মাহে রমজানে আসুন নিজেকে বদলে ফেলি

0
67

প্রতিবছরই আসে পবিত্র মাহে রমজান। আমরা চেষ্টা করি বেশি বেশি ইবাদত করার। উদ্দেশ্য একটাই, যাতে গুনাহর পরিমাণ কম হয়। কারণ মাহে রমজানে সবকিছুই ৭০ গুণ বেড়ে যায়।

কেউ এ মাসে একটা ফরজ আদায় করলে যেমন বছরের অন্য মাসে ৭০টি ফরজ আদায়ের সওয়াব তার আমলনামায় লেখা হয়, তেমনি এ মাসে একটা গুনাহের কাজ করলেও অন্য মাসের ৭০টি গুনাহ্ তার আমলনামায় যোগ হয়।

কিন্তু সমস্যা হল রোজা আসে, আবার বিদায় নেয়। আমাদের স্বভাবের পরিবর্তন হয় না কেন? এটা বুঝলেই সমাজে ও মানুষের দিলে বা কলবে পরিবর্তন আসবে।

ইবাদতের কতগুলো কঠিন শর্ত রয়েছে যেগুলো পালন করতেই হবে। যেমন- তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করতে হবে। এ তাকওয়া আসবে তখনই যখন আপনি গিবত বা পরনিন্দা করবেন না, হারাম উপার্জন করবেন না। সুদ, ঘুষ, হিংসা থেকে দূরে থাকবেন। সমাজে দেখা যাচ্ছে পবিত্র রমজান মাসেও ঘুষ খাওয়া কমে না, মজুদদারি কমে না, অপরের হক জেনে-শুনে নষ্ট করছি। কারণটা কী?

আমাদের সমাজে, মহল্লায় ও রাষ্ট্রে তাকওয়া অর্জনে সবচেয়ে বড় বাধা গিবত, হারাম খাওয়া এবং হিংসা করা। গিবত মানবদেহের জন্য ক্যান্সারের মতো। ক্যান্সার যেমন শরীরের কোষগুলোকে খেয়ে ফেলে, গিবত তেমনি কুরে কুরে একজন মুসলমানের সব নেকি খেয়ে ফেলে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা একে অপরের গিবত কর না। তোমরা কি কেউ আপন মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করতে পছন্দ কর?’- সূরা হুজরাত (৪৯) : ১২।

নামাজ কবুল হওয়ার প্রতিবন্ধক হল গিবত। তাহলে পবিত্র রমজানে এত কষ্ট করে ২০ রাকাত তারাবির নামাজ পড়ে লাভ কী হবে?

তার পর আসি হালাল উপার্জন সম্পর্কে। এ ব্যাপারে বহু হাদিস রয়েছে। হাদিসে আছে, ‘হালাল রুজি ইবাদতের পূর্বশর্ত।’ (মুসলিম : ২২১৮)। মাহে রমজানে অনেকে অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে ফেতরা, জাকাত দিয়ে থাকেন। হজরত (সা.) এরশাদ করেন, ‘হারাম উপার্জনের সদকা কবুল হয় না।’ (মুসলিম : ৫৫৭)। আরও আছে, ‘হারাম খেয়ে যে শরীর হৃষ্টপুষ্ট হয় তা জান্নাতে যাবে না।’ (তারগিব : ৯৬৭)।

হিংসা করলেও কোনো ইবাদত কবুল হবে না। বলা হয়, হিংসা সাপের বিষের চেয়েও ভয়াবহ। সাপ কখনও নিজের বিষে মরে না, কিন্তু হিংসুক হিংসায় জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যায়।

কাজেই গিবত, হারাম খাওয়া এবং হিংসা- এ তিনটি কঠিন কবিরা গুনাহ্ থেকে বাঁচতে পারলে লোভ, অহঙ্কার, পরের হক নষ্ট, অশ্লীলতা ইত্যাদি পাপগুলো থেকে আল্লাহ পাকই রক্ষা করবেন, যদি আমাদের নিয়ত সহিহ্ হয়।

অথচ এ সত্যি কথা আজকের বেশিরভাগ ইমাম, মাওলানা সাহেব মসজিদে বলেন না। এ সব কথা বলে মানুষকে সচেতন করবেন তো আলেম ওলামারা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেন। অথচ তাদের সত্য কথা বলা উচিত। কালামে পাকে আছে, ‘আল্লাহ মিথ্যাকে মুছে ফেলেন ও তার বাণী দিয়ে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেন।’ (৪২, সূরা শূরা : ২৪)। আরও বর্ণিত আছে, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিও না আর জেনে-শুনে সত্য গোপন করো না।’ ( ২ সূরা বাকারা : ৪২)। অথচ প্রায় সব ইমাম, মাওলানারা নিজেদের স্বার্থে চুপ করে থাকেন।

আজকাল মসজিদ কমিটিগুলো দখলদারদের হাতে বন্দি। একশ্রেণীর কুটিল চরিত্রের প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রণ করছে অধিকাংশ মসজিদ। তারাই সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ ইত্যাদি। মসজিদ এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আর্থিক লাভ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দেখা যায় বড় নদীর আশপাশে জমি দখল করেই মসজিদ বানায়, পাশেই তিনতলা মাদ্রাসা ভবন তৈরি করা হয়েছে। উদ্দেশ্য যাতে পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ করা না যায়। ধর্মের নামে মানুষের ওপর জুলুম করছে একশ্রেণীর অল্প শিক্ষিত মোল্লা মুনশিরা। পবিত্র ধর্ম ইসলাম আজ অপবিত্র হচ্ছে স্বজনপ্রীতিতে। এসব করলে রমজানে মানুষ শুদ্ধ হবে কীভাবে?

মাহে রমজান হল তাকওয়া অর্জনের মাস। বছরের ১১ মাস হারাম খেয়ে, গিবত করে আর পকেটে ঘুষ নিয়ে শুধু পবিত্র মাহে রমজানে রোজা রেখে, আর রাতে দামি নকশাদার পাঞ্জাবি গায়ে ২০ রাকাত তারাবিহ পড়ে চরিত্র বদলানো যাবে কি? মন পাল্টানো যাবে কী?

