‘মামলা করে লাভ হবে না, আমরা পুনর্ভোটের দাবিতেই আছি’

0
339

কর্নেল (অব.) অলি আহমদ (বীর বিক্রম)। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে যারা বিএনপির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাদের একজন অলি আহমদ। বর্তমানে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি সাবেক এ মন্ত্রী। গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকে তিনি ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চট্টগ্রামের এ রাজনীতিক মঙ্গলবার (২৯ জানুয়ারি) রাজধানীর মহাখালীতে তার নিউ ডিওএইচএসের বাসায় দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে একান্তে কথা বলেন বাংলানিউজের স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট মহসিন হোসেনের সঙ্গে।

বাংলানিউজ: ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আপনাদের পরাজয়ের জন্য সরকারকে দায়ী করছেন। এই পরাজয়ের পেছনে আপনাদের কি কোনো দুর্বলতা বা অযোগ্যতা ছিল না?

অলি আহমদ: শুধু আমরা না, দেশবাসীই বলছে ৩০ ডিসেম্বর কোনো নির্বাচন হয়নি। ২৯ ডিসেম্বর রাতে ভোট কেটে বাক্স ভর্তি করা হয়েছে। এর পেছনে পুলিশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। যেখানে নির্বাচনই হয়নি, সেখানে জয়-পরাজয়েরতো কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

বাংলানিউজ: সারাদেশে ৪০ হাজার ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার কথা ছিল। আপনারা দলীয় নেতাকর্মীদের ভোটের আগের দিন সন্ধ্যা থেকে ফলাফল পর্যন্ত কেন্দ্রে থাকতে বলেছিলেন। তারা কেন কেন্দ্রে ছিলেন না?

অলি আহমদ: আমার এলাকার একটি কেন্দ্রে পাহারা দিয়েছিল। সেখানে গুলি করে ১১ জনকে আহত করা হলো। তারপর সবাইকে বলে দিয়েছি পাহারার দরকার নেই। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভোটকেন্দ্র পাহারা দিতে গিয়ে অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়েছে।

বাংলানিউজ: আপনাদের ভাষায় ৩০ ডিসেম্বর সরকার কারচুপি করে বিজয়ী হয়েছে। এর বিরুদ্ধেতো আপনারা কোনো কর্মসূচিও দেননি।

অলি আহমদ: আমাদের ৩০-৪০ হাজার কর্মী কারাগারে। লক্ষাধিক নেতাকর্মী মামলার আসামি। কারও মনে শান্তি ছিল না। সরকার তাদের সবকিছু হারাম করে দিয়েছে। এখনো বহু জায়গায় বিরোধীদলের লোকদের দোকান খুলতে দিচ্ছে না। কোথাও চাঁদা দাবি করছে। কোথাও গায়েবি মামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ওই সময় কর্মসূচি দিয়ে তাদের ভোগান্তি কাম্য ছিল না। সবমিলিয়ে দেশ এখন একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। জানি না, বঙ্গবন্ধুর কন্যা তাদের কতোদূর সামাল দিতে পারবেন। কারণ এবার কোনো রাজনীতিবিদ এমপি হননি, এমপি হয়েছেন থানার ওসি আর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা। অতীতে সব সময় জনগণের ভোটে এমপি হয়েছে। এই প্রথম ইউএনও-ওসিরা এমপি বানিয়েছেন। এতে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বললেই চলে।

বাংলানিউজ: প্রতিটি আসনভিত্তিক প্রার্থীদের মামলা করার কথা ছিল। জানামতে এখনো কেউ মামলা করেনি। আপনি কি মামলা করেছেন?

অলি আহমদ: যেহেতু ভোট ডাকাতির মাধ্যমে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে, সেহেতু আমরা এর ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছি। এটাও বলেছি সর্বকালের নিকৃষ্ট ও জঘন্য এক অপরাধ বর্তমান নির্বাচন কমিশন করেছে। বিচার বিভাগসহ সবকিছু দলীয়করণ করা হয়েছে। এজন্যই এ ধরনের নির্বাচন করা সম্ভব হয়েছে। সুতরাং আমরা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়েছি মামলা করে কোনো লাভ হবে না। কারণ তারা সরকারের পক্ষে রায় দেবে। এতে করে সরকার বৈধতা পাবে। সুতরাং আমাদের পুনর্নির্বাচনের দাবি অব্যাহত আছে।

বাংলানিউজ: এখন কী করবেন ?

