এত টাকা কোথায় পেলেন কুড়িগ্রাম হাসপাতালের হিসাবরক্ষক আশরাফ মজিদ ?

0
370

কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল দুর্নীতির কারখানা হিসেবে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠান না থাকলেও হাসপাতালের ঠিকাদারি কাজ পাচ্ছেন স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। সেই সঙ্গে সরকারি ওষুধ পাচার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন মূল হোতারা।

হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে বিনামূল্যের ওষুধ অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে কিনতে হয় রোগীদের। হাসপাতালের কম্বল-মশারি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র না পেয়ে ভোগান্তি পোহান রোগী ও তার স্বজনরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে প্রতিদিন শত-শত রোগী সেবা নিতে আসেন। এদের মধ্যে অনেকে ভর্তি হন আবার কেউ বাড়ি চলে যান। ভর্তি হওয়া রোগীদের জন্য সরকারের দেয়া কম্বল, চাদর ও বালিশের কাভার দেয়ার নিয়ম থাকলেও সেগুলো দেয়া হয় না।

সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে শীতেও বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। শীতের সময় হাসপাতালের মেঝেতে থাকলেও রোগীদের মিলছে না কম্বল ও বালিশের কাভার। যদি কোনোভাবে মেলে সেটি হয় দুর্গন্ধযুক্ত, না হয় ময়লাযুক্ত। ফলে হাসপাতালে রোগী ভর্তি করে অনেকে বাধ্য হয়ে বাড়ি থেকে শীত নিবারণের কাঁথা, কম্বল এবং লেপ-তোশক নিয়ে আসেন।

এদিকে, প্রতিষ্ঠান না থাকলেও অসাধু উপায়ে মানিক লন্ড্রি এবং সাদেক লন্ড্রি নামে দুই অদৃশ্য প্রতিষ্ঠান হাসপাতালের ঠিকাদারি কাজ পায়। ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য সহযোগিতা করেন হাসপাতালের হিসাবরক্ষক আশরাফ মজিদ। এই কাজের জন্য মানিক লন্ড্রি এবং সাদেক লন্ড্রি নামে দুই অদৃশ্য প্রতিষ্ঠান থেকে মাসোয়ারা নেন আশরাফ মজিদ।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, প্রতি মাসে হাসপাতালের কাপড়-চোপড়, কাঁথা, কম্বল এবং লেপ-তোশক ধোয়ার কাজের জন্য মোটা অঙ্কের বিল উত্তোলন করছেন ঠিকাদার। এই টাকার ভাগ নেন আশরাফ মজিদ। হাসপাতালের বিভিন্ন কাজে এভাবে দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকার পাহাড় গড়েছেন মজিদ।

পৌর শহরের গস্তিপাড়ায় প্রায় ৬০ লাখ টাকা দিয়ে দুটি জমি কিনে একটিতে পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করেছেন মজিদ। যার মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা। ২০১৭ সালে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে গ্রামের বাড়িতে ৮০ শতক জমি কেনেন তিনি।

হলোখানা ইউনিয়নের এক জনপ্রতিনিধি বলেন, আশরাফ মজিদ সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের টাপুরচর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত প্রাইমারি শিক্ষক বহিয়ত উল্লাহ মাস্টারের ছেলে। তার বাবার ১০ বিঘার মতো সম্পত্তি রয়েছে। এই সম্পত্তির অংশীদার রয়েছেন ছয় ভাই-বোন। কিন্তু হঠাৎ করে আশরাফ মজিদ শহরে জায়গা কিনে বাড়ি করেছেন। হঠাৎ কীভাবে তিনি এত টাকার মালিক হলেন তা নিয়ে সবাই অবাক। অথচ তার পরিবারের এমন কোনো সদস্য নেই তাকে জায়গা-জমি কেনার জন্য মোটা অর্থ সহযোগিতা করবেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, হাসপাতালের বিল সিটে প্রতিটি কম্বল ধোয়ার বিল ১১ টাকা, চাদর ১৭ টাকা, বালিশের কাভার সাত টাকা, মশারি পাঁচ টাকা, দরজা ও জানালার পর্দা চার টাকা এবং তোয়ালে তিন টাকা করে দর দেয়া রয়েছে।

হাসপাতালের বিল সিটে দেখা যায়, কাপড়-চোপড় ধোয়ার কাজে শীত ও গ্রীষ্মকালীন প্রতি মাসে গড়ে ঠিকাদার প্রায় দেড় লাখ টাকা করে উত্তোলন করছেন। জেনারেল হাসপাতালের ১০০ শয্যা রাজস্ব খাত এবং ১৫০ শয্যার জন্য উন্নয়ন খাত থেকে ঠিকাদারকে এ বিল দেয়া হয়।

এ বিষয়ে ঠিকাদার মানিক মিয়া বলেন, দুই বছর ধরে হাসপাতালের কাপড়-চোপড়, কাঁথা-কম্বল, লেপ-তোশক ধোয়ার ঠিকাদারি কাজ করছি।

