নিউজিল্যান্ডে হামলা ও সভ্যতার সংঘাতের ‘ছক’: ১৯৯৮ সালে ‘সেভিওর’ সিনেমায় হামলার পরিকল্পনা!

0
231

ড. মারুফ মল্লিক

সদ্য বলকান যুদ্ধ শেষ হয়েছে। বলকানের মানুষের গায়ে তখনো যুদ্ধের ক্ষত। মার্কিন লেখক, চলচ্চিত্রকার ও ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিক অলিভার স্টোন একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করলেন। পরিচালক সদ্য যুগোস্লাভিয়া ভেঙে তৈরি হওয়া সার্বিয়ার পরিচালক পেটার আন্তোনিয়েভিচ। চলচ্চিত্রটি অনেকেই দেখেছেন। আমিও বহুবার দেখেছি। নাড়া দেওয়ার মতো একটি চলচ্চিত্র। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এটি একটি যুদ্ধবিরোধী চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটির নাম ‘সেভিওর’। এতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন ডেনিস কোয়াইদ। চলচ্চিত্রে ডেনিস অভিনীত চরিত্রটির নাম জশুয়া রোজ। ১৯৯৮ সালে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রের শুরুতেই দেখা যায় সন্ত্রাসী হামলা দৃশ্য। জশুয়া মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা হিসেবে প্যারিসে মার্কিন দূতাবাসে নিয়োজিত ছিল। প্যারিসের এক কফিশপে স্ত্রী ও ছেলের সঙ্গে দেখা করে জশুয়া। জশুয়া সেখান থেকে বেরিয়ে এসে মার্কিন দূতাবাসে ঢুকতে যাওয়ার সময় কফিশপে ইসলামিস্ট সন্ত্রাসীরা হামলা করে। জশুয়ার স্ত্রী ও ছেলের মৃত্যুর নিদারুণ দৃশ্য দেখা যায় চলচ্চিত্রটিতে। এরপরই জশুয়া ক্ষিপ্ত হয়ে স্ত্রী ও সন্তান হত্যার প্রতিশোধ নিতে এক মসজিদে হামলা করে নামাজরত অবস্থায় মুসল্লিদের একে একে গুলি করে হত্যা করে।

নিউজিল্যান্ডের ঘটনার সঙ্গে কি কোনো মিল পাচ্ছেন? বলা হচ্ছে, ২০১৭ সালের এপ্রিলে স্টকহোমে উজবেক যুবকের হামলার প্রতিশোধে ক্রাইস্টচার্চে হামলা করেছেন অস্ট্রেলীয় যুবক ব্রেনটন টারান্ট। ‘সেভিওর’ সিনেমার সঙ্গে আমি কেমন যেন হুবহু মিল খুঁজে পাচ্ছি। সিনেমাটি আরও একবার দেখুন। জশুয়া মসজিদের ভেতরে ঢুকে একে একে গুলি করছে। মুসল্লিরা বাঁচার তাগিদে ছোটাছুটি করছে। সবাইকে মারা হয়েছে ভেবে জশুয়া মসজিদ থেকে বের হয়ে এলে এক আহত মুসল্লি জশুয়াকে পেছন থেকে গুলি করতে উদ্যত হয়। কিন্তু জশুয়ার এক সহকর্মী তাকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর জশুয়া মার্সেনারি সৈনিক হিসেবে সার্বিয়ার পক্ষে বলকান যুদ্ধে যোগ দেয়। সেখানে গিয়ে সার্বিয়া-বসনিয়ার সীমান্তে এক বসনীয় কিশোরকে হত্যা করে। কিশোরটি ভেড়া বা ছাগল নিতে একটি ছোট্ট ব্রিজের ওপর উঠে এসেছিল। যা–ই হোক, নানা ঘটনার পর জশুয়ার মনে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব দেখা যায়। সিনেমার শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, ক্রোয়েশিয়ান শহর স্প্লিতের কাছে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরে জশুয়া তার অত্যাধুনিক রাইফেলটি ফেলে দেয়। এ সময় তার কোলে ছিল যুদ্ধশিশু ভেরা। ভেরার মাকে বসনিয়ান সৈনিকেরা আটকে রেখেছিল। বন্দী বিনিময়ের সুযোগে ভেরার মা ক্রোয়েশিয়াতে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে ফিরে আসে। জশুয়া অস্ত্রটি ফেলে দিয়েছে বটে কিন্তু যুদ্ধে যা হওয়ার তা হয়েছে। তামাম বলকান ততক্ষণে বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে।

‘সেভিওর’ মুভিটি আমি অনেকবার দেখেছি। দেখে বোঝার চেষ্টা করেছি। প্রথম দেখি ১৯৯৮ সালের দিকে। তখন মনে হয়েছিল, যুদ্ধের নির্মমতা খুবই ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। ভেরার মায়ের হত্যার দৃশ্য দেখে থমকে উঠেছিলাম। বা সার্বিয়ান সৈনিক গোরান যখন বসনিয়ান বৃদ্ধার আঙুল কেটে ফেলে, তখন তা দেখে শিউরে উঠেছিলাম। এরপর যতবার এই সিনেমা দেখেছি, ওই অংশটুকু আর দেখতে পারিনি। কিন্তু কখনোই চিন্তা করতে পারিনি ‘সেভিওর’–এর বাস্তব দৃশ্যায়ন দেখতে পাব। নির্মম হলেও সত্যি যে ‘সেভিওর’–এর দৃশ্যাবলি এখন বাস্তবেই নেমে এসেছে। হরহামেশাই এখানে সেখানে হামলা হচ্ছে। বার্লিনে ক্রিসমাসের মার্কেটে ট্রাক তুলে দিচ্ছে তো, প্যারিসের শার্লি এবদোতে হামলা হচ্ছে। সুইডেনের মালমোতে মসজিদে হামলা হচ্ছে তো স্টকহোমে ট্রাক তুলে দিচ্ছে পথচারীদের ওপর। কানাডার মসজিদে ঢুকে হামলা কোনো উগ্রপন্থী। সব মিলে এক ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন আর কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। সবাই সবার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়। আমি এশিয়ান। সবাই ভাবে, আমি সন্ত্রাসী কি না। তুমি ইউরোপীয়। আমি ভাবি, তুমি উগ্র ডানপন্থী কি না।

সভ্যতার সংঘাত নামক বিষাক্ত তত্ত্বের কী বীভৎস বাস্তবায়ন!

