আত্মসমর্পণের পথে ইয়াবার ‘প্রধান গডফাদার’ বদি, কারাবরণেও প্রস্তুত!

0
347

আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছেন মরণনেশা ইয়াবার ‘প্রধান গডফাদার’ হিসেবে খ্যাত সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি। তার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযোগ, তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ধ্বংস করে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনীর তালিকায় নিজের নাম যুক্ত করতে ইতোমধ্যে মাদককে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছেন। সেই বহুল আলোচিত মাদকের ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’ কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি এবার সরকারের চাপে পড়ে চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের আত্মসমর্পণ করতে পারেন। সেই লক্ষ্যে তিনি প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র সারাবাংলাকে বিষয়টি জানিয়েছে।

তবে, উপজেলা নির্বাচনের প্রার্থী চূড়ান্ত করার পরই বদি আত্মসমর্পণ করবেন বলে তার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়। আত্মসমর্পণের ফলে কারাবরণ করতে হলে সেই প্রস্তুতিও বদি সম্পন্ন করে রেখেছেন।

ইতোমধ্যে আত্মসমর্পণের প্রথমিক শর্ত হিসেবে বদির ৩ ভাই-বোন ও ভাগিনাসহ পরিবারের ২০ জন সদস্য পুলিশ হেফাজতে চলে গেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ফেব্রুয়ারির ১৫ অথবা ১৬ তারিখ সাবেক সংসদ বদি ও তার ভাই দেশের অন্যতম শীর্ষ ইয়াবা কারবারি আব্দুর শুক্কুর আত্মসমর্পণ করবেন বলেও সূত্র জানায়।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, এতদিন ধরে বদি তার পরিবারের সদস্যদের ইয়াবা কারবারে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে এলেও এবার নিজেই দোষস্বীকার করে ভাই-বোনদের আত্মসমর্পণ করাচ্ছেন। বদির ভাই-বোনসহ স্বজনদের ইয়াবা কারবারে জড়িত থাকর কথা স্বীকার করে নেওয়ায় এবার তাকেই আত্মসমর্পণ করতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বলা হয়েছে। দেশে ইয়াবাপাচার বন্ধের জন্য ইয়াবার ‘গডফাদার’ আব্দুর রহমান বদি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা তালিকার শীর্ষ ইয়াবা কারবারি আব্দুর শুক্কুরকে সরকার আত্মসমর্পণ করতে বলেছে। সরকারের চাপে পড়ে আত্মসমর্পণ করতেই দুবাইয়ে পালিয়ে যাওয়া আব্দুর শুক্কুর কয়েকদিন আগে দেশে ফিরেছেন বলেও সূত্র জানায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের সঙ্গে আব্দুর রহমান বদি (ফাইল ছবি)

জানা গেছে, আত্মসমর্পণ করতে এরইমধ্যে সরকারের কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে দেখাও করেছেন বদি। আত্মসমর্পণের পর যেন দ্রুত মুক্তি পান, সেটিও নিশ্চিত করতে চান তিনি। এই লক্ষ্যেই বদি এখন ঢাকায় অবস্থান করে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। দ্রুত জামিনের নিশ্চয়তা পেলে চলতি মাসেই আত্মসমর্পণ করবেন বলে তার একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়। তবে, আত্মসর্পণের আগে টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলা নির্বাচনে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে দলীয় মনোনয়ন নিয়েও দিতে চান বদি।

একটি সূত্র জানায়, আব্দুর রহমান বদি সংসদ সদস্য থাকার সময় তার বা তার স্বজনদের ইয়াবা কারবারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি প্রশাসন। এবার দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হননি তিনি। তাই বদির হাতে এখন আর আগের ক্ষমতা নেই। মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের অনমনীয় মনোভাবের কারণে অবস্থা বুঝে জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে নিজের ভাই ফয়সাল রহমান, শফিক রহমান, বোন শামসুন নাহার, ভাগিনা শাহেদ কামাল নিপুসহ ২০ জন নিকট আত্মীয়কে আত্মসমর্পণের জন্য পুলিশের হেফাজতে পৌঁছে দিয়েছেন বদি নিজেই।

