ভারতের আইন লংঘনের ফলে নদীমার্তৃক বাংলাদেশের নদীগুলোতে এখন পানি নেই

0
174

ভারত আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে উজান থেকে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় নদীমার্তৃক বাংলাদেশের নদীগুলোতে এখন পানি নেই। অনেক নদীর পেটে ফসল ফলানো হচ্ছে। অনেক নদীতে ধূধূ বালু চর। নদী যেমন হারিয়ে যাচ্ছে তেমনি শত শত টাকা খরচ করে নির্মিথ সুইচ গেইটগুলোও অকেজো হয়ে পড়েছে। গেটম্যান না থাকায় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মূলত সুইচ গেটগুলো ‘থেকেও নাই’ হয়ে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদাসিনতার কারণে পুর্ন:নিমাণ এবং নতুন করে সুইচ গেট হচ্ছে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খননের অভাবে পলি জমা পড়ে নদী ও খাল ভরাট করাতে ও নাব্য কমে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যেগুলো সচল রয়েছে সেগুলো কোনটা অকেজো আবার কোনটা সঠিক সময়ে দেখভাল না করায় গ্রামীণ কৃষি ব্যবস্থাপনায় দেখা দিয়েছে নানা সমস্যা।

সারাদেশে নদীর স্বাভাবিক চলার গতি ধরে রাখা এবং কৃষি ফসল বৃদ্ধিতে পানির সঠিক ব্যবহারের জন্য ৪ হাজার ৭২টি সুইচ গেট ও ৫২৯টি রেগুলেটর রয়েছে। পানি চলাচল না থাকার কারণে তিন হাজার সুইচ গেট ও রেগুলেটর প্রায় ২৫ বছর ধরে অকেজো। ৫শতাধিক সুইচ গেট বিভিন্ন সময়ে নদীভাঙ্গনে বিলিন হয়ে গেছে। অন্যদিকে সুইচ গেটে ও রেগুলেটর দেখাশোনার জন্য নিয়োজিত গেট ম্যান থাকলেও বাস্তবে অনেক জেলায় সুইচ গেট ও রেগুলেটর নেই। ভারত উজান থেকে পানি তুলে নেয়া এবং নদী খননের অভাবে পানি চলাচলের পথ বন্ধ। আবার অনেক সুইচ গেট ও রেগুলেটর দখল হয়ে গেছে। ১৫ বছর আগে সারাদেশের সুইচ গেট নির্মাণ ও সংস্কার সিদ্ধান্ত হলে তা বাস্তবায়ন করতে পারছে না পানি উন্নয়ন বোর্ডে। ভোলায় ১২টি সুইচ গেট। কিন্তু এখন ১০টিই অকেজো। জরাজীর্ণ সুইচ গেটগুলো দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। স্থানীয়রা সুইচ গেট গুলো মেরামত বা নতুন করে নির্মাণের দাবি জানালেও তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে এগুলো নষ্ট হয়েছে। সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে সুইচ গেট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে পানি সম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম ইনকিলাবকে বলেন, নদীর স্বাভাবিক চলার গতি ধরে রাখা এবং কৃষি ফসল বৃদ্ধিতে পানির সঠিক ব্যবহার এবং ভয়াবহ বন্যার হাত থেকে ফসল বাঁচাতে সুইচ গেট নির্মাণ করছে সরকার। নদী খননের অভাবে পানি চলাচলের পথ বন্ধ। এ বিষয়ে আমি ক্ষতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিব। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার বলেন, আসলে নদী খনন কাজ শুরু হচ্ছে। এ গুলো শুরু হলে সুইচ গেট ও রেগুলেটর নিয়ে কাজ করা হবে। আমরা চাই নদীর পানির প্রবাহ ধরে রাখতে। সেই লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।

পরিবেশ ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. আতিক রহমান ইনকিলাবকে বলেন, বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ পানিসংকটে ভুগছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আগামী বছরগুলোতে এই সংকট চরম রূপ ধারণ করবে। জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, গ্রীনহাউস গ্যাস বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি, এসব নিয়ে গোটা বিশ্বের মানুষ উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, পানি চলাচলের জন্য সুইচ গেট গুলোর দিকে নজর দেয়ার সময় এসেছে এখন। এ গুলোর সংস্কার করলে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে।

