বিদেশে এত বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক মারা যাচ্ছেন কেন?

0
113

গত বছর বিদেশে মারা গেছেন প্রায় ৩৮০০ বাংলাদেশি শ্রমিক। ২০০৫ সালের পর এক বছরে মারা যাওয়া এ সংখ্যা সর্বোচ্চ। বিশেষজ্ঞরা বলছে, বিদেশে মারা যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা এভাবে বাড়ার ফলে তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণের বিষয়টিই প্রতিফলিত হয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।

‘হোয়াই আর সো ম্যানি ওভারসিস বাংলাদেশি ওয়ার্কার্স ডাইং?’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, জর্ডানে মারা যান বাংলাদেশি এক যুবতী শ্রমিক। তার মৃত্যুতে ক্ষোভ দেখা দেয়। দাবি ওঠে, কী কারণে বিদেশে কাজ করতে গিয়ে প্রাণহীন দেহ হয়ে ফেরত আসা শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে তা খুঁজে বের করতে হবে।

২০১৭ সালে বাংলাদেশের নিজ গ্রামের বাড়ি ছাড়েন মৌসুমী আক্তার (২০)।

তারপর ৫০০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে জর্ডান পৌঁছেন একজন গৃহকর্মী হিসেবে। দেশে অভাবের মুখে পড়া তার পরিবারকে ভালো রাখাই ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তাকে ফিরে আসতে হয়েছে মৃত অবস্থায়। ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সরকারের প্রকাশিত নতুন ডাটা অনুযায়ী গত বছর বিদেশে কাজ করতে গিয়ে মারা গেছেন বাংলাদেশি ৩৭৯৩ জন শ্রমিক। তাদের একজন মৌসুমী আক্তার।

বাংলাদেশে বহু গরিব পরিবার আছে। তারা বিদেশে কর্মরত তাদের স্বজনদের পাঠানো রেমিটেন্সের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন। কিন্তু তাদের মারা যাওয়ার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অধিক থেকে অধিকতর পরিমাণ মানুষ দাবি করছেন, কেন এত বেশি সংখ্যক শ্রমিক মৃতদেহ বহনের ব্যাগে করে ফেরত আসছেন দেশে তা জানার জন্য।

মৌসুমী আক্তারের চাচা মোহাম্মদ ইমরান খান। তিনি বলেন, জর্ডান থেকে পাঠানো মৌসুমীর মেডিকেল রিপোর্ট অনুযায়ী স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে তার। কিন্তু তার দেহ দেশে আসার পর আমরা তাতে কালো কালো চিহ্ন দেখতে পেয়েছি। এ থেকে বোঝা যায়, তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল। আর সে কি কারণেই বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হবে? তার বয়স মাত্র ২০ বছর। তিনি দাবি করেন, এ জন্য সরকারের উচিত ছিল তার মৃত্যুর আসল কারণ উদঘাটনে দ্বিতীয়বার ময়না তদন্ত করা। এ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করাতে যে পরিমাণ টাকা লাগে তা বহন করার সামর্থ্য নেই তার পরিবারের। তিনি বলেন, বিদেশ থেকে যেকোনো মৃতদেহ দেশে এলেই তার দ্বিতীয়বার ময়না তদন্ত হওয়া উচিত।

মোহাম্মদ ইমরান খানের পরিবারই যে এমন সংশয়ে তা নয়। ২৩ বছর বয়সী বিলাল হোসেন মারা গেছেন। প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছিল, তিনিও স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। কিন্তু সৌদি আরবে বিলালের রুমমেটদের মাধ্যমে তার পরিবার জানতে পারে, রাস্তার পানি পরিষ্কার করার সময় বৈদ্যুতিক শক লেগে মারা গেছেন বিলাল।

সরকারি এজেন্সি ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের ডাটা অনুযায়ী, নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বিদেশে মারা যাওয়া প্রতি দুজন বাংলাদেশি শ্রমিকের মধ্যে একজনের বেশিকে দেখানো হয়েছে স্ট্রোকে মারা গেছেন।

রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার বলছে, বিদেশে কাজ নেয়া বাংলাদেশির সংখ্যা বাড়ছে। সরকারি ডাটা থেকে দেখা যায়, ২০১৭ সালে ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কাজ নিয়ে বিদেশে গেছেন। এ সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণ। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছে, ক্রমবর্ধমান হারে মারা যাওয়ার ফলে অনেক অভিবাসী শ্রমিকের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারের বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর সিআর আবরার বলেছেন, হতাশা বড় একটি ভূমিকা রাখে। এমনকি এসব শ্রমিককে বিদেশে যাওয়ার আগে প্রচুর অর্থ খরচ করতে হয়। তাদের ভেতর কী পীড়া থাকে সে সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। যেহেতু হতাশা-সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে অবজ্ঞা করা হয় তাই আমাদের উচিত অধিক হারে সুরক্ষা বিষয়ক পদক্ষেপ নেয়া। গত রোববার প্রায় ১০০ বাংলাদেশি শ্রমিক

ফেরত এসেছেন সৌদি আরব থেকে। তাদের বেশির ভাগই নারী। এ বিষয়ে ব্র্যাক বলেছে, এসব শ্রমিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন। তাদের কারো কারো আঘাতটা এত গুরুতর, ফেরার পর তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।

অভিবাসী ইস্যুতে গবেষণাকারী সংগঠন অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম। এর প্রধান শাকিরুল ইসলাম বলেছেন, বিদেশে যাওয়ার জন্য যে বিশাল খরচ এবং সেখানে যাওয়ার পর তারা যে নাজুক অবস্থার শিকার হন সেগুলোই মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার নেপথ্যে মূল ফ্যাক্টর। তিনি বলেন, অনেক কারণে শ্রমিকরা মারা যান। তার মধ্যে একটি হলো- তারা বাজে পরিবেশে কাজ করেন। দ্বিতীয়ত, বিদেশে কাজের জন্য ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের উচ্চমূল্য শোধ করতে হয়। এই অর্থ আসে ঋণের মাধ্যমে। এটা শ্রমিকদের মানসিক অবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

ওই রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, তৈরি পোশাকের পরেই বাংলাদেশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিটেন্স আসে অভিবাসী শ্রমিকদের কাছ থেকে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের উচিত প্রকৃত সত্যটি পরিবারগুলোর কাছে জানানোর জন্য সরকারের আরো বেশি কিছু করা উচিত।

সমাজকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা রওনক জাহান বলেছেন, এ বিষয়টিতে আমাদের চিন্তা করা প্রয়োজন। যদি আমাদের মনে হয় যে, একটি মৃতদেহের আরেকবার ময়নাতদন্ত করা উচিত, তাহলে কেন তা করা হবে না? এগুলো হলো নতুন ইস্যু, যা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।

মৌসুমী আক্তারের মা আনোয়ারা বলেছেন, সপ্তাহে একবার মৌসুমীর সঙ্গে কথা বলতাম আমি। প্রথম দু-একটা মাস বেশ ভালো ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে তাকে হতাশাগ্রস্ত মনে হলো। সে বলতো, কোনো বিরতি ছাড়াই তাকে সারা দিন কাজ করতে হয়। সর্বশেষ যখন তার সঙ্গে আমি কথা বলেছি, সে আমাকে বলেছে যে, আরেকটি কাজ নেয়ার আগে সে দেশে আসতে চায়। তারপর কী ঘটল আমি জানি না। আমার মনে হয় তারা আমার মেয়েকে হত্যা করেছে।

সুত্রঃ ‌মানবজমিন

আরও পড়ুনঃ জামিনপ্রার্থীদের ভিড় হাইকোর্টে

নির্বাচন শেষ হয়েছে তিন সপ্তাহ আগে। এরপরও হাইকোর্টে জামিনের জন্য হাজারো মানুষের ভিড় হচ্ছে প্রতিদিন। তাদের কারো বিরুদ্ধে অভিযোগÑ তারা বিএনপির নেতাকর্মী বা সমর্থক। কারো সম্পর্কে ধারণা তারা ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার যশোরের বাঘারপাড়া অভয়নগর এলাকার কয়েকজন নেতাকর্মীকে নিয়ে হাইকোর্টে জামিন নিতে আসেন যশোর-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার টি এস আইউব

