‘মরহুম’ নারীবাদীরা আল্লামা শফীর বক্তব্যে হঠাৎ ‘জীবিত’ হয়ে উঠলেন!

0
174

মাস দুয়েক আগের কথা। মাসুদা ভাট্টির জন্য সারি সারি দরদি চোখের পানি দেখা গেছে। ক্রুদ্ধ মানববন্ধনের গলা ফাটানো আওয়াজ শোনা গেছে। এরপর? এরপর আর তাদের খোঁজ মিলেনি। মাঝখানে কত মারধর গেল। সুবর্ণচর গেল, গণধর্ষণ ও গণপীড়ন গেল। তারা তখন মাটির উপরে ছিলেন বলে মনেই হয়নি। সেই মরহুম নারীবাদীরা হঠাৎ জীবিত হয়ে উঠলেন আবার। আহমদ শফী সাহেবের এক বক্তব্যে তারা ‘মরহুম’ থেকে ‘জীবিত’ হতে হতে একদম খাড়া হয়ে গেলেন। বাব্বাহ, হুজুরের এক বক্তৃতার এত পাওয়ার আগে আমাদের জানাই ছিল না।

১১ জানুয়ারি হাটহাজারি মাদরাসার মাহফিলে আল্লামা আহমদ শফী নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া মেয়েদের উচ্চ শিক্ষায় পাঠাতে নিষেধ করেছেন। নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে আরও কিছু কথাও বলেছেন। কেউ চাইলে সেসব কথার অনেক চুলচেরা কাটাছেড়া হতে পারে। কেউ চাইলে এত বয়স্ক, মান্যগণ্য একজন মুরব্বিকে মাঠে ময়দানের অনুষ্ঠানে উপস্থিত না করলেও চলে কি না-সে বিষয়েও হয়তো কথা চলতে পারে। কিন্তু আমি আজ বলছি অন্য কথা।

তাঁর এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেখলাম, জাতীয় গণমাধ্যমের বড় একটি অংশ নেতিবাচক চিৎকার জুড়ে দিল। পনের থেকে বিশ ঘণ্টার মধ্যে সুশীল নারী দরদিরা মৃতদশা ছেড়ে ‘জীবিত’ হয়ে উঠলেন। এ যেন এক আজব কেরামতি হুজুরের। এক বক্তব্যে মরহুম নারীবাদীদের জীবিত করেই ছাড়লেন। কেউ বলছেন হুজুরের বক্তব্য রাষ্ট্রবিরোধী, কেউ বলছেন সংবিধান বিরোধী। ভাবখানা, কী আর বলব, মনে হয়- রাষ্ট্র, সংবিধান আর আইন-কানুনের সব দস্তাবেজ তাদের হাতের তালুর মধ্যেই থাকে। রাষ্ট্র ও সংবিধানের দোহাই দিয়ে কাউকে নাকচ করতে আর উপরে তুলতে তাদের বেশি একটা বেগ পেতে হয় না।

অথচ মজার একটা ব্যাপার দেখুন! এ দেশের এক সবজান্তা সুশীল নারী কয়দিন আগে ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর মানুষকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে সম্বোধন করে বক্তৃতা দিয়েছেন। ‘বড়’ পত্রিকায় সে বক্তব্য ছাপাও হয়েছে। সংবিধান ও আইনে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তিনি কিন্তু সংযত হননি। সেই তিনিই আজ বললেন, আহমদ শফীর বক্তব্য সংবিধান বিরোধী। এদের বৈপরীত্ব বড় দেখার মতো জিনিস।

মেয়েদের শিক্ষা ও নিরাপত্তার চেয়েও এদের কাছে বড় ব্যাপার মতলবী চিৎকার। উদ্দেশ্যমূলক মায়াকান্না। এ জন্যই ক্যাম্পাসে ছাত্রী লাঞ্ছিত হলে, সুবর্ণচর ধর্ষিত হলে তারা চুপটি মেরে থাকে। ঘাপটি মেরে থাকে। মনে হয় বেঁচেই নেই। সেই তারাই যখন দেখে, প্রভাবশালী কোনো মহলের মনোযোগ পাওয়া যাবে, বরেণ্য কোনো ব্যক্তিত্বকে খাটো করা যাবে- তখন নীরবতার কবর ফুঁড়ে বের হয়ে আসে। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে দুনিয়া একসঙ্গে করে ফেলার চেষ্টা করে। কলহমগ্ন নারী-পুরুষের মতোই বেসুরো কোরাসে মানুষের ঘুম-শান্তি কেড়ে নিতে উদ্যোগী হয়। এইসব সময়চেনা ঝগড়াটে, মতলবী নারী-দরদিদের ব্যাপারে সজাগ থাকা দরকার সবার। সবচেয়ে বেশি নারীদের।

