বিএনপির নীতি নির্ধারণী বৈঠকে যে সিদ্ধান্ত এল

0
101

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে প্রথমবারের মতো স্কাইপিতে যুক্ত হন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে অনেকগুলো বিষয়ে আলোচনা হয়, সিদ্ধান্ত আগে বেশ কিছু বিষয়ে।

বৈঠকে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা, চিকিৎসা নিতে তার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে না আসা, তার মুক্তিতে আইনি প্রক্রিয়া, সদ্য সমাপ্ত ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের ভরাডুবি, উপজেলা নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে করণীয়, দল পুনগর্ঠন, অঙ্গ-সংগঠনের কমিটি গঠন, ভবিষ্যত করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া ২০-দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিএনপি গাঁটছড়ার লাভ-ক্ষতির নিয়েও আলোচনা হয়।

তারেক রহমান এসব আলোচনা মন দিয়ে শোনেন। শেষ পর্যায়ে তিনি সুচিন্তিত মত দেন।

বুধবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে রাত ৭টা থেকে বৈঠকটি শুরু হয়। আড়াই ঘণ্টাব্যাপী রুদ্ধদ্বার এ বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দলের সাংগঠনিক অবস্থার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। বৈঠকের শেষ দিকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন।

বিএনপির রাজনীতি যেন শুধু জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে সে বিষয়টি খেয়াল রাখার তাগিদ দিয়েছেন কেউ কেউ। বিএনপি ঐক্যফ্রন্টের ‘পেটে ঢুকে পড়েছে’ এমন মন্তব্য করে দলটিকে জোটনির্ভর না হয়ে স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার পক্ষে মত দিয়েছেন অনেকেই।

পাশাপাশি জামায়াত বিএনপির জন্য বোঝা হয়ে পড়েছে, এমন মতও উঠে এসেছে বৈঠকে। বৈঠকসূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

তারেক রহমানের উপস্থিতিতে (স্কাইপিতে) বৈঠকে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মত দেন যে, বিএনপির রাজনীতি এখন অনেকটাই জোটকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। ২০-দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে বের হতে হবে। এ জন্য নিজেদের মেধা, শ্রম ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সংগঠন শক্তিশালী করার বিষয়ে তারা একমত পোষণ করেছেন।

সূত্র জানায়, বৈঠকে দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের নাম উল্লেখ না করে তার সমালোচনা করে বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল নাকি ভুল ছিল, তা ইতিহাস একদিন তুলে ধরবে। তবে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা প্রধানমন্ত্রী হবেন এ আশায় নির্বাচনের কোনো পরিকল্পনা ও বাস্তবতাকে বাদ দিয়ে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন। তখন ওই নেতাকেই তাদের শীর্ষ নেতা হিসেবে মেনে নেয়া উচিত ছিল কিনা এমন প্রশ্ন তুলেন তিনি।

বিএনপি ওই নেতার সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়ে ৩০ ডিসেম্বরের ভোটে গিয়েছিল, এমন মত দিয়ে তিনি আরও বলেন, বিএনপির নেতাদের বাইরে তার (ঐক্যফ্রন্টের ওই নেতা) সিদ্ধান্তে নির্বাচনে যাওয়া হয়েছিল।

বিএনপিকে স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এখন নির্বাচন শেষ। এ নির্বাচনে যা অর্জন হওয়ার তা হয়েছে। তাই এবার এসব ঐক্যফ্রন্ট রাজনীতিকে বন্ধ করে নিজেদের সমতা বাড়াতে হবে। দলকে গোছাতে হবে। সারা দেশে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াতে হবে বলেও তিনি মনে করেন।

দলের আরেকজন স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, বিএনপির রাজনীতি এখন ঐক্যফ্রন্টমুখী হয়ে গেছে। এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। যদিও তাদের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তারেক রহমান কিছু বলেননি।

সূত্রে জানা গেছে, ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করা সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার বিষয়টি আলোচনায় তোলেন একজন সদস্য। এই প্রসঙ্গ উঠলে অন্যরাও ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতার সমালোচনা করেন। তার পর সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন কতটুকু সঠিক ছিল তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। এ বিষয়েও তারেক রহমান কিছু বলেননি।

আরেকজন স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জামায়াতকে জোটে রাখার বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, জামায়াত নানা কারণে বিএনপির জন্য দায় হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া কয়েক বছর আগে যে বাস্তবতায় জামায়াতের সঙ্গে জোট করা হয়েছিল সেটি আর এখন নেই। এখন জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তি নেই। আন্দোলনেও তাদের পাশে পাওয়া যায় না। এমতাবস্থায় তাদের জোটে রেখে লাভ নেই বলে মত দেন তিনি।

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য জামায়াত প্রসঙ্গে বলেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছেন। জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত বিতর্কের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এসব প্রচার করা হয়েছে। একটি দেশের নাম উল্লেখ করে ওই নেতা বলেন, ওই দেশটি নানা অজুহাতে বিএনপিকে নসিহত করলেও তারা আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে কখনও কিছু করবে না। তাই জামায়াত বিষয়ে সরকার কোনো কিছু না করলে বিএনপির পক্ষ থেকেও কিছু করা ঠিক হবে না।

নেতাদের বক্তব্যের একপর্যায়ে তারেক রহমান বক্তব্য রাখেন। তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতা ছাড়াও জেলাপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য পরামর্শ দেন। এর পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবীর সঙ্গেও নিজেদের সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়ে বক্তব্য রাখেন।

সূত্র জানায়, বৈঠকে আরেকজন স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে নিয়মিত স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও এখন আর তা হচ্ছে না। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হচ্ছে। তার ওই বক্তব্যের পর সপ্তাহে অন্তত একবার বৈঠক করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

দলের একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, বিএনপির রাজনীতি এখন ঐক্যফ্রন্টমুখী হয়ে গেছে। এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। যদিও তাদের এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তারেক রহমান কিছু বলেননি।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, দলের স্থায়ী কমিটির দুজন নেতা বৈঠকে বলেন, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথের আন্দোলনেও নামতে হবে। তবে এর আগে দলের বিভিন্ন জেলার মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো এবং অঙ্গ সংগঠনগুলোকে পুনর্গঠন করা জরুরি।

নেতাদের বক্তব্যের একপর্যায়ে তারেক রহমান বক্তব্য রাখেন। তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতা ছাড়াও জেলাপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য পরামর্শ দেন। এর পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবীর সঙ্গেও নিজেদের সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়ে বক্তব্য রাখেন।

বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ বিএনপির জেষ্ঠ নেতাদের বৈঠকে স্কাইপিতে যুক্ত হন তারেক রহমান


বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্কাইপিতে যুক্ত হন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বক্তব্য মনোযোগসহ শুনেছেন। পরে তিনি নিজের মত দিয়েছেন। তিনি সংকটময় মুহূর্তে নেতাদের করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

বুধবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে রাত ৭টায় বৈঠকটি শুরু হয়। আড়াই ঘণ্টাব্যাপী রুদ্ধদ্বার এ বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দলের সাংগঠনিক অবস্থার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন।

বৈঠকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও জামায়াত ইস্যুকে প্রাধান্য দিয়ে নেতারা তাদের মতামত তুলে ধরেন। এর বাইরে ডাকসু নির্বাচন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও মামলা প্রসঙ্গেও নেতারা বক্তব্য রাখেন। নেতাদের এসব বক্তব্যের সারমর্ম তৈরি করে দুই-একদিনের মধ্যে তারেক রহমানকে পাঠানোর জন্যও সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বৈঠকে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ সারমর্ম তৈরি করবেন।

বিএনপির রাজনীতি যেন শুধু জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে সে বিষয়টি খেয়াল রাখার তাগিদ দিয়েছেন কেউ কেউ। বিএনপি ঐক্যফ্রন্টের ‘পেটে ঢুকে পড়েছে’ এমন মন্তব্য করে দলটিকে জোট নির্ভর না হয়ে স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার পক্ষে মত দিয়েছেন অনেকেই।

পাশাপাশি জামায়াত বিএনপির জন্য বোঝা হয়ে পড়েছে এমন মতও উঠে এসেছে বৈঠকে। বৈঠকসূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

দলের একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, বিএনপির রাজনীতি এখন ঐক্যফ্রন্টমুখী হয়ে গেছে। এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। যদিও তাদের এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তারেক রহমান কিছু বলেননি।

সূত্রে জানা গেছে, ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করা সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার বিষয়টি আলোচনায় তোলেন একজন সদস্য। এ প্রসঙ্গ উঠলে অন্যরাও ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতার সমালোচনা করেন। তার পর সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন কতটুকু সঠিক ছিল তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, দলের স্থায়ী কমিটির দুজন নেতা বৈঠকে বলেন, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথের আন্দোলনেও নামতে হবে। তবে এর আগে দলের বিভিন্ন জেলার মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো এবং অঙ্গ সংগঠনগুলোকে পুনর্গঠন করা জরুরি।

বৈঠক তারেক রহমান তেমন কথা না বললেও দলের স্থায়ী কমিটির নেতাদের জেলাপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে মা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কেও জানতে চেয়েছেন।

বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ঐক্যফ্রন্টের কড়া সমালোচনা


বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কড়া সমালোচনা হয়েছে। ফ্রন্টের একজন শীর্ষ নেতার বিষোদগার করেছেন স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য।

বিএনপির রাজনীতি যেন শুধু জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে সে বিষয়টি খেয়াল রাখার তাগিদ দিয়েছেন কেউ কেউ। বিএনপি ঐক্যফ্রন্টের ‘পেটে ঢুকে পড়েছে’ এমন মন্তব্য করে দলটিকে জোটনির্ভর না হয়ে স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার পক্ষে মত দিয়েছেন অনেকেই।

পাশাপাশি জামায়াত বিএনপির জন্য বোঝা হয়ে পড়েছে, এমন মতও উঠে এসেছে বৈঠকে। বৈঠকসূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

বুধবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে রাত ৭টা থেকে বৈঠকটি শুরু হয়। আড়াই ঘণ্টাব্যাপী রুদ্ধদ্বার এ বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দলের সাংগঠনিক অবস্থার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্কাইপির মাধ্যমে বৈঠকে সংযুক্ত হন। তিনি সব নেতার বক্তব্য শোনেন। পরে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন।

বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মত দেন যে, বিএনপির রাজনীতি এখন অনেকটাই জোটকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। ২০-দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে বের হতে হবে। এ জন্য নিজেদের মেধা, শ্রম ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সংগঠন শক্তিশালী করার বিষয়ে তারা একমত পোষণ করেছেন।

বৈঠকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও জামায়াত ইস্যুকে প্রাধান্য দিয়ে নেতারা তাদের মতামত তুলে ধরেন। এর বাইরে ডাকসু নির্বাচন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও মামলা প্রসঙ্গেও নেতারা বক্তব্য রাখেন। নেতাদের এসব বক্তব্যের সারমর্ম তৈরি করে দুই-একদিনের মধ্যে তারেক রহমানকে পাঠানোর জন্যও সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বৈঠকে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ সারমর্ম তৈরি করবেন।

সূত্র জানায়, বৈঠকে দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের নাম উল্লেখ না করে তার সমালোচনা করে বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল নাকি ভুল ছিল, তা ইতিহাস একদিন তুলে ধরবে। তবে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা প্রধানমন্ত্রী হবেন এ আশায় নির্বাচনের কোনো পরিকল্পনা ও বাস্তবতাকে বাদ দিয়ে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন। তখন ওই নেতাকেই তাদের শীর্ষ নেতা হিসেবে মেনে নেয়া উচিত ছিল কিনা এমন প্রশ্ন তুলেন তিনি।

বিএনপি ওই নেতার সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়ে ৩০ ডিসেম্বরের ভোটে গিয়েছিল, এমন মত দিয়ে তিনি আরও বলেন, বিএনপির নেতাদের বাইরে তার (ঐক্যফ্রন্টের ওই নেতা) সিদ্ধান্তে নির্বাচনে যাওয়া হয়েছিল।

বিএনপিকে স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এখন নির্বাচন শেষ। এ নির্বাচনে যা অর্জন হওয়ার তা হয়েছে। তাই এবার এসব ঐক্যফ্রন্ট রাজনীতিকে বন্ধ করে নিজেদের সমতা বাড়াতে হবে। দলকে গোছাতে হবে। সারা দেশে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াতে হবে বলেও তিনি মনে করেন।

দলের আরেকজন স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, বিএনপির রাজনীতি এখন ঐক্যফ্রন্টমুখী হয়ে গেছে। এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। যদিও তাদের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তারেক রহমান কিছু বলেননি।

সূত্রে জানা গেছে, ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করা সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার বিষয়টি আলোচনায় তোলেন একজন সদস্য। এই প্রসঙ্গ উঠলে অন্যরাও ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতার সমালোচনা করেন। তার পর সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন কতটুকু সঠিক ছিল তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

আরেকজন স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জামায়াতকে জোটে রাখার বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, জামায়াত নানা কারণে বিএনপির জন্য দায় হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া কয়েক বছর আগে যে বাস্তবতায় জামায়াতের সঙ্গে জোট করা হয়েছিল সেটি আর এখন নেই। এখন জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তি নেই। আন্দোলনেও তাদের পাশে পাওয়া যায় না। এমতাবস্থায় তাদের জোটে রেখে লাভ নেই বলে মত দেন তিনি।

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য জামায়াত প্রসঙ্গে বলেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছেন। জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত বিতর্কের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এসব প্রচার করা হয়েছে। একটি দেশের নাম উল্লেখ করে ওই নেতা বলেন, ওই দেশটি নানা অজুহাতে বিএনপিকে নসিহত করলেও তারা আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে কখনও কিছু করবে না। তাই জামায়াত বিষয়ে সরকার কোনো কিছু না করলে বিএনপির পক্ষ থেকেও কিছু করা ঠিক হবে না।

নেতাদের বক্তব্যের একপর্যায়ে তারেক রহমান বক্তব্য রাখেন। তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতা ছাড়াও জেলাপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য পরামর্শ দেন। এর পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবীর সঙ্গেও নিজেদের সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়ে বক্তব্য রাখেন।

সূত্র জানায়, বৈঠকে আরেকজন স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে নিয়মিত স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও এখন আর তা হচ্ছে না। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হচ্ছে। তার ওই বক্তব্যের পর সপ্তাহে অন্তত একবার বৈঠক করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ গ্যাসের দাম বাড়াতে গণশুনানির নামে সরকার প্রতারণা করছে: আমীর খসরু মাহমুদ


গ্যাসের দাম বাড়াতে গণশুনানির নামে সরকার প্রতারণা করছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ মিলনায়তনে বাংলাদেশ জাতীয় দলের উদ্যোগে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ১৩তম কারাবন্দি দিবস উপলক্ষে এই আলোচনা সভা হয়।

তিনি বলেন, গ্যাসের দাম বারবার বাড়াচ্ছে। গণশুনানির নাম দিয়ে গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে। এর থেকে বড় প্রতারণা কী হতে পারে?

সরকারি পরিসংখ্যান তুলে ধরে খসরু বলেন, ১০ বছরে বাংলাদেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে, মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। তার ওপরে আপনি বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে, গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছেন।

এর ফলে দরিদ্র মানুষ, নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের জীবনযাত্রার মান কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। যেহেতু সরকারের জবাবদিহি নেই তাই তারা প্রত্যেকটা জিনিসের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, কয়েক শতাংশ মানুষের হাতে বাংলাদেশের মানুষের সব সম্পদ পুঞ্জিভূত হচ্ছে। এরা হাজার কোটি লক্ষ কোটি টাকার মানুষ হয়ে যাচ্ছে। এরা কারা আমরা সবাই জানি। এদের জন্য সরকারের সব নীতিমালা প্রণীত হচ্ছে। এদের সুবিধার্থে সরকার পরিচালিত হচ্ছে।

খসরু বলেন, এরাই কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য করছে , দেশও পরিচালনা করছে ওরা, দেশের সব নীতিমালা-সিদ্ধান্ত তারাই নিচ্ছে। দেশের মানুষের সঙ্গে এর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কারণ মানুষের তো মালিকানাই নেই। এই অবস্থায় গিয়ে আমরা যে পৌঁছেছি এটা হচ্ছে নিম্নগামী একটা যাত্রা। এটা কোথায় গিয়ে ক্রাস করবে আমরা কেউ জানি না।

সংগঠনের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী, নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, জেবা আমিন খান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। সরকার দিশেহারা হয়ে গেছে এমন মন্তব্য করে খসরু বলেন, যারা ক্ষমতা দখল করেছে তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) আজকে দিশেহারা। তাদের অ্যাকশন যেগুলো দেখছেন- এগুলো হচ্ছে দিশেহারা অবস্থানের অ্যাকশন। কারণ মানুষ যখন নিজের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে তখন তার প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করে না, তাকে ধ্বংস করে দিতে চায়। কারণ সে রাজনৈতিকভাবে প্রকাশ করতে পারছে না বিধায় তাকে ধ্বংস করতে চায়। এ জন্য খালেদা জিয়াকে ধ্বংস করতে হবে, তারেক রহমানকে ধ্বংস করতে হবে।

তিনি বলেন, সরকার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকার কোনো সুযোগ নেই। তারা জনগণের ভোটে যখন নির্বাচিত হবে না তখন রাতে তাদের ব্যালট বাক্স ভর্তি করতে হবে, পরের দিন তাদের পোলিং স্টেশন দখল করতে হবে এবং সেই কাজ করার জন্য তারা একটি প্রকল্প সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে আপনারা সেটা দেখেছেন।

খসরু বলেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির সামনে আজকে তাদের (আওয়ামী লীগ) টিকে থাকার সুযোগ নেই। আজকে আমরা (বিএনপি) অনেক বেশি শক্তিশালী। আমাদের নেতাকর্মীদের ত্যাগ-তিতিক্ষা তারা বারবার প্রমাণ করেছে এবং ইদানীং যেসব নির্বাচন হয়েছে সেখানেও তারা প্রমাণ করেছে। বর্তমান সংকটে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থেকে নাগরিক কর্তব্য জোরদার করার আহ্বানও জানান তিনি।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ রাশেদকে গুলি করে হত্যার হুমকিতে অসুস্থ রাশেদের মা


