করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে টাকায় ভরা ব্যাংক

0
198

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে ভোগব্যয় কমে যাওয়ায় বাড়তি বিনিয়োগে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে ব্যাংক। কিছু বড় গ্রুপ ছাড়া সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মাঝে ঢালাওভাবে আর ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে না। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের অর্থ ব্যাংকে প্রবেশ করছে
অপর দিকে বিনিয়োগ প্রবাহ কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা উদ্বৃত্ত বৈদেশিক মুদ্রা কিনে নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতেও ব্যাংকে টাকার সরবরাহ বাড়ছে। সবমিলেই কিছু ব্যাংকে টাকার প্রবাহ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকগুলোতে বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

এ সুবাদেই ব্যাংক খাতে এখন বিনিয়োগযোগ্য বাড়তি টাকার পরিমাণ প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা এ যাবৎকালে সর্বোচ্চ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমানতের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে তহবিল সংরক্ষণের কথা ১ লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আলোচ্য সময়ে তহবিল সংরক্ষণ করেছে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বিনিয়োগযোগ্য বাড়তি তহবিল রয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা।

এর মধ্যে সরকারি মালিকানাধীন ৬ ব্যাংকেরই সাড়ে ৫৩ হাজার কোটি টাকা। আর বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ৭০ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। ইসলামী ব্যাংকগুলোরও বাড়তি তহবিল রয়েছে সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা। আর বিদেশী ব্যাংকগুলোর রয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা।

তবে এ তহবিলের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ রয়েছে। কিন্তু বিল ও বন্ড কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বন্ধক রেখে টাকা নিতে পারে বলে এসব অর্থ ব্যাংকের ভাষায় বিনিয়োগযোগ্য তহবিল হিসেবেই গণ্য করা হয়।

ব্যাংক খাতে বিনিয়োগযোগ্য এ তহবিল বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, বর্তমানে তারা যেমন ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সচেতন রয়েছেন, তেমনি প্রকৃত ব্যবসায়ীরাও চলমান অবস্থায় নতুন করে ঋণ নিতে চাচ্ছেন না। কিন্তু এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী রয়েছেন, যারা ঋণ নিতে চাচ্ছেন। তবে তাদের বেশির ভাগেরই অতীত রেকর্ড ভালো নয়। তারা একবার ঋণ নিতে পারলে তা আর ফেরত দেন না। ওই শ্রেণীর ব্যবসায়ীরাই মূলত ব্যাংকে ঘোরাফেরা করছেন বেশি।

দেশের প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী ভোগব্যয় কমে যাচ্ছে। এমনকি অভ্যন্তরীণ চাহিদাও কমে গেছে। এর ফলে সবশ্রেণীর পণ্য আমদানি কমে গেছে। এ পরিস্থিতিতে যারা ভালো ব্যবসায়ী তারা নতুন করে ব্যবসা বাড়াতে চাচ্ছেন না। কারণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে যদি ব্যবসা বাড়ানো হয় কিন্তু ব্যবসা না চললে তারা ঋণ পরিশোধ করবেন কিভাবে? এ কারণেই প্রকৃত ব্যবসায়ীরা চলমান ব্যবসা-বাণিজ্যই ধরে রাখতে ব্যস্ত রয়েছেন।

আবার ব্যাংকও এখন ঢালাওভাবে ঋণ বিতরণ করছে না। কারণ এমনিতেই খেলাপি ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছে ব্যাংক খাত। বলা চলে এক বছর যাবৎ কোনো ঋণ আদায় করতে পারছেন না তারা। ডিসেম্বরের পরও ঋণ আদায় করতে পারবেন কি না তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কোনো উদ্যোগ না নিলে সামনে ব্যবসায়ীরা একসাথে কয়টি কিস্তি পরিশোধ করবেন? দীর্ঘদিন যাবৎ ঋণ পরিশোধ না করায় ব্যাংক খাতে হঠাৎ করে খেলাপি ঋণের ধাক্কা পড়ে যাবে। সব মিলিয়েই ব্যাংকও বর্তমানে বাড়তি সতর্কতা হিসেবে আগের মতো ঢালাওভাবে ঋণ বিতরণ করছে না।

অপর দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালু করা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংক ঋণ বিতরণ করে তা অবহিত করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর টাকা সমন্বয় করে দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি করোনার প্রভাবে আমদানি ব্যয় কমে গেছে। এতে ব্যাংকগুলোর হাতে যে বাড়তি বৈদেশিক মুদ্রা থাকছে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিনে নিচ্ছে। গত পাঁচ মাসে এমন প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ডলার কিনে বাজারে ছেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সব মিলিয়েই ব্যাংকে টাকার প্রবাহ বেড়ে যেতে সহায়তা করছে।

বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ব্যাংক সাধারণ গ্রাহকের মাঝে বিনিয়োগ না বাড়ালে বর্ধিতহারে কর্মসংস্থান হবে না। অর্থনৈতিক গতি থেমে যাবে। অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে প্রকৃত কারা টাকার অভাবে বিনিয়োগ করতে পারছে না তাদের বাছাই করে ঋণ দিতে হবে। অন্যথায় সামগ্রিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে অর্থনীতি। এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে ব্যাংক খাতও বাদ যাবে না বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

উৎসঃ নয়া দিগন্ত

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here