আল জাজিরার হেড টু হেড নিয়ে ড. গওহর রিজভীর সাথে কিছু কথা!

0
307

আল জাজিরার হেড টু হেডে আমার একটা চমৎকার অভিজ্ঞতা হলো। মেহেদী হাসান এই শো’টির পাবলিক ফেইস হলেও এর পিছনে যে টীমটি কাজ করে তাদের কর্মনিষ্ঠা ঈর্ষণীয়। বাংলাদেশ বিষয়ে তারা একটি এপিসোড করবে জানিয়ে তারা যখন প্রথম আমার সাথে যোগাযোগ করে তখন আমি আসলে বেশ স্কেপ্টিক্যাল ছিলাম কারণ শো’টির প্রযোজকদের বাংলাদেশের রাজনীতি বিষয়ক ধারণা ছিলো একেবারেই ভাসাভাসা। অনুষ্ঠানের রেকর্ডিংয়ে যখন দেখলাম মাত্র কয়েক মাসের প্রস্তুতি দিয়ে তারা মেহেদী হাসানের হাতে এমন একটা ওয়েল-রিসার্চড স্ক্রীপ্ট তুলে দিয়েছে তখন অবাক আর মুগ্ধ হয়েছি অবশ্যই।

মূল ইভেন্টটি কিন্তু ছিলো তিন ঘন্টার মতো, সেখান থেকে এডিট করে ৪৫ মিনিটের মতো নিয়ে এই এপিসোডটি ব্রডকাস্ট করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের রেকর্ডিংয়ের সময় অক্সফোর্ড ইউনিয়নে যারা ছিলেন তারা পুরোটাই দেখেছেন, শুনেছেন।

ভিডিওঃ ‘প্রশ্নবাণে গওহর রিজভী ও আওয়ামীলীগকে ধুয়ে দিল আল জাজিরা!’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

আল জাজিরার শো’টি ইন্টারন্যাশনাল অডিয়েন্সের জন্য, তারা সেটা মাথায় রেখে এডিট করবে তাই স্বাভাবিক। তবে আমার মনে হয়েছে তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গাই কেটে বাদ দিয়েছে। গওহর রিজভীর সাথে আমার কিছু আলাপ তারা ব্রডকাস্ট করেনি। সেটা তাদের বিবেচনা। তবে আমি এখানে এই রেকর্ডটি রাখতে চাই — সেদিন যারা অক্সফোর্ড ইউনিয়নে ছিলেন তারা এর স্বাক্ষী।

১. বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তাঁর স্মৃতিকথায় গওহর রিজভীর কথা লিখেছেন যে রিজভী জানতেন কিভাবে শেখ হাসিনা ডিজিএফআই লেলিয়ে দিয়ে বিচারপতি সিনহাকে দেশছাড়া করেছিলেন। আবার বিচারপতি সিনহা আমাকে ইন্টারভিউ দিয়ে বলেছেন যে বাংলাদেশে প্রায় সকল এনফোর্সড ডিজএপিয়ারয়েন্সের জন্য ডিজিএফআই দায়ী। আমি সরাসরি গওহর রিজভীকে এই রেফারেন্স দিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, তিনি কোনও সন্তোষ জনক উত্তর (স্বীকার বা অস্বীকার) দেননি — তবে বলেছেন যে বিচারপতি সিনহার স্মৃতিকথা এবং সিনহার সাথে আমার ইন্টারভিউ দুটিই তিনি পড়েছেন।