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা রাশেদ খানকে গুলি করে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বুধবার সন্ধ্যায় তার ঝিনাইদহের বাড়িতে গিয়ে এ হুমকি দেয়া হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনের এই যুগ্ম আগ্কায়কই এ অভিযোগ করেছেন।

এদিকে ছেলেকে গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন রাশেদের মা সালেহা বেগম। তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর তিনি জ্ঞান ফিরে পান। বর্তমানে তিনি ঝিনাইদহ ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

রাশেদ খান বুধবার রাতে গণমাধ্যমকে বলেন, বুধবার সন্ধ্যায় দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় চরমুরাড়ীদহ গ্রামে তার বাড়িতে যান। তারা তার মা–বাবাকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘রাশেদ আন্দোলন করছে এবং সরকারবিরোধী কথাবার্তা বলছে। তাকে শেষবারের মতো সতর্ক করে দেয়া হচ্ছে। এর পর সে এসব করলে তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হবে। পরিবারের সদস্যরা তাদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা না দিয়ে ফিরে যান।’

এ ঘটনার পর রাশেদের মা সালেহা বেগম অচেতন হয়ে পড়েন। তাকে ঝিনাইদহের একটি হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে আড়াই ঘণ্টা পর তার চেতনা ফিরে আসে। বর্তমানে তিনি ঝিনাইদহ ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা রাশেদ খান বলেন, আপনারা আমার মায়ের জন্য দোয়া করবেন।

তিনি আরও বলেন, এর আগেও আমাকে এমন হুমকি দেয়া হয়েছিল।

ঝিনাইদহ সদর থানার ওসি মিজানুর রহমান খান বলেন, এ ব্যাপারে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। রাশেদের পরিবারের পক্ষ থেকেও কিছু জানানো হয়নি।

রাশেদ চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা প্লাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক। তিনি এ পরিষদের ব্যানারে ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে জিএস পদে নির্বাচন করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর কাছে হেরে যান।

দীর্ঘ ২৮ বছর পর ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে ২৫টি পদের মধ্যে দুটি ছাড়া সব পদে জয় পায় ছাত্রলীগ।ভোটের দিনই নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ভোট বর্জন করে ছাত্রলীগ ছাড়া সব প্যানেল। এরা হলো- ছাত্রদল, বামজোট, ইসলামী আন্দোলন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জোট ও সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। এর পর থেকে তারা পুনর্নির্বাচন দাবিতে বিক্ষোভ করছে। এ বিক্ষোভে রাশেদও আছেন। গতকাল বুধবার তিনি রাজু ভাস্কর্যে বক্তৃতাও করেন।

এই নির্বাচনে রাশেদ জিএস পদে নির্বাচন করেন। রাশেদ জিততে না পারলেও ভিপি পদে জয় পান তার সহপাঠী নুরুল হক নুর। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক শোভনকে ১৯৩৩ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ ডাকসু নির্বাচন সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে ছাত্রদলের ভরাডুবি


নেতৃত্বে অছাত্র, প্যানেল গঠনে জটিলতা, ১০ বছর ধরে ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের সুযোগ না থাকাও বিপর্যয়ের কারণ * নেতাদের দাবি- অনিয়ম ও কারচুপি না হলে ছাত্রদলের প্যানেলই জয়ী হতো

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদল প্রার্থীদের ভরাডুবিতে বিস্মিত সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। একটি পদেও জয়ী হতে পারবে না- এটা তারা কল্পনাও করতে পারেননি।

সাংগঠনিক দুর্বলতাসহ বেশ কয়েকটি কারণে এই ভরাডুবি বলে মনে করছেন অনেকে। এ নিয়ে অসন্তোষ বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও।

মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মতে, ছাত্র অধিকার সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে ছাত্রদল সক্রিয় ছিল না। আবার সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির প্রায় সবাই অছাত্র।

গত দশ বছরে ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে না পারায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি, প্যানেল গঠনে জটিলতা ও যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া ভোটে অংশ নেয়ার ফলে ডাকসু নির্বাচনে অকল্পনীয় বিপর্যয় হয়েছে।

তবে ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের দাবি- ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির কারণে তাদের প্রার্থীরা বিজয়ী হতে পারেননি। ছাত্রদলের ভিপি ও জিএস পদে যে ভোট পড়েছে তাতে এ সন্দেহের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। ভিপি পদে মাত্র ২৪৫ ভোট পড়েছে। তাহলে সংগঠনের নেতাকর্মীরা কি ভোট দেননি?

সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজিব আহসান যুগান্তরকে বলেন, ‘এবারের ডাকসু নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এ ধরনের কলঙ্কময় ঘটনা এর আগে ঘটেনি। এটা শুধু ছাত্রদল নয়, ছাত্রলীগ বাদ দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী ও সব ছাত্র সংগঠনের উপলব্ধি। শিক্ষকসমাজ, বিগত দিনে যারা ডাকসু নেতৃত্ব দিয়েছেন- সবাই এ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।’

ছাত্রদলের সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে ছাত্রলীগের ভূমিকা যদি সাংগঠনিক হতো, তাহলে ছাত্রদলের সাংগঠনিক অবস্থা পাওয়া যেত। ছাত্রদল দুর্বল থাকলে তারা সেভাবেই নির্বাচনের আয়োজন করত।’

১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের জেরে ডাকসুতে বড় বিজয় পেয়েছিল। কিন্তু সোমবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ছাত্রদল ডাকসুর ২৫টি পদের একটিতেও জয় পায়নি। এমনকি প্রার্থীদের মধ্যে সম্পাদকীয় একটি পদ ছাড়া কেউ হাজারের ওপরে ভোট পাননি।

১২টি সম্পাদকীয় পদের মাত্র একটিতে ছাত্রদলের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পেরেছেন। কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া বিষয়ক সম্পাদক পদে প্রার্থী কানেতা ইয়া লাম-লাম ৭ হাজার ১১৯ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন।

ভিপি পদে এই সংগঠনের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ২৪৫ ভোট পেয়ে পঞ্চম হয়েছেন। জিএস প্রার্থী আনিসুর রহমান খন্দকার ৪৬২ ভোট পেয়ে ষষ্ঠ হয়েছেন। আর এজিএস প্রার্থী খোরশেদ আলম সোহেল পেয়েছেন মাত্র ২৯৪ ভোট।

এ ছাড়া ১৮টি হল সংসদের কোনো পদেও ছাত্রদল জয় পায়নি। প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও ছিল না। হল সংসদগুলোতে ২৩৪টি পদের বিপরীতে ছাত্রদলের প্রার্থী ছিলেন মাত্র ৫৪ জন।

এ প্রসঙ্গে ছাত্রদল প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কিরকম নির্বাচন হয়েছে, তা সবাই দেখেছেন। ১০ তারিখ রাতেই ব্যালট পেপারে সিল দেয়া হয়েছে ছাত্রলীগকে জেতানোর জন্য। সকালে ভোটের আগেই কুয়েত মৈত্রী হল থেকে সিল মারা ব্যালট উদ্ধার করা হয়েছে। অনেকে ভোটই দিতে পারেননি, সে জায়গায় ৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে অনেকে জয়ী হয়েছেন। তাদের বিজয়ী দেখানো হয়েছে। কারচুপির মাধ্যমে পুরোপুরি নীলনকশার নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, তফসিল ঘোষণার পর ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে ছাত্রদলে দ্বিধাবিভক্তি ছিল। সুষ্ঠু ও অবাধ ভোট নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অধিকাংশ নেতা নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিরোধিতা করেন।

কেন্দ্রীয় একজন যুগ্ম সম্পাদক যুগান্তরকে বলেন, যারা ডাকসু নির্বাচনে যাওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন তারা ছিলেন অছাত্র ও বয়স্ক নেতা। যারা এবার ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেবেন তাদের মধ্যে থেকেই হয়তো ভবিষ্যতে ছাত্রদলের কমিটিতে শীর্ষ পদে নেয়া হবে- এমন আশঙ্কা থেকে তারা বিরোধিতা করেছিলেন।

এ নিয়ে ছাত্রদলের সিনিয়র-জুনিয়র নেতাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বৈঠকও করেছিলেন। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে ওই বৈঠকে ডাকসু নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ওই সময় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছাত্রদল নেতাদের বলেন, ‘দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো ধরনের কর্মকাণ্ড কেউ করতে চাইলে পদত্যাগ করে করতে হবে।’

সূত্র জানায়, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে ছাত্রদল নেতাদের বৈঠকের আগেই বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ডাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। নীতিনির্ধারকদের যুক্তি ছিল- ঢাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের সহাবস্থান নিশ্চিত করার জন্য ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেয়া জরুরি। বিএনপির সিদ্ধান্ত গ্রহণের দীর্ঘসূত্রতার কারণে একেবারে শেষ দিনে ছাত্রদলের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দেন।

