ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগার দুই কর্মকর্তার পকেটেই মাসে ৬০ লাখ টাকা

0
199

বন্দি আর দর্শনার্থী যেন টাকা বানানোর মেশিন! তাদের পিষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের কর্মকর্তারা পকেটে ভরেছেন প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা। দুই শীর্ষ কর্মকর্তার কামাই কমপক্ষে ৬০ লাখ টাকা। পদে পদে বাণিজ্যে তাদের এই রোজগার। বন্দি দেখতে আসা দর্শনার্থীদের কাছ থেকে মসজিদের নামে যে ১০ টাকা করে রাখা হয় তাও নিজের পকেটে ঢুকানোর অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক তদন্তে এই কারাগারে রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র ওঠে আসে। বাণিজ্যের খাত থেকে কারা কর্মকর্তারা কত টাকা নিচ্ছেন মানবজমিনের অনুসন্ধানে মিলেছে সেই তথ্য। তিতাস, যমুনা, মেঘনা ও পদ্মা নামের ৪টি কারা ভবনে ওয়ার্ড রয়েছে ১৮টি। প্রত্যেক ওয়ার্ড একজন পুরনো বন্দির নিয়ন্ত্রণে থাকে।

এই নিয়ন্ত্রকরা প্রত্যেকে ১৫ হাজার টাকা করে দেন কারা কর্মকর্তাদের। পরে তারা বন্দিদের নানাভাবে নির্যাতন করে টাকা আদায় করেন। ১৫ হাজার টাকার বাইরে যত টাকা আদায় হবে সবই নেবে নিয়ন্ত্রকরা। কারা ভবন তিতাসে ৪ জন, যমুনায় ৬ জন, মেঘনায় ৪ জন এবং পদ্মায় ৪ জন নিয়ন্ত্রক রয়েছে। নতুন বন্দি এলে কেইস টেবিল থেকে একেকজনকে ৫শ’ টাকা করে কিনে নেন নিয়ন্ত্রকরা। ওয়ার্ডে এক হাত জায়গা পেতে দিতে হয় ৩ হাজার টাকা। আর একটি কম্বল পেতে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয় বলে উল্লেখ রয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে।

সাক্ষাৎকালে সচ্ছল বন্দির মহিলা আত্মীয়দের ফোন নম্বর রেখে দেন কারারক্ষীরা। পরবর্তীতে বন্দির মাধ্যমে টেলিফোন করে নির্যাতন করার কথা বলে বাড়ি থেকে অতিরিক্ত টাকা আনতে বাধ্য করা হয়। কারা হাসপাতালের নিয়ন্ত্রণ ৫ জনের হাতে। হাসপাতালে শয্যা রয়েছে ২১টি। হাসপাতাল নিয়ন্ত্রকদের প্রত্যেকে ১৫/২০ হাজার টাকা দেন কারা কর্মকর্তাদের। এই হাসপাতালের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয় মাসিক ১০-২০ হাজার টাকার বিনিময়ে আর্থিকভাবে সচ্ছল ও প্রভাবশালী বন্দিরা হাসপাতালে অবস্থান করে হাসপাতালটিকে তাদের নিজস্ব বাসাবাড়িতে পরিণত করেছে। ক্যান্টিন রাইটারের দায়িত্বে থাকা ১০ জনের প্রত্যেকে ৫ হাজার টাকা করে দিতে হয় কারা কর্মকর্তাদের।

