পাঠ্যপুস্তক থেকে ডারউইনের ‘বিবর্তনবাদ’ বাদ দিতে হবে: আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী

0
121

পাঠ্যপুস্তক থেকে অবিলম্বে নাস্তিকবাদী ধ্যানধারণার ‘বিবর্তনবাদ’ পাঠ বাদ দিতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী।

পাশাপাশি পাঠ্যবইয়ে ‘বিবর্তনবাদ’ অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা এবং রাষ্ট্রীয় সব কর্মকাণ্ড থেকে তাদের দূরে রাখারও দাবি জানান তিনি।

শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এ দাবি জানান।

বাবুনগরী বলেন, ২০১৩ সালে শিক্ষার আধুনিকায়নের নামে নবম-দশম শ্রেণি থেকে শুরু করে মাস্টার্স পর্যন্ত পাঠ্যবইয়ে ডারউইনের ‘বিবর্তনবাদ’ শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি আমাদের গোচরে এসেছে।

তিনি বলেন, আমরা দেখেছি- এর আগে ২০১২ সাল পর্যন্ত একই বইসমূহে এই ‘বিবর্তন’ পাঠ ছিল না। এই শিক্ষার মাধ্যমে ৯২ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত দেশের কোমলমতি মুসলিম শিক্ষার্থীর মননে আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাসকে ঘোরতর সন্দিহান ও ভঙ্গুর করে নাস্তিকবাদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

বাবুনগরী বলেন, পাঠ্যবইয়ে ‘বিবর্তনবাদ’ অন্তর্ভুক্তির প্রতিবাদ জানাই। একই সঙ্গে সরকারের প্রতি অবিলম্বে ইসলামী আকিদা-বিশ্বাস ও জাতি বিনাশী শিক্ষা বাতিল ও নিষিদ্ধের দাবি জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, ‘বিবর্তন’-এর এ শিক্ষা চলতে থাকলে আগামী কয়েক প্রজন্ম পর সবার অগোচরেই দেশ নাস্তিক অধ্যুষিত রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

আল্লামা বাবুনগরী বলেন, নামে মুসলমান থাকলেও চিন্তা-চেতনায় সবাই নাস্তিকবাদী ধ্যানধারণা ও ভোগবাদে ডুবে থাকবে। আল্লাহ, রাসুল, ইসলাম নিয়ে কটূক্তি বাড়তে থাকবে। আলেম-ওলামা, ধর্মীয় শিক্ষা ও ধর্মভীরু মানুষকে বাধা ও বিরক্তিকর ভাবতে শুরু করবে। ধর্মীয় বিয়ে মানবে না।

‘বিয়ের নানাবিধ দায়বদ্ধতা ছাড়াই লিভটুগেদার ও অবাধ যৌনতার প্রতি আগ্রহী হবে। মদ, জুয়ার বিধিনিষেধ মানবে না। সমকামিতার বৈধতা দেয়ার জন্য আন্দোলনে নামবে।’

হেফাজত মহাসচিব আরও বলেন, ডারউইনের বিবর্তনবাদে সৃষ্টিকর্তার ধারণা ভিত্তিহীন। তাই বিবর্তনবাদ সৃষ্টিকর্তাকে স্বীকার করে না। পৃথিবীর প্রচলিত কোনো ধর্মকেই স্বীকার করে না।

তিনি বলেন, এই বিবর্তনবাদের পাঠ দিতে গিয়ে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বইয়ে বাংলাদেশের মুসলমান ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানো হচ্ছে-‘ধর্ম মানুষের চিন্তা-চেতনার ফসল’ হিসেবে, নাউজুবিল্লাহ।

অভিভাবকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিবৃতিতে বাবুনগরী বলেন, নবম-দশম শ্রেণি থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত বিবর্তন পাঠের বিষয়গুলো যেকোনো অভিভাবক দেখলে সহজেই বুঝতে পারবেন যে, তার সন্তানকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানান সস্তা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে বুঝানো হচ্ছে যে, পৃথিবীর সবকিছুই প্রকৃতি থেকে সৃষ্টি হয়ে বিবর্তনের মাধ্যমেই বর্তমান অবস্থায় এসেছে।