চীন ও ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলো বর্ষকালের নদ-নদীর পানি ধরে রাখা এবং পানি চলাচলের প্রবাহ ব্যবস্থা এখনো করতে পারেনি সরকার। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। ৪০৫ নদীর দৈর্ঘ ২৪ হাজার একশ ৪০ কিলোমিটার। এ গুলোর মধ্যে ৫৭টি আন্ত:সীমান্ত নদী। আন্ত:সীমার ৫৭টি নদীর মধ্যে ৫৪টি নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং ৩টি নদী এসেছে মায়ানমার থেকে। এসব নদীর মাধ্যমে বয়ে আসা পলি মাটির উপরিভাগে স্তর জমেছে। দেশের কৃষকের জমিতে ফসল বৃদ্ধি করা এবং মরুভুমির হাত থেকে দেশ রক্ষার জন্য ৪০৫ নদ-নদীর পানি নিস্কাসন করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে দুই হাজার ৩২৩টি সুইচ-গেট নির্মাণ এবং গেটম্যান নিয়োগ করে সরকার। দশ বছর যেতে না যেতে সুইচ গেট গুলো অকেজো হয়ে যায়। থমকে গেছে নদীর স্বাভাবিক গতি। পানি চলাচলের নিস্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় দখল হয়েছে হাজারো নদী। ভারত থেকে আসা ৫৪টি আন্ত:সীমান্ত নদীর ৪২টিতে বাঁধ নির্মাণ করে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নেয়ার শুরু করে। পানি উন্নয়ন বোর্ড শুস্কমৌসুমে পানি ধরে রাখা এবং দেশের কৃষি জমিতে ফসল বৃদ্ধি করতে সুইচ গেট নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে সারাদেশে ২০০ থেকে ২৫৯টি সুইচ গেট থাকলেও বাকি গুলো নদীর ভাঙ্গনে বিলিন হয়ে গেছে।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশের কৃষকের জমিতে ফসল বাড়ানো জন্য বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও নিস্কাশন, নদী তীর ভাঙ্গন প্রতিরোধ, ব-দ্বীপ উন্নয়ন, ভূমি পুনরুদ্ধার ৪০৫ নদ-নদীতে তীরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে খাল খনন এবং সুইচ-গেট নির্মাণের প্রকল্প চালু করে এর মধ্যামে সারাদেশে ৪ হাজার ৭২টি সুইচ গেট ও ৫২৯টি রেগুলেটর নির্মাণ করা হয়। পরে ১৯৯৪ খালেদা জিয়া সরকার সেচ, পানি উন্নয়ন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়কে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় করে নদীতীর ভাঙ্গন প্রতিরোধ, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তুত ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যারেজ, রেগুলেটর, সুইস, খাল, বেড়িবাঁধ, রাবার ড্যাম, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ ও খাল খনন-পুনঃখনন করে সেচ, পানিবদ্ধতা নিরসন, বন্যা প্রতিরোধ, নদীর তীর ভাঙ্গন প্রতিরোধে নতুন করে প্রকল্পের কাজ শুরু করে। পরে ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে জাতীয় পানি নীতি চুড়ান্ত করে পরে ২০১৩ সালে পাস করা হয়। দেশের পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উন্নয়ন সাধন। বন্যা, খরা, জলাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক নদীর প্রবাহ, লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন জনিত বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি, মৎস্য, বন রক্ষার ক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন সাধন করা। জাতীয় পানি নীতি, জাতীয় পানি মহাপরিকল্পনা, অংশগ্রহণ মূলক পানি ব্যবস্থাপনা গাইড লাইন এবং বাপাউবো আইন অনুসারে দেশের পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন। বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ পানি সংকটে ভুগছে। ভূগর্ভস্থ পানি কৃষিকাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। ভারত, চীন ও ভিয়েতনাম সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার সীমিত করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আগামী বছরগুলোতে এই সংকট চরম রূপ ধারণ করবে। এর মধ্যে বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের জন্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বিডব্লিউডিবি) কাজ করছে সম্পদ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ,সেচ, নিষ্কাশন, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং সমুদ্র থেকে জমি পুনরুদ্ধার।

যেসব জেলায় সুইচ গেট ও রেগুলেটর রয়েছে সে গুলো হচ্ছে, কুড়িগ্রামের চিলমারীর কাঁচকলের বাজার রেগুলেটর, উলিপুর উপজেলার থেতরাই এলাকায় গোড়াই পিয়ার সুইচ গেট, খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় তিনটি সুইচ গেট অবৈধভাবে খাল দখল করে মাছ চাষ করছে দখলদারেরা। পানিবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন খালের মুখে ১৪টি সুইচ গেট এর মধ্যে ১২টি পড়ে রয়েছে অচল অবস্থায়।

