নুসরাত হত্যায় মানি লন্ডারিং সংশ্লিষ্টতার অনুসন্ধানে সিআইডি

0
155

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় মোটা অংকের মানি লন্ডারিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে এরই মধ্যে অনুসন্ধানে নেমেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি।

তদন্তের অংশ হিসেবে শিগগিরই সিআইডি আর্গানাইজড ক্রাইমের একটি দল ফেনীতে যাবে। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) মোল্যা নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার আগে রাফির ওপর চুন হামলা হয়েছে। শ্লীলতাহানির অভিযোগ রয়েছে। প্রত্যেকটি ঘটনাতেই অবৈধ অর্থের ব্যবহার হয়েছে বলে সিআইডির কাছে তথ্য রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কেবল মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগই নয়, রাফি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে কিনা; তাও খতিয়ে দেখবে সিআইডি।

সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের এএসপি শারমীন জাহান বলেন, বিষয়টি নিয়ে অমরা বুধবার থেকে অনুসন্ধান শুরু করেছি। অনুসন্ধান এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে আছে।

‘কীভাবে অনুসন্ধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে, সে বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হচ্ছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সোনাগাজী থানায় মানি লণ্ডারিংয়ের মামলা হবে। এরপর তদন্ত কাজ শুরু করা হবে।’

মানি লণ্ডারিং সংশ্লিষ্টতা নিয়ে শনিবার বেলা ১১টায় সিআইডি কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হবে বলে এএসপি শারমীন জাহান জানান।

তিনি বলেন, তদন্তের অংশ হিসেবে সোনাগাজীর আলোচিত ওসি (সম্প্রতি প্রত্যাহার হওয়া) মোয়াজ্জেম হোসেনসহ অভিযুক্তদের ব্যাংক হিসাবে লেনদেন খতিয়ে দেখা হবে। এই হত্যাকাণ্ডে অর্থলেনদেনের সঙ্গে যাদেরই সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যা: সোনাগাজী উপজেলা আ’লীগের সভাপতি রুহল আমিনকে গ্রেফতার


মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহল আমিনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে সোনাগাজী তাকিয়া রোডের নিজ বাসভবন থেকে তাকে গ্রেফতার করেন পিবিআই সদস্যরা।

আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন।

পিবিআই জানিয়েছে, এক আসামির সঙ্গে তার ছয় সেকেন্ডের কথোপকথনের অডিও সংগ্রহ করা হয়েছে। ওই আসামির স্বীকারোক্তিতে হত্যাকাণ্ডে তার জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ফেনীর পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান তাকে গ্রেফতারের সত্যতা নিশ্চিত করে যুগান্তরকে বলেন, শাহাদাত হোসেন শামীম নামে এক আসামি ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জাবনবন্দিতে রুহুল আমিন জড়িত ছিলেন বলে জানিয়েছেন।

‘সে মোতাবেক মোবাইল কললিস্টের সূত্র ধরে ওই আসামির সঙ্গে তার ছয় সেকেন্ডের কথোপকথনের সত্যতা মিলেছে।’

তিনি বলেন, তবে নুসরাত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে।

নুসরাত এবছর আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন। গত ৬ এপ্রিল আরবি প্রথমপত্র পরীক্ষা দিতে গেলে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় কয়েকজন।

এ ঘটনায় দগ্ধ নুসরাত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মারা যান।

মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে নুসরাতের পরিবারের দায়ের করা মামলা তুলে না নেয়ায় অধ্যক্ষর লোকজন তার গায়ে আগুন দেয়।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ সোনাগাজী ইসলামীয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি বাতিল


মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার সোনাগাজী ইসলামীয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ১৩ সদস্যবিশিষ্ট পরিচালনা কমিটি বাতিল (বিলুপ্ত) ঘোষণা করেছে ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাও. মোহাম্মদ হোসাইন জানান, ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. আহছান উল্লাহ কমিটি বাতিল (বিলুপ্তির) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি আরও জানান, আগামী ২-১ দিনের মধ্যে ৫ সদস্যবিশিষ্ট এডহক কমিটি গঠন করা হবে।

গত ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। মাদ্রাসার এক ছাত্রী সহপাঠী নিশাতকে ছাদের ওপর কেউ মারধর করছে, এমন সংবাদ দিলে তিনি ওই ভবনের তিনতলায় যান। সেখানে মুখোশধারী বোরকা পরিহিত ৪-৫ জন তাকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়। তিনি অস্বীকৃতি জানালে গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। গত ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মারা যান নুসরাত।

নুসরাত হত্যার ঘটনায় দুই দিনব্যাপী ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও তদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার বিকালে পুলিশের গাফিলতি তদন্ত কমিটির প্রধান পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি মো. রুহুল আমীন সাংবাদিকদের বলেছেন, ২৭ তারিখের যৌন হয়রানির ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন, ম্যানেজিং কমিটি ব্যবস্থা নিলে নুসরাতের গায়ে আগুনের ঘটনা এড়ানো যেত।

ডিআইজি মো. রুহুল আমীনের নেতৃত্বে একজন পুলিশ সুপার, দুজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও একজন পরিদর্শক এ তদন্তে উপস্থিত ছিলেন।

ডিআইজি মো. রুহুল আমীন বলেন, তদন্ত কার্যক্রম শেষ হতে আরও তিন-চার দিন সময় লাগতে পারে। নথিপত্র যাচাই-বাছাই চলছে। সাধারণ একটি মামলা তদন্ত করতে এক মাস সময় লাগে। এটি একটি বড় ঘটনা, তাই কিছুটা সময় লাগবে।

