নির্বাচন নিয়ে বিশ্লেষকদের আশঙ্কাই সত্য হলো

0
224

সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ার যে আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা শেষমেশ সেটাই সত্য হয়েছে বলে মনে করেন তারা। গতকালের নির্বাচনের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অনেক বিশেষজ্ঞই বলেছেন, তারা যা ভেবেছিলেন সেটাই হয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও টিআইবির সাবেক চেয়ারম্যান এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ একটি একদলীয় ও পুরোপুরি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার দিকে চলে যাবে। পদ্মা ব্রিজ হবে কিন্তু মানুষের মৌলিক অধিকার থাকবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সাবেক প্রফেসর মাহবুব উল্লাহ বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে এবং সংসদ ভেঙ্গে না দিয়ে নির্বাচন করলে কেমন নির্বাচন হয় তা খুব ভালোভাবে গোটা জাতির সামনে উন্মোচিত হলো। আর বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকায় আরেকটি জিনিস জাতির সামনে পরিষ্কার হলো। সেটা হলো নির্বাচন বর্জন করলে এক শ্রেণীর মানুষ বলত তারা শেষ পর্যন্ত থাকলে এত ভোট পেত, এত সিট পেত। এসব বলে তারা অনেক মানুষকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ পেত। এখন সে সুযোগও বন্ধ হয়ে গেল। জাতি এখন দেখল দলীয় সরকারের অধীনে কেমন নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়।

প্রফেসর মাহবুব উল্লাহ বলেন, ১৯৫৪ সাল থেকে নির্বাচন দেখে আসছি। জালিম মুসলিম লীগ সরকারও এ রকম নির্বাচন করার সাহস পায়নি। আর আমিও আমার জীবনে এ ধরনের নির্বাচন দেখিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর মাহবুব উল্লাহ বলেন, একটি দেশের বুদ্ধিজীবীরা যখন মোসাহেব হয়, আমলারা যখন নিয়মের বাইরে যায় আর ধর্মীয় নেতারা যখন পথভ্রষ্ট হয় তখন সে দেশের যে পরিণতি হয় বাংলাদেশেরও তাই হবে।

তিনি বলেন, বিরোধী দল বলতে আর কিছু থাকবে না। আর বিরোধী দলবিহীন সংসদ মানে বাংলাদেশের জন্য চরম সর্বনাশ হয়ে যাওয়া।
বাংলাদেশ ভবিষ্যতে একটি একদলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে মর্মে আশঙ্কার বিষয়ে তিনি চীনের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, চীনে সুশাসন রয়েছে। তাদের উন্নতি ঐন্দ্রজালিক। তারা একটি পদ্ধতির মধ্য দিয়ে চলে। সেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর নীতি মেনে চলা হচ্ছে। জবাবদিহিতার ব্যবস্থা আছে। জনগণের মধ্যে অসন্তোষ নেই।

কিন্তু গণতন্ত্র, সুশাসন, সততা, দেশপ্রেম, জবাবদিহিতা এর কোনোটাই যদি না থাকে তাহলে সে দেশের ভবিষ্যৎ ভালো হয় কেমন করে।
গতকালের নির্বাচন বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মাহবুব উল্লাহ বলেন, নির্বাচন মানে বড় বড় জনসভা, বড় বড় মিছিল, চায়ের দোকানে আডডা কিন্তু এসবের কিছুই ছিল না এবারের নির্বাচনে। এমনকি মানুষ চায়ের দোকানে বসেও ফিসফিস করে কথা বলেছে। চার দিকে ভীতির পরিবেশ, ভীতির রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে গুম, খুন, গ্রেফতারের মাধ্যমে এসব করা হয়েছে। আর ইলিয়াস আলীর মতো নেতাদের ক্ষেত্রে এটাই যে হয়েছে তা নয় বরং অনেক সাধারণ মানুষ এসবের শিকার হয়েছে। ফলে সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। এতে করে বুদ্ধিজীবীরাও গুটিয়ে নিয়েছেন নিজেদের।