২. বিচারপতি সিনহা আমাকে ইন্টারভিউ দিয়ে দাবী করেছিলেন যে শেখ হাসিনা হেফাজতে ইসলামকে টাকা দিয়ে ঠান্ডা রাখেন। হেফাজতের আমীর আহমদ শফী নিজেও বলেছেন যে আওয়ামী লীগের লোকজন তাদের মোটা অংকের সাহায্য দেয়। আমি এই দুটি রেফারেন্স দিয়ে কমেন্ট করেছিলাম। আমার কমেন্টের একটা অংশ (“কওমী জননী”) রেখে বাকিটা কেটে দেওয়া হয়েছে। আমার এই কমেন্টের সূত্র ধরে মেহেদী হাসান গওহর রিজভীকে প্রশ্ন করেন যে “শেখ হাসিনা কি হেফাজতে ইসলামকে টাকা দেন”? রিজভী এই প্রশ্নটির উত্তরও নিজের প্রশ্ন দিয়ে দেন — মেহেদী হাসানকে বলেন “আপনাকে কেউ এরকম প্রশ্ন করলে কি করতেন?” মেহেদী তখন উত্তর দেন “ওহ! এটাতো খুবই সোজা। আমি বলবো: না আমি দেই না…” বলাই বাহুল্য, এই পর্বেও দর্শকরা উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করেন। এই অংশটিও ব্রডকাস্টে বাদ গেছে।

আল জাজিরার হেড টু হেডে এই এপিসোডের টাইটেল ছিল: “বাংলাদেশ কি একটি এক-দলীয় রাষ্ট্র হয়ে যাচ্ছে?” এর উত্তরটাওতো আমরা সবাই জানি। বাংলাদেশে এখন দল (আওয়ামী লীগ) কোথায় শেষ হয় আর রাষ্ট্র (বাংলাদেশ) কোথায় শুরু হয় তারতো আসলে কোনও ঠিক নেই। এর নমুনা বা প্রমাণতো আমরা দেখলাম চাক্ষুষ। হেড টু হেডে শেখ হাসিনার উপদেষ্টা গওহর রিজভী কোথায় শেষ হয়েছেন আর “বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত” সৈয়দা মুনা তাসনিম কোথায় শুরু হয়েছেন তারতো কোনও লাইন ছিলোনা — দুইজনই লকলকিয়ে শেখ হাসিনার বন্দনা করেছেন।

সৈয়দা মুনা যে আমাকে ব্যাক্তিগতভাবে আক্রমণ করেছেন তাতে আমি একটুও অবাক হইনি। আমি কেন, কবে দেশ ছেড়েছিলাম সেটা তিনি খুব ভালো করেই জানেন, তারপরও নির্লজ্জভাবে মিথ্যাচার করেছেন অন ক্যামেরা। আমি তার কাছ থেকে ঠিক এই আচরণটিই এক্সপেক্ট করছিলাম। সেদিন যারা অক্সফোর্ড ইউনিয়নে ছিলেন তারা স্বাক্ষী যে এরপরেও আমি তাঁকে পূর্ণ সম্মান দেখিয়ে কথা বলেছি, এক্সেলেন্সি বলেই সম্বোধন করেছি পুরোটা সময়। সৈয়দা মুনা রাষ্ট্রদূত হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিধি, তাঁর সাথে অক্সফোর্ড ইউনিয়নের মতো জায়গায় নোংরা বাদানুবাদে লিপ্ত হওয়াটা আমার সমীচীন মনে হয়নি।

আওয়ামী সাংবাদিক শ্রদ্ধেয় আব্দুল গাফফার চৌধুরী সারাজীবন লন্ডনে বসে যদি ঢাকায় কলাম লিখতে পারেন বা আওয়ামী মুখপাত্র সজীব ওয়াজেদ জয় যদি ডিসি/ভার্জিনিয়াতে বসে বাংলাদেশ নিয়ে ফেইসবুকে পোস্ট দিতে পারেন, টুইট করতে পারেন বা দশকের পর দশক ব্রিটেনে থেকে ব্রিটিশ নাগরিক শেখ রেহানা যদি আওয়ামী লীগের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হতে পারেন তাইলে আমি কেন সুইডেন থেকে বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলতে পারবোনা?