ছাত্রদলের একাধিক শীর্ষ নেতা জানান, ডাকসু নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ার পর প্রার্থী নিয়ে জটিলতা শুরু হয়। বয়সসীমা বেঁধে দেয়ায় ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় এবং ঢাবি কমিটির কোনো নেতা প্রার্থী হতে পারেননি। জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির ফল বিপর্যয়ের কারণে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের অনেক যোগ্য নেতা প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ দেখাননি।

শেষ পর্যন্ত বিকল্প না থাকায় সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখার সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমানকে ভিপি, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক আনিসুর রহমান খন্দকার অনিককে জিএস ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক খোরশেদ আলম সোহেলকে এজিএস প্রার্থী করে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করে সংগঠনটি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের একজন সহসভাপতি যুগান্তরকে বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে আমাদের প্রার্থীরা প্রচারের সময়ও তেমন পাননি। তারপর আবার প্রচারে সমন্বয়হীনতাও ছিল। হল পর্যায়ের নেতাকে ডাকসুর প্রার্থী করায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে তারা অপরিচিত ছিলেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘ছাত্রদল প্রার্থীদের জয়ী করার ক্ষেত্রে সিনিয়র নেতাদের আন্তরিকতার অভাবও ছিল। কারণ, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩ হাজারের মতো অনাবাসিক ছাত্র ছিল। তাদের ফোন নম্বর সংগ্রহ করে তাদের বাসায় গিয়ে অথবা ফোন করে যোগাযোগ করা যেত। কিন্তু এ ব্যাপারে কেউ আগ্রহই দেখাননি। অনাবাসিক ভোটারদের টার্গেট করা হলে ছাত্রদলের প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয় পেত। যেখানে ডাকসুর ভিপি পদে ১১ হাজার ৬২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।

ডাকসু নির্বাচন পরিচালনায় বিএনপি গঠিত কমিটির এক নেতা জানান, দেশে সুস্থ রাজনীতি না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী বিএনপি মনোভাবাপন্ন হলেও সরাসরি রাজনীতিতে আসতে চাইছেন না। শিক্ষাজীবন শেষে সরকারি চাকরির সুবিধার জন্যই তারা এমনটা করছেন। আবাসিক হলের নেতাকর্মীরা হলে থাকার সুবিধার জন্য প্রকাশ্যে সমর্থন দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এ রকম জটিল পরিস্থিতিতে তাদের নির্বাচনে যেতে হয়েছে।

ছাত্রদলের প্যানেল ঘোষণার জটিলতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে জয়লাভের জন্য নয়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ক্যাম্পাসে যেতে পারবে, রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে পারবে, নিজেদের অবস্থান জানান দিতে পারেবে- এই চিন্তা থেকে ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেয়া। ছাত্রদলের রাজনীতিতে প্রকাশ্যে কেউ অংশগ্রহণ করতে না পারলেও নীরব সমর্থক ভোট রয়েছে। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে ছাত্রলীগের কার্যক্রমের ওপর বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্রদল প্যানেলকে সমর্থন করবে- এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির বিরোধিতার পরও তারা নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে মত দেন।’

এদিকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় তিন বছর আগে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কমিটিরও মেয়াদ শেষ হয়েছে এক বছর আগে। অছাত্রদের দিয়ে বছরের পর বছর কমিটির মেয়াদ পার করার কারণে তাদের পূর্ণাঙ্গ প্যানেল গঠনে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে ছাত্রীদের হলগুলোতে তারা কোনো প্যানেলই দিতে পারেনি।

অবশ্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ডাকসুতে ভোটই তো হয়নি। যেখানে ভোটই হয়নি, সেখানে কে কত ভোট পেয়েছে সেসব আলোচনা করে লাভ কি। সুষ্ঠু ভোট হলে ছাত্রদলই জিতত।

ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন বলেন, ছাত্রদলকে গত দশ বছরে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে দেয়া হয়নি। ছাত্রলীগ একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার সহাবস্থানের ব্যাপারে দাবি জানানো হলেও কর্ণপাত করেনি। দশ বছরে ছাত্রদলের ক্যাম্পাসে অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা তো ডাকসু নির্বাচনে প্রভাব পড়েছে। ভোট কারচুপির মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যে নির্বাচন করেছে তা নজিরবিহীন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, ছাত্রদলের বেশিরভাগ নেতাকর্মীই হলে থাকার সুযোগ পায়নি, বাইরে ছিল। এ নির্বাচন উপলক্ষে তারা সাহস করে যে সব হলে প্রচার চালাবে তাও সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া নিয়মিত ছাত্রদের হাতে সংগঠনের নেতৃত্বে না থাকাটাও পরাজয়ের অন্যতম কারণ।

তিনি বলেন, সব দল-মতের ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়া করবে, বিভিন্ন হলে থাকবে। এই অধিকার সবার আছে। এই পরিবেশটা যদি না পাওয়া যায় তাহলে কি করার আছে। আমি যখন উপাচার্য ছিলাম তখন ‘পরিবেশ পরিষদ’ করেছিলাম। সব সংগঠনের নেতাদের ৫ জন করে নিয়ে ‘পরিবেশ পরিষদের’ বৈঠক করা হতো। সেখানে সবার কথা বলার সুযোগ ছিল। নিজের মধ্যে সমস্যাগুলো সমাধান করার একটা প্রক্রিয়া ছিল। এখন তা নেই। এটা হলেও তো ক্যাম্পাসে সহাবস্থান থাকত।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ আন্দোলনকারীরা অনড় ডাকসুর ফল বাতিলে আলটিমেটাম


বিশ্ববিদ্যালয় অচল করে দেয়ার হুমকি * তিন দিনের মধ্যে পুনঃতফসিলের দাবি * ৩১ মার্চের মধ্যে সব পদে ফের নির্বাচন চান ভিপি নূর * নির্বাচনসংশ্লিষ্টদের পদত্যাগ ও মামলা প্রত্যাহারের দাবি * প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ দাবিতে রোকেয়া হলের ৫ শিক্ষার্থী অনশনে * পুনরায় ভোটের দাবিতে রাজু ভাস্কর্যে ৬ শিক্ষার্থীর অনশন অব্যাহত

ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের ফল বাতিল করে পুনঃতফসিলের দাবিতে তিন দিনের আলটিমেটাম দিয়েছেন ভোট বর্জনকারী পাঁচ প্যানেলের নেতারা। পাশাপাশি তারা নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে জড়িত সবার পদত্যাগ ও শিক্ষার্থীদের নামে দেয়া মামলা প্রত্যাহারেরও দাবি জানান।

দাবি না মানলে বিশ্ববিদ্যালয় অচল করে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। মঙ্গলবার টিএসসিতে নূর ও শোভনের কোলাকুলির পর বিকালের দিকে ক্যাম্পাসের পরিবেশ কিছুটা শান্ত হলেও বুধবার সকাল থেকেই অবস্থা পাল্টাতে থাকে। পাঁচটি প্যানেলের নেতাকর্মী-সমর্থকরা দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল করেন।

ভিসির কাছে স্মারকলিপি দেন। বিভিন্ন হলে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিতরাও ভোট বাতিল করে পুনঃতফসিলের দাবি জানান। একই সঙ্গে তারা রোকেয়া হলের প্রভোস্টের পদত্যাগ দাবির আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেন। আলাদাভাবে মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসে নামেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

অবশ্য ছাত্রলীগ এদিন কোনো মিছিল করেনি। তারা মধুর ক্যান্টিনে অবস্থান করেন। এদিকে পাঁচটি প্যানেলের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে ৩১ মার্চের মধ্যে ফের নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নূরুল হক নূর।

এছাড়া নির্বাচন বাতিলের দাবিতে দ্বিতীয় দিনের মতো অনশন অব্যাহত রেখেছেন ৬ শিক্ষার্থী। বুধবার রাতে চার দফা দাবিতে রোকেয়া হলের পাঁচ ছাত্রীও হল গেটে আমরণ অনশন শুরু করেন।

ছাত্রদলসহ আন্দোলনকারীরা রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। ডাকসুর সাবেক ভিপি ও সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমও তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।

কারচুপির অভিযোগে দীর্ঘ ২৮ বছর পর গত সোমবার অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচন বর্জন করে ছাত্রলীগ ছাড়া অংশগ্রহণকারী ছাত্রদলসহ সব প্যানেল। এরপরও নির্বাচন চলে। রাত সাড়ে তিনটার দিকে ফল ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

এতে কোটা আন্দোলনকারীদের প্লাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্রার্থী নূরুল হক নূর ভিপি নির্বাচিত হন। এছাড়া জিএস, এজিএসসহ ২৩ পদে জয়লাভ করে ছাত্রলীগ।

সোমবার দুপুর থেকে পাঁচ প্যানেলসহ বিএনপি নেতাকর্মী-সমর্থকরা ভোট বাতিলের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। সেই আন্দোলন বুধবার পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

এদিন আন্দোলনকারীরা তাদের দাবি মেনে নেয়ার জন্য তিন দিনের আলটিমেটাম দিয়ে ভিসির কাছে স্মারকলিপি দেন। বুধবার সকাল থেকেই ক্যাম্পাসের অবস্থা ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন বাতিলের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দিনভর দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

