নুসরাত হত্যা: প্রশাসনের গাফিলতি আছে কিনা দেখতে ফেনী যাচ্ছে তদন্ত দল

0
83

মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যায় প্রশাসনের গাফিলতি ছিল কিনা তা তদন্তে খতিয়ে দেখতে পুলিশ সদর দফতরের পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত দল আজ রোববার ফেনী যাচ্ছে।

সকাল ১০টার দিকে তদন্ত কমিটির সদস্যরা সোনাগাজীর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার কথা রয়েছে।

কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি এসএম রুহুল আমিন। তদন্ত দলের বাকি তিন সদস্যের দুজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও একজন পরিদর্শক।

জানা গেছে, চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তের দায়িত্ব নেয়ার তিন দিন পর পিবিআইয়ের (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) প্রধান বনজ কুমার মজুমদার প্রাথমিক তদন্তের বিষয়গুলো উল্লেখ করে পুলিশ মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) একটি প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে সোনাগাজীর ওসিসহ স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমান কমিটিও ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনসহ প্রশাসনের কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখবে। তদন্ত শেষে আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারীর নির্দেশে গঠিত এ কমিটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন পেশ করবেন বলে পুলিশের একাধিক সূত্রে জানা গেছে ।

উল্লেখ্য, গত ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। মাদ্রাসার এক ছাত্রী সহপাঠী নিশাতকে ছাদের ওপর কেউ মারধর করেছে, এমন সংবাদ দিলে তিনি ওই ভবনের তিন তলায় যান।

সেখানে মুখোশধারী বোরকা পরিহিত ৪-৫ জন তাকে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়। সে অস্বীকৃতি জানালে গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

গত ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তার মৃত্যু ঘটে।

উৎসঃ ‌জাগোনিউজ

আরও পড়ুনঃ নুসরাতকে হত্যার জন্য টাকা দেন আ.লীগ নেতা মুকছুদ


মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে হত্যার মিশনে অংশ নেয়া ‘কেরোসিন’ ও ‘বোরকা’ সরবরাহকারীকে খুঁজছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

কিলিং মিশনে অংশ নেয়া পাঁচজনের মধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করা হলেও হত্যা মামলার অন্যতম আসামি শাহাদাত হোসেন শামীমের ভাগনিকে (চাচাতো বোনের মেয়ে) খুঁজছে পিবিআই।

রোববার রাতে নুসরাত হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার শাহাদাত হোসেন ও নুর উদ্দিন ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম জাকির হোসাইনের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ১১ ঘণ্টা ধরে ৫৭ পৃষ্ঠার জবানবন্দিতে ওই দিনের ঘটনার আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন তারা।

এদিকে, মঙ্গলবার কামরুন নাহার মনি ও জান্নাতুল আফরোজ মনি নামে নুসরাতের মাদরাসার দুই ছাত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পিবিআই।

নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীমের প্রায় ১১ ঘণ্টা ধরে দেয়া ৫৭ পৃষ্ঠার জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দেন। জবানবন্দিতে কিলিং মিশনে অংশ নেয়া শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন ও জোবায়ের আহম্মেদ, উম্মে সুলতানা পপির নাম উল্লেখ করলেও শাহাদাত হোসেন শামিমের ভাগনি কে এখনো তা নিশ্চিত করতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তা।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহ আলম বলেন, আসামিদের স্বীকারোক্তির আলোকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। নুসরাতের আরও দুই সহপাঠীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, হত্যার পরিকল্পনা অনুযায়ী উম্মে সুলতানা পপিই নুসরাতকে ডেকে নিয়ে আসেন। কিন্তু নুসরাতের সামনে তাকে কৌশল করে ‘শম্পা’ নামে ডাকেন তারা। এ কারণেই নুসরাত তার জবানবন্দিতে শম্পার কথা বলেছেন। উম্মে সুলতানাই যে ‘শম্পা’ সেটি জিজ্ঞাসাবাদে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এর আগে জবানবন্দিতে শাহাদাত হোসেন বলেছেন, নুসরাতকে হত্যার বোরকা কেনার জন্য সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মুকছুদ আলম তাদের ১০ হাজার টাকা এবং এক শিক্ষক পাঁচ হাজার টাকা দেন। এর মধ্যে পাঁচ হাজার টাকা তিনি নুর উদ্দিনকে দেন। আর তিনটি বোরকা কেনার জন্য তার চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে ও ওই মাদরাসার ছাত্রীকে দুই হাজার টাকা দেন।

ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়ে শাহাদাত হোসেন বলেছেন, ওই দিন সকাল ৮টার দিকে তিনি সোনাগাজী বাজারে আসেন। তখন তার চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে তাকে একটি পুরনো ও দুটি নতুন বোরকা দিয়ে যান। তিনি তাকে উম্মে সুলতানা পপির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সঠিকভাবে কাজ করতে বলে বাজারে কেরোসিন কিনতে যান। এক লিটার কেরোসিন কিনে তিনি ‘ডাবল পলিথিনে’ করে নিয়ে আসেন। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি ও মাদরাসাছাত্র জোবায়ের আহম্মেদ (২০) ও জাবেদ হোসেন (১৯) মাদরাসার সাইক্লোন শেল্টারের নিচতলার শ্রেণিকক্ষে বসেন। সকাল পৌনে ৯টার দিকে নুসরাতকে ডাকতে যান উম্মে সুলতানা পপি। তখন তারা নিচের শ্রেণিকক্ষ থেকে তৃতীয় তলার একটি কক্ষে এসে অবস্থান নেন। কিছুক্ষণ পর উম্মে সুলতানা ও নুসরাত ছাদে ওঠেন। তাদের পিছে পিছে ওঠেন তার (শাহাদাতের) চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে। এরপর তৃতীয় তলা থেকে তিনজন ছাদে যান।

ছাদে ওঠার পর উম্মে সুলতানা পপি প্রথমে নুসরাতকে মামলা তুলে নিতে বলেন। নুসরাত তখন নিশাতকে ছাদে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এরপর শাহাদাতের চাচাতো বোনের পালিত মেয়েও নুসরাতকে একই কথা বলেন। নুসরাত তখন জবাবে বলেছিলেন, ‘মামলা উঠাব না। আমার গায়ে কেন হাত দিল। আমি এর শেষ দেখেই ছাড়ব।’

