‘ইসলামের নারী অধিকার সম্পর্কে সকলকে জানানোর জন্যই আমি লেখালেখি শুরু করি’

0
232

নাইজেরিয়া: মাইরো আহমেদ আমশি (পি.এইচ.ডি.) যিনি একাধারে একজন শিক্ষাবিদ, কৃষক, লেখক এবং নাইজেরিয়ার ইয়ব অঙ্গরাজ্যের ‘ওম্যান অ্যাফেয়ার্সের’ সাবেক কমিশনার।

আরটিএনএনের পাঠকদের জন্য শিক্ষা খাত, কৃষি কাজ এবং ইসলাম ও রাজনীতিতে নারী অধিকার নিয়ে লেখা তার বই নিয়ে দেয়া সাক্ষাৎকারটি ভাষান্তরে তুলে ধরা হল:

প্রশ্ন: আপনি ‘Participation of women in politics’ নামে একটি বই লিখেছেন। আপনার বইটি কিভাবে মুসলিম নারীদের রাজনীতিতে আসতে উৎসাহিত করেছে?

মাইরো আহমেদ আমশি: আপনি জানেন যে, নারীদের রাজনীতিতে যোগ দেয়ার অনেক পথ খোলা আছে, কারণ এটি হারাম কোনো কাজ নয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা এটিকে নেতিবাচক করে ফেলি।

আপনারা হয়ত জেনে আগ্রহ বোধ করবেন যে, মহানবী (সাঃ) এর সময়ে বেশ কয়েকজন নারী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেসময় তাদের অনেককেই মন্ত্রিত্বসহ বেশ কয়েকটি পদ দেয়া হয়েছিল। ইসলামে এটি নতুন কোনো বিষয় নয়, বরং নারীরা রাজনীতিতে নিজেদেরকে অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছে কারণ তারা কিভাবে রাজনীতি করতে হয় তা জানেন না।

প্রশ্ন: এর বাহিরেও কি আপনি আরো বই লিখেছেন?

মাইরো আহমেদ আমশি: হ্যাঁ, আমার প্রথম বইয়ের নাম হচ্ছে- ‘Resilient journey to my carrier’ যা আমার নিজের জীবন সম্পর্কে লিখা। আমি আমার বিদ্যালয়ের জীবন, বিয়ে, আমার কর্ম ক্ষেত্রে ইত্যাদি স্থানে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি তা এই বইতে উল্লেখ করেছি।

এর পরে আমি ‘Islam and Gender Issue in the Contemporary Era’ নামে আরেকটি বই লিখেছি। এছাড়াও আমি ‘Gender mainstreaming and equity in politic: Panacea for stable democracy’, এবং ‘Gender analysis in agriculture issues and policies: a case study of rural women in Yobe state, Nigeria’ নামে দুটো ভিন্ন ধরনের বই লিখেছি।

আমার আরেকটি বইয়ের নাম হচ্ছে- ‘Let the truth be told: misapplication of child custody (Hadana) in Muslims society’ যা এখনো প্রকাশিত হয় নি।

এখানে এমন অনেক বিষয় নিয়ে আমি আলোচনা করেছি যা আমাদের বিচার ব্যবস্থায় বিচারকগণ এড়িয়ে চলেন। অনেক বিচারক রয়েছেন যারা কোনো কিছু তোয়াক্কা করেন না এমনকি তারা পবিত্র কুরআন এবং হাদিস কেও এড়িয়ে চলেন।

তারা অনেক সময় এগুলোর ভুল ব্যাখ্যা দেন, এড়িয়ে যান এবং নারীদের বিরুদ্ধে রায় দেয়ার সময় নিজেদের সুবিধা মত ব্যবহার করেন। ইসলাম হচ্ছে এমন একটি ধর্ম যা সকলের সমতা,ন্যায় বিচার এবং শান্তিতে বিশ্বাস করে।

প্রশ্ন: ‘Resilient journey to my carrier’ নামক বইটিতে আপনি আপনার নিজের জীবন সম্পর্কে তুলে ধরেছেন। আপনি কি তা সম্পর্কে আমাদের কিছু বলবেন?

