।

বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যায় নুসরাত।

এদিকে ফেনী থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানিয়েছেন, সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার ছাত্রী ও আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে দাদির কবরের পাশেই দাফন করা হবে।

আজ বৃহস্পতিবার বাদ আসর সোনাগাজী মো: ছাবের সরকারী পাইলট হাই স্কুল মাঠে নুসরাত জাহান রাফির জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। জানাযা শেষে পৌর শহরের ৩নং ওয়ার্ডের ভূঁইয়া বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন নুসরাতের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ উল্লাহ ফরহাদ।

২৭ মার্চ নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে রাফিকে যৌন হয়রানি করেন মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা। এ ঘটনায় তার মা শিরিন আক্তারের দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করতে নানাভাবে চাপ দেয়া হয়। গত ৬ এপ্রিল শনিবার পরীক্ষার হল থেকে তার এক বান্ধবীকে মারা হচ্ছে বলে ছাদে ডেকে নিয়ে যায় আরেক সহপাঠি। পরে তাকে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।

পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে প্রেরণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর পাঠানোর নির্দেশ দিলেও স্বাস্থ্যের অবনতিতে তা সম্ভব হয়নি।

আলোচিত এ ঘটনায় সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মো: মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ঘটনায় রাফির ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায় এজাহারভুক্ত তিন আসামিসহ ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে সাতজনকে রিমান্ডের আদেশ দিয়েছে আদালত।

হাসপাতালে নেয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্সে নুসরাত তার ভাইকে জানায়, তার বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে বলে পরীক্ষার হল থেকে তাকে ডেকে তৎসংলগ্ন সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নেয়া হয়। এ ভবনের দ্বিতীয় তলায় আলিম শ্রেণিকক্ষ ও অধ্যক্ষের কার্যালয়। সেখানে আগ থেকে বোরকা পরা চার ব্যক্তি ওঁৎ পেতে ছিল। তারা তাকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দেয়া অভিযোগ প্রত্যাহার করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। নুসরাত এটা করতে অস্বীকার করে। তার ভাষ্য মতে, ‘আমি যা বলেছি সত্য বলেছি। মৃত্যু পর্যন্ত এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করে যাব। শিক্ষক হয়ে তিনি কিভাবে গায়ে হাত দিলেন…। এ সময় তিনজন হাত ধরে আরেকজন কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।’ এতে চিৎকার দিয়ে নুসরাত সিঁড়ি বেয়ে নিচের দিকে দৌড় দেয়। হামলাকারীদের একজনের কণ্ঠ তার চেনা বলে সে দাবি করে। তাহলে পরীক্ষার হল থেকে ডেকে নেয়া ওই শিক্ষার্থী এবং ঘটনায় জড়িত চারজন কারা- এ নিয়ে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। পরীক্ষা শুরু হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে সংরক্ষিত পরীক্ষাকেন্দ্রে কিভাবে এমন জঘন্য ঘটনা ঘটল এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে দায়িত্বরত কেউ হামলাকারীদের আসা-যাওয়ার সময় দেখেননি বলে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।

দায়িত্বরত একটি সূত্রের দাবি, ওই ছাত্রী পরীক্ষার হল থেকে নিজেই বেরিয়ে ছাদে যায় এবং কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। চিৎকার শুনে তারা এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করে। এ সময় ছাদ থেকে কেরোসিন বহনকারী পলিথিন, দিয়াশলাই কাঠি ও আগুনে পোড়া বোরখার টুকরো উদ্ধার করা হলেও হামলাকারীদের কাউকে দেখা যায়নি।

তবে মাদরাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নুসরাতকে আগুন লাগিয়েই হামলাকারীরা দক্ষিণ দিকে দ্রুত পালিয়ে যায়। অনেকে দেখলেও প্রাণভয়ে তা গোপন রাখছেন। ওই সূত্র আরো জানায়, ঘটনার দিন সকাল ৮টার দিকে মাদরাসার প্রভাষক মো: আফছার উদ্দিন মোবাইল ফোনে নুসরাতের ভাই আবদুল্লাহ আল নোমানকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দেয়া মামলা সম্পর্কে জানতে চান। মামলাটি সমঝোতা করার জন্য তিনি নোমানকে তাগিদ দেন। এ ছাড়া মাদরাসা শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য নুসরাতের পরিবারকে অব্যাহতভাবে হুমকি-ধমকি দেয় বলে জানায় নোমান।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা তার প্রভাব ধরে রাখতে একদিকে সরকারদলীয় কিছু নেতার সাথে গভীর সখ্য বজায় রাখেন এবং অন্য দিকে মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি অংশকেও নানা সুবিধা দিয়ে লালন করেন। ২৭ মার্চ নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগে নুসরাতের মায়ের করা মামলায় ওইদিনই গ্রেফতার হন অধ্যক্ষ। ঘটনার পর তার শাস্তি ও মুক্তির দাবিতে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন হয়ে আসছে।