‘সেভিওর’ সিনেমাটি দেখলে হালের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের একটি পূর্বরূপকল্প পাওয়া যায়। যখন সিনেমাটি মুক্তি পায়, তখনো বিশ্বে আইসিস, আল–কায়দার দাপট ততটা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তালেবানরা আফগানিস্তানে জাঁকিয়ে বসতে শুরু করেছে। কিন্তু হান্টিংটন, ডোনাল্ড রামসফেল্ডরা সভ্যতার সংঘাত নিয়ে খুব মাতামাতি করছেন। নতুন ধারণা ও তত্ত্ব পেয়ে আমরাও ঝাঁপিয়ে পড়লাম। নিওকনজারভেটিভদের এই সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বের আড়ালে কী ছিল, সেটা কেউই অনুসন্ধান করে দেখিনি। নোয়াম চমস্কির মতো কেউ কেই সমালোচনা করলেও খুব বেশি পাত্তা পাননি তখন। নাইন–ইলেভেনের পর সবাই সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে মত্ত। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সবাই জিহাদি জজবা নিয়ে নেমে পড়ে ঠিক তালেবান, আইসিসের মতোই।

১৯৯৮ সালে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্র ‘সেভিওর’ এর আরও ডিভিডির দুটি কভার ছবি

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ‘সেভিওর’–এর পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার কীভাবে ১৯৯৮ সালে বসে ২০১৯ সালের গল্প জেনে গেলেন। অনেকেই বলবেন, তাঁরা দূরদর্শী। কবি–সাহিত্যিকেরা অনেক কিছুই আগাম অনুধাবন করতে পারেন। তাঁদের কল্পনাশক্তি প্রবল। ১৯৯৮ সালে আঁচ করে ফেলেছিলেন ২০১৯–এ কী ঘটবে। আবার বিপরীত গল্পও আছে। বৈশ্বিক শক্তিগুলো আগামী ২০ বছর বা ৫০ বছরে কী করবে, তা আগেই ঠিক ফেলে। বিশ্বকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে, সেই পরিকল্পনা নিয়ে তারা মাঠে নামে। এই পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সাংস্কৃতিক উপাদান ছড়িয়ে দিতে থাকে। এর অন্যতম হচ্ছে চলচ্চিত্র। ‘র‍্যাম্বো’ চলচ্চিত্রে দেখেছি—নায়ক একাই এক শ। আফগানিস্তান থেকে ভিয়েতনাম সর্বত্র একাই সবাইকে হারিয়ে দিচ্ছেন। ‘র‍্যাম্বো’ সিরিজের সব চলচ্চিত্রে খলনায়ক ছিল সোভিয়েতপন্থীরা। সোভিয়েতের পতনের পর খলনায়কের আসনে চলে আসে মুসলমানরা। যেমন ‘সেভিওর’-এও।

‘সেভিওর’ বা ‘র‍্যাম্বো’, সব চলচ্চিত্রে নায়ক কিন্তু একজনই। তিনি হচ্ছেন আমেরিকান। হলিউডের চলচ্চিত্রে তো মার্কিন নায়কই থাকবেন। আফগান বা ভিয়েতনামিরা হবে কী করে? কথা সত্য। কিন্তু সন্ত্রাসী তকমার ক্ষেত্রে যে কেবল একটি গোষ্ঠীই চিহ্নিত হয়েছে। হালের সন্ত্রাসীরা কতটুকু মার্কিনবিরোধী, তা নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়। অনেকেই সন্দেহ করে থাকেন এই সন্ত্রাসীরা মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের অগ্রবর্তী বাহিনীই। এরা বিভিন্ন স্থানে হামলা করে মার্কিনদের প্রবেশের সুযোগ করে। তারও আগে এরা নেমে পড়ে চলচ্চিত্র, সামাজিক-রাজনৈতিক তত্ত্ব, গান, কবিতা নিয়ে। কেউ কেউ বলে থাকেন ‘সেভিওর’ যুদ্ধবিরোধী চলচ্চিত্র। আবার অনেকেই বলে থাকেন, ‘সেভিওর’ যুদ্ধকে উসকে দেওয়ার চলচ্চিত্র। সভ্যতার সংঘাতের একটি সাংস্কৃতিক রূপ হচ্ছে ‘সেভিওর’। সোভিয়েত–পরবর্তী যুদ্ধের গতি–প্রকৃতি কী হবে, তা ‘সেভিওর’–এর মাধ্যমেই মার্কিন আমাদের ২১ বছর আগে বলে দিয়েছেন। ‘সেভিওর’–এ কিন্তু সেব্রেনিতসার গণহত্যার কথা বিস্তারিত বলা হয়নি। একটি ক্রোয়েট গণহত্যার দৃশ্য দেখানো হয়েছে। বসনিয়ায় কোনো সন্ত্রাসী লড়াই ছিল না। বসনীয়দের মুক্তির লড়াই ছিল বলকানের যুদ্ধ। যদিও এই যুদ্ধ সার্ব ও পশ্চিমারাই বসনীয়দের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল। সেখানে প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে বসনীয় যুদ্ধকে পরিচালক কোন উদ্দেশ্যে যুক্ত করলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিষয়টি এমন, তুমি আমার স্ত্রী–সন্তানকে হত্যা করেছ, আমি এখন মুসলমানদের খুন করব। তা পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক। হচ্ছেও তাই। সন্ত্রাসীরা হামলা করে ইউরোপ, আমেরিকা। ট্যারেন্টরা হামলা করে ক্রাইস্টচার্চে।