বুধবার দুপুর ১২টা থেকে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী রাজু ভাস্কর্যের সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর ছাত্রলীগ বাদে ভোট বর্জনকারী ডাকসুর পাঁচটি প্যানেল পুনঃনির্বাচন চেয়ে দুপুরে ভিসিকে স্মারকলিপি দেন।

এ সময় সেখানে যান নবনির্বাচিত ভিপি নূরুল হক নূরও। ভিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ডাকসু নির্বাচনে বাম জোটের ভিপি প্রার্থী ও ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী এবং স্বতন্ত্র জোটের ভিপি প্রার্থী অরণি সেমন্তি খান।

এ সময় অরণি বলেন, শনিবারের মধ্যে নির্বাচনের ফল বাতিল করে পুনঃতফসিল দিতে হবে। ভোটে কারচুপির সঙ্গে জড়িতদের পদত্যাগ করতে হবে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দেয়া মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। অন্যথায় আমরা কঠোর কর্মসূচিতে যাব।

লিটন নন্দী বলেন, ‘আগামী তিন দিনের মধ্যে আমাদের দাবি না মানলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব রক্ষার্থে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় অচল করে দিতে বাধ্য হব।’ তিনি বলেন, ‘আমরা উপাচার্যকে বলেছি। আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহার করতে হবে। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অস্থিতিশীল করে, তাদের ছাড় দেয়া হবে না। বরং তাদের বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল অ্যাক্টের মামলা দেয়া হবে। আমরা বলেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে এতদিন যারা ক্রিমিনাল অ্যাক্ট করলেন, তাদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেয়া হবে। তিনি কোনো উত্তর দেননি।’

তবে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা শেষে প্রতিক্রিয়ায় উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান বলেছেন, ‘সকলের কর্মপ্রয়াস, আন্তরিকতা, সময় শ্রম সেগুলোকে নস্যাৎ করার এখতিয়ার আমার নেই। প্রত্যেকটি প্রক্রিয়া, প্রত্যেকটি কার্যক্রম রীতিনীতি মেনে হবে।’

৩১ মার্চের মধ্যে সব পদে নির্বাচনের দাবি ভিপি নূরের : এদিকে ৩১ মার্চের মধ্যে সব পদেই আবার নির্বাচন চেয়েছেন ডাকসুর নবনির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি) নূরুল হক।

বুধবার বেলা পৌনে তিনটার দিকে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে তিনি এ দাবি জানান। এ সময় নূর সাংবাদিকদের বলেন, ছাত্রলীগ বাদে অন্য সব সংগঠন পুনর্নির্বাচন চাইছে এবং সে লক্ষ্যে তারা আন্দোলন করছে।

আজ ভিসি স্যারকে তিন দিনের আলটিমেটাম দিয়েছে। আমি তাদের প্রতিনিধি হিসেবে, এত কারচুপির মধ্যেও যেখানে নির্বাচিত হয়েছি। এরপরও আমি তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে তাদের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করছি। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন বাতিল করে ৩১ মার্চের মধ্যেই পুনরায় নির্বাচন দিতে হবে।

নির্বাচনে কারচুপির বিষয়ে তিনি বলেন, শত কারচুপির পরও আমাকে এবং আমার প্যানেল থেকে আখতার হোসেনকে (সমাজসেবা সম্পাদক) হারাতে পারেনি। নীলনকশার মাধ্যমে তারা অন্যদের হারিয়ে দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চাইলে আমি দায়িত্ব পালন করব, না চাইলে করব না। তিনি বলেন, ছেলেদের হলগুলোয় দেখেছি, প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের তারা জোর করে লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল।

যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো অলিখিতভাবে ইজারা নিয়েছেন, সেই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন এসব করেছে। তাদের বলা হয়েছে, প্রত্যেকে যেন ভোট দিতে গিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় নষ্ট করে। এ ধরনের অনিয়ম আমরা দেখেছি।

নির্বাচনের দিন রোকেয়া হলে নিজের ওপর হামলার বিষয়ে ডাকসুর ভিপি বলেন, রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ জিনাত হুদা ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারিকে ফোন দেন। তাদের লেডি মাস্টার বাহিনী রয়েছে। শোভন ভাইয়ের (ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি) নেতৃত্বে তারা আমার ওপর হামলা চালিয়েছিল।

ক্যাম্পাসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ছাত্রলীগের সহযোগিতা চেয়ে নূর বলেন, আমাদের বিভিন্ন সময় লাঞ্ছিত করা হয়েছে। তবে গতকাল (মঙ্গলবার) আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক শোভন আমাদের সহযোগিতার কথা বলেছেন। এজন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

পুনরায় ভোটের দাবিতে ৬ শিক্ষার্থীর অনশন অব্যাহত : এদিকে ডাকসু এবং হল সংসদের নির্বাচনের ফল বাতিল করে পুনঃতফসিলের দাবিতে ছয় শিক্ষার্থীর আমরণ অনশন দ্বিতীয় দিনেও অব্যাহত। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মঙ্গলবার রাত থেকে এ অনশন শুরু করেন চার শিক্ষার্থী। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন আরও দু’জন।

বুধবার সকালে ডাকসুর সাবেক ভিপি ও সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম রাজু ভাস্কর্যের সামনে গিয়ে অনশনরত ছয় শিক্ষার্থীর দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি বলেন, আমি মনে করি যে নির্বাচন হয়েছে সেটা কোনো নির্বাচন নয়। এই নির্বাচনের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী ডাকসু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কলঙ্কিত করা হয়েছে।

এর বাইরে নির্বাচন বর্জনকারী পাঁচ প্যানেলের নেতারাও দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজু ভাস্কর্যের সামনে গিয়ে অনশনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাম জোটের ভিপি প্রার্থী ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী, এজিএস প্রার্থী সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের (মার্কসবাদী) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহসভাপতি সাদেকুল ইসলাম সাদিক, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের জিএস প্রার্থী মুহাম্মদ রাশেদ খান, এজিএস প্রার্থী ফারুক হাসান, স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদের জিএস প্রার্থী এএমআর আসিফুর রহমান, স্বতন্ত্র জোটের ভিপি প্রার্থী অরণি সেমন্তি খান, ছাত্র ফেডারেশনের জিএস প্রার্থী উম্মে হাবীবা বেনজীর প্রমুখ।

রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ : ডাকসু নির্বাচনে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে রোকেয়া হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. জিনাত হুদার পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন ছাত্রীরা।

এতে অংশ নেন বিভিন্ন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। রাতভর চলে এ কর্মসূচি। বুধবারও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। এখান থেকে ভোটের দিনে ওই হলের ঘটনায় দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারেরও দাবি জানানো হয়।

শিক্ষার্থীরা বলেন, সোমবার সকাল ৮টা থেকে হলগুলোতে ডাকসু নির্বাচনের ভোট শুরু হয়। তবে রোকেয়া হলের জন্য বরাদ্দ ৯টি ব্যালট বাক্সের মধ্যে তিনটি ব্যালট বাক্স পাওয়া না যাওয়ায় ভোট শুরু হয় এক ঘণ্টা দেরিতে।

ওই ব্যালট বাক্সগুলো প্রাধ্যক্ষ অন্যত্র সরিয়ে রেখেছিল। এ ঘটনায় ভোটগ্রহণ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা চলে যান। এতে সাধারণ ছাত্রীরা ভোট দিতে পারেননি। ফলে ছাত্রলীগ হলটিতে জয়ী হয়।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আবদুর রহিম যুগান্তরকে বলেন, তাদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার বেলা ১১টায় আমরা তাদের ডেকেছিলাম। কিন্তু সেখানে তারা আসেননি।

রোকেয়া হলের আন্দোলনে তিন ছাত্রী হলের স্বতন্ত্র প্যানেলের বিজয়ীদের একাত্মতা : রোকেয়া হল সংসদে পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন মেয়েদের তিনটি হলের স্বতন্ত্র প্যানেল থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। বুধবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিতে সংবাদ সম্মেলনে তারা এ দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে কবি সুফিয়া কামাল হল, শামসুন্নাহার হল ও বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলের নবনির্বাচিত তিন সহসভাপতি (ভিপি) ও দু’জন জিএসও উপস্থিত ছিলেন।

তারা রোকেয়া হলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। লিখিত বক্তব্যে শামসুন্নাহার হলের নবনির্বাচিত জিএস আফসানা ছপা বলেন, ‘রোকেয়া হল সংসদ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সারারাত ধরে চলা বিক্ষোভ ও উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।

ইতিমধ্যে আমরা জেনেছি যে, অজ্ঞাত ৪০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে। হুমকি দেয়া হচ্ছে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়ার।

এ পরিস্থিতিতে আমরা নির্বাচিত হল সংসদ স্বতন্ত্র প্যানেল ও প্রার্থীরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং তাদের দাবিগুলোর সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করছি।’

আমরণ অনশনে রোকেয়া হলের পাঁচ ছাত্রী : রোকেয়া হল সংসদ নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় নির্বাচন ও হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগসহ চার দফা দাবিতে এবার আমরণ অনশনে বসেছেন হলের পাঁচ ছাত্রী।

