ক্যাসিনো নিয়ে যুবলীগ চেয়ারম্যানের হুশিয়ারির বক্তব্যে যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

0
942

রাজধানীর ক্যাসিনোতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী। তবে বক্তব্যকে নিজস্ব বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে নিজ দফতরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন।

এর আগে বুধবার রাজধানীতে সাতটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়ে ১৪০ জন ব্যক্তিকে আটক করে র‌্যাব। এরপর ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে গুলশানের বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকেও।

ক্যাসিনো ও গ্রেফতার নিয়ে যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেন, অপরাধ করলে শাস্তির ব্যবস্থা হবে। প্রশ্ন হলো, এখন কেন অ্যারেস্ট হবে। অতীতে হলো না কেন? আপনি তো সবই জানতেন। আপনি কি জানতেন না? নাকি সহায়তা দিয়েছিলেন, সে প্রশ্নগুলো আমরা এখন তুলবো। আমি অপরাধী, আপনি কী করেছিলেন? আপনি কে, আমাকে আঙুল তুলছেন? এখন বলছেন ৬০টি ক্যাসিনো আছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, আপনারা কি এতো দিন আঙুল চুষছিলেন?’

যুবলীগ চেয়ারম্যানের এ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, সেটা ওনার নিজস্ব মন্তব্য, আপনারা দেখেছেন, আমিও দেখেছি।

তিনি বলেন, প্রশাসন তো বসে নেই, আমাদের নজরে যেগুলো আসছে আমরা সেগুলোর ব্যবস্থা নিয়েছি। আরও যারা চিন্তা-ভাবনা করেছে আমরা অ্যাকশনে যাওয়ার পর বন্ধ করেছে, এটা আমরা জানতাম। ইদানীং আমরা শুনছিলাম এটা বেশ কয়েকটি ঢাকা শহরে হয়েছে, সেই তদন্ত ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই এটা (অভিযান) হয়েছে।

আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, প্রশাসন জানতো কি জানতো না; আমি সেখানে যাচ্ছি না। আমি বলতেছি প্রশাসন যখনই জানছে তখনই অভিযান শুরু করেছে। আমাদের মাননীয় চেয়ারম্যান যুবলীগের, উনি হয়তো তার নিজস্ব মন্তব্য করেছেন, আমার এখানে কিছু বলার নেই।

দীর্ঘদিন ক্যাসিনো চলে এলেও এতদিন পরে কেন অভিযান- এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যখনই আমাদের কাছে খবর এসেছে, কলাবাগান বন্ধ হয়ে গেছে। কারওয়ান বাজারে একটা উঠছিল, খবর যখন এসেছে তখনই বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক সময় অনেক খবর আসে যেগুলো হয়তো তথ্যভিত্তিক নয়, সেগুলো হয়তো উদ্দেশ্যমূলকভাবে খবর আসে। সেগুলো গিয়ে দেখি এগুলোর ভিত্তি নেই। যে সাতটি আজকে হলো (অভিযান) এগুলোর যখনই তথ্য আসে আমরা তখনই অ্যাকশনে গেছি।

তিনি বলেন, আপনারা অনেক আগে দেখেছেন, আমরা আরেকটা বাড়িতে হানা দিয়েছিলাম। সেই বাড়িতে দু’জন বিদেশিও পেয়েছিল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। আমাদের আইন অনুযায়ী তাদেরও ব্যবস্থা হয়েছে।

ক্যাসিনোগুলোর তথ্য কতদিন আগে জেনেছেন- প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, আমাকে গোয়েন্দারা যখনই জানিয়েছেন তখনেই জেনেছি।

ক্যাসিনোর মেশিন এবং বোর্ডগুলো বিমানবন্দরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আসা কি সম্ভব?- এমন প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মেশিনগুলো কখনো এই রকম অবস্থায় আসে না। এগুলো ছোট ছোট পার্সের মতো হয়ে ভাগে ভাগে আসে, যেগুলো আপনার চোখেও পড়বে না। ডিক্লারেশন দিয়ে আনেনি বলেই তো তারা অপরাধী, সেজন্য তাদের বিচার হবে। সবগুলোর বিচার হবে যারাই আইন ভঙ্গ করেছে।

