কাতারে জেলে বন্দী হাজারো বাংলাদেশী, খোঁজ নিচ্ছে না দূতাবাস

0
277

মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ ধনী দেশ কাতারে পাড়ি জমানো অসংখ্য বাংলাদেশী শ্রমিক বর্তমানে নানা ধরনের বিপদের মধ্যে রয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কয়েক হাজার কর্মী পাসপোর্ট-ভিসাসহ নানা জটিলতায় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে ‘সফর’ নামক কারাগারে বন্দী রয়েছেন।

যাদের আত্মীয়স্বজন ও টাকা রয়েছে, তারাই আইনি লড়াই শেষে জেলজরিমানার পর খালি হাতেই দেশে ফিরছেন। আর যারা এ সুযোগ পাচ্ছেন না, তাদের মাসের পর মাস ওই কারাগারেই কাটাতে হচ্ছে। তবে অন্যান্য দেশের কারাগারের চেয়ে ‘সফর’ কারাগারের পরিবেশ ও থাকা-খাওয়ার মান উন্নত।

এ দিকে ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ফিলিপাইনসহ অন্যান্য দেশের যেসব নাগরিক ধরা পড়ে কারাগারে রয়েছেন; তাদেরকে মুক্ত করতে দূতাবাসের কর্মকর্তারা খোঁজ নিলেও ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ দূতাবাস। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেল (শ্রম) বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বাংলাদেশীদের মুক্ত করতে আইনি পদক্ষেপ নেয়া দূরের কথা, খোঁজও নিতে যাচ্ছেন না।

আর গেলেও আটক বাংলাদেশীদের তাদের চোখে পড়ছে না। এমনটিই জানিয়েছেন সম্প্রতি ২৯ দিন জেল খেটে খালি হাতে দেশে ফেরা হাজী ক্যাম্প এলাকার বাসিন্দা ইকবাল হোসেন রনি। তার দাবি বর্তমানে ‘সফর’ কারাগারে অনেক (হাজার হাজার) বাংলাদেশী বন্দী আছেন।

এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কাতারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো: অসুদ আহমদের সাথে যোগাযোগ করার পরও তিনি কোনো সাড়া দেননি। পরে তার মোবাইলে খুদে বার্তা পাঠিয়ে ‘সফর’ জেলে কী পরিমাণ বাংলাদেশী আটক আছেন এবং দূতাবাস কর্মকর্তাদের খোঁজ না নেয়ার অভিযোগের বিষয়ে উত্তর জানানোর অনুরোধ করার পরও তিনি সাড়া দেননি। পরে শ্রম কাউন্সেলরের মোবাইলে ফোন দেয়া হলে তিনিও সাড়া দেননি।

বুধবার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে খোঁজ নিতে গেলে বিমানবন্দর পুলিশবক্সের সামনে এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর কাতার থেকে দেশে ফেরা রনির সাথে। জমি বিক্রি এবং হাওলাদ করে কাতারে গিয়ে অনেকটা খালি হাতে দেশে ফেরা রনি এখন অভাব-অনটনের সংসার টিকিয়ে রাখতে ভাড়ায় গাড়ি চালাচ্ছেন।

সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি তার কাতারে যাওয়া এবং সেখানে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে ২৯ দিন জেল খেটে চার মাস আগে দেশে ফেরার বর্ণনা দেন। এ সময় তিনি বলেন, যে ব্যক্তি তার কাছ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন, তিনি বর্তমানে বিমানবন্দর এলাকায়ই আছেন। বিদেশ যাওয়ার আগে তার ফার্মেসির প্যাডেই তার কাছ থেকে পুরো টাকা নেয়ার অঙ্গীকারনামা করে যান। অঙ্গীকারনামাটি এ প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।

