‘খুনিকে ক্ষমা করে দিয়েছি, আমার স্ত্রী হুসনে আরাও তাই করত’

0
202

না, কোনো ঘৃণা নেই, প্রতিশোধের আগুনও নেই বুকে। ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশি ফরিদ উদ্দিন হৃদয় থেকে ক্ষমা করে দিচ্ছেন তার স্ত্রীসহ ৫০ জনকে হত্যার জন্য দায়ী সেই বর্ণবাদী খুনিকে।

ছয় বছর আগে মাতাল এক চালকের গাড়ির ধাক্কায় চলৎশক্তি হারানোর পর থেকে ফরিদের জীবন এখন হুইলচেয়ারে বাঁধা। তার জীবন আর সংসারের সহায় ছিলেন স্ত্রী হুসনে আরা পারভীন।

বরাবরের মত গত শুক্রবারও স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন স্ত্রী হুসনে আরা। গুলি শুরু হলে কয়েকজন নারী ও শিশুকে বাইরে নিয়ে নিরাপদ জায়গায় রেখে আবার তিনি মসজিদে ঢোকেন স্বামীকে বাঁচাতে, কারণ তিনি জানতেন, হুইল চেয়ার নিয়ে ফরিদের পক্ষে একা বের হওয়া প্রায় অসম্ভব।

ভাগ্যক্রমে ফরিদ ঠিকই বেঁচে গেছেন, কিন্তু মসজিদের গেইটের কাছে ঘাতকের বুলেট কেড়ে নিয়েছে হুসনে আরার প্রাণ।

সেদিনের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বিবরণ নিউ জিল্যান্ড হেরাল্ডকে দিয়েছেন ফরিদ। বলেছেন, সব কিছু পেরিয়ে একমাত্র মেয়ের কাছে মায়ের মৃত্যুর খবর দেওয়াটাই ছিল সেদিন তার কাছে সবচেয়ে কঠিন বিষয়।

গত শুক্রবার দুপুরে ক্রাইস্টচার্চের আল নূর ও লিনউড মসজিদে ওই হামলার ঘটনায় প্রাণ গেছে ৫০ জনের। ব্রেন্টন ট্যারান্ট নামের এক বর্ণবাদী যুবক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে একাই দুই মসজিদে হামলা চালিয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ট্যারান্ট ওই হামলা চালানোর আগে একটি কথিত ম্যানিফেস্টো অনলাইনে প্রকাশ করেন, যেখানে এই হত্যাকাণ্ড চালানোর উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন তিনি। আর তাতেই তার অভিবাসী ও মুসলিম বিদ্বেষ এবং শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়।

নিউ জিল্যান্ড হেরাল্ডকে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ফরিদ বলেছেন, ট্যারান্ট যে বিশ্বাস থেকে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা ছিল ভুল। কিন্তু তার জন্য তিনি কোনো ঘৃণা বুকে পুষে রাখতে চান না।

“আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। আমি নিশ্চিত, আমার স্ত্রী আজ বেঁচে থাকলে সেও একই কাজ করত। তার প্রতি আমার কোনো বিদ্বেষ নেই।”

শহীদ হওয়া স্ত্রী হোসনে আরা পারভীনের সাথে স্বামী ফরিদ উদ্দিন (ফাইল ছবি)

‘ধরে নিয়েছিলাম, এখানেই শেষ’

সাক্ষাৎকারে ফরিদ বলেন, সেদিন দুপুরে জুমার নামাজ শুরুর আগে মসজিদের বাইরে গাড়ি রেখে তারা স্বামী-স্ত্রী ভেতরে ঢোকেন। হুইলচেয়ার ঠেলে তাকে পুরুষদের নামাজের ঘরে পৌঁছে দিয়ে হুসনে আরা চলে যান মেয়েদের কক্ষে। ঠিক তার পরপরই শুরু হয় গুলির শব্দ।

হামলাকারী গুলি শুরু করে মসজিদের হলওয়ে থেকে। হুসনে আরা তখন নারী ও শিশুদের একটি দলকে পথ দেখিয়ে বাইরে বের করে মসজিদের বাঁ দিকের একটি নিরাপদ জায়গায় রেখে আসেন। তারপর আবার মসজিদে ঢোকেন স্বামীকে বের করে আনার জন্য।

হুসনে আরা জানতেন, হুইলচেয়ারে বসা ফরিদ হামলাকারীর গুলি থেকে বাঁচার কোনো সুযোগই পাবেন না। এ কারণে মরিয়া হয়ে স্বামীর কাছে পৌঁছাতে চাইছিলেন তিনি।