তিনি বলেন, শুধু ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, এটা হলো অবৈধ কোনো ব্যবসার বিরুদ্ধে। সেটা ক্যাসিনো হোক কিংবা ক্লাব হোক কিংবা কোনো কিছু হোক; যেই কিছু অবৈধভাবে স্থাপন করবেন সেটার বিরুদ্ধে আমাদের ব্যবস্থা থাকবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রথম কথা হল ঢাকাতে আমরা শুনছিলাম কতগুলো অবৈধ ক্যাসিনো আছে। আমরা কোনো ক্যাসিনোকে পারমিশন দেইনি। বিভিন্ন হোটেল ও ক্লাবে আমরা বারের পারমিশন দিয়েছি। আমরা শুনছিলাম অনেক জায়গায় নাকি ক্যাসিনো চালাচ্ছে। আমাদের কাছে সেই তথ্য ছিল, সেই অনুযায়ী কালকে রাত্রে ক্লাব ও ক্যাসিনোগুলো চেক করা হয়েছে। আমরা মনে করি ক্যাসিনো করতে হলে সরকারের একটা অনুমতি লাগে, সেগুলো তারা নেয়নি। যেহেতু অনুমতি ছাড়া তারা এগুলো করেছে, তারা অপরাধ করেছে।

প্রশাসনের অনেকে জড়িত বলে অভিযোগ নিয়ে মন্ত্রী বলেন, আমরা পেয়েছি মাত্র, দেখবো এখন। কে কতখানি সহযোগিতা করেছে, কিংবা এটার জন্য ব্যবস্থা নিয়েছে, এগুলো তদন্তের পর আসবে। আমরা এখন দেখেছি, সিলগালা করছে, ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছেন। তদন্তের পর বেরিয়ে আসবে, কে কোনটায়, কে কোনটার সঙ্গে জড়িত ছিল, কার কতখানি ভূমিকা ছিল, সেটা দেখা যাবে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওনার সবসময় ডিরেকশনটা ক্লিয়ার যে, কোনো ধরনের আইনবর্হিভূত কাজ করে থাকলে তাকে বিচারের মুখোমুখি হতেই হবে। আমরা সেটিই করছি, উনি যেভাবে ডিরেকশন দিচ্ছেন।

ক্যাসিনো পরিচালনার বিষয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা কিনা- প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে গোয়েন্দারাই আমাদের ইনফরমেশন দিয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই অপারেশনগুলো হয়েছে। আমি তো সবসময় বলি এখানে যদি কোনো প্রশাসনের লোক জড়িত থাকে কিংবা তারা এগুলোকে সহযোগিতা করেছেন, তাদের নিয়ন্ত্রণে এগুলো হয়েছে। আইন অনুযায়ী তিনিও বিচারের মুখোমুখি হবেন।

গ্রেফতার যুবলীগ নেতার টর্চার সেল পাওয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটা আমরা শুনেছি, তবে এখনো সঠিক তথ্য পাইনি। এটা যদি হয়ে থাকে তাহলে সেটারও ব্যবস্থা হবে।

উৎসঃ যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ ১০ কোটি টাকার সরঞ্জাম পাহারায় ব্যয় ৪৬ কোটি!


পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্পে হরিলুট চলছে। এর মধ্যে নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্পে ১০ কোটি টাকা মূল্যের কমপ্রেসড এয়ার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (সিএএমএস) সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪৬ কোটি টাকা। রক্ষণাবেক্ষণের নামে ওই টাকার বেশির ভাগই লুটপাট হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির সদস্যরা। এ নিয়ে কমিটির বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। আবার মূল কাজ শুরুর আগেই ‘টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল)’ প্রকল্পের কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়েও কমিটিতে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কেইস ও সুফল প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসছে। এর আগে কেইস প্রকল্প নিয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়। দেখা যায়, প্রকল্পের কাজের নামে বিদেশ ভ্রমণ, গাড়িবিলাস, পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত নয় এমন কাজকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রকল্পের টাকা বেশির ভাগই লুটপাট করা হয়েছে। ২০০৯ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৪ সালের জুনে। পরে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৯ সাল নির্ধারিত হয়। সর্বশেষ ২২১ কোটি ৪৭ লাখ ৩৩ হাজার টাকার এ প্রকল্পের মেয়াদ নতুন করে বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উত্থাপিত প্রতিবেদনে প্রকল্পের খাতওয়ারি ব্যয়ের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কেইস প্রকল্পের মূল কাজের থেকে আনুষঙ্গিক ব্যয় বেশি। এর মধ্যে সিএএমএস সরঞ্জাম ক্রয়ে চার কোটি ৫২ লাখ ৪৬ হাজার টাকা এবং সিএএমএস ও প্রকল্প ভবনের জন্য সোলার প্যানেল ক্রয়ে পাঁচ কোটি ৭১ লাখ ২২ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে। আর ওই সব সিএএমএস সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬ কোটি ১৬ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংসদীয় কমিটির সদস্যরা।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই প্রকল্পে সাধারণ খরচ (স্থানীয় যাতায়াত, টেলিফোন ও বিদ্যুৎ) ব্যয় ধরা হয়েছে আট কোটি ৫১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। আর গাড়ি ও যাতায়াত নামে আরেকটি খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে এক কোটি ৬১ লাখ চার হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রকল্পে মিডিয়া ক্যাম্পেইনে সাত কোটি ৭৬ লাখ ১১ হাজার, প্রশিক্ষণে এক কোটি ৭৬ লাখ ১১ হাজার এবং গবেষণা সরঞ্জাম কেনা বাবদ চার কোটি ৪১ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো দেখা গেছে, কেইস প্রকল্পে একই ব্যক্তি ঘুরেফিরে প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকসহ (পিডি) প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ২৯৯ ব্যক্তি অবৈধভাবে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। সিটি মেয়র, কাউন্সিলর, সিটির কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ওসি থেকে কর্মকর্তা, স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা এ তালিকায় রয়েছেন।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের ওই প্রকল্প শেষ না হতেই এবার ‘সুফল’ প্রকল্পের নামে বিদেশ সফর শুরু হয়েছে।

সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রকল্পের টাকায় প্রশিক্ষণের নামে কর্মকর্তারা বিদেশ সফর করেছেন। দেখা যায়, যাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে তাঁরা প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই অবসরে চলে গেছেন। ফলে প্রকল্পের উন্নয়নে তাঁদের প্রশিক্ষণ কোনোই কাজে লাগেনি। এটা কেইস প্রকল্পে হয়েছে। আবার সুফল প্রকল্পে এসেও তেমনটি দেখা যাচ্ছে। কমিটির পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সহযোগিতামূলক বন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং প্রকল্প এলাকায় বননির্ভর জনগোষ্ঠীর বিকল্প আয়বর্ধক কাজের সুযোগ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নেওয়া হয় সুফল প্রকল্প। এর কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের ১ জুলাই। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষ এ প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ শেষ হবে ২০২৩ সালের ৩০ জুন। দেশের আটটি বিভাগের ১৭টি বন বিভাগের ২৮ জেলায় ৬০০ গ্রামে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। এখনো সেই গ্রামগুলো চিহ্নিত করা হয়নি। অথচ প্রকল্পের কর্মকর্তারা এরই মধ্যে বিদেশে প্রশিক্ষণ শুরু করেছেন। এর মাধ্যমে ১১৩ কোটি টাকা লুটপাটের আয়োজন চলছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেছেন।

সূত্র জানায়, সংসদীয় কমিটির বৈঠকে ওই দুই প্রকল্পের প্রতিবেদন নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন তোলা হয়। কিন্তু কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। গত শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে এ নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন কমিটির সদস্যরা। কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠক থেকে তদন্তসাপেক্ষ ওই দুটি প্রকল্পে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নকাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কমিটির সদস্য রেজাউল করিম বাবলু কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রকল্পের কর্মকর্তাদের দেওয়া প্রতিবেদনেই অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠেছে। এভাবে প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সরকারের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। এই কারণে প্রকল্পের কাজে মনিটরিং জোরদার করতে বলা হয়েছে।

উৎসঃ কালেরকণ্ঠ

আরও পড়ুনঃ শেখ হাসিনার নতুন মডেলের দুর্নীতির চিত্র!


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সভা-সমাবেশে নিয়মিতই বলে থাকেন এসবের মধ্যে তার গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা হলো-বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসলে দেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। রাষ্ট্রের সম্পত্তি লুটপাট, আত্মসাত ও দুর্নীতি করতে তারা ক্ষমতায় আসে। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে দেশের উন্নয়ন হয়। জনগণ উন্নত জীবন পায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সুনাম বাড়ে। তার আরেকটি কথা হলো-আমি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। আমার বাবা দেশ স্বাধীন করেছে। দুর্নীতি-লুটপাটের জন্য আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে না। আমাদের অর্থ-সম্পদের দরকার নাই। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে দুর্নীতি বন্ধ করেছে। দেশে এখন আর কোনো দুর্নীতি। এভাবেই প্রতিদিন শেখ হাসিনা ও তার দলের নেতারা সভা-সমাবেশে গিয়ে জনগণের সামনে কথিত উন্নয়নের ভাঙ্গা রেকর্ড শুনিয়ে নিজেদের দুর্নীতিকে চাপা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

আর শেখ হাসিনার বিগত ১১ বছরের শাসনামল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে দুর্নীতি-লুটপাটের এত মহোৎসব অতীতে আর হয়নি। শেয়ারবাজার ও ব্যাংক লুটের ঘটনা অতীতে ঘটেনি। আর বাণিজ্যিক খাতের প্রত্যেকটি ব্যাংক সরকার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসব ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বাণিজ্যিক খাতের ব্যাংকগুলো এখন চরম অর্থসংকটে ভুগছে। এছাড়া রাষ্ট্রের এমন কোনো সেক্টর নেই যেখান থেকে ক্ষমতাসীনরা অর্থ আত্মসাত করেনি।

সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো-কথিত উন্নয়ন প্রকল্পের নামে শেখ হাসিনা এখন সারাদেশে দুর্নীতির সম্প্রসারণ করেছে। আর এসব লুটপাট-দুর্নীতিও চলছে এখন নতুন মডেলে। এ রকম স্টাইলের দুর্নীতি দেশ কখনো হয়নি। এসব লুটপাট-দুর্নীতির দিকে তাকালে নিসন্দেহে বলা যায়-বাংলাদেশ এখন বিশ্বে দুর্নীতিতে নতুন মডেল। কারণ, পৃথিবীর কোথাও নতুন মডেলে দুর্নীতি হয়নি।

পাঠকদের জন্য এখানে শেখ হাসিনার নতুন মডেলের কিছু দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হলো:

পর্দা কেলেংকারি
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পর্দা কেলেংকারি নিয়ে সারাদেশ এখন তোলপাড়। হাসপাতালটির ১১ কোটি ৫৩ লাখ ৪৬৫ টাকার মেডিকেল যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনাকাটায় বিল দেখানো হয়েছে ৫২ কোটি ৬৬ লাখ ৭১ হাজার ২০০ টাকা। এই একটি কেনাকাটাতেই মেসার্স অনিক ট্রেডার্স বাড়তি বিল দেখিয়েছে ৪১ কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার ৭৩৭ টাকা।

আইসিইউতে ব্যবহৃত একটি পর্দার দাম ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ছাড়াও একটি অক্সিজেন জেনারেটিং প্ল্যান্ট কেনার খরচ দেখানো হয়েছে ৫ কোটি ২৭ লাখ টাকা। একটি ভ্যাকুয়াম প্ল্যান্ট ৮৭ লাখ ৫০ হাজার, একটি বিএইইস মনিটরিং প্ল্যান্ট ২৩ লাখ ৭৫ হাজার, তিনটি ডিজিটাল ব্লাড প্রেসার মেশিন ৩০ লাখ ৭৫ হাজার, আর একটি হেডকার্ডিয়াক স্টেথোসকোপের দাম ১ লাখ ১২ হাজার টাকা। এমন অবিশ্বাস্য দামে ১৬৬টি যন্ত্র ও সরঞ্জাম কিনেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

বই কেলেংকারি
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য বই কিনেছে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়। এই বই কেনাতেও করা হয়েছে সাগর চুরি। জানা গেছে, যে বইয়ের দাম ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। সে বইয়ের কেনার বিল করা হয়েছে ৪৩ হাজার টাকা। যে বইয়ের দাম ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা। সে বই কেনা হয়েছে ২০ হাজার ৪৮০ টাকায়। যে বইয়ের দাম ৪ থেকে পাঁচ হাজার টাকা। সে বই কেনা হয়েছে ১৪ হাজার ১৭৫ টাকা করে। যে বইয়ের বাজার মূল্য ২৯ হাজার টাকা। সে বই কেনা হয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৫০ টাকা করে। যে বইয়ের বাজার মূল্য ১৪ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা। সে বই কেনা হয়েছে ৩৩ হাজার ৭৫ টাকা করে।

ঢেউ টিন কেলেংকারি
আরেক মহা কেলেংকারির ঘটনা ঘটেছে খাগড়াছড়ির এপিবিএন কার্যালয়ের ঢেউ টিন কেনায়। এখানে একটি টিন কেনা হয়েছে এক লাখ টাকায়। যা বর্তমান বাজার মূল্যের তুলনায় ১০০ গুণেরও বেশি। ওই মেরামতকাজে মাত্র দুই বান টিনের দাম দেখানো হয়েছে ১৪ লাখ টাকা। এছাড়াও কাজ শুরুর মাত্র ২০ দিনের মধ্যেই বাজেটের ৭১ লাখ টাকা তুলে নেয়া হয়। অথচ মেরামত কমিটির সদস্য সচিবের দেয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থেকে জানা যায়, চার মাসে মাত্র ১৫ ভাগ কাজ হয়েছে।

রেলওয়েতে হরিলুট
রেলওয়ের কারিগরি প্রকল্পে একজন ক্লিনারের বেতন মাসে চার লাখ বিশ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। অবাক হলেও এমনই অবিশ্বাস্য বেতন ধরা হয়েছে। শুধু তাই নয়, অফিস সহায়কের বেতন ধরা হয়েছে ৮৪ হাজার টাকা। রেল মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো প্রকল্প প্রস্তাবনায় এমন বেতনের কথা বলা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের কার্যপত্রে দেখা যায়, প্রকল্পে ক্লিনারের বেতন ধরা হয় মাসে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা। আর অফিস সহায়কের বেতন প্রতি মাসে ৮৩ হাজার ৯৫০ টাকা। বিদেশী পরামর্শকদের বেতন মাসে গড়ে ১৬ থেকে ২৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।