নুসরাতের এমন জবাব শুনে পেছন থেকে এক হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরেন ও অন্য হাত দিয়ে হাত ধরেন শামীম। উম্মে সুলাতানা পপি তখন নুসরাতের পা ধরেন। আর শাহাদাতের চাচাতো বোনের পালিত মেয়ে নুসরাতের শরীর চেপে ধরেন। তিনজন মিলে নুসরাতকে তারা ছাদের মেঝেতে ফেলে দেন। ওই সময়টাতে উম্মে সুলতানাকে কৌশলে শম্পা বলে ডাক দেন তারা।

নুসরাতকে মেঝেতে শুইয়ে ফেলার পর জোবায়ের নুসরাতের ওড়না দুই টুকরো করে তার হাত ও পা বেঁধে ফেলেন। জাবেদ তখন নুসরাতের সারা শরীরে কেরোসিন ঢেলে দেন। এরপর শাহাদাতের চোখের ইশারায় জোবায়ের তার পকেট থেকে দেশলাই বের করে কাঠি জ্বালিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন। এরপর পাঁচজনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসেন। নামতে নামতেই তিনজন ছাত্র তাদের বোরকা খুলে জামার মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলেন। ছাত্রী দুইজন মাদরাসায় তাদের পরীক্ষার কক্ষে চলে যান। আর বাকি তিনজন নিজেদের মতো করে পালিয়ে যান।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিঁড়ি দিয়ে ওই পাঁচজন যখন নামছিলেন, তখন নুসরাতের আগুন, আগুন, বাঁচাও, বাঁচাও বলে চিৎকার তারা শুনতে পান। পা থেকে আগুন ধরানোয় প্রথমে নুসরাতের পায়ের বাঁধন খোলে। এরপর আগুন যখন ওপরে উঠে তার হাতের বাঁধন খুলে তখনই তিনি উঠে দৌড়ে নিচে নেমে আসেন। নুসরাতের মুখ শাহাদাত চেপে ধরায় সেখানে আর কেরোসিন ঢালা হয়নি। তাই পুরো শরীর পুড়লেও মুখে আগুন লাগেনি।

অধ্যক্ষের মুক্তি দাবির আন্দোলন ও বোরকা কেনার জন্য সোনাগাজী পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মুকছুদ আলম তাদের ১০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন বলেও শামীম জানিয়েছেন।

আলোচিত এ মামলায় এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ও পিবিআই। এদের মধ্যে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মুকছুদ আলম, শিক্ষক আবছার উদ্দিন, সহপাঠী আরিফুল ইসলাম, নুর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ জনি, মোহাম্মদ আলা উদ্দিন, শাহিদুল ইসলাম, অধ্যক্ষের ভাগনি উম্মে সুলতানা পপি, জাবেদ হোসেন, জোবায়ের আহম্মেদ, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন, মো. শামীম, কামরুন নাহার ও জান্নাতুল আফরোজ। এদের মধ্যে মামলার এজহারভুক্ত আটজনের মধ্যে সাত আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হাফেজ আবদুল কাদের নামে এজহারভুক্ত আরও এক আসামিকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পিবিআই।

গত ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। সেখানে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ১০ এপ্রিল (বুধবার) রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান অগ্নিদগ্ধ নুসরাত। পরদিন সকালে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের বুঝিয়ে দিলে বিকেলে সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

উৎসঃ ‌জাগোনিউজ

আরও পড়ুনঃ দুই খুনির লোমহর্ষক জবানবন্দি ঃ বেরিয়ে এলো সরকারীদলের প্রভাবশালীদের নাম


সোনাগাজী সিনিয়র ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আরো অন্তত ১৫ জন জড়িত ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত অন্যতম দুই আসামি নুরউদ্দিন ও শাহদাত হোসেন শামীম গত রোববার আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে এজাহারে বর্ণিত ঘটনা স্বীকার করে।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ঘটনায় জড়িত আরো অন্তত ১৫ জনের নাম উল্লেখ করেছে এই দুই আসামি। এর মধ্যে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনও ঘটনা জড়িত বলে আদালতকে জানায় নুরউদ্দিন ও শামীম। দুই আসামির এমন জবানবন্দির পর রোববার রাতেই রুহুল আমিন গা ঢাকা দেন বলে স্থানীয় কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে। তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে জানতে চেয়ে মুঠোফোন নম্বরে কল করলেও অপর প্রান্ত থেকে কল রিসিভ করেনি কেউ। তবে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা কারাগার থেকেই নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করেন। আর ঘটনার এক দিন আগে ৪ঠা এপ্রিল বিকালে ফেনীর জেলা কারাগারে দেখা করে নির্দেশনা বুঝে নেয় নুরউদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন।

নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নেয়া পাঁচজনের পরিচয়ও মিলেছে জবানবন্দিতে। এদের মধ্যে ছিল দুইজন নারী ও তিনজন পুরুষ। পাঁচজনের সবাই সোনাগাজী মাদরাসার শিক্ষার্থী। এজাহারে উল্লেখ করা ১৩ জনের বাইরে ঘটনায় জড়িত বেশিরভাগই সোনাগাজীর ওই মাদ্রাসার আলিম ও ফাজিল শ্রেণির শিক্ষার্থী। এছাড়া মাদরাসার কয়েকজন শিক্ষকও এমন নির্মম ঘটনায় মদত দিয়েছে বলেও আদালত ও তদন্ত সূত্রে জানা গেছে। অধিকতর তদন্তে এদের বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেলে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তাদের নাম অর্ন্তভূক্ত করা হবে বলে মামলার তদন্তকারী সংস্থার সূত্রে জানা গেছে।

গত রোববার বিকাল ৩টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা ধরে ফেনী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দিতে নুরউদ্দিন ও শামীম পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে। এর আগে ঢাকায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সদর দপ্তরে এজাহারভুক্ত আসামিসহ মোট ১৩ জন হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত বলে জানান পুলিশের এই ইউনিটের প্রধান বনজ কুমার মজুমদার। পিবিআইয়ের ফেনীর দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান রবিবার মধ্যরাতে সাংবাদিকদের জানান, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নুরউদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম অনেক তথ্য দিয়েছে। তারা হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে। অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাহর নির্দেশে তারা কীভাবে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল এবং তা বাস্তবায়নের জন্য কীভাবে কী করে তা বিস্তারিত বলেছে। পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, নুরউদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম আরও কিছু নাম বলেছে।