তিনি বলেন, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনেক খারাপ হিস্ট্রি রয়েছে। যা গভর্নিং বডির সদস্যরাও জানত। যদি তার ব্যাপারে আগে ব্যবস্থা নেয়া হতো তাহলে আজকে এ ধরনের ঘটনা ঘটত না। এই ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতির বিষয়ও জড়িত রয়েছে।

রুহুল আমীন বলেন, একই দলের দুজন কাউন্সিলর অধ্যক্ষের পক্ষে বিপক্ষে মানববন্ধন করেছে। প্রাথমিকভাবে সত্যতা পাওয়া গেছে। সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে পুরোপুরি তদন্ত শেষে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদের আনুষ্ঠানিক জানানো হবে।

মাদ্রসার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে বুধ ও বৃহস্পতিবার তদন্ত কমিটির সদস্যরা মাদ্রাসার শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ঘটনা সম্পর্কে তাদের মতামত গ্রহণ করেন। বুধবার তারা রাফির বাড়িতে গিয়ে রাফির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেখান থেকে সোনাগাজী আলহেলাল একাডেমিসংলগ্ন সামাজিক কবরস্থানে গিয়ে রাফির কবর জেয়ারত করেন।

বৃহস্পতিবারও কর্তব্যরত পুলিশ সদস্য, রাফির পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও কর্মচারীদের মতামত গ্রহণ করেন এ তদন্ত কমিটির সদস্যরা।

সূত্র জানায়, চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তের দায়িত্ব নেয়ার তিন দিন পর পিবিআইয়ের প্রধান বনজ কুমার মজুমদার প্রাথমিক তদন্তের বিষয়গুলো উল্লেখ করে পুলিশ মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) একটি প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে সোনাগাজীর ওসিসহ স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ মূল পরিকল্পনাকারীর জবানবন্দিতে নুসরাত হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা


ফেনীর সোনাগাজীতে নিপীড়নের পর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হাফেজ আবদুল কাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আদালতে ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে তিনি নুসরাত হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। নৃশংসভাবে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার লোমহর্ষক বর্ণনা উঠে এসেছে তার জবানিতে।

বৃহস্পতিবার ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শরাফ উদ্দিন আহমদের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় এ জবানবন্দি দেন কাদের। সোনাগাজী সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার ‘ঘনিষ্ঠ’ হাফেজ কাদের বিকাল ৪টা থেকে রাত ৭টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা জবানবন্দি দেন। এ নিয়ে এই ঘটনায় চারজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

জবানবন্দিতে তিনি হত্যার পরিকল্পনা, হত্যাকাণ্ডে তার ভূমিকা, কীভাবে গায়ে আগুন দেয়া হয় তার বর্ণনা দিয়েছেন।

রাত সাড়ে ৮টার দিকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) চট্টগ্রাম বিভাগীয় এসপি মো. ইকবাল গণমাধ্যমকে হাফেজ আবদুল কাদেরের স্বীকারোক্তির তথ্য নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, হাফেজ আবদুল কাদের আদালতের কাছে স্বীকার করেছেন তিনি ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। ঘটনার দিন তিনি হত্যাকারীদের নিরাপত্তায় মাদ্রাসার গেট পাহারায় ছিলেন এবং পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে অন্যতম। নিজের সক্রিয় অংশগ্রহণের কথাও জানিয়েছেন তিনি। তার রুমেই হয়েছে পরিকল্পনা।

আবদুল কাদের সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষক। তাকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বুধবার রাতে রাজধানী থেকে গ্রেফতার করে।

আবদুল কাদের তার জবানবন্দিতে বলেছেন, কাদের মাদ্রাসার বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার পক্ষে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন, কারাগারে সাক্ষাৎ এবং হত্যাকাণ্ডের দুদিন আগে অর্থাৎ ৪ এপ্রিল সকালে ও রাতে পৃথক সভায় উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বলেন, ১২ জনের উপস্থিতিতে রাফি হত্যার রূপরেখা নির্ধারণে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তার পরামর্শে হত্যাকাণ্ডে কে কোথায় থাকবে, তা নির্ধারিত হয়। তার দায়িত্ব ছিল মাদ্রাসার পরিবেশ শান্ত রাখা এবং গেটের পশ্চিম পাশে অবস্থান করে পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক শাহ আলম বলেন, হাফেজ আবদুল কাদের এ মামলার এজাহারের ৭ নম্বর আসামি। মামলার আসামি নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম, মো. আবদুর রহিম ওরফে শরিফ এবং হাফেজ আবদুল কাদেরসহ চারজন স্বীকারোক্তিতে একই ধরনের কথা বলেছেন। তাদের স্বীকারোক্তি থেকেও অনেকের নাম উঠে এসেছে।

স্থানীয়রা জানান, নুসরাত হত্যা মামলার প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার অনুগত হিসেবে মাদ্রাসার হোস্টেলে থাকতেন আবদুল কাদের। তার বাবা আওয়ামী লীগ কর্মী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। আবদুল কাদের সরাসরি শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে উপজেলা জামায়াতের আমির মো. মোস্তফা জানিয়েছেন, ইতিপূর্বে অপকর্মের দায়ে তাকে শিবির থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

এ মামলায় এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে যারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, তারা সবাই জানিয়েছেন- এ হত্যাকাণ্ড সংগঠনের মূল পরিকল্পনাকারী আবদুল কাদের। তিনি সিরাজউদ্দৌলার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন, কারাগারে সিরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা এবং হত্যাকাণ্ডের দুদিন আগে অর্থাৎ ৪ এপ্রিল সকালে ও রাতে পৃথক পৃথক সভায় উপস্থিত ছিলেন। ১২ জনের উপস্থিতিতে নুসরাত হত্যার রূপরেখা প্রণয়নে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তার পরামর্শে হত্যাকাণ্ডে কে কোথায় থাকবে, তা নির্ধারিত হয়।

আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত ১৮ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ও পিবিআই। এদের মধ্যে অধ্যক্ষ এসএম সিরাজউদ্দৌলা, কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মুকছুদ আলম, শিক্ষক আবসার উদ্দিন, সহপাঠী আরিফুল ইসলাম, নূর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ জনি, মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, শাহিদুল ইসলাম, অধ্যক্ষের ভাগ্নি উম্মে সুলতানা পপি, জাবেদ হোসেন, জোবায়ের হোসেন, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, কামরুন নাহার মনি, জান্নাতুল আফরোজ মনি, শরিফুল ইসলাম ওরফে শরিফ ও হাফেজ আবদুল কাদের।

এর আগে রোববার দিনে নুর উদ্দিন, রাতে শাহাদাত হোসেন শামীম এবং বুধবার বিকালে আবদুর রহিম শরিফসহ তিন আসামি সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালতে নুসরাত হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা তিনজনই ওই মাদ্রাসার ছাত্র। জবানবন্দিতে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার নির্দেশে তারা নুসরাতের গায়ে আগুন দিয়েছে বলে স্বীকার করেছেন। তাদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করেছে পিবিআই।

এর আগে টানা পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান অগ্নিদগ্ধ নুসরাত জাহান রাফি। পর দিন সকালে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের বুঝিয়ে দিলে সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে নুসরাতকে দাফন করা হয়।

এর আগে ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা। এ ঘটনায় ছাত্রীর মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। ওই দিনই অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে আটক করে পুলিশ। সে ঘটনার পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ নুসরাত হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় আমার কক্ষে: কাদেরের স্বীকারোক্তি


ফেনীর সোনাগাজীতে নিপীড়নের পর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হাফেজ আবদুল কাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আদালতে ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে তিনি জানিয়েছেন যে, নুসরাত হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় তার অফিসকক্ষেই।

বৃহস্পতিবার ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শরাফ উদ্দিন আহমদের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় এ জবানবন্দি দেন কাদের। এ নিয়ে এই ঘটনায় চারজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

আবদুল কাদের সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষক। তাকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বুধবার রাতে রাজধানী থেকে গ্রেফতার করে।

আবদুল কাদেরকে বৃহস্পতিবার বেলা ১টা ৩০ মিনিটে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শরাফ উদ্দিন আহমদের আদালতে তাকে হাজির করা হলে তিনি জবানবন্দি দিতে রাজি হন। আবদুল কাদের তার জবানবন্দিতে বলেছেন, কাদের মাদ্রাসার বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার পক্ষে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন, কারাগারে সাক্ষাৎ করা এবং হত্যাকাণ্ডের দুদিন আগে অর্থাৎ ৪ এপ্রিল সকালে ও রাতে পৃথক সভায় উপস্থিত ছিলেন। ১২ জনের উপস্থিতিতে রাফি হত্যার রূপরেখা নির্ধারণে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তার পরামর্শে হত্যাকাণ্ডে কে কোথায় থাকবে, তা নির্ধারিত হয়। তার দায়িত্ব ছিল মাদ্রাসার পরিবেশ শান্ত রাখা এবং গেটের পশ্চিম পাশে অবস্থান করে পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক শাহ আলম বলেন, হাফেজ আবদুল কাদের এ মামলার এজাহারের ৭ নম্বর আসামি। মামলার আসামি নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম, মো. আবদুর রহিম ওরফে শরিফ এবং হাফেজ আবদুল কাদেরসহ চারজন স্বীকারোক্তিতে একই ধরনের কথা বলেছেন। তাদের স্বীকারোক্তি থেকেও অনেকের নাম উঠে আসে।

নুসরাত হত্যা মামলার প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার অনুগত হিসেবে মাদ্রাসার হোস্টেলে থাকতেন আবদুল কাদের। তার বাবা আওয়ামী লীগ কর্মী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। আবদুল কাদের সরাসরি শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে উপজেলা জামায়াতের আমির মো. মোস্তফা জানিয়েছেন, ইতিপূর্বে অপকর্মের দায়ে তাকে শিবির থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

এ মামলায় এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে যারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, তারা সবাই জানিয়েছেন, এ হত্যাকাণ্ড সংগঠনের মূল পকিল্পনাকারী আবদুল কাদের। তিনি সিরাজউদ্দৌলার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন, কারাগারে সিরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা এবং হত্যাকাণ্ডের দুদিন আগে অর্থাৎ ৪ এপ্রিল সকালে ও রাতে পৃথক পৃথক সভায় উপস্থিত ছিলেন। ১২ জনের উপস্থিতিতে নুসরাত হত্যার রূপরেখা প্রণয়নে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তার পরামর্শে হত্যাকাণ্ডে কে কোথায় থাকবে, তা নির্ধারিত হয়।

আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত ১৮ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ও পিবিআই। এদের মধ্যে অধ্যক্ষ এসএম সিরাজউদ্দৌলা, কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মুকছুদ আলম, শিক্ষক আবসার উদ্দিন, সহপাঠী আরিফুল ইসলাম, নূর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ জনি, মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, শাহিদুল ইসলাম, অধ্যক্ষের ভাগ্নি উম্মে সুলতানা পপি, জাবেদ হোসেন, জোবায়ের হোসেন, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, কামরুন নাহার মনি, জান্নাতুল আফরোজ মনি, শরিফুল ইসলাম ওরফে শরিফ ও হাফেজ আবদুল কাদের।

এর আগে রোববার দিনে নুর উদ্দিন, রাতে শাহাদাত হোসেন শামীম এবং বুধবার বিকালে আবদুর রহিম শরীফসহ তিন আসামি সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালতে নুসরাত হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা তিনজনই ওই মাদ্রাসার ছাত্র। জবানবন্দিতে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার নির্দেশে তারা নুসরাতের গায়ে আগুন দিয়েছে বলে স্বীকার করেছেন। তাদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করেছে পিবিআই।