এদিকে এ ঘটনায় গত রোববার থেকে আগামী ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত মাদরাসার স্বাভাবিক কার্যক্রম ও অনির্দিষ্টকালের জন্য হোস্টেল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

উৎসঃ ‌নয়াদিগন্ত

আরও পড়ুনঃ মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত হত্যা: সেই অধ্যক্ষের পক্ষে মিছিল করেছিলো ছাত্রলীগ


মাদ্রাসা ছাত্রীকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার মুক্তির দাবীতে মিছিল করেছিলো ছাত্রলীগ।

গত ২৭ মার্চ যৌন হয়রানির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে অধ্যক্ষ জেলে যাওয়ার পরে ২৮ মার্চ তার মুক্তির দাবিতে মিছিল করেছিলো মাদ্রাসা ছাত্রলীগের সদস্যরা৷ সাধারন শিক্ষার্থীদেরকে হুমকি দিয়ে মিছিলে অংশ গ্রহণ করতে বাধ্য করেছিলো তারা।

সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ নেতা মামুন ও কাউন্সিলর মকসুদ আলমের ইন্ধনে কিছু শিক্ষার্থীকে দিয়ে সিরাজউদ্দৌলার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধনের আয়োজন করেন৷ মিছিল শেষে সমাবেশে যৌন হয়রানির মামলাকে মিথ্যা বলে দাবি করে ছাত্রীর পরিবারকে মামলা তুলে নিতে হুমকি দেওয়া হয়।

অন্যদিকে অধ্যক্ষের পক্ষে অবস্থার নেয়ার অভিযোগ আছে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমীনের বিরুদ্ধেও৷ তিনি মাদ্রাসার গভর্নিং বডির ভাইস প্রেসিডেন্ট৷ তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনার দায় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদের ওপর চাপিয়ে দেন। মাকসুদ শহরের জিরো পয়েন্টে শিক্ষার্থীদের দিয়ে মিছিল করিয়েছিলো বলে জানান তিনি৷

মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা তার প্রভাব ধরে রাখতে একদিকে সরকারদলীয় কিছু নেতার সাথে গভীর সখ্য বজায় রাখেন এবং অন্য দিকে মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি অংশকেও নানা সুবিধা দিয়ে লালন করেন। এবং মাদ্রাসাটির মালিকানায় শহরে তিন তলা একটি মার্কেট আছে, যা থেকে মাসে তিন লাখ টাকা আয় হয়৷ এছাড়া মাদ্রাসার আরো অনেক আয় আছে৷

এদিকে নানা রকম অনৈতিক কর্মকান্ডের অভিযুক্ত মাদ্রাসাছাত্রীর গায়ে আগুন দেয়ার ঘটনায় আলোচিত শিক্ষক সিরাজ উদদৌলা। সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হন তিনি। অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ওই মাদ্রাসার বিপুল পরিমাণ অর্থ-আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও বহু ছাত্রীকে যৌন হয়রানির কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনার ৬ মাস আগে ওই অধ্যক্ষ’র বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন মাদ্রাসার আরেক ছাত্রী।

নুসরাত জাহান রাফীর সহপাঠি ও মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নাসরিন সুলতানা ফুর্তি সাংবাদিকদের বলেন, ‘অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজ উদ্দৌলা ছিলেন, একজন লম্পট প্রকৃতির লোক। রাফির গায়ে হাত দেওয়ার ঘটনায় আমি নিজেও অধ্যক্ষের কাছে প্রতিবাদ করেছি।’

জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার দাবি জানায়, রাফির আরেক সহপাঠী নিশাত। তাকে মারা হচ্ছে বলেই রাফিকে পরীক্ষার হল থেকে বের করে এনেছিলো দুর্বৃত্তরা।

স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর বলেন, ‘অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজদ্দৌলা মাদ্রাসার এক ছাত্রীকে অন্তসত্তা করে ফেলেন। পরে তিনি স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতার হাত-পা ধরে বেঁচে যান। ২০১৬ সালে একবার চেক জালিয়াতি মামলায় জেল খেটেছেন, এরপরও উক্ত মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ পদে বহাল ছিলেন।’

তার বিরুদ্ধে চেক জালিয়াতি, প্রতারণা, নাশকতা ও যৌনহয়রানিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ফেনী ও সোনাগাজী থানায় চারটি মামলা রয়েছে। চেক জালিয়াতির মামলায় ২০১৭ সালেও জেল খেটেছিলেন তিনি।