অথচ সরেজমিনে দেখা যায়, ঠিকাদার মানিক মিয়া তার বাড়ির পুকুরের পাশে হাসপাতালের কাপড়-চোপড় ও কাঁথা ধুয়ে রোদে শুকাতে দিয়েছেন। কিন্তু সেখানে কোনো লেপ-তোশক ও কম্বল ছিল না।

মানিক লন্ড্রি নামের প্রতিষ্ঠানটি শহরের দাদামোড়ে থাকার কথা মানিক মিয়া জানালেও তার ভাই সাদেক বলেন, বর্তমানে লন্ড্রি প্রতিষ্ঠান না থাকলেও আগে ছিল।

মানিক মিয়া আরও বলেন, আমার এবং আমাদের স্বজনের কাছ থেকে তিন বছর আগে প্রায় ৬০ লাখ টাকা দিয়ে জমি কিনেছেন হিসাবরক্ষক আশরাফ মজিদ। শহরে বাড়িও বানিয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের দাদামোড়ের ঠিকানায় মানিক লন্ড্রি এবং সাদেক লন্ড্রি নামে দুই প্রতিষ্ঠানকে হাসপাতালের ঠিকাদারির কাজ দেয়া হলেও বাস্তবে দুই প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই।

দাদামোড়ের লন্ড্রি ব্যবসায়ী সালাম বলেন, আমি আট বছর ধরে এখানে লন্ড্রির ব্যবসা করছি। এখানে মানিক লন্ড্রি এবং সাদেক লন্ড্রি নামে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই, আর ছিলও না।

সম্প্রতি হাসপাতালের ওষুধ পাচারকালে মোসলেমা ও রোসনা বেগম নামে দুইজন নারী পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন। কিন্তু পরে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মকর্তা ও সিনিয়র নার্স বলেন, হাসপাতালের ওয়ার্ড ইনচার্জ অনেকেই আছেন, দীর্ঘদিন ধরে এই পদটি ধরে আছেন। তারা রোগীদের সরকারি ওষুধ না দিয়ে বাইরে থেকে কিনে নিয়ে আসতে বলেন। আর ওই ওষুধগুলো বিতরণ দেখিয়ে বহিরাগত নারী-পুরুষদের দিয়ে পাচার করেন তারা।

তারা আরও বলেন, হাসপাতালের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে একটি চক্র নিয়মতি ওষুধ পাচার করেন। হাসপাতালের প্রধান সহকারী ইউনুস আলীর বিরুদ্ধে নভেম্বর মাসে ৯০ জন নার্স হাসপাতালে যোগদানকালে তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি ১০০০ টাকা করে নেয়ার অভিযোগ আছে।

এসব বিষয়ে হাসপাতালের হিসাবরক্ষক আশরাফ মজিদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনি আমাকে চেনেন। আমার সম্পর্কে জানেন। আপনাকে কোনো তথ্য দিতে আমি বাধ্য নই। এই জেলার ৪০০ সাংবাদিকের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। আমার বিরুদ্ধে লিখলে কিছুই হবে না।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে মাসোয়ারা ও হাসপাতালের দুর্নীতির টাকার বাড়ি বানিয়েছেন এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ২৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছি আমি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আনোয়ারুল হক প্রামাণিক বলেন, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে নিয়ম মাফিক কাজ দেয়া হয়েছে।

হাসপাতালের কাপড়-চোপড় ধোয়ার কাজ না করেও নিয়মতি বিল উত্তোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই বিলগুলো চেক করেই আমার কাছে আসে। সে হিসেবে আমি বিলের কাগজে সই করে থাকি।

উৎসঃ ‌জাগোনিউজ

আরও পড়ুনঃ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কুমিরদের এত টাকা!


তাদের কেউ তৃতীয় কেউ চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। বেতনের টাকায় যাদের কোনোমতে জীবন ধারণের কথা। অথচ তারা একেক জন যেন টাকার কুমির। আছে আলিশান বাড়ি, বিলাসবহুল গাড়ি। নামে-বেনামে আছে হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি। তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মচারী। তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতি করে হাজার কোটি টাকার

সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগ উঠলেও এখনো তারা কর্মক্ষেত্রে বহাল। শুধু তাদের বদলি করা হয়েছে আগের কর্মস্থল থেকে।

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা- কর্মচারীর দুর্নীতির তথ্য। বিশেষ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবরক্ষণ পদের কর্মচারী আবজাল হোসেনের সম্পদের অনুসন্ধান করতে গিয়ে ফাঁস হয় বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের তথ্য। মাত্র ১২শ’ টাকা বেতনে চাকরি শুরু করা আবজাল গত দুই যুগে দুর্নীতির মাধ্যমে গড়েছেন অঢেল সম্পদ। তার ও তার স্ত্রী রুবিনা খানমের এতই সম্পদ যে, দুদক কর্মকর্তারা মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। সম্প্রতি বরখাস্ত হওয়া আবজাল দীর্ঘদিন কর্মরত থাকলেও তার স্ত্রী ২০০৯ সালে চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দম্পতির নামে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর সড়কেই ৪টি পাঁচতলা বাড়ি ও একটি প্লট রয়েছে।

