রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আরও অবনতি

0
78

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। সরকারি মালিকানাধীন এই ব্যাংকগুলোর লোকসানি শাখা বেড়েছে। বেড়েছে খেলাপি ঋণও। ব্যাংকগুলো আদায় করতে পারছে না অনাদায়ী ও শ্রেণিকৃত ঋণ। অবলোপনকৃত খেলাপি ঋণ ও শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি থেকে আদায় মোটেও সন্তোষজনক নয়। এছাড়া কৃষি ও পল্লি ঋণ, এসএমই ঋণ, অন্যান্য ঋণ বিতরণ ও আদায় পরিস্থিতিও হতাশাজনক। বিশেষ করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের বেঁধে দেওয়া কোনও লক্ষ্যমাত্রাই পূরণ করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। গত সেপ্টেম্বরে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অনুষ্ঠিত দ্বিমাসিক বিশেষ সমন্বয় সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের ৩৫৯ শাখা এখন লোকসান গুনছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অব্যাহতভাবে লোকসানি শাখা বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক অর্থনৈতিক সূচক দিনদিন খারাপ হচ্ছে। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ‘সুশাসন না থাকার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকগুলোতে কেবল লোকসানি শাখাই বাড়ছে, একইসঙ্গে ব্যাংকগুলো মূলধন ঘাটতিতেও পড়ছে।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সুশাসন না থাকার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এখন সংকটে পড়ছে। প্রভাবশালীরা যখন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আর ফেরত দেন না, তখন ব্যাংকের আর কিছুই করার থাকে না। এ কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। একই কারণে লোকসানি শাখা বাড়ছে। ব্যাংকগুলোও মূলধন ঘাটতিতে পড়ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, জুন প্রান্তিক শেষে সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি হয়েছে ছয় হাজার ৬০১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি তিন হাজার ১০৬ কোটি ২২ লাখ, জনতা ব্যাংকের দুই হাজার ১৯৫ কোটি ২৫ লাখ, অগ্রণী ব্যাংকের এক হাজার ৪১৯ কোটি ২৯ লাখ এবং রূপালী ব্যাংকের এক হাজার ২৯৩ কোটি ১৯ লাখ।

এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করা হচ্ছে। এটা হচ্ছে মূলত সুশাসন না থাকার কারণে। আবার বাজেট থেকে প্রতি বছর এই ব্যাংকগুলোকে টাকা দেওয়া হচ্ছে। তিনি মনে করেন, এই টাকা দেওয়ার অর্থই হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে লুটপাটে উৎসাহিত করা।’

জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের বেঁধে দেওয়া অনাদায়ী ও শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সোনালী ব্যাংক আদায় করেছে মাত্র ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ। জনতা ব্যাংক আদায় করেছে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ২০ দশমিক ১৯ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংক ২১ দশমিক ৩০ শতাংশ, রূপালী ব্যাংক ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ, বিডিবিএল ২৩ শতাংশ ও বেসিক ব্যাংক আদায় করেছে ৩৩ দশমিক ৯১ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের বেঁধে দেওয়া অবলোপন করা খেলাপি ঋণ লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১ দশমিক ২০ শতাংশ আদায় করেছে সোনালী ব্যাংক। জনতা ব্যাংক করেছে লক্ষ্যমাত্রার ৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংক ১২ দশমিক ২৪ শতাংশ, রূপালী ব্যাংক ৮ দশমিক ৪০ শতাংশ ও বেসিক ব্যাংক মাত্র দশমিক ১৬ শতাংশ আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। তবে বিডিবিএল করেছে লক্ষ্যমাত্রার ৮৮ শতাংশ।

এদিকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৭ দশমিক ১০ শতাংশ কৃষিঋণ আদায় করেছে সোনালী ব্যাংক। জনতা ব্যাংক করেছে ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংক ১০ দশমিক ০৮ শতাংশ ও বিডিবিএল ৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ কৃষিঋণ আদায় করতে পেরেছে। বেসিক ব্যাংক করেছে ২০ শতাংশ।

বৃহৎ শিল্প, চলতি মূলধনসহ অন্য বেশকিছু খাতে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করে থাকে। প্রথম আট মাসে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রূপালী ব্যাংক ৭২ দশমিক ৯২ শতাংশ ঋণ আদায় করেছে, যা সন্তোষজনক। তবে এই সময়ে অগ্রণী ব্যাংক আদায় করেছে মাত্র ২৮ দশমিক ৬১ শতাংশ ও জনতা ব্যাংক আদায় করেছে ২২ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই বছরের জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা, যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুনের শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মোট ঋণের ৩৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। জনতা ব্যাংকে ছিল ২১ দশমিক ৫৬ শতাংশ, অগ্রণীতে ১৮ দশমিক ১৫ শতাংশ, রূপালীতে ২২ দশমিক ৬৪ শতাংশ, বেসিক ব্যাংকে ৫৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে ছিল ৫৫ দশমিক ১৭ শতাংশ।

ছয় মাসে (গত জুন মাস পর্যন্ত) শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির কাছ থেকে সোনালী ব্যাংক অর্থ আদায় করেছে লক্ষ্যমাত্রার ৩ দশমিক ২২ শতাংশ, জনতা ব্যাংক ১৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংক শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ, রূপালী ব্যাংক শূন্য দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং বেসিক ব্যাংক আদায় করেছে শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ।

২০ শীর্ষ ঋণখেলাপি বাদে অন্যদের কাছ থেকে সোনালী ব্যাংককে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছিল এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা। কিন্তু ছয় মাসে আদায়ের হার ১৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ, জনতা ব্যাংককে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছিল এক হাজার ১০০ কোটি টাকা, ছয় মাসে আদায়ের হার ২১ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অগ্রণী ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০০ কোটি টাকা, ছয় মাসে আদায়ের হার ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। রূপালী ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬০০ কোটি টাকা, ছয় মাসে আদায়ের হার মাত্র ১১ শতাংশ। আর বেসিক ব্যাংকের আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭১৫ কোটি টাকা, ছয় মাসে আদায়ের হার ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন প্রান্তিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রভিশন ঘাটতি দেখা দিয়েছে এই ব্যাংকগুলোতে। জুন শেষে সোনালী ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি তিন হাজার ২২৩ কোটি, রূপালীতে এক হাজার ৩৭২ কোটি ও অগ্রণী ব্যাংকে ৮৯০ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি লোকসানি শাখা এখন সোনালী ব্যাংকের। ব্যাংকটির এক হাজার ২১২ শাখার মধ্যে ১৮৩টি লোকসানি শাখা। জনতা ব্যাংকের ৯০৮ শাখার মধ্যে ৫৭টি লোকসানি শাখা। অগ্রণী ব্যাংকের ৯৩১টির মধ্যে ৪৩টি লোকসানি শাখা। রূপালী ব্যাংকের ৫৬২টির মধ্যে ৩৩টি, বেসিক ব্যাংকের ৬৮টির মধ্যে ২১টি এবং বিডিবিএল-এর ৪০টির মধ্যে ২২টি লোকসানি শাখা।

উৎসঃ banglatribune

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here