নিরাপদ সড়কের জন্য শিশুরা চায় ন্যায্যতা, বড়রা দেয় মিথ্যা প্রতিশ্রুতি!

0
311

গোলাম মোর্তোজা
রাস্তায় শিশু কিশোররা যা করে, তা তাদের করার কথা নয়। বড়দের যা করার কথা তা তারা করে না বলে, শিশুরা নিজেরাই দায়িত্ব তুলে নেয়। অনেকটা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার মতো। একই কাজ তারা কয়েক মাস আগেও করেছিল। তখন বড়রা কিঞ্চিত লজ্জা পেয়েছিলেন। লজ্জার প্রকাশ ঘটেছিল দুই ভাবে। প্রথমে বলা হলো, তোমাদের ‘সব দাবি মেনে নিলাম’- ঘরে ফিরে যাও। শিশু মনেও তাদের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না যে, এটা একটা ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ বা ‘রাজনৈতিক কৌশল’। রাস্তা থেকে উঠে গেলেই প্রতিশ্রুতির কথা রাজনীতিবিদরা ভুলে যাবেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে, হেলমেট বাহিনী নামিয়ে শিশু-কিশোরদের নির্মমভাবে পেটানো হয়। সেই ছবি তুলতে গেলে, পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয় গণমাধ্যম কর্মীদের। কারা এই হেলমেট বাহিনী, গণমাধ্যম তাদের অনেকের পরিচয় প্রকাশ করেছিল। ‘গুজব’ ছড়ানোর অভিযোগ এনে প্রখ্যাত আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তারসহ আরও বহু কিছু করা হয়েছিল। হেলমেট বাহিনী বিষয়ে কিছু করা হয়নি।

এবার আবার শিশু-কিশোরদের বলা হয়েছে, তোমরা রাস্তা থেকে ঘরে ফিরে যাও। তোমাদের দাবি মানা হবে, কমিটি করেছি, ‘সুপ্রভাত’ বাসের রুট পারমিট বাতিল করা হয়েছে, নিহত আবরারের নামে ফুটওভার ব্রিজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে।

গতবারের সব দাবি মেনে নেওয়া এবং এবারের প্রতিশ্রুতিকে কেন্দ্র করে কিছু কথা।

১. ক্ষমতাসীনরা বলেছিলেন, শিশু-কিশোররা আমাদের ‘চোখ খুলে’ দিয়েছে। সড়কে নৈরাজ্য সহ্য করা হবে না। বলা হলো, পনেরো বিশ বা তারও বেশি বছর বয়সী ভাঙাচোরা বাস রাস্তায় চলবে না। কয়েকদিন চলল না। তারপর এবড়ো-থেবড়ো বাসগুলো রঙ করে আবার রাস্তায় নামানো হলো। বলা হয়েছিল, ট্রিপ ভিত্তিক ভাড়ায় নয়, বেতন ভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত ড্রাইভার-হেলপাররা গাড়ি চালাবেন। কিছুই করা হয়নি। ট্রিপ ভিত্তিক ভাড়ায়ই গাড়ি চলছে। বলা হয়েছিল, বৈধ লাইসেন্সধারী চালকরাই বাস চালাবেন। বৈধ লাইসেন্স নেই এমন কেউ বা হেলপাররা বাস চালাতে পারবেন না। আবরারকে যে ড্রাইভার চাপা দিয়ে হত্যা করল, তার কাছে পাওয়া গেল মোটরসাইকেল চালানোর লাইসেন্স।

বলা হয়েছিল, ঢাকায় লেগুনা নামক পরিবহনটি চলবে না। বলে রাখা দরকার, লেগুনা পরিবহনটি শতভাগ অবৈধ। রুট-পারমিট, চালকের লাইসেন্স কোনো কিছুই নেই। দু’দিন বন্ধ থাকার পর আবার লেগুনা চলতে শুরু করে। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়, লেগুনা থেকে চাঁদা আদায়ের পরিমাণ আরও বেড়েছে। প্রতিদিন একটি লেগুনা থেকে আগে চাঁদা নেয়া হতো ৭০০ টাকা। এখন নাকি তা ৯০০ টাকায় ঠেকেছে। ঢাকায় ১০ হাজারের উপরে লেগুনা চলে।

রাস্তায় সামগ্রিক নৈরাজ্য একটুও কমেছে, একথা কেউ-ই বলতে পারছেন না। অগ্রগতি হয়েছে একটি, মোটরসাইকেল চালক ও পেছনের যাত্রী এখন হেলমেট ব্যবহার করেন। মোটরসাইকেলের বিশৃঙ্খলভাবে চলাচল আগের মতোই আছে।

২. ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়েছে, ছোটরা বড়দের সম্মান-শ্রদ্ধা করবে। বড়রা ছোটদের প্রতি সংবেদনশীল হবেন। ছোটদের কাছে অসত্য কোনো কথা বলবেন না। যা বলবেন, তা করবেন। যা করতে পারবেন না, তা ছোটদের কাছে বলবেন না।

আমাদের শিশু-কিশোররা দেখলেন, বড়রা নীতি নির্ধারকরা তাদের কাছে অসত্য কথা বলেছেন। তাদেরকে হেলমেট বাহিনী নামিয়ে পেটানো হয়েছে।

এখন যখন বড়রা আবার বলছেন, তোমাদের সব দাবি মেনে নেয়া হবে, তা কি তাদের বিশ্বাস করার কথা?

‘আমি তোমাদের জনপ্রতিনিধি’ ‘কয়েক মাসের মধ্যে নিহত আবরারের নামে ফুটওভার ব্রিজ বানিয়ে দেব’- এ কেমন প্রতিশ্রুতি, কেমন সান্ত্বনা? শিশু-কিশোরদের যে আবেগ-ক্ষোভ, তার সামনে গিয়ে বলছেন ‘আমি জনপ্রতিনিধি’! ‘ফুটওভার ব্রিজ’ এসব ছেলে-ভোলানো কথা বলে শিশু-কিশোরদের বুঝ দেওয়া যাবে? এমনটাই ভেবেছেন? এরা শিশু-কিশোর হলেও, বড়দের যে তারা চিনে ফেলেছেন, তা বুঝতে পারছেন না। কংক্রিটের এই জঙ্গল শিশুদের শিশু হিসেবে বেড়ে উঠতে দিচ্ছে না। সহপাঠীর রক্তাক্ত দেহ দেখতে দেখতে, ক্ষুব্ধ- বিক্ষুব্ধ হয়ে শিশুরা বেড়ে উঠছেন। শিশুদের জীবন-শৈশব কেড়ে নিচ্ছে দূষণ- অনিয়মের স্বর্গ নগর ঢাকা।

৩. বাংলাদেশের রাস্তায় যে নৈরাজ্য তা একদিনে তৈরি হয়নি। আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে, বহু দিনেও তা দূর করা কঠিন। এক একটি সংকট তৈরি হচ্ছে, আর আপনারা বলছেন ‘এখন থেকে আর কিছু ঘটবে না’। তা যে সম্ভব না, আপনারাই সবচেয়ে ভালো জানেন।