নদীর তীর সংরক্ষণের নামে লুটপাট
নদী একটা, এলাকাও একটাই, কিন্তু তার তীর সংরক্ষণ ব্যয় তিন ধরনের। আর এই ব্যয় ব্যবধান ৯ থেকে ১৫ কোটি টাকা প্রতি কিলোমিটারে। প্রতিটি সাইনবোর্ড বানাতে ব্যয় সাড়ে ৫ লাখ টাকা। স্ট্যাম্প ও সিল বাবদ খরচ ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা। আর এই খরচ প্রস্তাব করা হয়েছে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের সন্দ্বীপ চ্যানেলের ভাঙনরোধে ৪.৪ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ প্রকল্পে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি ১১৮ কোটি ৩০ লাখ ২৪ হাজার টাকা ব্যয়ে তীর সংরক্ষণের একটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। প্রকল্পটি হলো নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সন্দ্বীপ চ্যানেলের ভাঙন থেকে মুসাপুর ক্লোজার, রেগুলেটর এবং সংলগ্ন এলাকা রক্ষার জন্য মুসাপুর রেগুলেটরের ডাইভারশন চ্যানেল ও সন্দ্বীপ চ্যানেলের বাম তীর প্রতিরক্ষা। এখানে ৪.৪ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০০ কোটি ৮৯ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। ১.৩ কিলোমিটার রোড নির্মাণ ও কার্পেটিং খরচ ৩ কোটি ৩ লাখ ৬১ হাজার টাকা। প্রকল্পের পাঁচটি সাইনবোর্ড তৈরিতে ব্যয় হবে সাড়ে ২৭ লাখ টাকা। সিল ও স্ট্যাম্প খাতে ব্যয় ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

দেখা যায়, গড়ে প্রতি কিলোমিটার তীর সংরক্ষণে ব্যয় হবে ২২ কোটি ৯৩ লাখ ২ হাজার টাকা। একই নদীর একই এলাকায় তীর সংরক্ষণে ব্যয় হচ্ছে তিন ধরনের। মুসাপুর রেগুলেটরের ডাইভারশন চ্যানেলের ভাটিতে ১.৩ কিলোমিটারের জন্য ব্যয় ২২ কোটি ৮১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। এখানে কিলোমিটারে ব্যয় হবে ১৭ কোটি ৫৪ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। আর একই চ্যানেলের উজান তীরে ৬০০ মিটার বা আধা কিলোমিটারের একটু বেশির জন্য ব্যয় ১১ কোটি ২২ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। অন্য দিকে চ্যানেলের ভাটির বাম তীরে আড়াই কিলোমিটারের জন্য খরচ ৬৬ কোটি ৮৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা। এখানে কিলোমিটারে ব্যয় হবে ২৬ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার টাকা।

বালিশ কাণ্ড
আসবাবপত্র ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র কেনা ও ফ্ল্যাটে তুলতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার জন্য নির্মিত ভবনে ওয়াশিং মেশিনসহ অন্তত ৫০টি পণ্য ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ক্রয়মূল্যের প্রায় অর্ধেক, কোনো কোনোটিতে ৭৫ শতাংশ। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো- এক কেজির মতো ওজনের একটি বৈদ্যুতিক কেটলি নিচ থেকে ফ্ল্যাটে তুলতে খরচ হয়েছে প্রায় তিন হাজার টাকা। জামা-কাপড় ইস্ত্রি করার কাজে ব্যবহৃত প্রতিটি ইলেক্ট্রিক আয়রন ওপরে তুলতেও খরচ হয়েছে প্রায় সমপরিমাণ টাকা।

প্রায় আট হাজার টাকা করে কেনা প্রতিটি বৈদ্যুতিক চুলা ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিতে খরচ দেখানো হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার টাকার বেশি। প্রতিটি শোবার বালিশ ভবনে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় এক হাজার টাকা করে। আর একেকটি ওয়াশিং মেশিন ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ৩০ হাজার টাকারও বেশি। কেবল ভবনে ওঠানোর ক্ষেত্রেই নয়, আসবাবপত্র কেনার ক্ষেত্রেও অস্বাভাবিক অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে। ২০ তলা ওই ভবনটির প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য প্রতিটি বালিশ কেনা হয়েছে ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা করে, ফ্ল্যাটে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ৭৬০ টাকা। ৯৪ হাজার ২৫০ টাকা করে কেনা প্রতিটি রেফ্রিজারেটর ওপরে ওঠাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১২ হাজার ৫২১ টাকা। একেকটি ওয়াশিং মেশিন কেনা হয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা দরে, ফ্ল্যাটে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ৩০ হাজার ৪১৯ টাকা করে। একেকটি ড্রেসিং টেবিল কেনা হয়েছে ২১ হাজার ২১৫ টাকায়, আর ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ৮ হাজার ৯১০ টাকা করে। এছাড়া রুম পরিষ্কার করার মেশিন কিনতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১২ হাজার ১৮ টাকা, ভবনে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ছয় হাজার ৬৫০ টাকা।

