বড় জোটে ইসলামি দলগুলোর কেন এই অবমূল্যায়ন?

0
109

মাত্র কয়েক মাস আগেও দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে ইসলামি দলগুলোর বিশেষ মূল্যায়ন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। বিশেষত সরকারের সঙ্গে কওমি ভিত্তিক কয়েকটি দল ও কতিপয় ইসলামি নেতার যোগাযোগের মাত্রা দেখে অনেকেই মনে করছিলেন আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে আলেম রাজনীতিকরা উভয় শিবিরে যথেষ্ট মূল্য পাবেন। যদিও তাদের যোগাযোগ, যোগাযোগের মাত্রা ও উচ্ছসিত ভাষা নিয়ে অস্বস্তি ছিল সাধারণ আলেম সমাজে। তবুও আলেমদের ক্ষীণ প্রত্যাশা ছিল, তারা মূল্যায়িত হোক।

অপরদিকে বিএনপির সঙ্গে আলেমদের যোগাযোগ ও রাজনৈতিক সমঝোতার প্রায় দুই দশক পার হয়েছে। চিন্তা, আদর্শ, বক্তব্য নানাবিধ সাদৃশ্যের কারণে রাজনৈতিক জোটের জন্য বিএনপিকেই প্রথম বেছে নিয়েছিলেন আলেমরা। সে হিসাবে বিএনপির কাছে আলেম সমাজের প্রত্যাশার পরিমাণ ছিলো আরেকটু বেশি।

আওয়ামী লীগের ছায়াসঙ্গী এরশাদ আলেমদের দলে ভেড়ানোর জন্য বলেছিলেন, আমি শেষ জীবনে কয়েকজন আলেমকে জাতীয় সংসদে দেখতে চাই। তার কথায় সরলভাবে বিশ্বাস করেন কিছু ইসলামি রাজনীতিক। জাতীয় সংসদে ইসলাম ও মুসলমানের প্রতিনিধিত্বের আশায় জোটবদ্ধ হন তার সাথেও।

কিন্তু বড় এই তিন দলের সঙ্গেই জোট করে হতাশ হয়েছেন ইসলামি দলগুলোর নেতা-কর্মীরা। নির্মোহভাবে বললে, দ্বিধা ছাড়াই বলা যায় ইসলামি দলগুলো নির্বাচনী রাজনীতি ও আসন বণ্টনে অবমূল্যায়নের শিকার। মাত্র কয়েক মাস আগেও আশা-আকাঙ্ক্ষার যে রঙিন বেলুন ফুলে উঠেছিলো আসন বণ্টন শেষে তা চুপসে গেছে।

ক্ষমতাসীন মহাজোট থেকে একটি আসনও পাননি মূলধারার কোনো ইসলামি দল বা ব্যক্তি। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ছায়াসঙ্গী এরশাদও মহাজোট থেকে প্রাপ্ত আসন থেকে একটিও ছেড়ে দেননি শরিক ইসলামি দলগুলোর জন্য। একই চিত্র বিএনপি শিবিরে। সেখানে ৪টি ইসলামি দলকে দেয়া হয়েছে ৫টি আসনের মনোনয়ন। যা এখনও চূড়ান্ত কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে খোদ মনোনয়নপ্রাপ্তদের মধ্যে।

সার্বিক বিচারে বলা যায়, ইসলামি দলগুলো ব্যাপক অবমূল্যায়ন ও উপেক্ষার শিকার হয়েছেন জোটের রাজনীতিতে। কিন্তু কেন?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এবারই ইসলামি শক্তিসমূহের বিক্ষিপ্ততা সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পেয়েছে। প্রত্যেক দল ও দলের কর্ণধার নিজস্ব হিসাব নিয়েই এগিয়ে যাওয়ার চিন্তা করেছে। সামগ্রিকতার অভাব ছিলো প্রত্যেকের কাজে-কর্মে। ফলে তাদের মূল্যায়নও হয়েছে বিক্ষিপ্ত ও ব্যক্তি কেন্দ্রিক।

