‘হিজাবী নারী হিসেবে যেভাবে আমি প্রসাধনী দোকানে বৈষম্যের শিকার হয়েছি’

0
41

“সম্প্রতি আমি কিছু কেনাকাটা করার জন্য Sephora তে(ফ্রান্সের প্যারিস ভিত্তিক আন্তর্জাতিক একটি চেইন শপ যারা নারীদের প্রসাধনী বিক্রি করে)গিয়েছিলাম আর সেখানে আমার সাথে অত্যন্ত অসম্মানজনক আচরণ করা হয়েছিল। আমি অসম্মানজনক আচরণের সম্মুখীন হয়েছি কারণ আমি একজন হিজাবী মুসলিম নারী।

আমি প্রায়ই এসব দোকানে এমন অসম্মানজনক আচরণের মুখোমুখি হই কিন্তু কখনো এসবের প্রতিবাদ করিনি। কিন্তু গত সপ্তাহে আর নীরব থাকতে পারি নি। আমি অবাক হয়ে গেছি যে, Sephora এর মত একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানে এমন কর্মী থাকতে পারে যারা একজন নারীকে সম্মান দিতে জানে না।

কেউই আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে নি। আমি একজন মুসলিম এবং আমি হিজাব পরিধান করি, সুতরাং আপনি কি ধারণা করতে পারেন যে, কেন তারা আমার সাথে এমন বৈষম্য মূলক আচরণ করেছে?

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার যে স্থানে আমি থাকি সেখানটায় এ ধরনের বর্ণবাদী মন নিয়ে অনেকেই চলাফেরা করেন। যদিও বাহির থেকে দেখলে মনে হবে ফ্লোরিডা নামক রাজ্যটি একেবারে চকচকে তকতকে একটি শহর কিন্তু এর ভেতরে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যত ধরনের অপরাধ সংগঠিত হয় তা পুরো যুক্তরাষ্ট্রেও হয় না।

আমি যে শহরে বসবাস করি সে শহরের JCPenney (একধরনের ক্রেডিট কার্ড) সমর্থন করে এমন একটি sephora স্টোরে গিয়েছিলাম। আমি চলতি বছরের জুন মাসের ৮ তারিখ বিকেল ৫ ঘটিকার দিকে সেখানে গিয়েছিলাম।

আমি সেখানে ১৫ মিনিট কারো সাহায্য ছাড়াই কিছু কেনাকাটা করি এবং আমার বাস্কেটে একটি পণ্য নিই। এর পরে আমি একজন কর্মীর নিকটে গিয়ে তাকে বিনয়ের সহিত আমাকে পণ্য পছন্দ করতে সহযোগিতা করতে বলি। কিন্তু ওই নারী কর্মীটি আমার দিকে অত্যন্ত অমার্জিতভাবে তাকিয়েছিল এবং এমন আচরণ করছিল যেন সে আমাকে দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছে।

সে আমাকে জানায় যে, আমাকে আরো ১৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে।

কিন্তু আরো ১৫ মিনিট অপেক্ষা করার পরেও কেউই আমাকে সাহায্য করতে আসল না। অন্য কোনো নারী ক্রেতা আসার সাথে সাথেই তারা তার নিকটে দৌড়ে যায় এবং তাদের কি সাহায্য দরকার তা জানতে চায়।

আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। একসময় sephora’র ওই দোকানে আমি এবং আরেকজন আফ্রিকান আমেরিকান ক্রেতা ছাড়া আর কোনো ক্রেতা ছিল না। আমি তখন শুনতে পেলাম যে, দোকানের কর্মীরা এবং ব্যবস্থাপক আমাকে নিয়ে একে অপরের সাথে বাজে কথা বলছিল এবং আমাকে তারা কোনো ধরনের সাহায্য না করে খুব আনন্দ প্রকাশ করছিল।

আমি তখনও কিছু মনে করি নি এবং নীরব ছিলাম।

আমার শুধু মনে হয়েছিল যে, আমার কোনো অস্তিত্বই নেই।

Sephora তে আমার এধরনের অভিজ্ঞতার কথা আমি যখন ইনস্টাগ্রামে ভাগাভাগি করি তখন অনেক মুসলিম নারীই আমাকে বলেছিল যে, তাদের সাথেও sephora’র কর্মীরা ঠিক একই আচরণ করেছে কিন্তু তারা এর বিরুদ্ধে কিছু আমার মত বলতে সাহস পায় নি।

ফ্লোরিড়ার উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের sephora তে আমার পরিচিত একজন মুসলিম হিজাবী নারী কাজ করতেন এখানে নিরাপত্তার জন্য আমি তার নাম প্রকাশ করছি না। তিনি আমার অভিজ্ঞতাটি সম্পর্কে জানতে পেরে আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন।