তবে, এখনপর্যন্ত নিজের আত্মসমর্পণের বিষয়টি স্বীকার না করলেও ভাই-বোনসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের আত্মসমর্পণের কথা স্বীকার করেছেন বদি। দুবাই পালিয়ে যাওয়া তার ভাই আব্দুর শুক্কুরও আত্মসমর্পণ করতে দেশে ফিরে এসেছেন বলে বদি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘যেহেতু সরকারের তৈরি করা ইয়াবা কারবারিদের তালিকায় আমার ভাই-বোন, ভাগিনাসহ স্বজনদের নাম রয়েছে, তাই আমি নিজেই তাদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছি।’

প্রতিটি তালিকায় তার নাম আছে, তাহলে তিনিও কি আত্মসমর্পণ করছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে বদি বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনা অনুসারেই আমি কাজ করছি।’

ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জড়িত থাকার বিষয় এতদিন কেন অস্বীকার করেছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে বদি বলেন, ‘আমরা একান্নবর্তী পরিবার। বিশাল পরিবারের সবাইকে পাহারা দেওয়া একার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার অজান্তেই পরিবারের অনেকেই বিপথে জড়িয়ে গেছেন।’

বদি ও তার স্বজনদের আত্মসর্পণের বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মাসুদ হোসেন বলেন, ‘শর্ত সাপেক্ষে ইয়াবা কারবারিদের সরকার স্বাভাবিক জীবনে সুযোগ দিতে চায়। এরইমধ্যে অনেক শীর্ষ ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণে রাজি হয়েছে। এরমধ্যে টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির আত্মীয়-স্বজনও আছে।’ বদির ভাই শুক্কুর তার দল-বল নিয়ে আত্মসমর্পণের জন্য দেশে ফিরেছেন বলেও তিনি জানান।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘তালিকাভুক্ত বা তালিকার বাইরের যত ইয়াবা কারবারি আছে, তাদের সবাইকে আত্মসমর্পণের আহবান জানানো হয়েছে।’ যারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করবে, তাদের শর্তসাপেক্ষে আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

উৎসঃ ‌সারাবাংলা

আরও পড়ুনঃ সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে টেনে হিঁচড়ে জবরদস্তি করে আদালতে আনা হচ্ছে


দীর্ঘ এক বছর ধরে কারাবন্দি অসুস্থ বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে টেনে হিঁচড়ে জবরদস্তি করে আদালতে আনা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।

তিনি বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের মা’ বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সাজানো মিথ্যা মামলায় এক বছর পরিত্যক্ত নির্জন কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছে। খালেদা জিয়ার বয়স ৭৩ বছর। প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ অসুস্থ শরীর। একা চলতে পারেন না। আদালতে বা হাসপাতালে আনতে গেলে হুইল চেয়ারই ভরসা। তারপরও টেনে হিঁচড়ে জবরদস্তি করে আনা হচ্ছে শেখ হাসিনার নির্দেশিত ক্যাঙ্গারু কোর্টে।’

রবিবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১১টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

রিজভী অভিযোগ করে বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার তাঁকে আদালত নামের কারাগারের আলো-বাতাসহীন ছোট্ট একটি রুমে এনে এক ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। তাঁর অসুস্থতা দিনে দিনে বাড়লেও চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না। পুরনো রোগগুলো বেড়ে গেছে। চোখেও প্রচণ্ড ব্যথা, পা ফুলে গেছে। নির্যাতন সহ্য করতে গিয়ে তাঁর পূর্বের অসুস্থতা এখন আরও গুরুতর রূপ ধারণ করেছে। তাঁকে বিশেষায়িত হাসপাতালের সুবিধা ও ব্যক্তিগত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের দ্বারা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা থেকেও বঞ্চিত করেছে শেখ হাসিনা। তাঁর আর্থরাইটিসের ব্যথা, ফ্রোজেন শোল্ডার, হাত নড়াচড়া করতে পারেন না। রিস্ট জয়েন্ট ফুলে গেছে, সার্ভাইক্যাল স্পন্ডিলোসিসের জন্য কাঁধে প্রচণ্ড ব্যথা, এই ব্যথা হাত পর্যন্ত রেডিয়েট করে। হিপ-জয়েন্টেও ব্যথার মাত্রা প্রচণ্ড। ফলে শরীর অনেক অসুস্থ, তিনি পা তুলে ঠিক মতো হাঁটতেও পারেন না।