উৎসঃ ‌নয়াদিগন্ত

আরও পড়ুনঃ নুসরাতের মামলায় তদন্তে গাফিলতি হলে আমরা হস্তক্ষেপ করবো : হাইকোর্ট


ফেনীর সোনাগাজীর অগ্নিদগ্ধ মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি মারা যাওয়ার বিষয়ে আদালত বলেছেন, নুসরাতের মামলায় তদন্তে গাফিলতি পরিলক্ষিত হলে আমরা ইন্টারফেয়ার (হস্তক্ষেপ) করবো।

আজ বৃহস্পতিবার বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন নুসরাতের মারা ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনলে আদালত এমন্তব্য করেন।

আদালত বলেন, যেহেতু প্রধানমন্ত্রী নিজেই এ ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছেন। ইতোমধ্যেই পিবিআইকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আপনারা আস্থা রাখুন।

আদালতে আরো বলেন, তদন্তে গাফিলতি দেখলে আপনারা আদালতে আসবেন, তখন আমরা ইন্টারফেয়ার (হস্তক্ষেপ) করবো।

ব্যারিস্টার সুমন আদালতকে বলেন, নুসরাতের মারা যাওয়ার ঘটনাটি মর্মান্তিক ও সেনসেটিভ। নুসরাত মারা যাওয়ায় সারাদেশের মানুষ ব্যথিত। এ ঘটনার সাথে একজন মাদরাসার অধ্যক্ষ, স্থানীয় বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তাই পুলিশের শুধু একজন এসআই দিয়ে এ ঘটনার তদন্ত করলে বিশ্বাসযোগ্য হবে না। আমরা বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশনা দেয়ার আবেদন জানাচ্ছি।

ব্যারিস্টার সুমন আরো বলেন, অগ্নিদগ্ধ মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি মারা যাওয়ার ঘটনায় আমরাও ব্যথিত। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি, কুমিল্লার তনু বা চট্টগ্রামের মিতুর মামলার মতো যেন নুসরাতের মামলাটিও হারিয়ে না যায়।

এর আগে গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ৯ টার দিকে অগ্নিদগ্ধ মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান। তাকে নুসরাতকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। তার শরীরের ৭৫ শতাংশ আগুনে পুড়ে গিয়েছিল বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন।

গত ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা করেন মেয়েটির মা। ছাত্রীর স্বজনদের অভিযোগ, মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় অধ্যক্ষের পক্ষের লোকজন ওই ছাত্রীর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।

গত শনিবার গুরুতর আহত অবস্থায় ওই মাদ্রাসাছাত্রীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। রোববার অগ্নিদগ্ধ ওই ছাত্রী চিকিৎসকদের কাছে জবানবন্দি দেন। তিনি বলেন, নেকাব, বোরকা ও হাতমোজা পরিহিত চারজন তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন।

উৎসঃ ‌নয়াদিগন্ত

আরও পড়ুনঃ আমার একমাত্র মেয়ে, কলিজায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে : নুসরাতের বাবা চাইলেন ন্যায়বিচার

আমার একমাত্র মেয়ে নুসরাত। সেদিন সে পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল, আর তার সাথে এমন ঘটনা ঘটেছে। আমার ভিতরে কি চলছে তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। মেয়ে হারানোর বেদনায় কলিজায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আমি এর ন্যায়বিচার চাই।

আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজে হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সামনে এভাবেই কথাগুলো বলেন দুর্বৃত্তের আগুনে দগ্ধ ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির বাবা কে এম মুসা।

কে এম মুসা বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। সকলেই আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আপনাদের সবার কারণে আমার মেয়ের এই পরিণতির কথা সবাই জানতে পেরেছে।

এই কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্নায় বার বার বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছিলেন কে এম মুসা। পরে তিনি নিজেকে সামলিয়ে আবারো বলেন, সেই দিন আমার মেয়ে পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল, কিন্তু সেই দিনই আমার একমাত্র মেয়ের সাথে এ ঘটনা ঘটেছে। আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি, কি বলব জানি না। আমাদের ভিতরে যে কি চলছে তা আমি বুঝাতে পারছি না। আমার কলিজায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।

দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ইতমধ্যেই আমরা মেয়ের বিষয়ে সকল কিছুই প্রকাশিত হয়েছে। আমার দাবি দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার যেন হয় দায়ীদের।

এর আগে আজ সকাল ৯টায় নুসরাতের লাশ মর্গে নেয়া হয় ময়নাতদন্তের জন্য। এছাড়া ইতোমধ্যে নুসরাতের সুরতহাল প্রতিবেদন সম্পন্ন করেছে শাহবাগ থানা পুলিশ।

এ বিষয়ে শাহবাগ থানার এসআই শামছুর রহমান বলেন, আমরা সুরতহাল শেষ করে ফেলেছি। এখন শুধু অপেক্ষা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের। এই প্রতিবেদন পেলেই আমরা লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে দিব।