‘সেভিওর’ চলচ্চিত্রটিকে ঘিরেই সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের ছক অনুধাবনের কসরত চলতে পারে। ‘সেভিওর’ দেখিয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যদের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই কেমন হবে। এতে কে কোন পক্ষে থাকবে। চলচ্চিত্রে দেখানোই হয়েছে সন্ত্রাসীরা হামলা করবে। এরপর মসজিদেও হামলা হবে। দাঙ্গা–ফ্যাসাদ শেষে জশুয়াদের মধ্যে মানবিক বোধের উদয় হবে। এ কারণেই বেইভ্রিককে মানসিক রোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মার্কিন মুলুকে স্কুল–কলেজে হামলাকারীও মানসিকভাবে অসুস্থ। অসম্ভব কিছু না। দেখা যাবে, ব্রেইভিক সুস্থ হওয়ায় তাঁর ব্যবহৃত অস্ত্রটি উত্তর মহাসাগরে ফেলে দিচ্ছেন। কিন্তু তত দিনে সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান যুদ্ধে ছারখার। লাখো সিরিয়ান ইউরোপে উদ্বাস্তু। হাজারো মানুষ পঙ্গু। কেবল মুসলমানরাই পরিপূর্ণভাবে ‘সুস্থ’। এবং সন্ত্রাসী তকমা তাদেরই প্রাপ্য। ফিলিস্তিনের পাথর ছুড়ে মারা যুবকেরা সন্ত্রাসী। আইসিস থেকে কাশ্মীরি—সবাই এককাতারে।

আজকের গ্রেট রিপ্লেসমেন্টে অনুপ্রাণিত হয়ে টারান্টের মেনিফেস্টো ‘সেভিওর’–এরই ধারাবাহিকতা। যে উদ্দেশ্য নিয়ে মার্কিনরা ‘সেভিওর’, ‘র‍্যাম্বো’ বাজায়ে ছড়িয়ে দিয়েছিল, তা সফল। চারদিকে মার্কিনদের জয়জয়কার। সেখানে খুশি, সেখানে ঢুকে যাচ্ছে সন্ত্রাস দমনের নামে। দখল করে নিচ্ছে দেশ–জনপদ। ভয়–বিদ্বেষ জারি হয়ে আছে সর্বত্র। সব জায়গাতেই বিভাজন। মারা পড়ছে মায়ের সঙ্গে প্যারিসে ঘুরতে বের হওয়া শিশু সন্ত্রাসীর ট্রাকচাপায়। অথবা ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে নামাজরত অবস্থায় সাধারণ মুসল্লি। তাই এই সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ে আগপাছ বুঝতে হবে। এর গভীরে যেতে হবে। বুঝতে হবে এই সন্ত্রাসবাদ লড়াইয়ের আড়ালে আছে সমাজকে, বিশ্বকে বিভাজিত করার হীন উদ্দেশ্য। দেশ দখলের সুপ্ত বাসনা।

তাই ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলায় আমরা আহত হয়েছি বটে অবাক হয়নি। অন্তত যারা ‘সেভিওর’ চলচ্চিত্রটি দেখেছিলাম। কী ঘটবে, তা মার্কিনরা ১৯৯৮ সালেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করে বলে দিয়েছে তাদের এজেন্ডা সেটিং পরিকল্পনার আওতায়।

লেখকঃ ড. মারুফ মল্লিক, ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো, ইনস্টিটিউট অব ওরিয়েন্ট অ্যান্ড এশিয়ান স্টাডিজ, ইউনিভার্সিটি অব বন

উৎসঃ প্রথম আলো

আরও পড়ুনঃ বলকান গণহত্যার স্মৃতি ধরেই ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে হামলা

বন্দুকধারী শ্বেতাঙ্গ জঙ্গি যখন গণহত্যার জন্য নিউজিল্যান্ডের মসজিদে প্রবেশ করেন, তখন তার হেলম্যাটে রাখা লাইভ ক্যামেরার ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে সার্ব জাতীয়তাবাদী গান বাজছিল।

শুক্রবার জুমা পড়তে আসা মুসল্লিদের হত্যার সময় তিনি এ নারকীয় দৃশ্য সামাজিকমাধ্যম ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচার করেন।

শ্বেতাঙ্গ জঙ্গির অস্ত্রের গায়ে সার্ব জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের নাম খোদাই করা ছিল। এতে বলকান সহিংসতা নিয়ে অপ্রত্যাশিত আগ্রহ তৈরি হয়েছে সর্বত্র। সে সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলটিতে রক্তের বন্যা বয়ে গিয়েছিল।

দুটি মসজিদে ওই অস্ট্রেলীয় সন্ত্রাসী গুলি করে অর্ধশত লোককে হত্যার পর নিউজিল্যান্ডে বসনীয় রাষ্ট্রদূত স্থানীয় টেলিভিশনে গিয়ে হত্যার ব্যাকগ্রাউন্ড দৃশ্যে সংগীত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

মসজিদে ঢুকে এই শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী যখন এক এক করে মুসল্লিদের হত্যা করছিলেন, তখন ভিডিওর অন্তরালে সার্ব জাতীয়তাবাদী সংগীত শোনা গেছে।