এর আগে টানা পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান অগ্নিদগ্ধ নুসরাত জাহান রাফি। পর দিন সকালে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের বুঝিয়ে দিলে সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে নুসরাতকে দাফন করা হয়।

এর আগে ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা। এ ঘটনায় ছাত্রীর মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। ওই দিনই অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে আটক করে পুলিশ। সে ঘটনার পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যা: নজরদারিতে উপজেলা আ’লীগ সভাপতি


ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে নিপীড়নের পর পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার একাধিক আসামির জবানবন্দিতে একটি নাম উঠে এসেছে। তিনি হলেন সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন।তাকে নজরদারিতে রেখেছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছে মামলার তদন্তকারী সংস্থা- পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন)।

পিবিআই জানায়, নুসরাত হত্যার ঘটনায় রুহুল আমিনের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে- সেগুলো খতিয়ে দেখা শুরু করেছে পিবিআই।

তদন্ত কমিটির প্রধান ও পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি এসএম রুহুল আমিন বৃহস্পতিবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত শিক্ষক, গভর্নিং বডি, রাফির পরিবারের সদস্যসহ ১৫ জনের বক্তব্য রেকর্ড করেছি, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছি। এগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তদন্তের আনুষঙ্গিক কার্যক্রম শেষ করতে আমাদের আরও ৪-৫ দিন লেগে যেতে পারে। চেষ্টা করব দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে। বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার আরও অনেক অপকর্মের তথ্য পেয়েছি। সময়মতো ব্যবস্থা নিলে এ ধরনের ঘটনা ঘটত না।

স্থানীয়দের সন্দেহ এ ঘটনায় উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিন সম্পৃক্ত।মূল আসামি অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাকে তিনি বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন।

এর আগে নুসরাত হত্যাচেষ্টা মামলার প্রধান আসামি নিপীড়ক অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার পক্ষে মামলা পরিচালনা করায় ফেনীর কাজীরবাগ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট কাজী বুলবুল সোহাগকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

সিরাজউদ্দৌলাসহ অন্য আসামিদের আইন সহায়তা দেয়ায় তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়।

মামলার তদন্তের বিষয়ে পিবিআই’র প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, নুসরাত হত্যার ঘটনার তদন্তে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পাশাপাশি সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার তদন্তও চলছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেব।

প্রসঙ্গত গত ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। কয়েকজন তাকে কৌশলে ছাদে ডেকে নিয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা শ্লীলতাহানির মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। অস্বীকৃতি জানালে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা, পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান অগ্নিদগ্ধ রাফি। এর আগে ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই ঘটনার পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ আযানের সাথে সাথে শুরু হতো ওসি মোয়াজ্জেমের নিজস্ব টোকেন বানিয়ে চাঁদা আদায়


ফেনীর সোনাগাজী মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা চেষ্টার ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে যাওয়া এবং রাফিকে বেআইনিভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করাসহ নানা অনিয়মের কারণে সোনাগাজী থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে। এরপর থেকেই তার অনিয়ম দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন এলাকার ভুক্তভোগিরা।

শহরে ব্যাটারী চালিত অটো রিক্সা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ওসি নিজস্ব টোকেন বানিয়ে এসবে লাইসেন্স দিয়ে বাজারে ছেড়েছেন। এসব অপকর্ম চালিয়ে যাওয়ার জন্য একটি সমিতিও চালু করেছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে সোনাগাজী শহরে প্রায় ৫শ ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সা চলে। প্রতিদিন প্রতিটি রিক্সা থেকে ‘সোনাগাজী রিক্সা শ্রমিক ও মালিক সমিতি’র ব্যানারে দশ টাকা করে নেয়া হতো। যার সিংহভাগ ঢুকতো ওসি মোয়াজ্জেমের পকেটে। এর বাইরে ভিন্ন কিছু ঘটলে থানায় এনে রিক্সা আটকে রাখা হয়। পৌর মেয়রের সাথে এবিষয়ে মতবিরোধও হয়েছে। এতদিন ক্ষতিগ্রস্তরা নীরবে সহ্য করলেও এখন ফুঁসে উঠেছে এসব শ্রমিকরা।

শ্রমিকদের কাছ থেকে টাকা কখন তুলতে আসেন, জানতে চাইলে রিক্সা চালক মাঈন উদ্দিন ও জয়নাল আবদীন জানান, যখন মসজিদে মুয়াজ্জিন মাগরিবের নামাজের আজান দেয়; তখন ওসি মোয়াজ্জেমের জন্য টাকা তোলা শুরু হয়। তাঁরা আরও জানান, ‘ওসি মোয়াজ্জেম শুধু রিক্সা চালক নয়, ফকির-মিসকিনদেরও রেহাই দেননি। সবার থেকে টাকা খেয়েছেন’

দক্ষিণ চরচান্দিয়া গ্রামের রিক্সা চালক মোশারফ হোসেন ও বিজয় নগর গ্রামের মাইন উদ্দিন বলেন, নুসরাত হত্যায় বিতর্কিত ওসি মোয়াজ্জেম প্রত্যাহার হলেও তার চাঁদাবাজির চক্র থেকে পরিত্রাণ পায়নি অটোরিকশা শ্রমিকরা। এখনো তারা প্রতিদিন ১০ টাকা করে চাঁদা দিয়ে যাচ্ছে। ওসি মোয়াজ্জেম এসব চাঁদাবাজির জন্য তার নিজস্ব একটি টোকেনও রয়েছে। সেটি যার কাছে থাকবে তাকে প্রতিদিন ১০ টাকা করে চাঁদা দিতে হবে।

