বাংলাদেশে সাংবাদিক ও পাঠকের চোখে গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন?

0
86

বাংলাদেশে গণমাধ্যম কিংবা এর কর্মীরা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে সেটা নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক বেশ পুরনো। ২০১৯ সালে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস নামে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সেখানে ১৮০ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এর আগের বছরের তুলনায় চার ধাপ নেমে ১৫০এ দাঁড়িয়েছে।

অথচ গত সপ্তাহে লন্ডনে বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যম খোদ ব্রিটেনের গণমাধ্যমের চেয়েও স্বাধীন।

বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কী মনে করেন গণমাধ্যমকর্মী কিংবা সাধারণ মানুষ?

পুরনো ঢাকার গোপীবাগ। রাস্তার পাশে দেয়ালে সাঁটানো রয়েছে একটি জাতীয় দৈনিকের পাতা।

সেখানে চোখ বোলাচ্ছেন ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান। কাজের ফাঁকে অনেকটা এভাবেই দেশের খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করেন তিনি।

পত্রিকায় কি সব খবর তিনি পান? আমার এই প্রশ্নের জবাবে মি. রহমান বলেন, “আমার কাছে মনে হয় সাংবাদিকরা চেষ্টা করে। কিন্তু তারা প্রশাসনের দিক দিয়ে বাধার মুখে পড়ে। যার কারণে সবসময় সঠিক খবর দিতে পারে না।”

বিষয়টি নিয়ে আরো কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলি। সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না বলেই মনে করেন মিজানুর রহমান। সবার মন্তব্যই অনেকটা একইরকম।

এর মধ্যে শরীফুন্নেসা নামে একজন বলছিলেন, “আমাদের চারপাশে যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলোর সঠিক নিউজ পাচ্ছি বলে মনে হয় না। অন্তত: আমরা যেভাবে ঘটনাগুলো দেখি সেভাবে মিডিয়াতে আসে না।”

বোঝাই যায় অনেক মানুষ মনে করেন গণমাধ্যম সবসময় সব খবর দিচ্ছে না, কিংবা দিতে পারছে না। তারা মনে করেন, এবং এর পেছনে কাজ করে বিভিন্ন ধরণের চাপ। কিন্তু এরকম চাপ কি আসলেই আছে?

দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে ঢাকায় সাংবাদিকতা করছেন উদিসা ইসলাম।

অনলাইন গণমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রধান প্রতিবেদক মনে করছেন, সাংবাদিকদের উপর চাপ আছে। কখনো সেটা কর্পোরেট, কখনো বিজ্ঞাপন বা প্রভাবশালী কোন মহলের কাছ থেকে সেই চাপ আসে।

কিন্তু এর বাইরেও আরো একধরণের চাপ আছে, যেটা অনেক সময় সাংবাদিকদের সেলফ সেন্সরশিপে বাধ্য করে।

তিনি বলছিলেন, “বিভিন্ন যে আইন আছে, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বলেন বা ৫৭ ধারার মামলা বলেন সেগুলো সাংবাদিকদের মাথায় আগে থেকেই থাকে। সে ভাবে আমার প্রতিবেদনের কারণে আমাকে ঝামেলায় পড়তে হতে পারে। ফলে সে আগে থেকেই সেলফ সেন্সরশিপে চলে যায়।”

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের যে বৈশ্বিক প্রতিবেদন সেখানেও এই ধারনার প্রতিফলন দেখা যায়।

২০১৯ সালের ঐ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫০ তম। অথচ গতবছরও তা ছিলো ১৪৬ তম। অর্থাৎ গণমাধ্যম স্বাধীনতার সূচকে বাংলাদেশের অবনতি ঘটছে।

যদিও সরকার এর বিপরীত মতই দিচ্ছে।

গেল সপ্তাহে লন্ডনে এ বিষয় নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী বিবিসিকে বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যম এমনকি ব্রিটেনের চেয়েও স্বাধীনতা ভোগ করছে।

সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের পুরো গণমাধ্যম বর্তমানে যে স্বাধীনতা ভোগ করে, ইউকে-তেও অতো স্বাধীনতা সব সময় সবক্ষেত্রে ভোগ করে না।”

উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যে ভুল সংবাদ পরিবেশনের জন্য একটি পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে মি. মাহমুদ বলেন, “বাংলাদেশে ভুল অসত্য কিংবা ফেব্রিকেটেড সংবাদ পরিবেশনের কারণে কোন সংবাদপত্র বন্ধ হয় না।”

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশে বিভিন্ন কৌশলে গণমাধ্যম বন্ধ, নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এমনকি সাময়িক বন্ধ হবার নজীর আছে।

বছর-খানেক আগেই ঢাকার দুটি নামকরা গণমাধ্যমের অনলাইন সংস্করণ সাময়িকভাবে বন্ধ হবার ঘটনা ঘটে।

এর একটি বিডি নিউজ টুয়েন্টিফোর, অন্যটি প্রথম আলো।

এরও কিছুদিন আগে ঢাকা থেকে একজন সংবাদকর্মী রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হবার দু’মাস পর তাকে পাওয়া যায় নারায়ণগঞ্জে।

কিন্তু এসব ঘটনা কার নির্দেশে কিংবা কিভাবে ঘটছে, তা কখনোই স্পষ্ট হয়না।

আর এখানেই গণমাধ্যমের জন্য সংকট তৈরি হয় বলে মনে করেন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাভিশনের হেড অব নিউজ মোস্তফা ফিরোজ।

বিবিসিকে তিনি বলছিলেন, “যদি আইনগতভাবে কোন সংস্থা কোন ব্যবস্থা নেয়, তাহলে তার বিপরীতে আইনের একটা সুরক্ষা পাওয়া যায়। কিন্তু এখানে তো সেটা হচ্ছে না। এখানে কোন অদৃশ্য শক্তি কিভাবে গণমাধ্যমগুলোতে নিয়ন্ত্রণ বা খবরদারি করছে, সেটা তো বোঝা যাচ্ছে না। ফলে এটা তো একটা আতংক। বড় বড় গণমাধ্যম যখন বিপদে পড়ে তখন সেটা অন্যান্য গণমাধ্যমের কাজকে আরো সংকুচিত করে ফেলে।”

উৎসঃ বিবিসি বাংলা

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here