বাংলাদেশের মানুষেরতো দুর্ভাগ্য আর লজ্জা যে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে খোলামেলা আলাপ করতে যেতে হয় কাতারী আমীরের স্পন্সরড চ্যানেলে। এই যে এখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ সাংবাদিক মেহেদী হাসানের প্রশংসা করছে আর বাংলাদেশের সাংবাদিকদের গালাগালি করছে এই লজ্জাটা কার আসলে?

শেষ করি ড. গওহর রিজভীকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানিয়ে। অক্সফোর্ড ইউনিয়নে তিনি যেভাবে প্রায় তিন ঘন্টা হাসির পাত্র হয়েছেন তাতে আমার আসলে খারাপই লেগেছে। এমনটি হবে তাতো জানাই ছিলো। তারপরও তিনি যে অক্সফোর্ডে গিয়ে মেহেদী হাসানের মুখোমুখি হয়েছেন সেটা তাঁর সাহসিকতারই পরিচয়। শেখ হাসিনাতো কখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে লাইভ ইন্টারভিউ দেবেননা — সেই সাহসতো শেখ হাসিনার নাই।

লেখকঃ তাসনিম খলিল (আল জাজিরার সাংবাদিক)

উৎসঃ ‌আল জাজিরা

আরও পড়ুনঃ আল-জাজিরায় প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে নাকানি-চুবানি খেল গওহর রিজভী! (ভিডিও সহ)


বাংলাদেশের গণতন্ত্র হীনতা এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এক দলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা নিয়ে প্রভাবশালী গণমাধ্যম আল-জাজিরার মুখোমুখি হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক মেহদি হাসানের সঞ্চালনায় ‘হেড টু হেড’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে অনেকটা নাকানি-চুবানি খেয়েছেন হাসিনার এই উপদেষ্টা। অনুষ্ঠানে তথ্য-প্রমাণসহ সঞ্চালক, বিশেষজ্ঞ এবং অংশগ্রহণকারীদের করা প্রশ্নে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি বরং সব বিষয়ে সরকারের সাফাই আর অস্পষ্ট উত্তর দিয়ে অনুষ্ঠানে হাসির খোরাকে পরিণত হন।

ভিডিওঃ ‘প্রশ্নবাণে গওহর রিজভী ও আওয়ামীলীগকে ধুয়ে দিল আল জাজিরা!’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

অক্সফোর্ড ইউনিয়নে দর্শকদের উপস্থিতিতে ড. গওহর রিজভীর সঙ্গে আলজাজিরার এই সাক্ষাতকারে বাংলাদেশে সদ্য সমাপ্ত সরকার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন, বিরোধীদলের নেতা-কর্মীদের উপর ধর-পাকড়, বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড, গুম, মত প্রকাশ-আইনেরশাসনের অবনতি, রোহিঙ্গা ও যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনালের মতো ইস্যুগুলোতে উঠে আসে একের পর এক প্রশ্ন।

শেখ হাসিনার এই উপদেষ্টা যখন সরকারের নানা ইস্যুতে কিছুই হচ্ছেনা সবই ঠিক আছে-এরকম একটা ভাব দেখিয়ে যাচ্ছিলেন তখন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা এর প্রতিবাদ করে স্পষ্টই মুখের উপর বলে দিয়েছেন- গওহর রিজভী সরকারের পক্ষে মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন।

শুরুতেই সঞ্চালক বাংলাদেশে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন- “গওহর রিজভী, গত ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে তাতে যেটা প্রকট মনে হচ্ছে সেটা হলো বাংলাদেশ একদলীয় শাসনের দিকে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার নির্বাচনের যে ফলাফল দেখা যাচ্ছে একই পাসের অনুপাত দেখা যায় সিরিয়ার বাসার আল আসাদ আর উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের ক্ষেত্রেও।”

এমন প্রশ্নে সদুত্তর দিতে না পেরে গওহর রিজভী বলেন- “আমি এমনটা মনে করিনা। তিনি এসময় পাল্টা প্রশ্ন করে বসেন সঞ্চালককে। বলেন- কেন মানুষ বিরোধীদলকে ভোট দিতে যাবে? ৩৯ টি রাজনৈতিক দল ভোটে অংশ নিয়েছে এবং নির্বাচন ছিলো অবাধ ও সুষ্ঠু।”