সোনাগাজী পৌরসভার মেয়র এ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, দশ টাকা করে চাঁদা নেয়ায় তার সাথে আমার মতবিরোধ হয়েছে। আমি সব ব্যাটারি চালিত রিক্সা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। পরবর্তীতে সে আবার চালু করেছে।

‘সোনাগাজী রিক্সা শ্রমিক ও মালিক সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক ও লাইনম্যান মো. মাসুদ বলেন, অটোরিক্সা থেকে যে টাকা তোলা হয় তা থানার ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে ওসির কাছে পৌঁছে যায়। কারণ আমরা কোনো নেতা নই। আমি শুধু টাকা তুলে দিই।

এবিষয়ে ‘সোনাগাজী রিক্সা শ্রমিক ও মালিক সমিতি’র ক্যাশিয়ার মো. ইসমাইল হোসেন জানান, এঘটনাটি পেপার-পত্রিকায় লেখালেখি হলে আমাদের রিক্সা চালানো বন্ধ করে দিবে। তখন আমরা না খেয়ে থাকতে হবে। আমরা চাঁদা দিয়ে হলেও চাই রিক্সা চালু থাকুক। তিনি আরও জানান, যিনি লাইনম্যানের দায়িত্ব পালন করেন তাকে মাসে ৯ হাজার টাকা দিতে হয়। যে রেজিস্টার লেখেন তাকে ৬ হাজার টাকা দিতে হয়। সভাপতি- সাধারণ সম্পাদক পায় মাসে দুই হাজার টাকা, ক্যাশিয়ার পায় এক হাজার পাঁচ’শ টাকা। এই কমিটির সভাপতি লিটন ও সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুদ।

এব্যাপারে সোনাগাজী থানার ওসি তদন্ত মো. কামাল হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, থানায় কোনো ক্যাশিয়ার নেই। চাঁদা তোলার বিষয়টি আমি জানিনা।

উৎসঃ ‌যমুনাটিভি

আরও পড়ুনঃ নুসরাত হত্যা: অর্থ লেনদেন অনুসন্ধানে সিআইডি


ফেনীর সোনাগাজীতে নিপীড়নের পর আগুনে পুড়িয়ে মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ঘটনা চাপা দিতে অর্থ লেনদেন হয়েছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখতে অনুসন্ধানে নেমেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট। এই হত্যাকাণ্ড ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে কিংবা ঘটনা ধামাচাপা দিতে কোনো অবৈধ লেনদেন হয়েছে কিনা কিংবা কে বা কারা এসব লেনদেনের সঙ্গে জড়িত সেসব খুঁজে করতে কাজ শুরু করছে সিআইডি।

শুক্রবার সকালে সিআইডির সিনিয়র সহকারী বিশেষ পুলিশ সুপার শারমিন জাহান এসব তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি জানান, সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত হত্যাকাণ্ডে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। সিআইডি এই অর্থের উৎস কিংবা অর্থের যোগানদাতা কে তা খোঁজ করবে।

আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত ১৮ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ও পিবিআই। এদের মধ্যে অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ্দৌলা, কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মুকছুদ আলম, শিক্ষক আবসার উদ্দিন, সহপাঠী আরিফুল ইসলাম, নূর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ জনি, মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, শাহিদুল ইসলাম, অধ্যক্ষের ভাগ্নি উম্মে সুলতানা পপি, জাবেদ হোসেন, জোবায়ের হোসেন, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন, মো. শামীম, কামরুন নাহার মনি, জান্নাতুল আফরোজ মনি, শরিফুল ইসলাম ওরফে শরিফ ও হাফেজ আবদুল কাদের।

এর আগে রোববার দিনে নুর উদ্দিন, রাতে শাহাদাত হোসেন শামীম এবং বুধবার বিকালে আবদুর রহিম শরীফসহ তিন আসামি সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালতে নুসরাত হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা তিনজনই ওই মাদ্রাসার ছাত্র। জবানবন্দিতে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার নির্দেশে তারা নুসরাতের গায়ে আগুন দিয়েছে বলে স্বীকার করেছেন। তাদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করেছে পিবিআই।

এর আগে টানা পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান অগ্নিদগ্ধ নুসরাত জাহান রাফি। পরদিন সকালে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের বুঝিয়ে দিলে সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে নুসরাতকে দাফন করা হয়।

এর আগে ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা। এ ঘটনায় ছাত্রীর মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। ওই দিনই অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাকে আটক করে পুলিশ। সে ঘটনার পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ রাফি হত্যার তদন্ত: মানবাধিকার কমিশনের সুপারিশ আমলে নিন


আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।

এ তদন্ত রিপোর্টে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসা কমিটি, এমনটি খোদ জেলা প্রশাসনের অবহেলা-অপরাধের যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে বলতেই হয়- ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দেব কোথা’।

যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধের শিকার নিরীহ একজন ছাত্রী যদি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও যথাযথ সুরক্ষা না পায়, তাহলে শিক্ষা প্রশাসন থেকে শুরু করে পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসনসহ আমাদের দায়িত্বশীলদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ রয়েছে বৈকি।

কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ যদি যথাসময়ে ব্যবস্থা নিত, তাহলে রাফির মতো সাহসী একজন শিক্ষার্থীকে এভাবে হারাতে হতো না। এমনকি মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্টে জেলা প্রশাসনের অবহেলার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের অবহেলা ও অপরাধের বিষয়টিও ফুটে উঠেছে।

কমিশনের রিপোর্ট যে সত্য ও বাস্তবসম্মত তার প্রমাণ পাওয়া যায় যুগান্তরেরই একটি রিপোর্টে, যেখানে বলা হয়েছে, নিপীড়ক অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাকে গ্রেফতারের পর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে (এডিএম) ঘটনাটি জানানো হলে তিনি বলেছিলেন, ঘটনাটি এভাবেই থাকুক এবং অধ্যক্ষকে চালান করা হোক।