অলি আহমদ: আপাতত আমরা এলডিপির পক্ষ থেকে নিজেদের দলকে কিভাবে শক্তিশালী করতে পারি, সে বিষয়গুলির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।

বাংলানিউজ: প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জাতীয় ঐক্যর কথা বলেছেন। এর জবাবে কী বলবেন?

অলি আহমদ: সরকার জাতীয় ঐক্যের কথা বলেছে। কিন্তু জাতীয় ঐক্যটা কিভাবে প্রতিষ্ঠা করবে এ ব্যাপারে কোনো ফর্মুলা দেওয়া হয়নি।

বাংলানিউজ: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একমাস অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে ২০ দলীয় জোটের কোনো বৈঠক হয়নি কেন?

অলি আহমদ: বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা আছে। অনেকে কারাগারে আছেন। অনেকে নেতাকর্মীদের মামলা ও কারাগার থেকে মুক্তির ব্যাপারে ব্যস্ত আছেন বিধায় বৈঠক ডাকা হয়নি।

বাংলানিউজ: শিগগির ২০ দলীয় জোটের কোনো বৈঠক হবে কি-না?

অলি আহমদ: অনেক দলের নেতারা আমাকে এ বিষয়ে ফোন করেছেন। তারা ২০ দলীয় জোটের বৈঠক ডেকে করণীয় ঠিক করতে বলছেন। তাদের অনুরোধ করেছি বিএনপির মহাসচিবের সঙ্গে কথা বলে তারিখ নির্ধারণ করার জন্য। আমি আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি ওমরাহ করার জন্য মক্কা-মদিনা যাবো। ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করবো। সেজন্য বড় দল হিসেবে বিএনপিকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলানিউজ: ২০ দলীয় জোটের কোনো দলকে নিয়ে আপনাদের মধ্যে অস্বস্তি আছে কি-না ?

অলি আহমদ: আমার মধ্যে কোনো ধরনের অস্বস্তি নেই। আমি জাতীয় ঐক্য চাই। যারা দেশের নাগরিক তাদের মধ্যে বিভেদ-অনৈক্য কাম্য নয়। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশ ও জাতির মঙ্গলের জন্য এগিয়ে যাওয়া উচিত। আল্লাহ নিজেও ঐক্যের পক্ষে। যারা বিরোধ সৃষ্টি করে তারা আল্লাহর নির্দেশের বিরুদ্ধে কাজ করে।

বাংলানিউজ: আসছে ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাগারে যাওয়ার একবছর পূরণ হবে। ২০ দলীয় জোটের কোনো কর্মসূচি থাকবে কি-না?

অলি আহমদ: আমি এলডিপির সভাপতি। তিন দিন আগেও জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি অনুষ্ঠানে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করেছি। ইতোপূর্বে তার মুক্তির জন্য আমরা দলীয়ভাবে ১০টি সভা করেছি। এখন বছরের মাথায় বিএনপি কী করবে সেটা তারা সিদ্ধান্ত নেবে। কোথাও সাহায্য-সহযোগিতা প্রয়োজন হলে এগিয়ে যাবো।

বাংলানিউজ: ২০ দলীয় জোট, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বাইরেও অনেক দল একাদশ নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ কোনো কর্মসূচি দেওয়ার চিন্তাভাবনা আছে কি?

অলি আহমদ: এলডিপি এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। ২০ দল যদি আলোচনা করে তাহলে সিদ্ধান্ত হবে। এটা সবার চিন্তার ওপর নির্ভর করে। তবে আমি মনে করি লক্ষ্য যদি এক হয়, তাহলে পথ ভিন্ন হলেও অসুবিধা নেই।

বাংলানিউজ: ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে আন্দোলন এবং নির্বাচন করা বিএনপির ভুল ছিল বলে নেতাকর্মীদের একটি অংশ মনে করছে, জোটের সঙ্গী হিসেবে আপনার বক্তব্য…

অলি আহমদ: ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে বিএনপি ঐক্য করেছে। এলডিপি তাদের সঙ্গে কোনো ঐক্য করেনি। এখন তারা ভুল করেছে কি-না সেটা তারাই বলতে পারবে। এর কোনো ওষুধ আমার কাছে নেই।

বাংলানিউজ: ঐক্যফ্রন্ট এ ভোট প্রত্যাখ্যান করলেও জোটের শরিক গণফোরামের দুই সংসদ সদস্য বলেছেন, তারা সংসদে যোগ দেবেন। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?