গওহর রিজভী এমন উত্তরের প্রেক্ষিতে সঞ্চালক বলেন- “বিশ্বের অনেক জনপ্রিয় নেতারাও ভোটে বেশি হলে ৫৫-৫৭% ভোট পেয়ে থাকেন।” এছাড়া তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া নিয়ে দেয়া বিবৃতি, টিআইবির ৫০ আসনের জরিপে ৪৭ আসনে কারচুপির প্রমাণ, বিবিসির সাংবাদিক কর্তৃক চট্টগ্রামে জাল ভোট দেবার ভিডিও ডকুমেন্টের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন।

তাতেও কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি সরকারের এই উপদেষ্টা। এসময় গুজামিলের আশ্রয় নিয়ে তিনি বলেন, “৪০,০০০ বেশি ভোট কেন্দ্রে ১৫-১৯ টি কেন্দ্রে অনিয়ম হতেই পারে, এটা এমন কিছুনা!” এসময় টিআইবি’র বাংলাদেশ প্রধানকে নিজের ব্যক্তিগত বন্ধু বলে দাবি করেন।

প্রশ্নের উত্তরে গুজামিলের আশ্রয় নেবার সময়টাতে প্রায়ই দর্শকদের হাসতে এবং টিপ্পনী কাটতে দেখা গেছে।

এসময় সঞ্চালক বলেন, “এটা ১৫-১৯ ভোট কেন্দ্রের কোনো বিষয় নয়, আপনার বন্ধুর সংগঠন (টিআইবি) ৫০ আসনের মধ্যে ৪৭ টিতে অনিয়ম পেয়েছে। এটা কি অনিয়ম প্রমাণ করেনা, যেখানে আপনারা ৯৫ শতাংশ আসনে নিজেদের জয়ী দেখালেন।”

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন উল্লেখ করে সঞ্চালক আরো বলেন- “নির্বাচনের ঠিক দুই সপ্তাহ আগে ১৫০ এর বেশী বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের আটক করা হয়েছে, অনেককে গুম করা হয়। নির্বাচনে এক আতংকের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিলো বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। এর মাধ্যমে কী আপনার সরকার নির্বাচনের পরিবেশকে বাঁধাগ্রস্থ করেনি?”

জবাবে গওহর রিজভী বলেন- “যাদের বিরুদ্ধে অগ্নিসন্ত্রাস, অপরাধের অভিযোগ আছে নির্বাচনের সময় তাদেরকেই আটক করা হয়েছে। তারা এর আগে আত্মগােপনে ছিলো, যখন প্রকাশ্যে তখনি আটক করা হলো।”

এসময় সঞ্চালক বলেন- “আপনারা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন তারা বিরোধীদলের। তিনি একটি মামলার উদাহরণ টেনে বলেন- ২০১৮ সালে সেপ্টেম্বর রাজপথ অবরোধ করার অভিযোগে একটি মামলা করা হয়েছে ঢাকার বিএনপি নেতা মিন্টু কুমার দাসের বিরুদ্ধে। অথচ তিনি মারা গেছেন ২০০৭ সালেই। এটা কী বিব্রতকর নয়? আপনারা যে বিরোধী নেতা মারা গেছেন তার বিরুদ্ধেও মামলা করছেন।”

ভিডিওঃ ‘প্রশ্নবাণে গওহর রিজভী ও আওয়ামীলীগকে ধুয়ে দিল আল জাজিরা!’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

সঞ্চালক মেহদির এ বক্তব্য উপস্থাপনের পর হাসিতে ফেটে পড়েন উপস্থিত সবাই। এসময় অনেকটা বিব্রত হয়ে পড়েন গওহর রিজভী। তাকে বলতে শোনা যায়- “হ্যাঁ। এটা বিব্রতকর। স্বল্পোন্নত দেশে পুলিশ প্রশাসনে এমনটা প্রায়ই ঘটে থাকে।”