‘তাঁর এই রকম শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও অমানবিকভাবে কারাগারের ভেতরে স্থাপিত ছোট্ট অপরিসর কক্ষের ক্যাঙ্গারু আদালতে ঘন ঘন হাজির করা হচ্ছে। মূলত: বেগম জিয়াকে আদালতে হাজির করার নামে টানা হেঁচড়া করে নির্যাতন করা হচ্ছে। চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকলেও তিলেতিলে শেষ করে দেয়ার জিঘাংসা চরিতার্থ করে চলেছে সরকার। আইনজীবীরা বলছেন, কারামুক্ত হতে চারটি মামলায় জামিন পেতে হবে। এই অবৈধ সরকারের হাত যেহেতু আইনের হাতের চেয়ে লম্বা, তাই সব নির্ভর করছে মিডনাইট ইলেকশনের প্রধানমন্ত্রীর ওপর।’

এসময় বিএনপির এই মুখপাত্র প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলতে চাই— দুই কোটি টাকার সাজানো মিথ্যা মামলায় যার সাথে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্টতা নেই, তাঁকে জেলখানা নামের ইঁদুর-তেলাপোকা ও পোকা-মাকড়ে উপদ্রুত স্যাঁতসেতে অন্ধকার ঘরে আর আটকে রাখবেন না। ঐ দুই কোটি টাকাতো সরকারের ছিল না। ছিল ব্যক্তিগত ট্রাস্টের। সেই দুই কোটি টাকা ব্যাংকে জমা আছে। তা এখন তিনগুন বেড়েছে। বেগম জিয়ার সংশ্লিষ্টতাহীন দুই কোটি টাকার মিথ্যা মামলায় সাজা দেয়ার নজীর নেই, যেখানে ন্যূনতম আইনের শাসন আছে। প্রধানমন্ত্রী, আপনি অনুগ্রহ করে ফেরাউন-নমরুদ-হিটলার অথবা কল্পরাজ্যের হীরকের রাজাকে টেক্কা দেয়ার প্রতিযোগিতা করবেন না। জালিম এ সমস্ত শাসকরা আজও মানুষের মধ্যে ধিক্কৃত। দুই কোটি টাকার মিথ্যা মামলায় এক বছর তো কারারুদ্ধ করে রাখা অন্যায়, অবিচার ও জুলুম। মিথ্যা দণ্ড দিয়ে তাঁকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার সাধ পূর্ণ করলেন, এবার মুক্তি দিন।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী— আপনি দেয়ালের ভাষা পড়ুন। চারদিকের মানুষ চোখে মুখে কি বলছে বোঝার চেষ্টা করুন। পৃথিবীটা ক্ষণিকের। কিন্তু কর্মফল অনন্তকালের। এখনো সময় আছে। এক বছরে বহু নির্যাতন বহু কষ্ট দিয়েছেন বেগম জিয়াকে। চিকিৎসার সুযোগটুকুও দেননি। এবার দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিন। কেবল বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর কেউ যখন শোনে দুই কোটি টাকার সাজানো মিথ্যা মামলার অজুহাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রীকে কারারুদ্ধ রাখা হয়েছে তখন তারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। অনেকে এটাকে শ্রেফ ক্ষমতার হিতাহিত জ্ঞানহীন নির্মম রসিকতা মনে করে।’

