হাসিনার কারচুপির নির্বাচনের বিরুদ্ধে একাট্টা পশ্চিমাবিশ্ব

0
343

সহিংসতা আর ব্যাপক কারচুপির কারণে বাংলাদেশের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সন্তোষ্ট নয় কেউই। সরকার নিয়ন্ত্রিত এ নির্বাচনে দেশে এবং দেশের বাইরে সমালোচনা আর নিন্দার ঝড় বইছে। কারচুপির অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত এবং সব পক্ষকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের তাগাদা দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে। নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে মুখে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকার খই ফোটালেও এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে পশ্চিমাবিশ্ব।

সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ এবং কারচুপির সুষ্ঠু তদন্তের তাগাদা দিয়ে ইতিমধ্যে বিবৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ।

বাংলাদেশ নির্বাচন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে মঙ্গলবার কড়া বার্তা পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। নির্বাচন নিয়ে সরকারকে ‘স্বাগত’ না জানিয় তারা বরং অনিয়ম, কারচুপি এবং সহিংসতার ঘটনাগুলো বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করার আহবান জানিয়েছেন। একিসঙ্গে গণতন্ত্রের সংকট সমাধানে সবপক্ষকে এক হয়ে পন্থা খুঁজে বের করার তাগাদাও উঠে এসেছে বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার দেশ এবং সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে।

নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমাবিশ্ব শক্ত ভাষায় তাদের যে মূল্যায়ন এবং অবস্থান তোলে ধরেছেন তাতে নিজের ভাবমূর্তি নিয়ে বেকায়দায় পড়তে পারেন শেখ হাসিনা। বুধবার যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী গণমাধ্যম রয়টার্স তাদের এক প্রতিবদনে এমন অভিমত তোলে ধরেছে।

‘ওয়েস্টার্ণ পাওয়ার কলস ফর প্রোব ইনটু বাংলাদেশ ইলেকশন ইরেগুলারিটিস, ভায়োলেন্স’ শিরোনামের এই প্রতিবেদনের শুরুতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন চলাকালীন সময়ে ঘটে যাওয়া সহিংসতার ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে পশ্চিমাবিশ্ব। যে নির্বাচনে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন জোট ৯০ শতাংশের বেশী আসনে জয়ী হয়েছে সে ভোটে সংগঠিত কারচুপির অভিযোগগুলো নিয়েও সবিস্তারে কথা বলেছে পশ্চিমাদেশগুলো।

নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমাবিশ্ব কড়া ভাষায় তাদের যে মূল্যায়ন তোলে ধরেছেন সেটি শেখ হাসিনার ভাবমূর্তির ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাপক কারচুপি আর ভোটারদের আতংকিত করে নির্বাচন করা হয়েছে অভিযোগ এনে এর ফলাফল প্রত্যাখান করেছে শেখ হাসিনার বিরোধী সকল রাজনৈতিক দল। তবে অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেছেন শেখ হাসিনা। তার ভাষ্যমতে ভোট ছিলো শান্তিপূর্ণ, আর তাতে উৎসব মুখর পরিবেশে অংশ নিয়েছেন তার সমর্থকরা।

দেশে চলমান পরিস্থিতির দিকে ইংগিত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবারের ঢাকার পরিস্থিতিটা ছিলো চুপচাপ। তবে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি বলছে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের কর্মীদের হামলার শিকার হচ্ছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। তবে আওয়ামী লীগ এ অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদরে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেছে, “নির্বাচনের দিনে ব্যাপক সহিংসতা ঘটেছে, পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াজুড়ে ছিলো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ঘাটতি। এসকল প্রতিবন্ধকতার কারণেই নির্বাচনের প্রচার এবং ভোটদান প্রক্রিয়া কলুষিত হয়েছে।”

“নির্বাচনে অনুষ্ঠিত কারচুপির অভিযোগসমূহের একটি যথার্থ তদন্ত করার” আহবান জানিয়েছে সংস্থাটি।