শুধু বিরোধী দল নয় সরকারের বিরোধীতার মুখোমুখি হচ্ছে মিডিয়াও এমন প্রসঙ্গ টেনে সঞ্চালক বলেন- “আপনি নিজেও বলেছেন মিডিয়ার স্বাধীনতা ছাড়া সভ্যতা বিকশিত হতে পারেনা। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা ঠিক নয়।- কিন্তু এটা শুধু মুখের কথা কিন্তু বাস্তবে মত প্রকাশ বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে এমন অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। যেমন বলা যায়- আল-জাজিরায় আপনার সরকারের সমালোচনা করায় বাসা থেকে আটক করে নিয়ে আসা হয় খ্যাতিমান ফটোসাংবাদিক শহিদুল আলমকে।শেখ হাসিনা এই ফটোসাংবাদিককে মানিসকভাবে অসুস্থ বলে মন্তব্য করেছেন।”

এসময় গওহর রিজভীকে বলতে শোনা যায়- “বাংলাদেশ সম্পর্কে যারা জানেন তারা বলবেন দেশটিতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রয়েছে। আলজাজিরাকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্যে শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো মিথ্যা তথ্য প্রচারের অভিযোগে। তার প্রচারিত তথ্যগুলো সন্ত্রাসকে উসকে দিচ্ছিলো।”

শহিদুল আলমকেও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে দাবি করেন গওহর রিজভী।

শেখ হাসিনার এই উপদেষ্টাকে উদ্দেশ্য করে মেহদি বলেন- “গত আগস্টে শহিদুল আলম আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে পুলিশ তাকে বেধড়ক প্রহার করেছে। তার গায়ের জামা রক্তে ভিজে গিয়েছিলো। সেই জামা ধুয়ে আবার তাকে পড়ানো হয়েছে। তাকে ১০৭ দিন কারাগারে থাকতে হয়েছিলো। সেখানে তার ওপর অত্যাচার করা হয়েছে। আপনার বন্ধুদের সঙ্গে কি এমন আচরণই করে থাকেন?”- আলজাজিরার এ প্রশ্নের পর হাসিতে ফেটে পড়েন দর্শকরা। তাতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন ড. গওহর রিজভী।

নিজেকে সামলে নিয়ে গওহর রিজভী বলেন- “শহিদুলের প্রতি কী আচরণ করা হয়েছিলো যে বিষয়ে আমি আপনাকে একটি কথাও বলিনি। আমি যা বলেছি তা হলো শহিদুল আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যখন তাকে গ্রেপ্তার করা হয় তখন তার চিকিৎসার ব্যাপারে আমি নিজে উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তার যাতে সুচিকিৎসা হয়, তার পরিবার যাতে তার জন্যে খাবার নিয়ে যেতে পারেন, তা নিশ্চিত করার জন্যে আমি উদ্যোগ নিয়েছিলাম।”

গওহর রিজভীর কথা বলার মধ্যেই আলজাজিরা প্রশ্ন করে- “কেনো তার চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছিলো? উত্তরে রিজভী বলেন, আপনি যে বলছেন শহিদুল আলমকে মারধর করা হয়েছে সে জন্যে নয়।…

এমন সময় আবারো প্রশ্ন করা হয়- “তার মানে শহিদুলকে যে মারধর করা হয়েছিলো তা আপনি অস্বীকার করছেন?”

গওহর রিজভী বলেন- “না, আমি অস্বীকার করছি না যে তাকে মারধর করা হয়নি। আমি তা অস্বীকার করছি না এ কারণে যে আমি তো জানি না কী ঘটেছিলো।”

“আপনার বন্ধু কী মানসিকভাবে অসুস্থ?”- প্রশ্ন আলজাজিরার।

গওহর রিজভীর উত্তর- “না।”

“তাহলে আপনার দেশের প্রধানমন্ত্রী কেনো বললেন যে শহিদুল আলম মানসিকভাবে অসুস্থ?”