১১ নম্বর সড়কের ১৬, ৪৭, ৬২ ও ৬৬ নম্বর বাড়িটি তাদের নামে। সড়কের ৪৯ নম্বর প্লটটিও তাদের। মিরপুর পল্লবীর কালশীর ডি-ব্লকে ৬ শতাংশ জমির একটি, মেরুল বাড্ডায় আছে আরো একটি প্লট। মানিকদি এলাকায় জমি কিনে বাড়ি করেছেন। ঢাকার দক্ষিণখানে আছে ১২ শতাংশ জায়গায় দোতলা বাড়ি। আবজালের নিজ জেলা ফরিদপুর শহরে টেপাখোলা লেকপাড়ে ফরিদের স’মিলের পাশে নিজে কিনেছেন ১২ শতাংশ জমি। ওই জমির প্রায় পাশাপাশি টেপাখোলায় ওই এলাকার কমিশনার জলিল শেখের আবাসন প্রকল্পে ৬ শতাংশ করে নিজে প্লট কিনেছেন দুটি। ফরিদপুরে ওইসব ভূ-সম্পদ ছাড়াও শহরের গোপালপুর এলাকার বনলতা সিনেমা হলের পাশে মাস্টার কলোনিতে ১৫ শতাংশ জায়গায় একটি একতলা বাড়ি ও ভাড়ায়চালিত ৩০টি সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিক এই আবজাল। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, গুলশান, বনানী ও বারিধারায় আবজালের বাবা-মা, ভাইবোন ও নিকট আত্মীয়দের নামে ২০টিসহ সারা দেশে তাদের প্রায় শতাধিক প্লট ও বাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া মালয়েশিয়ায় ২ একর জমি, অস্ট্রেলিয়ায় ট্রাভেল এজেন্সি, ব্যবসা-বাড়ি, কানাডায় কেসিনোর মালিকানা-ফার্ম হাউজ এবং যুক্তরাষ্ট্রে হোটেল রয়েছে তার। অ্যাকাউন্টস অফিসার থাকা অবস্থায় আবজাল ব্যবহার করেছেন লেক্সাস গাড়ি। যা বাংলাদেশের মন্ত্রী ও সচিব পদের কর্মকর্তারা ব্যবহার করেন। আবজাল দম্পতি নানা কাজের জন্য বছরে ২০ থেকে ২৫ বার দেশের বাইরে ভ্রমণ করেন বিজনেস ক্লাসের টিকিটে।

এদিকে রাজধানীর মহাখালী বক্ষব্যাধি হাসপাতালের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী (হিসাবরক্ষক) লিয়াকত হোসেন ও তার স্ত্রী লাকি আক্তার চৌধুরীর নামে রয়েছে শত কোটি টাকার সম্পদ। গত ১৫ বছরে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন লিয়াকত। জানা গেছে তিনি সেই টাকার কুমির আবজাল হোসেনেরই ভাই। ২০০৩ সালে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে বক্ষব্যাধি হাসপাতালের হিসাব সহকারী পদে চাকরিতে যোগদান করেন লিয়াকত হোসেন। সে হিসাবে গত ১৫ বছর ধরে চাকরি করছেন তিনি। এই ১৫ বছরেই অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে যান তিনি। ৩১শে জানুয়ারি সম্পদের হিসাবের বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

সূত্রে জানা যায়, ফরিদপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে রয়েছে তার বিপুল পরিমাণ সম্পদ। শহরের টেপাখোলার লক্ষ্মীপুর এলাকায় স্ত্রী লাকির নামে রয়েছে একটি আলিশান বাড়ি। টেপাখোলার ফরিদাবাদে ‘মাহি মাহাদ ভিলা’ নামে রয়েছে আরেকটি দৃষ্টিনন্দন বাড়ি। এই বাড়িতে বসবাস করছেন জুয়েলের শ্বশুরবাড়ির লোকজন। শহরতলীর বায়তুল আমান এলাকায় পাঁচ কাঠার আবাসিক প্লট রয়েছে স্ত্রীর নামে। নর্থ-চ্যানেল গোলডাঙ্গীর চরে এল অ্যান্ড এমএম নামে রয়েছে তার একটি ইটভাটা। বড় বোন নাসরিন আক্তারের নামে সিঅ্যান্ডবি ঘাটের ওপারে নাজিরপুরে এঅ্যান্ডআর ব্রিকস নামে আরেকটি ইটভাটা রয়েছে। এ ছাড়া সিঅ্যান্ডবি ঘাটের বাজারে রয়েছে ১৭ শতাংশ জমিতে দোতলা ভবন। এ ছাড়া শহরের ভাটি লক্ষ্মীপুরে ২৪ কাঠা জমিতে রয়েছে তার বাগান বাড়ি। শহরতলীর আদমপুর এলাকার বেরহমপুর মৌজায় ১৭ বিঘা জমি রয়েছে স্ত্রীর নামে। তার ছোট কার্গো জাহাজ রয়েছে ১৬টি, তবে এসব জাহাজ শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজনদের নামে। এ ছাড়া পারিবারিকভাবে ব্যবহারের জন্য রয়েছে আধুনিক মডেলের তিনটি প্রাইভেটকার।

