এই ন্যক্কারজনক আচরণের অবসান চাই

0
160

২ সেপ্টেম্বর যুগান্তরের তৃতীয় পৃষ্ঠার একটি সংবাদ শিরোনাম ছিল, ‘ঝুলিয়ে পিটিয়ে মিথ্যা খুনের স্বীকারোক্তি আদায় করে ডিবি’। সংবাদটি পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। আবু সাঈদ নামক এক কিশোরের ‘কথিত অপহরণ ও হত্যা’ মামলায় সম্পূর্ণ নিরপরাধ ব্যক্তির সঙ্গে সরকারের একটি বিশেষ সংস্থার কিছু সদস্যের মধ্যযুগীয় নির্মম আচরণের রোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা আছে খবরটিতে।

কথিত খুনের অন্যতম আসামি আফজাল দেশের সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের কাছে তার জীবনের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে দাবি করেন, ২০১৪ সালে তিনি এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। একই বছর ১৬ এপ্রিল রাত সাড়ে ১২টায় ডিবি পুলিশ তাকে, তার বাবা, বড় বোন সোনিয়া, ছোট বোন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তানিয়া ও তার ফুপাতো ভাই সাইফুলকে আটক করে প্রথমে বরিশালের হিজলা থানায় নিয়ে যায়। আটক করার সময় জানানো হয়, অপহরণের মামলা আছে তাদের বিরুদ্ধে।

পরবর্তী সময়ে হিজলা থানা থেকে ঢাকার ডিবি অফিসে নিয়ে গিয়ে নির্মম নির্যাতন করে মিথ্যা অপহরণ ও খুনের স্বীকারোক্তি দিতে তাদের বাধ্য করা হয়। তার ভাষায়, ‘নির্যাতনের একেকটি দিন ছিল বিভীষিকাময়। অফিসের সিলিংয়ের হুকের সঙ্গে ঝুলিয়ে দুই হাত রশি দিয়ে বেঁধে পিটিয়েছে। রক্তে জামা লাল হয়ে গেছে। যে আসে সেই পেটায়। একজন পেটাতে পেটাতে হয়রান হয়ে গেলে আরেকজন এসে পেটাতে শুরু করে। একটা বেত ভেঙে গেলে আরেকটা বেত এনে পেটায়।’ যে পর্যন্ত না ১৬৪ ধারায় পুলিশের শেখানো জবানবন্দি দিতে রাজি হয়েছে, সে পর্যন্ত তাদের ওপর এ বর্বর নির্যাতন চলেছে।

আফজালের বর্ণনা যত না মর্মান্তিক, তারচেয়েও তার বোন সোনিয়ার ওপর শারীরিক এবং মানসিক টর্চার আরও করুণ ও হৃদয়স্পর্শী ছিল। সোনিয়া বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘ডিবি অফিসে নিয়ে আমাকে, আমার ভাই, বাবা ও ফুপাতো ভাইকে ভীষণ অত্যাচার করেছে। আমাকে নারী পুলিশ মারধর করেছে। মারধর করার সময় অপরাধ স্বীকার করে তাদের শেখানো ঘটনা উল্লেখ করে যেন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেই সে জন্য পুলিশ বারংবার আমার ওপর চাপ প্রয়োগ করেছে। আমি অস্বীকার করলে আমার এবং ছোট বোনের সামনেই পুলিশ ভাই ও বাবাকে বেদম মারধর করেছে। চেয়ারে মোটা রশি দিয়ে হাত-পা বেঁধে আমার বাবাকে খুব মেরেছিল। ‘পাঠক চোখ বন্ধ করে বর্ণিত ঘটনাটি একবার উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন, আপনার সামনে আপনার পিতা কিংবা ভাইকে যদি এমন করে পেটানো হয়, তাহলে আপনার মানসিক অবস্থার কী হবে? একজন অসহায়-নিরপরাধ ভুক্তভোগী নারীর জন্য এর চেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা আর কী হতে পারে? শুধু তাই নয়, তার বাবার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে পুলিশ সোনিয়াকে হুমকি দেয়, ‘তোর বাবাকে এক শর্তে ছাড়তে পারি, যদি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিস। তা না হলে তোর বাবাকে মেরে ফেলব।’ এমন এক অসহায় মুহূর্তে সোনিয়া শেষ পর্যন্ত বাবার জীবন বাঁচাতে পুলিশের শেখানো জবানবন্দি দিতে বাধ্য হয়। অথচ এ মামলায় সোনিয়ার বাবা তালিকাভুক্ত কোনো আসামি ছিলেন না। তদন্ত কর্মকর্তা সোনিয়ার ফুপাতো ভাই সাইফুলের মাথায়ও পিস্তল ঠেকিয়ে একই কায়দায় স্বীকারোক্তি আদায় করে। পরে পুলিশ ২০১৫ সালের ১৫ জুন সোনিয়া ও আফজালসহ চারজনের বিরুদ্ধে ৩০২ ধারায় অভিযোগপত্র দেয়। চারজনের মধ্যে আফজাল ৩৩ মাস, সাইফুল ২৪ মাস এবং সোনিয়া ৬ মাস কারাভোগ করে জামিনে মুক্ত হন। অথচ যাকে অপহরণ এবং খুনের দায়ে গত চার-পাঁচ বছর এতগুলো মানুষ পুলিশের নিষ্ঠুর শিকারে পরিণত হয়েছে, সেই আবু সাঈদ সম্প্রতি জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরে এসেছে।