উত্তরে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা বলেন- “এ বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই।গওহর রিজভীর এমন মন্তব্যের পর আবারো দর্শকদের হাসতে দেখা যায়। হাসি থামলে তিনি বলেন, আমি ঠিক জানি না প্রধানমন্ত্রীর মনে কি ছিলো। তবে কেউ যদি মিথ্যা তথ্য প্রচার করে আর সেই তথ্য সন্ত্রাসকে উসকে দেয়, জীবনকে বিপন্ন করে তোলে…”

আবারো প্রশ্ন- “কোন তথ্যটি মিথ্যা ছিলো?”

গওহর রিজভী বলেন- “যেমন ধরুন, কয়েকজন মানুষ মারা গিয়েছে। তাদের মরদেহ সরিয়ে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে রাখা হয়েছে। নারীদের ধর্ষণ করা হয়েছে।… দর্শক হেসে উঠলে তিনি তাদের থামিয়ে দিয়ে বলেন- না, না শুনুন..”

এমন সময় প্রশ্ন করা হয়- “ঠিক আছে, আপনি যদি মনে করেন সেই কথাগুলো মিথ্যা তাহলে সেই কারণেই কি তাকে আটক করা হয়েছিলো?”

ড. গওহর রিজভী বলেন- “আমি যা বলেছি, আমি আমৃত্যু সেই একই কথা বলবো। তা হলো বাকস্বাধীনতা না থাকলে আমাদের সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে। একই সঙ্গে সরকারের দায়িত্ব রয়েছে নাগরিকদের রক্ষা করার।”

বাংলাদেশ এক দলীয় শাসনের দিকে যাচ্ছে পশ্চিমা এবং সাংবাদিকদের এমন অভিযোগের প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সুইডিশ সাংবাদিক এবং ‘জল্লাদ: ডেথ স্কোয়াডস এন্ড স্টেট টেরর ইন সাউথ এশিয়া’র লেখক তাসনিম খলিলকে। এসময় তাসনিম বলেল- “শেখ হাসিনা শুধু দেশটাকে এক দলীয় শাসনের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন না বরং সফলভাবে ঐ পথটাই পাকাপোক্ত করছেন। তার রয়েছে গওহর রিজভীর মতো উপদেষ্টা যিনি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনবরত মিথ্যা বলে যাচ্ছেন। আসল সত্যটা হলো- বাংলাদেশের জনগণকে তাদের ঘর থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, গোপনে বন্দি রাখা হচ্ছে, সেখানে মানুষ গুম হচ্ছে, বিচার বর্হিভূত হত্যার শিকার হচ্ছে, হাজারে হাজারে মানুষকে জেলে পুরা হচ্ছে, যেটা নির্বাচনেও দেখা গেছে। যারাই সরকারের বিপক্ষে যাচ্ছে তারা আক্রোশের শিকার হচ্ছে।”

বাংলাদেশে মতপ্রকাশ সম্পর্কে জানতে চাইলে তাসনিম বলেন, “বাংলাদেশে সরকারের শাখা সংগঠন ছাত্র লীগের হাতে নির্মম মারধরের শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। সেগুলোর ভিডিও আমরা দেখেছি কিন্তু রিজভী সাহেব হয়তো বলবেন- এক-দু’জন সাংবাদিকের সঙ্গে এটা হয়ে থাকতে পারে এটা তেমন কিছুনা। এটাকে অন্ধকার পরিস্থিতি ছাড়া আর কিছুর সঙ্গে তোলনা করা যায়না।”

এসময় অনুষ্ঠানে প্যানেল বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থিত যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিম এর কাছে জানতে চাওয়া হয়- “আপনি যখন যুক্তরাজ্যের মতো একটি পশ্চিমা দেশে অবস্থান করছেন তখন আপনার দেশে হাজারো মানুষ কারাগারে আটক, বিচারবর্হিভূত হত্যা এবং গুমের মতো ঘটনাগুলো আপনার দায়িত্ব এবং জবাবদিহিতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারকে সমর্থন করাটা আপনার জন্য অনেকটাই কঠিন।”