হে সায়েম, প্রিয় ভাই আমার আসুন, খাস দিলে তওবা করি। পবিত্র কোরআনে আছে, ‘কিন্তু যারা তওবা করে আর নিজেদের সংশোধন করে এবং আল্লাহ্র আয়াতকে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে, এরাই তো তারা যাদের আমি ক্ষমা করি এবং আমি ক্ষমাকারী, পরম দয়ালু।’ (২, সূরা বাকারা : ১৬০)। এখনই তওবা করে পবিত্র হই, তাকওয়া সম্পন্ন মানুষ হই। পবিত্র মাহে রমজানে নিজেদের এমনভাবে বদলাই যেন বছরের বাকি মাসগুলোয়ও মুমিন বান্দার মতো জীবন কাটাতে পারি।

উৎসঃ ‌‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ ‌পঞ্চম তারাবিতে পড়া আয়াতের সারাংশ


আজ পঞ্চম তারাবিতে সুরা মায়েদার এগারতম রুকুর শেষার্ধ থেকে শুরু করে সুরার শেষ রুকু, ৮৩ থেকে ১২০ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পড়া হবে। সঙ্গে সুরা আনআমের পুরো অংশ এবং পরবর্তী সুরা আরাফের দ্বিতীয় রুকুর প্রথম আয়াত , ১ থেকে ১১ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পড়া হবে।

পারা হিসেবে আজ পড়া হবে সাত পারা থেকে শুরু করে আট পারার প্রথমার্ধ। পাঠকদের জন্য আজকের তারাবিতে পঠিত অংশের মূলভাব তুলে ধরা হল।

৫. সূরা মায়েদাহ: ৮৩-১২০

এগারতম রুকুর শেষার্ধ, ৮৩ থেকে ৮৬ নম্বর আয়াতে আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা সত্যনিষ্ঠ, তাদের প্রশংসা করা হয়েছে।

বলা হয়েছে, এসব জ্ঞানীরা আল্লাহর আয়াত শুনে অশ্রুবিগলিত হয়ে পড়ে। তারা বলে, হে আল্লাহ! এ মহাসত্যের সাক্ষী হিসেবে আমাদের তুমি কবুল করে নাও। এদের পুরস্কার হিসেবে জান্নাত দেয়া হবে বলে ওয়াদা করেছেন আল্লাহ তায়ালা। বারতম রুকু, ৮৭ থেকে ৯৩ নম্বর আয়াতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান দেয়া হয়েছে। কসম-শপথ ভাঙার কাফফারা, মদ-জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্যনির্ণায়ক তীর বা পাশা হারাম করা হয়েছে এ রুকুতে।

তেরতম রুকু, ৯৪ থেকে ১০০ নম্বর আয়াতে ইহরাম অবস্থায় শিকার নিষেধ করা হয়েছে। কেউ যদি ইহরাম অবস্থায় শিকার করে ফেলে তবে তার কাফফারা কী হবে, তাও বলা হয়েছে এ রুকুতে। চৌদ্দতম রুকু, ১০১ থেকে ১০৬ নম্বর আয়াতে অহেতুক প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বলা হয়েছে, অহেতুক প্রশ্ন তোমাদের জন্য অকল্যাণ ডেকে আনে। তাই এ থেকে বিরত থাক। আরো বলা হয়েছে, কারো মৃত্যুর সময় অসিয়ত করা জরুরি। আর অসিয়তের সময় যেন দুজন সাক্ষী রাখা হয়।

সাক্ষীদের থেকে যদি মিথ্যার আশঙ্কা থাকে অথবা অন্য কেউ যদি দাবি করে আমাকে ভিন্নরকম অসিয়ত করা হয়েছে- এমন নাজুক পরিস্থিতি মোকাবেলায় কসমের মাধ্যমে সমাধান করতে বলা হয়েছে। পনেরো ও ষোলতম তথা শেষ রুকু, ১০৯ থেকে ১২০ নম্বর আয়াতে কেয়ামতের দিন হজরত ঈসা (আ.) এবং তার মা হজরত মরিয়ম (আ.) এর সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা কী কথা বলবেন, খ্রিস্টানদের সম্পর্কে কী জিজ্ঞেস করবেন- এ কথা বলে সুরার ইতি টানা হয়েছে।

৬. সুরা আনআম ১-১৬৫

২০ রুকু ও ১৬৫ আয়াত সম্বলিত এ সুরা অবতীর্ণ হয়েছে মক্কায়। আজকের তারাবিতে সম্পূর্ণ সুরাই পড়া হবে।

সুরার প্রথম রুকু থেকে চতুর্থ রুকু, ১ থেকে ৪১ নম্বর আয়াত পর্যন্ত কাফেরদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব, তাদের হঠকারি আচরণের তীব্র নিন্দা করা হয়েছে।

তাদেরকে বলা হয়েছে, তোমরা একটু চোখ মেলে দেখ ও ভাব। তোমরা যা বলছ ও করছ তা কতটুকু সঠিক?

আমিই তোমাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তোমাদের জন্য দিয়েছি একটি নির্দিষ্ট হায়াত, আমি জানি তোমরা কী করছ। তারপরও তোমরা আমার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করছ?