রিজভী বলেন, ‘হলমার্ক, সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের বিচার না করে দুই কোটি টাকার তথাকথিত প্রমাণহীন ও সংশ্লিষ্টতাহীন দুর্নীতির বিচারে ১০ বছর সাজা দেয়া হলো। রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুতের দুর্নীতির অভিযোগ তুলে যাতে কেউ মামলা করতে না পারেন সেজন্য জাতীয় সংসদে ইনডিমনেটি বিল পাস করা হয়েছে। দেশের উন্নয়নের নামে মেগা মেগা প্রকল্প গ্রহণ করে সেগুলো বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ এবং দফায় দফায় ব্যয় বৃদ্ধি কি দুর্নীতি নয়? খালেদা জিয়ার কারাদণ্ডে যে মন্ত্রীরা উৎফুল্ল তারা আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখেন কখনো? যারা লাখো কোটি টাকা পাচার করেছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, উল্টা তারাই জাতির দণ্ডমুণ্ডের কর্তা সেজেছেন।’

সংবাদ সম্মেলনে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুস সালাম, যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সহ-দফতর সম্পাদক মো. মুনির হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

উৎসঃ ‌ব্রেকিংনিউজ

আরও পড়ুনঃ ঢাকা উত্তর সিটির ১৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতা শামীম আহমেদের ভয়ংকর শাসন।


ঢাকা উত্তর সিটির ১৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ মাতবর। একই সঙ্গে তিনি ক্যান্টনমেন্ট থানা কমিউনিটি পুলিশিং কমিটিরও সাধারণ সম্পাদক। এই দুই পদের প্রভাব খাটিয়ে মানিকদী এলাকায় ‘ভয়ংকর শাসন কায়েম’ করেছেন তিনি।

শামীমের বিরুদ্ধে এলাকায় বাড়ি দখলের চেষ্টা, জমি দখল, চাঁদাবাজির একাধিক অভিযোগ রয়েছে। দেশের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজেই ‘আদালত’ বসিয়ে বিচারকাজ করছেন। এর মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। যারাই তাঁর ‘আদালতের’ বিচার মানছে না, তাদের ওপর নেমে আসছে নানা ধরনের হয়রানির খড়্গ। বিএনপির নেতা বানিয়ে একাধিক মামলায় ফাঁসিয়ে দিয়ে এলাকাছাড়া করেছেন বেশ কয়েকজনকে।

সম্প্রতি কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে আওয়ামী লীগ নেতা শামীম মাতবরের এমন ত্রাস সৃষ্টির তথ্য পাওয়া গেছে। শামীম নিজেই ‘আদালত’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব মানিকদীতে ৬২৫ নম্বরের বাড়িটির মালিক মৃত মোতাহার হোসেন। ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন জোয়ার সাহারা মৌজার আরএস ৬ নম্বর দাগে প্রায় ৫ শতাংশ জমির ওপর তিনতলা ভবন। মোতাহার হোসেনের মৃত্যুর পর ১৯৯৭ সালে তাঁর মেজ ছেলে মাকসুদ হোসেন টিপু বাড়িটি নির্মাণ করে মা ও ভাইবোনদের নিয়ে ২২ বছর ধরে ভোগদখল করে আসছেন। মোতাহার হোসেনের স্ত্রী রহিমা খানম জীবিত থাকতেই ২০১১ সালের ১ জানুয়ারি পারিবারিকভাবে বণ্টননামা করে সন্তানদের মধ্যে জমিজমা সম্পত্তি ভাগ করে দিয়ে যান। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর এই বণ্টননামা মানতে চাচ্ছেন না বড় ছেলে মোয়াজ্জেম হোসেন বিপু। ২০১৬ সালের ৭ জুলাই ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসের মাধ্যমে করা হয় একটি বণ্টননামা, সেটাও মানছেন না বিপু।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ নেতা শামীম আহমেদ মাতবরের সঙ্গে আঁতাত করে অন্য ভাই-বোনদের উচ্ছেদ করে পুরো বাড়িটি দখলে নিতে চান লন্ডনপ্রবাসী মোয়াজ্জেম হোসেন বিপু। তিনি বাংলাদেশে এসে এ বিষয়ে শামীম মাতবরের কাছে যান। শামীম মানিকদী বাজার এলাকায় তাঁর কার্যালয়ে পরিবারটির অন্যদের ডাকলেও তাঁরা যাননি। এরপর গত সেপ্টেম্বরে শামীম কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির প্যাডে একটি বণ্টননামা তৈরি করে দেন।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, শামীম মাতবরের রোষানলে পড়ে মাকসুদ হোসেন টিপু প্রায় তিন মাস ধরে এলাকাছাড়া। টিপুর ভাই বিপুর কাছ থেকে কম দামে বাড়িটি কিনে নিতেই টিপুকে মামলায় জড়িয়ে এলাকাছাড়া করেছেন।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাকসুদ হোসেন টিপু এলাকার কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। কখনো বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে ছিলেনও না। কিন্তু ওয়ার্ড বিএনপির কোষাধ্যক্ষ বানিয়ে তিনটি মামলায় আসামি করা হয়েছে তাঁকে। এর পেছনে ইন্ধন রয়েছে শামীম মাতবরের।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে মাকসুদ হোসেন টিপুকেও আসামি করা হয়েছে (৬১ নম্বর)। কিন্তু মামলার এজাহারে তাঁর নাম ছিল না। অভিযোগপত্রেও মাকসুদকে ওয়ার্ড বিএনপির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টিপু বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন।