এতে দখা যায়, নর্দাপাড়া তালতলা মোড়ের হিমা ফার্মেসির (চেম্বার) জেনারেল প্রাকটিশনার (এলএমএফ) মো: ইমতিয়াজ আহম্মেদ জনির প্যাডে ২০১৬ সালের ২৯ নভেম্বর হওয়া চুক্তিতে উল্লেখ আছে ‘আমি প্রথম পক্ষ মো: ইকবাল হোসেন রনি এবং দ্বিতীয় পক্ষ মো: জনিকে কাতার যাওয়ার ভিসা বাবদ পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রদান করিয়া কাতার যাওয়ার জন্য সম্মতি প্রদান করিলাম। শর্ত হচ্ছে দুই বছরের জন্য আইডির ব্যবস্থা করিয়া দিবেন। ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে তিনবার পর্যন্ত পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দিবেন। দুই মাসের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ও সকল প্রকার সমস্যার দায়ভার নিবেন।’

সাক্ষী হিসেবে এ এস এম মজিবুর রহমান ও মো: বজলুর রহমানের নাম ছাড়াও হিমা ফার্মেসির প্যাডের নিচে দ্বিতীয় পক্ষ মো: জনির স্বাক্ষর রয়েছে। হিমা ফার্মেসির ওই প্যাডে থাকা একটি মোবাইল নম্বর রয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ওই নম্বরে যোগাযোগ করা হলে কেউ রিসিভ করেননি।

কাতারে ‘সফর’ জেলে ২৯ দিন থাকার সময় সেখানে কেমন ছিলেন জানতে চাইলে ইকবাল হোসেন রনি নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বাংলাদেশের কারাগারে তো কখনো যাইনি। জেলখানা তো জেলখানাই। তবে সেখানকার জেল খুব উন্নত, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। খাবারের মানও ভালো। তারা কাউকে নির্যাতন করে না। সময়মতো তিন বেলা খাবার দিচ্ছে। কোনো মারধর করে না। উঁচা জাজিম, কম্বল আর প্লেট দেয়। এটা আমাগো ঘরের থেইক্যা ভালা।’

কতজন বাংলাদেশী সফর জেলে আছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘হাজার হাজার। আমি যখন ছিলাম তখন আমার সিরিয়াল আছিল ২৯ হাজার ৬৩৩ নম্বর। বেশির ভাগ ধরা পড়েছে জাল ভিসার কারণে। এর জন্য কারো এক মাস, আবার কারো ১৫ দিনের জেল হয়েছে। সাজা শেষ হলে তখন সেখান থেকেই এয়ারপোর্টে দিয়ে যাচ্ছে জেলের লোকজন। আমাকে বাড়ির সামনে থেকে ধরে নিয়ে যায়। ২৯ দিন জেল খেটে ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দেশে আসি।’

তিনি আরো বলেন, কাতারে যাওয়ার পর ছয় মাস কাজই পাইনি। তাই দেশে এসে আমাকে যে ফার্মেসির মালিক পাঠিয়েছিল, তার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি পাত্তাই দেননি। পরে আমি থানায় যাই। দারোগা (সাব ইন্সপেক্টর) আমাকে বলেন, তুমি তো দুই বছরের চুক্তিতে গিয়েছিলা। ১৮ মাস কাতারে ছিলা। তাই এ নিয়ে আর জিডি করার দরকার নেই বলে ফিরিয়ে দেন।

তবে তিনি ওই দারোগার নাম জানাতে পারেননি। কারাগারে থাকা অবস্থায় দূতাবাসের কর্মকর্তা কি আপনাদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমি যে ২৯ দিন ছিলাম, ওই সময় কোনো কর্মকর্তাই আসেননি। তবে অন্যান্য দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের দেখেছি তাদের দেশের নাগরিকদের খোঁজখবর প্রতিনিয়ত নিতে।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিদেশে আমাদের দেশের দূতাবাসের কাজ হচ্ছে নাগরিকদের সমস্যা দেখা। কিন্তু এটা যেন আমাদের দূতাবাসের লোকজন ভুলেই গেছেন। আপনারা ভালোভাবে খোঁজ নেন, তাহলে জানতে পারবেন আমি ঠিক বলেছি কি না?

উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটিতে বর্তমানে তিন লাখের মতো বাংলাদেশী অবস্থান করছেন। এর মধ্যে নারী কর্মীও আছেন। আর প্রতি মাসে দেশটিতে যাচ্ছেন গড়ে ৮-১০ হাজার শ্রমিক। তবে কাতার সরকার ওয়ানস্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে মেডিক্যাল ও ভিসা প্রসেসিং চালু করলেও এখনো জনশক্তি ব্যুরোর ১০ সদস্যের একটি সিন্ডিকেট অসত্যায়িত ভিসায় বাংলাদেশীদের পাঠাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

উৎসঃ ‌justnewsbd

আরও পড়ুনঃ কী হচ্ছে ইয়াবা সাম্রাজ্যেঃ আত্মসমর্পণকারীরা এখন হেফাজতে, বদি বললেন একটু সময় দিন


ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ নিয়ে এখন তুমুল আলোচনা চলছে ‘ইয়াবা সাম্রাজ্য’ টেকনাফের সর্বত্র। কৌতুক আর কৌতূহল এখানে-ওখানে। যেমন : কী প্রক্রিয়ায় হবে এই আত্মসমর্পণ। কারা আত্মসমর্পণ করবে। যারা আত্মসমর্পণ করবে এখন তারা কোথায়। স্থানীয়রা বলছেন, পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই চলছে একধরনের লুকোচুরি। ওদের আত্মসমপর্ণ প্রক্রিয়া নিয়ে অন্ধকারে রয়েছেন তারা।

স্থানীয়দের ভাষ্য হচ্ছে, এটা ইয়াবার বড় কারবারিদের জীবন রক্ষার সাময়িক কৌশল মাত্র। তারা বন্দুকযুদ্ধের হাত থেকে বাঁচার মতলবে নিজেরাই একটা পথ তৈরি করেছে। আর যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ইতিমধ্যে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে তাদের পরিবার আবার এই ‘ধরা দেওয়ার’ ঘোর বিরোধী। অবশ্য টেকনাফের পুলিশ বলছে, প্রক্রিয়াটা খুবই সোজা। যারা আত্মসমর্পণ করবে তারা ইতিমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা আদালতে মোকাবিলা করার সুযোগ পাবে। তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো মামলাও হবে না। আর যারা আত্মসমর্পণ করবে না তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে।

তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর করা টেকনাফের ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বিশাল তালিকার মধ্যে খুবই ক্ষুদ্র একটা অংশ এখন পর্যন্ত আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পেরেছে। বিরাট অংশ এখনো আত্মগোপনে। যার মধ্যে রয়েছে তালিকার প্রথম সারির ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। তারা আদৌ আত্মসমর্পণ করবে কিনা, কেউ কোনো ধারণা দিতে পারছে না। টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা দুই দিন ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইয়াবা ব্যবসায়ীরা ধরা দেওয়ার কৌশল নিয়েছেন গত কয়েক দিন ধরে। চলতি মাসের শুরুর দিকে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য এনামুল হক প্রথম আত্মসমর্পণের প্রস্তাব তুলে নিজের ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। এর পরপরই তিনি টেকনাফ ছেড়ে কক্সবাজার চলে যান। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছেন, তিনিও কক্সবাজারে পুলিশের হেফাজতেই আছেন। সূত্র জানান, এনাম মেম্বারের আত্মসমর্পণ ঘটনার পর তৎপর হয়ে ওঠেন আবদুর রহমান বদি। গত সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী নতুন সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পর এলাকায় ফিরে টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি নিজের বাড়িতে এক সমাবেশে ইয়াবা কারবারিরা আত্মসমর্পণ করবে বলে ঘোষণা দেন। বদির ঘোষণার পরপরই তার অনুসারী এবং আত্মীয়স্বজনরা তার মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করার জন্য জড়ো হন। এরপর বদির তত্ত্বাবধানেই আত্মসমর্পণের জন্য জড়ো হওয়াদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় কক্সবাজার জেলা শহরে পুলিশ লাইনসে। তার ওই প্রক্রিয়ার পরই বিষয়টি নিয়ে শোরগোল শুরু হয়। এনামুলের পথ অনুসরণ করে আরও কয়েকজন একই পথে পা বাড়ান। এখন যারা আত্মসমর্পণ করছেন তারা সাবেক সংসদ সদস্য বদির মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করছেন বলে জানা গেছে। যার ফলে নতুন করে যারাই আত্মসমর্পণের তালিকায় নিজেদের নাম লিখিয়েছেন তারা বদির মাধ্যমেই যাচ্ছেন। বদিকে এড়িয়ে কেউ আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় যেতে পারছেন না। স্থানীয়রা বলছেন, বদি তার আত্মীয়স্বজন ও অনুসারীদের রক্ষা করার জন্য এই আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়াটাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ বিভিন্ন সংস্থার তৈরি টেকনাফের ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকায় বদির নাম থাকলেও তিনি নিজে আত্মসমর্পণ করবেন কিনা তা কেউ নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি। আর তার আপন ছোট ভাই টেকনাফ পৌরসভার প্যানেল মেয়র মৌলভী মুজিবুর রহমান শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী হলেও এবং তার নাম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকার শীর্ষে থাকার পরও তিনি আত্মসমর্পণ করতে যাননি। শোনা যাচ্ছে, তিনি নিজের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য ঢাকায় দৌড়ঝাঁপ করছেন। যদিও বদির অন্য ভাই ও আত্মীয়স্বজনদের বেশ কয়েকজন ইতিমধ্যে আত্মসমর্পণের জন্য কক্সবাজার পুলিশ লাইনসে রয়েছেন। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কারা কারা আত্মসমর্পণ করছেন, তিনি নিজে করছেন কিনা- এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজারে অবস্থানরত আবদুর রহমান বদি গতকাল দুপুরে মোবাইল ফোনে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘অপেক্ষা করুন, একটু সময় দিন সবই দেখতে পাবেন। সবই দৃশ্যমান হবে। অনেক প্রশ্নের জবাব পাবেন।’

ওরা এখন হেফাজতে : এদিকে যারা আত্মসমর্পণ করার জন্য বাড়ি ছেড়েছেন তাদের বর্তমান অবস্থান নিয়েও নানান প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, যারা আত্মসমর্পণ করার জন্য গত কয়েকদিনে বাড়ি থেকে বের হয়েছেন তারা সবাই কক্সবাজার জেলা সদরে পুলিশ লাইনসে অবস্থান করছেন। তাদের আত্মীয়স্বজনরা নিয়মিত কক্সবাজার গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করছেন। খাবার দিচ্ছেন। জানা গেছে, এ পর্যন্ত টেকনাফের ৬০ জনের বেশি ইয়াবা ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণের জন্য কক্সবাজার পুলিশ লাইনসে গিয়েছেন। তাদের প্রত্যেকেই ইয়াবার বড় ব্যবসায়ী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকাভুক্ত। টেকনাফ সদর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নাজিরপাড়া গ্রামের আবদুর রহমান এখন পুলিশ হেফাজতে কক্সবাজার পুলিশ লাইনসে আছেন। তার এক ভাই জিয়াউর রহমান গত বছর নভেম্বরে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন। পুলিশ জিয়ার বাড়িও বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আবদুর রহমানের বাবা মো. ইসলাম গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বড় ছেলের মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয় ছেলেকে বাঁচাতে আত্মসমর্পণের জন্য পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। ১২ জানুয়ারি তিনি ও তার স্ত্রী ছেলেকে কক্সবাজার পুলিশ লাইনসে রেখে এসেছেন। ইতিমধ্যে দুই দিন সেখানে গিয়ে ছেলের সঙ্গে দেখাও করেছেন। ইসলাম জানান, তার ছেলেসহ যারা আত্মসমর্পণ করতে পুলিশ লাইনসে গেছেন তারা সবাই ভালো আছেন। তিনি দেখেছেন একটি বড় কামরায় ২৫-৩০ জন। তাদের খাবার দেওয়া হচ্ছে। তারা ফ্লোরে বিছানা পেতে ঘুমাচ্ছেন। প্রায় প্রতিদিনই স্বজনরা গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করছেন। তার মতে, প্রায় ৬০ জনের মতো ইয়াবা ব্যবসায়ী কক্সবাজার পুলিশ লাইনসে আছেন। আরেক স্বজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ক্রসফায়ার থেকে নিজেকে রক্ষা করতে তার ভাই আত্মসমর্পণ করেছেন। তিনিও এখন পুলিশ লাইনসে আছেন। তিনি বলেন, পুলিশ তাদের জানিয়েছে, খুব শিগগির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে তাদের আত্মসমর্পণ করানো হবে। তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন।