পঞ্চম থেকে দশম রুকু, ৪২ থেকে ৯০ নম্বর আয়াত পর্যন্ত আগের ধারাবাহিকতায় আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস ও ঈমানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

এখানেও কাফেরদের মনে জাগা ও মুখে তোলা অনেক প্রশ্নের জবাব দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, হে নবী! আপনি আমার বান্দাদের জিজ্ঞেস করুন, তারা যখন জলে-স্থলে বিপদে পড়ে, তখন কে তাদের উদ্ধার করে? কার কাছে তারা কাকুতি-মিনতি করে বলে, হে আল্লাহ আমাকে এবারের মত বাঁচিয়ে দাও। তাহলে আমি তোমার কৃতজ্ঞবান্দা ভালো মানুষ হয়ে জীবনযাপন করব। আমিই তাদের প্রার্থনা শুনি। তাদের বিপদ দূর করি। সুতরাং তোমরা আমার অনুগত বান্দা হয়ে সুন্দর-সুখী জীবনযাপন করো।

পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও আখেরাতের বিশালতা উল্লেখ করে মোমিন সম্প্রদায়কে নসিহত করা হয়েছে। এক পর্যায়ে ইবরাহিম(আ.) এর উদাহরণ দেয়া হয়েছে। কীভাবে তিনি ইমানের নিদর্শন পেলেন তা বলা হয়েছে বিস্তারিতভাবে। তার পিতার সঙ্গে যুক্তিতর্কের পুরো দৃশ্য তুলে ধরেছেন বড় নিখুঁতভাবে। এগারতম রুকু, ৯১ থেকে ৯৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহর পক্ষ থেকে কিতাব নাজিলের প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা আলোচনা করা হয়েছে।

যারা কিতাব নিয়ে অযথা তর্কবিতর্কে লিপ্ত তাদেরকে তাদের মত ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, আল্লাহর কিতাব নিয়ে যে মিথ্যা বলে তার চেয়ে বড় জালেম আর কেউ নেই। কেয়ামতের দিন সে ভোগ করবে অপমানজনক-লাঞ্চনাদায়ক শাস্তি।

বারতম রুকু, ৯৫ থেকে ১১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নিজেই নিজের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি কীভাবে বিশ্বরাজ্য পরিচালনা করছেন এর কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে তার প্রতি ঈমান আনার উদাত্ত আহ্বান করা হয়েছে। এরপরও যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে না- তাদের শাস্তি কী হবে তাই বলা হয়েছে।

চৌদ্দ ও পনেরতম রুকু, ১১১ থেকে ১২৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, চোখের সামনে এতসব নিদর্শন দেখেও অনেকেই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে না। তারা উল্টো হঠকারি আচরণ করবে। পরকালে এদের জীবন কত কষ্ট ও যন্ত্রণাদায়ক হবে তাও বলা হয়েছে।

ষোল ও সতেরতম রুকু, ১৩০ থেকে ১৪৪ নম্বর আয়াতে সাধারণ নসিহত করা হয়েছে, যাতে করে মানুষ আল্লাহ, কিতাব, নবী ও আখেরাতের প্রতি ইমান আনতে পারে।

এজন্য আল্লাহ তায়ালা গাছ, বাগান, ফল, ফুল, শস্য ও গবাদি পশু সৃষ্টি করেছেন কীভাবে সে উদাহরণ দিয়েছেন। কেউ যদি তার চারপাশের এসব সৃষ্টিরাজির প্রতি ভাবুক মন ও গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকায় তাহলেই সে বুঝতে পারবে এসব সৃষ্টির পেছনে যে স্রষ্টা রয়েছে, তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তার কাছেই আবার সবাইকে ফিরে যেতে হবে।

আঠার ও উনিশতম রুকু, ১৩০ থেকে ১৫৪ নম্বর আয়াতে উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য আল্লাহ তায়ালা কী খাদ্য হারাম করেছেন আর ইহুদীদের জন্য কী হারাম করেছিলেন তার একটা তুলনামূলক পর্যালোচনা করা হয়েছে।

এরপর আল্লাহ তায়ালা বিকৃত ইহুদি ধর্মের সঠিক রূপ বলে দিয়েছেন। ওই ধর্মে আসলেই কী কী নিষিদ্ধ ছিল তা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। বিশতম রুকু, ১৫৫ থেকে ১৬৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী কিতাব যা হারাম করেছে, কোরআনও তাই হারাম করেছে। তাই কোরআনের দাওয়াত মেনে নেয়ার জন্য আর কোন অজুহাত নেই। এর যৌক্তিকতা তুলে ধরেই সুরা আনআম শেষ করা হয়েছে।

৭. সূরা আরাফ: ১-১১

সুরা আরাফ মক্কায় নাজিল হয়েছে। এর আয়াত সংখ্যা ২০৬ এবং রুকু ২৪টি। আজ পড়া হবে প্রথম রুকুর পুরোটা এবং দ্বিতীয় রুকুর প্রথম আয়াত।

প্রথম রুকু, ১ থেকে ১০ নম্বর আয়াতে কোরআন নাজিলের উদ্দেশ্য বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, এ কিতাব মানুষের হেদায়াতের জন্য নাজিল করা হয়েছে।

এর পর বলা হয়েছে, অতীতে যারাই আল্লাহর কিতাব অমান্য করেছেন, তাদেরকে বিভিন্ন আজাব দিয়ে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। এখনও যারা আল্লাহর কিতাব মানবে না, তাদেরও একইভাবে শাস্তি দেয়া হবে।

দ্বিতীয় রুকুর প্রথম আয়াত, ১১ নম্বর আয়াতে মানব সৃষ্টির ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সুরা বাকারার পর এখানে আবার আদম (আ.) ও ইবলিসের ঘটনা আরেকটু বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

উৎসঃ ‌‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ ‌৪র্থ তারাবিতে পঠিত আয়াতসমূহের সারাংশ


আজ ৪র্থ তারাবিতে সুরা নিসার ১২তম রুকুর শুরু থেকে সুরার শেষ রুকু; অর্থাৎ ৮৮ থেকে ১৭৬ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পড়া হবে। সঙ্গে সুরা মায়েদার প্রথম রুকু থেকে ১১তম রুকুর মাঝামাঝি অংশ, ১ থেকে ৮২ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পড়া হবে। পারা হিসেবে আজ পড়া হবে পাঁচ পারার শেষার্ধ থেকে শুরু করে ছয় পারার পুরো অংশ।

৪. সুরা নিসা: ৮৮-১৭৬

১২তম রুকু। ৮৮ থেকে ৯১ নম্বর আয়াত পর্যন্ত আল্লাহতায়ালা মুমিনদের উদ্দেশ্য করে মোনাফিকদের সম্পর্কে বলেছেন- মোনাফিকদের ব্যাপারে কোনো দ্বিধায় থাকা যাবে না। পাক্বা ইমান আনলে তারা মুমিনদের ভালোবাসা ও সহযোগিতা পাবে, নয়তো তাদের সঙ্গে মুমিনদের কোনো সম্পর্ক নেই।

