মোটা চাল কেটে তৈরি হচ্ছে মিনিকেট!

0
152

দেশের বাজারে বিদ্যামান চালের মধ্যে সবচেয়ে কম, ৬ পিপিএম জিংক মিলেছে মিনিকেট চালে। তাই শরীরের জন্য দরকারী পুষ্টি উপাদান জিংক ঘাটতিতে ভুগছে দেশের ৭৩ ভাগ নারীও ৪১ ভাগ শিশু। হারভেষ্ট প্লাস নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, দেশের বিভিন্ন জাতের মোটা চালকে বার বার ছাটাঁই করে বানানো হয় মিনিকেট। আর ছাটাইয়ের সাথে সাথে কমতে থাকে জিংকের পরিমানও।

মিনিকেট চালের একছটাকও বাণিজ্যিক চাষ নেই দেশে। অথচ চিকন এই চালেই আগ্রহ বেশিরভাগ ভোক্তার।

তাই জোগান ঠিক রাখতে ব্যবসায়ীদের ভরসা স্বয়ংক্রিয় চালকলে। যেখানে বিভিন্ন জাতের মোটা চাল ২০ ভাগ পর্যন্ত ছেঁটে বাজারে ছাড়া হয় মিনিকেট নামে। এতে নষ্ট হয় খনিজ উপাদান জিংক। স্মৃতিশক্তি কমা, ডায়েরিয়া, নিউমোনিয়াসহ নানা রোগের কারণ জিংকের ঘাটতি।

গবেষণার তথ্য বলছে, পুষ্টিচাহিদা পূরণে প্রতিকেজি চালে কমপক্ষে ১২পিপিএম জিংক থাকার কথা হলেও, মিনিকেটে আছে মাত্র ৬ দশমিক ৩৬ পিপিএম। সবচেয়ে বেশি ১২ দশমিক ৯২ রয়েছে নাজিরশাইলে। কাটারিভোগে ১১ দশমিক ৩৯, ২৮ চালে ৯ দশমিক ৬৮, স্বর্ণায় ৮ দশমিক ৯, বাংলামতিতে ৭ দশমিক ৬২ আর অন্যান্য চালে জিংক রয়েছে গড়ে ১০ পিপিএম।

সরকারি তথ্য বলছে, দেশের পাঁচ বছর বয়সী ৪১ শতাংশ শিশু আর বিভিন্ন বয়সী ৭৩ শতাংশ নারী এখনো ভুগছে জিংক স্বল্পতায়। এ ঘাটতি মেটাতে চাষ হচ্ছে উচ্চ জিংক সমৃদ্ধ ধান। কিন্তু সচেতনতার অভাবে প্রতিদিনের খাবার টেবিল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে জিংক। তাই চাল ছাঁটাইয়ে নীতিমালা চান সাবেক এই কৃষি সচিব।

বিশ্ব খাদ্য সংস্থার মতে, একজন মানুষের দৈনিক ৮ পিপিএম জিংক দরকার। তাই কেবল চালের ওপর নির্ভর না করে, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ পুষ্টিবিজ্ঞানীদের।

সুত্রঃ ‌শীর্ষ কাগজ

আরও পড়ুনঃ চালের বাজার অস্থির কেন?

বেশ কিছুদিন স্থিতিশীল থাকার পর ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে চালের বাজার। নির্বাচনের পরদিন থেকেই বাড়তে থাকে দাম। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে দুই থেকে চার টাকা বেড়েছে সরু ও মোটা চাল। চালের এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য খুচরা বিক্রেতারা দুষছেন পাইকারদের। আর পাইকারি বিক্রেতাদের অভিযোগের আঙুল মিলমালিকদের প্রতি। বসে নেই তারাও! ধানের মূল্যবৃদ্ধিকে অস্থিতিশীলতার কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন চালকল মালিকরা। অথচ কৃষকদের অভিযোগ থেকেই যাচ্ছে। ধানের উপযুক্ত মূল্য না পেয়ে হতাশ তারাও। মাঝে পড়ে বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। যদিও বাজারের এমন চিত্র ফুটে উঠছে না টিসিবির প্রতিবেদনে। তাদের দাবি সরু চালের দাম কেজিতে এক টাকা বাড়লেও মোটা চালের দাম সমান হারে কমেছে।

গতকাল রাজধানীর মালিবাগ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ভালোমানের নাজির শাইল ও মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৪ টাকা কেজি দরে। ব্যবসায়ীরা জানান, এক সপ্তাহ আগে তারা এ চাল বিক্রি করেছেন ৫৬ থেকে ৬২ টাকায়। খুচরা বাজারে গতকাল ৪০ থেকে ৪৪ টাকায় বিক্রি হওয়া মোটা চাল এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছিল তিন থেকে চার টাকা কম দরে। পাইকারি বাজারে মোটা চালের কেজি গতকাল ছিল ৩৮ থেকে ৪২ টাকা। আর মিনিকেট ও নাজির শাইল চালের গতকাল পাইকারি দর ছিল ৫৭ থেকে ৬২ টাকা।