বসনীয় রাষ্ট্রদূত বলেন, এটি সার্বীয় জাতীয়তাবাদী সংগীত, যাতে যুদ্ধাপরাধী রাদোভান কারাদজিচের নাম উল্লেখ রয়েছে। তাকে সার্বসদের নেতৃত্ব দিতে আহ্বান করা হয়েছে।

১৯৯২-৯৫ সালের যুদ্ধে বসনীয় সার্বসদের নেতৃত্ব দেয়া রাদোভান যুদ্ধাপরাদের দায়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তাকে দেয়া ৪০ বছরের সাজার চূড়ান্ত রায় শুনতে চলতি সপ্তাহে তিনি জাতিসংঘের আদালতে গিয়েছিলেন।

স্রেব্রেনিকা মুসলমানদের ওপর গণহত্যা এবং বসনিয়ায় জাতিগত সংঘাতের সময় অন্যান্য অপরাধের দায়ে তাকে এ কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এতে এক লাখের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।

বসনীয় কূটনীতিক জানিয়েছেন, ওই গানে বলা হয়েছে- তুর্কিদের অবশ্যই হত্যা করতে হবে। বসনীয় মুসলমানদের কথা উল্লেখ করে সার্ব জাতীয়তাবাদীরা এখনও নিয়মিতভাবে এমন কথা বলে যাচ্ছেন।

১৯৯০ দশকের যুদ্ধের মতোই ক্রাইস্টচার্চের হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় ২৮ বছর বয়সী অস্ট্রেলীয় সন্ত্রাসী এ গানটি বাজিয়েছিলেন। এমনকি উগ্র ডানপন্থীরা সম্প্রতি এ গানটি মিম বা ছবি ক্যাপশন আকারেও ইন্টারনেট জগতে ছড়িয়ে দেয়।

কিন্তু মসজিদে ট্যারেন্টের এই হত্যাযজ্ঞ বলকান ইতিহাসের শিকরের গভীরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়ে গেছে। এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে ডানপন্থী উগ্ররা তার এই ঘৃণায় ভরা ইশতেহারকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন।

উসমানীয় সাম্রাজ্যের ঘোর

জঙ্গি ট্যারেন্টের অস্ত্রে যেসব ঐতিহাসিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ ছিল, তাদের মধ্যে কয়েকজন সার্ব জাতীয়তাবাদী আইকন রয়েছেন।

সার্ব লোকগাঁথার একজন নাইট মিলোস অবিলিক ও চতুর্দশ শতকের সার্বীয় প্রিন্স স্টিফান লাজারসহ উসমানীয় খেলাফতের বিরুদ্ধে লড়াই করা যোদ্ধাদের নামও ছিল।

মন্টিনেগ্রিয়ান জেনারেল মার্কো মিলজেনোভের নামও রয়েছে বন্দুকে। এই বলকান সামরিক নেতা ১৯ শতকে উসমানীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন।

উসমানীয় শাসনামলে বলকানে মুসলিম ও খ্রিস্টান বিশ্বের মধ্যে প্রায়ই যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছিল। অতি উগ্রজাতীয়তাবাদী সার্বদের মধ্যে সেই ইতিহাসের ছায়া এখনও রয়ে গেছে।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলেন, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে জঙ্গি ট্যারেন্ট সেখানে ভ্রমণে গিয়েছিলেন। ২০১৮ সালের নভেম্বরে মন্টেনিগ্রো, সার্বিয়া, বসনিয়া ও ক্রোয়েশিয়া হয়ে বুলগেরিয়ায় যান এই শ্বেতাঙ্গ জঙ্গি। তিনি তুরস্কও ভ্রমণে গিয়েছিলেন।

সার্ব জাতীয়তাবাদের অনুপ্রেরণা

বসনিয়ার সারাজেভোতে মুসলিম সম্প্রদায় জানিয়েছে, এটি সত্যিই ভয়ের কথা যে, বসনিয়ার যুদ্ধাপরাধকে মহিমান্বিত করে গাওয়া একটি সংগীত দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড শুরু হয়েছে। এই শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী একই উগ্র মতাদর্শ ও ঘৃণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন, যা ১৯৯০ দশকে ঘটেছিল।

কাজেই এ হামলাকারী যখন তার হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় বলকানকে টেনে এনেছেন, তখন তা কেবল কসোভোর সেই ভয়ার্ত স্মৃতিকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।

সাবেক সার্বীয় প্রদেশের অধিকাংশ মুসলমান এবং নৃতাত্ত্বিক আলবেনীয়রা ১৯৯৮-৯৯ সালে গেরিলা যুদ্ধে জড়ে পড়েন। এ যুদ্ধে ১৩ হাজার আলবেনীয় নিহত হয়েছিলেন।

টুইটারে কসোভোর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেট্রিক সেলিমি বলেন, এই অস্ট্রেলীয় সন্ত্রাসী সার্বীয় শিকড় গজানো শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী একটি বিশেষ দল থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

তিনি বলেন, কসোভো ও বসনিয়ায় সার্বীয় মতাদর্শীরা যে যুদ্ধ ও গণহত্যা চালিয়েছিলেন, তা বিশ্বব্যাপী উগ্রডানপন্থী খ্রিস্টানদের উৎসাহ হিসেবে কাজ করেছে।-খবর এএফপির।

উৎসঃ যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ সেই হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারেন্টের কড়া বাঁধা হাতেও বর্ণবাদের প্রশস্তি

কড়া বাঁধা হাতেও বর্ণবাদের প্রতীক দেখালেন নিউ জিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের খুনি ব্রেন্টন ট্যারেন্ট, যার গুলিতে ৩ বাংলাদেশিসহ অন্তত ৪৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

শুক্রবার দুটি মসজিদে গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যার অভিযোগ এনে ট্যারেন্টকে একদিন বাড়ে ক্রাইস্টচার্চের ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে হাজির করা হয়। বিচারক তাকে আগামী ৬ এপ্রিল পর্যন্ত আটক রাখতে বলেছেন।

