কোনো যুক্তিতেই এ নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ নয়ঃ ১৬টি আন্তর্জাতিক সংগঠনের বিবৃতি

0
234

বাংলাদেশে রোববার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘নিয়ন্ত্রণমূলক নির্বাচনী পরিবেশ’ বিরাজ করছে উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা ১৬টি আন্তর্জাতিক সংগঠন।

‘বাংলাদেশে অগণতান্ত্রিক নির্বাচনী পরিবেশের বিরুদ্ধে যৌথ বিবৃতি’ শিরোনামে শনিবার দেয়া এই যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, আইন প্রয়োগকারী বাহিনী দ্বারা সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করা, আইনকে হাতিয়ার বানিয়ে ফেলা, বিরোধীদের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় এজেন্সিগুলো ব্যবহার, নাগরিক সমাজের বিরুদ্ধে প্রতিকূলতা তৈরি ও মিডিয়াকে ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে জনগণের স্বাধীন মত প্রকাশকে অবজ্ঞা করা হয় এবং তা গণতান্ত্রিক নির্বাচনী নীতির একেবারেই পরিপন্থী। এই অবস্থায় আমরা নির্বাচনের বিশুদ্ধতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছি, এ নির্বাচনকে কোনো যুক্তিতেই সুষ্ঠু ও অবাধ বিবেচনা করা যায় না। ব্যাংককভিত্তিক এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (অ্যানফ্রেল) এ বিবৃতি দেয়। ১৬টি সংগঠনের মধ্যে অ্যানফ্রেলও রয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই সুশীলসমাজ, বিরোধী দল ও মিডিয়ার ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক-প্রক্রিয়া খর্ব করা হয়েছে এবং বাংলাদেশের ক্ষয়িষ্ণু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। চাপ সৃষ্টি হয়েছে নির্বাচনের বিশুদ্ধতার ওপরও।

বিবৃতিতে বলা হয়, সত্যিকার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক-প্রক্রিয়ায় নির্বাচনী সহিংসতা ও ভীতির কোনো স্থান থাকতে পারে না। ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, ১০ ডিসেম্বর নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দ দেয়ার পর থেকে বিরোধী দলের গাড়িবহরে কমপক্ষে ৩০টি হামলা হয়েছে। ১৫৯টি সংসদীয় আসনে ২০৭টি সহিংসতা ঘটেছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কমপক্ষে ৪৩ জন প্রার্থীর ওপর হামলা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ জন মারাত্মক আহত হয়েছেন। গ্রেফতার করা হয়েছে বিরোধী দলের ১৭ প্রার্থীকে। অন্য দিকে ২৩টি সংসদীয় আসনে বিএনপির প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করেছে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন। উপরন্তু এই সময়ের মধ্যে নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হয়েছেন পাঁচজন এবং আহত হয়েছেন দুই হাজার ৬৮২ জন। এ ছাড়াও বিরোধীদলীয় সদস্যদের মারধর, দলীয় নেতাকর্মীদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া, নারী প্রার্থীদের ওপর হামলা ও বিরোধী দলের নির্বাচনী র‌্যালিতে বাধা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার উদ্দেশ্যই হলো ভোটারদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়া এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড খর্ব করা।

বিবৃতিতে বলা হয়, বিরোধী দলগুলোর মতে, নভেম্বরের শুরুর দিকে জাতীয় নির্বাচন ঘোষণার পর পুলিশ তাদের ২১ হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। ২০১৮ সালের শুরু থেকে ক্ষমতাসীন দলের বিরোধীদের বিরুদ্ধে কল্পিত মামলার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে বলে জানায় বেশ কিছু মানবাধিকার-বিষয়ক গ্রুপ। এর মধ্যে বিরোধীদলীয় জোটের সাথে সম্পর্ক আছে এমন নেতারাও মামলার শিকার হয়েছেন। এই মামলায় রয়েছে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে মানিহানির ফৌজদারি মামলা এবং ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে এই মামলায় রয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহ, চাঁদাবাজি ও মাছ চুরির মামলা।