আমরা তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করছি না। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে বাকিদেরও গ্রেপ্তার করা হবে। তদন্ত সূত্র জানায়, ২৭শে মার্চ নুসরাতকে যৌন হয়রানির পর থানা ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করার দায়িত্বও নিয়েছিলেন রুহুল আমিন। যৌন হয়রানির মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাহ গ্রেপ্তার হওয়ার পর উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের নির্দেশে নুরউদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম অধ্যক্ষের মুক্তির জন্য আন্দোলন শুরু করে। এজন্য সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর মুকছুদ আলম তাদের ১০ হাজার টাকাও দিয়েছিল। এছাড়া মাদরাসার আরেক শিক্ষকও আন্দোলন ও নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার জন্য পাঁচ হাজার টাকা দেন। ঘটনায় জড়িত শিক্ষকদের মধ্যে আফসার উদ্দিনের নামও বলেছে প্রধান দুই আসামি। সরাসরি কিলিং মিশনে নেতৃত্ব দেয়া শাহাদাত হোসেন শামীম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানায়, নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়ার পর সে দৌঁড়ে নিচে নেমে উত্তর দিকের নিচু প্রাচীর টপকে পার হয়ে যায়। ঘটনার পর দুই মিনিটের মধ্যে নিরাপদ দুরত্বে গিয়ে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে কল করে বিষয়টি জানায় শামীম। উত্তরে রুহুল আমিন বলেন, আমি জানি। তোমরা চলে যাও। নুসরাতের শরীরে আগুন দিয়ে ভবন থেকে নেমে প্রথমেই শামীমের সাথে কথোপকথন হয় রুহুল আমিনের। কয়েক সেকেন্ডের ওই আলাপে ঘটনায় রুহুল আমিনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়।

উপজেলা আওয়ামী লীগের এই নেতার বিষয়ে শাহাদাত হোসেন শামীম বলেছে, নুসরাতের দায়ের করা মামলার পর রুহুল আমিন থানা ম্যানেজ করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এদিকে, প্রায় দেড় মাস আগে প্রেমের প্রস্তাব দিলে শামীমকে ফিরিয়ে দেয় নুসরাত। সে সময় শামীমকে অপমানও করা হয় বলে জবানবন্দিতে বলেছে সে। নুসরাতের প্রতি নিজের ক্ষোভ থাকার কথা উল্লেখ করে শাহাদাত হোসেন শামীম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছে, সে নিজেও নুসরাতের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল। এসব কারণে অধ্যক্ষ সিরাজের নির্দেশে অন্যদের সঙ্গে নিয়ে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। নুসরাত কিলিং মিশনে শামীম নেতৃত্ব দিলেও এতে অংশ নেয় আরো চারজন।

এদের প্রত্যেকেই সোনাগাজী মাদরাসার শিক্ষার্থী। শামীম ছাড়া বাকি চার জন হলো: অধ্যক্ষের ভাগ্নী উম্মে সুলতানা পপি, নুসরাতের সহপাঠী কামরুন্নাহার মনি, আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী জাবেদ এবং ফাজিল দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও শামীম-নুরউদ্দিনের বন্ধু জোবায়ের। এদের মধ্যে উম্মে সুলতানা পপি ও কামরুন্নাহার মনি নুসরাতের সহপাঠী। তারা দুজনেই সেদিন বোরকা, হাতমোজা ও দড়ি ম্যানেজ করে। আর উম্মে সুলতানা পপি নুসরাতকে ডেকে নিয়ে যায় ছাদে। পপি ও মনি মিলে শম্পা নামের ফাঁদ ফেলে। মূলত নুসরাত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করার জন্য নিজে থেকে নুসরাতের সামনে বার বার শম্পা নামটি বলার চেষ্টা করে পপি ও মনি। কিলিং মিশনে অংশ নেয়া প্রত্যেকে বিভিন্ন পরীক্ষায় অধ্যক্ষের কাছ থেকে আগেভাগে প্রশ্ন পেতো বলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছে শামীম।

এছাড়া, নানা সময় অনৈতিক সুবিধাও দিতেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা। আরেক আসামি নুূরউদ্দিন জানিয়েছে, তার সঙ্গে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার ভালো সম্পর্ক ছিল। এ কারণে তার নির্দেশে তারা পরিকল্পনা করে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ঘটনার সময় সে ভবনের নিচে ছিল। আর পরিকল্পনা অনুযায়ী উম্মে সুলতানা পপি গিয়ে নুসরাতকে ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে যায়। ওই সময় ছাদে কামরুন্নাহার মনি বোরকা পড়ে অপেক্ষায় ছিল। নুরউদ্দিন জানিয়েছে, অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা নানা সময়ে ছাত্রীদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের যৌন হয়রানি করতো। ফেনীর সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে গত ২৭শে মার্চ যৌন হয়রানি করেছিল ওই মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা। এ ঘটনায় নুসরাত থানায় অভিযোগ করলে অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এরপর থেকেই মাদরাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা তুলে না নেয়ায় নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। গত ৬ই এপ্রিল পরীক্ষার আগ মুহূর্তে মিথ্যা কথা বলে নুসরাতকে মাদরাসার ছাদে ডেকে নিয়ে গিয়ে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়া হয়। শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশ পুড়ে যাওয়ায় জীবনের সঙ্গে লড়াই করে হেরে যান নুসরাত। গত ১০ই এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পরদিন সোনাগাজীর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে সন্ধ্যায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় নুসরাতকে। এ ঘটনায় নিন্দার ঝড় উঠে সারাদেশে। জড়িতদের গ্রেপ্তারে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছে বিভিন্ন সংগঠন।

উৎসঃ ‌মানবজমিন

আরও পড়ুনঃ নুসরাত হত্যাকাণ্ড, ‘থানা ম্যানেজ করা’ আ.লীগ নেতা রুহুল আমিনের কাছে আমেরিকার ভিসা


মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দিয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আরো অনেকের জড়িত থাকার কথা শুনা যাচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিন।

রোববার মামলার অন্যতম দুই সন্দেহভাজন আসামি নুরুদ্দিন এবং শাহাদত হোসেন শামীম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। এতে তার নাম উঠে আসে।

সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া শাহাদাত জবানবন্দীতে জানান, নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর তিনি দৌঁড়ে নিচে নেমে উত্তর দিকের প্রাচীর টপকে বের হয়ে যান। এর মিনিট খানেকের মধ্যে নিরাপদ স্থানে গিয়ে রুহুল আমিনকে ফোনে আগুন দেওয়ার বিষয়টি জানান। তখন রুহুল আমিন বলেন, ‘আমি জানি। তোমরা চলে যাও।’

শাহাদাত বলেছেন, নুসরাতকে যৌন হয়রানির ঘটনায় করা মামলার পর রুহুল আমিন থানা ম্যানেজ করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এজন্য অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার পরিবারের কাছ থেকে টাকাও নিয়েছিলেন।

একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, মাদ্রাসা কমিটির সহ-সভাপতি ও আওয়ামী লীগের উপজেলা সভাপতি রুহুল আমিন ওরফে গুজা রুহুলের কাছে আমেরিকার ভিসা যুক্ত পাসপোর্ট রয়েছে। তিনি যাতে আমেরিকা পালিয়ে যেতে না পারেন, তাই তাকে পিবিআইয়ের গোয়েন্দারা কড়া নজরদারীতে রেখেছে।

রুহুল আমিনের উত্থান:

সোনাগাজী আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা জানান, আওয়ামী লীগের নাম ভাঙ্গিয়ে কিছু হাইব্রিড নেতাকে আওয়ামী লীগের নব্য নেতা বানিয়ে দেওয়ার কারণে আজ সোনাগাজী আওয়ামী লীগ কঠিন পরীক্ষায় পড়েছে। দলের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, তাকে হঠাৎ করে আওয়ামী লীগের উপজেলা সভাপতি করে দেওয়া হলো। রুহুল আমিন সম্পর্কে বলতে গিয়ে নেতারা আরো বলেন, তার বাড়ি হলো মধ্যম চর চান্দিয়া কুচ্চাখোলা গ্রামে। তার বাবা কোরবান আলী।

পাকিস্তান আমলে কোরবান আলী জাহাজে চাকরি নেয়। চাকরির সুবাদে তিনি সিডিসি (নলি) নিয়ে দেশ-বিদেশ ঘুরার সুযোগ পান। আমেরিকা পোর্টে জাহাজ ভিড়লে গভীর রাতে কোরবান আলী জাহাজ থেকে পানিতে লাফ দিয়ে পড়ে পালিয়ে ডাঙ্গায় উঠে। এরপর তার ভাগ্যের চাকা খুলতে থাকে। দীর্ঘদিন আমেরিকায় কাজ করে দেশ থেকে তার পরিবার পরিজনের সবাইকে সেখানে নিয়ে যায়।

উৎসঃ ‌ইত্তেফাক

আরও পড়ুনঃ নুসরাত হত্যা প্রমাণ করে নারীদের রক্ষায় সরকার ব্যর্থ হয়েছে: এইচআরডব্লিউ


আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক পরিচালক মীনাক্ষি গাঙ্গুলি বলেছেন, ‘যৌন নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার কতটা ব্যর্থ তা ফুটে উঠেছে নুসরাত জাহান রাফি হত্যার মাধ্যমে।’

তিনি বলেন, ‘এই হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে যৌন নির্যাতনের শিকার নারীদের বিষয়ে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে কথাটি জোরালো হয়ে উঠেছে। একইসঙ্গে নির্যাতিতরা নিরাপত্তার সঙ্গে যেন আইনগত সমাধান পান সে বিষয়টিও সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। তাদেরকে প্রতিশোধের শিকার হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।’

এইচআরডব্লিউ এর নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংগঠনটির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক পরিচালক মীনাক্ষি গাঙ্গুলির এসব বিবৃতি দেয়া হয়েছে।

ওই বিবৃতিতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যার মূল আসামি অধ্যক্ষ সিরাজসহ জড়িতদের বিচার চেয়ে এ ঘটনায় দ্রুত পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছে সংস্থাটি।

বিবৃতিতে মীনাক্ষি গাঙ্গুলি বলেন,‘ন্যায়বিচার চাওয়াতে সাহসী মেয়ে নুসরাতকে অত্যান্ত বর্বরোচিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।’

এ ঘটনায় অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এর দায়িত্বহীনতার বিষয়টিতেও নজর দিয়েছে সংস্থাটি। সংস্থাটি বলছে, গত ২৭ শে মার্চ নুসরাত যখন পুলিশে অভিযোগ করতে যান, তখনকার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তাকে বলছেন, ঘটনাটি তেমন বড় কিছু নয়। এর পরপরই অভিযুক্তের সমর্থকরা নুসরাতকে মামলা তুলে নেয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমে দেয়া নুসরাতের ভাইয়ের বক্তব্য তুলে ধরেছে সংস্থাটি।

নুসরাতের ভাই বলেছিলেন, ৬ই এপ্রিল হামলার পর নুসরাত তার পরিবারকে বলেছেন, হামলাকারীরা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নেয়ার দাবি জানিয়েছে। এতে রাজি না হওয়ায় নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে তারা।

কেন হত্যা করা হয়েছে নুসরাত জাহান রাফিকে? আর হত্যার জন্য আগুনই বা কেন বেছে নেয়া হলো, এই প্রশ্নগুলো তুলে ধরা হয়েছে সংস্থাটি থেকে।

এই হত্যার তদন্তকারী সংস্থা বলছে, দুটি কারণে নুসরাতকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রথমত, শ্লীলতাহানির মামলা করে অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করিয়ে নুসরাত আলেম সমাজকে ‘হেয়’ করেছেন। দুই. আসামি শাহাদাত নুসরাতকে বারবার প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু নুসরাত তা গ্রহণ না করায় শাহাদাতও হত্যার পরিকল্পনা করেন।

পিবিআইপ্রধান বনজ কুমার মজুমদারের তথ্য মতে, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৩ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাসহ আটজন গ্রেফতার রয়েছেন। বাকি আরও অনেকের নাম উঠে আসতে পারে।

নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার পেছনের কারণ হিসাবে তিনি জানিয়েছেন, হত্যার পরিকল্পনাকারীরা ২০১৬ সালে নুসরাতের চোখে চুন মেরেছিল। তখন মেয়েটির হাসপাতালে চিকিৎসা হয়।

এরপর ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজ নুসরাতকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। সেসব ঘটনাই স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তারা সামাল দিয়েছিল। এবারও নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার পর পরিস্থিতি মোকাবিলা করে পার পেয়ে যাবেন ভেবেছিলেন নুর উদ্দিন, শাহাদাত ও অধ্যক্ষ সিরাজ।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ নুসরাত হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হাফেজ মানিক: পরিবার নিয়ে উধাও


ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হাফেজ আবদুল কাদের মানিক পরিবার নিয়ে পালিয়েছে।

আবদুল কাদেরকে গ্রামের মানুষ মানিক নামেই চিনত। সে আমিরাবাদ ইউনিয়নের পূর্বসফরপুর গ্রামের মনছুর খান পাঠান বাড়ির আবুল কাসেমের ছেলে। তার বাবা সাহেবের হাটের চা দোকানি। ৪ ভাই তিন বোনের মধ্যে হাফেজ আবদুল কাদের ৫ নম্বর।

তার বাবা স্থানীয় আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মী হলেও হাফেজ আবদুল কাদের শিবিরের রাজনীতিতে সরাসরি জড়িত।

আরেক ভাই বর্তমানে প্রবাসে রয়েছে। তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কাদের সোনাগাজী ইসলামীয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষক ও ফাজিল দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তিনি অধ্যক্ষ সিরাজের অনুগত হিসেবে মাদ্রাসার হোস্টেলে থাকতেন।

নুসরাত হত্যাকাণ্ডে নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম তাদের স্বীকারোক্তিতে আবদুল কাদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। ঘটনার দিন হাফেজ আবদুল কাদের গেট পাহারার দায়িত্বে ছিল এবং ঘটনার আগের দিন ৫ এপ্রিল খুনের পরিকল্পনার বৈঠকে ছিল মানিক। গ্রেফতারকৃত আসামিরা তার হোস্টেলে বৈঠক হওয়ার কথা জানিয়েছেন।

৭ এপ্রিল মালামাল নিয়ে হোস্টেল ত্যাগ করে হাফেজ আবদুল কাদের। পরদিন ৮ এপ্রিল তার গ্রামের বাড়িতে ছিল। মামলাটি পিবিআইতে স্থানান্তরের খবর জানতে পেরে বাড়ি ত্যাগ করে আত্মগোপনে চলে যায় আবদুল কাদের মানিক।

১২ এপ্রিল ঘটনার রহস্য উদঘাটনের পর আবদুল কাদেরের নাম আসায় ওই দিন বিকালেই বসতঘরে তালা লাগিয়ে পালিয়ে যান আবদুল কাদেরের বাবা-মা ও পরিবারের সব সদস্যরা।

তার এক ভাই দিনমজুর, একভাই মালদ্বিপ ও এক ভাই ঢাকায় একটি কারখানায় চাকরি করেন। তিন বোন বিবাহিত। আবদুল কাদের অবিবাহিত। বাড়ির লোকজনদের সঙ্গেও রয়েছে তার পরিবারের সদস্যদের বিরোধ।

৬ শতক জমির মধ্যে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করে নির্দিষ্ট সীমানায় বসবাস করছে তার পরিবার। কয়েক মাস আগে ব্র্যাক থেকে কিছু টাকা ঋণ নিয়ে ও আবদুল কাদেরের উপার্জনের টাকা দিয়ে বসতঘরের চারপাশে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়। কাদেরের সেই টাকার উৎস নিয়েও এলাকাবাসীর মাঝে নানা সন্দেহের সৃষ্টি হয়।

স্থানীয় যুবলীগ নেতা আজগর হোসেন ও জসিম উদ্দিন জানান, আবদুল কাদেরের আচরণ সন্দেহজনক ছিল। গ্রামবাসীও সোচ্চার হয়েছেন। কাদেরকে দেখামাত্র আটক করে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করা হবে। তার বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যরা আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে। পিবিআই এজাহারভুক্ত ৮ জন আসামির মধ্যে ৭ আসামিসহ ১৬ জন সন্দেহভাজন আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হলেও শুধুমাত্র আবদুল কাদেরকে গ্রেফতার করতে পারেনি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর পরিদর্শক মো. শাহ আলম জানান, আবদুল কাদেরকে ধরতে পুলিশ একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে। বর্তমানেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অতিশীঘ্রই তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হবে।

উল্লেখ্য, ৬ এপ্রিল শনিবার সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যায় নুসরাত জাহান রাফি। মাদ্রাসার এক ছাত্রী সহপাঠী নিশাতকে ছাদের ওপর কেউ মারধর করেছে এমন সংবাদ দিলে নুসরাত ওই বিল্ডিংয়ের তিনতলায় যান। সেখানে মুখোশপরা ৪-৫ জন ছাত্রী তাকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়। এ সময় নুসরাত অস্বীকৃতি জানালে তারা গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায় মুখোশধারীরা।

এ ঘটনায় সোমবার রাতে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা ও পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমসহ ৮ জনের মান উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন অগ্নিদগ্ধ রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।

এর আগে ২৭ এপ্রিল ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাকে আটক করে পুলিশ। সে ঘটনার পর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।

এদিকে টানা পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গত ১০ এপ্রিল বুধবার রাত ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান অগ্নিদগ্ধ নুসরাত জাহান রাফি। পরদিন সকালে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ স্বজনদের বুঝিয়ে দিলে বিকালে সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ ঘরে তালা দিয়ে লাপাত্তা অধ্যক্ষ সিরাজের পরিবার গা ঢাকা দিয়েছে!


ঘরে তালা দিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যার প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার পরিবার। ফেনী শহরের পাঠানবাড়ী এলাকার মকছুদুর রহমান সড়কের ‘ফেরদৌস মঞ্জিল’ নামে দোতলা বাড়িটি অধ্যক্ষ সিরাজের। রোববার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায় বাড়িটি তালাবদ্ধ।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ৭ থেকে ৮ বছর আগে ২০ লাখ টাকায় সাড়ে চার শতক জমি ক্রয় করেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা। প্রথমে টিনশেড বাসা ছিল। তিন বছর আগে দোতলা পাকা দালান করেন প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে। ৬ তলা ফাউন্ডেশনের ওপর দোতলা বাড়ি। ওই ভবনের দোতলার রাস্তা লাগোয়া বড় ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন তিনি। কয়েকদিন আগে ঘরে তালা দিয়ে গা ঢাকা দেন পরিবারের সদস্যরা। তারা কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে থাকতে পারেন বলে ধারণা প্রতিবেশীদের।

অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার ফ্ল্যাটের সামনে মুখোমুখি ফ্ল্যাটে বসবাস করেন ফেনী সদরের ফাজিলপুরের মো. ইব্রাহিম। স্ত্রী আর মেয়ে নিয়ে ওই ভবনের দোতলার একটি ফ্ল্যাটে থাকেন তিনি। ইব্রাহিম জানান, ৪ থেকে ৫ দিন আগে ওই বাড়ির লোকজন তালা দিয়ে চলে গেছেন। তবে তারা কোথায় গেছেন-তা বলতে পারেননি ষাটোর্ধ্ব এই প্রতিবেশী।

তিনি বলেন, আমরা আসলে এতো কিছু জানতাম না। বাইরে থেকে তাকে সাধারণ বলেই মনে হত। এখন টিভির খবরে আর পত্রিকায় দেখে ওনার সম্পর্কে জানতে পারছি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আশপাশের কয়েকজন বাড়ির মালিক ও বাসিন্দা বলেন, মাঝে মাঝে তাকে দেখতাম। সকালে বেরিয়ে রাতে ফিরতেন। বিভিন্ন সময় তার ব্যাপারে অনেক অভিযোগ শুনেছি। তার পরিবারে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

তারা বলেন, এখন তার এসব অপকর্মের কথা জেনে আমরা প্রতিবেশী হিসেবে লজ্জিত ও বিব্রত। তাদের মতে, ফেনী শহরের পাঠানবাড়ী রোড ও মকছুদুর রহমান সড়কে জামায়াত কেন্দ্রিক একাধিক প্রতিষ্ঠানের অংশীদার ছিলেন এই সিরাজ। নানাভাবে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি আর্থিকভাবে লাভবানও হন। এসব খাত থেকে পাওয়া অর্থে প্রায় ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে দোতলা বাড়ি তৈরি করেন তিনি।

সোনাগাজীর ৮নং আমিরাবাদ ইউনিয়নের চর কৃষ্ণজয় গ্রামে অধ্যক্ষ সিরাজের বাড়িতে গিয়েও দেখা যায় তার ঘরে তালা। বাড়ির সামনে পুলিশ পাহারা বসানো হয়েছে। সোনাগাজী মডেল থানার এসআই কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে চার পুলিশ সদস্য সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন।

অধ্যক্ষ সিরাজের ভাবি (বড় ভাইয়ের স্ত্রী) হাছিনা আক্তার বলেন, সিরাজ উদ দৌলার বাড়িতে একটি ঘর থাকলেও এখানে কেউ থাকেন না। তিনি বাড়িতে খুব কম আসেন। পরিবার নিয়ে থাকেন ফেনীর পাঠানবাড়ীতে।

তিনি বলেন, মেয়েটার (নুসরাত) জন্য খুব কষ্ট পাচ্ছি। আমার দেবর যদি এ ঘটনায় দোষী হন তাহলে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

সিরাজ-উদ-দৌলার গ্রামের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. গোলাম কিবরিয়া শামীম বলেন, আমাদের গ্রামটি খুব শান্তিপূর্ণ। একটি ঘটনায় পুরো গ্রাম কলঙ্কিত হয়ে গেছে। আমরা নুসরাত হত্যার কঠিন শাস্তি দাবি করছি।

উৎসঃ ‌জাগোনিউজ

আরও পড়ুনঃ একরামুল হত্যার বিচার হয়নি, নুসরাত হত্যার বিচার হবে কি ? (ভিডিও সহ)


ফেনীর মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত হত্যার বিচারের দাবিতে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ-মানববন্ধন চলছে। নির্মম হত্যাকাণ্ডের এ ঘটনায় ক্ষোভে ফুসছে সারাদেশ। হত্যাকারীদের কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় প্রতিদিনই বলছেন-নুসরাতের হত্যাকারীদের কঠোর শাস্তি দেয়া হবে। অপরাধীরা ছাড় পাবে না।

প্রধানমন্ত্রীর বার বার কঠোর শাস্তির কথা বললেও আসলে নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত সেসব অপরাধীদের বিচার কি হবে? গত দুইদিন ধরে এমন প্রশ্নই শুনা যাচ্ছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মুখে মুখে। তারা বলছেন, জনগণের চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী পরিস্থিতি সামাল দিতে একটু কঠোরতা দেখাচ্ছেন। সর্বোচ্চ বিচার প্রথম অবস্থায় হয়তো কয়েকজন গ্রেফতার হবে। এরপরই সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিছুদিন পর ঘুরে যাবে তদন্তের মোড়। প্রকৃত দোষীরা জেল থেকে বেরিয়ে আসবে আর কিছু নির্দোষ মানুষ আবার নতুন করে জেল খাটবে।

ভিডিওঃ ‘ব্রেকিং নিউজঃ পিবিআই’র তদন্তে বেরিয়ে এলো নুসরাত ঘটনার চাঞ্চল্যকর সব তথ্য! (ভিডিও সহ)’


[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

সাধারণ মানুষের এসব এসব প্রশ্ন তোলার পেছনে যৌক্তিক কারণও রয়েছে। অতীতে দেখা গেছে, এই ফেনীতেই উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হককে আগুনে পুড়িয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল আওয়ামী লীগ নেতা নিজাম হাজারী। নুসরাতের চেয়ে সেই ঘটনাটা আরও বেশি নির্মম ও হৃদয় বিদারক ছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত নির্মম এই হত্যাকা-ের বিচার হয়নি। একরাম হত্যার ঘটনা নুসরাতের চেয়েও আরও বেশি তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। শেখ হাসিনা তখনও আজকের মতো প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু বিচারের মুখ আজ পর্যন্ত দেশবাসী দেখতে পায়নি।

একইভাবে নুসরাত হত্যায় যারা ইন্ধনদাতা তারা সবাই স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সোনাগাজীর সেই মাদরাসা শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম, যুবলীগ নেতা সাবেক ছাত্র নুর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন, জোবায়ের আহম্মদ, হাফেজ আবদুল কাদের এবং সোনাগাজী পৌর কাউন্সিলর মকসুদুল আলম ও প্রভাষক আবছার উদ্দিনের পক্ষে সাফাই গাইতে মাঠে নেমেছে প্রভাবশালী একটি গ্রুপ। ইতিমধ্যে তারা রাজনৈতিক নেতাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধর্নাও দিচ্ছেন।

ভিডিওঃ  শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করবোঃ নুসরাত (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