গাজীপুরের অন্য একটি ঘটনায় মূল অভিযুক্তকে না পেয়ে তার বদলে স্ত্রীকে ধরে নেয়ার ঘটনাও অনভিপ্রেত। পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, ৭ আগস্ট গাজীপুরে এক মুমূর্ষু রোগীকে রমজান আলী নামক এক অটোরিকশা চালক তার অটোরিকশার ব্যাটারির চার্জ না থাকায় হাসপাতালে নিয়ে যেতে অস্বীকার করেন। ফলে অন্য কোনো বাহন পেতে কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হয়। অবশেষে হাসপাতালে নিয়ে যেতে যেতে রোগীর মৃত্যু হয়। এর জের ধরে শ্রীপুর থানার পুলিশ ওইদিন রাতে অটোরিকশা চালককে গ্রেফতার করতে বাড়ি গিয়ে তাকে না পেয়ে তার স্ত্রী, দুই বছরের দুগ্ধশিশুর মা আমেনা বেগমকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। অটোরিকশা চালক কিংবা তার স্ত্রী কারও নামেই থানায় কোনো মামলা বা অভিযোগ ছিল না। রমজান আলী পুলিশের কাছে ধরা না দিলে স্ত্রী আমেনা বেগমকে ছাড়া হবে না বলে হুমকিও দেয়া হয়। পুলিশ ভুক্তভোগী মহিলাটিকে সারা রাত থানায় আটকে রাখে। প্রশ্ন হল, দেশের কোন আইন কিছু পুলিশের এ অমানবিক আচরণকে জাস্টিফাই করে? সংবিধানের কোন ধারায় লেখা আছে অভিযুক্তকে না পেলে তার আত্মীয়স্বজন-আপনজনকে আটক করতে হবে? সংবাদপত্র খুললেই প্রতিদিন আমরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো না কোনো সদস্য দ্বারা সংবিধান প্রদত্ত নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণের ঘটনার খবর দেখতে পাই। এসব ঘটনা মানুষকে দিন দিন ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলছে।

বর্তমানে সাধারণ মানুষ যে কত অসহায়, উপরের পৃথক দুটো ঘটনা তারই প্রমাণ বহন করে। ঘটনা দুটো আমাদের ব্যথিত করে, মানসিক কষ্ট দেয়। আমরা প্রায়ই লক্ষ করি, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য নিয়ে গড়ে ওঠা আমাদের পুলিশ ফোর্সের কিছু সদস্যের এরূপ কর্মকাণ্ড সংগঠনের সবার জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। যেখানে ফোর্সের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ভাবমূর্তি রক্ষায় নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, সেখানে এ ধরনের ঘটনা সত্যিই দুঃখজনক। তদন্ত কর্মকর্তা যদিও বরাবরের মতো আফজালের দাবিকে অস্বীকার করেছেন; তবুও প্রশ্ন থাকে, মিথ্যা হত্যা মামলায় আফজালদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে জেলহাজতসহ বিগত চার বছরে যে মানসিক টর্চার করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা তার কী জবাব দেবেন? অবশ্য কথিত খুনের ঘটনায় পুলিশের এ ধরনের তদন্তের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে পুলিশ কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার কথা সাংবাদিকদের কাছে ব্যক্ত করেছেন।

কিছু পুলিশের এ ধরনের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। এ বছরের পুলিশ সপ্তাহে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কারও প্রতি নিষ্ঠুর, অমানবিক আচরণ ও নির্যাতন না করার জন্য পুলিশবাহিনীর সব সদস্যের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশের মাধ্যমেই পুলিশের কিছু কিছু সদস্য দেশের মানুষের সঙ্গে যে অন্যায় আচরণ করে, তা উঠে এসেছে। অথচ এসব বড় বড় অন্যায় কর্মকাণ্ডের জন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে হাতেগোনা দু-একটি ছাড়া দেশের সাধারণ মানুষের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যায়, এমন শাস্তি প্রদানের উদাহরণ নেই। বিচারহীনতার এ সংস্কৃতি ও দায়মুক্তি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। ফলে এ ধরনের বর্বর আচরণের ঘটনাও দিন দিন বেড়েছে। এ জন্য পুলিশ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভেতর এক ধরনের ভয় ও আতঙ্ক কাজ করছে। এ প্রসঙ্গে কিছুদিন আগে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটি (কমিটি অ্যাগেইনস্ট টর্চার, ক্যাট) আয়োজিত বাংলাদেশের মানবাধিকার সংক্রান্ত যে সভা অনুষ্ঠিত হয়, এখানে তা উল্লেখ করতে চাই। এ বছর বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জোট মানবাধিকার ফোরাম বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর একটি রিপোর্ট ক্যাটের জেনেভা অফিসে জমা দেয়। রিপোর্টে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্তে পাওয়া বাংলাদেশে পুলিশি হেফাজতে বা রিমান্ডে নির্যাতনের যেসব কৌশল প্রয়োগ করে, সেগুলোর বিবরণ উল্লেখ করা হয়। রিপোর্টে উল্লেখ আছে, হাত-পা বেঁধে শুইয়ে পায়ের তলায় পেটানো হয় যাতে আঘাতের চিহ্ন না দেখা যায়, ছাদের হুকে ঝুলিয়ে নির্বিচারে পেটানো, মুখে কাপড় গুঁজে নাকে-মুখে অনবরত পানি ঢেলে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেয়ার মতো অবস্থা তৈরি করা এবং ধাতুর তৈরি আংটি আঙুলে পরিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেয়া ইত্যাদি। উল্লেখ্য, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এক সভাও অনুষ্ঠিত হয় যেখানে আমাদের আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল যোগ দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে। সভায় বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন আইনমন্ত্রী। আমাদের আইনমন্ত্রীর বক্তব্য তারা কতটুকু গ্রহণ করেছেন, তা আমরা খবরের কাগজের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই জানতে পেরেছি।