১৩তম রুকু। ৯২ থেকে ৯৬ নম্বর আয়াতে ভুলক্রমে কোনো মুমিন অন্য মুমিনকে হত্যা করলে কী ক্ষতিপূরণ দিতে হবে সে সম্পর্কে বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধের ময়দানে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে শত্রুমিত্র পার্থক্য করা জানতে হবে। আর যারা সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও জিহাদের ডাকে সাড়া না দিয়ে ঘরে বসে থাকে, তারা কখনব মর্যাদাবান মুমিনদের কাতারে শামিল হতে পারবে না।

১৪তম রুকু। ৯৭ থেকে ১০০ নম্বর আয়াতে নির্যাতনে অসহ্য হয়ে কেউ যেন নিজেই নিজেকে হত্যা না করে বসে। বরং সে যেন অন্য কোথাও হিজরত করে সে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

১৫তম রুকু। ১০১ থেকে ১০৪ নম্বর আয়াতে ভয়কালীন নামাজ ও যুদ্ধকালীন নামাজ পড়ার বিধান ও নিয়ম বলে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে- শত্রুর সঙ্গে মোকাবেলায় কোনো ধরনের শিথিলতা বা দুর্বলতা দেখানো যাবে না।

১৬ থেকে ১৮তম রুকু। ১০৫ থেকে ১২৫ নম্বর আয়াতে মুমিনদের উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন নসিহত করা হয়েছে। অপরাধীদের পক্ষ নিয়ে ওকালতি নয়, বরং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করাই মুমিনদের কর্তব্য। গোনাহ করার পর কেউ ক্ষমা চাইলে অবশ্যই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন। তবে মনে রাখতে হবে, কেউ যদি গোনাহ করে, সে আসলে নিজেরই ক্ষতি করে। তাই গোনাহ থেকে দূরে থাকতে হবে। পাশাপাশি নিজের গোনাহর দায়ভার অন্যের ওপর চাপানো থেকে মুক্ত থাকতে হবে।

১৯তম রুকু। ১২৭ থেকে ১৩২ নম্বর আয়াতে নারীদের ব্যাপারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক বিধান দেয়া হয়েছে। কোনো নারী যদি তার স্বামী থেকে অবজ্ঞা-অবহেলা পেয়ে থাকে- তা হলে তার করণীয় কী এ সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক যৌক্তিক পরামর্শ দিয়েছেন আল্লাহতায়ালা।

২০ ও ২১তম রুকু। ১৩৫ থেকে ১৫২ নম্বর আয়াতে মুমিনদের সত্যের ওপর অটল থাকার হেদায়েত করা হয়েছে। আর মোনাফিকদের ব্যাপারে সজাগ-সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মোনাফিকরা আল্লাহ ও মুমিনদের ধোঁকা দিতে চায়। কিন্তু তারা নিজেরাই ধোঁকার মধ্যে পড়ে রয়েছে। তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তর।

২২ থেকে ২৪ রুকু। ১৫৩ থেকে ১৭৬ নম্বর তথা শেষ আয়াত পর্যন্ত কাফিরদের প্রশ্নের জবাবে মুসা (আ.) ও অন্যান্য নবীর দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে- ওই সব নবীও সত্যের বাণী প্রচার করতে গিয়ে আরও কঠিন ও জটিল সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। এসব সমস্যা মোকাবেলার জন্য হেকমতের সঙ্গে কাজ করতে হবে। আরও কিছু নির্দেশ ও আইনি বিধান দিয়ে সুরার ইতি টানা হয়েছে।

৫. সুরা মায়েদাহ : ১-৮২

সুরা মায়েদাহ অবতীর্ণ হয়েছে মদিনায়। এর আয়াত সংখ্যা ১২০ এবং রুকু ১৬টি। আজ পড়া হবে ১১তম রুকু পর্যন্ত।

সুরার প্রথম রুকু। ১ থেকে ৫ নম্বর আয়াত পর্যন্ত ইহরাম অবস্থায় শিকার করা নিষিদ্ধ এবং কোন প্রাণী খাওয়া হারাম ও কোন প্রাণী খাওয়া হালাল এসব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় রুকু। ৬ থেকে ১১ নম্বর আয়াতে অজুর বিধান এবং মুমিনদের আল্লাহর অনুগত ও কৃতজ্ঞ বান্দা হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

তৃতীয় রুকু। ১২ থেকে ১৯ নম্বর আয়াতে বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসী, ইহুদি-খ্রিস্টানদের দল-উপদলের বিভিন্ন আকিদার অসারতা সংক্ষিপ্ত ও যুক্তিসঙ্গতভাবে প্রমাণ করা হয়েছে।

৪র্থ রুকু। ২০ থেকে ২৬ নম্বর আয়াতে নির্দিষ্ট করে ইহুদিদের হঠকারিতা সম্পর্কে বলা হয়েছে। তারা মুসা (আ.)-এর সঙ্গে কত নিচু আচরণ করেছে তা এই রুকুতে বিস্তারিত বলা হয়েছে।

পঞ্চম রুকু। ২৭ থেকে ৩৪ নম্বর আয়াতে আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের ঘটনা বলা হয়েছে। কীভাবে এক ভাই অন্যায়ভাবে আরেক ভাইকে হত্যা করে জাহান্নামি হয়ে গেছে- তা বিস্তারিত বলা হয়েছে।

ষষ্ঠ রুকু। ৩৫ থেকে ৪৩ নম্বর আয়াতে মুমিনদের আল্লাহভিরু হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। চোরের হাত কাটার বিধান এবং মোনাফিকদের আচার-আচরণে কষ্ট না পাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

সপ্তম রুকু। ৪৪ থেকে ৫০ নম্বর আয়াতে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। বলা হয়েছে- তাওরাত ও ইঞ্জিলের বিধান ছিল আল্লাহ প্রদত্ত বিধান। আর কোরআন হলো ওই দুই কিতাবের সত্যায়ক। তাই তাওরাত ও ইঞ্জিলের মতো এই সময়ও আল্লাহর কিতাব কোরআন অনুযায়ী পরস্পরের মাঝে ফায়সালা করতে হবে।

ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি নয়; বরং প্রত্যেকে ভালো কাজ করতে থাকুক। কে সত্যবাদী আর কে মিথ্যাবাদী সে ফায়সালা করবেন আল্লাহতায়ালা।

অষ্টম রুকু। ৫১ থেকে ৫৬ নম্বর আয়াতে ইসলাম বিরোধীমনা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বন্ধু না বানানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এ ধরনের কাজ অন্তরে রোগ আছে এমন মোনাফিকরাই করে থাকে। আরও বলা হয়েছে, ইমানদের আসল বন্ধু আল্লাহ এবং তার রাসুল। যারা আল্লাহ, আল্লাহর রাসুল এবং মুমিনদের বন্ধু বানায়, তারাই দুনিয়া ও আখেরাতে সফল হয়।

নবম রুকু। ৫৭ থেকে ৬৬ নম্বর আয়াতেও আহলে কিতাব ও মোনাফিকদের নানান আচরণ ও চরিত্র সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। মোনাফিকরা মুখে বলে আমরা নবীর কথা মেনে নিয়েছি, আর অন্তরে তারা নবীর বিরুদ্ধে, ইসলাম ও কোরআনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। এদের অনেকেই জুলুমবাজ ও হারামখোর। আলেমরা তাদের এসব কাজ নিষেধ না করে বড় ধরনের গোনাহ করছে।

দশম রুকু। ৬৭ থেকে ৭৭ নম্বর আয়াতে আহলে কিতাবদের পক্ষ থেকে বিশেষ করে হজরত ঈসা (আ.)-এর অনুসারীরা যে ধরনের ভ্রান্ত আকিদা পোষণ করে থাকে, তার অসারতা তুলে ধরা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, আহলে কিতাব অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিস্টান এবং সাবেয়িদের মধ্যে যারাই আল্লাহ এবং পরকালের জবাবদিহিতায় বিশ্বাস করবে, সে অনুযায়ী সৎজীবনযাপন করবে, তাদের কোনো ভয় নেই, তাদের কোনো চিন্তাও নেই।

১১তম রুকুর প্রথমার্ধে অর্থাৎ ৭৮ থেকে ৮২ নম্বর আয়াতে খ্রিস্টানদের মধ্যে যারা হজরত ঈসা ও মরিয়ম (আ) সম্পর্কে ভ্রান্ত আকিদায় বিশ্বাসী, তাদের নিন্দা করে বলা হয়েছে- এ ধরনের কাজে না ঈসা মসিহ (আ.) সন্তুষ্ট, না তার মা মরিয়ম (আ.) তোমাদের ওপর সন্তুষ্ট। এভাবে আহলে কিতাবদের ঘুমন্ত বিবেকের দরজায় কশাঘাত করা হয়েছে।

উৎসঃ ‌‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ ‌রোজা রেখে ওষুধ ব্যবহার


রোজা রাখা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ। রোজা পালন করা অবস্থায় রোগীর ওষুধপত্র সেবন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।

রোজা রাখা, ওষুধপত্র খাওয়া এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা নিয়ে অনেকের মনে এ সময় সংশয় দেখা দেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগী এসব ব্যবস্থাপত্র নিলে রোজার ক্ষতি হয় না বা রোজা নষ্ট হয় না।

অসুস্থ অবস্থায় রোজা রেখে ওষুধ গ্রহণের ব্যাপারে বিশ্বের ইসলামী চিন্তাবিদ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ইসলামী আলেম, ওলামা ও চিন্তাবিদদের সঙ্গে কথা বলে কিছু সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, রোজা থাকাবস্থায় বেশ কয়েকটি পন্থায় ওষুধ সেবন ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে রোজা নষ্ট হবে না।

এ ক্ষেত্রে নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ সার্জন অধ্যাপক ডা. এম আলমগীর চৌধুরী বলেন, কয়েক পন্থায় ওষুধ গ্রহণ করলে রোজা ভঙ্গ হয় না। রোজা রাখাবস্থায় চোখ, কান ও নাকের ড্রপ নেয়া যাবে।

রোগীর বুকে ব্যথা হলে নাইট্রোগ্লিসারিন স্প্রে জিহ্বার নিচে নিতে পারবেন। মূত্রথলী পরীক্ষা বা এক্স-রে করার জন্য রোগীর প্রস্রাবের দ্বার দিয়ে ক্যাথেটার অথবা অন্য কোনো যন্ত্র প্রবেশ করানো হলে রোজা ভঙ্গ হবে না।

মেসওয়াক অথবা ব্রাশ দিয়ে কেউ দাঁত পরিষ্কার করার সময় পাকস্থলীতে থুতু অথবা টুথপেস্ট প্রবেশ না করলে রোজা ভাঙবে না।

রোগীর চামড়া, মাংস ও শিরায় ইনজেকশন দেয়া যাবে। কিন্তু এ ইনজেকশন খাদ্যদ্রব্য (যেমন- স্যালাইন, ডেক্সট্রোজ স্যালাইন) হলে চলবে না। যে কেউ রক্ত দিতে পারবেন আবার চিকিৎসা নিতেও পারবেন।

কোনো রোগী অক্সিজেন অথবা অজ্ঞানকারী গ্যাস (এনেসথেসিয়া) নিলে রোজা ভঙ্গ হবে না। চর্মজাতীয় রোগ নিরাময়ে চামড়ায় মলম নেয়া যাবে।

আবার শরীরের কোনো হাড় ভেঙে গেলে সে ক্ষেত্রে প্লাস্টার করলে রোজা ভঙ্গ হবে না। কারও কোনো অসুখ হলে পরীক্ষার জন্য তার শরীর থেকে রক্ত নেয়া যাবে। হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী হার্টের এনজিওগ্রাম করার জন্য আর্টারিওগ্রাফ করতে পারবে না।

রোগীর অপারেশন অথবা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এন্ডোসকপি করলে রোজা ভাঙবে না। মুখ পরিষ্কারের জন্য মাউথওয়াশ বা কুলি করা যাবে, যাতে পাকস্থলীতে কোনো কিছু না যায়।