ট্যারেন্টকে আদালতে নিয়ে যায় দুজন পুলিশ সদস্য, এসময় তার দেহে ছিল বন্দিদের পোশাক, হাতকড়ায় বাঁধা ছিল হাত।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট দেখিয়েছে, হাতকড়ার মধ্যে আঙুল দিয়ে ‘শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের’ বর্ণবাদী প্রতীক দেখাচ্ছিলেন ট্যারেন্ট।

মানুষের মধ্যে শেতাঙ্গরা শ্রেষ্ঠ- এটা যারা মনে করেন, তারা আঙুলের মাধ্যমে বিশেষ চিহ্ন তৈরি করে প্রতীক হিসেবে তার প্রকাশ ঘটিয়ে থাকেন।

এক্ষেত্রে বৃদ্ধা ও তর্জনি আঙুল বৃত্তাকারে একসঙ্গে যুক্ত করলে তা ‘চ’ এর আকৃতি নেয়, যা দিয়ে চড়বিৎ বা শক্তি বোঝানো হয়। আর বাকি তিনটি আঙুল তখন ‘ড’ এর রূপ নেয়, যা দিয়ে বোঝানো হয় ডযরঃব বা সাদা।

২৮ বছর বয়সী অস্ট্রেলীয় ট্যারেন্টও বন্দি হওয়ার পরও তার বর্ণবাদী মনোভাব এভাবে তুলে ধরেন।

হত্যাযজ্ঞের পুরো ঘটনা ফেইসবুকে সরাসরি সম্প্রচার করেছিলেন ট্যারেন্টন, ইন্টারনেটে ছড়িয়েছেন বর্ণবাদী, অভিবাসী বিদ্বেষী, উগ্র ডানপন্থি বার্তা।

গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলা চালানোর আগে ট্যারেন্ট তার টুইটার অ্যাকাউন্টে ৭৩ পৃষ্ঠার একটি কথিত ‘ম্যানিফেস্টো’ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি নিজেকে বর্ণনা করেছেন ভাষায়, সংস্কৃতিতে, রাজনৈতিক বিশ্বাস আর দর্শনে, আত্মপরিচয়ে এবং বংশপরিচয়ে একজন ইউরোপীয় হিসেবে।

ট্যারেন্ট তার তথাকথিত ‘ম্যানিফেস্টোতে’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

হামলার উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে নিজের অভিবাসনবিরোধী ও মুসলিমবিরোধী অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন ট্যারেন্ট। এক জায়গায় তিনি নিজেকে ‘এথনোন্যাশনালিস্ট এবং ফ্যাসিস্ট’ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।

উৎসঃ শীর্ষ কাগজ

আরও পড়ুনঃ নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারেন্ট সন্ত্রাসী সংগঠন ‘ব্লাক সান’ এর সদস্য

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে শুক্রবার (১৫ মার্চ) জুম্মার নামাজের সময় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় নব্য নাৎসিবাদী সন্ত্রাসী সংগঠন ‘ব্লাক সান’ জড়িত বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্রেন্টন টারান্ট নামের ওই হামলাকারী কুখ্যাত ব্লাক সানের সদস্য। হামলার আগে টুইটারে তার প্রকাশিত এক ইশতেহারে ব্লাক সানের সঙ্গে তার সম্পর্ক পরিষ্কার করেন। টুইটারে তিনি ৮৭ পৃষ্ঠার একটি ইশতেহার দিয়েছিলেন। যেখানে হামলার পূর্বাভাসও দেয়া হয়েছিল।

২০১১ সালে নরওয়েতে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা থেকে ব্রেন্টন টারান্ট অনুপ্রাণিত হয়েছেন বলে টুইটে দাবি করেন। নরওয়েতে সেই ভয়াবহ হামলায় ৭৭ জন নিহত হয়েছিল।

ব্রেন্টন টারান্ট টুইটারে যে ইশতেহার প্রকাশ করেছিলেন তার প্রচ্ছদে ব্লাক সানের লোগো ব্যবহার করা হয়েছে। এ ঘটনার পর ‘ব্লাক সান’ নিয়ে বিশ্বজুড়ে আবার হইচই শুরু হয়েছে।

ব্লাক সান কী?

জার্মানির উত্তরাঞ্চলে ওয়েলসবার্গ নামক দুর্গ নির্মাণ হয় ১৬০৩ সালে। ১৬০৯ সালে সেটি উদ্বোধন করা হয়। তৎকালীন শাসকের দুর্গপ্রাসাদ হিসেবে এটি ব্যবহার হতো। জার্মান শাসক হিটলারের সময় থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এই দুর্গটি হিটলারের বাহিনীর (এসএস) জেনারেলদের জন্য ব্যবহার হতো।

ওয়েলসবার্গ দুর্গের মেঝেতে ১৯৩৩ সালে হিটলারের সময়ে একটি লোগো স্থাপন করা হয়। লোগোতে কালো গোলাকৃতির মধ্যে ১২টি সাদা রঙের ফাঁকা অংশ রয়েছে। তৎকালীন জার্মানিতে হিটলারের পরে দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি জেনারেল হেনরিক হিমলারের নেতৃত্বে এই লোগোটি বসানো হয়, যা দেখতে অনেকটা চাকার মতো। লোগোটি নাৎসি বাহিনীর দলীয় লোগোর সাথে সামঞ্জস্যতা রেখে তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে ব্লাক সান ওয়েলসবার্গের ওই চিহ্নটিই তাদের লোগো হিসেবে ব্যবহার করছে।