প্রায় শতবর্ষী একজন মানুষের কথা। যিনি হয়তো পূর্বাপর মনে রেখে, আগাগোড়া গুছিয়ে কথাগুলো পেশ করার সুযোগ এখন আর পান না। মূল কথাটা সরাসরি বলে দেন। কথার দরকারি অংশটা প্রকাশ করে বয়ান সম্পন্ন করেন। বিপথগামীরা তাঁর বয়স, প্রেক্ষাপট ও ক্ষেত্র-সব ভুলে গিয়ে একসারি বাক্য নিয়ে গিট্টু লাগিয়ে বসে যায়। পাইছি রে পাইছি- একটা ভাব নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড বাঁধানোর চেষ্টা করে। যত চেষ্টাই তারা করুক, লাভ হাতিয়ে নিতে পারে না। দূর থেকে ভালো মানুষেরা তাদের কাণ্ড দেখে আর মুখটিপে হাসে। ঝগড়া-পাগলদের সঙ্গে ঝগড়ায় লিপ্ত হওয়া শরমের ব্যাপার না!

মরহুম সুশীলদের এ দেশের মানুষ ভালো করেই চেনে। এরা কখন জীবিত হয়, এরা কখন মরে যায়, এরা কখন খাড়া হয়, এরা কখন শুয়ে পড়ে- সচেতন মানুষ ঠিকই টের পায়। এদের চেতনার দিনকাল, মৃত হওয়ার মওসুম সম্পর্কে মানুষ সম্যক জানে। ভাট্টির মিছিলে থাকলেও এরা যে সুবর্ণচরের পাশে থাকবে না- এই অংকটা কারো অজানা না। আল্লামা আহমদ শফীর বক্তব্যের ‘মওকা’ নিয়ে এদের গলাফাটানো চিৎকারে তাই শুভবুদ্ধির মানুষদের কিছুই যায় আসে না। মানুষ দেখে এবং নেয়- যেখান থেকে তার যে মেসেজ নিতে হয়।

সুত্রঃ ‌ইসলাম টাইমস

আরও পড়ুনঃ নারী শিক্ষা বিষয়ক নিজ বক্তব্যের ব্যাখ্যায় যা বললেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী

জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর ১১৮ তম মাহফিলে দেয়া আল্লামা শাহ আহমদ শফী’র ‘নারী শিক্ষা’ বিষয়ক একটি বক্ত্যব নিয়ে মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে। তার প্রেক্ষিতে নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি।

গণমাধ্যমে পাঠানো এই ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে আল্লামা আহমদ শফীর বক্তব্যের খণ্ডাংশ বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার করা হচ্ছে। এতে করে বিভিন্ন মহলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তাই নিজের কথার ব্যাখ্যা দিলেন তিনি। আল্লামা শাহ আহমদ শফী’র কার্যালয় থেকে প্রচারিত ব্যাখ্যা হুবহু তুলে ধরা হলো।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

গতকাল ১১ জানুয়ারি ২০১৯ ইং তারিখে জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী’র বার্ষিক মাহফিলে দেয়া আমার বক্তব্যের একটি খণ্ডাংশ বিভিন্ন মিডিয়ায় ভুলভাবে উপস্থাপন করায় জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে বলে আমি জানতে পেরেছি।

বক্তব্যে আমি মূলত বলতে চেয়েছি, ইসলামের মৌলিক বিধান পর্দার লঙ্ঘন হয়, এমন প্রতিষ্ঠানে মহিলাদের পড়াশুনা করানো উচিৎ হবেনা। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। এখানে শিক্ষা থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনাসহ যাবতীয় সকল কিছুই রয়েছে। ইসলামে নারীদের শিক্ষার বিষয় উৎসাহিত করা হয়েছে এবং সকলেই অবগত যে, উম্মুল মুমিনিন হজরত মা আয়িশা রাঃ ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস। তিনি শিক্ষাগ্রহণ না করলে উম্মত অনেক হাদিস থেকে বঞ্তি হয়ে যেত।