তাদের চারজন প্রার্থী ছিলেন। বুধবার রাত ৯টা থেকে হলের প্রধান ফটকে অনশন শুরু করেন তারা। হল গেট ১০টায় বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও বিক্ষুব্ধ ছাত্রীরা রাত সাড়ে ১২টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তা বন্ধ হতে দেয়নি। রাতেও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন।

অনশনে বসা শিক্ষার্থীরা হলেন- রাফিয়া ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্যানেল থেকে হল সংসদে ভিপি প্রার্থী, সায়েদা ছাত্র ফেডারেশন থেকে হল সংসদে এজিএস প্রার্থী, দীপ্তি স্বতন্ত্র জোট থেকে কেন্দ্রীয় সংসদে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক প্রার্থী এবং প্রমি হল সংসদে ছাত্র ফেডারেশনের সদস্য প্রার্থী ছিলেন।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ দায়িত্ব না নিলেও নূরুল হকই থাকবেন ভিপি


দীর্ঘ ২৮ বছর পর ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচন। তবে পুনর্নির্বাচন দাবিতে ক্যাম্পাসে এখনও আন্দোলন চলছে।

এরই মাঝে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে নবনির্বাচিত ভিপি মো. নূরুল হক নূর শেষ মুহূর্তে দায়িত্ব না নিলে সংসদ কিভাবে চলবে। তিনি ভিপি পদে থাকবেন কিনা এমন প্রশ্নও তৈরি হয়েছে শিক্ষার্থীসহ অনেকের মনে।

জানা গেছে, ডাকসুর গঠনতন্ত্রে শপথ বলে কোনো ধারা উল্লেখ নেই। হল সংসদ ও কেন্দ্রীয় সংসদ নেতাদের অভিষেক অনুষ্ঠান হয়। সে হিসেবে অভিষেক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ বা সংসদের কোনো বৈঠকে না গেলেও নূরুল হক নূরুই থাকবেন ডাকসুর ভিপি।

এ প্রসঙ্গে ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধন কমিটির প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ডাকসু নেতাদের শপথের কথা কোথাও লেখা নেই। দায়িত্বগ্রহণ অনুষ্ঠান হয়।

ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমার সময় কোনো শপথ নেয়ার মতো কিছু হয়নি। দায়িত্ব হস্তান্তর বলেও কিছু হয়নি। আমরা বড় করে অভিষেক অনুষ্ঠান করেছিলাম। সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম।

ডাকসু ও হল সংসদের গঠনতন্ত্র দুটি খণ্ডে বিভক্ত। যেখানে কেন্দ্রীয় সংসদ অংশে নির্বাহী কমিটি, কার্যালয় বণ্টন, সংসদের তহবিল, শূন্যপদ পূরণ, গঠনতন্ত্র সংশোধনসহ ১৬টি বিষয় উল্লেখ রয়েছে।

অন্যদিকে দ্বিতীয় খণ্ডে হল সংসদের নিয়মাবলি, কার্যক্রমসহ তেরোটি বিষয় রয়েছে। সেখানকার কোথাও ডাকসু নেতাদের কোনো ধরনের শপথ অনুষ্ঠানের কথা উল্লেখ নেই।

হল সংসদের ৭২নং ধারায় অভিষেক অনুষ্ঠানের কথা লেখা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, নির্বাহী কমিটি একটি ব্যয়ের বাজেট প্রস্তুত করবে এবং অভিষেক অনুষ্ঠানের ১৪ দিনের মধ্যে তা সংসদে উপস্থাপন করবে।

ডাকসুর সাবেক নেতারা বলছেন, ডাকসু নির্বাচনের পর নতুন নেতৃত্বের শপথ গ্রহণের মতো কোনো কিছু আগে হয়নি। শপথ গ্রহণ করার কোনো অনুষ্ঠানও হয়নি। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে অভিষেক অনুষ্ঠান হয়েছে। অনুষ্ঠান আয়োজন করে সংশ্লিষ্ট বিজয়ী নেতৃত্ব।

তবে প্রশ্ন রয়েছে, নতুন ভিপি দায়িত্ব না নিলে সংসদ কিভাবে চলবে। এ বিষয়ে সাবেক নেতারা বলেন, এমন কোনো ঘটনা অতীতে ঘটেনি। ভিপি দায়িত্ব না নিলে সংসদ কিভাবে চলবে সে ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কারণ তিনি ডাকসুর সভাপতি।

নির্বাচন নিয়ে কোনো সমস্যা থাকলে তা গঠনতন্ত্রের নিয়মে তিন দিনের মধ্যে উপাচার্যকে নিষ্পত্তি করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে না হলে উপাচার্যের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ নুরের ভিপি পদ গ্রহণ নিয়ে যা বললেন অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল


ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠু হলে শুধু নুর আর আখতার না, কোটা সংস্কার আন্দোলনের আরও অনেকেই জিততো বলে মন্তব্য করেছেন রাজনীতি-বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল।

ডাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা কোটা সংস্কার আন্দোলনের অনেককে কারচুপি করে হারিয়ে দেয়া হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি কুয়েত মৈত্রী হলের নির্বাচনের ফলাফলকে উদাহরণ হিসেবে দেখতে বলেন।
তাহলে ভিপি পদে নুর ও আখতার কীভাবে জিতল সেই ব্যাখ্যাও দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এই অধ্যাপক।

গতকাল (১২ মার্চ) ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর চমক দেখান কোটা আন্দোলনকারীদের সংগঠন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতা নুরুল হক নুর।

জালভোট, কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ এনে ছাত্রলীগ ছাড়া আর বাকি সব প্যানেল ধর্মঘট, ক্লাস বর্জন ও বিক্ষোভ করলেও পরদিন সকালে দেখা যায় সহসভাপতি (ভিপি) পদে বিজয়ী হয়েছেন কোটা আন্দোলনকারী নুরুল হক নুরু ও এই প্যানেল থেকে সমাজসেবা সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছেন কোটা আন্দোলনকারী আখতার হোসেন।

ফলাফল প্রকাশের কিছুক্ষণ পর সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটে ড. আসিফ নজরুল এ বিষয়ে নিজের ফেসবুক পেইজে ‘নুরের বিজয়, নুরের শপথ’ শিরোনামে একটি স্ট্যাটাস দেন। ওই স্ট্যাটাসে নুরুল হকের ভিপি পদ গ্রহণ করা উচিত হবে কি-না সে বিষয়েও নিজের মন্তব্য দেন।

তার সেই স্ট্যাটাসটি হুবুহু তুলে ধরা হলো-

‘কুয়েত মৈত্রী হলের নির্বাচনের ফলাফল ভালো করে লক্ষ্য করুন, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে ব্যালট ভরা বাক্স উদ্ধারের পর ছাত্রীদের তুমুল প্রতিবাদে ফেটে পড়লে নতুন প্রভোষ্ট নিয়োগ দিতে হয়েছে। নির্বাচনে কারচুপির কোন সুযোগ ছিল না সেখানে। ফলাফল? ১৩টির সব আসনে পরাজিত ছাত্রলীগ।

নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হলে ডাকসু ও বাকী সব হলের ফলাফল হয়তো তাই হতো। ডাকসুতে শুধু নুর আর আখতার না, জিততো কোটা আন্দালনের আরো অনেকে।

বিভিন্ন আলামত দেখে এটা মনে হয় যে কোটার অনেককে কারচুপি করে হারিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু নুর আর আখতারের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীর ব্যবধান এতো বিশাল ছিল যে কারচুপি করেও তাদের হারনো যায়নি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে নুরের কি ডাকসু ভিপি পদ গ্রহন করা উচিত?

আমার মতে কোটা আন্দোলনের নেতারা সবাই যদি রাজী থাকে তাহলে তার ডাকসু ভিপির পদ গ্রহন করা উচিত। ডাকসু ভিপি হিসেবেই হয়তো ছাত্রদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে আরো বেগবান করা সম্ভব।

তবে নুরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোটা আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে। বাম বা ছাত্রদলের মতামত এখানে গুরুত্বপূর্ণ হতো যদি তারা কোটার নেতাদের সঙ্গে একসঙ্গে নির্বাচন করতো। তারা এটি করেনি।

নুরের মধ্যে আমি দেখি তরুন বয়েসের বঙ্গবন্ধুর ছায়া। সাধারন ছাত্রদের নির্যাতনকারীদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু কোনোভাবেই নেই।’

(ড. আসিফ নজরুলের ফেসবুক পেইজ থেকে সংগৃহীত)

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ ডাকসু’র ফলাফল গণভবন থেকে নির্ধারিত: শামসুজ্জামান দুদু


ভোট ডাকাতি, জবরদখল ও হামলা-হুমকির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের ফলাফল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় গণভবন থেকে নির্ধারিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভাইস-চেয়ারমান ও কৃষকদলের আহ্বায়ক শামসুজ্জামান দুদু।

বুধবার ( ১৩ মার্চ) জাতীয় প্রেসক্লাবের মাওলানা আকরাম খাঁ হলে বাংলাদেশ জাতীয় দলের উদ্যোগে ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ১৩তম তম কারাবন্দি দিবস ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মূল উৎপাদনের ষড়যন্ত্র’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান আলোচকের বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।