সড়ক ও পরিবহন খাতে গত আট বছরে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প চলছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি প্রকল্পের সঙ্গে আরেকটি প্রকল্পের সমন্বয় নেই। একটি পরিকল্পনার সঙ্গে আরেকটি পরিকল্পনা সাংঘর্ষিক। যেমন, মেয়র মোহম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারের কারণে মেট্রোরেল বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে গিয়ে আটকে যাবে। মগবাজার-মৌচাক-মালিবাগ-রামপুরা- তেজগাঁও মেট্রোরেলের আওতায় আনার প্রতিবন্ধকতা হিসেবে সামনে আসবে নির্মাণ হয়ে যাওয়া ফ্লাইওভার। ফ্রাইওভারে যে যানজট সমস্যার সমাধান মিলছে না, তা দৃশ্যমান।

ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে ৩০টি সংস্থা জড়িত। এক সংস্থা কী প্রকল্প নিচ্ছে, কোন ‘উন্নয়ন’র সুফল কারা পাবেন, কতটা পাবেন, আদৌ কিছু পাবেন কিনা, গবেষণা-যাচাই হয় তা বোঝা যায় না। ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল দৃশ্যমান হচ্ছে, এক্সপ্রেসওয়ে হচ্ছে। কোনটা কবে শেষ হওয়ার কথা, তা যেন সবাই ভুলে গেছেন। কাজ শুরু হয়েছে, চলবে যেন অনন্তকাল। বাজেট বাড়ছে তিন চার পাঁচ ছয় গুণ।

দশ, পনেরো বা বিশ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে সংকেত বাতির আধুনিকায়ন করা হয়। বাস্তবে ট্রাফিক ব্যবস্থা চলে বাঁশ, রশি আর ইশারা ভাষায়। সংকেত বাতির পেছনে ১২ কোটি টাকার আরও একটি প্রকল্প এখন চলমান!

দেড় দুই কোটি মানুষের নগরে গড়ে ওঠেনি গণপরিবহন ব্যবস্থা। সরকারি উদ্যোগে বাস কেনা হয়। পনেরো বছর যেসব বাস চলার কথা, দুই থেকে তিন বছরে তা অকেজো হয়ে যায়। মেরামত করা হয় না। আবার নতুন বাস কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। মেরামতে অল্প ব্যয়, কম লাভ। নতুন কেনায় বেশি অর্থ, অনেক লাভ। কিছুদিন পর পর গণমাধ্যমে এসব সংবাদ প্রকাশিত হয়।

সরকারি বিআরটিসি দুর্নীতিতে ডুবে গেছে। বেসরকারি মাফিয়া চক্রের হাতে পরিবহন খাত। যদিও বেসরকারি পরিবহন খাতের মালিক-শ্রমিক নেতারা প্রায় সবাই সরকারের অংশ।

৪. যে নৈরাজ্য রাস্তায় দৃশ্যমান, তা আসলে মগজের নৈরাজ্য। মগজে যদি ক্ষত তৈরি হয়, আশাবাদের সুযোগ কমে যায়। ছাত্রদের ভোট কারচুপি করে ছাত্রদের হাতে ধরা পড়েন শিক্ষক। এমন সমাজ আমরা নির্মাণ করেছি। ভোট কারচুপির কথা যারা বললেন, দল বেঁধে তাদেরই বিচার চাওয়া হলো।

সাবেক মন্ত্রী ও পরিবহন খাতের প্রধান ব্যক্তি শাজাহান খান আবারও বললেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনার জন্যে শুধু ড্রাইভাররা দায়ী নয়।’ কথাটার সঙ্গে একমত পোষণ না করার সুযোগ নেই। সড়ক দুর্ঘটনার জন্যে প্রধানত দায়ী, মালিক এবং শ্রমিক নেতারা (মালিকও)। লাইসেন্স ছাড়া ‘সুপ্রভাত’ বাসটি যিনি চালাচ্ছিলেন, সেই চালকের লাইসেন্স নেই, ২৭ টি মামলা ছিল বাসটির বিরুদ্ধে।

মেয়র, পুলিশ কমিশনার এই তথ্য জানাচ্ছেন। কী করে এমন বাস রাস্তায় চলছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিচ্ছেন না। ২৭ টি মামলা যে বাসের বিরুদ্ধে, সেই বাস রাস্তায় নামানোর দায় কি ড্রাইভারের না মালিকের? লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভারকে মালিক বাস চালাতে দিলেন কেন? দায় ড্রাইভারের চেয়ে বেশি কি মালিকের নয়?

একটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটার পর একশ্রেণির লেখাপড়া জানা মানুষও বলতে শুরু করেন ‘জনগণেরও দোষ আছে। তারা সতর্ক নন, দেখে রাস্তা পার হন না।’

এমন তর্কের অবতারণা করে রাস্তার নৈরাজ্য, দুর্ঘটনা, হত্যা… সবকিছুর একটা যৌক্তিক ভিত্তি দেয়ার চেষ্টা করা হয়। পৃথিবীর অমুক দেশের মানুষ আইন মেনে চলেন, আমাদেরও তেমন চলতে হবে। কিছু মানুষ আছেন যারা হয়ত জানেন না, অমুক দেশ কেমন করে এমন হয়েছে। আর কিছু মানুষ আছেন, জেনে বুঝে অন্ধ রাজনৈতিক আনুগত্যের থেকে বলতে শুরু করেন, মানুষের দোষেই দুর্ঘটনা ঘটে। শুধু ড্রাইভারদের দায়ী করে লাভ নেই।

দায়ী করে লাভ নেই, তা তো বুঝলাম। আরও একটা বিষয় বোঝা দরকার, আইন মেনে চলা দেশগুলোর মানুষ কবে থেকে, কীভাবে আইন মানা শিখলেন। উদাহরণ হিসেবে জাপানের কথা বলা যায়। জাপানের প্রতিটি মানুষ আইন মেনে চলেন। রাস্তা দিয়ে হাঁটা, ট্রেনে ওঠা থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আইন মেনে চলেন। জাপানের এই প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। জাপান, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, কাছের সিঙ্গাপুরসহ পৃথিবীর সব দেশে মানুষকে আইন মেনে চলতে বাধ্য করা হয়েছে। প্রথমে আইনের শাসন বিষয়টি দৃশ্যমান করতে হয়েছে। নীতি-নির্ধারকদের তা মানতে হয়েছে। জনগণকে মানতে বলা হয়েছে। না মানলে শাস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। শাস্তির ভয়ে মানুষ আইন মানতে শুরু করেছে। একসময় তা মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আইন তার সামনে সব সময় দৃশ্যমান আছে। জানা আছে আইন অমান্য করলেই শাস্তি নিশ্চিত।

পৃথিবীর কোনো দেশের মানুষ নিজে থেকে আইন মানতে চায়নি। মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা আইন অমান্য করা।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকলে, সবাই আইন মেনে চলেন।

৫. ফিরে আসি ‘সুপ্রভাত’ প্রসঙ্গে।

‘লাইসেন্স ছাড়া ড্রাইভার, ২৭টি মামলা নিয়ে বাসটি কীভাবে রাস্তায় চলছিল’-প্রশ্ন যিনি করছেন, সেই পুলিশ কমিশনারেরই উত্তর দেওয়ার কথা। ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে এক ধরণের উত্তর তিনি দিয়েছেন। সঙ্গে ‘সুপ্রভাত’ বাস সম্পর্কে আরও কয়েকটি তথ্য জানাই। গত কয়েকদিনে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসব সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