শ্লীলতাহানির মামলা তুলে না নেয়ায় ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা তার অনুসারীদের দিয়ে গত ২৭ মার্চ নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা চালান বলে মেয়েটির স্বজনদের অভিযোগ।

হাসপাতালে নেয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্সে নুসরাত তার ভাইকে জানায়, তার বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে বলে পরীক্ষার হল থেকে তাকে ডেকে তৎসংলগ্ন সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নেয়া হয়। এ ভবনের দ্বিতীয় তলায় আলিম শ্রেণিকক্ষ ও অধ্যক্ষের কার্যালয়। সেখানে আগ থেকে বোরকা পরা চার ব্যক্তি ওঁৎ পেতে ছিল। তারা তাকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দেয়া অভিযোগ প্রত্যাহার করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। নুসরাত এটা করতে অস্বীকার করে। তার ভাষ্য মতে, ‘আমি যা বলেছি সত্য বলেছি। মৃত্যু পর্যন্ত এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করে যাব। শিক্ষক হয়ে তিনি কিভাবে গায়ে হাত দিলেন…। এ সময় তিনজন হাত ধরে আরেকজন কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।’ এতে চিৎকার দিয়ে নুসরাত সিঁড়ি বেয়ে নিচের দিকে দৌড় দেয়। হামলাকারীদের একজনের কণ্ঠ তার চেনা বলে সে দাবি করে। তাহলে পরীক্ষার হল থেকে ডেকে নেয়া ওই শিক্ষার্থী এবং ঘটনায় জড়িত চারজন কারা- এ নিয়ে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। পরীক্ষা শুরু হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে সংরক্ষিত পরীক্ষাকেন্দ্রে কিভাবে এমন জঘন্য ঘটনা ঘটল এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে দায়িত্বরত কেউ হামলাকারীদের আসা-যাওয়ার সময় দেখেননি বলে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।

দায়িত্বরত একটি সূত্রের দাবি, ওই ছাত্রী পরীক্ষার হল থেকে নিজেই বেরিয়ে ছাদে যায় এবং কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। চিৎকার শুনে তারা এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করে। এ সময় ছাদ থেকে কেরোসিন বহনকারী পলিথিন, দিয়াশলাই কাঠি ও আগুনে পোড়া বোরখার টুকরো উদ্ধার করা হলেও হামলাকারীদের কাউকে দেখা যায়নি।

তবে মাদরাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নুসরাতকে আগুন লাগিয়েই হামলাকারীরা দক্ষিণ দিকে দ্রুত পালিয়ে যায়। অনেকে দেখলেও প্রাণভয়ে তা গোপন রাখছেন। ওই সূত্র আরো জানায়, ঘটনার দিন সকাল ৮টার দিকে মাদরাসার প্রভাষক মো: আফছার উদ্দিন মোবাইল ফোনে নুসরাতের ভাই আবদুল্লাহ আল নোমানকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দেয়া মামলা সম্পর্কে জানতে চান। মামলাটি সমঝোতা করার জন্য তিনি নোমানকে তাগিদ দেন। এ ছাড়া মাদরাসা শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য নুসরাতের পরিবারকে অব্যাহতভাবে হুমকি-ধমকি দেয় বলে জানায় নোমান।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা তার প্রভাব ধরে রাখতে একদিকে সরকারদলীয় কিছু নেতার সাথে গভীর সখ্য বজায় রাখেন এবং অন্য দিকে মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি অংশকেও নানা সুবিধা দিয়ে লালন করেন। ২৭ মার্চ নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগে নুসরাতের মায়ের করা মামলায় ওইদিনই গ্রেফতার হন অধ্যক্ষ। ঘটনার পর তার শাস্তি ও মুক্তির দাবিতে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন হয়ে আসছে।

এদিকে এ ঘটনায় গত রোববার থেকে আগামী ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত মাদরাসার স্বাভাবিক কার্যক্রম ও অনির্দিষ্টকালের জন্য হোস্টেল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

উৎসঃ ‌নয়াদিগন্ত

আরও পড়ুনঃ রাফির মৃত্যুর জন্য দায়ী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই : মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান


মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজি রিয়াজুল হক বলেছেন, আমরা অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। আইনের দ্রুত ও কঠোর প্রয়োগ দেখতে চাই বলে জানান তিনি। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে নুসরাত হত্যার বিষয়ে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মারা যান নুসরাত জাহান রাফি। আজ সকালে ময়নাতদন্তের জন্য তার লাশ মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এরপর তার লাশ ফেনীতে নিয়ে যাওয়া হবে। বাদ আসর সোনাগাজী সাবের পাইলট হাইস্কুল মাঠে নামাজে জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।

মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান রাফির মৃত্যুর ব্যাপারে বলেন, অপরাধ দিনদিন বেড়েই যাচ্ছে। এটা সবার জন্য রেড মেসেজ। এর পরিসমাপ্তি দরকার। সবাইকে নিয়ে আমরা একটি আইন করতে চাই, সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের বিষয়ে যাতে ভুক্তভোগী দ্রুত বিচার পান।
তিনি বলেন, ‘নুসরাতের অকাল মৃত্যু আমাদের সবাইকে নাড়া দিয়েছে। নুসরাত একজন প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে থাকবে।’

মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা যখন দেখলাম অপরাধী অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাহকে আদালতে তোলা হয়েছে তার চেহারার মধ্যে কোনো অনুশোচনার চিহ্ন নাই। কোনো অপরাধবোধ আছে বলে মনে হচ্ছে না তার মধ্যে। আইনের কঠোর প্রয়োগ নাই বলে আজকে এমনটাই হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আশা করব তদন্তে প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করা সম্ভব হবে। তাছাড়া সাধারণ মানুষের একটা তদন্ত আছে সেটা আনুষ্ঠানিক না হলেও কিন্তু প্রশাসনের তদন্ত যাতে সাধারণ মানুষকে হতাশ না করে।

মানবাধিকার চেয়ারম্যান বলেন, নুসরাত একজন প্রতিবাদী মেয়ে। সে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর। অনেকে প্রতিবাদ না করলেও কিন্তু নুসরাত ব্যতিক্রম। সে বলেছে, আমি প্রতিবাদ চালিয়ে যাব। এর বিচার দেখে যাব। আমরা দিনটিকে ‘নুসরাত ডে’ হিসেবে ঘোষণা করতে চাই। অপরাধের শাস্তি আমরা দেখতে চাই।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অভিযোগ নিয়ে নুসরাত থানায় যাওয়ার পর তার সাথে যে ব্যবহার করা হয়েছে তা খুবই দুঃখজনক। তারও বিচার চাই আমরা।

গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় লাইফ সাপোর্ট খুলে নুসরাত জাহান রাফিকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা: সামন্ত লাল সেন তার মৃত্যুর বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন। তার মৃত্যুর সংবাদে ফেনীসহ সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাফির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।

গত ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে এসে দুর্বৃত্তরা তাকে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করে। এতে তার শরীরের ৮০ শতাংশ পুড়ে যায়। পাঁচ দিন ধরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন ছিলেন রাফি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেয়ার নির্দেশ দিলেও শারীরিক অবস্থার কারণে তা সম্ভব হয়নি।

গত ২৭ মার্চ মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা তার কক্ষে ডেকে নিয়ে রাফিকে যৌন হয়রানি করে। এ অভিযোগে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করতে রাজি না হওয়ায় তার এ করুণ পরিণতি বলে জানা যায়। এ দিকে এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারে অধ্যক্ষ এস এম সিরাজউদদৌলাসহ আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলো- পৌর কাউন্সিলর মাকসুল আলম, প্রভাষক আবছার উদ্দিন, মাদরাসা শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম, সাবেক ছাত্র নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন, জোবায়ের আহম্মদ ও হাফেজ আবদুল কাদের। ইতোমধ্যে ওই মামলার তিন আসামিসহ অন্তত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ সাতজনকে রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া তাকে ওই মাদরাসার অধ্যক্ষ পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মো: মোয়াজ্জেম হোসেনকেও প্রত্যাহার করা হয়। মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইতে স্থানান্তর করা হয়েছে।

উৎসঃ ‌নয়াদিগন্ত

আরও পড়ুনঃ নুসরাতের মৃত্যু: অধ্যক্ষকে ইন্ধন যুগিয়েছে কে?


শেষ পর্যন্ত বাঁচানো গেলো না ফেনির সোনাগাজীর অগ্নিদগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে। বুধবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তিনি মারা যান। নুসরাতের মৃত্যুতে ফেনিসহ সারাদেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এদিকে নুসরাত হত্যাকাণ্ডের জন্য স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ইন্ধন থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তারা প্রত্যক্ষভাবে অধ্যক্ষকে সহযোগীতা করেছেন এবং তার পক্ষে এলাকায় মিছিল করেছেন। এমনকি অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিতে নুসরাতকে হুমকীও দিয়েছেন।

গত শনিবার তাঁকে তারই মাদ্রাসার ছাদে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়৷ তাঁর শরীরের ৮০ ভাগেরও বেশি পুড়ে গেছে৷ এর আগে গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা তার এই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে যৌন হয়রানি করেন। ওই দিনই ছাত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার এবং তার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইনে মামলা হয়৷ ওই ছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার মামলায়ও অধ্যক্ষসহ আট জনকে আসামি করা হয়৷