গত কয়েক বছরে অত্যাচার, অনাচার, সন্ত্রাস, হত্যা, গুম, হামলা-মামলায় (ভূতুড়ে মামলা) মানুষের মনের ভেতর এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। মানুষ যখন দেখে, দেশে এমন কোনো অপরাধ নেই যার সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো না কোনো অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও সরকারের তরফ থেকে কঠোর বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও এর কোনো প্রতিকার হচ্ছে না, তখন স্বাভাবিক নিয়মেই মানুষের মনে ধারণা জন্ম নেয়, রাষ্ট্রের ক্ষমতার বাইরেও কিছু ক্ষমতাশালী লোক আছেন যারা ধরাছোঁয়ার বাইরে; কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক দেশে এমন চলতে পারে না। এ অদ্ভুত চর্চা বেশি দিন চলতে দেয়াও উচিত নয়।

এসবের প্রতিকারের জন্য সংশ্লিষ্ট সবার সদিচ্ছাই যথেষ্ট। কিন্তু প্রশ্ন থাকে, কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের সদিচ্ছার কথা যতই বলুক না কেন, দেশের মানুষ সেই সদিচ্ছা ও অনিচ্ছার পার্থক্য ভালোভাবেই বোঝেন। জনগণের এ ধারণাকে ভুল প্রমাণের জন্য দরকার বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা। এ ধরনের বাস্তবসম্মত পদক্ষেপই পারে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে। মনে রাখতে হবে, পক্ষপাতমূলক তদন্ত, মিথ্যা মামলায় হয়রানি, হেফাজতে রেখে নির্যাতনের অবসান না হলে মানুষের ভয়ের সংস্কৃতির অবসান হবে না।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

উৎসঃ যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ জিয়াউর রহমানকে ‘জাতীয়তাবাদের জাতির পিতা’ ঘোষণা করায় , তারেকের বিরুদ্ধে মামলা


সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের জাতির পিতা ঘোষণা করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই ঘোষণায় রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও মানহানির অভিযোগে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট নূরুল হুদা সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই মামলা দায়ের করেন। এতে বাদী হয়েছেন আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য আকরাম হোসেন বাদল।

মামলা দায়ের পর শুনানি শেষে সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ম্যাজিস্ট্রেট মিল্টন হোসেনের আদালত তারেক রহমানসহ মামলার তিন আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন।

এই মামলায় তিনি তারেক রহমানকে এক নম্বর আসামি, বিএনপির যুক্তরাজ্য শাখার সভাপতি শায়েস্তা চৌধুরী কুদ্দুসকে দুই নম্বর আসামি ও সাধারণ সম্পাদক কাওছার এম আহমেদকে তিন নম্বর আসামি করেছেন। পরে শুনানি শেষে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

অ্যাডভোকেট নূরুল হুদা জানান, ‘বাদী তার মামলায় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও মানহানির অভিযোগ এনেছেন। গত ১৮ আগস্ট লন্ডনে একটি অনুষ্ঠানে তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের জাতির পিতা জিয়াউর রহমান। সেই সঙ্গে দেশের সংবিধান নিয়েও তিনি কটূক্তি করেছেন, যা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল।’

তিনি আরও জানান, ‘আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সব নথি পর্যালোচনা করেছেন। মানহানির অভিযোগ আমলে নিয়ে আসামি তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন। একই সঙ্গে আগামী ১০ ডিসেম্বর এই মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ ধার্য করা হয়েছে। সেদিন রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগের বিষয়ে আদালত নির্দেশ দিতে পারেন।’

উৎসঃ ব্রেকিংনিউজ

আরও পড়ুনঃ সরকারের চাপে রওশনকে বিরোধী দলের নেতার পদ দিলেন কাদের!


এরশাদের জাতীয় পার্টিকে নিয়ে বিগত ১১ বছর ধরে খেলে আসছেন শেখ হাসিনা। এরশাদ ও তার দলটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে যখন যা খুশি তাই করেছেন। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত জাতীয় ছিল সরকারের শরিক দল। তখন সংসদে বিরোধীদল ছিল বিএনপি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে যখন বিএনপি-জামায়াত জোটসহ অন্যান্য দলগুলো অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তখন এরশাদও নির্বাচন থেকে সরে আসে। এরশাদের এই সিদ্ধান্তের পরই মাথা নষ্ট হয়ে যায় শেখ হাসিনার।

কারণ, জাতীয় পার্টি নির্বাচনে না আসলে বিরোধীদল হওয়ার মতো অন্য কোনো দল ছিল না। আর এ অবস্থায় নির্বাচন হলেও সেটা কারো কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। সেজন্য এরশাদকে নির্বাচনে আনতে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোক দিয়ে প্রচ- চাপ সৃষ্টি করা হয়। শেখ হাসিনার এই চাপ সহ্য করতে না পেরে এরশাদ তো একদিন নিজের পিস্তল দিয়ে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন।

এরপর এরশাদ যখন কোনোভাবেই নির্বাচনে আসতে রাজি হননি তখন তাকে অসুস্থ বানিয়ে জোর করে সিএমএইচে ভর্তি করলেন। এরশাদকে হাসপাতালে রেখে এদিকে রওশনকে বিরোধী দলের নেতা বানানোর লোভ দেখিয়ে তাকে ম্যানেজ করেন হাসিনা। আর বেকায়দায় পড়ে হাসপাতাল থেকে এরশাদও নির্বাচনে যেতে রাজি হয়। তবে স্বেচ্ছায় নয়, ডিজিএফআই জোর করে এরশাদের স্বীকারোক্তি নিয়েছিল ওই সময়।