তারা আরও মনে করেন, ইসলামি দলগুলো তাদের প্রত্যাশা পূরণে নিয়ন্ত্রক শক্তিগুলোর সঙ্গে শুধু সদাচার ও সৌজন্যই দেখিয়েছে, আপোষ-মীমাংসার মধ্য দিয়ে সব পেয়ে যাবেন এমন ধারণারই প্রকাশ পেয়েছে তাদের আচরণে। বিপরীতে নিজেদের ব্যক্তিত্ববোধ, নিজস্বতা, কৌশল ও রাজনৈতিক বার্গেনিং-এর মতো বিষয়গুলোর অভাব ছিলো তাদের মধ্যে। আর এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করায় ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আলেম রাজনীতিকরা তুলনামূলক ভালো মূল্যায়ন পেয়েছিলেন।

আশির দশকের শেষভাগ থেকে ইসলামি রাজনীতির গতিধারা পর্যবেক্ষণ করছেন মাওলানা আবু হেলাল। তার বিশ্লেষণ হলো, শাসক দলের কাছে ইসলামি রাজনীতিকদের একটি ধারার আত্মসমর্পণ, তৈলমর্দন নীতি ও ব্যক্তিত্বহীন আচরণ উভয় শিবিরেই রাজনৈতিক হিসাবটাকে দুর্বল করে দিয়েছে। কারণ, ক্ষমতাসীনদের প্রতি অতি মাত্রায় ঝুঁকে যাওয়ায় তাদের কাছে এসব নেতাদের গুরুত্বহীন করে তুলেছে। অন্যদিকে ইসলামি ধারার সম্মিলিত আয়োজনসমূতে সরকার ঘণিষ্ঠদের অংশগ্রহণ বিরোধী শিবিরকেও সন্দেহপ্রবণ করে তুলেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সবাই।

এদেশে আলেম উলামাদের ত্যাগ ও অবদান, প্রভাব ও প্রতিপত্তি এবং ইসলামের প্রতি সাধারণ মানুষের অনুরাগ বিচার করলে বলতে হবে, আলেম রাজনীতিকরা তাদের সঠিক মূল্যায়ন কখনোই পাননি। তবে কোনো সন্দেহ নেই এবারের জাতীয় নির্বাচনে বড় দলের কাছে আলেম রাজনীতিকদের অবমূল্যায়ন অনেক বেশি চোখে পড়ছে। অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এবার তা অনেক বেশি প্রকট।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বড় দলগুলোর আচরণ থেকে ইসলামি দলগুলোর শেখার আছে অনেক কিছু। যেমন, তাদের উচিত বিক্ষিপ্ততা পরিহার করে স্বতন্ত্র প্লাটফর্ম তৈরি, আত্মশক্তিতে বলিয়ান হওয়ার পর অন্যের সঙ্গে বার্গেনিংয়ে যাওয়া। শুধু বাংলাদেশ নয়; সাম্প্রতিককালের পাকিস্তান ও মালয়েশিয়ার জাতীয় নির্বাচন থেকেও এই বার্তা নেয়া যায়। দেশ দুটোতে ইসলামি দলগুলো নিজস্ব প্লাটফর্ম তৈরি করে নির্বাচনী ফলাফল ও ক্ষমতার ভাগাভাগি প্রশ্নে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে যেতে পেরেছে।

অনেকেই জোটবদ্ধ ইসলামি দলগুলোর জন্য এখনো কিছু সম্ভাবনা বাকি আছে বলেই দাবি করছেন। তারা বলছেন, প্রতীক বরাদ্দ পর্যন্ত জোটের কাছ থেকে আরও কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। কিন্তু এ পর্যন্ত যে আচরণ বড় দলগুলো করেছে, তাতে প্রশ্নটা থেকেই যায়-সত্যিই কি সম্ভাবনা বেঁচে আছে? মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পরও বার্গেনিংয়ের কতোটুকুই বা হাতে থাকে দলগুলোর?

সম্প্রতি রাজধানীর একটি হোটেলের ইসলামি দলগুলোর তরুণ কয়েকজন রাজনীতিক একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘এক আসনে একজন ইসলামি দলের প্রার্থী’ নীতিতে সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় বসেছিলেন। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এই প্রক্রিয়াকে তারা এগিয়ে নেবেন। কিন্তু আসন বণ্টন শুরু হওয়ার পর পুরো প্রক্রিয়াটাই ভেস্তে যায়। তারা তাদের দলগুলোর পারস্পরিক নির্বাচনী সমঝোতার চেয়ে বড় দলের নামমাত্র মনোনয়নকে শ্রেয় মনে করছেন। অথচ তাদের এই সমঝোতা এদেশের ইসলামি রাজনীতিতে বড় ধরনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারতো। এতে বড় দলগুলো ইসলামি দলগুলোকে পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ পেতো।