বিডব্লিউডিবি কয়েকটি বাস্তবায়ন করেছে পানি সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় ক্ষুদ্রও বয় প্রকল্প। পানিবাহী বাঁধ, নিষ্কাশন নিষ্কাশন চ্যানেল এবং সেচ খাল উপর নির্মিত হয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য। বিডব্লিউডিবি ১৪ হাজার ৫৯৭ কাঠামো তৈরি করেছে (টিওআর অনুযায়ী)। বন্যা নিয়ন্ত্রক, পালাবার, সেতু, কালভার্ট, সাইফন এবং জলদস্যু ইত্যাদি। এদের মধ্যে সুইচ সংখ্যা সর্বোচ্চ। এর আগে গ্যাস অপারেটর (গেট খালাশী) এই সুইচ নিয়ন্ত্রকদের অপারেশন করেছিলেন। বর্তমানে, অপর্যাপ্ত জনশক্তি কারণে,এইগুলি সঠিকভাবে পরিচালিত হয় না। নদীর চ্যানেল মাধ্যমে প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, এবং সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়, এটি দরজা যা ব্লক পুনরুদ্ধার/কাজ করা কঠিন।মসৃণ উদ্ধরণ এবং স্থায়িত্ব জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োাজন দরজা। সময় এবং বন্যা ক্ষতি হ্রাস সঙ্গে, পানিবাহী কাঠামো প্রয়োজন ধীরে ধীরে হ্রাস করা। তাছাড়া, এই কাঠামো অধিকাংশ দরকারী জীবন শেষ। অপর্যাপ্ত বা অপর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ক্ষেত্র বিভাগে প্রদান করা হয় পানিবাহী কাঠামো।

নিয়মিত মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণ অনুপস্থিতিতে, তার মসৃণ জন্য প্রয়োজন অপারেশন, পানিবাহী কাঠামো তার কার্যকারিতা হারাচ্ছে এবং অকার্যকরী হয়ে উঠছে। বর্তমানে নদী খনন কাজকে আরও গুরুত্ব দিচ্ছে। পানিবাহী কাঠামো কার্যকারিতা পর্যালোচনা করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। দ্য কমিটি আবার বিডব্লিউডিবি, এলজিইডি এবং লেভেল বোর্ডের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত উপ-কমিটি গঠন করে আরএইচডি এবং বিডব্লিউডিবি এবং স্থানীয় সরকার বিদ্যমান জলবাহী কাঠামোর তালিকা সংগ্রহ করেছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) কার্যকারিতা এবং শারীরিক সম্পর্কিত তথ্য সহশর্ত।

ভোলার মনপুরা উপজেলা কৃষক সামছুল আলম জানান, মেঘনার ভাঙন ও জোয়ারের পানি থেকে রক্ষার জন্য এখানে ১০০ কিলোমিটার বাঁধের উপর নির্মাণ করা হয় ১২টি সুইচ গেট। কিন্তু এখন ১০টিই অকেজো। জরাজীর্ণ সুইচ গেটগুলো নতুন করে নির্মাণের দাবি করেন তিনি।

উৎসঃ ‌ইনকিলাব

আরও পড়ুনঃ পানি নয়, ইলিশের জন্য খুলছে ফারাক্কা


পানি দেয়ার ইচ্ছা থাকুক আর নাই থাকুক ইলিশ পাওয়ার ইচ্ছাটা তাদের রয়েছে শতভাগ। আর সে জন্যই এ বছরের জুন মাস থেকে খুলে দেয়া হবে ফারাক্কা বাঁধের নতুন নেভিগেশন লক। যাতে ইলিশ সাতরে ভারতের এলাহাবাদ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে।

ভারতীয় কর্মকর্তারা জানান, ইলিশের মৌসুমে প্রতিদিন চার ঘণ্টা করে কিছুটা উঁচু করে স্লুইচ গেট খোলা রাখা হবে। যাতে ইলিশের আগমনে কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয়।

গঙ্গার জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় ভারত কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্ষা মৌসুমসহ তিনটি মৌসুমে যেন বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা ইলিশ পদ্মা-গঙ্গা বেয়ে ভারতের অনেকখানি ভিতরে ঢুকে যেতে পারে সে লক্ষ্যেই ৩৬১ কোটি রুপি ব্যয়ে নতুন এ কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে বলে গত শুক্রবার জানান ভারতের পানি সম্পদমন্ত্রী নিতিন গাদকারি।

ভারতের অভ্যন্তরীণ পানিপথ কর্তৃপক্ষের ভাইস চেয়ারম্যান প্রবির পান্ডে বলেন, ইলিশ যেহেতু রাতে চলাচল করে, তাই এই গেট প্রতিদিন রাত একটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত খোলা রাখা হবে। আইসিএআরসি সেন্টার ইনল্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট, কেন্দ্রীয় ওয়াটার কমিশন ও ফারাক্কা ব্যারেজ প্রজেক্ট অথরিটির সঙ্গে আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এ প্রকল্প চালু হলে ৪০ বছর পর আসন্ন বর্ষার মৌসুমে ফের ফারাক্কা দিয়ে এলাহাবাদের গঙ্গায় ঢুকতে পারবে ইলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে ভারতে আবারো ইলিশের প্রাচুর্য দেখা দেবে।

ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফারাক্কা বাধ তৈরি হওয়ার আগে ফারাক্কা দিয়ে ভারতের গঙ্গা হয়ে এলাহাবাদে ধরা পড়তো সাগরের ইলিশ। কিন্তু বাঁধটি চালু হওয়ার পর থেকে এর নেভিগেশন লকের কারণে ইলিশ এলাহাবাদ পর্যন্ত যেতে পারতো না। সম্প্রতি লকটি নতুন করে ডিজাইন করা হয়েছে। ফলে প্রজনন মৌসুমে ইলিশের যাতায়াতে বাধা থাকবে না।

উৎসঃ ‌নয়া দিগন্ত

আরও পড়ুনঃ আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ বেড়েছে ছয়গুণ


এ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে জানুয়ারি মাসে দেশে মোট ৬৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে ধর্ষণ ৪৮টি ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ১৯টি। গত বছরের একই সময়ে দেশে ১৯টি ধর্ষণ ও তিনটি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ ২০১৮ সালের জানুয়ারির তুলনায় এ বছরের জানুয়ারিতে দেশে ধর্ষণের ঘটনা তিনগুণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা প্রায় ছয়গুণ বেড়েছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের গবেষণায় উঠে আসা এই পরিসংখ্যানের বিষয়ে নারী নেত্রী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বিচারহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতির কারণে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। তাদের ভাষ্য, ধর্ষণ মামলা তদন্তে বা ভিকটিমের অভিযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও গাফিলতি হচ্ছে কিনা, তা মনিটরিং থাকতে হবে। কেননা, বিচার ব্যবস্থা সার্বিকভাবে জেন্ডার সংবেদনশীল না হওয়ায় পাওয়ার ম্যানুপুলেশনের সুযোগ থাকে।

বাংলা ট্রিবিউনের গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে দেশে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে মোট ৬৭টি। ২০১৮ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২২টি। ২০১৯ সালে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন ১৯ জন, এ সংখ্যা ২০১৮ সালের একই সময়ে ছিল তিনটি।

তিনটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের উপাত্ত নিয়ে এ গবেষণা করে বাংলা ট্রিবিউন। গবেষণায় পাওয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় এ বছরের শুরুতেই বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এ বছর ছাত্রী ও গৃহবধূরা ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বেশি। কর্মজীবী নারীদের মধ্যে পোশাক শ্রমিকরা বেশি ধর্ষণের শিকার হন। এই সহিংসতার শিকার হয়েছেন শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী নারীরাও।

২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ধর্ষণের খবর পাওয়া যায় ১৬টি জেলা থেকে, ২০১৯ সালের একই সময়ে ৩৫টি জেলা এ ধরনের সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।

গবেষণায় পাওয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার তুলনামূলক চিত্রও বেশ উদ্বেগজনক। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ৩১ জন শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয় ২১ জন, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয় তিন জন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭ জনকে। অন্যদিকে, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে সাতটি শিশু এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়, এর মধ্যে দু’টি শিশুকে হত্যা করা হয়।

নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর মনে করেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে ধর্ষণের ঘটনা কমছে না। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে যে ধর্ষণের খবরগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তার কয়টির বিচার হয়েছে। ধর্ষণের মতো ফৌজদারি অপরাধ করে যখন ধর্ষক পার পেয়ে যায়, তখন তা অপরাধকে উৎসাহিত করে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ধর্ষণ কমবে— এমনটা আশা করা ঠিক না।’

রোকেয়া কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রথমত, ধর্ষণের ঘটনার বিচার হতে হবে। দ্বিতীয়ত, ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে ভিকটিম যেন নির্ভয়ে বিচার চাইতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সংখ্যাগতভাবে ধর্ষণ বাড়ছে দুটো কারণে। এক. আগে ধর্ষণের সংবাদ পত্রিকায় কম আসতো। আরেকটি হলো সমাজে অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিচারহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতির কারণে অপরাধপ্রবণতা বেড়েছে। এমন অপরাধের (ধর্ষণ) ক্ষেত্রে বিচার না হওয়া, অপরাধী পার পেয়ে যাওয়ার পরিমাণ বাড়ছে।’

ধর্ষণ ঘটনার খুব কমই বিচার হয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, বিচার হলেও অভিযুক্ত খালাস পেয়ে যাচ্ছে। সাক্ষীর অভাব, বাদীর অনীহা, পুলিশের গাফিলতিতে দুর্বল চার্জশিট দেওয়া ইত্যাদি কারণে ধর্ষণ প্রমাণ কঠিন হয়। সমাজের মধ্যে এ ধরনের অপরাধের ব্যাপারে মানুষ সোচ্চার হলেও ভিকটিমকে ইতিবাচকভাবে দেখা হয় না। নারীকে অবহেলার চোখে দেখা হয়।’