হাইকোর্টে জামিন নিতে এসেছেন হাঁড়িপাতিল ফেরিওয়ালা নয়নউদ্দিন (৭৫)। ২০ জানুয়ারি সকালে হাইকোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে বসে এই বৃদ্ধকে পান বাটতে দেখা যায়। হামান দিস্তায় পান বেটে খাচ্ছিলেন। সঙ্গে পুরনো একটি ব্যাগে কিছু পলিথিনসহ দু-একটি কাপড়। পরনে একটি পুরনো পাঞ্জাবি ও সাদা লুঙ্গি। আপন মনে পান বানাচ্ছেন তিনি। কারো দিকে খুব বেশি তাকাচ্ছেনও না। কাছে গিয়ে পরিচয় জানতে চাইলে বলেন, নাম নয়ন উদ্দিন। বাড়ি পাবনার বেড়ায়। এলাকায় বাড়ি বাড়ি ফেরি করে হাঁড়িপাতিল বিক্রি করেন। এ দিয়েই চলে সংসার। বললেন তিনি কোনো দল করেন না। দল না করলেও এই বৃদ্ধ হাইকোর্টে এসেছেন বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলায় জামিন নিতে। এই মামলায় আসামি হওয়ার আগে কোনো দিন হাইকোর্টে আসেননি নয়ন। জামিন নিতে এলেও আইনজীবী কে তা জানেন না তিনি। বলেন, স্থানীয় পৌর বিএনপির সভাপতি জামিন করিয়ে দিবেন বলে তার সঙ্গে এসেছেন।

বিএনপি করেন কি না এই প্রশ্নে বৃদ্ধের জবাব, কোনো দল করি না বাবা। ধানের শীষে ভোট দেই। এ জন্য নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নেতারা বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে মামলা দিয়েছে। এক ছেলে আছে। সে মোটর মেকানিকের কাজ করে। তাকে নির্বাচনের আগে বলেছিল বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে। সে চলে যাওয়ায় মামলা দেয়নি। কিন্তু আমাকে কোনো কিছু বলেনি। তবুও মামলা দিয়েছে। নয়ন বলেন, মামলা হওয়ার পর থেকে পুলিশ বাড়ি গিয়ে হানা দেয়। তাই এতদিন পালিয়ে ছিলেন। ভোটও দিতে পারেননি এবার। আর নির্বাচনের পর এসেছেন জামিন নিতে।

যশোরের বাঘারপাড়া থানার বন্দবিলা ইউনিয়নের দক্ষিণ বধারাকান্দী জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন মো: মিজানুর রহমান হাইকোর্টে জামিন নিতে এসেছেন। গতকাল মঙ্গলবার হাইকোর্টের এনেক্স ভবনের সাথে গাছতলায় দেখা হয় তার সাথে। যশোরের অভয়নগর ও বাঘারপাড়া উপজেলা থেকে আসা কয়েক শ’ মানুষের সঙ্গে তিনিও জামিন নিতে এসেছেন। মিজানুর রহমান জানান, নির্বাচনের আগে গত ২৩ ডিসেম্বর যশোরের খাজুরা বাজারে ককটেল বিস্ফোরণের একটি মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমার বাড়ি ওই এলাকা থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। আমি মসজিদে আজান দেয়া ও নামাজ পাড়ানোর কাজে ব্যস্ত থাকি। ওই ঘটনা সম্পর্কে আমার কিছু জানা নেই।

হাইকোর্টের এনেক্স ভবন এবং আগাম জামিন প্রদানকারী সংশ্লিষ্ট কোর্টের আশপাশে গতকাল দেখা যায় দেশের বিভিন্ন জেলা ও থানা থেকে হাজার হাজার লোক নির্বাচনের আগে দায়ের করা নাশকতার মামলায় জামিন নিতে এসেছেন। নির্বাচনের আগে দায়ের করা নাশকতার মামলায় কোনো কোনো এলাকায় শত শত বিএনপি নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলায় তারা জামিন নিতে এসেছেন।