গত কয়েক দশকে গার্মেন্ট খাতসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার, বিপুল সংখ্যক মানুষের বিদেশমুখিতা এবং তাদের পাঠানো টাকায় দেশে থাকা পরিবারের নানা ধরনের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়াসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে প্রফেসর মাহবুব উল্লাহ বলেন, বর্তমানে মানুষ নিতান্তই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি এক শ্রেণীর মানুষের দুর্বৃত্তপনার কারণে মানুষের মধ্যে একটি মোহজালের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে আজ লোভ-লালসা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে কৌশলে।

লোভ-লালসা গ্রাস করছে সর্বস্তরের মানুষকে। গ্রামের একজন অতি দরিদ্র মানষের বাড়িতেও দালান হচ্ছে। সেটা সংখ্যায় কয়টা সেটা বড় না। কিন্তু বিষয় হলো তার দেখাদেখি সবার মনে বাসনা যে আমারও ও রকম লাগবে। ফলে সবাই ছুটছে। লোভ-লালসা দুই ধরনের হয়। এক. আপনার সামনে রসগোল্লা রাখা হলো, আপনি তা দেখে খাওয়ার লোভ করলেন কিন্তু খেতে পারলেন না এবং দুই. আপনি আশায় আছেন যে, আপনার জন্য রসগোল্লা আসবে।

অতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক হওয়ায় মানুষ দেশপ্রেম, জাতি, সততা, নীতিনৈতিকতা, জাতীয় উন্নতি ও ভ্রাতৃত্ব বোধ এসব নিয়ে ভাবার সুযোগ পায় না। এর পাশাপাশি মানুষকে এসবে উদ্বুদ্ধকরণের ক্ষেত্রে যদি নেতৃত্বের ব্যর্থতা থাকে তাহলে আরো সর্বনাশ হয়। বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির দায়িত্ব ছিল মানুষের মধ্যে এসব চেতনার বিস্তার ঘটানো। কিন্তু নিকট-অতীতে তাদের মধ্যে এটা দেখা যায়নি। জাতীয়তাবাদী চেতনার কথাবার্তা তাদের মুখে এখন আর শোনা যায় না বরং তারাও ব্যস্ত ছিল ভারত তোষণনীতিতে। ফলে সার্বিকভাবে ভোট কেন্দ্রে মানুষের ঢল নামার যে আশা করা হয়েছিল তা হয়নি।

মাহবুব উল্লাহ বলেন, নির্বাচন যে এ রকম হবে তার সব আয়োজন বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই গুছিয়ে আনা হচ্ছিল। সমস্ত রাষ্ট্রযন্ত্র আওয়ামী লীগের পক্ষে ছিল। অনেক সাধারণ মানুষের কাছেও বিষয়টি পরিষ্কার ছিল আসলে কী হতে যাচ্ছে।

গতকালের নির্বাচনের পরিবেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, সন্ত্রাস হয় দুই ধরনের একটা দেখা যায় এবং আরেকটি দেখা যায় না। গতকাল হয়েছে পরেরটা।

সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমি তো আগেই বলেছিলাম আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসছে। আমি এর আগে ২০০১ ও ২০০৮ সালে ভোট দিয়েছিলাম। তখন বিরাট লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে হয়েছিল। কিন্তু এবার এ রকম কিছু ছিল না। উত্তরায় আমি যে বাসায় থাকি তার খুব কাছে আমার ভোটকেন্দ্র। ভোট দিতে গেলাম আর দিয়ে চলে এলাম। কোনো ভিড় বা লাইন ছিল না।

দেশের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে জানতে চাইলে বদিউল আলম বলেন, গণতন্ত্র আর থাকবে না। ১৯৯০ সালের পর দেশে যে একটি নির্বাচনী সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল তা একেবারেই ধ্বংস হয়ে গেল।

সুত্রঃ ‌নয়া দিগন্ত

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here