মাইরো আহমেদ আমশি: অবশ্যই,আমি আমার জীবনে অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছি। ১৯৭৮ সালে আমার বিবাহ হয়, যখন আমরা দুজনেই ছিলাম একেবারে কম বয়সী এবং আমরা সেসময় একসাথে বিদ্যালয়ে যেতাম।

আমার পিতামাতা মাইদুগুরি শহরের বুলুনকুতু নামক স্থানে বসবাস করতেন এবং আমাকে তাদের সাথে থাকতে হত আর আমি সেসময় গর্ভবতী ছিলাম এবং এভাবেই আমাকে বিদ্যালয়ে যেতে হত।

আমার পিতা আমাকে বিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি ট্যাক্সির ব্যবস্থা করেছিলেন। ড্রাইভার ছুটির দিনগুলোতে আসত না এবং ছুটির দিনে আমাকে ব্যবহারিক ক্লাসে অংশ নেয়ার জন্য পাবলিক বাসে করে বিদ্যালয়ে যেতে হত।

আমি জিনস এবং বুট জুতো পরিধান করতাম আর এগুলো দেখে বাসের যাত্রীগণ প্রায়শই আমাকে টিটকারি করত। কিন্তু আমি বাড়ি ফিরে যখন এসব কথা আমার পিতামাতাকে বলতাম তারা আমাকে এগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিতেন।

কৃষিকাজ করতে গিয়ে আমি দ্বিতীয় প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছিলাম। লোকজন আমাকে উদ্দেশ্য করে বলত আমার এটা করা উচিত নয়, কারণ এটি পুরুষদের কাজ। কৃষি কাজের ক্লাসে আমরা সব মিলিয়ে ১০ জন শিক্ষার্থী ছিলাম আর আমি ছিলাম একমাত্র মেয়ে। আমি শস্য বিজ্ঞানে অধ্যয়ন করতাম এবং দ্বিতীয় শ্রেণী পেয়ে পাশ করেছিলাম।

মাঠে গিয়ে আমি দেখি আমরা যেসব খাদ্য খাই তার ৮০ শতাংশতেই নারীদের অবদান রয়েছে আর একারণেই আমি ‘Gender analysis in agriculture issue and policies’ নামক বইটি লিখি।

প্রশ্ন: আপনার বইটির মূল প্রতিপাদ্য কি?

মাইরো আহমেদ আমশি: আমার বইটির মলাটের দিকে লক্ষ্য করলেই এ বিষয়টি আপনার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। আপনি দেখবেন নারীরা আগাছা পরিষ্কার করছে, শস্য প্রক্রিয়া জাতকরণ করছে, তারা শস্য ফলাচ্ছে এবং এতকিছুর পরে সে বাড়ি ফিরে এসে তার শিশু এবং অন্যান্য সদস্যদের জন্য সুস্বাদু খাবার তৈরি করছে।

আর আমরা প্রতিদিন যা খাই তার ৮০ শতাংশই গ্রামীণ মহিলাদের ফলানো ফসল। আপনি যদি গ্রামে যান তবে এমনটি দেখতে পাবেন। সেখানে নারীরা তাদের উৎপাদিত ফসল সমূহকে দুভাগে বিভক্ত করেন। এক ভাগ বিক্রয় করার জন্য যাতে করে তার সন্তানদের জন্য বিদ্যালয়ের ফি পরিশোধ করতে পারেন আর অন্য ভাগ পরিবারের সদস্যদের খাবার জন্য রেখে দেন।

প্রতিদিন সকালে তাকে ভোর ৪:৩০ বা ৫ ঘটিকার সময় বিছানা ছেড়ে উঠতে হয় এবং তিনি রান্নার কাজ সেরে তার স্বামীর কৃষি জমিতে যান। দুপুর ১২ ঘটিকার দিকে তিনি ঘরে ফিরে আসেন আর তার স্বামীর জন্য খাবার নিয়ে যান।