গত সোমবার বিকেল ৪টায় সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনের দক্ষিণ পাশে কারপার্কিংয়ের কাছে পাবনার সাঁথিয়া থেকে আসা লুঙ্গি পরা কয়েকজন লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে মো: আবদুল কুদ্দুস (৪০) জানান, গত ২৪ ডিসেম্বর সাঁথিয়া থানায় দায়ের করা মামলায় জামিন নিতে তিনিসহ ৪০ জন এসেছেন। তিনি জানান, সাঁথিয়ার কাশিনাথপুর আমবাজারে নৌকা পোড়ানোর অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ওই ঘটনা সম্পর্কে তার কিছু জানা নেই। গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে হাইকোর্টে এসেছেন জামিন নিতে। হাইকোর্ট থেকে জামিনও পেয়েছেন। এখন এলাকায় ফিরে যাবেন।

হাইকোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে গতকাল দেখা হয়, ভালুকা থানার রাজৈর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানান, নির্বাচনের আগে গত ২৬ ডিসেম্বর তাদের বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা করা হয়। তিনিসহ ভালুকা উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফখরুদ্দিন আহমদ বাচ্চুসহ শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মীকে এ মামলার আসামি করা হয়। ভালুকা থেকে আসা ছফিরুদ্দিন (৬৫) জানান, গত ২৬ ডিসেম্বর ভালুকা বাজারে গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে ১৩১ জন বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ওই মামলায় তিনি ৮৭তম আসামি। তিনি বলেন, ভালুকা বাজার থেকে তার বাড়ি ৭ কিলোমিটার দূরে। বাস পোড়ানো সম্পর্কে তার কিছুই জানা নেই।

শেরপুর থেকে হাইকোর্টে জামিন নিতে আসেন শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মী। গতকাল হাইকোর্টের সামনে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল আমীনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, নির্বাচনের আগে গত ১৬, ১৭, ২১ ও ২৫ ডিসেম্বর শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় জামিন নিতে হাইকোর্টে এসেছেন।

গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় হাইকোর্টের সামনে গাছতলায় জামিন নিতে আসা শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মী নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়র টি এস আইয়ুব। তিনি সংসদ নির্বাচনে যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। টি এস আইয়ুব জানান, বাঘারপাড়া ও অভয়নগর থানায় নির্বাচনের আগে ও পরে দায়ের করা ৯টি মামলায় ৩৫০ জন বিএনপি নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। গত ২৩, ২৪, ২৬, ২৭ ডিসেম্বর ও ৬ জানুয়ারি এসব মামলা করা হয়। তাদের আগাম জামিন নেয়ার জন্য হাইকোর্টে এসেছেন। এর মধ্যে ৩টি মামলায় জামিন হয়েছে। বাকি মামলায় জামিনের জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন, মামলার কারণে নেতাকর্মীরা গ্রেফতার আতঙ্কে আছেন। এলাকায় থাকতে পারছেন না। তিনি আভিযোগ করেন, নির্বাচনের দিন তার পোলিং এজেন্ট শামসুর রহমানকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

দেশের বিভিন্ন জেলা ও থানা থেকে জামিন নিতে আসা বেশির ভাগ বিএনপি নেতাকর্মীর জামিন আবেদন করা হয় সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি জয়নুল আবেদীন, বিএনপির আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামালসহ বিএনপি সমর্থক বেশ কয়েকজন আইনজীবীর চেম্বার থেকে। জয়নুল আবেদীন বলেন, সারা দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ জামিন নিতে আসছেন। আমি আমার বেশ কয়েকজন জুনিয়রকে জামিন আবেদন ফাইল করার দায়িত্ব দিয়েছি। তারা এগুলো দেখছেন। হাইকোর্ট এনেক্স ভবনের ৫, ১২, ১৭, ১৮, ১৯, ২২ ও ৩২ নম্বর আদালতে আগাম জামিন আবেদনের শুনানি গ্রহণ করছে বলে আইনজীবীরা জানান।