‘সুপ্রভাত’ নামে প্রায় ৩৫০টি বাস চলে। বিআরটিএ রাস্তায় চলার অনুমতি দিয়েছে ৭৫টি বাস। প্রায় ২৭৫টি বাস চলে বেআইনিভাবে। জানা যায় ‘সুপ্রভাত’ সমিতি জাতীয় একটি প্রতিষ্ঠান। ৩৫০টি বাসের মালিক প্রায় ৪০০ জন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি বাসের মালিক দুই থেকে চার জন। প্রায় সব বাস কেনা হয়েছে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে। প্রতিটি বস থেকে প্রতিদিন এক হাজার টাকা চাঁদা তোলা হয়। এই টাকা কে তোলেন, টাকার ভাগ কারা কারা পান, এসব তথ্য অজানা কিছু নয়।

‘এই রুটে বাসের সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে’-এজাতীয় যুক্তি দেখিয়ে বিআরটিএ ২৭৫টি বাস চলার অনুমতি দেয়নি। অথচ বাসগুলো চলছে।

জানি না, পুলিশ কমিশনার বা বিআরটিএ এক্ষেত্রে কী বলবেন!

যাত্রী পাওয়া না গেলে বা বাসের সংখ্যা বেশি হয়ে গেলে, মালিকরা এই রুটে এতগুলো বাস চালাতে পারতেন না। চাঁদা দিতেন না, আয় থেকে ব্যাংক ঋণ শোধ করতে পারতেন না।

পরিবহন খাতের অনিয়ম-নৈরাজ্য-দুর্নীতি-মাস্তানি-চাঁদাবাজির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি যে কতটা শক্তিশালী, তার অতি ক্ষুদ্র দৃষ্টান্ত ‘সুপ্রভাত’ বা ‘জাবালে নূর’।

সুপ্রভাতের রোড পারমিট বাতিল করে দেওয়া হলো, জাবালে নূর সম্পর্কেও একই কথা বলা হয়েছিল। রুট পারমিট বাতিল করে দেওয়া কেমন শাস্তি? দেখা দরকার, বাসগুলো চলার উপযুক্ত কিনা। উপযুক্ত হলে, আইন মেনে চলতে বাধ্য করা দরকার। তা না করে, লোক দেখানো ‘রুট পারমিট’ বাতিলের ঘোষণা কেন?

‘জাবালে নূর’ রাস্তায় চলছে। গাড়ির মান তখনো যেমন ছিল, এখনো তেমনই আছে। লাইসেন্স ছাড়া ড্রাইভাররা পুলিশের সামনে দিয়ে কোনো কিছু তোয়াক্কা না করে বাস চালাচ্ছেন। ‘সুপ্রভাত’ নাম পরিবর্তন করে ‘সম্রাট’ নামে রাস্তায় চলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চক্রাকার এই অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ বা হ্রাস করার কাছাকাছি কোনো উদ্যোগও কেউ নিচ্ছেন না।

৬. প্রধানমন্ত্রী বললে কাজটি হয়, তিনি না বললে বা না দেখলে হয় না, সাধারণভাবে একথা বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু পরিবহন খাতে প্রধানমন্ত্রী যা বলেন বা নির্দেশনা দেন, তাও হয় না। পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০১৮ সালের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিলেন-

ক. চালক ও হেলপারদের (সহকারী) প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে।

খ. দূরপাল্লার বাসযাত্রায় বিকল্প চালক রাখতে হবে। এক্ষেত্রে পাঁচ ঘণ্টা পর পর চালক পরিবর্তন করতে হবে।

গ. চালক ও যাত্রীদের সিটবেল্ট বাঁধা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

ঘ. চালকদের জন্য মহাসড়কের পাশে বিশ্রামাগার রাখতে হবে।

ঙ. এবং অবশ্যই সিগন্যাল মেনে চলতে হবে।

নির্মোহভাবে বলেন তো, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে?

এখন আবার ১১১ দফা প্রস্তাবনা সামনে আনা হয়েছে। পরিবহন খাতের সবচেয়ে আলোচিত শাহজাহান খানের নেতৃত্বাধীন কমিটি এনেছে ১১১ দফা। সেখানে শুধু ‘করতে হবে’ ‘করতে হবে’…। গল্পের সেই ‘ঢাল আনো তলোয়ার আনো…’- কিন্তু আনবেটা কে?

৭. পূর্ব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, ১১১ দফার যে দফাগুলো ব্যাপক উদ্যোগ ও উদ্যমে শুরু হতে পারে বলে ধারণা করি-

‘ফুটপাত দখলমুক্ত করে রেলিং তৈরি, ফুটপাতহীন স্থানে ফুটপাত নির্মাণ ও রাস্তা থেকে ফুটপাত ৮ ইঞ্চি উঁচু রাখতে হবে।’

ফুটপাতে রেলিং বানানো, ফুটপাত নির্মাণ এবং আট ইঞ্চির চেয়ে উঁচু বা নিচু ফুটপাত নতুন করে ভাঙ্গাগড়া শুরু হতে পারে। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক যে ফুটপাত তৈরি করে গেছেন, সেই নতুন ফুটপাত সম্ভবত আবার নতুন করা শুরু হবে!

‘দেশের সব সড়কে প্রয়োজনীয় সাইন, মার্কিং ও স্ট্রিট লাইটের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনও প্রকার গতিরোধক স্থাপন করা যাবে না।’

সাইন, মার্কিং, লাইট ‘লাভজনক’ নতুন প্রকল্প আলোর গতিতে শুরু হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। শুরু হতে পারে গতিরোধক ভাঙ্গাগড়ার কাজটিও। সারা দেশের রাস্তায় অগণিত গতিরোধক আছে। প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জন্যে যা খুবই লাভজনক হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা।

‘রাস্তার সংযোগস্থলগুলোর ১৫০ ফুট পর্যন্ত কোনও ধরনের গাছপালা থাকতে পারবে না।’

আশা করা যায়, এই কাজটি সর্বপ্রথমে সম্পন্ন হবে। সারা দেশে রাস্তার পাশে এখনো যে সব বড় বড় গাছ আছে, আগে উদ্যোগ নিয়েও প্রতিবাদের কারণে যা কাটা যায়নি, এবার সেগুলো কাটা যাবে। সড়ক দুর্ঘটনার সঙ্গে এসব গাছের কতটা সম্পর্ক, তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, গাছ কাটা আমাদের জাতীয় শখের পর্যায়ে পড়ে।

৮. বড়দের কোনো বিষয়ের প্রতিবাদ দৃশ্যমান নয়। সরকার তাদেরকে বিবেচনায় নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করে না। শিশু-কিশোররা মারা যাবে, ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় আসবে। ‘সব দাবি মেনে নিলাম’ ‘ফুটওভার ব্রিজ করে দিলাম’ বলা হবে ‘হাতি-ঘোড়া’ সব দেব। তারা তো শিশু, রাজনীতির সত্য-অসত্য প্রতিশ্রুতির তারা কী বোঝে! গত বছর যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এবারও একই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, আগামীতেও…।

উৎসঃ The Daily Star

আরও পড়ুনঃ সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বাংলাদেশ এখন অকার্যকর রাষ্ট্র!


কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না সড়ক দুর্ঘটনা। এমনকি নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা যখন রাস্তায় আন্দোলন করে তখনও দেশের বিভিন্ন স্থানে বাস ও ট্রাক চাপায় প্রতিদিন ৮-১০ জন করে নারী-পুরুষ ও শিশু মারা গেছে। সর্বশেষ শুক্রবার সকালে ওয়ার্কর্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন। ধাক্কাটা আরেকটু জোরে লাগলেই হয়তো মেনন না ফেরার দেশে চলে যেতেন।

গত বছর নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্যে একাধিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আজ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাগুলোর একটিও বাস্তবায়ন করেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

চলতি বছরের প্রথম দিকেও সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সড়ক দুর্ঘটনার দায় আমরা এড়াতে পারি না। নিজেদের ব্যর্থতার কথাই ওবায়দুল কাদের সেদিন স্বীকার করেছেন। কাদেরের ভাষায়- মন্ত্রণালয় ও বিআরটিএ’র কথা পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা শুনছে না।

এরপর, সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিঞা বলেছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার, বিআরটিএ ও পুলিশ ব্যর্থ হয়েছে। নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে তিনি পথচারীদেরকেও গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন।

ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্মদিয়েছে। তার বক্তব্যের সূত্র ধরে রাজনীতিক বিশ্লেষকসহ সচেতন মানুষ বলছেন, পুলিশ কমিশনারের বক্তব্যে প্রমাণ হলো বাংলাদেশ এখন ব্যর্থ রাষ্ট্র। কারণ, রাষ্ট্রের সবগুলো সংস্থা মিলেও যেখানে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে পারেনি, সেখানেতো রাষ্ট্রের আর কার্যকারিতা থাকে না। রাষ্ট্রের চেয়ে এখন পরিবহন সেক্টর বেশি শক্তিশালী। যার কারণে, রাষ্ট্র তাদের সঙ্গে পারছে না।

তারা বলছেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন হয় না। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মানে না অধিদপ্তর। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মানে না ট্রাফিক পুলিশরা। আর পুলিশের কথা মানে না পরিবহন শ্রমিকরা। আর সরকারের কথা রাখে না পরিবহন মালিকরা। সেখানে রাষ্ট্রকে আর কার্যকর রাষ্ট্র বলার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশ কার্যত এখন একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র।

উৎসঃ অ্যানালাইসিস বিডি

আরও পড়ুনঃ এক দিনের মাথায় সু-প্রভাতের বাস রাতারাতি রং বদলিয়ে সম্রাট পরিবহন হয়ে যাচ্ছে! 

রাজধানীর প্রগতি সরণি এলাকায় মঙ্গলবার সু-প্রভাত পরিবহনের বাসের চাপায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহতের এক দিনের মাথায় সু-প্রভাতের বাস রাতারাতি রং বদলিয়ে সম্রাট হয়ে যাচ্ছে।

গাজীপুরা এলাকার এমরান হোসেন নামে একজন জানান, রাজধানীর সদরঘাট থেকে গাজীপুর মহানগরীর গাজীপুরা রুটে চলাচলকারী ‘সু-প্রভাত স্পেশাল বাস সার্ভিস’ পরিবহনের কিছু বাস রাতারাতি রং বদলিয়ে এখন হয়ে যাচ্ছে সম্রাট ট্রান্সলাইন (প্রা.) লি.।

তিনি জানান, বুধবার দুপুরে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের গাজীপুরা এলাকায় সু-প্রভাত পরিবহনের নাম মুছে সম্রাট পরিবহনের নামে পেন্টিং করতে দেখেছেন।

স্থানীয়রা জানান, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) একজন শিক্ষার্থী মারা যাওয়ার পর রাতারাতি রং বদলে দিয়েছে সু-প্রভাত। এ কোম্পানির বিভিন্ন বাস রাতারাতি রং বদলিয়ে সম্রাট পরিবহনে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাচ্ছে।

এ ছাড়া গাড়ির মালিকরা তাদের সুবিধামতো কোম্পানিতে নিজেদের বাস অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যস্ত রয়েছেন।

একাধিক শ্রমিক, বাসচালক ও সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সু-প্রভাত স্পেশাল বাস সার্ভিসটির রুট পারমিট রাজধানীর সদরঘাট থেকে রামপুরা হয়ে উত্তরা পর্যন্ত। কিন্তু এক প্রভাবশালী পরিবহন নেতার প্রভাবের কারণে চলছে গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীর গাজীপুরা পর্যন্ত। যেখানে ৭০টি বাস চলার অনুমতি রয়েছে, সেখানে চলছে প্রায় সাড়ে তিন শত বাস।

সু-প্রভাত পরিবহনের টঙ্গী স্টেশন রোডের সুপারভাইজার কামরুল ইসলাম জানান, সু-প্রভাত পরিবহনের বাসের রং বদলিয়ে অন্য পরিবহনের নামে চলার বিষয়টি তার জানা নেই। এটি মালিক কর্তৃপক্ষ বলতে পারবেন।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের (দক্ষিণ) সহকারী কমিশনার মো. নজরুল ইসলাম জানান, কোনো কোম্পানির বাস অন্য কোম্পানিতে পদ্ধতিগতভাবে স্থানান্তর করতেই পারে। তবে সেটা দেখতে হবে বাসটি যে কোম্পানিতে যাচ্ছে সে কোম্পানিটির বৈধ অনুমোদন আছে কিনা। সু-প্রভাত পরিবহনের কোনো বাস অন্য কোম্পানির নামে পরিবর্তিত হচ্ছে- এমনটা আমার জানা নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।

তবে সু-প্রভাত পরিবহনের কোনো বাস এখন আর গাজীপুরে প্রবেশ করতে পারবে না বলে জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা।

উৎসঃ যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ ওয়ালমার্টের শার্টের বারকোড নষ্ট করা সেই আতিক এখন ঢাকার মেয়র!


রানা প্লাজার দুর্ঘটনা নিয়ে অসাধারণ একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছিলো কানাডার সিবিসি টেলিভিশন। ওয়ালমার্টের কোনো একটি স্টোর থেকে একটি শার্ট কিনে সেটি নিয়ে রিপোর্টার মার্ক কেলি গিয়েছিলেন ঢাকা। শার্টের লেবেলের সূত্র ধরে তিনি খুঁজে বের করেছিলেন কোন ফ্যাক্টরিতে শার্টটি বানানো হয়েছিলো।

সিবিসির অনুসন্ধানে দেখা গেল, কালো তালিকাভূক্ত একটি ফ্যাক্টরিতে শার্টটি তৈরি হয়েছে। সিবিসির রিপোর্টার খুঁজে বের করলেন ফ্যাক্টরির মালিক সেই সময়কার বিজিএমইএ প্রেসিডেন্ট আতিকুল ইসলামকে।

শার্টটি নিয়ে রিপোর্টার গেলেন আতিকুল ইসলামের কাছে। আতিকুল ইসলাম বললেন, কোন শার্ট কোথায় তৈরি হয় -এটা তো বলা সম্ভব নয়।

পোর্টার যখন জানালেন, এটি তার কারখানায়ই তৈরি, তিনি তখন শার্টটি দেখতে চাইলেন। শার্টটি হাতে নিয়ে গিয়ে বসলেন নিজের চেয়ারে। তারপর শার্টটি ফেরত দিলেন রিপোর্টারকে।

প্রতিবেদনের শেষ দিকে এসে রিপোর্টার জানালেন, আতিকুল ইসলাম শার্টটি নিয়ে তার ট্যাগ এবং কানাডিয়ান ইম্পোর্ট বারকোড নম্বরের উপর কালি লেপ্টে দিয়েছেন যাতে এটি যে তার কারখানায় তৈরি হয়েছে সেটি আর বের না করা যায়।

নাছোড়বান্দা রিপোর্টার পরের দিন আবার গেলেন আতিকুলের কাছে। জানতে চাইলেন, শার্টের লেবেলগুলো কেন তিনি নষ্ট করে দিয়েছেন?