অবশ্য অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, ইসলামি দলগুলোর অবমূল্যায়নের পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক কারণ ছাড়াও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ইচ্ছারও প্রভাব থাকতে পারে। যেমন, মাত্র একদিন আগেই আমেরিকার প্রতিনিধি পরিষদ আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলোকে থামানোর আহবান জানিয়ে রেজুলেশন উত্থাপন করেছে। তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিতে তাদের এসব আহবানও যে কম ক্রিয়াশীল নয় তা অনেকেরই জানার কথা।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন প্রতিকূলতার মুখে ইসলামি দলগুলোর কৌশলচিন্তা ও আগামীর কর্মসূচির পুনর্গঠন প্রয়োজন। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে কওমি ভিত্তিক ইসলামি দলগুলোকে আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও বুদ্ধিদীপ্ত নতুন কৌশল সামনে নিয়ে এগুতে হবে। নতুবা শুধু আসন বণ্টনের রাজনীতি নয়, অবমূল্যায়নের ধারা শুরু হতে পারে সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্য সকল ক্ষেত্রেও।

উৎসঃ ইসলাম টাইমস

আরও পড়ুনঃ অতি লোভে তাঁতি নষ্টঃ কোন আসন না পাওয়ায় নৌকায় উঠছে না ইসলামী ঐক্যজোট!

অতি লোভে তাঁতি নষ্ট। নির্বাচনে আওয়ামীলীগ থেকে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার আশায় ২০ দলীয় জোট ছেড়ে মহাজোটে যোগ দিয়েছিল ইসলামী ঐক্যজোট। নানা গুঞ্জন থাকলেও অবশেষে নৌকা প্রতীকে ভোটে না লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কওমি মাদ্রাসা কেন্দ্রিক দল ইসলামী ঐক্যজোট। আসন নিয়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে দরকষাকষিতে সুবিধা করতে না পারার পর এখন এককভাবে দলীয় প্রতীক ‘মিনারে’ ভোট করার পক্ষে তারা।

এই দলটি ১৯৯৯ সাল থেকেই ছিল বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ। ২০১৩ সালে ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের অবরোধের সময় এই দলের নেতাকর্মীরা পালন করে মুখ্য ভূমিকা। তবে দশম সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির সঙ্গে তাদের সম্পর্কের অবনতি হয়। ২০১৬ সালের শুরুর দিকে জোট ছেড়ে চলে যায় দলটি।

প্রয়াত মুফতি ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বাধীন দলটি এবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ অথবা ৩, কুমিল্লা-১, চট্টগ্রাম-৭, নরসিংদী-৩ এবং ঢাকা-৫ আসনে আওয়ামী লীগের সমর্থন পাওয়ার আশায় ছিল দলটি।

এক সপ্তাহ আগেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ এবং কুমিল্লা-১ আসনে ছাড় পাওয়ার কথা জানিয়ে আরও একটি আসনের জন্য দরকষাকষির কথা জানাচ্ছিলেন নেতারা। তবে আওয়ামী লীগ এরই মধ্যে কুমিল্লা-১ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে দিয়েছে।

তবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটের আলোচনা চালিয়ে যাওয়া জাতীয় পার্টিও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ ছাড়তে নারাজ। এই অবস্থায় একটি আসনও ঐক্যজোট পাবে কি না, এ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমরা তো মহাজোটের সঙ্গে সম্পৃক্ত না। আওয়ামী লীগের সঙ্গে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনাও হয়নি।’

‘ইসলামী ঐক্যজোটের তো নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করার কথা ছিল’-এমন প্রশ্নে নেজামী বলেন, ‘না, এটা পত্র-পত্রিকায় চাউর হয়েছে। আর এখন তো সময়ই শেষ। এখন তো আর মহাজোটের হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নেই।’

ঐক্যজোট নেতা জানান, তাদের প্রাথমিক তালিকায় দুই শতাধিক প্রার্থীর নাম ছিল। তবে এখন পর্যন্ত ৬১টি মনোনয়নপত্র দেয়া হয়েছে। আজ মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন সংখ্যাটা বাড়তে পারে।