নিউজিল্যান্ডে ক্রাইস্টচার্চের ফুটপাতে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকা সেই নারী বাংলাদেশের হুসনে আরা পারভীন

কিন্তু আবার মসজিদে ঢোকার সময়ই নিহত হন হুসনে আরা। তাকে গুলি করা হয় পেছন থেকে।

ভেতরে হুইল চেয়ারে বসা ফরিদ তখন ভাবছিলেন, তার আর বাঁচার উপায় নেই।

“সে বড় ভয়ঙ্কর দৃশ্য… চারদিকে রক্ত। মানুষের লাশ পড়ে রয়েছে, অনেকে আহত। যারা বেঁচে আছে, সবাই আতঙ্কিত। একজন আরেকজনকে ধাক্কা দিয়ে বের হতে চাইছে। আর আমি ভাবছি, এর মধ্যে আমি কী করে বের হব!

“আমি মনে মনে প্রস্তুত হয়ে গেলাম। নিজেকে বললাম, শান্ত থাকতে হবে, আতঙ্কিত হওয়া চলবে না, যা হওয়ার তা হবে।”

ফরিদ তখন মসজিদের ভেতরে মূল নামাজের ঘরের পাশে আরেকটি ঘরে। ফলে হামলাকারীকে তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন না। তবে একটানা গুলির শব্দ পাচ্ছিলেন, সেই সঙ্গে আতঙ্কিত মানুষের চিৎকার।

গুলিতে জানালার কাচ ভেঙে পড়েছিল। মানুষ সেদিক দিয়েও পালানোর চেষ্টা করছিল। ওই হুড়োহুড়ির মধ্যে কিছুটা ফাঁকা দেখে ফরিদও সুযোগ নিলেন। হুইলচেয়ার টেনে বেরিয়ে গেলেন মসজিদ থেকে।

“প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল এই বুঝি পেছন থেকে মাথায় গুলি লাগে।… খুব ধীরে ধীরে আমি বেরিয়ে এলাম। আমার গাড়ি দাঁড় করানো ছিল মসজিদের পেছনে। আমি গাড়ির পেছনে গিয়ে হুইল চেয়ার থামালাম, সেখানেই অপেক্ষা করব ঠিক করলাম।”

ওই জায়গা থেকেই মসজিদের দরজার দিকে নজর রাখলেন ফরিদ। তিনি ভাবছিলেন, হুসনে আরা হয়ত নারী আর শিশুদের দলটিকে নিয়ে ওই পথেই বেরিয়ে আসবেন।
কিন্তু তাদের কেউ এল না। ফরিদ তখন ধারণাও করতে পারেননি, হুসনে আরা লাশ হয়ে পড়ে আছেন মসজিদের অন্য পাশে।

হামলাকারীকে ফরিদ দেখেননি। টানা গুলির শব্দে মিনিটখানেকের বিরতি দেখে তিনি বুঝতে পারছিলেন, হামলাকারী হয়ত ম্যাগাজিন বদলাচ্ছে।

এরকম প্রায় সাতবার ম্যাগাজিন বদলানো হলো। তখনও ফরিদকে পাশ দিয়ে ছুটে পালাচ্ছিলেন অনেকে। কেউ কেউ বেড়া ডিঙিয়ে পাশের বাড়ির দরজা ধাক্কাছিলেন আশ্রয়ের আশায়।

ফরিদ বলেন, পরে তার এক বন্ধু তাকে ফোন করেছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, মসজিদে ওই অবস্থায় ফরিদকে দেখেও তিনি সাহায্য করতে পারেননি, তাকে ফেলেই পালিয়ে গেছেন।

“আমি তাকে বলেছি সে ঠিক কাজটাই করেছে। আমি হুইল চেয়ারে ছিলাম, লাফ দিয়ে পালানো আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এ নিয়ে তুমি ভেবো না।”

ভয়ঙ্কর দৃশ্যগুলো

মসজিদের পেছনে নিজের গাড়ির আড়ালে মিনিট দশেক অপেক্ষার পর এক সময় ফরিদ বুঝতে পারেন, গুলি বন্ধ হয়েছে। তার মনে হল, হামলাকারী বোধহয় তার কাজ শেষ করেছে। বেঁচে যাওয়া আরেকজনকে সঙ্গে নিয়ে তখন আবার মসজিদের ভেতরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ফরিদ।