বেশ কিছু করপোরেট অফিস থেকে নারী নির্যাতনের খবর আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নারীরা আসলে রাস্তা-বাড়ি-কর্মক্ষেত্র কোথাও নিরাপদ না। এটি ব্যাপকতা পেয়েছে। একজন নারী, সে যদি অফিসেও যৌন হয়রানির শিকার হন, সেখানেও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম বলেন, ‘পিতৃতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা নারীকে সম্মানের জায়গায় অধিষ্ঠিত হতে বাধা দেয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ধর্ষণরোধে আইন হতে হবে এবং ধর্ষণের সংজ্ঞা নিয়ে বর্তমান বাস্তবতাকে মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। বিচার না হওয়ার কারণে অপরাধ দ্বিগুণ-তিনগুণ হবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিচার হবে কী করে, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। সাক্ষীর নিরাপত্তার কোনও জায়গা আমরা রাখিনি। অথচ, ভিকটিমের সাক্ষী লাগবে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার মেডিক্যাল পরীক্ষা হতে হবে, কিন্তু আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সবসময় সেই সহযোগিতা নিশ্চিত করা যায় না। তাহলে কীভাবে প্রতিকার মিলবে?’

আয়েশা খানম বলেন, ‘ধর্ষণ মামলা তদন্তে বা ভিকটিমের অভিযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও গাফলতি হচ্ছে কিনা, সেই বিষয়ে মনিটরিং থাকতে হবে। বিচার ব্যবস্থা সার্বিকভাবে জেন্ডার সংবেদনশীল না, ফলে পাওয়ার ম্যানুপুলেশনের সুযোগগুলো থাকে। নারী ভিকটিম হলে তাকে ইতিবাচক সহায়তা দেওয়ার বদলে কোন কোন কারণে তার ধর্ষণ জায়েজ, সমাজ এখনও সেদিকেই বেশি মনোযোগ দেয়। এসব বদলাতে অপরাধকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে তার বিচার হতে হবে।’

উৎসঃ ‌banglatribune

আরও পড়ুনঃ ভিন্নমত ও বিভিন্ন প্রতিবাদ আন্দোলন দমনের কারণে পদক পেল পুলিশ বাহিনী!


ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নিহত সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সহসম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর মায়ের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে লুটিয়ে পড়ার ছবিটি দেখে অপরাধীরা ছাড়া আর সবারই বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠার কথা। এর আগে ২০১৭ সালের নভেম্বরেও দিয়াজের মা ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে আমৃত্যু অনশনে বসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। হত্যার বিচারের আশ্বাসে তখন তিনি অনশন ভেঙেছিলেন। কিন্তু ২০১৬ সালের নভেম্বরের সেই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি গোষ্ঠীর প্রকাশনায় হত্যায় অভিযুক্ত একজনের বাণী ছাপা হয়েছে। অর্থাৎ দলীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অভিযুক্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক পুনর্বাসন অনেকটাই সাধিত হয়েছে।

বিচারপ্রার্থী দিয়াজের মা যখন দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে লুটিয়ে পড়েছেন, ঠিক তখনই ঢাকায় সুপ্রিম কোর্টের আঙিনায় অসহায় অজ্ঞাতনামাদের অবিচার থেকে মুক্তি চাওয়ার আর্তি। ধান বিক্রি করার টাকা খরচ করে পুলিশি হয়রানি থেকে রেহাই পেতে জামিনের জন্য দেশের সর্বোচ্চ আদালতে ধরনা দিয়ে বসে আছেন শত শত মানুষ। এঁদের অনেকেই হয়তো এর আগে কখনো ঢাকায় পা ফেলেননি। বছরের শুরু থেকে দেশের নানা প্রান্ত থেকে জামিনের আশায় ভিড় করছেন ৪ হাজারের বেশি গায়েবি মামলার আসামি শত শত মানুষ। এঁদের মধ্যে আছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, সত্তরোর্ধ্ব প্রায় চলনশক্তিহীন মানুষও, যাঁরা দলবাজির রাজনীতির ধারেকাছেও নেই। এ রকম গায়েবি মামলায় কতজন কারাগারে বন্দী আছেন, সেই হিসাব কারও কাছেই নেই। তবে মানবাধিকার সংগঠক সুলতানা কামাল বলেছেন, দেশের কারাগারগুলোতে বন্দীদের প্রতি তিনজনের দুজনই বিনা বিচারে আটক রয়েছেন। অবিচারের শিকার নির্দোষ জাহালমের তিন বছর কারাভোগের পর মুক্তিলাভের খবরের পটভূমিতে এসব বিনা বিচারের বন্দীর দুর্ভোগের বিষয়টি মোটেও উপেক্ষণীয় নয়।

ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই বিশ্ব গণমাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও সংবাদ শিরোনামে ফিরে এসেছে। নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয়টি নিয়ে জানুয়ারিজুড়ে নানা ধরনের বিচার-বিশ্লেষণের পর ফেব্রুয়ারির শুরুতে আলোচনায় এসেছে হারকিউলিস। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা কথিত ক্রসফায়ারের অভিযোগ কয়েক বছর ধরে বেড়েই চলেছে। এই পটভূমিতে ধর্ষণের অভিযোগে কয়েকজন সন্দেহভাজনের সাম্প্রতিক রহস্যজনক হত্যাকাণ্ড এই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ রকম কয়েকটি শিরোনাম হচ্ছে: ‘হারকিউলিস ভিজিল্যান্টে কিলস্ সাসপেক্টেড রেপিস্টস ইন বাংলাদেশ’ (আল-জাজিরা, ৬ ফেব্রুয়ারি), ‘ডেথস অব অ্যাকিউজড রেপিস্টস ইন বাংলাদেশ টায়েড টু সাসপেক্টেড ভিজিল্যান্টে’ (ইউপিআই, ৬ ফেব্রুয়ারি), ‘ইন বাংলাদেশ, এ সিরিয়াল কিলার কলড হারকিউলিস ইজ টার্গেটিং অ্যালেজড রেপিস্টস’ (জি নিউজ, ৫ ফেব্রুয়ারি), ‘হারকিউলিস সাইনস ডেথ ওয়ারেন্টস অব অ্যালেজড রেপিস্টস ইন বাংলাদেশ’ (টিআরটি ওয়ার্ল্ড, ৫ ফেব্রুয়ারি)। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এসব সংবাদ শিরোনাম বাংলাদেশে আইনের শাসনের দুর্বলতার করুণ প্রতিফলন।

এই সপ্তাহেই সাড়ম্বরে পালিত হয়েছে পুলিশ সপ্তাহ। এ সময়ে পুলিশের প্রায় ৪০০ কর্মকর্তা পেশাগত কাজে কৃতিত্ব প্রদর্শনের জন্য পদক ও প্রণোদনামূলক পুরস্কার পেয়েছেন। কেউ কেউ দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারের মতো পুরস্কৃত হয়েছেন। যাঁরা পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে যোগ্য কেউ ছিলেন না, তা নয়। তবে অনেক পুরস্কারের ক্ষেত্রে কারণগুলো স্পষ্টতই গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের মূল্যবোধের পরিপন্থী। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী বাহিনীর কথিত সাফল্য ও ব্যর্থতার প্রকট বৈপরীত্যের প্রতিফলন আর কী হতে পারে? নিরীহ কাউকে হয়রানি না করতে পুলিশের প্রতি নির্দেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে গাছের ছায়ায় জামিনের অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলোর কানে কি পরিহাসের মতো শোনায়নি?

যাঁরা পদক পেয়েছেন তাঁদের কৃতিত্বের যেসব বিবরণ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে আছে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন ও কোটাবিরোধী আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ, কথিত ‘রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণামূলক’ সাক্ষাৎকারের জন্য (আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে) গ্রেপ্তারে ‘পেশাগত দক্ষতা’র স্বীকৃতি, ডিজিটাল মাধ্যমে কথিত অপপ্রচার বন্ধে সাফল্য ইত্যাদি। প্রতিবাদ-বিক্ষোভের বৈধ নাগরিক অধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা চর্চার বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও দমন-পীড়নের স্বীকৃতি দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের পদক দেওয়ার ঘটনা এক নতুন দৃষ্টান্ত। দৃশ্যত এর উদ্দেশ্য: ১. পুলিশকে দমনমূলক নীতি অনুসরণে উৎসাহ দেওয়া; ২. সরকারবিরোধী সব দল, গোষ্ঠী ও ব্যক্তির মধ্যে ভীতি ছড়ানো, যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলন দানা বাঁধতে না পারে।

রাজনৈতিক দলগুলো যে প্রতিবাদ জানানোর শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছে, তাতে সন্দেহ নেই। এর ফলে নাগরিক সমাজে সৃষ্ট উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছে বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে যে তারা উদ্বিগ্ন। কেননা, যেসব সাফল্যের জন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের পদক দেওয়া হয়েছে, সেসব ঘটনার প্রতিটির ক্ষেত্রেই পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘নিষ্ক্রিয়তা’, ‘পক্ষপাতিত্ব’ বা ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের’ অভিযোগ সর্বজন বিদিত।