এরপর থেকেই বিভক্ত হয়ে পড়ে এরশাদের জাতীয় পার্টি। রওশনকে বিরোধী দলের নেতা বানিয়ে এক গ্রুপ সরকারি হালুয়া রুটি খেতে শুরু করে আর অপর গ্রুপ এরশাদের পক্ষে থাকে। এরপর মঞ্জু হত্যা মামলা দিয়ে এরশাদকে মুলার মতো পাঁচ বছর ঝুলিয়ে রেখেছে হাসিনা। এরশাদ একটু নড়াচড়া করলেই হাইকোর্টে মঞ্জু হত্যা মামলার শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ করা হতো। এভাবেই ছলে বলে কৌশলে জাতীয় পার্টিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে শেখ হাসিনা।

এরপর গত ৩০ ডিসেম্বরের ভোটডাকাতির নির্বাচনে আওয়ামীলীগ জাতীয় পার্টি জোটবদ্ধ নির্বাচন করে। প্রথম দিকে বিএনপি সংসদে যোগ না দেয়ায় জাতীয় পার্টিকেই সরকার আবার বিরোধী দলের আসনে রাখে। এরশাদ হন বিরোধী দলীয় নেতা। এরশাদের মৃত্যুর পর দলটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়ে যান শেখ হাসিনা।

কারণ, এরশাদ জীবিত অবস্থায় তার ছোট ভাই জিএম কাদেরকে লিখিতভাবে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হবেন। আর জিএম কাদের সব সময় শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিলেন। তাই শেখ হাসিনার আশঙ্কা ছিল জিএম কাদের বিরোধী দলের নেতা হলে যেকোনো সময় কোনো সংকট সৃষ্টি করতে পারেন। এমনকি, প্রয়োজনে সংসদ থেকে বেরিয়েও যেতে পারেন। ভবিষ্যতে এমন ধরণের কোনো ঘটলে তখন সংসদ টিকিয়ে রাখাই শেখ হাসিনার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সরাসরি শেখ হাসিনার ইঙ্গিতেই সরকারের এজেন্ট হিসেবে পরিচিত আনিসুল ইসলাম মাহমুদ রওশন এরশাদকে বেআইনি চেয়ারম্যান ঘোষণা দিয়ে তাকে বিরোধী দলীয় নেতা করতে স্পীকারকে চিঠি দিয়েছিলেন। আর এক্ষেত্রে দূতিয়ালী করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। যদিও ওবায়দুল কাদের বলছেন যে, জাতীয় পার্টির সাম্প্রতিক ঘটনা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ নেই।

কিন্তু বাস্তবতা হলো-জাতীয় পার্টিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে শেখ হাসিনা এখন মরিয়ে হয়ে উঠেছিলেন। কারণ, দলটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে তিনি ভবিষ্যতে অশনিসংকেত দেখছেন।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, রওশনকে বিরোধী দলের নেতা করতে যা যা করার দরকার সরকার সবই করেছে। জাতীয় পার্টির দুই গ্রুপকে নিয়ে ডিজিএফআইয়ের অফিসে একাধিক মিটিংও হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত জিএম কাদেরকে মানতে বাধ্য করেছে ডিজিএ্ফআই। সরকারি সিদ্ধান্তের আলোকেই শনিবার রাতে সমঝোতায় আসেন জাপা নেতারা।

উৎসঃ অ্যানালাইসিস বিডি

আরও পড়ুনঃ ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সরঞ্জাম কেনাকাটায় ৪১ কোটি টাকার দুর্নীতি


ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ (ফমেক) হাসপাতালে আইসিইউর (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) রোগীকে আড়াল করে রাখার এক সেট পর্দার দাম পড়েছে ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা! শুধু এ পর্দা নয়, কলেজের বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনাকাটায় প্রায় ৪১ কোটি টাকার দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উঠে এসেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তদন্তে। ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে এসব সরঞ্জাম কেনাকাটা করা হয়। এ ব্যাপারে তদন্ত করতে সম্প্রতি দুদককে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দরপত্রের মাধ্যমে ২০১২-১৬ সাল পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্পে ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স অনিক ট্রেডার্স ফমেক হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ও মালামাল সরবরাহ করে। প্রতিষ্ঠানটি সরবরাহকৃত মালামালের দাম কয়েকগুণ বেশি নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অবিশ্বাস্য দামে ফমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ১৬৬টি চিকিৎসা যন্ত্র ও সরঞ্জাম কিনেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ২০১২-১৬ সাল পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্পে হাসপাতালটি ১১ কোটি ৫৩ লাখ ৪৬৫ টাকার মেডিকেল যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনাকাটা করে। এতে বিল দেখানো হয়েছে ৫২ কোটি ৬৬ লাখ ৭১ হাজার ২০২ টাকা। এ কেনাকাটাতেই মেসার্স অনিক ট্রেডার্স বাড়তি বিল দেখিয়েছে ৪১ কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার ৭৩৭ টাকা। বিষয়টি ওই সময়ের ফমেক কর্তৃপক্ষ কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে কাজ করলেও বিপত্তি বাধে সর্বশেষ ১০ কোটি টাকার একটি বিল নিয়ে। সর্বশেষ ১০ কোটি টাকার বিলটিতে চিকিৎসা সরঞ্জামাদিতে বেশি দাম নেয়া হয়েছে- এ মর্মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিলটি আটকে দেয়। এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স অনিক ট্রেডার্স ওই বিল পেতে হাইকোর্টে একটি রিট করে। এরপর বিষয়টি জানাজানি হলে ফরিদপুরসহ সারা দেশে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পর্দা ছাড়া আর যেসব সরঞ্জামাদি কেনা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ৩ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা দামের একেকটি স্টেথিস্কোপের জন্য খরচ করেছে ১ লাখ সাড়ে ১২ হাজার টাকা করে। ১০ হাজার টাকার ডিজিটাল ব্লাডপ্রেশার মাপার মেশিন কেনা হয় ১০ লাখ ২৫ হাজার টাকায়। অব্যবহৃত আইসিইউর জন্য অক্সিজেন জেনারেটিং প্ল্যান্টের দাম ৫ কোটি ২৭ লাখ টাকা। খোদ জাপান থেকে আনলেও এটার খরচ পড়বে সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা। বিআইএস মনিটরিং প্ল্যান্ট স্থাপনে ২৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। এমন প্ল্যান্ট স্থাপনে সর্বোচ্চ খরচ হয় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। এভাবে প্রায় ১৮৬ গুণ পর্যন্ত বেশি দাম দিয়ে ১৬৬টি যন্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে মেসার্স অনিক ট্রেডার্স। অথচ এ অনিক ট্রেডার্সই দুদকের কালো তালিকাভুক্ত।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের লাইন ডাইরেক্টর (হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো) ডা. সত্যকাম চক্রবর্তী শুক্রবার রাতে টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, এ বিষয়টি এখন একটি আইনি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে চলছে। উচ্চ আদালত দুদককে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তাই আইনি প্রক্রিয়ায় যেভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা সেভাবেই হবে। এর বাইরে কিছুই বলা সম্ভব নয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সর্বশেষ ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১০ কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ও মালামাল সরবরাহ করে মেসার্স অনিক ট্রেডার্স। ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর ফমেক হাসপাতালের স্টোর অফিসার মো. আ. রাজ্জাক স্বাক্ষর করে ১০ প্রকারের যন্ত্রপাতি ও মালামাল বাবদ ১০ কোটি টাকার সরবরাহ করা মালামাল বুঝে নেন। সরেজমিন দেখা যায়, দু-একটি যন্ত্রপাতি ছাড়া বেশিরভাগই তালাবদ্ধ ভবনের রুম, স্টোর রুম ও আলমারিতে রয়েছে। এগুলো গত কয়েক বছর অযতœ-অবহেলায় থেকে ধুলাবালি পড়ে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বৃহস্পতিবার সরেজমিন ফমেক হাসপাতালে দেখা যায়, ইউএসএর তৈরি ভিএসএ অনসাইড অক্সিজেন জেনারেটিং প্ল্যান্টটি আইসোলেশন ওয়ার্ডের পশ্চিম পাশে আলাদা একটি রুমে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এ রুমটি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকায় তালায় মরিচা পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। অবশেষে তালা ভেঙে রুম খোলার ব্যবস্থা করে কর্তৃপক্ষ। সেখানে দেখা যায়, বন্ধ রুমটির দেয়ালে শ্যাওলা পড়ে নোনা ধরে স্যাঁতসেঁতে অবস্থায় পড়ে রয়েছে ৫ কোটি ২৭ লাখ টাকা মূল্যের পুরো প্ল্যান্টটি। প্ল্যান্টটিতে সংযোগ দেয়া রয়েছে বড় আকারের বেশ কয়েকটি অক্সিজেন ভর্তি সিলিন্ডার। এগুলো অযতেœ পড়ে থেকে বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে।

আরও দেখা গেছে, ফমেক হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগে হসপিটাল সারটেইন সিস্টেম ফর আইসিইউ/সিসিইউ ১৬টি বেড পড়ে রয়েছে। এর পাশে ঘেরাও করার জন্য রয়েছে ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের রোগীকে আড়াল করার এক সেট (১৬ পিস) পর্দা। এ রুমের দায়িত্বে রয়েছেন সিনিয়র স্টাফ নার্স রিজিয়া আক্তার। তিনি যুগান্তরকে বলেন, প্রতিদিন এ রুমের তালা খুলে বেড ও যন্ত্রপাতি চালু করি এবং ঝেড়েমুছে আবার বিকাল হলে রুম বন্ধ করে চলে যাই। এভাবেই কয়েক মাস ধরে কাজ করছি।

জনবলের অভাবে এখনও আইসিইউ চালু করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান তিনি। ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ভ্যাকুয়াম প্ল্যান্টটি পুরনো ভবনের দন্ত বিভাগে স্থাপন করা হয়েছে। রুমটি বেশির ভাগ সময় তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকে। মাঝেমধ্যে রুমটি খুলে দেলোয়ার হোসেন নামের একজন ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন। এ প্ল্যান্টটিও পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ডিজিটাল ব্লাডপ্রেশার ৩টি যন্ত্র মেল মেডিসিন, সিসিইউ ও লেবার ওয়ার্ডে অনেকটা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

বিস মনিটরিং সিস্টেমটি কাগজপত্রে অপারেশন থিয়েটারে থাকার কথা থাকলেও সেখানে গিয়ে মেশিনটি দেখা যায়নি। থ্রি হেড কার্ডিয়াক স্টেথিস্কোপ ৪টি মেডিসিন ওয়ার্ড ও সিসিইউ কক্ষে প্যাকেটজাত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফাইবার অপটিক ল্যারিনোস্কোপ সেট ম্যাকিন্টোস ২টি গাইনি ও মেডিসিন ওয়ার্ডে রয়েছে। এছাড়া অটোমেটিক স্ক্রাব স্টেশন, স্যাকশন মেশিন ও ডাউন স্টিম ইকুইপমেন্ট অনেকটা চালু অবস্থায় রয়েছে বলে দাবি করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

সার্বিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ে দুর্নীতির বিষয়ে ফমেক হাসপাতালের পরিচালক কামদা প্রসাদ যুগান্তরকে বলেন, আমি মাত্র কয়েক মাস আগে এ হাসপাতালে যোগদান করেছি। আমি এ বিষয়ে তেমন কিছু জানি না। তবে শুনেছি, এ নিয়ে হাইকোর্টে রিট হয়েছে। আদালতের আদেশে দুদক তদন্ত করবে। তদন্তের পর বিষয়টি জানা যাবে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যন্ত্রপাতিগুলো বুঝে নেয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে এগুলো পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছি। যেন তাড়াতাড়ি আইসিইউ বিভাগসহ সব যন্ত্রপাতি চালু করা যায়।

এদিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের এক সেট পর্দা ৩৭ লাখ টাকা দিয়ে কেনার খবরের বিষয়ে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ২০ আগস্ট এ বিষয়টি ৬ মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে নির্দেশ দেন আদালত। বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের বেঞ্চ এ নির্দেশ দেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী খুরশীদ আলম খান যুগান্তরকে বলেন, আমরা জেনেছি। কিন্তু এ বিষয়ে লিখিত কোনো আদেশ শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পাইনি।

এ বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার জানান, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের একটি পর্দা ৩৭ লাখ টাকা দিয়ে কেনার খবরের বিষয়ে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ২০ আগস্ট এ বিষয়টি ৬ মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে নির্দেশ দেন আদালত। তিনি বলেন, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মূল্যায়ন কমিটিতে সরকারি কর্মকর্তা ও ডাক্তার ছিলেন। দুঃখজনক যে, এভাবে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে, এতে চিকিৎসাসেবার মানের যে বিষয় তা কখনই বাস্তবায়ন হবে না। এর আগে পাবনায় রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের গ্রিন সিটিতে বালিশ কিনতে খরচ দেখানো হয় ৬ হাজার টাকা। পরে তা গড়ায় আদালতে। এ বিষয়টি নিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনা ও ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য উঠেছিল।

রেলওয়ের কারিগরি প্রকল্পে ক্লিনারের বেতন মাসে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। আর অফিস সহায়কের বেতন প্রতি মাসে ৮৩ হাজার ৯৫০ টাকা। যেখানে ক্যাড অপারেটরের বেতন সাধারণত ৫০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা ধরা হয় সেখানে এই প্রকল্পে ধরা হয়েছে সোয়া লাখ টাকা।

আর বিদেশী পরামর্শকদের বেতন মাসে গড়ে ১৬ লাখ টাকা। এসব ব্যয়কে পরিকল্পনা কমিশন অত্যধিক ও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছে কার্যপত্রে। প্রকল্পে অত্যধিক পরামর্শক রাখা হয়েছে বলেও মন্তব্য করা হয়েছে। আর অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে দেশে লাগামহীন লুটপাট চলছে। দুর্নীতির বিচার ও শাস্তি না হওয়ায় লুটপাটের মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এসব এখনই কঠোর হাতে দমন করতে হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগে পাঠানো রেলওয়ের প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে প্রস্তুতিমূলক কারিগরি সহায়তায় ২৫৬ কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যয়ে কারিগরি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রকল্পে ব্যয়ের বেশির ভাগ অর্থাৎ ১৮০ কোটি ৫০ লাখ ২৯ হাজার টাকা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ঋণ হিসেবে নেয়া হবে। বাকি প্রায় ৭৬ কোটি টাকা হবে সরকারি অর্থায়ন। প্রকল্পের মূল কাজ হলো ১১টি উপপ্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ।

অর্থাৎ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বিস্তারিত ডিজাইন, দরপত্র ডকুমেন্ট প্রস্তুতসহ কিছু আনুষঙ্গিক কাজ। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য পরামর্শক থাকবে ১ হাজার ৫৩০ জন। এর মধ্যে বিদেশী পরামর্শক ১ হাজার ১৫৩ জন, স্থানীয় ৩৭৭ জন। ১৩ জন কর্মকর্তা, ১৮ জন জনবল এবং ৯ জন স্টাফ। তবে এই জনবল নিয়োগে কোনো ক্ষেত্রেই অর্থ বিভাগের জনবল কমিটির সুপারিশ কারিগরি প্রকল্প প্রস্তাবনায় (টিপিপি) পাওয়া যায়নি।

পরিকল্পনা কমিশনের কার্যপত্রে দেখা যায়, সহায়তা স্টাফদের জন্য বেতন ধরা হয়েছে আকাশচুম্বী; যা বিশ্বাসযোগ্য নয়। ক্লিনারের বেতন প্রতি মাসে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা, যা কোনো কোনো প্রকল্পে একজন বিদেশী পরামর্শকের বেতনের সমান বা বেশি। অফিস সহায়কের বেতন ধরা হয়েছে প্রতি মাসে ৮৩ হাজার ৯৫০ টাকা আর ক্যাড অপারেটরের বেতন মাসে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এসব ব্যয় অত্যধিক বলে পরিকল্পনা কমিশন বলছে।

প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনায় দেখা যায়, পরামর্শক সেবার মূল প্যাকেজটির মূল্য ২৩৮ কোটি ২১ লাখ টাকা। এর আওতায় সব কাজই করা হবে। সেবা ক্রয়ে মাত্র দুটি প্যাকেজ করা হয়েছে। সম্ভবত একটি ফার্মের মাধ্যমে এই কাজ করা হবে। প্রকল্পভুক্ত ১১টি উপপ্রকল্পের কাজ একক প্যাকেজের পরিবর্তে ৪ থেকে ৫টি প্যাকেজের মাধ্যমে করা উচিত বলে ভৌত অবকাঠামো বিভাগ থেকে বলা হয়েছে। প্রকল্পে ১৩ জন কর্মকর্তা প্রেষণে অতিরিক্ত দায়িত্বে কাজ করবেন। আরো ৫ জনকে নিয়োগ দেয়া হবে। এ ছাড়া ৯ জন স্টাফ আউটসোর্সিং হিসেবে নিয়োগ দেয়া হবে। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই জনবল কমিটির সুপারিশ টিপিপিতে সংযুক্ত করা হয়নি। প্রকল্পটি চলতি বছরের জুলাই থেকে আগামী ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।