‘মানুষ ও বানরের আদি পিতা একই ছিল। হযরত আদম ও হাওয়া (আ.) এসব কিছু না। সৃষ্টিকর্তা ও ধর্মের ধারণা অশিক্ষিত কর্তৃত্বপরায়ণশীল মানুষের তৈরি। বিজ্ঞানের বিবর্তনের এ আবিষ্কার কেউ খণ্ডাতে পারবে না। ৯৯ পার্সেন্ট বিজ্ঞানী বিবর্তনবাদকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন।’

তিনি বলেন, দেশের সংবিধানে নাগরিকের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। এর অর্থ হরো স্বাধীনভাবে ধর্মকর্ম পালন, ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন, ধর্মীয় বিশ্বাস তথা ইমান-আকিদা ধারণ সবার নাগরিক অধিকার।

‘সুতরাং ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকি ও আগ্রাসী তৎপরতা থেকে রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের ইসলামী আকিদা-বিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিরোধী বিবর্তনবাদ শিক্ষা দেয়া সংবিধান প্রদত্ত ধর্মীয় অধিকার রক্ষার বিধানের গুরুতর লঙ্ঘন।’

হেফাজত মহাসচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার ইসলামী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়া প্রকৃত শিক্ষা হয় না, এমন প্রশংসনীয় বক্তব্যও বারবার দিয়েছেন। আলেম-ওলামা ও মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি তার আন্তরিকতার উল্লেখ করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের আরও মন্ত্রীরা ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারাও একই বক্তব্য দিয়েছেন বিভিন্ন সময়ে।

‘এসব বক্তব্যের বিপরীতে জাতীয় শিক্ষায় ইমান-আকিদাবিরোধী ‘বিবর্তনবাদ’ শিক্ষার কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছি না। যেখানে আধুনিক বিজ্ঞানে বাতিল করার কারণে এ বিবর্তনের পাঠ ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশ, কোরিয়া, রুমানিয়ায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্রে এই বাতিল পাঠ নতুনভাবে সংযোজন হয় কি করে?’

উৎসঃ যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশ আতঙ্কময় রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে : মোস্তাফিজুর রহমান ইরান


বাংলাদেশ একটি আতঙ্কময় রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান। তিনি বলেন, আজকে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে, তাদেরকে নির্যাতন করা হচ্ছে, তাদেরকে খুন করা হচ্ছে। দেশে বেড়ে গেছে ধর্ষণের সংখ্যা।

আজ শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ ছাত্র মিশনের দ্বিতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানে উদ্বোধকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

এ সময় অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন, লেবার পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান ইউনুস আলী, যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির, ছাত্র মিশনের নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন ভ্রাতৃপ্রতীম ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, আজকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদ এবং ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী একটি সরকারকে সু-প্রতিষ্ঠিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু ২০০৮ সালে সেই মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সরকারের ষড়যন্ত্রমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সূর্য অস্তমিত হয়েছে। আমরা সেই সূর্যকে আর জাগাতে পারিনি।

তিনি বলেন, আপনারা দেখেছেন ২০১৪ সালে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটকে কিভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তার দল বিএনপিকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। যে কয়েকটি আসনে নির্বাচন হয়েছিল সেখানে চতুষ্পদ জীবজন্তু ছাড়া কোনো মানুষের যাতায়াত হয়নি। আমরা ভেবেছিলাম ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে যে নির্বাচন হবে সে নির্বাচন হবে এ দেশের মানুষের মুক্তির নির্বাচন। ভেবেছিলাম এই নির্বাচনে মানুষ তার ভোট অধিকার, বাকস্বাধীনতা, গণতন্ত্র ফিরে পাবে। কিন্তু আমাদের সেই আশার আলো আর দেখতে দেয়নি। ৩০ তারিখের নির্বাচন রাতের আঁধারে ২৯ তারিখ সম্পন্ন করেছেন।

লেবার পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জেলা প্রশাসক, এসপি, ওসি এবং পুলিশ প্রশাসন নির্বাচন করেছে। কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী নির্বাচন করতে পারেনি। তারা কোথাও ভোট দিতে পারেনি। তাদের কোথাও ভোটের দরকার হয়নি। শুধুমাত্র এসপি, ডিসিরা তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেছেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের এমন কোনো আসন নেই যেখানে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে।