কমিউনিটি পুলিশিং সার্ভিসেসের প্যাডে বণ্টননামা দলিল প্রসঙ্গে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে মাকসুদ হোসেন টিপু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বড় ভাই বিপুর পক্ষ নিয়ে অন্যায়ভাবে শামীম মাতবর ও তাঁর লোকজন বাড়িটি দখল নিতে চায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশ যেখানে জমির মালিকানা নিয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে না, এটার কোনো বিধান নেই। সেখানে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সেক্রেটারি হয়ে তাদের প্যাডেই বণ্টননামা দলিল করায় আমরা বিস্মিত এবং হতবাক।’

পরিবারের বড় বোন লুৎফুন নাহার বেলা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার ভাই বিপু খুব বেশি অন্যায় করছেন, পুলিশ যেখানে জমি নিয়ে কথা বলে না, সেখানে কমিউনিটি পুলিশের লোকজন দলিলও করে দেয়, এটা কিভাবে সম্ভব?’

স্থানীয় বাসিন্দা রহিম উদ্দিন আহমদ ও বেলাল উদ্দিন বলছিলেন, দলীয় পদের সঙ্গে শামীম এখন কমিউনিটি পুলিশিংয়েরও নেতা। এ পদের প্রভাব খাটিয়ে নিজেই আদালত বসিয়ে বিচার করছেন। ভয়ে এ ব্যাপারে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চায় না।

শামীমের এক চাচাতো ভাই নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির সাধারণ সম্পাদক হয়ে মানুষকে তাঁর কার্যালয়ে নোটিশ করে ডেকে বিচার-সালিস করছেন। কেউ তাঁর অন্যায় বিচার না মানলে নির্যাতন এবং হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।’

পূর্ব মানিকদী কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির প্যাডে জমির বণ্টননামা দলিল তাঁরা কিভাবে করলেন, সেটা তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন। বিষয়টি নিয়ে আমি থানায়ও গিয়েছিলাম; কিন্তু তারাও এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেনি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থানা কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘শামীম মাতবর ক্ষমতার জোরেই এটা করেছেন। বিপুর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে পুলিশিং কমিটির ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন তিনি।’

ক্যান্টনমেন্ট থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির সভাপতি সামসুল হক খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি আসলে জানতাম এটা করা যায় না। তবে ইচ্ছা করলে সেটা তারা না মানলেও হবে কিংবা ছিঁড়ে ফেলে দিতেও পারবে। আর টিপু আমার কাছে এলে আমি সমাধান করে দেব।’

এ ব্যাপারে শামীম মাতবর বলেন, ‘বণ্টননামা নিয়ে বিপুরা আমার কাছে এসেছিল। তাই করে দিয়েছি।’ টিপুকে বিএনপির নেতা বানানো বিষয়ে বলেন, ‘তারা তো নিজেরা নিজেরা কমিটি করে।’ টিপুকে বিএনপির কোনো কর্মসূচিতে দেখেছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাঁরা তো প্রকাশ্যে কর্মসূচিতে থাকে না।’