ডাকসুতে কোন নির্বাচন হয়নি মন্তব্য করে ছাত্রদলের সাবেক এই সভাপতি বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন তো হয় নাই। এখানে আবার ভোটের সংখ্যা কি? কে বেশি, কে কম, কার কত ভোট এসব আলোচনা কেন? ভোট তো হয়নি। প্রধানমন্ত্রী যা চে‌য়ে‌ছেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (গণভবন) যা চেয়েছে তাই হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এটা কি আমাদের সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়, এটা কি বায়ান্নোর আন্দোলনের বিশ্ববিদ্যালয়, এটা কি ঊনসত্তরের বিশ্ববিদ্যালয়, একাত্তরের বিশ্ববিদ্যালয়, নব্বইয়ের বিশ্ববিদ্যালয়, এটা শেখ হাসিনার আমলের বিশ্ববিদ্যালয়।’

দুদু প্রশ্ন রেখে বলেন,‘ডাকসু নির্বাচনের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদল সর্বশেষ যত বড় মিছিল করেছে এত বড় মিছিল ছাত্রলীগ করতে পেরেছে কি? ১২ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল যত বড় মিছিল করেছে ১২ বছর ছাত্রলীগ যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে না পারতো তাহলে ছাত্রলীগ নামের কোন সংগঠনই থাকত না।’

ডাকসু নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘নূরকে আনা হয়েছে এটা নিয়ে এত সম্মান করার কিছু নেই। এটা ছাত্রলীগেরই একটা অংশ। সকালে এক কথা দুপুরে বলে আরেক কথা বিকেলে আবার আরেক কথা বলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমরা ছিলাম যা বলেছি তাই করেছি। ৯০ এর আগে ডাকসু নির্বাচনে কারা জিতেছিল? জিতেছিলো ছাত্রদল। তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয় ঢুকতে দেয়া হয়নি। যারা সর্বশেষ ডাকসুর পদে ছিল তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয় ১২ বছর ঢুকতে দেওয়া হয়নি।’

ছাত্র সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে শামসুজ্জামান দুদু বলেন,‘ছাত্র সমাজকে উঠে দাঁড়াতে হবে ফ্যাঁসিবাদের বিরুদ্ধে। আমি বলছি না এটা খুব সহজ লড়াই। এ লড়াইটির প্রতিটি পদক্ষেপ হবে হিসাবি, প্রতিটি কৌশল হতে হবে সুচিন্তিত, প্রতিটি লড়াই হবে ভয়হীন, তাহলে আপনারা জয় লাভ করতে পারবেন।’

নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য তিনি বলেন,‘তারেক রহমানকে যদি দেশে ফিরিয়ে আনতে হয় তাহলে এই সরকারের পরিবর্তন ছাড়া তা সম্ভব নয়। যদি বেগম জিয়াকে জেল থেকে মুক্ত করতে হয় এই সরকারের পরিবর্তন ছাড়া সম্ভব না। কেউ যদি মনে করেন অনুনয়-বিনয় করে ভারতের কাছে গিয়ে এই সরকারের কাছে গিয়ে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবেন ,এটা সম্ভব নয, লড়াই ছাড়া গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার সম্ভব না।ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে।’

ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে দুদু আরও বলেন, ‘শহীদ জিয়া যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন শেখ হাসিনা তখন দেশে ফিরে এসেছে। খন্দকার মোশতাক যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন শেখ হাসিনা তখন কিন্তু দেশে ফিরে আসতে পারেনি। তার (শেখ হাসিনা) আজন্মের চাচা ছিলেন খন্দকার মোশতাক। তার আমলে কিন্তু তিনি ফিরে আসেননি।খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রী পরিষদের ৪০ জনের ৩৯ জন ছিলেন আওয়ামী লীগের। শেখ মুজিবের কাছের লোক। তখনো কিন্তু শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন নাই। শহীদ জিয়াউর রহমানের সময় ফিরে এসেছেন। আর সেই শেখ হাসিনার আমলে তারেক রহমান দেশের বাহিরে, বেগম খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগের ভাষায় কারাদণ্ডিত হয়ে কারাগারে। এটাই হচ্ছে শেখ পরিবার ও জিয়া পরিবারের পার্থক্য।’

বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদা সভাপতিত্বে সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী,নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাছের মোহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, কৃষকদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মইনুল ইসলাম,আলিম হোসেন, লায়ন মিয়া মোহাম্মদ আনোয়ার, কে এম রকিবুল ইসলাম রিপন,আব্দুর রাজি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

উৎসঃ ‌ব্রেকিংনিউজ

আরও পড়ুনঃ আমার রুচির অবস্থা এত খারাপ হয়ে যায়নি! আমি সন্ত্রাসীদের সাথে ছবি তুলি না!(ভিডিও সহ)


ডাকসু নির্বাচনে পরাজিত সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের সঙ্গে ছবি তুলতে অনীহা প্রকাশ করেছেন স্বতন্ত্র জোটের পরাজিত ভিপি প্রার্থী অরণি সেমন্তি খান। ছবি না তোলার এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়।

মঙ্গলবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) অডিটরিয়ামের মঞ্চে এ ঘটনা ঘটে।

ভিডিওতে দেখা যায়, ছাত্রলীগ সভাপতি শোভন মঙ্গলবার বিকালে নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুরের সঙ্গে কুশলবিনিময় করতে গেলে সেখানে অন্য প্যানেলের প্রার্থীরাও ছিলেন। এ সময় নুরের সঙ্গে কোলাকুলি করে ছবি তোলেন শোভন। পরে তিনি সেখানে থাকা অন্যদের সঙ্গেও কথা বলেন। একপর্যায়ে স্বতন্ত্র জোটের প্রার্থী অরণির সঙ্গে শোভনের একটি ছবি তুলতে চান সেখানে থাকা এক ছাত্র।

ভিডিওঃ ‘আমার রুচির অবস্থা এত খারাপ হয়ে যায়নি! আমি সন্ত্রাসীদের সাথে ছবি তুলি না!(ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

এ সময় অরণি ছবি তুলতে অনিহা প্রকাশ করেন এবং শোভনের সামনেই তিনি বলেন, ‘না ভাই কালকে রোকেয়া হলে এই লোক নিজে আমাদের বলছে মারধর করতে। এর সঙ্গে ছবি তুলব না। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ছবি তুলি না।’ এর পর তাদের আশপাশে থাকা সবাই হাততালি দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

অরণি এ কথা বলার পর শোভন কিছু না বলে সেখান থেকে চলে যান। এর পর তাদের ওই কথোপকথনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক শোভনকে ফিরিয়ে দেয়ার পর সংবাদিকদের কাছে অরণি বলেন, ‘ছাত্রলীগ আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। তাদের আমরা বিশ্বাস করি না। তাদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করতে চাই না।’ কারও মিষ্টি কথায় তিনি ভুলতে চান না বলেও জানান পরাজিত স্বতন্ত্র এ প্রার্থী।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ নুরকে ভিপি করেও স্বস্তি পাচ্ছেন না শেখ হাসিনা!


নজিরবিহীন দখল, জালিয়াতি, ব্যালট ছিনতাই, জালভোট আর বিরোধী প্যানেলের প্রার্থী ও সমর্থকদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার মধ্যদিয়ে সোমবার অনুষ্ঠিত হলো দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ ও হল সংসদ নির্বাচন। এরমাধ্যমে গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর আরেকটি প্রহসন দেখলো দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের লোকজন। মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে পরিচিত দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষকদের ভোটডাকাতি ও জাল জালিয়াতির ঘটনায় পুরো দেশ স্তব্ধ হয়ে গেছে। ঢাবি প্রশাসন ও সরকারের ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে সকল শ্রেণিপেশার মানুষ।

এমনকি নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী ঢাবির ৮ জন শিক্ষক নির্বাচন নিয়ে গণমাধ্যমে যে বিবৃতি দিয়েছেন সেটার মধ্যেও ভোটডাকাতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। তারা অবিলম্বে নির্বাচন স্থগিত করে নতুন করে তফসিল ঘোষণারও দাবি জানিয়েছেন। ঢাবি ভিসি, প্রোভিসি ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী ছাড়া ডাকসু নির্বাচনের পক্ষে এখন পর্যন্ত কেউ কথা বলছেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শত বছরের ইতিহাসে ডাকসু নির্বাচনকে একটি কলঙ্কিত অধ্যায় বলে আখ্যাদিচ্ছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিশিষ্টজনেরা।