জরায়ু পরীক্ষার জন্য শরীরে কোনো যন্ত্রপাতি বা অন্যকিছু পরীক্ষার জন্য প্রবেশ করালে রোজায় কোনো সমস্যা হবে না। লিভার বায়োপসি অথবা অন্য কোনো অঙ্গের বায়োপসি করলে রোজা নষ্ট হবে না।

নাকে স্প্রে ও ইনহেলারজাতীয় কিছু নিলে কোনো সমস্যা নেই। রোগীর পায়ুপথে ইনজেকশন অথবা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কোনো কিছু প্রবেশ করালে অথবা শরীর অবশ করালে রোগী যদি ইচ্ছা করেন তা হলে তিনি রোজা থাকতে পারবেন।

রোগীর কিডনি ডায়ালাইসিস করালে রোজা ভাঙবে না। পাকস্থলী পরীক্ষা করার জন্য গ্যাসট্রোস্কপি করা যাবে কিন্তু কোনো তরল প্রবেশ করানো যাবে না।

এ মতামতগুলো নিয়ে অনেক চিকিৎসকের মধ্যে বিভ্রান্তি হতে পারে। তবে এ মতামতগুলো বিশ্বের ইসলামী চিন্তাবিদ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।

উৎসঃ ‌‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ ‌রোজার আধুনিক কয়েকটি মাসআলা


পেস্ট, টুথ পাউডার ব্যবহার করা

রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় টুথ পাউডার, পেস্ট, মাজন ইত্যাদি ব্যবহার করা মাকরূহ। কিন্তু গলায় পৌঁছালে রোজা ভেঙে যাবে। (জাদিদ ফিকহি মাসায়েল)

মুখে ওষুধ ব্যবহার করা

মুখে ওষুধ ব্যবহার করে তা গিলে ফেললে বা ওষুধের অংশ বিশেষ গলায় প্রবেশ করলে রোজা ভেঙে যাবে। গলায় প্রবেশ না করলে রোজা ভাঙবে না। (ফতওয়া শামি)

রোজা রেখে রক্ত দেয়া-নেয়া

শরীরে রক্ত নিলে বা নিজ শরীর থেকে কাউকে রক্তদান করলে কোনো অবস্থাতেই রোজা নষ্ট হবে না। কারণ রক্ত দেয়ার কারণে কোনো বস্তু দেহের ভেতরে ঢুকেনি, তাই তাতে রোজা নষ্ট হওয়ার প্রশ্নই আসে না। আর রক্ত নিলে যেহেতু এ রক্ত শরীরের উল্লেখযোগ্য চার নালি থেকে কোনো নালি দিয়ে প্রবেশ করে না, বরং শরীরের অন্যান্য ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে প্রবেশ করে। সুতরাং রোজাবস্থায় কারও শরীরে রক্ত দান করলে বা নিজে রক্ত গ্রহণ করলে রোজা নষ্ট হবে না। তবে খুব বেশি পরিমাণে রক্ত দেয়া যার দ্বারা শরীরে দুর্বলতা আসে, তা মাকরূহ।

(আল-কাসানি, খ. ২, পৃ. ৯২; ইবনে আবিদিন, খ. ৩, পৃ. ৪০০; আল-ফাতওয়া আল-হিন্দিয়া, খ. ১, পৃ. ২০০)

ইনজেকশন নেয়া

ইনজেকশন নিলে রোজা নষ্ট হবে না। চাই তা মাংসে নেয়া হোক বা রগে। কারণ ইনজেকশনের সাহায্যে দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশকৃত ওষুধ মাংস বা রগের মাধ্যমেই প্রবেশ করানো হয়ে থাকে, যা অস্বাভাবিক প্রবেশপথ, তাই এটি রোজা ভঙ্গের গ্রহণযোগ্য কারণ নয়।

(ইবনে আবিদিন, খ. ২, পৃ. ৩৯৫; (খ) ইবনু নুজাইম, খ. ২, পৃ. ২৭৮; (গ) আপকে মাসায়েল আওর উনকা হলো, খ. ৩, পৃ. ২১৪)

ডায়াবেটিস পরীক্ষা

ডায়াবেটিসের ‍সুগার মাপার জন্য সুচ ঢুকিয়ে যে একফোঁটা রক্ত নেয়া হয়, এতে রোজার কোনো ক্ষতি হবে না।

নাকে ওষুধ দেয়া

নাকে পানি বা ওষুধ দিলে যদি তা খাদ্যনালিতে চলে যায়, তা হলে রোজা ভেঙে যাবে এবং কাজা করতে হবে।

চোখে ওষুধ বা সুরমা ব্যবহার

চোখে ড্রপ, ওষুধ, সুরমা বা মলম ইত্যাদি ব্যবহার করলে রোজা নষ্ট হবে না। যদিও এগুলোর স্বাদ গলায় উপলদ্ধি হয়। কারণ চোখে ওষুধ ইত্যাদি দিলে রোজা না ভাঙার বিষয়টি হাদিস ও ফিকাহ শাস্ত্রের মূলনীতি দ্বারা প্রমাণিত।

(জাদিদ ফিকহি মাসায়েল, খ. ১, পৃ. ১৮৩; (খ) আলিম ইবনুল আলা, আল-ফাতাওয়া আত-তাতারখানিয়া, খ. ২, পৃ. ৩৬৬)

কানে ওষুধ প্রদান করা

কানে ওষুধ, তেল ইত্যাদি ঢুকালে রোজা ভেঙে যাবে। তবে গোসল করার সময় অনিচ্ছায় যে পানি কানে ঢুকে তাতে রোজা ভঙ্গ হবে না। অবশ্য এ ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, যেন পানি গলায় না চলে যায়। (মাকালাতুল ফিকহিয়া)

নকল দাঁত মুখে রাখা

রোজা রেখে নকল দাঁত মুখে স্থাপন করে রাখলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। (ইমদাদুল ফতওয়া)