প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য ৪৩ হাজার ৩৫৭ টাকা দরে ১১০টি খাট কিনতে খরচ হয়েছে ৪৭ লাখ ৫৯ হাজার ২৭০ টাকা। খাটগুলোর প্রত্যেকটি ফ্ল্যাটে নিতে খরচ দেখানো হয়েছে ১০ হাজার ৭৭৩ টাকা করে। একেকটি সোফা কেনা হয়েছে ৭৪ হাজার ৫০৯ টাকায়, ভবনে ওঠাতে খরচ হয়েছে ২৪ হাজার ২৪৪ টাকা করে। ১৪ হাজার ৫৬১ টাকা দরে কেনা সেন্টার টেবিলের প্রত্যেকটি ভবনে তুলতে লেগেছে ২ হাজার ৪৮৯ টাকা।

ছয়টি চেয়ারসহ ডাইনিং টেবিলের একেকটি সেট কেনা হয়েছে এক লাখ ১৪ হাজার ৬৭৪ টাকায়, ভবনে তুলতে লেগেছে ২১ হাজার ৩৭৫ টাকা করে। ৫৯ হাজার ৮৫৮ টাকা দরে ওয়ারড্রব কিনে ভবনে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ১৭ হাজার ৪৯৯ টাকা করে। ৩৬ হাজার ৫৭ টাকা দরে ৩৩০টি মেট্রেস ও তোশক কেনা হয়েছে মোট এক কোটি ১৯ লাখ টাকায়, যার প্রতিটি ভবনে ওঠাতে খরচ করা হয়েছে সাত হাজার ৭৫২ টাকা করে।

আরও জানা গেছে, এই প্রকল্পের আওতায় একজন গাড়িচালকের বেতন ধরা হয়েছে ৭৩ হাজার ৭০৮ টাকা, যা একজন সচিবের বেতনের সমান। বর্তমানে সচিবের বেতন ৭৮ হাজার টাকা। অন্যদিকে রাঁধুনি আর মালির বেতন ধরা হয়েছে ৬৩ হাজার ৭০৮ টাকা। এই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের বেতন ধরা হয়েছে সর্বসাকুল্যে ৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। যা প্রধানমন্ত্রীর সম্মানীর ছয়গুণেরও বেশি। প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালকের মাসিক বেতন মোট ৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। যা প্রধানমন্ত্রীর সম্মানীর প্রায় পাঁচগুণ।

দুর্নীতির কারখানা তিতাস
সম্প্রতি দুদকের অনুসন্ধানে ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র বেরিয়ে এসেছে তিতাসে। এখানে পদে পদে দুর্নীতি অনিয়ম হচ্ছে। আর খেসারত দিচ্ছে গ্রাহকরা। যেমন-অবৈধ সংযোগ, নতুন সংযোগে অনীহা এবং অবৈধ সংযোগ বৈধ না করা, অবৈধ লাইন পুনঃ সংযোগ, অবৈধ সংযোগ বন্ধে আইনগত পদক্ষেপ না নেওয়া, অদৃশ্য হস্তক্ষেপে অবৈধ সংযোগ, গ্যাস সংযোগে নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ না করা, বাণিজ্যিক শ্রেণির গ্রাহককে শিল্প শ্রেণির গ্রাহক হিসেবে সংযোগ প্রদান, মিটার টেম্পারিং, অনুমোদনের অতিরিক্ত বয়লার ও জেনারেটর এ গ্যাস সংযোগ, মিটার বাইপাস করে সংযোগ প্রদান সংক্রান্ত দুর্নীতি, এস্টিমেশন অপেক্ষা গ্যাস সরবরাহ কম করেও সিস্টেম লস দেখানো, ইচ্ছাকৃতভাবে ইভিসি-ইলেকট্রনিক ভলিয়ম কারেক্টর না বসানো।

দুর্নীতির শিকার ওয়াশার গ্রাহকরা
ঢাকা ওয়াসার অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে সম্প্রতি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে টিআইবি। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ৬২ শতাংশ গ্রাহক ওয়াশা কর্মকর্তাদের দুর্নীতি অনিয়মের শিকার। এসব অনিয়মের মধ্যে- পানির সংযোগের জন্য ২০০ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। পয়:লাইনের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে ৩০০-৪৫০০ টাকা, গাড়িতে জরুরি পানি সরবরাহের জন্য ২০০থেকে ১৫০০ টাকা, মিটার ক্রয়/পরিবর্তনের জন্য এক হাজার-১৫ হাজার, মিটার রিডিং ও বিল সংক্রান্ত কাজের জন্য ৫০ থেকে তিন হাজার এবং গভীর নলকূপ স্থাপনে এক থেকে দুই লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়।