এসময় তাসনিম বলেন- “তাসনিম এখন বাংলাদেশে থাকেনা। আমিও আপনার মতো দেশটিতে কী ঘটছে তা দেখছি।”-তার এ জবাব শুনে উপস্থিত সবাইকে হাসতে দেখা যায়।

বাংলাদেশে কী ঘটছে এ পসঙ্গে মতামত জানতে চাইলে অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালে ৩০ বছর ধরে কাজ করা মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ আব্বাস ফয়েজ বলেন- “বর্তমান সরকারের অধীনে বাংলাদেশে যা ঘটছে তা কিছুতেই মেনে নেয়া যায়না। যদি গণতন্ত্র প্রসঙ্গে আসি তাহলে সংসদসহ সবকিছুই এখন সরকারের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। আর এসবই ঘটছে গওহর রিজভীর মতো বুদ্ধিজীবিদের ছত্রছায়ায়। যা কিছু অনিয়ম ঘটছে তার সবই তিনি মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ঢেকে যাচ্ছেন। যদি গুম প্রসঙ্গে বলি তাহলে বলতে হয়- সাদা পোশাকে লোকজন বাড়িতে থেকে মানুষদের ধরে নিয়ে আসছে, গুম করছে, এ পসঙ্গে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কাউকে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা কিছুই জানেনা বলে এড়িয়ে যান।”

এসময় এ বিষয়টিকেও ধামাচাপা দিতে যান গওহর রিজভী। বলেন- “আপনি যদি এটাকে সরকারের পলিসি বলেন তাহলে এটা শঙ্কার। সরকার কাউকে গুম করার দরকার নেই।”

এসময় গওহর রিজভীর একথার প্রতিবাদ করতে দেখা যায় আব্বাস ফয়েজকে।

সঞ্চালক মীর আহমদ বিন কাসেম, হাসান আলী, শফিকুল ইসলামসহ গুম হওয়া ব্যক্তিদের তালিকা উল্লেখ করে বলেন, “এদেরকে পরিবারের সামনে থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, পরিবার সাদা পোশােকর পুলিশ এটা করেছে, এমনকি সিসি টিভির ফুটেজও রয়েছে। তাদেরকে কী গুম করা হয়নি? আপনি কী এটা অস্বীকার করবেন?”

এসময় গওহর রিজভীকে বলতে শোনা যায়, “যদি এটা ঘটে থাকে তাহলে বলবো খুবি পরিতাপের।”

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সঞ্চালক বলেন, “আপনারা এখন লাখো রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিচ্ছেন। যদি কয়েক বছর আগে ফিরে যাই তাহলে বলতে হয় ২০১২-২০১৬ সালের মধ্যে আমরা যেটা দেখেছি আপনার দেশের সীমান্ত রক্ষীরা মিয়ানমার সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। আর এ জন্য তাদের প্রাণহানির শঙ্কাও ছিলো। সম্ভবত লোকগুলো মারাও যেতে পারতো।

জবাবে গওহর রিজভী বলেন- “আমার পেছনে ফিরতে চাইনা। ইতিমধ্যে অনেক শরণার্থী আছে যারা আগে থেকেই বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া। তারা এখানে আছে ১৯৯০ সালের মাঝামাঝি থেকে।”

এর জবাবে সঞ্চালক বলেন- “আমি এটা বলছিনা। আমি বিস্ময় প্রকাশ করছি এটা নিয়ে যে, আপনারা শরণার্থীদের যখন আশ্রয় দিবেন তাহলে ফেরত পাঠাতে চেয়েছিলেন কেন? আমাদের কী জীবন রক্ষা করা উচিত নয়?”