বিধবা ও প্রবাসীর জমি দখল

শামীম মাতবরের অপকর্মের বিষয়ে অনুসন্ধানকালে মানিকদী বাজার, পূর্ব মানিকদী ও পশ্চিম মানিকদী ঘুরে পাওয়া গেছে বেশ চাঞ্চল্যকর তথ্য। এর মধ্যে একজন বিধবার জমি দখল অন্যতম। শামীম মাতবরের দখলবাজির শিকার ঢাকা উত্তরের ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন মানিকদি বাজার এলাকার মৃত মো. হানিফ মিয়ার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম আঙ্গুর।

জানা গেছে, আনোয়ারার স্বামীর কেনা তিন শতাংশ নিচু জমি জোরপূর্বক বালু ভরাট করে দখলে নিয়েছেন শামীম। সেখানে ছাপরা তুলে নিজের নামে সাইনবোর্ডও টানিয়ে দিয়েছেন। একপ্রকার বাধ্য হয়ে প্রায় কোটি টাকার জমিটি বিক্রি করার জন্য বারবার ক্রেতা আনলেও শামীম মাতবর ও তাঁর লোকজন ভয়ভীতি দেখাচ্ছে এই বিধবাকে।

আনোয়ারা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার স্বামী নেভিতে সার্জেন্ট হিসেবে চাকরি করতেন। স্বামী জীবিত থাকতেই ডোবা জায়গায় তিন শতাংশ জমি কেনেন। সেই জমিটি সাত-আট বছর আগে শামীম মাতবর ও তার লোকজন বালু দিয়ে ভরাট করে এবং বিনিময়ে ৭০ হাজার টাকা দাবি করে। পরে ঘর তুলে নিজের নামে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেয়।’ তিনি বলছিলেন, মেয়েকে দেওয়ার পরিকল্পনা করলেও টাকার জন্য পারছেন না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আনোয়ারা বলেন, ‘আমার মতো একজন বিধবার জমিটি দখলে রাখছে শামীম। জমিটি বিক্রির জন্য অনেক চেষ্টা করছি, কিন্তু শামীমের জন্য বিক্রি করতে পারছি না।’

লোকমান খান ২৫ বছর ছিলেন সৌদি আরবে। প্রবাসে থেকে কষ্টের টাকায় দুই কাঠা জমি কিনেছিলেন পশ্চিম মানিকদি এলাকায়। সেখানে নিচু জমি ভরাট করে বাড়ি বানানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। তিন বছর আগে শামীম মাতবর ও তাঁর ক্যাডার বাহিনী এসে বাড়ি তৈরির কাজ বন্ধ করে দেয়। জমিটি নিজের দাবি করে আধাকাঠা জোর করে দখলে নিয়ে যান শামীম। শুধু তা-ই নয়, লোকমান খানের বাড়ি করার জন্য কেনা ইট-বালু-সিমেন্ট দিয়েই দেয়াল তুলে প্রায় ২৫ লাখ মূল্যের জমি দখল করেন।

জানতে চাইলে লোকমান খানের চোখে-মুখে আতঙ্ক ভর করে। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ভাই সেই জমি দখলের কথা আর কী বলব? শুধু আল্লাহর কাছে বিচার দিয়ে রাখছি। আমার অনেক পরিশ্রমের টাকায় কেনা জমি দখলে নিয়েছে। আমি আর বেশি কিছু বলতে পারব না। একই এলাকার আরো অনেকের জমি দখলে নিয়েছে কিংবা জমির পরিবর্তে টাকা নিয়েছে শামীম সিন্ডিকেটের লোকজন।’

বিধবার জমি দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে শামীম মাতবর কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে লোকমানের জমি দখল করে নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সেটা তাঁর পৈতৃক সম্পত্তির অংশ। সে কারণে দখলে নিয়েছেন তিনি।