ক্যান্টিন মেডের দায়িত্বে থাকেন একজন। তাকে দিতে হয় ২০ হাজার টাকা। বাগানের মেড হিসেবে দায়িত্ব পালনকারীকে দিতে হয় ২০ হাজার টাকা। সাক্ষাৎ রুমের সিআইডিকে প্রতি সপ্তাহে দিতে হয় ১০ হাজার টাকা। কারাগারের ভেতর ও বাইরের ক্যান্টিনে প্রতি মাসে ৫০ লাখ টাকা বেচাবিক্রি হয় বলে জানা যায়। এর মধ্যে লাভই হয় ৩০ লাখ টাকা। ক্যান্টিন পরিচালনাতে হিসেবের দুটি খাতা রাখা হয়। এর একটিতে থাকে প্রকৃত মূল্যে বেচাবিক্রির হিসেব, অন্যটিতে থাকে দ্বিগুণ মূল্যে বিক্রির হিসেব। কারাগারের ভেতরের ক্যান্টিন এবং বাইরের ক্যান্টিন পরিচালনার দায়িত্ব পেতে একজন কারারক্ষীকে ৩ মাসের জন্য ৪ লাখ টাকা দিতে হয় কারা কর্মকর্তাদের। কারা ক্যান্টিনে দ্বিগুণের বেশি মূল্যে পণ্য সামগ্রী বিক্রির প্রমাণ পান তদন্ত কর্মকর্তারা।

ক্যান্টিনে এক কেজি গরুর মাংস বিক্রি হয় এক হাজার টাকা। আর মুরগির মাংসের কেজি ৭শ’ টাকা। এক কেজি পুঁটি মাছের দাম ১৬শ’ টাকা। মাম দেড় লিটার ও ফ্রেস ২ লিটার পানি ৩০ টাকার স্থলে বিক্রি করা হচ্ছে ১৪০ টাকা। এভাবে ৩৩টি পণ্য সামগ্রীর সবক’টি দ্বিগুণ মূল্যে বিক্রি করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় কারা নীতিমালা অনুযায়ী ক্যান্টিন থেকে লভ্যাংশের অর্থ কারারক্ষী এবং বন্দিদের কল্যাণে খরচ করার কথা। কিন্তু এখানে তা করা হয়নি। প্রতি মাসেই খরচের ক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষ আর্থিক বিধি বিধান ও পিপিআর ২০১৮ অনুসরণ করেনি। জেলার এবং জেল সুপার ইচ্ছেমাফিক কারা ক্যান্টিনের লভ্যাংশ অর্থ খরচ করে থাকেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়।

বন্দিদের খাবার কমিয়ে দিয়ে মাসে ১০ লাখ টাকা পকেটে ভরেন কারা কর্মকর্তারা। কারাগারের ভেতর ও বাইরে উৎপাদিত সবজি ঠিকাদারের মাধ্যমে সরবরাহ করে এর দাম বাবদ কয়েক লাখ টাকা নিজেদের পকেটে নেন তারা। প্রত্যেক বন্দির প্রাপ্য খাবারের অর্ধেকও দেয়া হয় না। তাছাড়া মোট বন্দির দু-আড়াইশো ক্যান্টিন থেকে খাবার কিনে খাচ্ছে। কিন্তু সকল বন্দির খাবার সরবরাহের হিসেব কাগজপত্র দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করছেন তারা। সূত্র জানায়-বন্দিদের জন্য ঠিকাদারের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ অনেকটাই কাগজপত্রে।

সরবরাহ সামান্য করে পুরো সরবরাহের অর্থ লুপাট করা হয়। এদিকে কারাগার থেকে সরবরাহকৃত খাবার অত্যধিক নিম্নমানের বলে উল্লেখ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে। এতে তদন্ত কর্মকর্তারা বলেন ‘বন্দিদের সরবরাহকৃত রুটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে প্রতিটি রুটি খাবার অযোগ্য। সিদ্ধ করা আটার রুটি কোনোভাবে গরম করে বন্দিদের দেয়া হয়ে থাকে। দর্শনার্থীকক্ষ হতে বন্দি সাক্ষাৎপ্রার্থীদের কাছ থেকে মসজিদের নামে ১০ টাকা করে রাখা হয়। এখান থেকে প্রতি মাসে আসে ৫০/৬০ হাজার টাকা। কিন্তু গত ৪ বছরে এই টাকার কোনো হিসাব মেলানো হয়নি।