আওয়ামী লীগ নেতারা তাদেরকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, পরিবেশ এখন ঘোলাটে। এখনই কোন তদবীর চলবে না। পরিবেশ একটু ঠান্ডা হলে তারা তদবীরে নামবে বলে জানিয়েছেন।

স্থানীয়রা বলছেন, অপরাধীদের ফাসিই হলো নুসরাত হত্যার একমাত্র বিচার। কিন্তু সেটাতো আর হবে না। কারণ, আকাশের তারার চেয়েও আইনের ধারা বেশি। প্রকৃত দোষীরা একদিন আইনের ফাক দিয়েই বেরিয়ে আসবে।

উৎসঃ ‌অ্যানালাইসিস বিডি

আরও পড়ুনঃ টাকার দাপটে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক চক্রকে ম্যানেজ করে চলতেন সিরাজ (ভিডিও সহ)


সোনাগাজী সিনিয়র ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার মূল হোতা অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দৌলার যৌন হয়রানি ও নানা অপকর্মের কথা জানতেন মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা। তবে টাকার দাপটে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক চক্রকে ম্যানেজ করে চলতেন সিরাজ।

এই চক্রের ভয়ে তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পেতেন না শিক্ষক ও অভিভাবকরা। নানা সময়ে অভিযোগ করলেও ম্যানেজ হয়ে যেত প্রশাসন, উল্টো বিপদে পড়তেন অভিযোগকারীারা। গত কয়েক দিনে মাদরাসা শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্য ও স্থানীয় জনগণের সাথে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে। মাদরাসার তিন তলা মার্কেট, পুকুর, নানা অনুদান-তহবিল এবং ওয়াজ মাহফিল থেকে বছরে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন অধ্যক্ষ। অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের সুবিধার লোভ দেখিয়ে ভেড়াতেন নিজের দলে।

ভিডিওঃ ‘ব্রেকিং নিউজঃ পিবিআই’র তদন্তে বেরিয়ে এলো নুসরাত ঘটনার চাঞ্চল্যকর সব তথ্য! (ভিডিও সহ)’


[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

২০০১ সালে শতবর্ষী এই মাদ্রাসায় উপাধ্যক্ষ পদে যোগ দেবার পর থেকে নানা সময়ে জেলা প্রশাসনের কাছে যৌন হয়রানি, অর্থ আত্মসাৎ ও হত্যার হুমকির মতো অভিযোগ জমা হয় তার বিরুদ্ধে।

তবে, মাদরাসার তহবিলের টাকা নয়ছয় করে অর্থের জোরে ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদ ও স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ফেলতেন সিরাজ উদ দৌলা। সবশেষ গত ২৭ই মার্চ নুসরাতকে যৌন হয়রানি এবং ৬ই এপ্রিল আগুনে পোড়ানোর পরও চলেছে সেই টাকার খেলা।

ভিডিওঃ  ‘থানার ওসির কাছে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

যে কারণে শুরুর দিকে যৌন হয়রানির ঘটনাটিতে ষড়যন্ত্র ও আগুনে পোড়ানোকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছিল স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। এমনকি সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনও শুরুতে ঘটনাকে আত্মহত্যা বলেই উল্লেখ করেন। প্রায় দুই দশক ধরে যৌন হয়রানি, মাদ্রাসার টাকা আত্মসাৎ ও হত্যার হুমকির মতো অপরাধে অর্থের জোরে পার পেয়ে যায় সিরাজ উদ দৌলা। গত বছরের ৩রা অক্টোবর নুসরাতের আরেক বান্ধবীকে যৌন হয়রানি করেন সিরাজ। ওই ঘটনায়ও মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আক্তার উন নেছা শিউলির কাছে অভিযোগ দেয়া হয়। তবে নারী শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির মতো ওই ঘটনায় শুধু একটি নোটিশ পাঠিয়ে দায় সারে জেলা প্রশাসন।

ভিডিওঃ  শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করবোঃ নুসরাত (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

অভিযুক্ত মাদরাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। ওই শিক্ষার্থীর বাবা পূর্বধলী মদিনাতুল উলুম দাখিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, ঘটনার পর মেয়ে আমাদের কিছু জানায়নি। পরে বিষয়টি জানতে পেরে পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যকে বিষয়টি জানাই। ভয়ে আর জেলা প্রশাসনে কোন অভিযোগ দেইনি। তবে এর মধ্যে তার নামে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর একটি অভিযোগ জমা দেয়া হয়।

অভিযোগের পর অধ্যক্ষ সিরাজকে শোকজ করা হলে তিনি ক্ষেপে যান। অভিযোগের কারণে তিনজন শিক্ষককে উল্টো হেনস্তা করেন সিরাজ। তাদের ডেকে নিয়ে হুমকি দেয়া হয় এবং অপমান করা হয়। পরে আর জেলা প্রশাসন কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় আমরাও বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করিনি। শুনেছি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করায় প্রশাসন আর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এদিকে, ২০১৬ সালে মাদরাসার তহবিলের অডিটে গরমিল ও টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে পরের বছর অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি কে এনামুল করিমকে লিখিতভাবে জানান স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সদস্য শেখ আবদুল হালিম মামুন।

ভিডিওঃ  নুসরাতের আগে সিরাজউদ্দৌলার শ্লীলতাহানির শিকার হন আরও এক ছাত্রী বল্লেনঃ প্রভাসক আবুল কাশেম (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

ওই বছর মাদরাসার বেশ কিছু তহবিল থেকে অধ্যক্ষ প্রায় ৫৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ করেন শেখ মামুন। সেখানে দেখা যায়, ক্যাশ থেকে ৬ হাজার ২৬৫ টাকা ব্যাংকে জমা না দেয়া, মাদ্রাসার মার্কেটের দোকান ভাড়া ৪১ হাজার ১০০ টাকা, মাহফিলের অপ্রদর্শিত ১ লাখ ১১ হাজার ৬৯৩ টাকা, ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭২৫ টাকা ব্যাংকে জমা না দেয়া, ক্যাশের ৯০ হাজার ২৯২ টাকা ব্যাংকে জমা না দেয়া, পরের মাসে ৬ লাখ ২৭ হাজার ৮০৩ টাকা জমা না দেয়া, তহবিলের ৮৩ হাজার ২০০ টাকা ব্যাংকে জমা না রাখা, অভ্যন্তরীণ আয় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৯৮ টাকা আত্মসাৎ করা, ছাত্র ফির ৬৮ হাজার ৭৫০ টাকা ব্যাংকে জমা না দেয়া, বছরের শেষের দিকে ক্যাশ থেকে আরো প্রায় ৫০ হাজার টাকাসহ মোট ২২ লাখ ৫২ হাজার ১০০ টাকা আত্মসাতের করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন শেখ মামুন। এসব প্রমাণ ছাড়ানো আরো কয়েকটি খাত থেকে ২০১৬ সালে সর্বমোট প্রায় ৫৬ লাখ টাকা অধ্যক্ষ সিরাজ নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেন বলেও অভিযোগ ছিল শেখ মামুনের। তবে, এমন অভিযোগের পর তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি কে এনামুল করিম অধ্যক্ষকে শুধু নোটিশ দিয়েই দায় সারেন।