ব্যয় বিভাজন পর্যালোচনা করে পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রকল্পে সব মিলে ১ হাজার ৫৩০ জন পরামর্শক রাখা হয়েছে। প্রকল্পে পরামর্শকের আধিক্য রয়েছে। আবার একই বিষয়ে দুই বা ততোধিক পরামর্শকের সংস্থান রাখা হয়েছে, যা অর্থের অপচয়। আন্তর্জাতিক পরামর্শকের বেতন প্রতি মাসে ২৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এই খাতে ব্যয় প্রতি মাসে গড়ে ১৬ লাখ টাকা। সম্প্রতি অনুমোদিত এডিবির সমজাতীয় প্রকল্পের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই ব্যয় যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। এসব আলোচনা করে কমিয়ে আনা প্রয়োজন। আবার পরামর্শক ব্যয়ের সাথে গাড়ি ভাড়া বাবদ ৪ কোটি ১৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। এই ব্যয়ের কোনো যৌক্তিকতা নেই বলেও ভৌত অবকাঠামো বিভাগ মন্তব্য করেছে।

যে ১১টি উপপ্রকল্পের জন্য এই কারিগরি প্রকল্প তার মধ্যে হলো- হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর বিদ্যমান রেলসেতুর সমান্তরালে নতুন একটি সেতু নির্মাণের জন্য বিশদ নকশাসহ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, আব্দুলপুর-রাজশাহী সেকশনে আরেকটি সমান্তরাল ব্রডগেজ লাইনের জন্য বিশদ ডিজাইনসহ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, সান্তাহার থেকে রোহনপুর নতুন ব্রডগেজ লাইনের জন্য বিশদ ডিজাইনসহ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, সান্তাহার-বগুড়া-কাউনিয়া-লালমনিরহাট সেকশনে বিদ্যমান মিটারগেজ লাইনকে ডুয়েলগেজ লাইনের জন্য বিশদ ডিজাইনসহ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত কর্ড লাইনের সমান্তরাল নতুন ব্রডগেজ লাইনের জন্য বিশদ ডিজাইনসহ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, যশোর থেকে বেনাপোল সমান্তরাল নতুন ব্রডগেজ লাইনের জন্য বিশদ ডিজাইনসহ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ইত্যাদি।

এই খরচের ব্যাপারে ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য শামীমা নার্গিসের সাথে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে মোবাইলে যোগাযোগ করে তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে রেল উইংয়ের যুগ্ম-প্রধান মো: মতিউর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি একটা মিটিংয়ে আছেন বলে জানান।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদের মতে, চোখ বন্ধ করে দুর্নীতি করা হচ্ছে। যেখানে প্রধানমন্ত্রী বলছেন দুর্নীতিতে জিরো টরালেন্স সেখানে তারা কিভাবে এবং কারা এভাবে দুর্নীতি করার সাহস পাচ্ছে। ক্লিনারের বেতন ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা কোনো মতেই হতে পারে না। এসব হলো চরম মাত্রায় দুর্নীতি। তিনি বলেন, এক সময় আমরা দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ছিলাম। সেখান থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। বিদেশ থেকে ঋণ এনে সেই টাকা এভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে অপব্যবহার করা হলে বিদেশীরা আমাদের সম্পর্কে খারাপ ধারণা করবে।

তিনি বলেন, যেখানে খুব দ্রুত আমরা উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার আশা করছি সেখানে এসব দুর্নীতি আমাদেরকে সেই প্রত্যাশা পূরণে বাধাগ্রস্ত করবে এবং করছে। এসব দুর্নীতি না থাকলে আমরা আরো আগেই মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হতে পারতাম। এই যে বালিশ দুর্নীতি, ৩৭ লাখ টাকায় পর্দার কাপড় কেনা এগুলো আমাদের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করছে।

ক্লিনারের বেতন সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এসবের ব্যাপারে কঠোরতম ব্যবস্থা নিতে হবে। যেটা না করার কারণে দুর্নীতির মাত্রা বেড়েই চলেছে। একজন ক্লিনারের বেতন মাসে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা এটা লুটপাট ছাড়া কিছুই না। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে এসব কী হচ্ছে? তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন খাতে যে দুর্নীতি ও অর্থের অপব্যবহার হচ্ছে তার কোনো বিচার ও শাস্তি হচ্ছে না। যার কারণে এসব কর্মকাণ্ড এখন লাগামহীনভাবে চলছে। এভাবে দেশ চলতে পারে না। জনগণের করের টাকা এবং জনগণের মাথায় ঋণের দায় চাপিয়ে দিয়ে বিদেশ থেকে ঋণ এনে তা এইভাবে লুটপাট ও তছরুপ করা হচ্ছে। এগুলোকে কঠোরভাবে দমন করা দরকার। যারা এসব করছে তাদের ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে এখনই।

উৎসঃ যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ দুর্নীতির আখড়া জাহিদ মালেকের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়!


মাত্র কিছু দিন আগে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঘটে গেল এক ভয়াবহ বালিশ কেলেংকারির ঘটনা। বালিশ, বিছানা চাদর, চায়ের কাপ, কেটলি, চেয়ার টেবিল, লেপ-তোষক কেনায় এমনই সীমাহীন দুর্নীতি ছিল যে, হাইকোর্টের বিচারপতিরা পর্যন্ত এসব শুনে অবাক হয়ে গেছেন। নজিরবিহীন এই দুর্নীতির ঘটনায় সরকারের ওপর মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল।

ভিডিওঃ  ‘ দুর্নীতিতে রূপপুর বালিশ কান্ডকে হার মানাল ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

কিন্তু, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৌশলে এই দুর্নীতির দায় বিএনপির ওপর চাপানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু, পরে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। মির্জা ফখরুল আসল গোমর ফাঁস করে দিয়েছেন।