টাকা কিভাবে খরচ করা হয়েছে তার কোনো হদিস নেই। অথচ প্রত্যেক কারারক্ষীর কাছ থেকে মসজিদের ইমামের বেতনের জন্যে ১শ’ টাকাসহ মোট ১২০ টাকা কেটে রাখা হয় প্রতি মাসে। বিশেষ ব্যবস্থায় বন্দি দর্শন বা অফিস কলের জন্য একজন দর্শনার্থীর কাছ থেকে সর্বনিম্ন ৫শ’ টাকা করে নেয়া হয়। কখনো কখনো এক হাজার টাকাও নেয়া হয়। কারা অভ্যন্তর থেকে জানালা দিয়ে কথা বলার জন্য বন্দিকে ১০০ টাকা প্রদান করতে হয়। এ ছাড়া কোর্টে হাজিরা দিয়ে বন্দিগণ কারাগারে ফেরত আসার সময় তাদের সঙ্গে কোনো মালামাল থাকলে তা টাকার বিনিময়ে কারা অভ্যন্তরে নিতে দেয়া হয়।

বন্দির পরিধেয় জামা কাপড় কারা অভ্যন্তরে নিতেও দিতে হয় টাকা। প্রতিটি জামা-লুঙ্গি নিতে ৩০ টাকা করে প্রদান করতে হয়। সূত্র জানায়- জামিন থেকে ৫ লাখ টাকা আসে মাসে। এই আয়ের টাকা ভোগ করেন ডেপুটি জেলার। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, যেসব বন্দি আদালত থেকে জামিন প্রাপ্ত হয়ে থাকে তাদের মুক্ত হতে অনেক বেগ পেতে হয়। অর্থ প্রদান না করলে জামিননামা আটকে রেখে বন্দিদের মুক্তি বিলম্বিত করা হয়। জামিননামার মাধ্যমে বন্দিদেরকে মুক্তি পেতে হলে সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকা দিতে হয়।

তদন্ত রিপোর্টের সুপারিশ আংশিক বাস্তবায়িত: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের নানা অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কারারক্ষীদের সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছিল তদন্ত কমিটি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কারারক্ষী ছাড়া কর্মকর্তাদের কারো বিরুদ্ধেই নেয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। ৬ই এপ্রিল মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পর ২৬ কারারক্ষীকে কম গুরুত্বপূর্ণ কারাগারে বদলিপূর্বক বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়।

কারা মহাপরিদর্শকের পক্ষে অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক মো. বজলুর রশিদ ২৮শে এপ্রিল চট্টগ্রামের কারা উপ-মহাপরিদর্শকের কাছে এই নির্দেশ পাঠান। তাতে ২৭শে মে’র মধ্যে অভিযুক্ত কারারক্ষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে কারা অধিদপ্তরকে অবহিত করতে বলা হয়। কিন্তু তদন্ত রিপোর্ট পেশের ৩ মাস পরও দায়ী কারা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। তদন্তে কারাগারে সংগঠিত সব অপকর্মের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় জেল সুপার নূরন্নবী ভূঁইয়া, জেলার এজি মাহমুদ, ডেপুটি জেলার হুমায়ুন কবির, হিসাবরক্ষক মো. নাজিম উদ্দিনকে। এ ছাড়া কারা হাসপাতালের সহকারী সার্জন মো. হুমায়ুন কবির রেজা ও ডিপ্লোমা নার্স মো. নাজিরুল ইসলামকে দায়ী করা হয় হাসপাতালকেন্দ্রিক অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত থাকার জন্য। তাদের বিরুদ্ধেও নেয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা।

তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর সর্ব প্রধান কারারক্ষী আবদুল ওয়াহেদকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। এ ব্যাপারে চট্টগ্রামের কারা উপ-মহাপরিদর্শক মো. ফজলুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন- তদন্তের প্রেক্ষিতে অ্যাকশন হয়েছে। নিচের লেবেলের যেটা আমার করার কথা ছিল সেটা আমি করে ফেলেছি। ওইটা আমার অংশ না। ওপরের ব্যাপার। সেখান থেকে হয়তো ব্যবস্থা হচ্ছে।

উৎসঃ মানবজমিন

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here