আতিক অস্বীকার করলেন। সেই আতিক এখন ঢাকার মেয়র। ওয়ালমার্টের শার্টের বারকোড নষ্ট করে ফেলার মতোই তিনি কি ভেবেছিলেন, ফুটওভার ব্রিজে আবরার হত্যার স্মৃতিকে তিনি মুছে ফেলবেন? সূত্র : বাংলা

উৎসঃ (সওগাত আলী সাগর, কানাডা প্রবাসী সাংবাদিক। লেখাটি তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে নেওয়া।)

আরও পড়ুনঃ গুমে জড়িত শেখ হাসিনার উপদেষ্টা, সংবাদের পর বাংলাদেশে বন্ধ আলজাজিরা


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও শেখ রেহানার দেবর মেজর জেনারেল তারেক আহমেদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে তিনজনকে গুম করার অভিযোগ উঠেছে। প্রচ্ছায়া লিমিটেডের ৩ কর্মচারীকে আইনের অপব্যবহার করে তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে বলে খবর প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। আল জাজিরা’র ইনভেস্টিগেটিভ ইউনিটের এই প্রতিবেদন ইতিমধ্যে আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

এদিকে গতকাল বুধবার এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বাংলাদেশে আলজাজিরা বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ থেকে এখন আর সাইটটিতে প্রবেশ করা যাচ্ছে না।

প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক আহমেদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে গুমের এই অভিযোগ তুলেছেন তার এক সময়ের ব্যাবসায়-সহযোগী এবং প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা কর্নেল শহিদ উদ্দিন খান। তিনি জানান, তার (প্রচ্ছায়া লিমিটেড) প্রতিষ্ঠানের তিন জন কর্মচারীকে তুলে নিয়ে গেছে। বর্তমানে শহিদ উদ্দিন খান যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন।

আবাসন কোম্পানি ‘প্রচ্ছায়া লিমিটেড’ ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। যেখানে তারেক আহমেদের স্ত্রী শাহিনা সিদ্দিকী চেয়ারপারসন এবং শহিদ উদ্দিন খান চিফ এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসেবে ছিলেন। এছাড়াও দুই পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও এই কোম্পানির সাথে জড়িত।

নির্বাচনের আগে এপ্রিল মাসে সরকার পরিবর্তন হতে পারে এমন ভয়ে শাহিনা সিদ্দিকী শহিদ উদ্দিনকে কোম্পানির সাথে তার জড়িত থাকার প্রমাণ নষ্ট করে কোম্পানি বন্ধ করার জন্য চাপ দেয়। শহিদ উদ্দিন পরবর্তীতে জানুয়ারি মাসে এসে কোম্পানি গুটিয়ে ফেলেন।

গত বছর এপ্রিলে শাহিনা সিদ্দিকীর লোকজন এসে অফিসের কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভ ও সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে চলে যায়। এছাড়াও শহিদ উদ্দিনের অন্যান্য অর্থ সংক্রান্ত নথি নিয়ে চলে যায়।

এবং এপ্রিলের ওই ঘটনার সাক্ষ্য দিতে চাওয়ায় ডিরেক্টর জেনারেল অফ ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স অফিসে জিজ্ঞাসাবাদের নাম করে কোম্পানির ৩জন কর্মীকে তুলে নিয়ে যায়। বর্তমানে তারা নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলেন, সৈয়দ আকিদুল আলী, জহিরুল হক খন্দকার এভং খোরশেদ আলম পাটোয়ারি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায় খোরশেদ আলম ও আকিদুল আলীকে তাদের স্ব-স্ব বাড়ি থেকে গত ১৩ জানুয়ারি তুলে নেয়া হয়। অন্যত্র থেকে জহিরুলকে তুলে নেয়া হয়।

অন্যদিকে আল জাজিরা, পরিবারগুলোর সাথে কথা বলে তাদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এছাড়া আল জাজিরার ইনভেস্টিগেটিভ ইউনিট জেনারেল তারেক আহমেদ সিদ্দিকী ও তার স্ত্রীর সাথে কথা বলতে চাইলে তারা কোন সাড়া দেননি।

উল্লেখ্য, তারেক আহমেদ সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা হওয়ায় দেশের সশস্ত্র বাহিনী ও ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির উপর তার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এছাড়াও তিনি আওয়ামী লীগের একজন অন্যতম সহযোগী। তার ভাই প্রধানমন্ত্রীর বোন শেখ রেহানার স্বামী।

আলজাজিরার প্রতিবেদনটির লিংক: Exclusive: Bangladesh top security adviser accused of abductions

উৎসঃ ভাষান্তর করেছে জবান

আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশে যে কারণে আলজাজিরা বন্ধ করে দিয়েছে আওয়ামীলীগ সরকার


কাতারভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আলজাজিরা বাংলাদেশে ব্লক রয়েছে। তবে কী কারণে ব্লক রয়েছে তা কোনো সূত্র নিশ্চিত করেনি।

বুধবার মধ্যরাত থেকে আলজাজিরার ওয়েবসাইটে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে ঢুকা সম্ভব হচ্ছে না। তবে বেসরকারি কোম্পানির মোবাইল নেটের মাধ্যমে আলজাজিরার ওয়েবসাইটে ঢোকা যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) সভাপতি এম এ হাকিম বলেন, এখন কোনো ওয়েবসাইট বন্ধ করার দরকার হলে সরকার আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে না। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থা নিজস্ব ডিভাইস ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় ওয়েবসাইট বাংলাদেশে ব্লক করে দেয়।

তবে এ বিষয়ে জানতে বিটিআরসির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কেউ এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

উৎসঃ যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশে অপহরণে জড়িত স্বয়ং শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টাঃ আল-জাজিরা’র বিস্ফোরক প্রতিবেদন


সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী ব্যবহার করে বাংলাদেশে অপহরণ আর নির্যাতনের ঘটনা পরিচালনা করছেন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকী। ব্যবসায় বনিবনা না হবার জেরে তিন ব্যবসায়ীকে অপহরণ করার অভিযোগ উঠেছে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ট এবং প্রভাবশালী এই উপদেষ্টার বিরুদ্ধে। আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী গণমাধ্যম আল-জাজিরার এক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উপর তারিক আহমদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, “শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয় জেনারেল সিদ্দিকীকে।তিনি (শেখ হাসিনার) খুব ঘনিষ্টজন। তার ভাইয়ের সঙ্গেই বিয়ে হয়েছে শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার। তার ভাতিজি হলেন যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিকী।”