বালিশ কেলেংকারির সেই রেশ কাটতে না কাটতেই আবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ঘটেছে বই কেলেংকারির ঘটনা। দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের জন্য বই কেনার নামে লুটপাট করা হয়েছে কোটি টাকা।

জানা গেছে, গোপালগঞ্জের শেখ সায়েরা খাতুন মেডিক্যাল কলেজের জন্য ১০টি বই কপি কিনেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। বইটির বাজারমূল্য সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা হলেও স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রতিটি বই কিনেছে ৮৫ হাজার ৫০০ টাকা করে। সেই হিসাবে ১০ কপি বইয়ের মোট দাম পরিশোধ করা হয়েছে ৮ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ, বাজার দামের তুলনায় ৮ লাখ টাকা বেশি খরচ করে এ বই কিনেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

শুধু এই একটি আইটেমের বই-ই নয়, দুটি টেন্ডারে ৪৭৯টি আইটেমের ৭ হাজার ৯৫০টি বই কিনেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এসব বইয়ের মূল্য বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৬ কোটি ৮৯ লাখ ৩৪ হাজার ২৪৩ টাকা।

রাজধানীর মুগদা মেডিক্যাল কলেজের জন্য ৩১৭টি আইটেমের ২৪৫৪টি বই ২ কোটি ৫০ লাখ ৯১ হাজার ২৮৫ টাকায় কেনা হয়েছে। এছাড়া, সারাদেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের জন্য ১৬২টি আইটেমের ৫৪৯৬টি বই কেনা হয়েছে ৪ কোটি ৩৮ লাখ ৪২ হাজার ৯৫৮ টাকায়।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এ বছরের ২৬ ও ২৭ মে বই কেনার জন্য পৃথক দুটি টেন্ডার আহ্বান করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। প্রথম টেন্ডারের প্রাক্কলিত মূল্য ধরা হয় পাঁচ কোটি টাকা ও দ্বিতীয়টির প্রাক্কলিত মূল্য ছিল ২ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ৪ কোটি ৩৮ লাখ ৪২ হাজার ৯৫৮ টাকায় প্রথম টেন্ডারের ওয়ার্ক অর্ডার পায় হাক্কানী পাবলিশার্স। আর ২ কোটি ৫০ লাখ ৯১ হাজার ২৮৫ টাকায় দ্বিতীয় টেন্ডারের ওয়ার্ক অর্ডারও পায় একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষে এসব বই কেনার দায়িত্বে ছিলেন উপ-পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) ডা. শেখ মো. মনজুর রহমান, শিক্ষা চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন বিভাগের লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল ইসলাম ও ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মোহাম্মদ শামীম আল মামুন।

৪৭৯টি আইটেমের বইয়ের মধ্যে দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে ৩০টি বইয়ের বাজার দাম যাচাই করেছে । বইয়ের বাজার দাম যাচাই করে দেখা গেছে, বইগুলো দ্বিগুণ, তিনগুণ কোনও ক্ষেত্রে ১৫ গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে।

সাতটি মেডিক্যাল কলেজের জন্য গ্রেজ অ্যানাটমি নামে ৯৫টি বই কেনা হয়েছে। বাজারে এই বইয়ের প্রতিটি কপির দাম ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা। কিন্তু একেকটি বই কেনার বিল করা হয়েছে ৪৩ হাজার টাকা করে। ৯৫টি বই কিনতে খরচ হয়েছে ৪০ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ বাজার মূল্যের চেয়ে অন্তত সাতগুণ বেশি দামে বইটি কিনেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

বার্ন অ্যান্ড লেভি ফিজিওলজি বইটির ৬৫টি কপি কেনা হয়েছে দেশের পাঁচটি মেডিক্যাল কলেজের জন্য। বাজারে বইটির দাম চার হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা। কিন্তু, মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিটি বই কেনা হয়েছে ২০ হাজার ৪৮০ টাকায়।

মুগদা মেডিক্যালের জন্য কেনা হয়েছে ‘অর্থোডোনটিক মেটারিয়াল সায়েন্টেফিক অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল অ্যাসপেক্টস’ নামে তিনটি বইয়। বাজারে বইটির দাম চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা হলেও কেনা হয়েছে ১৪ হাজার ১৭৫ টাকা করে।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্র্যাকটিক্যাল অপটামোলজি: ম্যানুয়াল ফর বিগেনার্স বইটি কেনা হয়েছে পাঁচ কপি। প্রতিটি বইয়ের বাজার মূল্য ২৯ হাজার টাকা। কিন্তু, প্রতিটি বই কেনা হয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৫০ টাকা করে।

‘অর্থোফিক্স এক্সটার্নাল ফিক্সেশন ইন ট্রমা অ্যান্ড অর্থোপেডিকস’ নামের বইটির ১০টি কপি কেনা হয়েছে মুগদা মেডিক্যালের জন্য। এ বইয়ের বাজার দর প্রতিটি ১৪ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা। কিন্তু প্রতিটি বই কেনা হয়েছে ৩৩ হাজার ৭৫ টাকা করে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখত বরাবরই দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে পরিচিত। কিছু দিন আগেই তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী আবজালের দুর্নীতির চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বিগত ১৫ বছরে ২৪ হাজার কোটি টাকার মালেক হয়েছেন। তার এই দুর্নীতি নিয়ে সারাদেশে হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু, এরপরও দুদকের চোখ ফাঁকি দিয়ে আবজাল দম্পতি দেশ থেকে পালিয়েছেন।

বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ওই সময় প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। জানা গেছে, এসব দুর্নীতির সঙ্গে তিনিও জড়িত আছেন। এখন তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী। দুর্নীতি এখন মন্ত্রণালয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছেছে। বিভিন্ন সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি বড় বড় কথা বললেও কার্যত দুর্নীতি বন্ধে তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

উৎসঃ অ্যানালাইসিস বিডি

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here