লিয়াকত ছাড়াও তার ভাই আবজালের এই সিন্ডিকেটের মধ্যে রয়েছে তাদের আরেক ভাই। তিনি ফরিদপুর টিভি হাসপাতালের ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে কর্মরত। এ ছাড়া এই সিন্ডিকেটের মধ্যে রয়েছেন আবজালেরই আরো তিন শ্যালক। এরা হলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক রকিবুল ইসলাম, উচ্চমান সহকারী বুলবুল ইসলাম এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অফিস সহকারী শরিফুল ইসলাম। ৩১শে জানুয়ারি দিনভর তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সিন্ডিকেট করে টেন্ডার বাণিজ্যসহ নানা দুর্নীতি করে আবজাল হোসেন ও তার পাঁচ সহযোগী ব্যাপক সম্পদের মালিক হয়েছে। দেশে-বিদেশে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর এসব সম্পত্তির অনুসন্ধানেও নেমেছে দুদক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এরই মধ্যে ২৩ জন কর্মকর্তা- কর্মচারীকে দুদকের সুপারিশে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলায় বদলি করে দিয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধান সূত্রে জানা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী প্রধান মীর রায়হান আলীও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। এরই মধ্যে দুদকের সুপারিশের ভিত্তিতে বদলি করা হয়েছে তিনিসহ একই অধিদপ্তরের ২৩ কর্মকর্তাকে। এই দপ্তরেই টানা ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কর্মরত এই ব্যক্তি ঢাকাতেই গড়েছেন বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি।

এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাবে জমা রয়েছে রায়হানের শত কোটি টাকা। এসব অবৈধ সম্পদ থাকার বিষয়টি একেবারেই অস্বীকার করেন তিনি। মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, আমি জীবনভর সৎ পথে উপার্জন করেছি। কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত না। নির্ভেজাল মানুষ। দুদকের সুপারিশে বদলি করা হয়েছে কেন জানতে চাইলে রায়হান বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। শুধু বদলির নোটিশ পেয়েছি। আর কিছু আমাকে জানানো হয়নি। টেন্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে শতকোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগ রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেরই আরেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তিনি বাজেট বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান। দুদক সূত্রে জানা যায়, বাজেট বিভাগের এই কর্মকর্তা ভুয়া টেন্ডারের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। তবে গত ১৪ই জানুয়ারি দুদকের জিজ্ঞাসাবাদের পর নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন ডা. আনিসুর রহমান। তিনি বলেছেন, আমি বাজেট শাখায় কাজ করি। আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে বাজেট পত্রে স্বাক্ষর করি। যে কাজটার জন্য বলা হয়েছে টেন্ডার জালিয়াতিতে জড়িত, আমি তো টেন্ডার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত না। বাজেটটা এখান থেকে কীভাবে ডিসপাস (ছাড়) হয়েছে, সে বিষয়ে আমাকে দুদকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে। তাহলে কি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জড়িত এ প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রমাণিত না হওয়া ছাড়া কারো বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না। এসময় তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ভিত্তিহীন।

বদলির আদেশ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ঢাকার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের সহকারী প্রধান (পরিসংখ্যানবিদ) মীর রায়হান আলীকে বরিশালে, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফারুক হাসানকে রাঙ্গামাটি, প্রধান সহকারী আশরাফুল ইসলামকে খাগড়াছড়ি, প্রধান সহকারী সাজেদুল করিমকে সিরাজগঞ্জ এবং উচ্চমান সহকারী তৈয়বুর রহমানকে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সাইফুল ইসলামকে হাতিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি করা হয়েছে। চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী ফয়জুর রহমানকে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, প্রধান সহকারী মাহফুজুল হককে নেত্রকোনা সিভিল সার্জন কার্যালয়, কম্পিউটার অপারেটর আজমল খানকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানকে রংপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়, প্রধান সহকারী-কাম হিসাবরক্ষক আবদুল কুদ্দুসকে ভোলার চরফ্যাশন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সিলেটের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের প্রধান সহকারী নুরুল হককে জামালপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়, প্রশাসনিক কর্মকর্তা গৌস আহমেদকে সিরাজগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়, উচ্চমান সহকারী আমান আহমেদকে কুড়িগ্রামের চিলমারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও অফিস সহকারী-কাম কম্পিউটার অপারেটর নেছার আহমেদ চৌধুরীকে নেত্রকোনার বারহাট্টা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি করা হয়েছে।