একইভাবে মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (এডিসি রাজস্ব) জানানো হলে তিনিও কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকদেরই একজনকে পরীক্ষার কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব দেন। দায়িত্বশীল এসব ব্যক্তি যে নিজেদের দায়িত্বে অবহেলা করেছেন এবং তারা আন্তরিক হলে এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি এড়ানো যেত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

রাফি চলে গেছেন। এখন আর কোনো সান্ত্বনাই তার ভুক্তভোগী পরিবারকে শান্ত করতে পারবে না এক ন্যায়বিচার ছাড়া। আমরা মনে করি, রাফি হত্যাকাণ্ডে যারা সরাসরি জড়িত এবং যারা দায়িত্বে অবহেলা করেছে, তাদের সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিকল্প নেই।

কেবল এমনটি করা গেলেই ভবিষ্যতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নারীর জন্য নিরাপদ করা এবং রাফি হত্যার মতো ভয়াবহ ঘটনার যবনিকা টানা যাবে, অন্যথায় নয়। এক্ষেত্রে মানবাধিকার কমিশনের সাতটি সুপারিশ যেমন- দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা, মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত জমা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে করা মামলায় দ্রুত সাক্ষ্য গ্রহণ, পুলিশ ও প্রশাসনের যারা দায়িত্বে অবহেলা ও অপরাধ করেছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, মাদ্রাসায় যারা অধ্যক্ষকে সহযোগিতা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, মাদ্রাসার গভর্নিং বডি পুনর্গঠন এবং রাফির পরিবারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা- ন্যায়বিচারের স্বার্থে এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে অবিলম্বে।

আশার কথা, এরই মধ্যে এ মামলার অনেক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং অবহেলা-অপরাধের দায়ে প্রত্যাহার করা ওসির বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। সর্বোপরি, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অপরাধীরা ছাড় পাবে না। তারপরও আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।

দেখা গেছে, পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলে তাদের প্রত্যাহারের মাধ্যমেই দায়িত্ব শেষ করা হয় এবং পরে যথারীতি অন্য স্থানে পদায়নের মাধ্যমে আবারও তাদের অপরাধ কর্মকাণ্ড শুরু হয়।

অন্তত পরীক্ষার হলের মতো নিরাপদ স্থানে আগুনে পুড়িয়ে মারার মতো জঘন্য ঘটনাটির ক্ষেত্রে এমনটি হবে না বলে আমাদের বিশ্বাস। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ইতিবাচক মানসিকতার মধ্য দিয়ে যৌন নিপীড়নমুক্ত নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করার ধারা শুরু হোক ফেনীর ঘটনাটি থেকে।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ নুসরাত হত্যাকাণ্ডে ওসির ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল: ডিআইজি রুহুল আমীন


নুসরাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সোনাগাজী থানার সাবেক ওসির ত্রুটি-বিচ্যুতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওসিসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার গাফিলতির বিষয়ে তদন্ত চলছে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নুসরাত হত্যার ঘটনায় দুই দিনব্যাপী ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও তদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার বিকালে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

ডিআইজি মো. রুহুল আমীনের নেতৃত্বে একজন পুলিশ সুপার, দুজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও একজন পরিদর্শক এ সময় তদন্তে উপস্থিত ছিলেন।

মাদ্রসার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে বুধ ও বৃহস্পতিবার তদন্ত কমিটির সদস্যরা মাদ্রাসার শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ঘটনা সম্পর্কে তাদের মতামত গ্রহণ করেন। বুধবার তারা রাফির বাড়িতে গিয়ে রাফির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেখান থেকে সোনাগাজী আলহেলাল একাডেমিসংলগ্ন সামাজিক কবরস্থানে গিয়ে রাফির কবর জেয়ারত করেন।

বৃহস্পতিবারও কর্তব্যরত পুলিশ সদস্য, রাফির পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও কর্মচারীদের মতামত গ্রহণ করেন এ তদন্ত কমিটির সদস্যরা।

সূত্র জানায়, চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তের দায়িত্ব নেয়ার তিন দিন পর পিবিআইয়ের প্রধান বনজ কুমার মজুমদার প্রাথমিক তদন্তের বিষয়গুলো উল্লেখ করে পুলিশ মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) একটি প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে সোনাগাজীর ওসিসহ স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশের আইজি ড. জাবেদ পাটোয়ারীর নির্দেশে এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। বর্তমান কমিটিও ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনসহ প্রশাসনের কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখেন। তদন্ত কমিটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারীর কাছে তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করবেন বলে জানিয়েছেন।

প্রসঙ্গত গত ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। মাদ্রাসার এক ছাত্রী সহপাঠী নিশাতকে ছাদের ওপর কেউ মারধর করছে, এমন সংবাদ দিলে তিনি ওই ভবনের তিনতলায় যান। সেখানে মুখোশধারী বোরকা পরিহিত ৪-৫ জন তাকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়। তিনি অস্বীকৃতি জানালে গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। গত ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মারা যান নুসরাত।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ টাকার দাপটে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক চক্রকে ম্যানেজ করে চলতেন সিরাজ (ভিডিও সহ)


সোনাগাজী সিনিয়র ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার মূল হোতা অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দৌলার যৌন হয়রানি ও নানা অপকর্মের কথা জানতেন মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা। তবে টাকার দাপটে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক চক্রকে ম্যানেজ করে চলতেন সিরাজ।