অলি আহমদ: কোনো সংসদ সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করলে তার সংসদ সদস্য পদ যায় না। রাজনীতিতে এখন বেইমান ও মোনাফেকের সংখ্যা বেশি। অনেকে এটাকে বড়লোক হওয়ার পন্থা হিসেবে ব্যবহার করছে। কারা শপথ নেবে না নেবে এর জবাব আমি দিতে পারবো না। এর জবাব বিএনপি দিতে পারবে।

বাংলানিউজ: উপজেলা নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত কি সঠিক?

অলি আহমদ: ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায়। দু’বার যায় না। যেখানে দিনের বেলায় ভোট হয় না, সেখানে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেওয়া বোকামির কাজ হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে কথা বলার কোনো জায়গা নেই। সব প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগের পেছনে।

বাংলানিউজ: কোনো করণীয়?

অলি আহমদ: মানুষ যখন অসহায় হয়ে পড়ে, আল্লাহ তখন সাহায্য করে। মজলুমের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন। বর্তমানে দেশের মানুষ অসহায় এবং মজলুম।

উৎসঃ ‌বাংলানিউজ

আরও পড়ুনঃ দুর্নীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ১৩তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ২য়!


বিশ্বে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় ১৩তম অবস্থানে উঠেছে বাংলাদেশ, যার স্কোর ২৬। এর আগের বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭তম, স্কোর ছিল ২৮। তার আগের বছর ছিল ২০১৬ সালে অবস্থান ছিল ১৫তম।

আর দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। এ অঞ্চলে আফগানিস্তানের পরেই অবস্থান বাংলাদেশের। খবর পার্স টুডের।

মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর মাইডাস সেন্টারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ- টিআইবির কার্যালয়ে ‘দুর্নীতির ধারনা সূচক (সিআইপি) ২০১৮’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এসব তথ্য তুলে ধরেন।

সংস্থাটির মতে, এবারের সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ২ পয়েন্ট কমেছে। তালিকার নিম্নক্রম অনুযায়ী ১৮০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ১৩তম, যা ২০১৭ সালের তুলনায় ৪ ধাপ নিম্নে এবং উর্ধক্রম অনুযায়ী ১৪৯তম, যা ২০১৭ সালের তুলনায় ৬ ধাপ অবনতি। ১০০ এর মধ্যে ৪৩ স্কোরকে গড় হিসেবে বিবেচনায় বাংলাদেশের ২০১৮ সালের স্কোর ২৬ হওয়ায় দুর্নীতির ব্যাপকতা এখনো উদ্বেগজনক বলে প্রতীয়মান হয়। তদুপরি দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নিম্নক্রম অনুসারে এখনো বিব্রতকরভাবে আফগানিস্তানের পর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩১টি দেশের মধ্যে অবস্থান চতুর্থ সর্বনিম্ন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতির ধারণা সূচকে ২০১৮ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ ভুটান। ২০১৮ সালের সিপিআই অনুযায়ী এ দেশটির স্কোর ৬৮ এবং উর্ধক্রম অনুযায়ী অবস্থান ২৫। এরপরের অবস্থানে রয়েছে ভারত, যার স্কোর ৪১ এবং অবস্থান ৭৮। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এরপরে শ্রীলংকা ৩৮ স্কোর পেয়ে ৮৯তম অবস্থানে রয়েছে। ৩৩ স্কোর পেয়ে ১১৭ তম অবস্থানে উঠে এসেছে পাকিস্তান এবং ৩১ স্কোর পেয়ে ১২৪ তম অবস্থানে নেমে গেছে মালদ্বীপ। অপরদিকে ৩১ স্কোর পেয়ে ১২৪ তম অবস্থানে আরো রয়েছে নেপাল। এরপর ২৬ স্কোর পেয়ে ১৪৯ অবস্থানে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের পরে ১৬ স্কোর পেয়ে সিপিআই ২০১৮ সূচকে ১৭২ তম অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান।