হেনরিক হিমলার ওই দুর্গটির ডিজাইনও পরিবর্তন করেন। পরিবর্তিত ডিজাইনেই পরে লোগোটি স্থাপন করা হয়। এটিকেই মূলত ব্লাক সান বলা হয়। তৎকালীন ব্লাক সানের অনুসারীরাই বর্তমান ব্লাক সান নামক সংগঠন পরিচালনা করছে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনটিকে নব্য নাৎসিবাদীদের সংগঠন হিসেবে সজ্ঞায়িত করা হয়ে থাকে।

১৯৯১ সালে লেখক রাসেল ম্যাক ক্লাউড এ বিষয়ে একটি বই প্রকাশ করেন। তার ‘জার্মান দ্য ব্লাক সান অব তাসি লুনপো’ নমের বইটিতে ব্লাক সানের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রথম লিখিত তথ্য প্রকাশ করা হয়। ওই সময় বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। খ্যাতিমান লেখক নিকোলাস গডরিক ক্লার্ক বইটিকে ‘অকাল্ট নাৎসি থ্রিলার’ হিসেবে সজ্ঞায়িত করেন।

নাৎসিবাদীরা ব্লাক সান লোগো নিজেদের ঐতিহাসিক আদর্শের প্রতীক বলে মনে করে। হিটলারের আদর্শ থেকেই তারা নিজেদের সংগঠনের নাম দেয় ব্লাক সান। সংগঠনের লোগো হিসেবেও ব্লাক সান ব্যবহার করে।

তবে তাদের এই সংগঠন কবে কোথায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা জানা যায় না। সম্পূর্ণ গোপন এই সংগঠন বিশ্বজুড়ে হিটলারের আদর্শের অনুসারীদের নিয়ে কাজ করে।

উৎসঃ শীর্ষকাগজ

আরও পড়ুনঃ ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে হামলাঃ যেসব শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করছে হামলাকারী

ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে হামলার ঘটনা ফেসবুকে লাইভস্ট্রীমিং করেছিলেন ব্রেন্টন টারান্ট। আল নুর মসজিদে নির্বিচারে পুরুষ-নারী-শিশুদের ওপর তার গুলি চালানোর দৃশ্য এতটাই ভয়ংকর যে তা বেশিক্ষণ দেখা যায় না।

ব্রেন্টন টারান্ট এর আগে এক তথাকথিত ইশতেহার প্রকাশ করেন যেখানে তিনি তার সহিংস কট্টর দক্ষিণপন্থী মতাদর্শ তুলে ধরেছেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনের ভাষায়, ব্রেন্টন টারান্ট আসলে একজন ‘উগ্র দক্ষিণপন্থী সন্ত্রাসবাদী।’

হামলার ঘটনার যে ১৭ মিনিটের ভিডিও এবং তার আগে যে সুদীর্ঘ ইশতেহার ব্রেন্টন টারান্ট প্রকাশ করেছেন, তা থেকে তার চিন্তা ও মতাদর্শ সম্পর্কে কী ধারণা পাওয়া যায়?

ব্রেন্টন টারান্ট যখন অস্ত্র বোঝাই গাড়ি নিয়ে আল নুর মসজিদের দিকে যাচ্ছেন, তখন তার গাড়িতে যে গানটি বাজছিল, সেটি একটি সার্বিয়ান জাতীয়তাবাদী রণসঙ্গীত। ‘চেটনিকস’ নামে পরিচিত সার্বিয়ান প্যারামিলিটারি ইউনিট ১৯৯২-৯৫ সালের বসনিয়ান যুদ্ধের সময় এটিকে তাদের কুচকাওয়াজ সঙ্গীত হিসেবে ব্যবহার করতো।

এই সঙ্গীতে বসনিয়ান সার্ব নেতা রাদোভান কারাদযিচের প্রশংসা রয়েছে। গণহত্যা এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে রাদোভান কারাদযিচ দোষী সাব্যস্ত হন।

মুসলিমদের এবং অভিবাসীদের হত্যার কারণে যেসব লোকের সাজা হয়েছে, তাদের অনেকের নাম লেখা আছে ব্রেটন টারান্টের আগ্নেয়াস্ত্রগুলিতে।

একটি বন্দুকের গায়ে লেখা ‘ফর রদারহ্যাম।’ যুক্তরাজ্যের রদারহ্যামে শিশুদের ওপর এশিয়ান মুসলিম পুরুষদের যৌন নিপীড়নের যে কেলেংকারির ঘটনা আলোড়ন তুলেছিল, সেই ঘটনাকেই এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া অটোম্যান সাম্রাজ্যের সঙ্গে ইউরোপের দেশগুলোর ঐতিহাসিক অনেক লড়াইয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে বিভিন্ন শব্দ লেখা ছিল তার অস্ত্রশস্ত্রে।

অস্ট্রেলিয়ান গণমাধ্যম খবর দিচ্ছে, ব্রেন্টন টারান্ট সিডনি থেকে প্রায় ছয়শো কিলোমিটার উত্তরের একটি শহর গ্রাফটনের লোক। তার সাবেক বস ট্রেসি গ্রে দাবি করছেন, ব্রেন্টনের মধ্যে তিনি কখনো কোন চরমপন্থী চিন্তাভাবনা বা পাগলামি আচরণ দেখেননি।

দীর্ঘ ইশতেহারে ব্রেন্টন টারান্ট লিখেছেন, ২০১৭ সালে ইউরোপ ঘুরে আসার পর তিনি এই হামলার পরিকল্পনা শুরু করেন। বিশেষ করে তিনি উল্লেখ করেছেন সুইডেনে একটি লরি চালিয়ে ইসলামিক স্টেটের সমর্থক এক ব্যক্তির চালানো একহামলার কথা। এছাড়াও আছে ফ্রান্সে ইমানুয়েল ম্যাক্রর মতো লোকের প্রেসিডেন্ট হওয়া এবং ফ্রান্সে যে জাতিগত বৈচিত্র, তা নিয়ে ক্ষোভ-হতাশার কথা।