এই চক্রের ভয়ে তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পেতেন না শিক্ষক ও অভিভাবকরা। নানা সময়ে অভিযোগ করলেও ম্যানেজ হয়ে যেত প্রশাসন, উল্টো বিপদে পড়তেন অভিযোগকারীারা। গত কয়েক দিনে মাদরাসা শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্য ও স্থানীয় জনগণের সাথে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে। মাদরাসার তিন তলা মার্কেট, পুকুর, নানা অনুদান-তহবিল এবং ওয়াজ মাহফিল থেকে বছরে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন অধ্যক্ষ। অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের সুবিধার লোভ দেখিয়ে ভেড়াতেন নিজের দলে।

ভিডিওঃ ‘ব্রেকিং নিউজঃ পিবিআই’র তদন্তে বেরিয়ে এলো নুসরাত ঘটনার চাঞ্চল্যকর সব তথ্য! (ভিডিও সহ)’


[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

২০০১ সালে শতবর্ষী এই মাদ্রাসায় উপাধ্যক্ষ পদে যোগ দেবার পর থেকে নানা সময়ে জেলা প্রশাসনের কাছে যৌন হয়রানি, অর্থ আত্মসাৎ ও হত্যার হুমকির মতো অভিযোগ জমা হয় তার বিরুদ্ধে।

তবে, মাদরাসার তহবিলের টাকা নয়ছয় করে অর্থের জোরে ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদ ও স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ফেলতেন সিরাজ উদ দৌলা। সবশেষ গত ২৭ই মার্চ নুসরাতকে যৌন হয়রানি এবং ৬ই এপ্রিল আগুনে পোড়ানোর পরও চলেছে সেই টাকার খেলা।

ভিডিওঃ  ‘থানার ওসির কাছে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

যে কারণে শুরুর দিকে যৌন হয়রানির ঘটনাটিতে ষড়যন্ত্র ও আগুনে পোড়ানোকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছিল স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। এমনকি সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনও শুরুতে ঘটনাকে আত্মহত্যা বলেই উল্লেখ করেন। প্রায় দুই দশক ধরে যৌন হয়রানি, মাদ্রাসার টাকা আত্মসাৎ ও হত্যার হুমকির মতো অপরাধে অর্থের জোরে পার পেয়ে যায় সিরাজ উদ দৌলা। গত বছরের ৩রা অক্টোবর নুসরাতের আরেক বান্ধবীকে যৌন হয়রানি করেন সিরাজ। ওই ঘটনায়ও মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আক্তার উন নেছা শিউলির কাছে অভিযোগ দেয়া হয়। তবে নারী শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির মতো ওই ঘটনায় শুধু একটি নোটিশ পাঠিয়ে দায় সারে জেলা প্রশাসন।

ভিডিওঃ  শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করবোঃ নুসরাত (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

অভিযুক্ত মাদরাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। ওই শিক্ষার্থীর বাবা পূর্বধলী মদিনাতুল উলুম দাখিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, ঘটনার পর মেয়ে আমাদের কিছু জানায়নি। পরে বিষয়টি জানতে পেরে পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যকে বিষয়টি জানাই। ভয়ে আর জেলা প্রশাসনে কোন অভিযোগ দেইনি। তবে এর মধ্যে তার নামে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর একটি অভিযোগ জমা দেয়া হয়।

অভিযোগের পর অধ্যক্ষ সিরাজকে শোকজ করা হলে তিনি ক্ষেপে যান। অভিযোগের কারণে তিনজন শিক্ষককে উল্টো হেনস্তা করেন সিরাজ। তাদের ডেকে নিয়ে হুমকি দেয়া হয় এবং অপমান করা হয়। পরে আর জেলা প্রশাসন কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় আমরাও বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করিনি। শুনেছি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করায় প্রশাসন আর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এদিকে, ২০১৬ সালে মাদরাসার তহবিলের অডিটে গরমিল ও টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে পরের বছর অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি কে এনামুল করিমকে লিখিতভাবে জানান স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সদস্য শেখ আবদুল হালিম মামুন।

ভিডিওঃ  নুসরাতের আগে সিরাজউদ্দৌলার শ্লীলতাহানির শিকার হন আরও এক ছাত্রী বল্লেনঃ প্রভাসক আবুল কাশেম (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

ওই বছর মাদরাসার বেশ কিছু তহবিল থেকে অধ্যক্ষ প্রায় ৫৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ করেন শেখ মামুন। সেখানে দেখা যায়, ক্যাশ থেকে ৬ হাজার ২৬৫ টাকা ব্যাংকে জমা না দেয়া, মাদ্রাসার মার্কেটের দোকান ভাড়া ৪১ হাজার ১০০ টাকা, মাহফিলের অপ্রদর্শিত ১ লাখ ১১ হাজার ৬৯৩ টাকা, ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭২৫ টাকা ব্যাংকে জমা না দেয়া, ক্যাশের ৯০ হাজার ২৯২ টাকা ব্যাংকে জমা না দেয়া, পরের মাসে ৬ লাখ ২৭ হাজার ৮০৩ টাকা জমা না দেয়া, তহবিলের ৮৩ হাজার ২০০ টাকা ব্যাংকে জমা না রাখা, অভ্যন্তরীণ আয় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৯৮ টাকা আত্মসাৎ করা, ছাত্র ফির ৬৮ হাজার ৭৫০ টাকা ব্যাংকে জমা না দেয়া, বছরের শেষের দিকে ক্যাশ থেকে আরো প্রায় ৫০ হাজার টাকাসহ মোট ২২ লাখ ৫২ হাজার ১০০ টাকা আত্মসাতের করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন শেখ মামুন। এসব প্রমাণ ছাড়ানো আরো কয়েকটি খাত থেকে ২০১৬ সালে সর্বমোট প্রায় ৫৬ লাখ টাকা অধ্যক্ষ সিরাজ নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেন বলেও অভিযোগ ছিল শেখ মামুনের। তবে, এমন অভিযোগের পর তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি কে এনামুল করিম অধ্যক্ষকে শুধু নোটিশ দিয়েই দায় সারেন।