বিকালে বাড়ি ফিরে এসে তিনি কোনো বিশ্রাম ছাড়াই শস্য গুঁড়ো করেন, রান্না করেন। আর তার স্বামী জমিতে বিশ্রাম নেন অন্যদিকে বিছানায় যাওয়ার পূর্বে তাকে সবকিছু সেরে নিতে হয়। একবার চিন্তা করে দেখুন এই প্রক্রিয়া সকল পরিবারে ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।

যখন আমরা সরকারিভাবে সার বিতরণ করি তখন পুরুষরা এসে বলে তার চার জন স্ত্রী রয়েছে এবং এসব কথা বলে সে ১৬ ব্যাগ সার নিয়ে যায়। কিন্তু তার স্ত্রীরা তার থেকে কোনো সারের ব্যাগ পায় না। এভাবেই নারীরা সবক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে।

আমরা কৃষি ক্ষেত্র নারীদের পরিশ্রম কমানোর জন্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সরবরাহ করি কিন্তু যখন আমরা গ্রামে সফর করি তখন দেখতে পাই যে, শুধুমাত্র ছেলেরাই এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছেন।

এমনকি শস্য কাটার যন্ত্র যা আমরা নারীদের জন্য সরবরাহ করেছি তা পর্যন্ত পুরুষরা তাদের থেকে হাইজাক করে নিয়ে যায়, যা আমাকে একেবারেই অবাক করেছে।

সুতরাং, আমি এখন এমন একটি বই লিখছি যাতে করে কর্তৃপক্ষ বাস্তব ঘটনা তাদের উপলব্ধিতে আনতে পারেন এবং সে অনুসারে নীতি নির্ধারণ করতে পারেন। আমি আপনাদের বলতে চাই যে, যদি একজন পুরুষের ৫ হেক্টর জমি থাকে এবং তিনি সেখানে যা ফলান তার প্রায় সবটুকুই জমিতে থাকাবস্থায়ই বিক্রয় হয়ে যায় আর তিনি খুব কম সময়েই কিছু ফসল পরিবারে জন্য নিয়ে যান। এর কারণ হচ্ছে তাদের স্ত্রী গণ যা ফলান তারা তার উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকেন।

প্রশ্ন: আপনি ঠিক কোন কারণে আপনার লিখিত একটি বইয়ের নাম দিয়েছেন- ‘Islam and gender issues in the contemporary era’?

মাইরো আহমেদ আমশি: আসলে, আমি পূর্বেই বলেছি যে, ইসলামে নারীদের যে অধিকার দিয়েছে প্রায় সময়ই তার ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হয়। আর লিঙ্গ সমতা বর্তমানে বিশ্বের উদ্বিগ্ন হওয়ার কেন্দ্র বিন্দুতে রয়েছে। জনগণ যখন ‘লিঙ্গের’ কথা চিন্তা করে তখন তারা এই শব্দটি দ্বারা শুধুমাত্র নারীদের কথাই চিন্তা করে। আমি আমার বইতে এ শব্দটি দ্বারা নারী এবং পুরুষ উভয়কেই যে বোঝানো হয় তা ব্যাখ্যা করতে সচেষ্ট হয়েছি।

এর পরে আমি নারী অধিকারের কথা বলেছি। আমি লিঙ্গ সমতা এবং স্বাধীনতার কথা আলোচনা করেছি। আমি দাঁড়ি রাখতে পারি না কারণ আমি একজন নারী ঠিক একই ভাবে একজন পুরুষ কোনো ভাবেই গর্ভবতী হতে পারে। তাই আমরা একে অন্য থেকে ভিন্ন এবং আমরা সে দিক থেকে সমান নই, আমি আমার বইতে তাও আলোচনা করেছি।

উদাহরণ সরূপ, সৌদি আরবে সম্প্রতি নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেয়া হয়েছে। সেখানে এর পূর্বে যদি কোনো নারী গাড়ি চালাতেন তবে তার প্রতি ভিন্ন দৃষ্টিতে তাকানো হত। আর আমাদের এখানে যদি কোনো পুরুষ রান্নার কাজ করেন তখন সেই পুরুষটির প্রতি ভিন্ন দৃষ্টিতে তাকানো হয়। সুতরাং তা এক স্থানে একেক রকম।