প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা বলেন- “এটা বাধা দিয়েছিলো সীমান্ত রক্ষীরা, তারা তাদের দেশে প্রবেশে সুযোগ দিতে চায়নি। কিন্তু যখন উচ্চ পর্যায়ে সভা হয়-তখন প্রধানমন্ত্রী শরণার্থীদের প্রবেশের অনুমতি দেন।”

উৎসঃ ‌জাস্ট নিউজ

আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশে পুনঃনির্বাচন চেয়ে ইইউ সাংসদদের চিঠি


বাংলাদেশে পুনরায় নির্বাচন ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ চারটি দাবি করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপিত্তা কাউন্সিলের উচ্চ প্রতিনিধি ফেডেরিকা মোগেরিনির কাছে চিঠি দিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৯ সাংসদ।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ইইউ এর ১৯ সাংসদ স্বাক্ষরিত এ চিঠি ফেডেরিকা মোগেরিনির কাছে পাঠানো হয়।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ১৯ সাংসদের দেয়া এ চিঠির শুরুতেই বাংলাদেশের উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। এরপরই এসেছে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথা।

চিঠিতে ইইউ সাংসদরা, বাংলাদেশে নতুন ও স্বতন্ত্র নির্বাচন দেয়ার আহ্বান জানাতে বলেছেন। নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক রাখার প্রস্তাব করেছেছেন তারা যাতে করে বাংলাদেশে সহিংসতা ছাড়াই একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।

চিঠিতে তারা গত নির্বাচনে ১৭ জন নিহত অসংখ্য আহতের কথা উল্লেখ করেছেন। নির্বাচনের আগে ও পরে বিরোধীদলের অনেক নেতাকে আটক করার কথাও তারা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দলকে ভোট দিতে বাধা দানের কথা ইইউ সাংসদরা তাদের চিঠিতে ইইউ উচ্চ প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন। ক্ষমতাসীনদের জাল ভোট প্রদানের কথাও চিঠিতে উল্লেখ করেছেন তারা।

ইই্উ সাংসদরা বাংলাদেশের দুর্নীতির কথা তুলে ধরে ইইউ এর অনুদানের সঠিক খরচ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

চিঠিতে তারা মোটাদাগে চারটি সুপারিশ তুলে ধরেছেন। যার প্রথমটি হল- বাংলাদেশে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে পুনরায় নির্বাচন দিতে হবে। তাদের দ্বিতীয় সুপারিশ হল- বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে।

তৃতীয় সুপারিশ হিসেবে তারা বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুদানের খচর কিভাবে ব্যয় হয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চেয়েছে। চতুর্থ সুপারিশ হিসেবে তারা বাংলাদেশে শ্রমিক নির্যাতন বিশেষ করে পোষাক-শ্রমিক নির্যাতন বন্ধ করার আহ্বান জানাতে বলেছেন।

চিঠি দেয়া ১৯ সাংসদ হলেন- সোস্যালিষ্ট ও ডেমোক্রেটিক পার্টির- ব্রান্ডো বেনিফি, নেসা চিল্ডার্স, আনা গোমেজ, ক্যারোলিন গ্রাসওয়ান্ডর হেইঞ্জ, অ্যাগনেস জংরিয়াস, ওয়াজিদ খান, ডেভিড মার্টিন, সোরায়া পোস্ট, জুলি ওয়ার্ড।

ইউরোপীয়ান পিপল’স পার্টির- টুনে কেলাম, অ্যান্টিনিও লোপেজ, জিরি পোসপিসিল। দ্য অ্যালায়েন্স অব লিবারেল ডেমোক্রেটস ফর ইউরোপ গ্রুপের- ম্যারিতজে সাখি, রিমোন তিমোসা-ই-বেলসেলস। জিইউফ/এনজেএল এর- স্টেলিয়স কোউলুংলু, মের্জা কেলোনেন এবং ইসিআর এর এন্থেয়া ম্যাকেনটায়ার।

উৎসঃ ‌ব্রেকিংনিউজ

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here