সূচকে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে ডেনমার্কের অবস্থান প্রথম। আর সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ আফ্রিকার সোমালিয়া। ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৮০তম স্থান পাওয়া এ দেশটির স্কোর ১০। সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে এরপরের অবস্থানগুলো পর্যায়ক্রমে সিরিয়া, সাউথ সুদান, ইয়েমেন, উত্তর কোরিয়া, সুদান, গিনিয়া বিসাউ, একুয়াটোরিয়াল গিনিয়া, আফগানিস্তান, লিবিয়া, বুরুন্ডি।

২০১৭ সালের তুলনায় দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নিম্নমুখী হওয়ার কারণ বলতে গিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, দুর্নীতি দমন কমিশন নিম্ন এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে যেসব দুর্নীতি হয় সেসব ক্ষেত্রে অভিযান চালায়। কিন্তু উচ্চ শ্রেণীর মধ্যে অভিযান চালাতে তাদের দেখা যায় না। ফলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না।

ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, বাংলাদেশে দুর্নীতি বেড়ে যাওয়ার কারণ এখানে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ঘোষণা থাকলেও এটার বাস্তবায়ন সেভাবে নেই। উচ্চ পর্যায়ের লোকদের বিচারের আওতায় আনার সেরকম উদাহরণ কম। ব্যাংক খাতে অবারিত দুর্নীতি, জালিয়াতি, ভূমি-নদী-জলাশয় দখল, সরকারি ক্রয় খাতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে দুর্নীতি এক ধরনের ছাড় পেয়ে যাচ্ছে।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদক ও অন্যান্য জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল। গণমাধ্যম ও নাগরিক প্রতিষ্ঠানের কাজের ক্ষেত্রও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। ক্রমাগতভাবে অর্থ পাচার হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ব্যবস্থাপনা কমিটির উপদেষ্টা সুমাইয়া খায়ের ও গবেষণা বিভাগের পরিচালক রফিকুল ইসলাম।

উৎসঃ ‌আরটিএনএন

আরও পড়ুনঃ রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে, দুদক যাচ্ছে প্রাইমারি স্কুলে!


সরকারের অনুগত দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ দিন দিন ব্যাপক সফলতা দেখিয়ে যাচ্ছেন। দুর্নীতির অনুসন্ধানে তিনি সারাদেশ চষে বেড়াচ্ছেন। ছুটে চলছেন এক জেলা থেকে আরেক জেলা। তিনি এখন এমন ব্যক্তিদের পেছনে লাগছেন যাদের কাজে ফাঁকি দেয়ার কিছু সুযোগ আছে, কিন্তু দুর্নীতি করার কোনো সুযোগ নেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক চাইলেও কোনো টাকা-পয়সা আত্মসাত করতে পারবেন না। কারণ, বেতন ছাড়াতো তাদের কাছে আর কোনো টাকা আসে না। তবে ক্লাস ফাঁকি দেয়ার একটা সুযোগ তাদের আছে। কিন্তু দুদক চেয়ারম্যান বিষয়টিকে এমনভাবে তুলে ধরছেন যেন রাষ্ট্রের সকল অনিয়ম-দুর্নীতি শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই হচ্ছে।

রোববার চট্টগ্রামের ৩টি স্কুলে আকস্মিক পরিদর্শন করেছেন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। একটি স্কুলে ৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ৭ জনই অনুপস্থিত ছিল। এটা অবশ্যই বড় ধরণের অন্যায় ও শিক্ষার জন্য খুবই ভয়ঙ্কর বিষয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসলে শিক্ষার নামে কি হচ্ছে সেটা বেরিয়ে এসেছে।

এখন প্রশ্ন হলো-শুধু প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের পেছনে দৌড়ানোই কি দুদকের মূল কাজ?