“কাজটা বোকার মত হয়েছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু আমার মাথায় তখন অন্য কিছু আসছিল না। আমি নারীদের কক্ষে যেতে চাইছিলাম, আমার স্ত্রীকে খুঁজতে চাইছিলাম।

“আমি ভেতরে ঢুকলাম। দেখলাম লাশ আর লাশ। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল মানুষগুলো বের হওয়ার চেষ্টা করেছিল। ওই অবস্থায় পেছন থেকে তাদের গুলি করা হয়েছে।

“মূল নামাজের ঘরে গিয়ে দেখি চারদিকে বুলেটের শেল। একজনকে দেখলাম ছেলেকে আঁকড়ে ধরে আছে। কি ভয়ঙ্কর!

ক্রাইস্টটার্চে হোমিও চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি তিন বছর ধরে আল নূর মসজিদে নিয়মিত বয়ান করে আসছিলেন ফরিদ। আর তার স্ত্রী হুসনে আরা ওই মসজিদে বাচ্চাদের কোরআন পড়াতেন।

ফলে যারা ওই মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়তেন, তাদের অধিকাংশই ছিল তাদের পরিচিত। মৃত, মারাত্মকভাবে আহত যে মানুষগুলো তখন নামাজের ঘরে রক্তের মধ্যে পড়ে ছিল, সেই মুখগুলোও ছিল ফরিদের চেনা।

“একজন চিৎকার করে আমার কাছে সাহায্য চাইছিল। আমি দেখলাম দুটো মৃতদেহের নিচে সে চাপা পড়েছে। সে বলছিল মৃতদেহ দুটো সরাতে, সে নিজে কাজটা করতে পারছিল না।”

কিন্তু চারদিকে লাশ পড়ে থাকায় ওই ঘরে হুইল চেয়ার নিয়ে আর সামনে বাড়ার সুযোগ ছিল না ফরিদের।
“ইথিওপিয়ার এক লোক আমার সাহায্য চাইল, বললো সে শ্বাস নিতে পারছে না… আরেকজনকে দেখলাম এমনভাবে শ্বাস টানছে, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, তার সময় প্রায় শেষ।

“দুজনকে দেখলাম তখনও জীবিত আছে, তাদের একজন বাংলাদেশি। তাকে আমি চিনতাম। ওইদিন সন্ধ্যায় দুটো বাচ্চা আর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে তার দেশে যাওয়ার কথা ছিল।… আমাকে দেখে বললো, ‘আমি শেষ’… ফিলিস্তিনের এক লোককে দেখলাম, খুব রক্ত বের হচ্ছিল তার। চারপাশে এতে লাশ, এত আহত মানুষ… ।“

সবাই চাইছিল ফরিদ তাদের সাহায্য করুক, জানতে চাইছিল অ্যাম্বুলেন্স আসছে কি না। ফরিদ তাদের আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছিলেন, শিগগিরই এসে পড়বে, সব ঠিক হয়ে যাবে, শুধু একটু ধৈর্য্য ধরতে হবে।

“তারপর পুলিশ এলো, বললো- ‘তুমি এখানে কি করছ!’, ওরা আমাকে পাহারা দিয়ে বাইরে নিয়ে এল।”

রাস্তার শেষ মাথায় পুলিশ যেখানে ব্যারিকেড দিয়েছিল, সেইখানে নিয়ে যাওয়া হল ফরিদকে। তিনি বোঝার চেষ্টা করছিলেন নারী আর শিশুদের কোথায় রাখা হয়েছে। কিন্তু হুইল চেয়ারে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু করার ছিল না তার।

অনেক সময় পরে পরিচিত একজন পুলিশ বর্মকর্তা এলেন। হুসনে আরাকেও তিনি চিনতেন।

বললেন, “তোমার জন্য দুঃসংবাদ আছে ফরিদ, তুমি বরং বাড়ি যাও।”

‘এখন আমিই তোর মা’

ভয়ঙ্কর সেই অভিজ্ঞতার পর আরও কিছু বাকি ছিল ফরিদের জন্য। তার জন্য সেটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ।

তাদের ১৫ বছর বয়সী মেয়ে শিফা ক্রাইস্টচার্চেরই একটি স্কুলে পড়ে। মসজিদে হামলার পর সব স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে যখন বাড়ি ফিরল, তার মুখোমুখি হতে হল ফরিদকে।

ওই অংশটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন। বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন ফরিদ।