অভিযোগের পর উল্টো পরের বছর পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয় শেখ আবদুল হালিম মামুনকে। তিনি মানবজমিনকে বলেন, মাদরাসার তহবিলের টাকা আত্মসাৎ করার সুস্পষ্ট প্রমাণসহ অভিযোগ করলেও প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নেয়নি। পরের বছর বরং আমাকে পরিচালনা পর্ষদ থেকে ষড়যন্ত্র করে বাদ দিয়ে দেয়া হয়। শেখ মামুন বলেন, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল এসব টাকার ভাগ পেতেন। যারা অধ্যক্ষের হয়ে প্রশাসনের কাছে তদবির করতো। এদিকে সোনাগাজী পৌরসভার মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন মানবজমিনকে বলেন, আর্থিক সুবিধা দিয়ে অধ্যক্ষ স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। অনেক অস্বচ্ছল ও গরিব শিক্ষার্থীদের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করতেন। পরে এদের নিজের দলে ভিড়িয়ে গড়ে তোলেন ক্যাডার বাহিনী।

এছাড়া, মাদরাসায় দুপুর ও রাতে লঙ্গরখানার মতো খানাপিনার আয়োজন করতেন অধ্যক্ষ। অনেকেই তার কাছ থেকে এসব সুবিধা নিতেন। এদিকে, ফেনী জেলা প্রশাসনের একজন সাবেক কর্মকর্তা মানবজমিনকে জানান, ক্ষমতাসীন স্থানীয় রাজনীতিবিদদের প্রভাবে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি জেলা প্রশাসন। অভিযোগের বিষয়ে কেন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি পি কে এনামুল করিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার সময়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আসেনি। তবে এডিএম আক্তারুন্নেছা শিউলির সময় একটি অভিযোগের কথা স্মরণ করেন। ওই শিক্ষার্থী ও তার পরিবারকে ডাকা হলে তারা বিষয়টি অস্বীকার করে বলে দাবি করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক।

এছাড়া, অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয় বলেও জানান এনামুল করিম। কিন্তু সেই তদন্তে অর্থ আত্মসাতের কোন প্রমাণ মিলেনি বলেও দাবি করেন জেলা প্রশাসনের এই কর্মকর্তা। তবে, পি কে এনামুল করিমের এমন বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করে অভিযোগকারী শেখ আবদুল হালিম মামুন বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এমন কোন লিখিত কাগজ বা প্রমাণ আমাদের দেয়া হয়নি। মূলত তদন্ত না করেই অধ্যক্ষ সিরাজকে বাঁচিয়ে দিতে এমন ভূমিকা নেয়া হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সাথে ২০১৮ সালে মাদরাসা থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সই জাল করে একটি চেক ইস্যু করা হয় বলেও মানবজমিনকে জানান শেখ মামুন। এই ঘটনায় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি বলেও জানান তিনি। মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সদস্য থাকাকালীন ২০১৭ সালে পুরো মাদরাসা এলাকা ক্লোজসার্কিট ক্যামেরার আওতায় আনার দাবি তুলতে তা পর্ষদে পাস হয় বলে জানান শেখ মামুন। তবে, নিজের অপকর্ম ঢাকতে পরিচালনা পর্ষদকে ম্যানেজ করে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসাতে দেননি অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাহ। ওই বছর পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা বসালে নুসরাতের মতো আর কেউ যৌন হয়রানির শিকার বা আগুনে পুড়ে মারা যেতো না বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

রহস্যের উদঘাটনে সন্তুষ্ট পরিবার, অপেক্ষা বিচারের: নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার রহস্য উন্মোচন, মূল পরিকল্পনাকারী শনাক্ত ও আসামিদের গ্রেপ্তার করায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে নুসরাতের পরিবারের সদস্যরা। পুরো কিলিং মিশন নিয়ে ধোঁয়াশা পরিষ্কার করায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) ধন্যবাদ জানান নুসরাতের বাবা এ কে এম মূসা। গতকাল শনিবার দুপুরে নিহত নুসরাতের বাসায় গেলে তার বাবা মানবজমিনকে বলেন, সকলের প্রচেষ্টায় ঘটনার রহস্য উন্মোচন হয়েছে। আর বাকি আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করার তাগিদ দেন নুসরাতের বাবা।

ভিডিওঃ  ‘অধিকাংশ খুনিকে গ্রেফতার করায় পিবিআইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞ নুসরাতের বাবা। খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেখার অপেক্ষায়… (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

একই সঙ্গে দ্রুত সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেয়ার জন্যও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। পিবিআই কম সময়ের মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার ও হত্যার রহস্য উন্মোচন করায় তাদের ধন্যবাদ দেন নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। তিনি বলেন, আমি শুরু থেকেই বলেছি নূর উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করলে সব ঘটনা জানা যাবে। তবে শুরুর দিকে সোনাগাজী থানার ওসি ও প্রভাবশালী মহল আগুনে পোড়ানোর ঘটনাকে ভিন্ন অবস্থানে নেয়ায় তাদেরও শাস্তির দাবি করেন নুসরাতের ভাই। এদিকে, মামলার আরো দুই আসামি শাহাদাত হোসেন শামীম ও জাবেদ হোসেনকে গতকাল ময়মনসিংহ ও ফেনী থেকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। গতকাল বিকালে এজাহারভূক্ত আসামি জাবেদ হোসেনকে ফেনী আদালতে হাজির করে দশ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। পরে তার বিরুদ্ধে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন বিচারক জাকির হোসাইন।

উৎসঃ ‌মানবজমিন

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here