বাড়ি থেকে বের হওয়ার রাস্তা দখল করে চাঁদাবাজি

মানিকদি বাজারের মানিক ফার্মেসির মালিক ও পল্লী চিকিৎসক সিদ্দিকুর রহমানের বাড়ি থেকে বের হওয়ার রাস্তা নিজের জমি দাবি করে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে শামীম মাতবর ও তাঁর লোকজন। শেষ পর্যন্ত নিরীহ সিদ্দিকুর রহমান ধারদেনা করে পাঁচ লাখ টাকা শামীমকে দিয়ে রাস্তায় চলাচলের সুযোগ পান। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টাকা দিয়েছি রাস্তার জন্য, সেই বিষয়ে এখন কিছু বলে বিপদে পড়তে চাই না।’

এ বিষয়ে শামীম বলেন, ‘আমাদের জমিতে রাস্তা করেছিলেন সিদ্দিকুর রহমান। সে জন্য টাকা নিয়েছি।’

মানিকদি বাজারের ষাটোর্ধ্ব সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এলাকায় ঘুরলে শামীম মাতবরের অনেক দখলবাজি আর চাঁদাবাজির ঘটনা পাবেন, তবে কেউ মুখ খুলতে চায় না।’

এলাকাবাসী বলছে, শামীম মাতবরের বাবা মমতাজ মাতবর ছিলেন খুবই ভালো মনের মানুষ। উনি মানুষের বিপদ-আপদে এগিয়ে যেতেন। অথচ তাঁর ছেলে হয়ে শামীম এলাকায় মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে উঠেছেন। আওয়ামী লীগের সুনাম নষ্ট হচ্ছে এই শামীমদের কারণে। দলের ওপর মহলের এ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত।

মামলায় আসামি করে হয়রানি

শুধু মাকসুদ হোসেন টিপুই নন, মানিকদি বাজারের সিঙ্গার শোরুমের ম্যানেজার ও স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমানও শামীম মাতবরের রোষানলের শিকার হয়ে মিথ্যা নাশকতা মামলার আসামি হয়েছেন। একইভাবে এলাকার ২০ জনের বেশি নিরীহ বাসিন্দাকে মামলায় জড়িয়ে দিয়েছেন। আরো কয়েকজনের কাছ থেকে মামলার ভয় দেখিয়ে আদায় করছেন টাকা।

উৎসঃ ‌কালের কণ্ঠ

আরও পড়ুনঃ আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ বেড়েছে ছয়গুণ


এ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে জানুয়ারি মাসে দেশে মোট ৬৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে ধর্ষণ ৪৮টি ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ১৯টি। গত বছরের একই সময়ে দেশে ১৯টি ধর্ষণ ও তিনটি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ ২০১৮ সালের জানুয়ারির তুলনায় এ বছরের জানুয়ারিতে দেশে ধর্ষণের ঘটনা তিনগুণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা প্রায় ছয়গুণ বেড়েছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের গবেষণায় উঠে আসা এই পরিসংখ্যানের বিষয়ে নারী নেত্রী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বিচারহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতির কারণে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। তাদের ভাষ্য, ধর্ষণ মামলা তদন্তে বা ভিকটিমের অভিযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও গাফিলতি হচ্ছে কিনা, তা মনিটরিং থাকতে হবে। কেননা, বিচার ব্যবস্থা সার্বিকভাবে জেন্ডার সংবেদনশীল না হওয়ায় পাওয়ার ম্যানুপুলেশনের সুযোগ থাকে।

বাংলা ট্রিবিউনের গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে দেশে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে মোট ৬৭টি। ২০১৮ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২২টি। ২০১৯ সালে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন ১৯ জন, এ সংখ্যা ২০১৮ সালের একই সময়ে ছিল তিনটি।

তিনটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের উপাত্ত নিয়ে এ গবেষণা করে বাংলা ট্রিবিউন। গবেষণায় পাওয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় এ বছরের শুরুতেই বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এ বছর ছাত্রী ও গৃহবধূরা ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বেশি। কর্মজীবী নারীদের মধ্যে পোশাক শ্রমিকরা বেশি ধর্ষণের শিকার হন। এই সহিংসতার শিকার হয়েছেন শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী নারীরাও।

২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ধর্ষণের খবর পাওয়া যায় ১৬টি জেলা থেকে, ২০১৯ সালের একই সময়ে ৩৫টি জেলা এ ধরনের সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।