ইরান বলেন, যে দুই কোটি টাকা দুর্নীতির দায়ে খালেদা জিয়ার নামে মামলা হয়েছে, সে টাকার সাথে বেগম জিয়ার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সেই দুই কোটি টাকা এখন সুদে-আসলে সাত কোটি টাকা হয়েছে। তিনি এই ট্রাস্টের কোনো মেম্বারও নন এবং এই ট্রাস্টের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তার কোনো সইও নেই। শুধুমাত্র মইনুল রোডের ওই বাড়ির ঠিকানাটি এই ট্রাস্টের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকার কারণে তাকে অন্যায় ভাবে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে।

তিনি বলেন, দেশনেত্রীর মুক্তি মানেই গণতন্ত্রের মুক্তি। তাই গণতন্ত্রকে মুক্ত করার জন্য এদেশের জনগণকে সাথে নিয়ে দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে দেশনেত্রীকে মুক্ত করা হবে ইনশাআল্লাহ।

উৎসঃ নয়াদিগন্ত

আরও পড়ুনঃ কোটি টাকার প্রকল্পে আ’লীগ নেতার চাঁদা দাবি, না দিলে কাজ বন্ধ করে দেয়ার হুমকি

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ও জয় বাংলা সাংস্কৃতিক জোটের প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রিন্স সদরুজ্জামান

মাহবুবুর রহমান রিপন, সিলেট ব্যুরো

বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্রের ৫৬ কোটি টাকা উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) দেখা না করলে কাজ বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ও জয় বাংলা সাংস্কৃতিক জোটের প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রিন্স সদরুজ্জামান।

বাংলাদেশ বেতারের আঞ্চলিক প্রকৌশলী মানোয়ার হোসেন খানকে মোবাইল ফোনে এমন হুমকি দেয়ার অডিও সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে। এ নিয়ে সিলেট ও ঢাকায় চলছে ব্যাপক সমালোচনা।

অডিওটিতে মানোয়ার হোসেন খানকে প্রিন্স সদরুজ্জামান বলেন, আপনার পিডি, ডিপিডি বারবার বলার পরও সেলিমের (সামসুল আলম সেলিম, সিলেট জেলার সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহসভাপতি) সঙ্গে দেখা করল না, আমার এখন একটিই পথ খোলা- সেটা কাজ বন্ধ করে দেয়া। উন্নয়ন দরকার নেই, টাকা ফেরত যাক।

যদিও প্রিন্স সদরুজ্জামান যমুনা টেলিভিশনকে বলেন, কাজ যাতে ভালো হয় সেই পরামর্শ নেয়ার জন্য দেখা করতে বলেছি, অন্য কোনো কারণে নয়। প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মুজিবর রহমান বলেন, তারা কি কারণে দেখা করতে বলেছেন তা সবারই জানা থাকার কথা। কোনোভাবেই তাদের কোনো অনৈতিক চাঁদা দাবি মেটাব না। এই অডিওটির বিষয়ে বাংলাদেশ বেতারের প্রধান প্রকৌশলীও জানেন।

জানা গেছে, বাংলাদেশ বেতার সিলেট আঞ্চলিক কেন্দ্রের আধুনিকায়নে ৫৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। বরাদ্দ অনুযায়ী একটি ডরমেটরি ও একটি আধুনিক অডিটোরিয়ামসহ বেশকিছু কাজ শুরু করে বাংলাদেশ বেতার প্রকৌশল বিভাগ। প্রকল্প পরিচালক হিসেবে প্রকৌশল বিভাগের ঢাকা কার্যালয়ের মুজিবর রহমানকে দায়িত্ব দেয়া হয়। কিছু কাজ শুরু করার পর বারবার পিডিকে দেখা করার জন্য বলেন প্রিন্স সদরুজ্জামান। দেখা না করায় সম্প্রতি তিনি সিলেটের আঞ্চলিক প্রকৌশলী মানোয়ার হোসেন খানের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলেন।