খুলনা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের ব্যক্তিগত সহকারী ফরিদ হোসেনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, অফিস সহকারী মো. মাসুমকে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, প্রধান সহকারী আনোয়ার হোসেনকে নওগাঁ সিভিল সার্জন অফিস, বরিশাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের প্রধান সহকারী মো. রাহাত খানকে মানিকগঞ্জের সিভিল সার্জন অফিস, উচ্চমান সহকারী মো. জুয়েলকে কক্সবাজারের মহেশখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, রংপুর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী আজিজুর রহমানকে শেরপুরের সিভিল সার্জন কার্যালয়, স্টেনোগ্রাফার সাইফুল ইসলামকে গোপালগঞ্জের শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমকে সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন অফিসে বদলি করা হয়েছে।

উৎসঃ ‌মানবজমিন

আরও পড়ুনঃ তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর সম্পদের পাহাড়ঃ চড়েন হাসপাতালের গাড়িতে


তিনি তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। চড়েন হাসপাতালের গাড়িতে, থাকেন মোহাম্মদপুর ইকবাল রোডে নিজের আলিশান ফ্ল্যাটে। নিজের নামে ছাড়াও স্ত্রী ও স্বজনদের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে দিয়েছেন তিনি। একেবারে শূন্য থেকে বিশাল বিত্তবৈভবের মালিক হওয়া এই তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর নাম আবু সায়েম মোহাম্মদ এমদাদুল হক সাদেক। বর্তমানে কাজ করছেন শেরেবাংলা নগরের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্স (এনআইএনএস) হাসপাতালে। মাত্র ৮ বছরের চাকরি জীবনেই কোটিপতি বনে যাওয়ার এমন ম্যাজিক দেখিয়েছেন তিনি। তবে তার পেছনে রয়েছেন প্রভাবশালী মামা। অভিযোগ রয়েছে, মামার খুঁটির জোরেই তিনি বেপরোয়া।

তোয়াক্কা করেন না হাসপাতালের সিনিয়র কর্মকর্তাদেরকেও। এ নিয়ে অনেকে ক্ষুব্ধ হলেও ভয়ে মুখ খোলেন না কেউ।

সূত্র জানায়, ২০১০ সালে নিউরোলজি বিশেষায়িত হাসপাতাল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট নিউরো সায়েন্স চালু হয়। এর আগে এটি একটি প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত হতো। পরিচালক একজন হিসাবরক্ষক, একজন প্রজেক্ট এসিস্ট্যান্ট, একজন পিয়ন ও একজন আয়াসহ ৫-৬ জন ওই প্রজেক্টের অধীনে কাজ করতেন। তবে হিসাবরক্ষক আবু সায়েম মোহাম্মদ এমদাদুল সাদেক ছিলেন প্রজেক্টের সর্বেসর্বা।

অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে সাদেকের ভাগ্যোন্নয়ন শুরু হয়। ওই সময় তিনি লক্ষ লক্ষ টাকার ভুয়া ভাউচার তৈরি করে বিল উত্তোলন করেন। টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে পছন্দের কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেন। এর বিনিময়ে হাতিয়ে নেন কোটি টাকা। নিজ এলাকা গাইবান্ধার সাঘাটায় বিঘার পর বিঘা জমি ক্রয় করেন। বোন জামাইকে এলাকায় পাট ও তেলের ব্যবসায় নামান। কিনে ফেলেন ট্রাক। যেখানে একটি টিনের চালা ছিল, সেখানে তোলেন পাকা দালান। মাত্র ৬ হাজার টাকার প্রজেক্ট কর্মচারী হয়ে ওঠেন কোটিপতি।