পুলিশ যা বলছে : কক্সবাজার জেলায় ১ হাজার ১৫১ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর যে তালিকা রয়েছে তাতে শুধু টেকনাফেরই প্রায় ৯০০ জন। এর মধ্যে গত বছরের ৪ মে থেকে মাদকের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া অভিযানে কক্সবাজার জেলায় যে ৩৯ জন বন্দুকযুদ্ধে বা ক্রসফায়ারে মারা গেছেন তার মধ্যে ৩৭ জনই হচ্ছেন টেকনাফের ছোট-বড় ইয়াবা কারবারি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই মাদকবিরোধী অভিযানের মধ্যেই শুরু হয়েছে আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া। তবে স্থানীয় পুলিশ বলছে, আত্মসমর্পণের বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তারা সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকেও এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা পাননি। টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ মঙ্গলবার রাতে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘শুনেছি ইয়াবা কারবারিদের কেউ কেউ আত্মসমর্পণের চেষ্টা করছেন। কিন্তু তারা কোথায়, কার হেফাজতে আছেন তা আমার জানা নেই।’ কক্সবাজার পুলিশ লাইনসে থাকার কথাও ঠিক নয় বলে জানান তিনি। ওসি বলেন, তারা একসঙ্গে ১০০-১৫০ জন আত্মসমর্পণ করতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। ওসি বলেন, কেউ যদি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চায় এবং ভবিষ্যতে আর কখনো ওই খারাপ কাজে জড়াবে না বলে অঙ্গীকার করে তা তো খারাপ কিছু নয়।

ধরা দিতে প্রস্তুত যারা : আত্মসমর্পণের ডাকে সাড়া দিয়ে যারা পুলিশ হেফাজতে গিয়েছেন তাদের অনেকের নাম জানা গেছে। এরা প্রায় প্রত্যেকেই পাঁচ থেকে সাতটি মামলার আসামি। কারও কারও বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা আরও বেশি। এর মধ্যে রয়েছেন- সদর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার এনামুল হক, টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর নুরুল বশর নুরশাদ, নারী কাউন্সিলর কহিনুরের স্বামী শাহ আলম, সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোয়াজ্জেন হোসেন ও রেজাউল করিম, সাবেক সদস্য আবদুর রহমান বদির ভাই আবদুল আমিন, মো. শফিক, মো. ফায়সাল, চাচাতো ভাই জালিয়াপাড়ার মো. আলম, খালাতো ভাই মং মং সিং, ফুফাতো ভাই কুড়ালপাড়ার কামরুল ইসলাম রাসেল, ভাগনে সাবরাংয়ের সাহেদুজ্জামান নিপু, বদির বেয়াই সদর ইউনিয়নের নাজিরপাড়ার জামাল হোসেন, বেয়াই সাবেক মেম্বার নাজিরপাড়ার সৈয়দ হোসেন, আরেক বেয়াই সাবরাংয়ের শাহেদ কামাল, ফল্লানপাড়ার ছলিম, গোদার বিলের জিয়া, নাজিরপাড়ার রফিক, টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আহম্মদের ছেলে দিদার, ভাইপো সিরাজ, হ্নীলার আবদুল্লাহ, ছৈয়দ আহমদ, হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নুরুল হুদা, জামাল হোসেন ও তার ছেলে শাহ আজম, টেকনাফ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দুই ভাই জিয়াউর রহমান ও আবদুর রহমান।

উৎসঃ ‌বিডি প্রতিদিন

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here