এতে বলা হয়, “জেনারেল সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে অপহরণের এই অভিযোগ এনেছেন তারি এক সময়ের ব্যবসায়িক অংশীদার কর্ণেল শহীদ উদ্দীন খান। তিনি বর্তমানে যুক্তরাজ্যে স্বেচ্ছায় নির্বাসনে রয়েছেন।”

খানের ভাষ্যমতে জানুয়ারি মাসে ঢাকায় তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তিন কর্মচারীকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

নিখোঁজ হওয়া এই তিন জনের পরিবারের সদস্যরা আল-জাজিরাকে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন ১২ সপ্তাহ আগে যখন তাদের অপহরণ করা হয় তখন থেকে তাদের কোনো খোঁজ বা হদিস পাননি তারা। অপহরণের যে দাবি খান করেছেন তার তথ্য-প্রমাণাদি আল-জাজিরার হাতে রয়েছে। আর এসব প্রমাণ দাবির সত্যতা নিশ্চিত করে।

খান জানান নয় মাস আগেও অপহরণ হওয়া এই তিনজনসহ আরেকজনকে ঢাকার অফিস থেকে তোলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ডিজিএফআই-এর এখানে গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়। শাহীন সিদ্দিকীর (নিরাপত্তা উপদেষ্টার স্ত্রী) সঙ্গে খানের যৌথ মালিকানার একটি কোম্পানিতে ব্যবসায়িক বিষয়ে বনিবনা না হওয়ার একদিন পরই এ ঘটনা ঘটে। শাহীন সিদ্দিকী প্রচ্ছায়া লিমিটেড নামের ঐ কোম্পানির চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

২০০৯ সালে চালু হওয়া এ কোম্পানিটি জমি-জমা সংক্রান্ত একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিলো। কোম্পানিটির রেজিস্ট্রেশন দেখা যায় শুধু জেনারেল সিদ্দিকীর স্ত্রী এটির পরিচালক ছিলেননা বরং তার ভাই জামাল শাফি (২০১২ পর্যন্ত) এবং মেয়ে নোরিন তাসমিয়া ও বুশরাও এর পরিচালক ছিলেন। খান ছিলেন কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আর তার স্ত্রী এবং দুই সন্তান ছিলেন এর পরিচালক।

খান বলেন, “তিনি (শাহীন সিদ্দিকী) চাইতেন না আমার সঙ্গে ব্যবসা করার কোন প্রমাণ থাকুক।”

“তারা মনে করতেন এই সরকার (শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকার) হয়তো পরিবর্তন হয়ে যাবে। আর যদি সরকার বদল হয় তাহলে আমি তাকে বিপদে ফেলবো।”

২০১৭ সালের জুন মাসে বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করার জন্য যুক্তরাজ্যে উড়াল দেন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা। সেখানে তিনি খানের সঙ্গে দেখা করেন এবং খুব দ্রুত কোম্পানিটি বন্ধ করে দেবার কথা বলেন।

খান বলেন সাক্ষাতকালে নিরাপত্তা উপদেষ্টা তাকে এই বলে তাকে সতর্ক করে দেন যে তাঁর স্ত্রী খুবই হিংস্র প্রকৃতির। তাই যত দ্রুত সম্ভব কোম্পানিটি যেন বন্ধ করে দেয়া হয়।

খান চাইছিলেন নিয়ম মেনেই কোম্পানিটি বন্ধ করতে কিন্তু এর পর যা ঘটে সেটা ছিলো আর ভয়াবহ কিছু। ২০১৮ সালের এপ্রিলে প্রচ্ছায়া বন্ধ হবার পরদিন খানের তিন কর্মকর্তার কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা গ্রহণ করা হয়। সিদ্দিকীর স্ত্রী এই বলে সতর্ক করেন যে তিনি তাদের অফিসে গিয়ে দেখে আসবেন।

শাহীন সিদ্দিকী এরপর অফিসে যাননি। কিন্তু কর্মকর্তারা জানান, অবসরপ্রাপ্ত দুই জন সেনা কর্মকর্তার নেতৃত্বে অফিসে ডজন খানেক লোক প্রবেশ করে। তারা প্রচ্ছায়া অফিসে হার্ডডিস্ক, অর্থনৈতিক কাগজ পত্রাদি এবং খানের ব্যবসায়িক অন্যান্য দলিলও সঙ্গে করে নিয়ে যায়।

প্রতিবদেনে বলা হয়, “কর্মকর্তাদের দেয়া ভাষ্য থেকেই বুঝা যায় কিভাবে ঐ দলটির দ্বারা অফিস তছনছ করা হয়, তারা ক্যাবিনেটের তালা ভাঙ্গে, ২৭ টি বক্সে করে মালামাল নিয়ে যায় এবং সিসি টিভি ক্যামেরাগুলো সরিয়ে দেয়।”

অপহৃত চারজনই জানান তাদরকে জেনারেল সিদ্দিকীর সরকারি বাস ভবনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই জব্দ করা মালামাল নামানো হয়।

তারা জানান তাদেরকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ডিজিএফআই এর সদরদপ্তরে। তখন তাদের চোখ বাঁধা ছিলো এবং খানের ব্যবসা সম্পর্কে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।দুই জন জানান তাদের মৃত্যুর ভয় দেখানো হয়। ধরে নেবার ৪৮ ঘন্টা পর তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।

গত এপ্রিল মাসে অপহৃত জহিরুল হক খন্দকার, খোরশেদ আলম পাটওয়ারি এবং সৈয়দ আকিদুল আলীকে আবারো গুম করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আল-জাজিরাকে জানান, ১৩ জানুয়ারি খোরশেদ এবং আকিদুলকে আকিদুলের বাড়ি থেকে ২০ জনের একটি দল এসে তোলে নিয়ে যায়। এসময় তাদের সঙ্গে অস্ত্র ছিলো এবং তারা ছিলো কালাে পোশাকধারী, যেমনটা র‍্যাব পরিধান করে থাকে। অপহরণকারিদের আরেকটি গাড়িতেই জহিরুলকে দেখা গিয়েছিলো।

অপহৃতদের পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের সন্ধান জানার চেষ্টা করা হলেও কোনো লাভ হয়নি। উল্টো তারা এখন নিজেদের জীবন নিয়ে শংকায় পড়েছে। খান বলছেন তার পরিবারের সদস্য এবং কর্মচারী এখন হয়রানি এবং ভীতির মুখোমুখি।

দ্বিতীয়বার অপহরণের কয়েকদিন পরই খানের বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ এবং তার বিরুদ্ধে সরকার এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনে। খান, তার পরিবার এবং গুম হওয়া তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগ এনে মামলাও করা হয়েছে।এসব অভিযোগ মিথ্যা বলে জানিয়েছেন খান।

খানের পক্ষে তার এক বৃটিশ আইনজীবি এক অভিযোগের মাধ্যমে জেনারেল সিদ্দিকী, তার স্ত্রী এবং গোয়েন্দা বাহিনীর বিরুদ্ধে আইন ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দেবার কয়েক সপ্তাহ পরই এসব অভিযানের ঘটনা ঘটলো।

আল-জাজিরার কাছে পাঠানো এক বিবৃতিতে ডিজিএফআই খানের বক্তব্য এবং এসব ঘটনায় তাদের কোনো সম্পৃক্ততার বিষয় দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে।