“মেয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল- ‘তুমি বলতে চাইছ আমার মা আর নেই!’ আমি বললাম, এখন থেকে আমিই তোর মা। আমাদের একসঙ্গে এই দুঃখ সইতে হবে।”

ফরিদ সিদ্ধান্ত নিলেন, তাকে শক্ত থাকতে হবে, ভেঙে পড়লে চলবে না। পরিবারের সবাইকে সাহস যোগাতে হবে।

“মেয়েকে আমি বললাম, কান্না পেলে কাঁদো, কিন্তু ভেঙে পড়ো না। আমি বলতেই থাকলাম, বোঝাতে থাকলাম, কেন ভেঙে পড়া চলবে না।”

হুসনে আরা জীবনের বড় একটা সময় কমিউনিটিতে স্বেচ্ছাসেবীর ভূমিকায় কাটিয়েছেন। আল নূর মসজিদে বাচ্চাদের কোরআন শিখিয়েছেন। তাকে চিরতরে হারিয়েছেন ফরিদ, কিন্তু স্ত্রীর জন্য তিনি গর্বিত।

শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছে শোকাহতরা

“ও জীবন দিয়েছে মানুষকে বাঁচানোর জন্য। ওইটাই ছিল ওর শেষ কাজ। অনেকগুলো মানুষকে ও নিরাপদে সরিয়ে নিতে পেরেছিল। তারপর এসেছিল আমাকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে। অন্যদের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে ও।”

সিলেটের গোলাপগঞ্জের জাঙ্গালহাটা গ্রামের নুরুদ্দিনের মেয়ে হুসনে আরা পারভীনের সঙ্গে বিশ্বনাথ উপজেলার চকগ্রামের ফরিদ উদ্দিনের বিয়ে হয় ১৯৯৪ সালে।
ফরিদ নিউ জিল্যান্ডে বসবাস করছেন ১৯৮৮ সাল থেকে। বিয়ের পর হুসনে আরাও সেখানে চলে যান। এই দম্পতি একসময় নেলসনে থাকলেও দুর্ঘটনায় ফরিদ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ার পর তারা অকল্যান্ডে চলে যান। সেখানে ফরিদ হোমিওপ্যাথি শেখেন।

ফরিদের ভাষায়, হুসনে আরা ছিলেন চমৎকার একজন মানুষ। তার ব্যক্তিত্ব মানুষকে আকর্ষণ করত। তিনি ছিলেন একজন ভালো মা।

“আমি ওর জন্য গর্বিত। লাখ লাখ মানুষের হৃদয় জয় করে সে চলে গেছে। আমার মেয়েকে বলেছি, ওর মায়ের স্মৃতি নিয়েই আমরা বেঁচে থাকব। কাঁদব না, তার কথা ভেবে আমরা বরং গর্বিত হব।”

ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে পরিকল্পিত ওই হামলার স্মৃতি কখনও ভুলতে পারবেন না ফরিদ। কিন্তু সেই আতঙ্কে ভবিষ্যতকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে তিনি রাজি নন।

“আমরা সব উল্টে দিতে পারব না। আমরা এখন নিজেদের কষ্ট দিতে পারি, কষ্ট পেতে পারি অথবা ঘুরে দাঁড়াতে পারি, যে অভিজ্ঞতা আমাদের হল, তাকে ভবিষ্যতের জন্য কাজে লাগাতে পারি। “

ফরিদ বলেন, “রাগ পুষে রাখার দরকার নেই। ক্ষোভ আর লড়াই কোনো সমাধান দেবে না। বরং ভালোবাসা দিয়ে আমরা বহু মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা জাগাতে পারি। আমাদের সেটাই করা উচিৎ।”

বাংলাদেশি ফরিদ উদ্দিন

‘কোনো ঘৃণা নেই’

শুক্রবারের ঘটনা আরও অনেকের মত ফরিদের জীবনকেও বদলে দিয়েছে। তিনি স্ত্রী হারিয়েছেন, তার সন্তান হারিয়েছে মা। কিন্তু অস্ত্রধারী সেই খুনিকে ঘৃণা করতে চান না ফরিদ।

বরং তিনি তাকে ক্ষমা করে দিতে চান।

“আমাকে অনেকেই জিজ্ঞেস করেছে, যে আমার স্ত্রীকে হত্যা করল, তার বিষয়ে আমি কী ভাবছি। আমি বলেছি, আমি তাকেও ভালোবাসতে চাই, কারণ সেও একজন মানুষ। একজন মানুষ হিসেবে সেও আমার ভাই।