২০১২ সালে প্রজেক্ট শেষ হয়ে রাজস্বে আসে। যেহেতু সাদেকের সরকারি চাকরির বয়স শেষ, তাই নিয়ম ভেঙে চাকরিবিধি তৈরি করা হয়। প্রকল্পের চাকরিজীবীদের বয়স শিথিল করে মন্ত্রণালয়ের যোগসাজশে অ্যাকাউন্টস্‌ অফিসার ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার দু’টি পদ সৃষ্টি করা হয়। সাদেককে বিধিবহির্ভূতভাবে প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদে নিয়োগ দেয়া হয়। এ পদটি ২য় শ্রেণির, যা নিয়োগ হয় পিএসসি’র মাধ্যমে। তাই বেতন স্কেল কমিয়ে করা হয় ৩য় শ্রেণির। এতে নিয়োগ চলে যায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হাতে। এরপরে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন সাদেক। তার গ্রামের কমপক্ষে ৫০ জনকে আউটসোর্সিংয়ের কাজ দেন। এ ছাড়া সরকারি জেলা কোটা ভেঙে ১০-১২ জন কর্মচারীকে নিয়োগ দেয়া হয় তার এলাকা থেকেই। মূলত হাসপাতাল নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এই ব্যবস্থা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাদেকের রয়েছে মোহাম্মদপুর ইকবাল রোডের মতো জায়গায় ১৪৫০ বর্গফুটের দু’টি ফ্ল্যাট। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা। রাজধানীর আগারগাঁয়ে কয়েকজন মিলে তৈরি করছেন ১০ তলা একটি ভবন। ব্যাংকে রয়েছে এফডিআর। বউয়ের নামে ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ও ৫০ লাখ টাকার এফডিআর। ছোট ভাইয়ের নামেও একইভাবে ব্যাংকে রয়েছে এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র। বউ আর মেয়ের নামে নিজ গ্রামে ক্রয় করেছেন কয়েক একর জমি। রাজশাহীতে রয়েছে কয়েক একরের আম বাগান।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, নামমাত্র মেরামত দেখিয়ে তিনি হাতিয়ে নেন লাখ লাখ টাকা। বিভিন্ন অর্থবছরের প্রজেক্ট থেকে কেনা ভারী মেশিনগুলোর ফাইল তিনি কাউকে দেন না। সেগুলো রেখেছেন তার নিজ গ্রামের নিয়োগকৃত লোকের কাছে। অন্য কেউ চাইলেও সেগুলো পান না। অনেক ফাইল অডিট করিয়ে গায়েব করে ফেলেছেন। মেশিন মেরামত বিভাগেও বসানো হয়েছে তার নিজ গ্রামের লোক। কোনো রকম নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সেখান থেকে তুলে নিয়েছেন বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ।

বর্তমানে বেশ কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে তার রয়েছে মালিকানাধীন সম্পর্ক। নামসর্বস্ব কোম্পানির কাছ থেকে প্রডাক্ট কিনে বিল ভাউচার দেখিয়ে সরকারি অর্থ লোপাট করেন।

সূত্র জানায়, সরকারি গাড়ির বরাদ্দ দেন তিনি নিজেই। সরকারি কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা গাড়ি না পেলেও তার বাসার লোকজন, আত্মীয়স্বজন এসব গাড়ি ব্যবহার করেন নিয়মিত। এসব গাড়ির তেল ও জেনারেটরের তেলও বরাদ্দ দেন তিনি। ফলে এখানেও রয়েছে তার দুর্নীতির বিশাল ক্ষেত্র। ব্যবহার না করেও ব্যবহার দেখিয়ে তিনি এবং তার সহযোগী ইকবাল প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা তুলে নেন।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতাল প্রজেক্টের অনেক জিনিসপত্র তার বাসায় ব্যবহার করেন। এরমধ্যে রয়েছে ফ্রিজ, মাইক্রো ওভেন, এসি, ক্যামেরা, ল্যাপটপ, ভিডিও ক্যামেরা, রয়েছে হাসপাতালের স্টিলের ফার্নিচারও। যেগুলো ট্রাকে করে তার গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। এগুলো তিনি মেশিনের সঙ্গে টেন্ডারে যোগ করে দিতেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে সরবরাহের পর সুযোগ বুঝে নিজের লোক দিয়ে বাসায় নিয়ে যান। এ ছাড়া হাসপাতালের চেয়ার, টেবিল, আলমারি তার বাসায় ব্যবহার করা হচ্ছে। হাসপাতালে তার বিশ্বস্ত কিছু লোকজনকে ম্যানেজ করে তিনি এসব জিনিস বাসায় নিয়ে গেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভাউচারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা, আরএফকিউ পদ্ধতিতে কোটেশন বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৫ লাখ, এলটিএম পদ্ধতিতে জরুরি কিন্তু নিবন্ধিত কোম্পানিদের মধ্যে থেকে কোটেশন বিজ্ঞপ্তির টেন্ডার দিয়ে নিম্ন দরদাতার কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ এবং তার বেশি মূল্যের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী উন্মুক্ত টেন্ডার দিয়ে হাসপাতালের মালামাল ক্রয় করার নিয়ম। কিন্তু ক্রয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সময় থাকা সত্ত্বেও যথাযথ নিয়ম মানা হয় না।

একটি মাত্র কোম্পানিকে দিয়ে এমএসআর সামগ্রী এবং ওষুধ ক্রয় করা হয়েছে দুই কোটি টাকার উপরে। কেনাকাটায় নামে-বেনামে কোম্পানি তৈরি করে ক্রয় করা হয়েছে লাখ লাখ টাকার মালামাল। এলটিএম-এর মাধ্যমে নিবন্ধিত কোম্পানির কাছ থেকে কোটেশনের মাধ্যমে ক্রয়ের বিধান থাকলেও এনআইএনএস হাসপাতাল আজও পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধিত করেনি। বিনা টেন্ডারে প্যাডসর্বস্ব এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি কোম্পানির প্যাড ব্যবহার করে কেনাকাটা করা হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ টাকার নন ইডিসিএল ওষুধ। এমনকি টেন্ডারের মাধ্যমে ২০১২-১৩ এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরে নামমাত্র মূল্যে পয়সার হিসাবে যেসব ওষুধ ক্রয় করা হয়েছে, তা বিনা টেন্ডারে কেনা হয়েছে কয়েকগুণ বেশি দামে।