ডিজিএফআই অভিযোগ করে বলেছে, সাবেক এই কর্ণেল তার কর্মকর্তাদের লুকিয়ে যাবার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে করে তদন্ত কর্মকর্তারা তাদের কিছু জিজ্ঞাসা না করতে পারে।

সংস্থাটি আরো অভিযোগ করে বলেছে, খান বিতর্কিত কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত যেটি সেনাবাহিনীর পরিবেশ নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর। এর মধ্যে সম্পত্তি আত্মসাতের বিষয়টিও রয়েছে।

এর সবগুলো অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন খান।

আল-জাজিরার তদন্ত শাখার পক্ষ থেকে জেনারেল সিদ্দিকী এবং তার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তারা কোনো সাড়া দেননি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, “বেআইনী এবং গোপন বন্দিশালায় আটকের বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার বাংলাদেশকে তাগিদ দিয়ে আসছে, আর তাতে ব্যর্থ হওয়ার নিন্দা জানাচ্ছে সংস্থাগুলো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব ঘটনার শিকার হচ্ছে বিরোধীদলের সদস্যরা। যাদের অনেকেরই গুম হবার পর আর দেখা মেলেনা।”

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে ২০১৬ সালে ৯০ জন লোককে অপহরণ করে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা। গুম হওয়াদের মধ্য থেকে পরে ২১ জনের লাশ পাওয়া যায়। মানবাধিকার গবেষকরা গুমের জন্য যে কয়টি রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে দায়ী করছেন তার মধ্যে ডিজিএফআইও রয়েছে।

শেখ হাসিনার সমালোচনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় অপহরণের এসব ঘটনায় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আহবানকে নাকোচ করে দিয়ে আসছেন। কিন্তু জেনারেল সিদ্দিকী সঙ্গে তার ঠিকই ঘনিষ্টতা বজায় রয়েছে। অথচ তিনিই রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দাসংস্থাগুলোকে কল-কাঠি নাড়ছেন।”

উৎসঃ জাস্ট নিউজ

আরও পড়ুনঃ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গোপন কারাগারে আটক ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ


এক বছর তিন মাস নিখোঁজ থাকার পর সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গোপন কারাগারে আটক ছিলেন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বার বার বলা হচ্ছিলো তারা কিছুই জানেনা এ বিষয়ে কিন্তু প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র তাকে গোপনে আটকে রাখার বিষয়টি স্বীকার করেছে।

বাংলাদেশে পলিটিকো’তে প্রকাশিত এক কলামে এ কথা বলা হয়। কলামটি লিখেছেন বৃটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান।

জাস্ট নিউজ পাঠকদের জন্য কলামটি তোলে ধরা হলো:

দিনটি ছিলো ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর। ধানমন্ডির নিজের বাসা থেকে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আসার জন্য গাড়ি নিয়ে একাই বিমানবন্দর যাওয়ার উদ্দেশে বের হন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান।কিন্তু তাকে পথিমধ্যে । উঠিয়ে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর লোকেরা।

মারুফ রাষ্ট্রদূত হিসেবে ২০০৮ সাল থেকে ২০০৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভিয়েতনামে কর্মরত ছিলেন। এর আগে তিনি কাতারে রাষ্ট্রদূত ও যুক্তরাজ্যে কাউন্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে তিনি অবসর নেন।

গুম হবার দিনই রাত ৭.৪৫ মিনিটে অপরিচিত একটি নাম্বার থেকে বাসায় ল্যান্ড ফোনে কথা বলেন মারুফ। বাসার কাজের লোককে তিনি জানিয়ে দেন অপরিচিত কিছু লোক তার কম্পিউটার নিতে আসবে, তাদের যেন সহযোগিতা করা হয়। ফোন দেবার ২০ মিনিট পরই পরিপাটি পোশাক পরিহিত ৩ জন মানুষ এসে পৌঁছায় সাবেক এই রাষ্ট্রদূতের বাসায় এবং তারা সেখান থেকে ল্যাপটপ, কম্পিউটার এবং মোবাইল ফোন সেট সঙ্গে করে নিয়ে যায়।

যারা বাসায় এসেছিলো তাদের মাথায় ছিলো টুপি আর মুখে সার্জিক্যাল মাস্ক। উদ্দেশ্য ছিলো বাসার সিসি টিভির থেকে যেন নিজেদের আড়াল রাখা যায়। মারুফের গুম হবার ঘটনা নিয়ে এটাই ছিলো তার পরিবারের দেয়া ভাষ্য।

সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকতা অবৈধভাবে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কর্তৃক মারুফ জামানকে আটকে রাখার বিষয়টি নিশ্চত করেছেন। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এই সূত্রের বক্তব্য- মারুফ জামান নির্দোষ নন, সরকার বিরোধী একটি ওয়েবসাইটের সঙ্গে তার যোগসূত্র ছিলো। বিচারবর্হিভূত আইন, গুম বা অপহরণ যে ঘটনাই ঘটুক বাংলাদেশে এখন এভাবেই সবকিছু সরকার বিরোধী বলে বৈধতা দেয়া হয়।

১৫ মাস ধরে গােপন কারাগারে আটকে রাখা হয়েছিলো মারুফকে, এসময়ে একবারের জন্যও ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়নি তাকে। খুব সম্ভবত সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই তাকে আটক রেখেছিলো। শুক্রবার তাকে মুক্তি দিলো আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা।

বিষয়টি উল্লেখ করে মারুফ জামানের মেয়ে শবনম জামান ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন:তিনি লিখেছেন, ‘আমার বাবা সাড়ে ১৫ মাস বা ৪৬৭ দিন পর ফিরে এসেছেন। আমি ও আমার বোন কৃতজ্ঞ তাদের কাছে, যারা এই সময় আমাদের সহযোগিতা করেছেন।এ ক্ষত কাটিয়ে উঠতে আমরা এখন গোপনীয়তা বজায় রাখতে চাই। এ বিষয়ে আর কিছু না জানতে চাইতে সবাইকে অনুরোধ করছি।’

যেমনটা বলছিলাম- আসলে মারুফের কি ঘটেছিলো সেটা হয়তোবা আর জানার সুযোগ মিলবেনা। যখনি গোপন বন্দিদশা থেকে কাউকে মুক্তি দেয়া হয় তখন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা তাকে এমনভাবে ভীত করে হুমকি দেয় যে তার কি ঘটেছিলো সেটা নিয়ে আর ভয়ে মুখ খুলেনা।

ভিন্নমত দমন আর তাদের নিয়ন্ত্রণে নানান কৌশল অবলম্বন করে সরকার। তারি একটা কৌশল হলো জোরপূর্বক গুম করা এবং গোপন কারাগারে আটকে রাখা। রাজনীতির বিরোধী মতের যারা তাদের মধ্যে বিষয়টি ভয় আর যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনগণ এখন যেটা দেখতে পাচ্ছে সেটা হলো- যে কাউকে উঠিয়ে নেয়া হতে পারে, গুম করা হতে পারে, তাতে কার্যত কারোরি করার কিছু নেই। আর গুমের এমন সব রুটিনতর ঘটনায় আদালতের নজরদারিতে একরকম অনীহা দেখা যাচ্ছে।

২০০৯ সালে যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে তখন গুমের ঘটনা ঘটেছিলো ৩টি। ২০১৭ সালে সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ৯০ তে। যে তথ্যটা দেয়া হলো সেটা শুধু গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে।এছাড়াও আরো অনেক গুমের ঘটনা আছে যেগুলো শুধু ভুক্তভোগী পরিবার জানে।

মারুফের মতো অন্যরাও ফিরে আসুক এ আশা করি এবং প্রত্যাশা করি গোপন কারাগার নামে যেনাে আর কিছু না থাকে।

উৎসঃ জাস্ট নিউজ

আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশে গুম: ফিরে আসা ব্যক্তিদের থেকে কিছু জানা যায়না কেন?