দুর্নীতির কারণে ধসে পড়েছে বিমান খাত
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ১৯ খাতে দুর্নীতির সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বিমানের ৮ এবং বেবিচকের ১১ খাতে দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত হয়েছে।

বিমানের ৮ খাতের মধ্যে এয়ারক্রাফট কেনা ও লিজ নেয়া, রক্ষণাবেক্ষণ-ওভারহোলিং, গ্রাউন্ড সার্ভিস, কার্গো আমদানি-রফতানি, ট্রানজিট যাত্রী ও লে-ওভার যাত্রী, অতিরিক্ত ব্যাগেজের চার্জ আত্মসাৎ, টিকিট বিক্রি, ক্যাটারিং খাতের দুর্নীতি চিহ্নিত হয়েছে।

আর বেবিচকের ১১ খাতের মধ্যে আছে টাওয়ার বোর্ডিং ব্রিজসহ বড় বড় কেনাকাটা, অবকাঠামো উন্নয়ন, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, বিমানবন্দরের দোকান বিলবোর্ড ভাড়া, পরামর্শক নিয়োগ, কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণ, মন্ট্রিল কনভেনশন বাস্তবায়নে দুর্নীতি ও দীর্ঘসূত্রতা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, পাইলট ফ্লাইং ইঞ্জিনিয়ার ও এয়ারক্রাফটের লাইসেন্স, ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্স ও সিডিউল অনুমোদন ও অপারেশনাল কাজে দুর্বলতা।

দুর্নীতির মহোৎসব স্বাস্থ্যখাতে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১১টি খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বিভিন্ন ক্রয়, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসা দেওয়া, চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইকুইপমেন্ট ব্যবহার, ওষুধ সরবরাহসহ বিভিন্ন দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, এসব খাতের দুর্নীতির সঙ্গে সরকারের মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতারা জড়িত। এসব দুর্নীতি ও লুটপাটের টাকা সরকারের উচ্চপর্যায়ের লোকদের পকেটেও যাচ্ছে। যার কারণে দুর্নীতি দমন কমিশন এসব দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

উৎসঃ অ্যানালাইসিস বিডি

আরও পড়ুনঃ ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, ক্ষমতার দম্ভে মানবতা কেন ভূলুণ্ঠিত হয়?


দখল, লুটপাট, রাহাজানি ছাত্রলীগের ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে শুধু শেখ হাসিনাই দেশের ক্ষমতা দখল করেননি, শেখ সাহেব নিজেও এই ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশকে হটিয়ে আ. লীগের নেতৃত্ব দখল করেছিলেন। ফলে দখল, শোষণ আর ফ্যাসিবাদী দর্শনেই ছাত্রলীগ সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদকাসক্তি ও টাকার বিনিময়ে দলীয় পদ বিক্রির মত বেশ কিছু অভিযোগে পদ হারাতে হলো ছাত্রলীগের সভাপতি শোভন ও গোলাম রাব্বানীকে।

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় পদ হারাতে হয় ছাত্রলীগের সভাপতি সোহাগ ও জাকিরকে। ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জাকিরের বিরুদ্ধে ছাত্রশিবিরের সাথে সম্পৃক্ততার ভাসমান অভিযোগ আনা হয়। সেই সাথে দুর্নীতি ও অর্থের বিনিময়ে দলীয় পদ বিক্রির অভিযোগ ছিল সভাপতি সোহাগের বিরুদ্ধেও। আর এসব কারণ দেখিয়ে অনেকটা ঝেটিয়ে বিদায় করা হয় তাদের। এরপর আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে পারিবারিক সম্পৃক্ততা থাকাকে গুরুত্ব দিয়ে শোভন ও রাব্বানীকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি দেয়া হয় ছাত্রলীগে।

পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড থাকায় পদ পেয়ে ক্ষমতার দম্ভে যেন উন্মত্ত হয়ে ওঠেন শোভন-রাব্বানী। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে হেলমেট পরিহিত ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দেয় তারা। চালানো হয় গুলি। ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের রক্তে ভিজে যায় রাজপথ। আ. লীগের ধানমন্ডি কার্যালয়ে বন্দী রেখে তাদের ওপর চালানো হয় পৈশাচিক নির্যাতন।

এরপর আর শোভন-রাব্বানীকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহনকারী শিক্ষার্থী ও বেকার তরুণ তরুণীদের ওপর চালানো বর্বরতা সবার চোখের সামনেই ঘটেছে। তাই সে বর্বর জুলুমের বিস্তারিত বর্ণনা টেনে পাঠকের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাব্বানী বাহিনীর হাতুড়ি আর হেলমেট তান্ডবের ক্ষত আজও অনেক তরুণ বহন করে চলেছেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নুরু, রাশেদ, ফারুকসহ অনেকেই সাক্ষী হয়ে আছেন সেই অমানবিক নির্যাতনের। সাধারণ শিক্ষার্থীদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে সেদিন যারা শোভন-রাব্বানীর নেতৃত্বে জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে সন্ত্রাস চালিয়েছিলেন, প্রাচ্যের অক্সফোর্ডকে শিক্ষার্থীদের রক্তে রক্তাক্ত করেছিলেন, আজ তারা কোথায়? কোথায় সেই দম্ভ?