জোটে ভাঙন

আশা অনুযায়ী আসনে ছাড় না পাওয়া নিয়ে ঐক্যজোটে দেখা দিয়েছে দ্বন্দ্ব। মনোমালিন্যে দলছুটও হয়েছেন কেউ কেউ। ঐক্যজোটের ভাইস চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামে যোগ দিয়েছেন মধুপুরের পীর আব্দুল হামীদ।

মাওলানা হামীদ জানান, তিনি মুন্সীগঞ্জ-১ আসন থেকে নির্বাচন করতে আগ্রহী ছিলেন। তার দাবি ছিল, মহাজোট থেকে ইসলামী ঐক্যজোটে যদি একটি আসনও দেয়া হয়, সেটা যেন তাকেই দেয়া হয়। তবে তাকে দেওয়ার সম্ভাবনা নেই-এটা নিশ্চিত হওয়ার পর ঐক্যজোট ছেড়ে যান তিনি।

উৎসঃ ঢাকাটাইমস

আরও পড়ুনঃ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের কে বিএনপির মনোনয়ন পাচ্ছেন?

আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামে ১৪টি আসনে ৩২ জনকে প্রাথমিক মনোনয়নের চিঠি দিয়েছে বিএনপি। ১২টি আসনেই রাখা হয়েছে বিকল্প প্রার্থী। দুটি আসন খালি রাখা হয়েছে ২৩-দলীয় জোটের জন্য। চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভোট নিয়ে বিএনপির যখন এত প্রস্তুতি, তখন প্রাথমিক মনোনয়নেও ঠাঁই হয়নি দলটির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের কোনো সদস্যের।

নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরুর পর থেকেই চট্টগ্রামের অন্তত ৩টি আসনে (রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি) সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, স্ত্রী ফরহাত কাদের চৌধুরী ও তার ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী বিএনপির প্রার্থী হচ্ছেন বলে জোর প্রচারণা ছিল। এমনকি এ তিনজনই বিএনপির মনোনয়ন ফরমও সংগ্রহ করেছিলেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাঙ্গুনিয়া আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়নের চিঠি পেয়েছেন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক শওকত আলী নূর ও উপজেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি কুতুব উদ্দিন বাহার। ফটিকছড়ি আসনে মনোনয়নের চিঠি পেয়েছেন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকার ও বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের সাবেক সভাপতি ডা. খোরশেদ জামিল। রাউজানে বিএনপির মনোনয়নের চিঠি পেয়েছেন গিয়াস কাদের চৌধুরীর ছেলে সামির কাদের চৌধুরী, উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক জসিম উদ্দিন শিকদার ও উত্তর জেলা মহিলা দলের সভাপতি ফরিদা আক্তার।

এ পর্যন্ত বিএনপির মনোনয়নের চিঠি পেয়েছেন-এমন প্রার্থীদের মধ্যে শুধুমাত্র রাউজান আসনে সামির কাদের চৌধুরীই আছেন, যিনি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের সদস্য। সামির কাদের চৌধুরী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে।

তবে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি বিএনপির একটি রাজনৈতিক কৌশল। শেষ দিকে এসে অন্তত একটি বা দুটি আসনে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের সদস্যদের প্রার্থী করা হতে পারে। এর মধ্যে রাঙ্গুনিয়ায় সাকা চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের প্রার্থী হতে পারেন। কারণ রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়িতে সাকা পরিবারের আলাদা একটি ইমেজ রয়েছে। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীও এসব আসন থেকে কয়েকবার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীকে হুমকি প্রদানের অভিযোগে কারাগারে থাকা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে সামির কাদের চৌধুরীকে সামনে নিয়ে আসার পেছনেও এই যুক্তি কাজ করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি শেষ পর্যন্ত বিএনপি যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের সদস্যদের মনোনয়ন না দেয়, তবে ধরে নিতে হবে রাজনীতির মাঠে বিএনপির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি হিসেবে যে প্রচারণা আছে তা ঝেড়ে ফেলতে চাইছে দলটি। আগামী দিনের রাজনীতিতে যা বিএনপির জন্য নতুন দিকের উন্মোচন করবে।

তবে এ বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ চট্টগ্রামে বিএনপির নেতারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, ‘কী হচ্ছে তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরও ১০ দিন।’