ব্রেন্টন টারান্টের দীর্ঘ ইশতেহারটির শিরোণাম হচ্ছে ‘দ্য গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’।

এতে যে ধরণের ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ তুলে ধরা হয়েছে, তা সাম্প্রতিককালে অনলাইনে দ্রুত প্রসার লাভ করছে। এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসীদের একটি ব্যাপক আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীও তৈরি হচ্ছে।

এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মূল কথা হলো, ইউরোপীয়রা ক্রমশ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে তাদের তুলনায় নিকৃষ্ট এবং বিপদজনক জাতি ও সংস্কৃতির দাপটে। মূলত মুসলিমদের নিয়ে ঘৃণা এবং ভীতি ছড়ানোর সাংকেতিক আলোচনা বলে মনে করা হয় এসব আলোচনাকে।

এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বে আরও বলা হচ্ছে, পশ্চিমা দুনিয়ায় যে অভিবাসীদের আসার হার বেড়েই চলেছে, এর পেছনেও রয়েছে ষড়যন্ত্র। বিশ্ব পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখতে বড় বড় রাষ্ট্র এবং কর্পোরেশনগুলো ‘হোয়াইট জেনোসাইড’ বা ‘শ্বেতা্ঙ্গ গণহত্যায়’ উৎসাহ যোগানোর নীতি নিয়েছে। এই ইশতেহারে এন্টি সেমিটিক (ইহুদী বিদ্বেষী) এবং নব্য নাৎসীবাদী কথাবার্তাও আছে।

পশ্চিমা দুনিয়ায় যে উগ্র ডানপন্থী শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটছে, তার পেছনে এ ধরণের ‘ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্বের’ বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। নানা ধরণের গোপন গোষ্ঠী ফেসবুকে এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব প্রচারণা চালাচ্ছে জোরে-শোরে।

উৎসঃ ‌আরটিএনএন, বিবিসি

আরও পড়ুনঃ ‘মুসলমান! আজ তোদের সবাইকে খুন করব’: অস্ত্রধারী খুনি ব্রেনটন ট্যারেন্ট

হামলাকারী অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া নাগরিক ব্রেনটন ট্যারেন্ট

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে আল নুর মসজিদে হামলার সময় সেখানকার ছোট অজুখানায় ছিলেন আনোয়ার আল সালেহ। হাত ধোয়ার সময় হঠাৎ করেই গুলির আওয়াজ শোনেন তিনি। বাইরে প্রচণ্ড চিৎকার। আতঙ্কে ছোটাছুটি করছে মানুষ। এর মধ্যে শুনতে পান হামলাকারী আক্রোশে বলছে, ‘আজ তোদের সবাইকে খুন করব।’

ক্রাইস্টচার্চের স্থানীয় গণমাধ্যম দ্য প্রেস ও নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় ভয়ংকর দুপুরটির চিত্র।

১৯৯৬ সালে ফিলিস্তিন থেকে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে এসে বাস করতে শুরু করেন আনোয়ার। শান্ত ছবির মতো এই শহরটিতে কখনো কোনো গন্ডগোলের খবর পাননি তিনি। শান্তিতেই বাস করছিলেন। তবে আজ দুপুরে হঠাৎ গুলির শব্দ যেন তার জগৎকে লন্ডভন্ড করে দেয়। নিজের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানায় এখান থেকে বের হওয়া যাবে না। অজুর ঘরে বসেই জরুরি সেবায় ফোন করেন তিনি। কয়েকবার পুলিশকে ফোন দেন। তবে কাউকেই ফোনে পাননি। শেষে অ্যাম্বুলেন্স–সেবায় ফোন দিয়ে বিপদের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘এখানে ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড চলছে। দয়া করে সাহায্য করুন। পুলিশ পাঠান, তারা গুলি করেই যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘বন্দুকধারী বলছে, মুসলমান তোদের আজ আমরা খুনই করে ফেলব।’

আনোয়ার জানান, গুলি খেয়ে আহত মানুষগুলো বন্দুকধারীর কাছেই বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন। তবে তাঁদের আবারও গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে বন্দুকধারী। তিনি বলেন, ঘটনার ২০ মিনিট পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। মাথার পেছনে হাত বেঁধে মসজিদ থেকে বের হয়ে আসেন তিনি। দেখতে পান অসংখ্য নারী-পুরুষের রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে। তিনি বলেন, ‘এদের সন্ত্রাসী বললে কম বলা হয়, এরা ঠান্ডা মাথার ভয়ংকর খুনি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তি জানান, সাত বছর আগে জর্ডান থেকে এখানে আসেন তিনি। শান্তিতে পরিবার নিয়ে বাস করার লক্ষ্যেই এখানে আসা। গোলাগুলির শব্দ শুনে প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, কোথাও বাজি ফুটছে। কারণ শান্ত এই শহরে কখনো এমন হয়নি। ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করে পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে পাঁচিল টপকে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছান তিনি। দেখেন পান, সবাই প্রাণভয়ে চিৎকার করতে করতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছে। পড়ে আছে নিথর দেহ।

তিনি জানান, নিহত কয়েকজনকে তিনি খুব ভালো করে চেনেন। তাঁদের একজন সিরিয়ান শরণার্থী আছেন, যিনি ছয় মাস আগে পরিবার নিয়ে এখানে এসেছেন। স্ত্রী আর তিনটে ফুটফুটে সন্তান আছে ওই সিরীয় ব্যক্তির। একজন ক্যান্টারবেরি মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের মহাপরিচালক আছেন। জর্ডান থেকে আসা ওই ব্যক্তি সব সময় মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন, সৎ পরামর্শ দিতেন। সাত বছর বয়সী একটা ছেলে আছে তাঁর।