প্রায় ১৫ মাস নিখোঁজ থাকার পর গতকাল নিজ বাড়িতে ফিরে এসেছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। তবে তিনি কোথায় কি অবস্থায় ছিলেন এবং ফিরলেন কিভাবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কিছু জানা যায়নি।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাত ১টার দিকে মারুফ জামান একা একাই তার ধানমন্ডির বাসায় ফিরে আসেন। বাড়ির ম্যানেজার তাকে দেখতে পেয়ে ওপরে নিয়ে যান। এ সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন বলে জানা গেছে।

মিস্টার জামানের মেয়ে গতকাল তার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে বাবার ফিরে আসার খবরটি নিশ্চিত করলেও এ বিষয়ে আর কিছু জানতে না চাওয়ার অনুরোধ করেন। এমনকি পুলিশের সঙ্গেও এখন কথা বলছেন না তারা।

পুলিশ কি বলছে?

ধানমন্ডি থানার ওসি আব্দুল লতিফ বলেন,”মারুফ জামানের মেয়ে আমাদেরকে জানিয়েছেন যে তার বাবা ফিরে এসেছেন। তাদের ভবনের ম্যানেজার তাকে দেখতে পেয়ে বাসার ভেতরে নিয়ে আসেন।”

মিস্টার মারুফের মেয়ে তার বাবার সঙ্গে কাউকেই এখন পর্যন্ত দেখা করতে দেননি। তাই তিনি কিভাবে ফিরেছেন, কোথা থেকে এসেছেন, কে দিয়ে গেছেন- কোন কিছুই জানা সম্ভব হয়নি।

ওসি আব্দুল লতিফ বলেন,”মারুফ জামানের খোঁজ নিতে আমার দুইজন লোক ওনার বাসায় গেলে তার মেয়ে বলেছেন যে উনি অসুস্থ। কোন কথা বলবেন না। একটু সুস্থ হওয়ার পর কথা বলবেন।”

মিস্টার জামান কিছু জানালে যদি কোন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ থাকে তাহলে পুলিশ সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে বলে জানান ওসি আব্দুল লতিফ।

গুম হওয়া ব্যক্তিদের অনেক পরিবারের অভিযোগ তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোন সহযোগিতা পাননা।

আশার আলো দেখছেন নিখোঁজদের পরিবার:

২০১৭ সালের চৌঠা ডিসেম্বর মারুফ জামান নিজ বাড়ি থেকে বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন।

তারও চার বছর আগে জাতীয় নির্বাচনের সময় আরো কয়েকজনের সঙ্গে নিখোঁজ হয়েছিলেন সাজেদুল ইসলাম নামে বিএনপির এক সংগঠক।

গত ছয় বছর ধরে প্রিয়জনের খোঁজ না পেলেও মিস্টার জামানের ফিরে আসা নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে সাজেদুলের পরিবারে।

তবে হাইকোর্টের রুল জারি সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত ভাইয়ের সন্ধানে কোন অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ জানান নিখোঁজের বোন সানজিদা ইসলাম।

“এটা আমাদের জন্য আশা যে ১৫ মাস পরে যদি মারুফ জামান ফিরে আসেন, তাহলে নিখোঁজ অন্যরাও ফিরতে পারেন।”

“আমরাও ভাইয়ের সন্ধানের দাবিতে অনেক সংবাদ সম্মেলন করেছি। মন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রশাসন আশ্বাস দিয়েছে তারা দেখবেন। কিন্তু তারা কোন তদন্ত করেনি।”

কেন তারা নীরব?

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৩১০জন গুমের শিকার হয়েছেন৷ তাদের মধ্যে ৩৩ জন ফেরত এসেছেন৷

তবে যারা ফিরে এসেছেন তাদের সঙ্গে কি ঘটেছিলো সে ব্যাপারে প্রায় কেউই মুখ খোলেননি।

রাষ্ট্রযন্ত্র ও আইনি কাঠামোর ওপর আস্থাহীনতা এই নীরবতার বড় কারণ বলে মনে করেন মানবাধিকার কর্মী এবং গুম পরিস্থিতির গবেষক নূর খান।

“রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা-বাহিনীর পক্ষ থেকে এমন কোন উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখা যায়না, যার কারণে তারা ছাড়া পাচ্ছেন এবং যারা তাদের আটক করেছে তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে।”

এছাড়া এতো দীর্ঘ সময় কাউকে আটক রাখা কোন দুষ্কৃতিকারী দলের পক্ষে সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এটা কেবল তাদের পক্ষেই সম্ভব যারা অনেক শক্তিশালী এবং নির্দেশিত পন্থায় কাজ করে।”

এ পর্যন্ত যারা ফিরে এসেছেন তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন নূর খান।

তিনি জানান প্রত্যেকের বক্তব্যে এটাই স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে তাদেরকে এমন জায়গায় রাখা হতো যেখানে সাধারণ মানুষের চলাচলের সুযোগ নেই এবং আটককারীরা প্রশিক্ষিত গ্রুপের সদস্য।

তবে তারা এই কথাগুলো প্রকাশ্যে আনতে চান না, আরেকটি বিপর্যয় ঘটতে পারে এমন আশঙ্কায়।গুম ঠেকাতে কি প্রয়োজন?

তবে এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ফিরে আসা প্রত্যেকের অভিজ্ঞতাগুলো সামনে আনা জরুরি বলে মনে করেন মানবাধিকার-কর্মী সুলতানা কামাল।

যেসব আশঙ্কা ও হুমকির কারণে এই মানুষগুলো মুখ খুলতে ভয় পান সেই ভয় দূর করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর আরও জোরালো ভূমিকা নেয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

সুলতানা কামাল বলেন, “এর আগে যারা হারিয়ে গিয়েছিলেন, পরে ফিরে এসেছেন, তাদের কাছে আমরা প্রশ্ন রেখেছিলাম, তার মধ্যে একটি উত্তর এমন ছিল যে, ছেলেমেয়ের ওপর যখন হুমকি আসে তখন মুখ খোলা কঠিন। তার মানে নিশ্চয়ই তাদেরকে এমনই কোন শর্ত দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। যার জন্য তারা মুখ খুলতে ভয় পান।”

“কিন্তু এটা আমি মনে করি তাদেরও একটা দায়িত্ব জানানো যে কি হয়েছিল না হয়েছিল। তাহলে আমরাও হয়তো এটা সুরাহা করার একটা পথ পেতাম। তাছাড়া আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তারাই বা এটার সুরাহা করেননা কেন?”

নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনের অভিযোগ, তারা প্রিয়জনের খোঁজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ করলেও এখনও কোনটির তদন্ত শুরু করা হয়নি।

এমন অবস্থায় প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।

উৎসঃ বিবিসি

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here