বিরোধী দলের বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলাই বলে দেয়, নির্বাচনী মাঠ অসমতল। বিচার বিভাগ ও নিরাপত্তা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, শুধু প্রতিযোগিতামূলক ও পদ্ধতি মানার মধ্য দিয়েই একটি নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা সংজ্ঞায়িত হয় না। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্বাচনী পরিবেশের গুণগত মান।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয় ২০১৮ সালের নভেম্বরে সাংবাদিকদের ওপর ৭২টি হামলা হয়েছে। ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে গ্রেফতার করা হয়েছে ৩৯ জনকে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসংক্রান্ত ইসুু্যুতে গ্রেফতার করা হয়েছে ৯ জনকে। বাংলাদেশ সরকার নিরপেক্ষ ও সমালোচকদের বিরুেেদ্ধ কতটা ক্ষ্যাপা তার একটি উদাহরণ ফটোসাংবাদিক ও অধিকারকর্মী ড. শহিদুল আলমকে গ্রেফতার। স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষ মিডিয়ার সাথে নাগরিক সমাজের কর্মকাণ্ড মিলে একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের মেরুদণ্ড তৈরি হয়। এসব স্বাধীনতা খর্ব করাটা এমন একটি সরকারের পরিচায়ক, যা জনগণের বিবেচনা ও তাদের কাছে জবাবদিহিতার ধার ধারে না। এতে বিশেষত বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশে প্রথম সারির মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক সংগঠন ‘অধিকার’ রাষ্ট্রবিরোধী, সরকারবিরোধী ও দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে মর্যাদাহানির মুখে পড়ে। নির্বাচন মনিটরিং ও পর্যবেক্ষক মোতায়েনের ক্ষেত্রে অধিকারকে নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। এ ক্ষেত্রে এনজিও-বিষয়ক ব্যুরো সংগঠনটির রেজিস্ট্রেশন প্রদানের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করে।

এসব বিধি-নিষেধের কারণে নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের সংখ্যা দ্রুত কমে গেছে। জানা গেছে, ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আগ্রহ দেখিয়েছেন ৩৮ হাজার ৮৩৮ জন পর্যবেক্ষক। নির্বাচন কমিশনের একজন কর্মকর্তা জানান, এর মধ্য থেকে ২৬ হাজারকে অনুমোদন দেয়া হবে। ২০১৪ সালের নির্বাচন বাদ দিলে এটি হবে দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে কমসংখ্যক পর্যবেক্ষক। ২০১৪ সালের নির্বাচনে স্থানীয় পর্যবেক্ষক ছিলেন আট হাজার ৮৭৮ জন এবং বিদেশী পর্যবেক্ষক ছিলেন মাত্র চারজন। পক্ষান্তরে ২০০৮ সালের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক ছিলেন প্রায় এক লাখ ৫৯ হাজার। ২০০১ সালে এই সংখ্যা ছিল দুই লাখ ১৮ হাজার। পর্যবেক্ষক কমে যাওয়া ইঙ্গিত দেয় যে, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশ, প্রতিবন্ধকতা এবং নাগরিক সমাজের পছন্দ করা অংশকে অ্যাক্রিডিটেশন দেয়ার মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন, এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (অ্যানফ্রেল), গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অব ডমেস্টিক ইলেকশন মনিটরস, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস, সেন্টার ফর মনিটরিং ইলেকশন ভায়োলেন্স- শ্রীলঙ্কা, ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন নেটওয়ার্ক-পাকিস্তান, কোমিতে ইন্ডেপেন্ডেনে পেমানতাউ পেমিলু-ইন্দোনেশিয়া, মালাভি ইলেকটোরাল সাপোর্ট নেটওয়ার্ক-মালাবি, মারুয়াহ-সিঙ্গাপুর, ন্যাশনাল সিটিজেন্স মুভমেন্ট ফর ফ্রি ইলেকশন-ফিলিপাইনস, পিপলস অ্যালায়েন্স ফর ক্রেডিবল ইলেকশন-মিয়ানমার, পিপলস অ্যাকশন ফর ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন-শ্রীলঙ্কা, পেরকুমপুলান উনতুট পেমিলু ডান ডেমোক্র্যাসি-ইন্দোনেশিয়া, ট্রান্সপারেন্সি মালদ্বীপ-মালদ্বীপ, জিম্বাবুয়ে ইলেকশন-সাপোর্ট নেটওয়াক-জিম্বাবুয়ে এবং কমিটি ফর ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন ইন কম্বোডিয়া।

সুত্রঃ ‌দেশজনতা

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here