সোমবার দিবাগত রাতে কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম সংস্করণে সংবাদ ছাপা হয়েছে যে, ডাকসুতে ভিপি-জিএসসহ ছাত্রলীগের জয়জয়কার। কেউ আবার শিরোনাম করেছে বিপুল ভোটের ব্যাবধানে এগিয়ে ছাত্রলীগের প্যানেল। কিন্তু, রাত ৩ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোটা আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুরকে ডাকসুর ভিপি হিসেবে ঘোষণা করেন। তবে, অন্যান্য প্যানেলের প্রার্থী, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ সকল শ্রেণিপেশার মানুষ মনে করছেন, ব্যাপক জালিয়াতির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি সামাল দিতেই সরকার নুরুল হক নুরকে ভিপি হিসেবে ঘোষণা করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডাকসু নির্বাচনে সীমাহীন ভোটডাকাতি নিয়ে চরম অস্বস্তিতে পড়ে যায় সরকার। শেখ হাসিনার নির্দেশ ছিল ছাত্রলীগকে জেতানো। ছাত্রলীগকে এমন বেপরোয়া হয়ে উঠবে এটা সরকারেরও ধারণা ছিল না। ছাত্রলীগ ছাড়া সবগুলো ছাত্রসংগঠন ভোট বর্জন করে নতুন নির্বাচনের দাবিতে দুপুর থেকেই আন্দোলনে নামে। ঢাবির সার্বিক পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রীর গণভবন থেকে মনিটর করা হচ্ছিল। কখন কি হচ্ছে সব কিছুর আপডেটই প্রতি মুহূর্তে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন শেখ হাসিনাকে অবহিত করেছেন।

এরপর রাত ১ টার দিকে গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে জানানো হয়েছে যে, পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে। হয়তো নির্বাচন বাতিলের ঘোষণা দিতে হবে অন্যাথায় আন্দোলন দমাতে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হবে। এরপরই আ.লীগ নেতা বাহাউদ্দিন নাছিম এ নিয়ে গণভবনে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বসেন। ওই সময়ই কোটা আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুরকে ভিপি পদ দিয়ে ছাত্রআন্দোলন দমানোর সিদ্ধান্ত হয়। কারণ, ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও বামজোটের অবস্থা ভাল না। তারা কোনো আন্দোলন করতে পারবে না। এজন্য কোটা আন্দোলনের নেতাদেরকে শান্ত করার পরিকল্পনা করা হয়। ছাত্রলীগ সভাপতি শোভনকেও এ নিয়ে চুপ থাকতে বলেন শেখ হাসিনা । আর ছাত্রলীগ সেক্রেটারি রাব্বানীকেও বলা হয়েছে প্রতিবাদে কিছু বিক্ষোভ অবরোধ করার জন্য। এরপরই রাত সাড়ে ৩ টায় নুরকে ভিপি হিসেবে ঘোষণা করেন ঢাবি ভিসি। এ ঘোষণার পরই প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু করে ছাত্রলীগ।

এদিকে, পুরো ঘটনাটিই যে সরকারের তৈরি খেলা ছিল সেটা মঙ্গলবার দুপুরে ছাত্রলীগ সভাপতির বক্তব্যের মাধ্যমেই পরিষ্কার হয়ে যায়। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদেরকে শান্ত করতে ছাত্রলীগ সভাপতি বলেই ফেললেন যে, পরিবেশ ঠিক রাখতে কোনো কোনো সময় নিজেকে বলি দিতে হয়। নেতাকর্মীদেরকে শান্ত থাকার নির্দেশ দেয়ার পরই টিএসসিতে গিয়ে নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন শোভন। তাৎক্ষণিক আলোচনা করে ধর্মঘট প্রত্যাহারেরও ঘোষণা দেন তারা। মূলত ছাত্রআন্দোলনকে থামাতেই সরকার এই নাটকটি করেছে।

কিন্তু, নুরসহ অন্যান্য প্যানেলের প্রার্থী ও সাধারণ ছাত্ররা ভোট বাতিল করে নতুন নির্বাচনের দাবিতে তারা অবিচল রয়েছেন। ইতিমধ্যে চারজন প্রার্থী নতুন নির্বাচনের দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেছেন। সাধারণ ছাত্ররাও লাগাতার কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

অপরদিকে, ভোটডাকাতির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে শিক্ষাবিদ, বিশিষ্টজন, সুশীল সমাজ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ সকল শ্রেণি পেশার মানুষ তাদের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডাকসুর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকরা আজ একাধিক বৈঠক করেছেন। কারণ, নুরকে ভিপি করে স্বস্তি পাচ্ছেন না শেখ হাসিনা। কোটা আন্দোলনের মতো এটা আবার ভিন্নদিকে মোড় নেয় কিনা এনিয়ে টেনশনে আছেন শেখ হাসিনা।

সরকার মনে করছে, জাতীয় নির্বাচনের পর জনগণ সরকারের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে আছে। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা। এছাড়া সরকারবিরোধী মহল থেকেই শিক্ষার্থীদেরকে উস্কে দিতে পারে। সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিটাকে সরকার একটা সংকট হিসেবেই দেখছে। তবে, পরিস্থিতি কখন কোন দিকে যাচ্ছে শেখ হাসিনা সহ সরকারের নীতিনির্ধারকরা সব সময়ই খোঁজ খবর রাখছেন।

উৎসঃ ‌অ্যানালাইসিস বিডি

আরও পড়ুনঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিতে কলঙ্কের তিলক দিয়েছেঃ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার


ইতিহাসবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেছেন, ডাকসু নির্বাচন নিয়ে যা ঘটেছে, তা প্রশাসনিক শৈথিল্যের কারণেই ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে যা ঘটেনি, এমনকি কোনো সামরিক স্বৈরাচারের আমলেও যা ঘটেনি, তা ঘটেছে। ব্যালট পেপারে ভোটের আগে সিল দেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিতে কলঙ্কের তিলক দিয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী সমঝোতাকে আমি স্বাগত জানাই। যা জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারিত হওয়া উচিত। গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।

ডাকসু নির্বাচন নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ডাকসু নির্বাচন এবং নির্বাচন পরবর্তী সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া মিশ্র। যে কোনো নির্বাচন কর্তার ইচ্ছার কর্ম হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি সঠিক পথে থাকে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শাসন’ প্রতিষ্ঠা করে তাহলে সব সময় নির্বাচন ভালো হবে। আমি সব সময় বিশ্বাস করি, ‘সুশাসন’ অনেক পরের ব্যাপার। আগে ‘শাসন’ নিশ্চিত করতে হবে। সেটি দেশেই হোক, প্রতিষ্ঠানেই হোক, সর্বাগ্রে তা প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে লক্ষ্য রাখতে হবে, আগামীতে যখন নির্বাচন হবে, অতীতের যে সব ব্যত্যয়, বিচ্যুতে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে গেছে, ভবিষ্যতে যেন তা না ঘটে।

তিনি বলেন, দলের অনুগত, অনুসারী থাকবেন, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু অন্ধ অনুসরণ দলের জন্য ক্ষতিকর। যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে যা ঘটেনি, এমনকি কোনো সামরিক স্বৈরাচারের আমলেও যা ঘটেনি, ভোটের আগে ব্যালট পেপারে সিল দেওয়া হয়েছে। তবে ইতিবাচক দিক হচ্ছে, এটি এখন শনাক্ত করা গেছে। তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে নানাবিধ অনিয়মের কথা আমরা শুনেছি। বিশেষ করে উপাচার্যের অনুমোদন সাপেক্ষে যারা শিক্ষক পর্যবেক্ষক দলে ছিলেন, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। যার ফলে নির্বাচনে অনিয়ম এবং বিশেষ একটি ছাত্র সংগঠনের দৌরাত্ম্য, সব মিলিয়ে এই নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তিনি বলেন, সব মিলিয়ে জাতীয় নির্বাচনে যেন অপছায়া যেন ডাকসু নির্বাচনকেও কলঙ্কিত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিতে কলঙ্কের তিলক দিয়েছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তবুও আশাবাদী হতে চাই, সর্বশেষ পরিস্থিতির বাস্তবে যে ইতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা যেন সামগ্রিক পরিস্থির ইতিবাচক পরিবর্তন হয়। সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, একমাত্র ছাত্রলীগ ছাড়া সবাই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। নির্বাচন বর্জন যে কেউ করতেই পারে। কিন্তু কেন করেছে-সেটাই লক্ষ্যণীয়।

এটা খতিয়ে দেখা দরকার। তিনি বলেন, এতদিন নেতা তৈরির কারখানাটি বন্ধ ছিল। নির্বাচনের মাধ্যমে সে কারখানা খুলে গেল। এই কারখানায় যারা শ্রমিক হিসেবে এলেন, তারা কেমন নেতা তৈরি করতে পারবেন? তারা কতটুকু নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবেন তা নিয়ে সংশয়-সন্দেহ থেকে গেল।

প্রবীণ এই শিক্ষাবিদ বলেন, শুধু ডাকসুতে নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্বাচন হওয়া দরকার। শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্র প্রতিনিধিদের নির্বাচন হওয়া দরকার। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও কোনো দল বা গোষ্ঠী ভিত্তিক নয়, সব ছাত্র সংগঠনের ছাত্রছাত্রী মিলে একটি সংগঠনে দাঁড়াবে। সেখান থেকে নির্বাচন হবে।

নির্বাচিত ভিপিকে ছাত্রলীগ সভাপতির অভিনন্দন জানানো এবং একসঙ্গে কাজ করার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, এটা ইতিবাচক রাজনীতির অংশ। নির্বাচন যাই হোক, নির্বাচন পরবর্তী সমঝোতাকে আমি স্বাগত জানাই। এটা জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারিত হওয়া উচিত।

উৎসঃ ‌বিডি প্রতিদিন

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here