তবে এর পাশাপাশি ইসলামের একটি মৌলিক বিধান হচ্ছে পর্দা। নারীদের পর্দার বিষয় ইসলামে সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। আমি আমার বক্তব্যে বলতে চেয়েছি, শিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে যেন পর্দার বিধান লঙ্ঘন করা না হয়। কারণ আমাদের দেশের বেশীরভাগ সাধারণ শিক্ষাকেন্দ্রে সহশিক্ষা দেওয়া হয়। যেখানে ছেলে-মেয়ে একই সাথে শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। এতে করে পর্দার লঙ্ঘন হয়। আমি মূলত এই সহশিক্ষা গ্রহণেই মানুষকে সতর্ক করতে চেয়েছি।

মেয়েদের শিক্ষার পরিবেশ নিরাপদ করতে হবে : হাটহাজারীর বার্ষিক মাহফিলে আল্লামা আহমদ শফী

আমি জানতে পেরেছি যে, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে আমাকে নারী বিদ্বেষী ও নারী শিক্ষা বিদ্বেষী বলে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তারা আমার বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে। আমি হাইয়াতুল উলইয়ালিল জামিয়াতিল কওমিয়া’র চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আপনারা জানেন যে, হাইয়ার অধীনে হাজার হাজার নারী শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষার সনদ গ্রহণ করে থাকেন। ইতিমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান প্রধান করেছেন। এতে করে আমাদের দেশের লাখো মাদরাসা ছাত্র ও ছাত্রীরা দাওয়ারে হাদিস পাশ করে মাস্টার্সের সমমান অর্জন করছেন।

যে সম্মিলিত বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা দিয়ে হাজার হাজার নারী রাষ্ট্র স্বীকৃত উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত বলে পরিগণিত হচ্ছে, সেই বোর্ডের প্রধান হয়ে আমি কিভাবে নারী শিক্ষার বিরোধী হলাম তা বোধগম্য নয়।

আমি আবারো বলছি যে, আমি বা আমরা নারী শিক্ষার বিরুদ্ধে নই, তবে নারীর জন্য নিরাপদ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিষয় আমরা আগেও সতর্ক করেছি, এখনো করছি। আমরা চাই নারীরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হোক, তবে সেটা অবশ্যই নিরাপদ পরিবেশে থেকে এবং ইসলামের মৌলিক বিধানকে লঙ্ঘন না করে। শিক্ষা গ্রহণ অবশ্যই জরুরি, তবে সেটা গ্রহণের জন্য আমরা আমাদের কন্যাদের অনিরাপদ পরিবেশে পাঠাতে পারি না।

আমরা যেমন নিরাপদ পরিবেশে রেখে নারীদের সর্বোচ্চ শিক্ষায় (দাওরায়ে হাদিস সমমান মাস্টার্স) শিক্ষিত করে যাচ্ছি, আপনারাও সেভাবে নিরাপদ ব্যবস্থা করে শিক্ষা দান করুন। আমরা উৎসাহিত করব আপনাদের।

আমরা চাই এ দেশের নারীরা শিক্ষিত হোক। কারণ, মা শিক্ষিত হলেও সন্তান সঠিক শিক্ষা পাবে। নারীদের শিক্ষা গ্রহণের জন্য পরিবেশ তৈরি করুন। যেখানে পরিচালক থেকে শুরু করে কর্মকর্তারা সকলেই নারী থাকবেন। সে ধরনের শিক্ষা দানের ব্যবস্থা থাকলে আমরা তাতে উৎসাহিত করবো ইনশা আল্লাহ।

হেফাজতের ১৩ দফা দাবীতেও নারীদের জন্য নিরাপদ শিক্ষার কথা উল্লেখ আছে। তাছাড়াও কথাটি আমি মাহফিলে আগত মেহমানদের উদ্দেশ্যে বলেছি। তারা যেন ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে অবগত হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে তা বাস্তবায়নের জন্য নয়।
পরিশেষে আমি অনুরোধ করব যে, আমার বক্তব্যের খণ্ডাংশ প্রচার করে জাতিকে বিভ্রান্ত করবেন না।

শাহ আহমদ শফী

সুত্রঃ ‌ইসলাম টাইমস

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here