“সে যা করেছে তা আমি সমর্থন করি না। সে ভুল করেছে।… সে হয়ত কোনোভাবে মনে আঘাত পেয়েছিল, হয়ত তার জীবনে খুব খারাপ কিছু ঘটেছিল। … কিন্তু শেষ কথা হচ্ছে… সে তো আমারও ভাই।”

ফরিদ বলেন, গত রাতে তিনি ঘুমাতে পারছিলেন না । বার বার মনে হচ্ছিল অস্ত্রধারী সেই হত্যাকারীর কথা।

“আমি কাঁদতে চেষ্টা করলাম। তারপর মনে হল, আমি যদি সেই লোককে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারতাম…

“যদি তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারতাম, আমি তাকে আলিঙ্গন করে বলতাম, আপনি তো আমার খালা।

“আমি জানি না তার কোনো বোন আছে কি না। থাকলে আমি তাকেও আলিঙ্গন করে বলতাম, তুমি আমার বোনের চেয়ে আলাদা কিছু নও। “

পঞ্চাশোর্ধ ফরিদ বলেন, “অনেকেই হয়ত মনে করবে আমি পাগল হয়ে গেছি। কিন্তু আমি আমার মনের কথাটাই বলছি। আমি কোনো ভান করছি না। তার (ব্রেন্টন ট্যারান্ট) সাথে দেখা করার সুযোগ পেলে আমি সত্যিই তাকে আলিঙ্গন করতে চাই।”

ফরিদের আশা, ট্যারান্ট এবং তার মত আর যারা একই বিশ্বাসে বিশ্বাসী, তারা এখন বুঝতে পারবে কী ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেছে, তারা তাদের জীবনের পথ শুধরে নেবে।

“সে এখনও বেঁচে আছে, নিজেকে শুধরে নেওয়ার সুযোগ তার এখনও আছে।… প্রত্যেকটা মানুষের দুটো দিক থাকে। একটা খারপ, আরেকটা মানবিক। হত্যা আর ঘৃণার বদলে আমাদের মানবিক দিকটাকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দিতে হবে। আমি এই কথাটা তাকে বলতে চাই।

“আমি যদি একটা মানুষকেও হিংসার পথ থেকে মানবতার পথে ফেরাতে পারি, আমি গর্ব অনুভব করব।”

উৎসঃ বিডি নিউজ ২৪

আরও পড়ুনঃ নিউজিল্যান্ডে ক্রাইস্টচার্চের ফুটপাতে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকা সেই নারী বাংলাদেশের হুসনে আরা পারভীন

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৯ জন। এ হামলা সংক্রান্ত যে কয়েকটি ছবি সবচেয়ে বেশি আলোচিত তার মধ্যে একটি হল ফুটপাতে মুখ থুবড়ে পড়া এক নারীর। হামলার পর ক্রাইস্টচার্চের ফুটপাত থেকে ছবিটি তোলা হয়। ছবিতে যে নারীকে দেখা গেছে তিনি বাংলাদেশি হুসনে আরা পারভীন (৪২)।

অসুস্থ স্বামীকে মসজিদে খুঁজতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে প্রাণ হারান পারভীন। সন্ত্রাসীদের গুলিতে তিনি নিহত হলেও অন্যদের সহযোগিতায় বেঁচে গেছেন তার প্যারালাইজড স্বামী ফরিদ উদ্দিন। হুসনে আরা নিহতের খবরে সিলেটে তার গ্রামের বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

নিহত হুসনে আরা সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালহাটা গ্রামের মৃত নূর উদ্দিনের মেয়ে ও একই জেলার বিশ্বনাথ উপজেলার চকগ্রামের ফরিদ উদ্দিনের স্ত্রী। হুসনে আরা পারভীন দম্পতি প্রায় ২০ বছর আগে নিউজিল্যান্ড পাড়ি জমিয়েছিলেন। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে হুসনে আরা এবং তার এক বোন ও এক ভাই নিউজিল্যান্ডে থাকতেন। এর মধ্যে এক বছর আগে বড় ভাই সেখানেই মারা যান। হুসনে আরা পারভীনের একমাত্র মেয়েও নিউজিল্যান্ডে বসবাস করেন।

শহীদ হওয়া স্ত্রী হোসনে আরা পারভীনের সাথে স্বামী ফরিদ উদ্দিন (ফাইল ছবি)