উল্লেখ্য, যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী চারটি আলাদা রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন নিয়ে ছয়বার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ থেকে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ার দুটি আসন থেকে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে রাউজান আসনের জাতীয় পার্টি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে আবারও রাউজান আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে এনডিপি থেকে।

১৯৯৬ সালে বিএনপির প্রার্থী রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি থেকে নির্বাচন করে রাঙ্গুনিয়ায় বিজয়ী হন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। ২০০১ সালের নির্বাচনে আবারও রাঙ্গুনিয়া থেকে বিজয়ী হন। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে ফটিকছড়ি থেকে বিজয়ী হলেও রাঙ্গুনিয়াতে হেরে যান।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (২৭ নভেম্বর) বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয় থেকে যারা মনোনয়নের চিঠি পেয়েছেন তার মধ্যে দুটিতে বিএনপির একক প্রার্থী রয়েছেন। তারা হলেন চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে জাফরুল ইসলাম চৌধুরী। বাকি ১২টি আসনে বিকল্প প্রার্থী রেখেছে বিএনপি।

চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে মনোনয়নের চিঠি পেয়েছেন নুরুল আমিন, কামাল উদ্দিন আহমেদ ও মনিরুল ইসলাম ইউসুফ। চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে মোস্তফা কামাল পাশা ও নুরুল মোস্তফা খোকন। চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খান ও নগর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আবু সুফিয়ান। চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-পাহাড়তলী) আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান ও নগর যুবদলের সভাপতি মোশাররফ হোসেন দীপ্তি।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে মনোনয়নের চিঠি পেয়েছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গাজী মোহাম্মদ শাহজাহান জুয়েল ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সহসভাপতি এনামুল হক এনাম। চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে সাবেক সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম ও মোস্তাফিজুর রহমান। চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে সামির কাদের চৌধুরী, উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক জসিম উদ্দিন শিকদার ও উত্তর জেলা মহিলা দলের সভাপতি ফরিদা আক্তার।

চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে শওকত আলী নুর, আবু আহমেদ হাসনাত ও অধ্যাপক কুতুব উদ্দিন বাহার। চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে উত্তর জেলা বিএনপি নেতা ডা. খুরশিদ জামিল চৌধুরী, উপজেলা বিএনপির সভাপতি সালাহ উদ্দিন ও কর্নেল আজিম উল্লাহ বাহার। চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এস এম ফজলুল হক ও ব্যারিস্টার সাকিলা ফারজানা মনোনয়নের চিঠি পেয়েছেন।

উৎসঃ jagonews24

আরও পড়ুনঃ জামিন নিতে হাইকোর্টে শত শত মানুষের ভিড়

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় দায়ের করা নাশকতার মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাংবাদিক শওকত মাহমুদ, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, হানিফ পরিবহনের মালিক কফিল উদ্দিনসহ কয়েক শ’ বিএনপি ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীকে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। সোমবার তারা হাইকোর্টের বিভিন্ন বেঞ্চে হাজির হয়ে জামিন প্রার্থনা করলে আদালত তাদের জামিন মঞ্জুর করেন।

এ ছাড়া নাশকতার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় জামিন নিতে গতকাল হাইকোর্টের কয়েকটি বেঞ্চে হাজির হন শত শত বিএনপি ও বিরোধী দলের নেতাকর্মী। এ কারণে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ, হাইকোর্টে এনেক্স ভবন ও সুুপ্রিম কোর্ট বার ভবনে জামিন প্রার্থনাকারী মানুষের ভিড় দেখা যায়। সুপ্রিম কোর্টে জামিন নিতে আসা শত শত মানুষের মধ্যে কয়েক শ’ বিএনপি নেতাকর্মী জামিন পেলেও অনেকেই জামিনের জন্য অপেক্ষা করছেন। জামিন প্রার্থনাকারী ও তাদের আইনজীবীদের অভিযোগ- এসব গায়েবি ও কাল্পনিক মামলার সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করতে এসব মামলা করেছে পুলিশ।

শওকত মাহমুদের জামিন : রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের করা নাশকতার ১০ মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাংবাদিক শওকত মাহমুদকে ছয় সপ্তাহের আগাম জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। গতকাল হাইকোর্টে হাজির হয়ে জামিন প্রার্থনা করলে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন।