মামলার এজাহারে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা করায় ছাত্রীটিকে অধ্যক্ষের পক্ষের লোকজন পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করে৷ এর আগে মামলা তুলে নিতে হুমকি দেয়া হয়েছে মেয়েটিকে৷

এই অধ্যক্ষ আগেও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন৷ তার বিরুদ্ধে আগেও যৌন হয়রানিসহ নানা অভিযোগে আরো ৬টি মামলা আছে বলে জানা গেছে৷

অধ্যক্ষকে রক্ষায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ

অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে তিন বছর আগে নানা অভিযোগে জামায়াত থেকে বহিষ্কার করা হয়৷ এরপর আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয়ে তিনি অধ্যক্ষের পদ টিকিয়ে রাখেন৷ জামায়াত থেকে বহিষ্কারের পর প্রথমে তিনি পৌর আওয়ামী লীগ নেতা ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ মামুনের সহায়তা নেন৷ এরপর মামুনকে বাদ দিয়ে তিনি আরেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাকসুদুর রহমানের সহায়তা নেন৷ মাকসুদ মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সদস্য৷

মাদ্রাসাটির মালিকানায় শহরে তিন তলা একটি মার্কেট আছে, যা থেকে মাসে তিন লাখ টাকা আয় হয়৷ এছাড়া মাদ্রাসার আরো অনেক আয় আছে৷

অধ্যক্ষের পক্ষে মিছিল করেছে ছাত্রলীগ

২৭ মার্চ যৌন হয়রানির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে অধ্যক্ষ জেলে গেলে পরের দিন ২৮ মার্চ তার মুক্তির দাবিতে শিক্ষার্থীদের একাংশকে দিয়ে মাকসুদ শহরে মিছিল বের করান৷ ওই মিছিলে মাদ্রাসা ছাত্রলীগের সদস্যরাও অংশ নেয়৷ মিছিল শেষে সমাবেশে যৌন হয়রানির মামলাকে মিথ্যা বলে দাবি করা হয়৷ আর তারাই ছাত্রীর পরিবারকে মামলা তুলে নিতে হুমকি দেয়৷ অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ নেতা মামুনও কিছু শিক্ষার্থীকে দিয়ে যৌন হয়রানির বিচারের দাবিতে মানববন্ধনের আয়োজন করেন৷ তবে কথা বলার জন্য তাদের কাউকেই টেলিফোনে পাওয়া যায়নি৷

অধ্যক্ষের পক্ষে অবস্থার নেয়ার অভিযোগ আছে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমীনের বিরুদ্ধেও৷ তিনি মাদ্রাসার গভর্নিং বডির ভাইস প্রেসিডেন্ট৷ তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘২৭ মার্চ যৌন হয়রানির পর আমিই মাদ্রাসায় গিয়ে ওসিকে খবর দিয়ে অধ্যক্ষকে আটক এবং মামলার ব্যবস্থা করি৷ তবে ওই ঘটনার পর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদ অধ্যক্ষের পক্ষে তার মুক্তির দাবিতে শহরের জিরো পয়েন্টে শিক্ষার্থীদের দিয়ে মিছিল করায়৷ আরেকজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর মামুন অধ্যক্ষের কিরুদ্ধে অবস্থান নেয়৷’

তিনি গভর্নিং বডির সহ-সভাপতি হিসেবে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে বলেন, ‘আমি উপজেলা নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম৷ আর সহ-সভাপতির তো কোনো পাওয়ার নেই৷’

রুহুল আমীন বলেন, ‘অধ্যক্ষ খারাপ মানুষ, তার বিরুদ্ধে আগেও যৌন হয়রানির অভিযোগ আছে৷ আর পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার আমি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই৷’

ইন্ধন ছিল ওসি ও গভর্নিং বডির

ছাত্রীর ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান ডয়চে ভেলের কাছে অভিযোগ করেন, সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনও অধ্যক্ষের পক্ষ নিয়েছিলেন৷ তিনি ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনাকে ‘নাটক’ বলে অভিহিত করেছিলেন৷ ‘আমার বোনের নিরাপত্তাহীতার কথা জানানোর পরও কোনো নিরাপত্তা দেয়া হয়নি’- বলেন তিনি৷

এদিকে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার পর ওসি প্রকাশ্যেই সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন যে, এটা আত্মহত্যার চেষ্টাও হতে পারে৷ তবে বুধবার তিনি ডয়চে ভেলের কাছে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন৷ তিনি দাবি করেন, ‘শনিবারের বিষয়টিকে আমি আত্মহত্যা চেষ্টার ঘটনা বলিনি৷ আর ২৭ মার্চ ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনাকেও আমি নাটক বলিনি৷ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছি৷’

ওসির বিরুদ্ধে মামলার এজাহার পরিবর্তনের চেষ্টারও অভিযোগ আছে৷ তিনি ছাত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার ঘটনার প্রতিবাদে যাতে কোনো মিছিল বের না হয় সেজন্যও তৎপর ছিলেন বলে অভিযোগ৷