বিগত কয়েক বছরে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের লাখ লাখ কোটি টাকা লোপাট হয়ে গেছে। শেয়ারবাজার থেকে এক লাখ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া দরবেশ নামে খ্যাত সেই সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ লুটকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সরকারের সর্বোচ্চ ব্যক্তির নির্দেশেই ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হয়েছে। ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান সরাসরি এই রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িত। অথচ এনিয়ে দুদক নীরব ভুমিকা পালন করছে।

রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয় দুর্নীতির আখড়া হিসেবে খ্যাত। টিআইবির পক্ষ থেকে কয়েক মাস পর পরই রাষ্ট্রের দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও বিভিন্ন অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজদের নিয়ে সিরিজ প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটি মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি দুদককে।

এছাড়া, প্রতিবছর দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টেগ্রিটির মতে, শুধু ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ২০১৬ সালেও সংস্থাটি এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তারপর পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতেও বাংলাদেশের কয়েকজন ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদের নাম এসেছিল। কিন্তু এসব বিষয়েও দুদকের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেলেও এসবের তদন্ত করার কোনো প্রয়োজনীয়তা মনে করছে না দুদক।

তবে, বিরোধীদলের কোনো নেতার বিরুদ্ধে কোনো তথ্য পেলে সেটা নিয়ে আবার ডাকঢোল পিটিয়ে মাঠে নামে।

রাজনীতিক বিশ্লেষকসহ সচেতন মানুষ মনে করছে, সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের দুর্নীতি চাপা দিতেই দুদক চেয়ারম্যান এখন প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের পেছনে লেগেছেন। প্রাইমারি স্কুলের তদারকির জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসই যথেষ্ট। দুর্নীতিবাজদের ধরার নামে দুদক চেয়ারম্যান আইওয়াশ করছেন।

কেউ কেউ বলছেন, দুদক চেয়ারম্যান এখন সরকারের দাসে পরিণত হয়েছেন। দাস যেমন মনিবের অন্যায়-অপকর্মের বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারে না, ইকবাল মাহমুদও ঠিক দাসের মতো সরকারের দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারছে না।

উৎসঃ ‌অ্যানালাইসিস বিডি

আরও পড়ুনঃ ‘দুদক ধোয়া তুলসী পাতা’ এই কথা দুদক নিজেও বিশ্বাস করে না, বললেন ব্যারিস্টার তানজীব


সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানজীব-উল-আলম বলেছেন, দুদক বাংলাদেশের বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। দুদক সবকিছু ন্যায্যভাবে করেছে বা তারা ধোয়া তুলসী পাতা এই দাবি দুদক নিজেও করে না। এ কথাটি জনগণও বিশ্বাস করে না। দুদকের কর্মকর্তারা নিজেদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ তুলেছেন। অবৈধ সম্পদ জব্দে দুদকের ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, তদন্ত চলাকালীন সময়ে যদি কারো সম্পদ ক্রোক বা বাজেয়াপ্ত করতে হয়, সেই সম্পদ যে অবৈধ উপায়ে গড়া হয়েছে তার যথেষ্ট প্রমান থাকতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী ‘রাইট টু প্রপার্টি’ নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সোমবার ডিবিসি’র রাজকাহন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ক্ষমতাকে যদি জুডিশিয়াসলি ব্যবহার করা হয়, তাহলে মানুষের হয়রানির সম্ভাবনা নেই। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা দেখে আসছি যে, যখনই কাউকে কোনো ক্ষমতা দেয়া হয়, তখনই তিনি ওই ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। ক্ষমতাকে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করেন।

তবে, অবৈধভাবে অর্জিত কারো সম্পদ অনুসন্ধাকালেই ক্রোক করার যৌক্তিক কারণ আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেমন কারো একাউন্টে প্রচুর টাকা পাওয়া গেছে, কিন্তু টাকার সোর্স এর ব্যাপারে অভিযুক্ত ব্যক্তি স্পষ্ট কিছু বলতে পারছে না বা প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে যে, সোর্সটি তার পরিচিত না। তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে জব্দ করার ক্ষমতা দুদকের আছে এবং এটি নতুন কিছু নয়। কারণ, টাকাটা সরিয়ে ফেলা হলে পরবর্তীতে দোষী সাব্যস্ত হলেও দূর্নীতিলব্ধ সম্পদ উদ্ধার করা কঠিন। এক্ষেত্রে টাকাটা যেনো সরাতে না পারে, অনুসন্ধানকালেই কোর্ট একাউন্ট ক্রোক করার অর্ডার দিতে পারে।