টিআইবি আরও বলেছে, পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরে শুদ্ধাচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি চর্চা সব নাগরিকের নিরাপত্তা ও আইনের সমান সুযোগ লাভের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য। তাই শান্তি ও জনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ আইন লঙ্ঘনকারীকে বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীকে সর্বোচ্চ পেশাদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময় পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের যেসব অভিযোগ উঠেছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। এই বাহিনীর প্রতি জনগণের নির্ভরশীলতা প্রতিষ্ঠায় এই মুহূর্তে এটাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।

টিআইবির এই দাবি নতুন নয়। বরং পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো তদন্তের জন্য একটি আলাদা ও স্বাধীন তদন্ত সংস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি অনেক দিনের। পুলিশে যেসব সংস্কারের জন্য ২০০৯ সালে সরকার জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সঙ্গে সমঝোতা করেছিল, তাতে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কথা ছিল। পুলিশ কমপ্লেইন্টস কমিশন বা পুলিশ কমিশন গঠিত হলে পুলিশের কর্তাব্যক্তিদের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা কিছুটা খর্ব হবে বলে তাঁরা এ বিষয়ে ছাড় দিতে রাজি নন, এটা জানা কথা। কিন্তু রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা দুর্ভাগ্যজনক।

গত এক দশকেও আমাদের রাজনীতিকেরা ওই সুপারিশটি বাস্তবায়নের পথে পা বাড়াননি। এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা পুলিশকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার ছাড়া আর কী হতে পারে? রাজনীতিকেরা এটা ভালোই জানেন যে এ রকম স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জবাবদিহির ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হলে পুলিশকে দলীয় কাজে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়বে। ৩০ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে দলীয় স্বার্থে নজিরবিহীনভাবে পুলিশকে কাজে লাগানো অথবা নিষ্ক্রিয় করায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। নির্বাচনের মাত্র এক মাসের মাথায় পুলিশ কর্তাদের পুরস্কারের বিষয়ে তাই প্রশ্ন ওঠা মোটেও অস্বাভাবিক নয়।

পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সদস্যদের বীরত্বপূর্ণ কাজ কিংবা জনস্বার্থমূলক ব্যতিক্রমী ভূমিকার স্বীকৃতি দেওয়ার রীতি সব দেশেই আছে। সাধারণত স্বাধীনতা দিবস বা জাতীয় দিবসগুলোতে এসব পদক দেওয়া হয়। সমাজ-সংস্কৃতির অগ্রযাত্রায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের যেভাবে সম্মান জানানো হয়, পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও তাঁদের দায়িত্ব পালনে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য এ ধরনের স্বীকৃতির ন্যায্য দাবিদার। কিন্তু জনমনে যদি এমন ধারণা হয় যে এই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক স্বার্থ, বিশেষত দলীয় বিবেচনার ছায়া পড়েছে, তাহলে তা বিতর্কের জন্ম দিতে বাধ্য। এবারের পুলিশ সপ্তাহে বিদেশে দূতাবাসে পদায়ন ও আলাদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মতো বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবিগুলোও এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে পুলিশের সাম্প্রতিক ভূমিকা ও তাদের পুরস্কার ও প্রণোদনার পদক্ষেপগুলো সেই বিতর্ক বাড়িয়েই দিয়েছে।

লেখক: সাংবাদিক কামাল আহমেদ

উৎসঃ ‌প্রথম আলো

আরও পড়ুনঃ আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ বেড়েছে ছয়গুণ


এ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে জানুয়ারি মাসে দেশে মোট ৬৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে ধর্ষণ ৪৮টি ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ১৯টি। গত বছরের একই সময়ে দেশে ১৯টি ধর্ষণ ও তিনটি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ ২০১৮ সালের জানুয়ারির তুলনায় এ বছরের জানুয়ারিতে দেশে ধর্ষণের ঘটনা তিনগুণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা প্রায় ছয়গুণ বেড়েছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের গবেষণায় উঠে আসা এই পরিসংখ্যানের বিষয়ে নারী নেত্রী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বিচারহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতির কারণে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। তাদের ভাষ্য, ধর্ষণ মামলা তদন্তে বা ভিকটিমের অভিযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও গাফিলতি হচ্ছে কিনা, তা মনিটরিং থাকতে হবে। কেননা, বিচার ব্যবস্থা সার্বিকভাবে জেন্ডার সংবেদনশীল না হওয়ায় পাওয়ার ম্যানুপুলেশনের সুযোগ থাকে।

বাংলা ট্রিবিউনের গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে দেশে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে মোট ৬৭টি। ২০১৮ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২২টি। ২০১৯ সালে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন ১৯ জন, এ সংখ্যা ২০১৮ সালের একই সময়ে ছিল তিনটি।

তিনটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের উপাত্ত নিয়ে এ গবেষণা করে বাংলা ট্রিবিউন। গবেষণায় পাওয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় এ বছরের শুরুতেই বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এ বছর ছাত্রী ও গৃহবধূরা ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বেশি। কর্মজীবী নারীদের মধ্যে পোশাক শ্রমিকরা বেশি ধর্ষণের শিকার হন। এই সহিংসতার শিকার হয়েছেন শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী নারীরাও।

২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ধর্ষণের খবর পাওয়া যায় ১৬টি জেলা থেকে, ২০১৯ সালের একই সময়ে ৩৫টি জেলা এ ধরনের সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।

গবেষণায় পাওয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার তুলনামূলক চিত্রও বেশ উদ্বেগজনক। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ৩১ জন শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয় ২১ জন, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয় তিন জন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭ জনকে। অন্যদিকে, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে সাতটি শিশু এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়, এর মধ্যে দু’টি শিশুকে হত্যা করা হয়।

নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর মনে করেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে ধর্ষণের ঘটনা কমছে না। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে যে ধর্ষণের খবরগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তার কয়টির বিচার হয়েছে। ধর্ষণের মতো ফৌজদারি অপরাধ করে যখন ধর্ষক পার পেয়ে যায়, তখন তা অপরাধকে উৎসাহিত করে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ধর্ষণ কমবে— এমনটা আশা করা ঠিক না।’

রোকেয়া কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রথমত, ধর্ষণের ঘটনার বিচার হতে হবে। দ্বিতীয়ত, ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে ভিকটিম যেন নির্ভয়ে বিচার চাইতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সংখ্যাগতভাবে ধর্ষণ বাড়ছে দুটো কারণে। এক. আগে ধর্ষণের সংবাদ পত্রিকায় কম আসতো। আরেকটি হলো সমাজে অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিচারহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতির কারণে অপরাধপ্রবণতা বেড়েছে। এমন অপরাধের (ধর্ষণ) ক্ষেত্রে বিচার না হওয়া, অপরাধী পার পেয়ে যাওয়ার পরিমাণ বাড়ছে।’

ধর্ষণ ঘটনার খুব কমই বিচার হয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, বিচার হলেও অভিযুক্ত খালাস পেয়ে যাচ্ছে। সাক্ষীর অভাব, বাদীর অনীহা, পুলিশের গাফিলতিতে দুর্বল চার্জশিট দেওয়া ইত্যাদি কারণে ধর্ষণ প্রমাণ কঠিন হয়। সমাজের মধ্যে এ ধরনের অপরাধের ব্যাপারে মানুষ সোচ্চার হলেও ভিকটিমকে ইতিবাচকভাবে দেখা হয় না। নারীকে অবহেলার চোখে দেখা হয়।’

বেশ কিছু করপোরেট অফিস থেকে নারী নির্যাতনের খবর আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নারীরা আসলে রাস্তা-বাড়ি-কর্মক্ষেত্র কোথাও নিরাপদ না। এটি ব্যাপকতা পেয়েছে। একজন নারী, সে যদি অফিসেও যৌন হয়রানির শিকার হন, সেখানেও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম বলেন, ‘পিতৃতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা নারীকে সম্মানের জায়গায় অধিষ্ঠিত হতে বাধা দেয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ধর্ষণরোধে আইন হতে হবে এবং ধর্ষণের সংজ্ঞা নিয়ে বর্তমান বাস্তবতাকে মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। বিচার না হওয়ার কারণে অপরাধ দ্বিগুণ-তিনগুণ হবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিচার হবে কী করে, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। সাক্ষীর নিরাপত্তার কোনও জায়গা আমরা রাখিনি। অথচ, ভিকটিমের সাক্ষী লাগবে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার মেডিক্যাল পরীক্ষা হতে হবে, কিন্তু আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সবসময় সেই সহযোগিতা নিশ্চিত করা যায় না। তাহলে কীভাবে প্রতিকার মিলবে?’

আয়েশা খানম বলেন, ‘ধর্ষণ মামলা তদন্তে বা ভিকটিমের অভিযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও গাফলতি হচ্ছে কিনা, সেই বিষয়ে মনিটরিং থাকতে হবে। বিচার ব্যবস্থা সার্বিকভাবে জেন্ডার সংবেদনশীল না, ফলে পাওয়ার ম্যানুপুলেশনের সুযোগগুলো থাকে। নারী ভিকটিম হলে তাকে ইতিবাচক সহায়তা দেওয়ার বদলে কোন কোন কারণে তার ধর্ষণ জায়েজ, সমাজ এখনও সেদিকেই বেশি মনোযোগ দেয়। এসব বদলাতে অপরাধকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে তার বিচার হতে হবে।’

উৎসঃ ‌banglatribune

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here