Sephora’র কর্মীরা কেন আমার সাথে এমন আচরণ করেছে তিনি তার একটি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘sephora’র কর্মীরা হিজাব পরিহিত কোনো নারীকে দেখলে প্রথমেই চিন্তা করে যে, এই নারী হয়তো কোনো উদ্বাস্তু এবং এর কাছে কোনো ধরনের টাকা পয়সা নেই। আমি জানি এমন ধারণা খুবই বাজে বিষয়।’

আমি Sephora’র কর্তাব্যক্তিদের শুধু একটি উপদেশ দিতে চাই, আর তা হচ্ছে দয়া করে আপনারা মলাট দেখেই কোনো বইকে যাচাই করে ফেলবেন না। আমি দেখতে অনেক ধনী বা একেবারে গরীব নই, যদিও আমি জানি না এ-দুটোর মধ্যে কোনটি সবচেয়ে বেশী সততা পূর্ণ।

আমি Sephora তে গিয়েছিলো কিছু কিনে নিতে এমনকি আমি আমার বাস্কেটে একটি পণ্য নিয়েছিলাম কিন্তু তাদের আচরণ দেখে আমি সেটি সেখানে রেখে দিয়ে স্থান ত্যাগ করি।

তবে আমি এ ঘটনার জন্য পুরো Sephora কর্তৃপক্ষকে দায়ী করতে চাই না। কিন্তু আমার বন্ধু প্রাক্তন Sephora কর্মী Sephora তে কর্মরত কর্মীদের মনোভাব সম্পর্কে আমাকে যা বলেছেন তাতে আমার মনে হয় তাদের ভিত্তি মূলেই কিছু ত্রুটি রয়েছে।

আমার বন্ধুটি Sephora সম্পর্কে বলতে গিয়ে আমাকে বলেছেন, ‘আমি এর পূর্বে Sephoraকে ভালবাসতাম। সেখানে কাজ করতে চাইতাম। কিন্তু আমি দেখেছি তারা কিভাবে মুসলিম নারীদেরকে হেনস্থা করে। আমি একজন মুসলিম হিজাবী নারী কর্মী হিসেবে অনেক ক্রেতা থেকে বিরূপ আচরণ সহ্য করেছি কিন্তু Sephora’র অন্যান্য কর্মীরা কখনো আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে নি। Sephora’র কর্মীরা সবচেয়ে বেশী রূঢ় আচরণ করে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদেরকে দেখলে। তারা এমন ভাব করে যেন এসব কৃষ্ণাজ্ঞ নারীরা এখানে কোনো কিছু চুরি করতে এসেছে।’

আমি Sephora’র কর্মীদের এধরনের আচরণ দেখে সে স্থান ত্যাগ করি এবং Sephora’র ওয়েব সাইটে ক্রেতা সেবা কেন্দ্রে একটি অভিযোগ দিয়েছিলাম। যদিও আমি নিশ্চিত নই যে, তারা আমার অভিযোগটি পেয়ে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছিল কিনা।

আমি যখন এই অভিজ্ঞতার কথা ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করি তখন আমার একজন বন্ধু আমার পোস্টটি দেখে এবং টুইটারে Sephora’র একাউন্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। Sephora কর্তৃপক্ষ কিছুদিন পরেই আমার সাথে যোগাযোগ করে বলে যে, আমি যাতে অভিযোগ দিই। আমি জানিয়েছি যে, আমি এর পূর্বেই অভিযোগ দিয়েছি কিন্তু কোনো প্রতিউত্তর পাই নি।

পরে তারা আমার ঠিকানা জানতে চাইলে আমি তাদেরকে আমার ঠিকানা জানাই। তারা আমাকে জানায় যে, আমার স্থানীয় শহরের Sephora দোকানটির ব্যবস্থাপকের সাথে একটি আলোচনার ব্যবস্থা করবে। কিন্তু এক সপ্তাহ পার হয়ে যাওয়ার পরেও এধরনের কোনো আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হয় নি।

সুতরাং আমি মুসলিম এবং সংখ্যালঘু নারীদের বলতে চাই যে, কোথা থেকে আপনারা আপনাদের প্রসাধনী ক্রয় করবেন পুনরায় বিবেচনা করে দেখুন।”

সূত্রঃ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী হিজাবী মুসলিম নারী কেয়া গ্রাভিতার তার নিজের ব্লগ সাইট- কেয়াগ্রাভিতারব্লগ ডট কম লিখা অনুচ্ছেদ থেকে।

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here