ওসি অভিযোগ অস্বীকার করলেও বুধবার তাকে এইসব অভিযোগে বদলি করা হয়েছে৷ আর মামলার তদন্ত থানাকে বাদ দিয়ে ‘পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন’কে দেয়া হয়েছে৷

এদিকে মাদ্রাসার গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হলেন ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক টি কে এনামুল করিম৷ ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ গ্রেপ্তার হলেও তার বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি৷ ছাত্রীটিকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টার পর তড়িঘড়ি করে সোমবার অধ্যক্ষকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়৷ এর আগে ১০ দিনেও তার বিরুদ্ধে কেন বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হলো না জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক করিম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘আমি প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত ছিলাম৷ আর একটা ঘটনার পর এখন আমরা জানছি যে, আগেও অনেক অপরাধ করেছে, আগেতো জানতাম না৷’

ছাত্রীর নিরাপত্তার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ কেন নেয়া হয়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরাতো আসি আর যাই৷ আমাদের কাছে এত খোঁজ থাকেনা৷’

উৎসঃ ‌ডয়চে বেলে

আরও পড়ুনঃ নুসরাতের চলে যাওয়া নির্বাক মা, সুবিচার চাইলেন বাবা


নির্বাক মা শিরিন আক্তার। নিথর হয়ে পড়ে আছেন হাসপাতালের বিছানায়। আগুনে পুড়িয়ে মারা হলো তাঁর নয়নের মনি নুসরাত জাহান রাফিকে। বাবা আবু মুসা কিছুক্ষণ পরপর হাউমাউ করে কেঁদে উঠছিলেন। বলছিলেন, ‘আহা! আমার মেয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। ওরা আমার মেয়েকে আগুন দিয়ে পুড়ি মারল।’ছোট ভাই রায়হানের বুকফাটা কান্না। মুখে কোনো কথা নেই তাঁর। এমন দৃশ্য বুধবার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ(ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে।

তখন রাত ১১টা। ঠিক দেড় ঘণ্টা আগে(সাড়ে ৯ টা) মারা গেছেন নুসরাত জাহান। একমাত্র মেয়ের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পর অচেতন মা শিরিন। বার্ন ইউনিটের দুই তলা থেকে স্ট্রেচারে করে শিরিনকে নেওয়া হলো ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে। বাবা মুসা তখনো বার্ন ইউনিটের দুই তলায়। অনেকেই তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। মুসা শুধু বলছিলেন, আমার মেয়ের জীবন ওরা কেড়ে নিল। মেয়ে নুসরাতের জন্য দোয়া চাচ্ছিলেন তিনি। তখন নুসরাতের খালাতো বোন ফরিদা বলছিলেন, আর কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা নুসরাতের ভাই রায়হান হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। ছেলের কান্না দেখে বাবা মুসাও কাঁদতে থাকেন। আর বলছিলেন, ‘আমি বিচার চাই। ন্যায় বিচার চাই।’ মুসা তখন বার্ন ইউনিটের লিফট দিয়ে নিচে নামছিলেন। লিফটের ভেতরে মেয়ের নাম বলে কেঁদে ওঠেন। বলেন, ‘আমি সুবিচার চাই। আইনে যে শাস্তি আছে, সেই শাস্তি চাই।’ তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নুসরাতের খালাতো বোন ফরিদা বলে ওঠেন, ‘চাওয়া পাওয়া একটাই, সিরাজ উদ দৌলার ফাঁসি চাই। আর কিছু চাই না।’

রাত সাড়ে ১১টার পর গাড়িতে করে মুসা ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল চত্বর ছেড়ে যান। যাওয়ার আগে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার মেয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। আমি সুবিচার চাই।’ তখন নুসরাতের মাকে দেখা গেল অচেতন হয়ে পড়ে আছেন। নুসরাতের খালাতো বোন শান্তাসহ আরও দুজন তাঁকে পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করছিলেন। তখনো অচেতন তিনি। নুসরাতের খালাতো বোন শান্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘নুসরাতের মৃত্যু সংবাদ শোনার পর থেকে কোনো কথা বলছেন না খালা শিরিন আক্তার। ডাকে সাড়াও দিচ্ছেন না।’

যৌন নিপীড়নের অভিযোগে গত ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে মামলা করেন নুসরাতের মা। ছাত্রীর স্বজনদের অভিযোগ, মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় অধ্যক্ষের পক্ষের লোকজন নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। নুসরাতের পরিবারের লোকজনের অভিযোগ, সেদিন পরীক্ষার কেন্দ্র থেকে নুসরাতকে ডেকে নিয়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।। গত শনিবার গুরুতর আহত অবস্থায় ওই মাদ্রাসাছাত্রীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।

বুধবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ(ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন ঢামেক বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের চিকিৎসক অধ্যাপক রায়হানা আওয়াল।

এর আগে নুসরাতকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। তাঁর শরীরের ৭৫ শতাংশ আগুনে পুড়ে যায় বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসকেরা। নুসরাতের ফুসফুসকে সক্রিয় করতে গতকাল মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকদের পরামর্শে অস্ত্রোপচার করা হ‌য়।

বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জাতীয় সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন জানান, মৃত্যুর কারণ রক্ত ও ফুসফু‌সের মারাত্মক সংক্রমণ থে‌কে কা‌র্ডিও রেসপিরেটরি ফেইলিয়র (হৃদ্‌যন্ত্রে ক্রিয়া বন্ধ) হয়। এতেই মৃত্যু হয় তাঁর।

উৎসঃ ‌প্রথম আলো

আরও পড়ুনঃ নুরুদ্দিনকে অ্যারেস্ট করলে সব তথ্য বের হয়ে যাবেঃ নুসরাতের ভাই (ভিডিও সহ)


নুরুদ্দিনকে অ্যারেস্ট করলে সব তথ্য বের হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন নিহত ফেনীতে অগ্নিদগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির ভাই। এ ঘটনায় প্রিন্সিপাল ইন্ধন দিয়েছে।

তিনি বলেন, সে প্রিন্সিপাল হুজুরের পক্ষে তার মুক্তির জন্য মানববন্ধন করছে। ও আসলে জানে হুজুর কেমন। হুজুরের চাপে তার পক্ষে এসব করছে।

নিহত রাফির ভাই ঘটনা সম্পর্কে যুগান্তরকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, নুসরাতকে কুপ্রস্তাব নিয়ে ২৭ মার্চ মামলা হয়েছিল। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ৬ এপ্রিল ওর ওপর এমন হামলা হয়েছে।

ভিডিওঃ  ‘নুরুদ্দিনকে অ্যারেস্ট করলে সব তথ্য বের হয়ে যাবেঃ নুসরাতের ভাই (ভিডিও সহ) ’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

ঘটনা সর্ম্পকে তিনি বলেন, গত ৬ এপ্রিল আমাকে কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয় নাই। আমাকে ঢুকতে দিলে এ ঘটনা ঘটত না। নুসরাত পরীক্ষা হলে গেলে একটা মেয়ে বলে নিশাতকে ছাদে মারতেছে। এ ঘটনা শুনে নুসরাত ছাদে যায়। তবে ছাদে কেউ ছিল না। ওই সময়ে চারটা বোরকাপরা ব্যক্তি ছিল। তাদের হাতে গ্লাপস ছিল, চোখে চশমা ছিল এবং মুখে মুখোশ ছিল। তাদের মধ্যে দুজন কথা বলছে আর দুজন কথা বলেনি।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নিহত শিক্ষার্থী রাফির ভাই আরও বলেন, তারা বলছে বল হুজুরের বিরুদ্ধে যেসব কথা বলেছিস সেসব মিথ্যা। তখন রাফি বলে, না এটা সত্য। অন্যায়ের প্রতিবাদ করে যাব। ওদের মধ্যে একজন চম্পা না, কে ছিল। পরে তারা ওর গায়ে কেরোসিন দিয়ে আগুন দিয়েছিল। আমাকে ঢুকতে দেয়নি। আমার পরিচিত এক সহপাঠী ছিল, কাদের ভাই। তাকে বলছি নুসরাত ঠিকমতো বসছে কিনা? সে জানায় তার গায়ে আগুন লেগেছে। আমি মাদ্রাসার পাশে ছিলাম।

তিনি বলেন, যে পুলিশ মোস্তফা ভাই আমাকে ঢুকতে দেয় নাই। তারা আগুন নেভাচ্ছে। পরে তাকে বলি ভাই আপনারা যদি আমাকে ঢুকতে দিতেন তাহলে এমন ঘটনা ঘটত না।

কাকে ধরলে সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে এমন প্রশ্নের উত্তরে নিহত রাফির ভাই বলেন, প্রিন্সিপাল ইন্ধন দিয়েছে। নুরুদ্দিনকে অ্যারেস্ট করলে সব বের হয়ে যাবে। সে প্রিন্সিপাল হুজুরের পক্ষে তার মুক্তির জন্য মানববন্ধন করছে। ও আসলে জানে হুজুর কেমন। হুজুরের চাপে তার পক্ষে এসব করছে।

বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় মারা যান ফেনীতে অগ্নিদগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি।

এর আগে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয় কিন্তু তাতেও কোনো কাজ করছিল না।

নুসরাত জাহান রাফি সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রের আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন।

উৎসঃ ‌নয়াদিগন্ত

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here