হাসপাতালের এ সিন্ডিকেটটি গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে টেন্ডারের মাধ্যমে ফার্নিচার ক্রয় করে। টেন্ডারে সম্পূর্ণ কাঠের ফার্নিচার ক্রয়ের কথা থাকলেও হাসপাতালে সরবরাহ করা হয় বোর্ডের। এসব বিভিন্ন কর্মকর্তাদের কক্ষে ব্যবহার করা হচ্ছে।

হাসপাতালের এসব অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ইতিপূর্বে নামে-বেনামে একাধিক চিঠি দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সেসব অভিযোগের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

এসব অভিযোগের ব্যাপারে আবু সায়েম মোহাম্মদ এমদাদুল হক সাদেকের বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এমনকি তার অফিসের ল্যান্ড ফোনেও পাওয়া যায়নি।

এ ব্যাপারে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সস ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ বলেন, সাদেক যদি কোনো দুর্নীতি করে থাকে তবে তা দুদককে জানান। তারাই খুঁজে বের করবে তার এত সম্পদ কোথা থেকে এসেছে। তিনি আরো বলেন, তার কারণে যারা দুর্নীতি করতে পারে না, তারাই হয়তো আপনাকে তথ্য দিয়েছেন। সাদেক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে পরিচালক সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে বলেন, সে অনেকের চেয়ে ভালো। তবে তার সম্পদের কথা দুদককে বলেন। তারা অনুসন্ধান করবে।

উৎসঃ ‌মানবজমিন

আরও পড়ুনঃ তিতাস গ্যাসের কেরানি থেকে কোটিপতি সুলতান


সাভার তিতাস গ্যাসের সামান্য কেরানি থেকে আজ কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক সুলতান আহম্মেদ। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে পেয়েছেন বেশ কয়েকটি প্রমোশন। আবারও প্রমোশনের আশায় তদবির করছেন বলে চাউর রয়েছে। নিজে চলাচল করেন দামি গাড়িতে।

তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠায় নড়েচড়ে বসেছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি এ বিশাল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

তিতাস গ্যাস সাভার অঞ্চলের বিপণন বিভাগের ব্যবস্থাপকের কার্যালয় সূত্র জানায়, সাভার উপজেলায় বাসা-বাড়িতে সংযোগ নেয়া গ্রাহকের সংখ্যা ৩৫ হাজারের বেশি। এসব গ্রাহককে ৮৪ হাজার চুলা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আর শিল্প-কারখানায় সংযোগ রয়েছে ৭০০ বেশি। ২০১০ সালের জুলাই মাসের আগে এসব সংযোগ দেওয়া হয়। ওই বছরের ১৩ জুলাই থেকে নতুন সংযোগ প্রদান বন্ধ রয়েছে।

কিন্তু সরকারি এই সিদ্ধান্তের পরও তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ দিলেই পাওয়া যায় সংযোগ। মেলে অনুমোদনের অতিরিক্ত চুলা জ্বালানোর অনুমতি।

তিতাস গ্যাস সাভার অঞ্চলের টিসিসি (টাইপিস্ট কাম ক্লার্ক) থাকাকালীন সুলতান আহাম্মেদ বিপণন বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. আবদুল ওয়াহাব তালুকদারের একান্ত সহকারীর (পিএস) দায়িত্বে থাকা অবস্থায় অবৈধ লেনদেনের বিনিময়ে অর্জিত টাকা দিয়ে সাভারের গেন্ডা এলাকায় বিলাসবহুল একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন।

সবুজবাগ এলাকায় তার রয়েছে আরও একটি টিনশেড বাড়ি। সেটি তিনি ভাড়া দিয়েছেন। সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডের দুটি মার্কেটে রয়েছে তার দুটি দোকান। তার দুটি গাড়িও রয়েছে। একটিতে তার ছেলে-মেয়ারা আর অন্যটিতে তিনি নিজে চলাচল করেন। এ ছাড়া নামে-বেনামে আরও কয়েকটি প্লট রয়েছে, রয়েছে ব্যাংক ব্যালেন্সও। তার গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাটে রয়েছে বিঘায় বিঘায় সম্পত্তি।