শওকত মাহমুদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সোহরাব হোসেন। তিনি বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন থানায় গত কয়েক মাসে শওকত মাহমুদের বিরুদ্ধে ১০টি নাশকতার মামলা দায়ের করে পুলিশ। গতকাল এসব মামলায় তিনি পৃথক দশটি আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ তাকে ছয় সপ্তাহের আগাম জামিন দেন।

অন্য দিকে রাজধানীর দারুস সালাম থানায় দায়ের হওয়া ১৫টি নাশকতার মামলায় হানিফ পরিবহনের বর্তমান মালিক বিএনপি নেতা কফিল উদ্দিনকে ৬ সপ্তাহের জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট বলে তার আইনজীবী জানিয়েছেন।

এ ছাড়া ঢাকার ৩০ জন, ঠাকুরগাঁওয়ের ১০০ জন, রংপুরের ৭০ জন, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানার ৮০ জন, ভৈরব থানার ৪৬ জন এবং কুমিল্লা দক্ষিণ সদর থানার ২৩ ও মুরাদনগর থানায় শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মী নাশকতার মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন।

বিএনপি নেতাদের পক্ষে জামিন আবেদনের শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি জয়নুল আবেদীন, বিএনপির আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, আইনজীবী সগীর হোসেন লিওন, মাসুদ রানা, গাজী কামরুল ইসলাম সজলসহ বেশ কয়েকজন আইনজীবী।

এ বিষয়ে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিসহ বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গায়েবি ও কাল্পনিক মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। এসব মামলায় পুলিশের হয়রানি থেকে রক্ষা পেতে বিএনপি নেতাকর্মীরা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনের সময় বিএনপি নেতাকর্মীরা যাতে মাঠে নামতে না পরে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও ভীতি সঞ্চার করার জন্য এসব মামলা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমার চেম্বার থেকে গতকাল প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন বিএনপি নেতাকর্মীর জামিন করানো হয়েছে।

এ বিষয়ে আইনজীবী সগীর হোসেন লিওন বলেন, সোমবার হাইকোর্ট থেকে নাশকতার মামলায় জামিন নিতে শত শত বিএনপি নেতাকর্মী আসেন। তাদের মধ্যে সাংবাদিক শওকত মাহমুদ, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, হানিফ পরিবহনের মালিক কফিল উদ্দিনসহ কয়েক শ’ নেতাকর্মী নাশকতার অভিযোগে দায়ের করা গায়েবি মামলায় জামিন পান। তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে ঠাকুরগাঁওয়ের ১০০ জন, রংপুরের ৭০ জন এবং ঢাকার ৩০ জনসহ ২০০ নেতাকর্মীর জামিন করিয়েছি।

আইনজীবী মাসুদ রানা জানান, তিনি ঢাকা, বগুড়া, নেত্রকোনাসহ বেশ কয়েকটি থানায় দায়ের করা নাশকতার মামলায় তিন শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মীর জামিন করিয়েছেন।

আইনজীবী গাজী কামরুল ইসলাম সজল জানান, দোহার ও নবাবগঞ্জ থানায় দায়ের হওয়া পৃথক নাশকতার ৪ মামলায় বিএনপি নেতা খন্দকার আশরাফ, আব্দুর রহিম মিয়া, শাহাবুদ্দীনসহ ২৫০ জন এবং বরিশাল জেলার গৌরনদী থানার ২ মামলায় ৬০ জন বিএনপি নেতাকর্মীর জামিন আবেদন করা হয়েছে। আজ (মঙ্গলবার) জামিন শুনানি হতে পারে।

আইনজীবীরা জানান, গত সেপ্টেম্বর থেকে দেশের বিভিন্ন থানায় বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় ৪ হাজার মামলা দায়ের করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে লাখ লাখ বিএনপিসহ বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীকে। সম্প্রতি এসব মামলার তদন্ত করতে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিশন গঠনের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়। রিট আবেদনে ‘গায়েবি ও কাল্পনিক’ এসব মামলা যারা দায়ের করেছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা চাওয়া হয়। প্রবীণ আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া এ রিট দায়ের করেন।

আইনজীবীরা জানান, ১০ বছর আগে মারা গেছেন এমন লোকদেরও এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে। ২০০৭ সালে মারা গেছেন, কিংবা চলতি বছর হজে ছিলেন, বিদেশে থাকেনÑ এমন লোকদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।

উৎসঃ নয়া দিগন্ত

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here