গবেষণায় পাওয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার তুলনামূলক চিত্রও বেশ উদ্বেগজনক। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ৩১ জন শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয় ২১ জন, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয় তিন জন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭ জনকে। অন্যদিকে, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে সাতটি শিশু এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়, এর মধ্যে দু’টি শিশুকে হত্যা করা হয়।

নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর মনে করেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে ধর্ষণের ঘটনা কমছে না। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে যে ধর্ষণের খবরগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তার কয়টির বিচার হয়েছে। ধর্ষণের মতো ফৌজদারি অপরাধ করে যখন ধর্ষক পার পেয়ে যায়, তখন তা অপরাধকে উৎসাহিত করে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ধর্ষণ কমবে— এমনটা আশা করা ঠিক না।’

রোকেয়া কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রথমত, ধর্ষণের ঘটনার বিচার হতে হবে। দ্বিতীয়ত, ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে ভিকটিম যেন নির্ভয়ে বিচার চাইতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সংখ্যাগতভাবে ধর্ষণ বাড়ছে দুটো কারণে। এক. আগে ধর্ষণের সংবাদ পত্রিকায় কম আসতো। আরেকটি হলো সমাজে অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিচারহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতির কারণে অপরাধপ্রবণতা বেড়েছে। এমন অপরাধের (ধর্ষণ) ক্ষেত্রে বিচার না হওয়া, অপরাধী পার পেয়ে যাওয়ার পরিমাণ বাড়ছে।’

ধর্ষণ ঘটনার খুব কমই বিচার হয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, বিচার হলেও অভিযুক্ত খালাস পেয়ে যাচ্ছে। সাক্ষীর অভাব, বাদীর অনীহা, পুলিশের গাফিলতিতে দুর্বল চার্জশিট দেওয়া ইত্যাদি কারণে ধর্ষণ প্রমাণ কঠিন হয়। সমাজের মধ্যে এ ধরনের অপরাধের ব্যাপারে মানুষ সোচ্চার হলেও ভিকটিমকে ইতিবাচকভাবে দেখা হয় না। নারীকে অবহেলার চোখে দেখা হয়।’

বেশ কিছু করপোরেট অফিস থেকে নারী নির্যাতনের খবর আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নারীরা আসলে রাস্তা-বাড়ি-কর্মক্ষেত্র কোথাও নিরাপদ না। এটি ব্যাপকতা পেয়েছে। একজন নারী, সে যদি অফিসেও যৌন হয়রানির শিকার হন, সেখানেও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম বলেন, ‘পিতৃতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা নারীকে সম্মানের জায়গায় অধিষ্ঠিত হতে বাধা দেয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ধর্ষণরোধে আইন হতে হবে এবং ধর্ষণের সংজ্ঞা নিয়ে বর্তমান বাস্তবতাকে মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। বিচার না হওয়ার কারণে অপরাধ দ্বিগুণ-তিনগুণ হবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিচার হবে কী করে, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। সাক্ষীর নিরাপত্তার কোনও জায়গা আমরা রাখিনি। অথচ, ভিকটিমের সাক্ষী লাগবে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার মেডিক্যাল পরীক্ষা হতে হবে, কিন্তু আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সবসময় সেই সহযোগিতা নিশ্চিত করা যায় না। তাহলে কীভাবে প্রতিকার মিলবে?’

আয়েশা খানম বলেন, ‘ধর্ষণ মামলা তদন্তে বা ভিকটিমের অভিযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও গাফলতি হচ্ছে কিনা, সেই বিষয়ে মনিটরিং থাকতে হবে। বিচার ব্যবস্থা সার্বিকভাবে জেন্ডার সংবেদনশীল না, ফলে পাওয়ার ম্যানুপুলেশনের সুযোগগুলো থাকে। নারী ভিকটিম হলে তাকে ইতিবাচক সহায়তা দেওয়ার বদলে কোন কোন কারণে তার ধর্ষণ জায়েজ, সমাজ এখনও সেদিকেই বেশি মনোযোগ দেয়। এসব বদলাতে অপরাধকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে তার বিচার হতে হবে।’

উৎসঃ ‌banglatribune

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here