নিউজিল্যান্ডের আত্মীয় স্বজনের বরাত দিয়ে সিলেটে অবস্থানরত হুসনে আরার চাচাতো ভাই এইচ আর শাকিল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ‘নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ এলাকায় নারী ও পুরুষের জন্য পাশাপাশি আলাদা মসজিদ রয়েছে। হামলার প্রায় আধা ঘণ্টা আগে হুসনে আরা তার স্বামীকে হুইল চেয়ারে করে পুরুষদের মসজিদে রেখে তিনি নারীদের মসজিদে নামাজ পড়তে যান। এর কিছুক্ষণ পর পুরুষদের মসজিদে গোলাগুলির শব্দ শুনে হুসনে আরা তার স্বামীকে খুঁজতে পুরুষ মসজিদের দিকে যান। এসময় সন্ত্রাসীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে ঘটনাস্থলেই তিনি নিহত হন।

শাকিল আরও জানান, গোলাগুলি শুরুর পরই কয়েকজন মুসল্লি ফরিদ উদ্দিনকে হুইল চেয়ারে করে মসজিদ থেকে বের করে নিলে তিনি প্রাণে রক্ষা পান। বর্তমানে তিনি ক্রাইস্টচার্চ এলাকায় তার বাসায় আছেন। তবে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৪ সালে হুসনে আরা পারভীন ও ফরিদ উদ্দিনের বিয়ে হয়। এর কয়েক বছর পর তারা নিউজিল্যান্ড চলে যান। সর্বশেষ ২০০৯ সালে তারা বাংলাদেশে এসেছিলেন। এই দম্পত্তির ১৮ বছর বয়সী এক কন্যা সন্তান রয়েছে। গত প্রায় ৮ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় প্যারালাইসড হয়ে যান হুসনে আরা পারভীনের স্বামী ফরিদ উদ্দিন। হুসনে আরা সেখানে একটি কোম্পানীতে চাকুরি করতেন।

উৎসঃ বিডি প্রতিদিন

আরও পড়ুনঃ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে খুন হলেন সিলেটের হুসনে আরা

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে জুমার নামাজের সময় দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় অর্ধশত মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। নিহতদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশিও রয়েছেন। এদের মধ্যে একজন সিলেটের হুসনে আরা পারভীন (৪২)। ঘটনার সময় তিনি মসজিদে জুমার নামাজে যাওয়া স্বামী ফরিদ উদ্দিন আহমদের খোঁজে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন।

নিহত হুসনে আরা পারভীন সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মীপাশা ইউনিয়নের জাঙ্গালহাটা গ্রামের মৃত আব্দুন নূরের মেয়ে। তার মৃত্যুর খবরে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

নিহত হুসনে আরা পারভীনের চাচাতো ভাই সিলেট মহানগর কৃষকলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ আর শাকিল জানান, স্বামী, একমাত্র মেয়ে ও দুই ভাইবোনের সঙ্গে ক্রাইস্টচার্চে থাকতেন হুসনে আরা পারভীন। তার স্বামী ফরিদ উদ্দিন আহমদের বাড়ি বিশ্বনাথ উপজেলার চকগ্রামে। তিনি প্যারালাইজড হওয়ায় হুইল চেয়ারে চলাচল করেন।

তিনি আরও জানান, শুক্রবার জুমার নামাজ পড়ার জন্য স্বামীকে নিয়ে ক্রাইস্টচার্চে একটি মসজিদে যান হুসনে আরা । সেখানে পুরুষ ও নারীদের জন্য পৃথকভাবে নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা আছে। স্বামীকে পুরুষদের মসজিদে দিয়ে নারীদের জন্য পৃথক জায়গায় নামাজ আদায়ে যান তিনি। কিছু সময় পর গোলাগুলির শব্দ শুনে পুরুষদের মসজিদে স্বামীকে খুঁজতে যান হুসনে আরা। ওই সময় বন্দুকধারী সন্ত্রাসী তাকে গুলি করে। এতে ঘটনাস্থলেই তিনি নিহত হন।

এদিকে স্ত্রী পারভীন নিহত হলেও অন্যান্য মুসল্লিরা তার স্বামী ফরিদ উদ্দিনকে মসজিদ থেকে বের করে নেয়ায় তিনি প্রাণে বেঁচে গেছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৪ সালে ফরিদ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে হুসনে আরা পারভীনের বিয়ে হয়। বিয়ের কয়েক বছর পর তারা নিউজিল্যান্ডে যান। সর্বশেষ ২০০৯ সালে দেশে তারা এসেছিলেন।

উৎসঃ ‌জাগোনিউজ২৪

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here