অভিযোগের পর উল্টো পরের বছর পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয় শেখ আবদুল হালিম মামুনকে। তিনি মানবজমিনকে বলেন, মাদরাসার তহবিলের টাকা আত্মসাৎ করার সুস্পষ্ট প্রমাণসহ অভিযোগ করলেও প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নেয়নি। পরের বছর বরং আমাকে পরিচালনা পর্ষদ থেকে ষড়যন্ত্র করে বাদ দিয়ে দেয়া হয়। শেখ মামুন বলেন, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল এসব টাকার ভাগ পেতেন। যারা অধ্যক্ষের হয়ে প্রশাসনের কাছে তদবির করতো। এদিকে সোনাগাজী পৌরসভার মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন মানবজমিনকে বলেন, আর্থিক সুবিধা দিয়ে অধ্যক্ষ স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। অনেক অস্বচ্ছল ও গরিব শিক্ষার্থীদের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করতেন। পরে এদের নিজের দলে ভিড়িয়ে গড়ে তোলেন ক্যাডার বাহিনী।

এছাড়া, মাদরাসায় দুপুর ও রাতে লঙ্গরখানার মতো খানাপিনার আয়োজন করতেন অধ্যক্ষ। অনেকেই তার কাছ থেকে এসব সুবিধা নিতেন। এদিকে, ফেনী জেলা প্রশাসনের একজন সাবেক কর্মকর্তা মানবজমিনকে জানান, ক্ষমতাসীন স্থানীয় রাজনীতিবিদদের প্রভাবে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি জেলা প্রশাসন। অভিযোগের বিষয়ে কেন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি পি কে এনামুল করিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার সময়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আসেনি। তবে এডিএম আক্তারুন্নেছা শিউলির সময় একটি অভিযোগের কথা স্মরণ করেন। ওই শিক্ষার্থী ও তার পরিবারকে ডাকা হলে তারা বিষয়টি অস্বীকার করে বলে দাবি করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক।

এছাড়া, অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয় বলেও জানান এনামুল করিম। কিন্তু সেই তদন্তে অর্থ আত্মসাতের কোন প্রমাণ মিলেনি বলেও দাবি করেন জেলা প্রশাসনের এই কর্মকর্তা। তবে, পি কে এনামুল করিমের এমন বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করে অভিযোগকারী শেখ আবদুল হালিম মামুন বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এমন কোন লিখিত কাগজ বা প্রমাণ আমাদের দেয়া হয়নি। মূলত তদন্ত না করেই অধ্যক্ষ সিরাজকে বাঁচিয়ে দিতে এমন ভূমিকা নেয়া হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সাথে ২০১৮ সালে মাদরাসা থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সই জাল করে একটি চেক ইস্যু করা হয় বলেও মানবজমিনকে জানান শেখ মামুন। এই ঘটনায় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি বলেও জানান তিনি। মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সদস্য থাকাকালীন ২০১৭ সালে পুরো মাদরাসা এলাকা ক্লোজসার্কিট ক্যামেরার আওতায় আনার দাবি তুলতে তা পর্ষদে পাস হয় বলে জানান শেখ মামুন। তবে, নিজের অপকর্ম ঢাকতে পরিচালনা পর্ষদকে ম্যানেজ করে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসাতে দেননি অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাহ। ওই বছর পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা বসালে নুসরাতের মতো আর কেউ যৌন হয়রানির শিকার বা আগুনে পুড়ে মারা যেতো না বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

রহস্যের উদঘাটনে সন্তুষ্ট পরিবার, অপেক্ষা বিচারের: নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার রহস্য উন্মোচন, মূল পরিকল্পনাকারী শনাক্ত ও আসামিদের গ্রেপ্তার করায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে নুসরাতের পরিবারের সদস্যরা। পুরো কিলিং মিশন নিয়ে ধোঁয়াশা পরিষ্কার করায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) ধন্যবাদ জানান নুসরাতের বাবা এ কে এম মূসা। গতকাল শনিবার দুপুরে নিহত নুসরাতের বাসায় গেলে তার বাবা মানবজমিনকে বলেন, সকলের প্রচেষ্টায় ঘটনার রহস্য উন্মোচন হয়েছে। আর বাকি আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করার তাগিদ দেন নুসরাতের বাবা।

ভিডিওঃ  ‘অধিকাংশ খুনিকে গ্রেফতার করায় পিবিআইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞ নুসরাতের বাবা। খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেখার অপেক্ষায়… (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

একই সঙ্গে দ্রুত সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেয়ার জন্যও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। পিবিআই কম সময়ের মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার ও হত্যার রহস্য উন্মোচন করায় তাদের ধন্যবাদ দেন নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। তিনি বলেন, আমি শুরু থেকেই বলেছি নূর উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করলে সব ঘটনা জানা যাবে। তবে শুরুর দিকে সোনাগাজী থানার ওসি ও প্রভাবশালী মহল আগুনে পোড়ানোর ঘটনাকে ভিন্ন অবস্থানে নেয়ায় তাদেরও শাস্তির দাবি করেন নুসরাতের ভাই। এদিকে, মামলার আরো দুই আসামি শাহাদাত হোসেন শামীম ও জাবেদ হোসেনকে গতকাল ময়মনসিংহ ও ফেনী থেকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। গতকাল বিকালে এজাহারভূক্ত আসামি জাবেদ হোসেনকে ফেনী আদালতে হাজির করে দশ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। পরে তার বিরুদ্ধে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন বিচারক জাকির হোসাইন।

উৎসঃ ‌মানবজমিন

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here