সমতা বলতে আমি বুঝি সমাজের জন্য কল্যাণকর কাজ করতে আমি পুরোপুরি স্বাধীন এবং তা যদি আমার সমাজ এবং ধর্মের বিরুদ্ধে না যায়। যদি আমি একজন সৈনিক হতে চাই তবে আমাকে তা হতে দেয়া উচিত কারণ নবী মুহাম্মদ(সাঃ) এর সময়ে অনেক নারী যুদ্ধে ক্ষেত্রে অংশ গ্রহণ করেছিলেন।

প্রশ্ন: আপনি ‘Misconceptions of people about Islam’ নামে আরকেটি বই লিখেছেন। বইটি লিখার পেছনে ঠিক কি কারণ কাজ করেছিল?

মাইরো আহমেদ আমশি: আমি এ বইটি লিখেছি কারণ আমি একজন মুসলিম নারী হিসেবে যে সব প্রতিবন্ধকতার মোকাবেলা করেছি তা তুলে ধরতে চাই। ইসলাম সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা, ভুল উপলব্ধি এবং ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে আছে। আমি একজন মুসলিম নারী হিসেবে এসব ভুল বিষয়ের উপর সরাসরি আক্রমণ করেছি। আমি বইটি লিখেছি মুসলিম হিসেবে আমার নিজের ধর্মের জন্য কিছু অবদান রাখার দায় থেকে।

প্রশ্ন: ইসলাম সম্পর্কে আসলে ঠিক কোন ধরনের ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে?

মাইরো আহমেদ আমশি: আপনারা দেখছেন যে, লোকজন চিন্তা করে মুসলিম নারীরা সবসময় নিপীড়িত হয় এবং তাদের কে তাদের ন্যায্য অধিকার দেয়া হয় নি। আমরা নিপীড়িত নই এবং পৃথিবীর অন্য যে কোনো নারীর চাইতে আমরা বেশী অধিকার ভোগ করে থাকি।

কিন্তু লোকজন কে এসব কথা বলা ছাড়া এসকল ভুল ধারণা দূর করা একেবারে অসম্ভব। আর এ কারণেই আমার ভাই এবং বোনদের ইসলাম সম্পর্কে জানার জন্য এবং সঠিক তথ্য দেয়ার জন্য আর ইসলামে নারীদের সত্যিকারের অবস্থান তুলে ধরার জন্য লিখতে শুরু করেছি।

একই সাথে পশ্চিমা চিন্তাবিদ এবং বিশ্বাসীদের নিকট ইসলামে নারীদের অধিকার জানাতে সচেষ্ট হয়েছি যাদের ধারণা ইসলামে নারীদের কোনো অধিকার নেই।

প্রশ্ন: আমরা কি আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে কিছু জানতে পারি?

মাইরো আহমেদ আমশি: আমি মাইরো আহমেদ আমশি(পি.এইচ.ডি)। আমি ১৯৬০ সালে নাইজেরিয়ার ইয়ব অঙ্গরাজ্যের বাদে নামক স্থানীয় সরকারি অঞ্চলের বিজি নামক গ্রামে জন্ম গ্রহণ করি। আমি ১৯৬৫ সালে কানো শহরের ‘Army Children’s School’ এ আমার প্রাথমিক বিদ্যালয় শুরু করি। পরে আমরা ইয়লা শহরে স্থানান্তরিত হই এবং ১৯৬৭ সালে আমি সেখানকার ‘Islamiyya Primary School’ এ ভর্তি হই।

সেখানে পরবর্তীতে আমি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হই যেখান থেকে আমি ১৯৭৬ সালে বিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করি। আমি মাইদুগুরি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষা বিভাগে ভর্তি হই। আর এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ১৯৮২ সালে আমি কৃষিতে বি.এস.সি ডিগ্রি অর্জন করি। বর্তমানে আমি একজন পি.এইচ.ডি ডিগ্রি ধারী নারী।

সুত্রঃ ‌ডেইলিট্রাস্ট ডট কম

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here