বিদেশে বাংলাদেশের সবচাইতে বড় বিনিয়োগকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রও এ নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এক বিবৃতিতে দেশটি জানিয়েছে, “হয়রানি, ভীতিকর পরিস্থিতি এবং সহিংস কর্মকান্ডের জন্যই নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে বিরোধী দলের প্রার্থী এবং সমর্থকেরা স্বাধীনভাবে তাদের সভা-সমাবেশ করতে পারেনি, কোনো প্রচারণা চালাতে পারেনি। এঘটনাগুলোর স্বপক্ষে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য রয়েছে, আর তাতে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র।”

ভোটে বাধা দেবার বিষয়টিতে অসন্তোষ জানিয়ে দেশটি বলেছে, “ভোটের দিনে সংগঠিত অনিয়মগুলোর কারণে অনেক ভোটার ভোট দিতে পারেননি। এ বিষয়টিতে আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করছি।কারচুপির এসব বিষয় নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।”

একই উদ্বেগ প্রতিধ্বনিত হয়েছে যুক্তরাজ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয়বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মার্ক ফিল্ডের বিবৃতিতেও। তিনি বলেন, “যেসকল বাধা কিংবা গ্রেফতারের মতো ঘটনার কারণে বিরোধীদলসমূহ নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারেনি সে বিষয়ে আমি অবগত।”

মার্ক বলেন, “নির্বাচন কর্মকান্ড নিয়ে যেসকল অভিযোগ এসেছে সেগুলোর একটি পরিপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য এবং স্বচ্ছ সমাধানের আহবান জানাচ্ছি।”

পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী নির্বাচনের দিন শেখ হাসিনার সমর্থক এবং বিরোধী নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, নতুন আরেকটি নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে ভোট কারচুপির তথ্যগুলো জমা করছেন তিনি। এ নিয়ে একটি স্মারক নির্বাচন কমিশনে হস্তান্তর করা হবে। নতুন কোনো নির্বাচন করা যাবে না- নির্বাচন কমিশন এমনটা বললেও আলমগীর বলছেন-“এ ছাড়া (নির্বাচন) বিকল্পটা কী?”

নির্বাচনের রেশ না ফুরোতেই এক সাংবাদিককে গ্রেফতার করার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে রিপোর্ট করা দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন এক স্থানীয় সরকারী কর্মকতা। ভুল তথ্য দেবার অভিযোগ এনে মামলাটি করা হয়েছে কিছু দিন আগে পাস করা ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে। বিরোধী কন্ঠ দমনে এই আইন করা হয়েছে বলে বিতর্ক রয়েছে।

খুলনার একটি আসনে নিবন্ধিত ভোটারের চাইতে বেশী সংখ্যা দেখিয়ে ভোটের ফল ঘোষণা করা হয়েছে-এরকম একটি প্রতিবেদন করার অভিযোগে হেদায়েত হোসেন মোল্লা এবং রাশেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে এই আইনে মামলাটি করা হয়েছে। হেদায়েত হোসেনকে মঙ্গলবারই আটক করেছে পুলিশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাণহানির মাধ্যমেই নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতার অবসান ঘটলো দেশটিতে। বিরোধীপক্ষের দাবি তাদের নেতা-কর্মীদের কারণ ছাড়াই গ্রেফতার করা হয়েছে এবং হামলা চালিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের কর্মী-সমর্থকরা।

বাংলাদেশের সহিংসতার ঘটনার একটি পক্ষপাতহীন তদন্তের আহবান জানিয়েছেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দক্ষিণ এশিয়ার রিজিওনাল ক্যাম্পেইনার সাদ হামাদি।

তিনি বলেন, “সাধারণ মানুষের শারীরিকভাবে নির্যাতিত হবার ঘটনাগুলো আমরা শুনেছি, ভোট কেন্দ্রগুলোতে আক্রান্ত হবার কথাও জেনেছি।”

সুত্রঃ ‌জাস্টনিউজ

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here