স্যালাইন

স্যালাইন নেয়া হয় রগে, আর রগ যেহেতু রোজা ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য রাস্তা নয়, তাই স্যালাইন নিলে রোজা ভাঙবে না। তবে রোজার কষ্ট লাঘবের জন্য স্যালাইন নেয়া মাকরূহ। (ফতওয়ায়ে দারাল উলুম)

ইনসুলিন গ্রহণ করা

ইনসুলিন নিলে রোজা ভাঙবে না। কারণ ইনসুলিন রোজা ভঙ্গ হওয়ার গ্রহণযোগ্য রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করে না এবং গ্রহণযোগ্য খালি জায়গায় প্রবেশ করে না।

(ইবনে আবিদিন, খ. ৩, পৃ. ৩৬৭; (খ) ইসলাম ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান, পৃ. ৩২৭)

দাঁত তোলা

রোজা অবস্থায় একান্ত প্রয়োজন হলে দাঁত তোলা জায়েজ আছে। তবে অতিপ্রয়োজন না হলে এমনটি করা মাকরূহ। ওষুধ যদি গলায় চলে যায় অথবা থুতু থেকে বেশি অথবা সমপরিমাণ রক্ত যদি গলায় যায় তা হলে রোজা ভেঙে যাবে। (আহসানুল ফতওয়া)

উৎসঃ ‌‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ ‌তৃতীয় তারাবিতে পঠিত আয়াতসমূহের সারাংশ


আজ তৃতীয় তারাবিতে সুরা আল ইমরানের দশম রুকুর শুরু থেকে সুরার শেষ রুকু পর্যন্ত, ৯২ থেকে ২০০ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পড়া হবে। সঙ্গে সুরা নিসার প্রথম রুকু থেকে ১১তম রুকুর পুরো অংশ, ১ থেকে ৮৭ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পড়া হবে। পারা হিসেবে আজ পড়া হবে চার পারা থেকে শুরু করে পাঁচ পারার প্রথমার্ধ।

৩. আল ইমরান: ৯১-২০০

১০ম ও ১১তম রুকু। ১ থেকে ১০৯ নম্বর আয়াত পর্যন্ত আহলে কিতাব ও মোমিনদের সম্বোধন করা হয়েছে। উভয়কে মৌলিক উপদেশ ও পথ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এই দুই রুকুতে। পছন্দের জিনিস কোরবান না করা পর্যন্ত কেউ-ই আল্লাহর প্রিয় হতে পারবে না এই বলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

তার পর আহলে কিতাবের আলেমদের উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে- তারা যেন জেনেশুনে সত্য গোপন না করে। কোরআন এসেছে পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলোর সত্যায়ন করতে। তা ছাড়া পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবের নির্দেশ ডিঙিয়ে ইহুদি ও খ্রিষ্টান আলেমরা সাধারণ মানুষের জন্য যা যা নিষেধ করে রেখেছিল, কোরআন এসে ওগুলোকে বৈধ করে দিয়েছে।

পৃথিবীতে বিশ্বাসীদের রাজ কায়েম করতে হলে এবং খুব দ্রুত সফল হতে চাইলে অবশ্যই বিশ্বাসীদের একটি সংঘ থাকা প্রয়োজন। যে সংঘের অধীনে তারা নিজেদের এবং মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করবে।

তার পর আল্লাহতায়ালা বলেছেন, এই দুনিয়ায় যেমন কেউ সফল হলে তার চেহারায় আনন্দের চিহ্ন ফুটে ওঠে এবং ব্যর্থ হলে লজ্জায় চেহারা কালো হয়ে যায়। তেমনি কেয়ামতের দিনও মানুষের একই অবস্থা হবে। বিশ্বাসীদের চেহারা থাকবে হাস্যোজ্জ্বল। আর অবিশ্বাসীদের চেহারা অপমান-হতাশা আর লজ্জায় ছেয়ে যাবে।

১২তম রুকু।১১০ থেকে ১২০ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বিশ্বাসীদের গুরুত্বপূর্ণ একটি হেদায়াত করেছেন। বলেছেন- হে বিশ্বাসীরা! তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। তোমরা মানুষের কল্যাণ করবে এবং পৃথিবীবাসীর নেতৃত্ব দেবে। পূর্ববর্তীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ওদের মধ্যে কিছু খাঁটি বিশ্বাসী আছে ঠিক, তবে তাদের বেশিরভাগই সত্য থেকে দূরে। তারা তোমাদের কষ্ট দিতে চায়। কিন্তু তাদের না আছে মনের জোর, না আছে গায়ের জোর। তাই প্রকৃত বিশ্বাসীদের মোকাবেলায় তারা কখনই সফল হবে না। তারা যদি কোনো ভালো কাজ করে থাকে, তবে তার প্রতিদান আল্লাহ দেবেন। কিন্তু প্রকৃত বিশ্বাসী কখনই কপট এবং অবিশ্বাসীকে বন্ধু বলে গ্রহণ করতে পারে না। এতে করে নিজেকেই বিপদে ফেলা হয়।

১৩তম রুকু। ১২১ থেকে ১২৯ নম্বর আয়াতে বদর যুদ্ধের আলোচনা করা হয়েছে। অল্পসংখ্যক বিশ্বাসীকে আল্লাহতায়ালা কীভাবে আসমান থেকে ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্য করেছেন এবং কীভাবে বিশ্বাসীদের দুর্বল মনকে চাঙ্গা করেছেন সে কথা বলা হয়েছে এখানে। অবিশ্বাসীরা যেন হতাশায় কালো অন্ধকারে ডুবে যায় এবং লাঞ্ছনার গভীর গর্তে পড়ে যায়- মূলত এ জন্যই বিশ্বাসীদের হাতকে শক্তিশালী করেছেন মহাক্ষমতাধর আল্লাহপাক। আকাশ ও পৃথিবীর নিয়ন্ত্রক আল্লাহর জন্য এটা খুবই সহজ।