শুধু তাই নয়, রাতের আঁধারে বিরোধী মতের পোস্টার ছেঁড়ার ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে পৈশাচিক আনন্দ প্রকাশের যে নজির রাব্বানী ও তার সহচররা দেখিয়েছেন, এমন হীন কাজ করতে ইতোপূর্বে কোনো ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাকে করতে দেখা যায়নি।

পাঠককে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের কথা। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হলেও গভীর রাতে ২০-২৫টি মোটরসাইকেলে করে দলীয় সন্ত্রাসীদের সাথে নিয়ে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে প্রবেশ করে বুয়েট শিক্ষার্থী দাঈয়ানকে ব্যাপক মারধর করে পুলিশের কাছে তুলে দেন। এসময় বুয়েট শিক্ষার্থী দাঈয়ান নাফিস প্রধানের কাছে থাকা একাডেমিক সরঞ্জামকে জঙ্গী সরঞ্জাম বলে ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়।

প্রয়াত বিএনপি নেতা সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর কবর পর্যন্ত নিস্তার পায়নি হাতুড়ি ও হেলমেট বাহিনীর কমান্ডার গোলাম রাব্বানীর হাত থেকে। মৃত মানুষের কবরে গিয়ে এমন উন্মত্ততা দেশের মানুষ আর কোনোদিন দেখেনি।

আর ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগ যা করেছে তা সত্যিই এক কদর্য ইতিহাস হয়ে যুগ যুগ থাকবে। ভিপি নূরের ওপর বারবার হামলা ও নির্যাতনের ভিডিওগুলো দেখলে আজও গা শিউরে ওঠে। রাতের আঁধারে ছাত্রীদের হলে প্রবেশ করে হুমকি ধামকি দেয়া ও হয়রানি ব্যাপারেও রেকর্ড আছে এই ছাত্রলীগের। আন্দোলনরত মেয়েদেরকে বারবার যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে নজিরবিহীন। ভিসির কাছে ছাত্রলীগের নিপীড়নের বিচার চাইতে গিয়েও বর্বর হামলার শিকার হয়েছে শিক্ষার্থীরা। কিন্তু সেদিন সেসব নিপীড়িত শিক্ষার্থীরা বিচার পায়নি। উল্টো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদেরকে হিংস্র হায়েনার মত লেলিয়ে দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমন করেছে।

হেলমেট বাহিনীর কমান্ডার শোভন-রাব্বানী সেদিন এসব দলীয় সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে অবলীলায় করতে পেরেছিলেন শুধু ক্ষমতার দাপটে। কিন্তু আজ কোথায় তাদের সেই ক্ষমতা? কোথায় তাদের সেই দম্ভ? কোথায় সেই পারিবারিক পরিচয়? ক্ষমতার দম্ভে যারা অন্ধ হয়ে যায় তাদের পরিণতি সম্ভবত এমনই হয়। এরচেয়ে ভয়ানক পরিণতি তাদের জন্য আসলেও কেউ অবাক হবে না।

বিগত নির্বাচনে যে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী বানাতে দিন-রাত সারাদেশে শোভন-রাব্বানীরা সন্ত্রাস চালিয়েছে, সময়ের ব্যবধানে সেই শেখ হাসিনাই তাদের ছুড়ে ফেললেন। অনেকটা ব্যবহৃত নোংরা কাপড়ের মত। ক্ষমতা দখল করে ক্ষমতার দম্ভে যারা সাধারণ জনমানুষের সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন, শোভন-রাব্বানীরা তাদের জন্য অনেক বড় উদাহরণ হয়ে রইল। শিক্ষা নিতে পারলে কল্যাণ। অন্যথায় অপমান আর ঘৃনাই হয় জুলুমবাজ দাম্ভিকদের প্রাপ্য। মনে রাখা প্রয়োজন, ক্ষমতা কখনই চিরস্থায়ী নয়। বিশ্বের অনেক বড় বড় ক্ষমতাধরকেই এভাবে অপমানের সাথে বিদায় নিতে হয়েছে। তাই ক্ষমতাধরদের মনে রাখতে হবে- ক্ষমতায় যেন কখনও মানবতা পিষ্ট না হয়।

হাসান রূহী
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

উৎসঃ অ্যানালাইসিস বিডি

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here