ব্যারিস্টার তানজীব মনে করেন, কোর্ট অনুসন্ধানকালে কারো একাউন্ট জব্দ করলেই যে অধিকার খর্ব হবে তাও কিন্তু নয়। নাজমুল হুদার একাউন্টও ফ্রিজ করা হয়েছিলো। উনার বিরুদ্ধে মামলা চলমান ছিলো। তখন উনি প্রয়োজনে কোর্টে আবেদন করে করে বিভিন্ন সময় টাকা উত্তোলন করেছেন।

উৎসঃ ‌amadershomoy

আরও পড়ুনঃ দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা


গত ১০ বছরে (২০০৬ থেকে ২০১৫) বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৩০৯ কোটি ডলার বা ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সোমবার (২৮ জানুয়ারি) ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) এর বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

জিএফআই’র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫৯০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। ২০১৪ সালে দেশ থেকে পাচার হয়েছিল ৮৯৭ কোটি ডলার। এই হিসাবে ২০১৪ সালের চেয়ে ২০১৫ সালে পাচারের পরিমাণ কমেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে এক দশকে পাচারের পরিমাণ ৫ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা।

সংস্থাটি বলছে, উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের প্রায় ২০ ভাগই পাচার হয়েছে নানা কৌশলে। আর পাচারকৃত টাকার বড় অংশই গেছে আমদানি-রফতানির সময়ে পণ্যের প্রকৃত দাম গোপন করার মাধ্যমে।

বিশ্বজুড়ে অর্থপাচার নিয়ে প্রায় এক দশক ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি-জিএফআই। সোমবার প্রকাশিত সবশেষ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে ১৪৮ উন্নয়নশীল দেশের টাকা পাচারের চিত্র।

তবে জিএফআই এর দেওয়া অর্থ পাচারের তথ্যকে পুরোপুরি স্বীকার করতে নারাজ বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান।

তিনি বলেন, ‘জিএফআই পাচারের যে তথ্য দেয় তা পুরোপুরি সত্য নয়। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রেটি বা জিএফআই অর্থ পাচারের যে তথ্য দেয় তা যে পুরোপুরি সত্য, তা আমরা স্বীকার করি না।’

জিএফআই এর প্রতিবেদন অনুসারে, টাকার অংকের দিক দিয়ে ২০১৫ সালে অর্থপাচারে শীর্ষ ৩০ দেশের একটি ছিল বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। জিএফআই বলছে, টাকা পাচারের এ প্রবণতা টেকসই উন্নয়নের বড় বাধা।

জিএফআই’র হিসাবে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৩০৯ কোটি ডলার বা ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট বাজেট ছিল ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এই অর্থবছরের মোট বাজেটের চেয়েও বেশি টাকা ১০ বছরে পাচার হয়েছে।

জিএফআই বলছে, এটি আনুমানিক হিসাব। প্রকৃত পাচারের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। পাচারের পাশাপাশি, ২০১৫ সালে অবৈধভাবে দেশে ২৮০ কোটি ডলার আসার তথ্যও দিয়েছে জিএফআই।

এর আগে গত জুনে প্রকাশিত সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৭’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিকদের জমানো অর্থের পরিমাণ কমেছে। সুইস ব্যাংকে ২০১৭ সালে বাংলাদেশি নাগরিকদের জমার পরিমাণ ছিল ৪৮ কোটি ১৩ লাখ সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা (১ সুইস ফ্রাঁ = সাড়ে ৮৪ টাকা হিসাবে)। আগের বছর ২০১৬ সালে এর পরিমাণ ছিল ৬৬ কোটি ১৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ (৫ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা)। সুইস ব্যাংকে ২০১৫ সালে বাংলাদেশি নাগরিকদের জমার পরিমাণ ছিল ৫৫ কোটি ৮ লাখ সুইস ফ্রাঁ।

উৎসঃ ‌গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here