১৪তম রুকু।১৩০ থেকে ১৪৩ নম্বর আয়াতে খাঁটি বিশ্বাসীদের গুণাবলি আলোচনা করা হয়েছে। তারা সুদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না। আল্লাহ এবং তার রাসুলকে মেনে চলে। সচ্ছল-অসচ্ছল সবসময়ই দান করে। রাগ নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষকে ক্ষমা করে দেয়। তারা হতাশ হয় না। এসবই বিশ্বাসীদের জন্য সুখের জীবন এবং শান্তির জান্নাত অপেক্ষা করছে। তবে হ্যাঁ! জান্নাত লাভ করতে চাইলে অক্লান্ত পরিশ্রম করেই সাফল্যের চূড়ায় উঠতে হবে।

১৫ থেকে ১৮তম রুকু। ১৪৪ থেকে ১৮০ নম্বর আয়াত পর্যন্ত ওহুদ যুদ্ধের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। মাঝে মাঝে কাফেরদের পক্ষ থেকে ওঠা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা ও মোমিন বাহিনীর প্রশংসা করা হয়েছে।

১৯তম রুকু। ১৮১ থেকে ১৮৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সম্পর্কে কাফেরদের বিভিন্ন ধারণা ও প্রশ্নের জবাব দেয়া হয়েছে। মোমিন বাহিনীকে বারবার পরীক্ষা করা হবে এ কথাও বলা হয়েছে।

২০তম তথা শেষ রুকু। ১৯০ থেকে ২০০ নম্বর আয়াতে উপসংহারস্বরূপ কিছু হেদায়াতি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, বিশ্বাসীরা আল্লাহর সৃষ্টি রাজ্য নিয়ে ভাবে এবং সবসময় জিকির ও প্রশংসাকীর্তনে লিপ্ত থাকে। পরস্পর ধৈর্য ধারণ করতে হবে, আল্লাহভিরুতার জীবনযাপন করতে হবে। তবেই মোমিনের জীবনে সফলতা ধরা দেবে বলে সুরার ইতি টানা হয়েছে।

উৎসঃ ‌‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ ‌যেসব কারণে রোজা ভেঙে যায়, যে কারণে রোজা মাকরুহ হয়


সুবেহ সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরনের পানাহার এবং জৈবিক চাহিদা থেকে বিরত থেকে রোজা রাখেন মুসলিমরা। তবে কয়েকটি ভুলের কারণে আমাদের রোজা ভেঙে যেতে পারে। তাই আসুন রোজা ভঙ্গের কারণসমূহ জেনে নিই।

১. রোজা স্মরণ থাকাবস্থায় কোনো কিছু খাওয়া বা পান করা অথবা স্ত্রী সহবাস করা। এতে কাজা ও কাফফারা (একাধারে দুই মাস রোজা রাখা) ওয়াজিব হয়।

২. নাকে বা কানে তৈল বা ওষুধ প্রবেশ করানো।

৩. নস্য বা হাঁপানী রোগীর জন্য ইনহেলার গ্রহণ করা। ৪. ইচ্ছাকৃতভাবে মুখভরে বমি করা।

৫. বমি আসার পর তা গিলে ফেলা।
৬. কুলি করার সময় পানি গলার ভেতরে চলে যাওয়া। ৭. দাঁতে আটকে থাকা ছোলার সমান বা তার চেয়ে বড় ধরনের খাদ্যকণা গিলে ফেলা।

৮. মুখে পান রেখে ঘুমিয়ে পড়ে সুবেহ সাদিকের পরে জাগ্রত হওয়া। ৯. ধূমপান করা।

১০. ইচ্ছাকৃতভাবে আগরবাতি কিংবা অন্য কোনো সুগন্ধি দ্রব্যের ধোঁয়া গলধকরণ করা বা নাকের ভেতরে টেনে নেয়া। ১১. রাত মনে করে সুবেহ সাদিকের পর সাহরি খাওয়া বা পান করা।

১২. সূর্যাস্তের পূর্বে সূর্য অস্তমিত হয়েছে ভেবে ইফতার করা।

এসব কারণে রোজা ভেঙে গেলে শুধু কাজা (পরে একটি রোজা রাখা) ওয়াজিব হয়, কাফফারা ওয়াজিব হয় না। কিন্তু রোজা ভেঙে যাওয়ার পর দিনের বাকি সময় রোজাদারের ন্যায় পানাহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে।

সূত্র: রদ্দুল মুহতার ও দুররে মুখতার: ২/৪০২

যেসব কারণে রোজা মাকরুহ হয়

মাকরুহ অর্থ অপছন্দনীয়। যেসব কাজ করলে গুনাহ হয় না; তবে ইসলামে অপছন্দ করা হয়েছে সেগুলোকে মাকরুহ বলে।

রোজার ক্ষেত্রেও অনেক কাজ এমন রয়েছে, যেগুলো করলে রোজা ভঙ্গ হবে না। তবে এ ধরনের কাজ করা ঠিক নয়।

১. মিথ্যা কথা বলা।

২. গিবত বা চোগলখোরি করা।

৩. গালাগাল বা ঝগড়া-ফ্যাসাদ করা।

৪. কোন কবিরাহ গুনাহে লিপ্ত হওয়া।

৫. সকালবেলায় নাপাক অবস্থায় থাকা।

৬. রোজার কারণে অস্থিরতা বা কাতরতা প্রকাশ করা।

৭. কয়লা, মাজন, টুথপাউডার, টুথপেস্ট বা গুল দিয়ে দাঁত মাজা।

৮. অনর্থক কোনো জিনিস মুখের ভেতরে দিয়ে রাখা।

৯. অহেতুক কোনো জিনিস চিবানো বা চেখে দেখা।

১০. কুলি করার সময় গড়গড়া করা।

১১. নাকের ভেতর পানি টেনে নেয়া। (কিন্তু ওই পানি গলায় পৌঁছলে রোজ ভেঙে যাবে।)

১২. ইচ্ছাকৃতভাবে মুখে থুতু জমা করে গিলে ফেলা।

১৩. ইচ্ছাকৃতভাবে অল্প বমি করা।

সূত্র: দুররে মুখতার: ২/৪১৬, বাদাইউস সানায়ে: ২/৬৩৫, কিতাবুল ফিকহ: ১/৯২৩

উৎসঃ ‌‌যুগান্তর

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here