এ বিষয়ে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, গত সোমবার ও গতকাল তিনি চার শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মীর জামিন করিয়েছেন। ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, ঢাকা, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর জেলার বিভিন্ন থানা থেকে এসব বিএনপি নেতাকর্মী জামিন নিতে এসেছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এসব মামলা করা হয়েছে। এটা নজিরবিহীন। একতরফা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন করার জন্য গত ১১ ডিসেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা করা হয়। প্রায় প্রতিটি থানায় ১০ থেকে ১৫টি নাশকতার মামলা করা হয়েছে। এ বিষয়ে আইনজীবী সগীর হোসেন লিওন বলেন, সোম ও মঙ্গলবার তিনি দুই শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মীর জামিন করিয়েছেন। এছাড়া নির্বাচনের পর থেকে এ পর্যন্ত আট শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মীর আগাম জামিন করিয়েছেন। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁও, পিরোজপুর, নারায়ণগঞ্জ, শেরপুর, যশোর ও মাদারীপুরের বেশি নেতাকর্মী রয়েছেন বলে তিনি জানান। এ বিষয়ে আইনজীবী মাসুদ রানা বলেন, সোম ও মঙ্গলবার তিনি প্রায় ৬০ জন বিএনপি নেতাকর্মীর আগাম জামিন করিয়েছেন।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ হাইকোর্টে জামিন নিতে আসা প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, বাংলাদেশে বিএনপি করে, ছাত্রদল বা যুবদল করে এমন কোনো নেতাকর্মী ও সমর্থক নেই যাদের বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা নেই। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে ও পরে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়েক হাজার মামলা করা হয়েছে। নি¤œ আদালতে মানুষ জামিন পাচ্ছে না, এ জন্য হাইকোর্টে আসছেন। মামলার কারণে মানুষ নিজেদের কাজকর্ম করতে পারছেন না। ৮২ বা ৮৩ বছরের বৃদ্ধের বিরুদ্ধেও নাশকতার মামলা করা হয়েছে। সরকার যদি আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতো তা হলে এরকম মামলা দিয়ে দেশের মানুষকে হয়রানি করত না। এটা দুঃখজনক। এটা দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। এতে মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণœ হচ্ছে। দেশের মানুষ শান্তি চায়। এসব মামলা দিয়ে পরিবেশ অশান্ত করা হচ্ছে। আদালতও এসব মামলা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। এটা বিচার বিভাগের জন্য শুভ নয়।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান প্রবীণ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বর্তমান অনির্বাচিত সরকারের আমলে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, মামলা, নির্যাতন সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। সারা দেশে হাজার হাজার নেতাকর্মী মামলায় জর্জরিত এবং আতঙ্কে রয়েছে। পুলিশের এজাহারে অজ্ঞাত আসামি উল্লেখ থাকায় তারা গ্রেফতার ও পুলিশের নির্যাতনের ভয়ে ঘরছাড়া। এমন কি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের স্ত্রী-কন্যাদেরকেও আসামি করার ভয় দেখিয়ে আতঙ্কিত করা হচ্ছে। গ্রেফতার ও হয়রানি হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরও মাসের পর মাস তাদেরকে আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। এমনকি ২০১৩ সালের মামলায়ও আজ পর্যন্ত চার্জশিট হয়নি, বিচার হয়নি। কিন্তু আসামিদের জামিনে যাওয়ার পরও নিয়মিত হাজিরা দিতে হচ্ছে। ফলে একদিকে সময় ক্ষেপণ, অন্যদিকে অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, হাজার মানুষের ভিড় সরকার প্রশাসন ও সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে ভোট ডাকাতি করে আবার ক্ষমতায় এসেছে। নির্বাচনের আগে ও পরে স্থানীয়ভাবে যাতে প্রতিবাদ না হয় তার জন্য শত শত লোককে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। সেই কারণে দেখা যাচ্ছে প্রতিদিন শত শত নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়ে পুলিশের নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আগাম জামিন নিতে হাইকোর্টের বারান্দায় দিনের পর দিন অবস্থান করছেন। এ অবস্থা এবং তাদের মনের ক্ষোভ দেখে বিরোধী দলের নেতৃত্বের প্রতি অনেকেরই নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছে। তাই আমি মনে করি, আমাদের নেতাদের অবশ্যই সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। আইনি প্রক্রিয়ায় এসব নেতাকর্মীকে মামলা থেকে মুক্তি দেয়া দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। তাই প্রশাসনিক আদেশে এসব রাজনৈতিক মামলা যাতে প্রত্যাহার হয় তার ব্যবস্থা করতে হবে।