অভিযোগ উঠেছে, হেমায়েতপুর এলাকার জামাল ক্লিনিকে গ্যাস সংযোগ দেয়ার কথা বলে প্রায় ২ বছর আগে ১ লাখ টাকা নিলেও পরে আর সংযোগ দিতে পারেননি। কিন্তু তিনি সেই ১ লাখ টাকা অদ্যবধি ফেরত দেননি এমন অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিতাসের এক কর্মচারী জানান, টিসিসি থাকাকালীন সুলতান আহম্মেদ মোটা অংকের টাকা নিয়ে এক গ্রাহকের নাম পরিবর্তনের জন্য ভুয়া লোককে মালিক সাজিয়ে আবেদন করেন। তখন প্রকৃত মালিক বিষয়টি জানতে পেয়ে সুলতানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে বিষয়টি সামনে আসে। সে যাত্রায় তিনি দেন-দরবার করে বিষয়টি ধামাচাপা দেন।

বড় কর্তাদের সাথে অর্থনৈতিক যোগাযোগ থাকায় দ্রুতই প্রমোশন পেয়ে সহ-ব্যবস্থাপক হন সুলতান আহম্মেদ। আর এখন তিনি একাই এক শ। দুই হাতে অবৈধ পন্থায় কামিয়ে নিচ্ছেন টাকা।

আাবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকলেও মোটা অংকের টাকা নিয়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগ প্রসঙ্গে সুলতান আহাম্মেদ দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার কথা অস্বীকার করলেও বাড়ি-গাড়ির কথা স্বীকার করেছেন।

এ ছাড়া স্থানীয় একটি ক্লিনিকে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জামাল ক্লিনিকে’ গ্যাস দেয়ার বিষয়ে আলোচনা হলেও কোনো টাকা নেয়া হয়নি।

প্রসঙ্গত, দৈনিক সাভারের কোনো না কোনো এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। তবুও বন্ধ নেই অবৈধ সংযোগ। সুলতান আহাম্মেদের মতো তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে দেয়া হচ্ছে রাতের আধারে অবৈধ গ্যাস সংযোগ।

উৎসঃ ‌poriborton

আরও পড়ুনঃ বিআইডব্লিউটির দরপত্র ১৩০০ কোটি টাকা দুর্নীতির নেপথ্যেঃ এক সঙ্গে দুই চেয়ারম্যান!


বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)তে চলছে ‘মগের মুল্লুক’ কাণ্ড। প্রতিষ্ঠানটির নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়ার ১৬ দিন পার হলেও দায়িত্ব ছাড়ছেন না পুরাতন চেয়ারম্যান। ফলে বর্তমানে একই প্রতিষ্ঠানে দুইজন চেয়ারম্যান নিয়োগপ্রাপ্ত রয়েছেন।

জাহাজ নির্মাণের জন্য ১৩০০ কোটি টাকার একটি দরপত্রে প্রভাব বিস্তার করতে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। বর্তমান চেয়ারম্যান তার পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে দায়িত্ব ছাড়ছেন না বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআইডব্লিউটিসির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত মন্ত্রিপরিষদে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর খালিদ মাহমুদ চৌধুরী তার মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেন।

বিআইডব্লিউটিসির বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ থাকায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)ও সক্রিয় হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তার তথ্য জানতে চেয়েছে দুদক।

এদিকে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান পরিবর্তনের আদেশ দিয়ে গত ২১ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে প্রণয় কান্তি বিশ্বাসকে (অতিরিক্ত সচিব) চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে উপসচিব মুহাম্মদ আব্দুল লতিফ সাক্ষরিত ওই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।

তবে প্রজ্ঞাপন জারির পর ১৬ দিন পার হলেও এখনো দায়িত্ব ছাড়েননি বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মফিজুল হক। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে এখনো তাকেই চেয়ারম্যান দেখানো হচ্ছে। মফিজুল হক ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বিআইডব্লিউটিসি চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেন।

জানা যায়, বিআইডব্লিউটিসিতে শীঘ্রই জাহাজ নির্মাণ প্রকল্পের ১৩০০ কোটি টাকার একটি দরপত্র আহ্বান করা হবে। ওই দরপত্রে প্রভাব বিস্তার করে নিজের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য দায়িত্ব ছাড়ছেন না মফিজুল হক।

কেন দায়িত্ব ছাড়ছেন না সে বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ মফিজুল হক সন্তোষজনক কোনো উত্তর না দিয়ে সময় নিউজকে বলেন, ‘এটা আমাকে জিজ্ঞেস করছেন কেন? এটা যারা করে (নিয়োগ দেয়) তাদের জিজ্ঞেস করেন।’

প্রজ্ঞাপনের ১৬ দিন পার হলেও কেন দায়িত্ব নিতে পারেননি এ প্রশ্নের উত্তরে প্রণয় কান্তি বিশ্বাস সেময় নিউজকে বলেন, ‘প্রজ্ঞাপনের পর আমি মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেছি। তবে বিআইডব্লিটিসিতে দায়িত্ব নিতে আমি এখনো কোনো কাগজ হাতে পায়নি।’

উৎসঃ ‌somoynews.tv

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here