ভয়ংকর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা সবার জন্যই বেদনাদায়ক দিন। মানুষ মেঝেতে আহত হয়ে পড়ে আছেন। চারদিকে রক্ত। চিৎকার করে কাঁদছেন সাহায্যের আশায়। কিন্তু পুলিশ আমাদের ওখানে যেতে দিচ্ছে না। জায়গাটা এখনো নিরাপদ নয়। আমরা আমাদের ভাইদের জন্য কিছুই করতে পারিনি।’

১৪ বছরের এক কিশোর জানায়, তার চাচাকে পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করে বন্দুকধারী। সে বলে, ‘আমরা মাত্র নামাজ আদায় শুরু করেছি, হঠাৎ করেই গুলির শব্দ। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, কোথাও নির্মাণের কাজ হচ্ছে। তখনই দেখলাম মানুষ চিৎকার করে দৌড়াচ্ছে।’

হিরমরটন হাইস্কুলের এই ছাত্র জানায়, তার চাচাসহ পরিচিত ছয়জন নিহত হয়েছেন। কীভাবে সেখান থেকে বের হতে পেরেছ? এমন প্রশ্নে সে বলে, ‘আমি কেবল দৌড়েছি, যত জোরে সম্ভব। কোথাও তাকাইনি। হ্যাগলি পার্কের বেড়া পার হয়ে তবেই থেমেছি।’

আজ স্থানীয় সময় বেলা দেড়টার দিকে মসজিদে নামাজ শুরুর ১০ মিনিটের মধ্যে একজন বন্দুকধারী সিজদায় থাকা মুসল্লিদের ওপর গুলি ছোড়ে। হামলাকারীর হাতে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ছিল। হামলা চালিয়ে বন্দুকধারী জানালার কাচ ভেঙে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৯ জন নিহত হয়েছে বলে নিউজিল্যান্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়। গুরুতর আহত হয়েছেন ২০ জন।

উৎসঃ ‌প্রথম আলো

আরও পড়ুনঃ ‘কে এই ঠান্ডা মাথার খুনি ব্রেনটন ট্যারেন্ট?’

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে হামলাকারী ব্যক্তি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। হামলাকারীর পরিচয় নিশ্চিত করে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বলেন, হামলাকারী কট্টর ডানপন্থী। তাঁর নাম প্রকাশ করেননি তিনি।

আজ শুক্রবার স্থানীয় সময় বেলা দেড়টার দিকে ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে জুমার নামাজ আদায়রত মুসলিমদের ওপর হামলা চালান ওই বন্দুকধারী। পরে কাছাকাছি শহরতলি লিনউডের মসজিদে হামলা চালানো হয়। তবে দ্বিতীয় মসজিদে হামলাকারী একই ব্যক্তি কি না, তা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।

প্রত্যক্ষদর্শী কারও কারও মতে, হামলাকারী একাধিক ছিলেন। হামলায় জড়িত সন্দেহে এক নারীসহ চারজনকে পুলিশ আটক করেছে। একটি গাড়িতে স্থাপন করা বিস্ফোরক উদ্ধার করে তা নিষ্ক্রিয় করেছে পুলিশ।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, স্কট মরিসন বলেন, ক্রাইস্টচার্চে একজন উগ্র মনোভাবের অধিকারী ডানপন্থী উন্মত্ত জঙ্গি হামলা চালিয়েছেন। হামলাকারী অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া নাগরিক। তবে তিনি বিস্তারিত আর কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, নিউজিল্যান্ড কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি তদন্ত করছে।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন জানিয়েছেন, হামলাকারী নিরাপত্তা নজরদারির তালিকায় ছিল না।

এদিকে ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর পর একটি ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে যায়। এতে দেখা গেছে, ভিডিও গেমের মতো একজন বন্দুকধারী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি করছে। হামলার ভিডিও দেখে ধারণা করা হচ্ছে, বন্দুকধারী হামলার আগে পুরো ঘটনাটি ভিডিও করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। হয়তো তাঁর মাথায় ভিডিও ক্যামেরা বসানো ছিল। একটি ওয়েবসাইট জানায়, হামলাকারী হামলাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লাইভ করেছেন।

ভিডিওতে দেখা গেছে, হামলাকারী স্বয়ংক্রিয় বন্দুক নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে মসজিদের দিকে যাচ্ছেন। মসজিদের প্রবেশ কক্ষ থেকেই মুসল্লিদের ওপর নির্বিচারে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে শুরু করেন। মসজিদের ভেতর ছুটোছুটিরত মুসল্লিদের প্রতি টানা গুলি করতে থাকেন। এরপর মসজিদের এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে ঘুরে ঘুরে গুলি করতে থাকেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে যাঁরা মসজিদের মেঝেতে পড়েছিলেন, তাঁদের দিকে ফিরে ফিরে গুলি করছিলেন তিনি।

এক্সপ্রেস নামের একটি স্থানীয় গণমাধ্যমের অনলাইনে বলা হয়েছে, হামলাকারীকে শনাক্ত করা গেছে। ২৮ বছর বয়সী একজন শ্বেতাঙ্গ। তিনি অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছেন। দুই বছর ধরে তিনি এ হামলার পরিকল্পনা করছেন। হামলাকারী জানিয়েছেন, ইউরোপের দেশগুলোতে বিদেশি হামলাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে তিনি এ হামলার পরিকল্পনা করেন।

ভিডিওটি ভয়াবহ উল্লেখ করে তা অনলাইনে না ছড়াতে লোকজনকে নির্দেশ দিয়েছে নিউজিল্যান্ড পুলিশ।

উৎসঃ ‌প্রথম আলো

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here