খন্দকার মাহবুব হোসেন আরো বলেন, বহু নেতাকর্মীকে মিথ্যা মামলা ও হয়রানির মধ্যে ফেলে বিরোধী দলের গণতন্ত্র কায়েম, ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার আন্দোলন কোনো অবস্থায়ই সক্রিয় হবে না বলে আমি মনে করি। তাই এই নির্যাতিত নেতাকর্মীদের মামলার জাল থেকে মুক্ত করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এখন সময়ের দাবি।

এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

উৎসঃ ‌নয়াদিগন্ত

আরও পড়ুনঃ পঙ্গু তারা মিয়া চাপাতি, হকিস্টিক দিয়ে পুলিশকে আক্রমণ করেছে এমন অভিযোগে মামলা!


ডান হাতটি অস্বাভাবিক চিকন, নাড়াতেই কষ্ট হয়। কিছু ধরতে বা কাজ করতে পারেন না ডান হাত দিয়ে। এমনকি ডান হাতে খেতেও পারেন না। এটি তার জন্মগত সমস্যা। বাম হাত তুলনামূলকভাবে লম্বা এবং বাঁকানো। খুব কষ্ট করে বাম হাত দিয়ে খেতে হয়। ছবির এই মানুষটির ডান হাত অচল, বাম হাতও প্রায় অচল। তিনি সুনামগঞ্জের অধিবাসী, নাম তারা মিয়া।

তারা মিয়া চাপাতি, হকিস্টিক ও লোহার রড় হাতে নিয়ে আক্রমণ করেছেন পুলিশের ওপর। ভিক্ষা করে জীবনযাপন করা তারা মিয়ার বিরুদ্ধে পুলিশ এমন অভিযোগ এনে মামলা করেছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ২৮ ডিসেম্বর অর্থাৎ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুদিন আগে বিকাল ৪টার পর মল্লিকপুর বাজারে এই আক্রমণের ঘটনা ঘটে। ৫২ জনকে আসামী করে মামলা করেছে পুলিশ। তারা মিয়া সেই ৫২ জনের একজন।

ঘটনার দুদিন পর জামালগঞ্জ থানায় দায়ের করা মামলায় তারা মিয়াকে অভিযুক্ত করা হয়। ঢাকায় হাইকোর্ট চত্বরে দ্য ডেইলি স্টারের এই সংবাদদাতাকে তিনি বলেন, “আমার হাতের যখন এই অবস্থা তখন আমি কীভাবে পুলিশকে আক্রমণ করতে পারি? একদিকে ডান হাত ব্যবহার করতে পারি না, অন্যদিকে, বাম হাতটাও তেমন কাজ করে না।”

উচ্চ আদালতে অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের আশায় আসা ৪৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তি আরও বলেন, “আমি রাজনীতি করি না। আমি ভিক্ষা করে জীবন চালাই।… আমার পরিবারের অবস্থা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।”

জামালগঞ্জ থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম জানান, মামলাটিতে অভিযুক্ত হিসেবে ৫২ জনের নাম রয়েছে। অজ্ঞাত রয়েছেন আরও ৭০ থেকে ৮০ জন।

মামলার বিবরণীতে রয়েছে, সেদিন (২৮ ডিসেম্বর) বিকাল ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে অভিযুক্তরা অবৈধভাবে মল্লিকপুর বাজার এলাকায় জড়ো হয়ে ‘ধানের শীষের’ পক্ষে মিছিল বের করে। তারা রাস্তা আটকায় এবং পুলিশের ওপর আক্রমণ করে। এতে অভিযোগকারীসহ ৫জন পুলিশ সদস্য আহত হন।

এ বিষয়ে তারা মিয়া জানান, “আমি কখনো কোনো মিছিলে অংশ নেই নাই। আর পুলিশকে আক্রমণ করা তো দূরের কথা।”

এরপর তাকে দেখা যায়, উদ্বেগের সাথে আদালত চত্বরে এদিক-ওদিক হাঁটাহাঁটি করতে।

সুত্রঃ ‌দ্যা ডেইলি স্টার

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here