যদিও বাজারদর পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দেয়া তথ্যানুযায়ী খুচরা বাজারে গতকাল মোটা চালের দাম ছিল প্রতি কেজি ৩৮ থেকে ৪২ টাকা। এক সপ্তাহ আগেও মোট চাল এ দামে বিক্রি হয় বলে টিসিবির দাবি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, খুচরা বাজারে গতকাল প্রতি কেজি সরু চালের দাম ছিল ৫৫ থেকে ৬২ টাকা। এক সপ্তাহ আগে ছিল ৫৪ থেকে ৬২ টাকা। টিসিবির হিসাব অনুযায়ী খুচরা বাজারে গতকাল প্রতি কেজি মাঝারিমানের চাল ৪৫ থেকে ৫২, সাধারণ লতা ও পায়জাম চাল ৪৫ থেকে ৪৮ এবং উন্নতমানের লতাপায়জাম বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৫২ টাকা কেজি দরে।

বাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার হিসাবে সরকার কর্তৃক আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দেয়ার কথা উল্লেখ করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, গত বছরের জুন মাসে সরকার চালের আমদানি শুল্ক ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৮ শতাংশ করে। এতে চাল আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাজারে চালের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়। তা ছাড়া সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের কারণেই দাম বেড়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির কথা বলে সরকার বাড়তি দামে ধান-চাল সংগ্রহ করার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে বাজারে এক ধরনের অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। যদিও ধান-চাল সংগ্রহের বর্ধিত মূল্য কৃষকের পরিবর্তে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে যায় বলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিবিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছরে বিশ্বের যে কটি দেশে চালের উৎপাদন বেশি হারে বেড়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ২০১৭ সালের মে মাসে হাওরে অকালবন্যায় ফসল তলিয়ে যাওয়ার কারণে চালের দাম বেড়ে যায়। তখন সরকার চালের আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশে নিয়ে আসে। কিন্তু এতে চালের আমদানি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বেড়ে গেলে সরকার গত জুনে আবারো শুল্ক ২৮ শতাংশ করে। এর পর চাল আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তবে উৎপাদন ভালো হওয়ায় দেশে এত দিন তেমন কোনো সমস্যা হয়নি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

সরকারি তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এবার আমনে বাম্পার ফসল হয়েছে। মজুতও যথেষ্ট পরিমাণে ভালো। গত বোরো মওসুমে এক কোটি ৯০ লাখ টন এবং আমনে এক কোটি ৩৫ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়েছে। যা এর আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেশি। ধান-চালের দাম এখন পর্যন্ত কৃষকের উৎপাদনের খরচের প্রায় সমান সমান আছে। ছয় মাস ধরে ধান-চালের দাম ক্রমাগতভাবে নিচে নামছিল। অবশ্য এক সপ্তাহ ধরে পরিস্থিতি পাল্টেছে। দাম আবার বাড়ছে।

ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীরা ধান-চালের দাম বেড়ে যাওয়াকে। তারা জানান, চলতি বছর প্রতি কেজি চালের উৎপাদন খরচ পড়েছে ৩৮ টাকা। আর সরকার সংগ্রহমূল্য নির্ধারণ করেছে ৩৬ টাকা। পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৩৩ থেকে ৩৪ টাকা দরে। সেই হিসাবে কৃষকের বর্তমানে লোকসান কমে আসছে। ধানের দাম বেড়ে যাওয়ায় চালের দামও কিছুটা বেড়েছে উল্লেখ করে তারা বলছেন, কৃষকের লোকসান যাতে না হয় সে জন্য চালের দাম ৪০ টাকার ওপরে যাওয়া উচিত।

বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ কে এম লায়েক আলী এ প্রসঙ্গে বলেন, বাজারে এখন ধান-চালের যা দাম, তাতে কৃষকের লোকসান হচ্ছে। কৃষকের স্বার্থে এই দাম আরো বাড়া উচিত। তবে দাম যাতে খুব বেশি না বাড়ে, সেই দিকে সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন, কৃষককে যদি চাল বিক্রি করে সংসার চালাতে হয় তাহলে তাকে অবশ্যই প্রতি মণ চালে কমপক্ষে ১০০ টাকা মুনাফা দেয়া উচিত। এ জন্য ধান-চালের দাম আরো বাড়ানো উচিত বলে তিনি মনে করেন। তিনি দাবি করেন, চালের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি আমাদের ওপর বর্তায় না। আমরা ধান ক্রয় করে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারে চাল বিক্রি করি। এখানে সামান্য লাভ রেখে আমরা চাল ছেড়ে দেই। বাড়তি মূল্য স্বাভাবিক করতে খুচরা ব্যবসায়ীদের প্রতি নজর দেয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার খাদ্য অধিদফতরে খাদ্যমন্ত্রীর সাথে চাল ব্যবসায়ী সমিতি, আড়তদার ও অটো চাল মিল মালিকদের মতবিনিয়ময় সভায় সদ্যদায়িত্ব নেয়া খাদ্যমন্ত্রী সাধনচন্দ্র মজুমদার বলেন, বাজারে অযৌক্তিক কারণে অস্বাভাবিকভাবে চালের দাম বৃদ্ধির কোনো সুযোগ নেই। দেশ হিসেবে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি অনেক আগেই। ইতোমধ্যে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি চাল ও খাদ্যশস্য মজুদ আছে। তারপরও চালের দাম বাড়বে কেন? তিনি বলেন, চালের বিষয়টি একেবারেই সাধারণ মানুষের সাথে সম্পৃক্ত। কাজেই এ সমস্যা সমাধানের উপযুক্ত উপায় আমরা অবশ্যই খুঁজে বের করব।

সুত্রঃ ‌নয়াদিগন্ত

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here