যা হুবহু তুলে ধরা হল- ‘কি অবস্থা আমি তো ভারত থেকে এসে শুনলাম আপনার পিডি সেলিমের সঙ্গে দেখা করল না, সে তো এসে সেলিমের সঙ্গে বসার কথা ছিল। আমি তো তাকে স্ট্রেইট বলেছিলাম, সিলেটে এসে সেলিমের সঙ্গে দেখা করে কাজ শুরু করার জন্য। এখন সে যদি এসব করে তাহলে উন্নয়নের দরকার নেই, কাজ বন্ধ থাকুক। উন্নয়ন তো আমরাই আনছি, উন্নয়ন দরকার নেই, এগুলো বন্ধ রাখেন।’ এ সময় মানোয়ার খান বলেন, কাজ বন্ধ করতে পারবেন না। আমাকে প্রধান প্রকৌশলীর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এ সময় প্রিন্স বলেন, ‘স্ট্রেইট আমাদের কথা বলেন যে তারা বলেছে- পিডি ডিপিডি দেখা না করা পর্যন্ত কাজ বন্ধ থাকবে।’ এ সময় প্রিন্সকে বলতে শোনা যায়, ‘বারবার কথা বলার পরও সে যদি না শুনে, তার মানে সে চোর। এখানে চুরি চলবে না।’ এ সময় প্রিন্স আরও বলেন, ‘ঢাকায় জয় বাংলা সাংস্কৃতিক জোটের স্মরণসভায় তথ্যমন্ত্রী এসেছিলেন, তার পাশেই বসা ছিলাম। আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে ছিল; কিন্তু নানাদিক চিন্তা করে বলিনি।’

এরপর মানোয়ার খান কিছু কথা বলার পর প্রিন্স বলেন, ‘এসব বললে সোজা ওপর মহলে বলে আঞ্চলিক প্রকৌশলী আর পিডিকে বদলাতে বলব। এসব লোক দিয়ে এখানে কাজ হবে না।’ এ সময় মানোয়ার খানকে বলতে শোনা যায়, তিনি কাজ করছেন না, কাজ মনিটরিং করছেন পিডি ও ডিপিডি। প্রিন্স বলেন, ‘আমি কাজ বন্ধ করলে আপনার পিডির বাপও কাজ করতে পারবে না এবং আমি আসলে একদম কাজ বন্ধ করে দিব, আমার আর কোনো রাস্তা নেই। আপনিই দায়িত্ব নিয়েছিলেন সেলিমের সঙ্গে পিডিকে বসিয়ে দিবেন।’ এসব বিষয়ে প্রায় ৭ মিনিট ১৪ সেকেন্ড কথা হয় প্রিন্স সদরুজ্জামান ও মানোয়ার হোসেন খানের। এই অডিও ক্লিপটি এখন যমুনা টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা দফতর ও বাংলাদেশ বেতারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে।

এ বিষয়ে প্রিন্স সদরুজ্জামান বলেন, আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বরাদ্দ এসেছে। কিন্তু কাজ সঠিকভাবে করার জন্যই তাদের সঙ্গে বসার কথা বলেছি। পিডি যাতে সার্বক্ষণিক সিলেটে থেকে কাজটি করেন এসব পরামর্শ দেয়ার জন্য। কাজ বন্ধ করে দেয়ার হুমকির বিষয়ে তিনি বলেন, কাজ যদি ভালো না হয়, তাহলে তো বন্ধ করে দেয়াই ভালো।

এ বিষয়ে মানোয়ার হোসেন খান বলেন, তার সঙ্গে কথা হয়েছে, কি বিষয়ে কথা হয়েছে তা তো অডিওতেই আছে, এর বেশি আর কিছু বলতে চাচ্ছি না। কথা হয় প্রকল্প পরিচালক মুজিবর রহমানের সঙ্গে, তিনি বলেন, কাজ শুরুর আগে থেকেই আমাকে বারবার তাদের সঙ্গে বসতে বলা হচ্ছে। সামসুল আলম সেলিমের সঙ্গে কথাও বলেছি, কিন্তু তারপরও সেলিম আমাকে বলেছে তাদের সঙ্গে বসতে।

কেন বসতে বলেছে জানতে চাইলে মুজিবর রহমান বলেন, সেটা তো অনুমানই করতে পারেন কেন বসতে বলেছে। কোনোভাবেই অনৈতিক চাঁদা দাবিতে আমি সায় দেব না। তিনি আরও বলেন, এই অডিওটি এখন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে।

তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন। এদিকে সামসুল আলম সেলিমের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করেন তার সঙ্গে পিডির কথা হয়েছে। কিন্তু শুধু কাজটি ভালোভাবে করার জন্যই বলেছেন বলে দাবি করেন তিনি। বসার কথা তিনি বলেননি বলে দাবি করেন।
প্রিন্স সদরুজ্জামান কেন তার সঙ্গে বসার জন্য পিডিকে বলেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে সামসুল আলম সেলিম বলেন, এটা আমি জানি না, আমার সঙ্গে প্রিন্সের কোনো সম্পর্কই নেই।

মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা প্রিন্স সদরুজ্জামানের কাজ বন্ধ করে দেয়ার হুমকির বিষয়ে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সদস্য বদরউদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। এমন কথাবার্তার প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উৎসঃ যমুনা টিভি

আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশ কি সভ্যতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে, নাকি অসভ্যতার পথে ফিরে যাচ্ছে?


মানবতার ধ্বজা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে সভ্যতা। কিন্তু আমাদের চোখের সামনে এমন কিছু কাণ্ডও ঘটছে, যেসব কাণ্ড মানবতার সেই ধ্বজাকে ভূলুণ্ঠিত করে; আমরা সত্যিই সভ্যতার পথে এগিয়ে যাচ্ছি, নাকি অসভ্যতার উল্টো পথে ফিরে যাচ্ছি বর্বর আদিম যুগে?-এমন প্রশ্ন মেলে ধরে চোখের সামনে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি একের পর এক ঘটে যাচ্ছে এমন অমানবিক, নির্মম কাণ্ড।

ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির মৃত্যু আমাদের হৃদয়ে দগদগে ক্ষত সৃষ্টি করেছে। সেই ক্ষত শুকানোর আগেই বরগুনায় প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে খুন করার দৃশ্য আমাদের ক্ষত হৃদয়কে ফের রক্তাক্ত করে; চেপে ধরে মানবতার টুঁটি। দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক ঘটে যাচ্ছে এহেন ন্যক্কারজনক পাশবিক কাণ্ড।

বিবেকবান মানুষের মনে এখন প্রশ্ন, দেশে এসব কী হচ্ছে? কেন হচ্ছে? সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিষয়ক বিজ্ঞানী ও মানবাধিকারকর্মীসহ সংশ্লিষ্টদের মতে, হত্যা-ধর্ষণসহ মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা সহজাত। কিন্তু পারিবারিক বন্ধন ক্রমেই হ্রাস পাওয়া, তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ অপব্যবহার বৃদ্ধি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অভাব, রাজনৈতিক পেশিশক্তির দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়া, সামাজিক অবক্ষয়, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ইত্যাদি কারণই মূলত আমাদের মানবিক গুণগুলোকে গ্রাস করছে, করে তুলছে পাশবিক। এতে করে নিরীহ কুসুমকোমল হৃদয়ের সাধারণ মানুষ এখন মারাত্মক ভীতিকর অবস্থার মধ্যে আছে। রিফাত শরীফ কিংবা নুসরাত জাহান রাফির মতো নির্মম মৃত্যুর শিকার মানুষের তালিকা চারপাশে ক্রমেই বাড়ছে।

গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ চাঁদ উদ্যানে এক যুবককে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে হত্যা করে স্থানীয় কিশোর-তরুণেরা। নিহত পঁচিশোর্ধ্ব ওই যুবক ও হত্যাকারীদের পরিচয় শনাক্ত হয়নি এ পর্যন্ত। বুধবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ রেলস্টেশনে অজ্ঞাত যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। গত ২৯ জুন রাতে শরীয়তপুরের জাজিরায় এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন পৌর মেয়র ইউনুছ বেপারির ছেলে মাসুদ বেপারি।

কিন্তু ৮ দিনের মাথায় মেয়রপুত্র জামিনে মুক্তি পাওয়ায় ভুক্তভোগী ওই কলেজছাত্রী ও তার পরিবারের সদস্যরা এখন ভয়াবহ আতঙ্কের মধ্যে আছেন। এভাবে প্রতিদিনই পিটিয়ে, কুপিয়ে, ছুরিকাঘাতে, কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে, গণপিটুনি দিয়ে, ধর্ষণ কিংবা যৌন নিপীড়নের পর নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হচ্ছে মানুষ। এমনকি পাঁচ-ছয় বছরের শিশুরাও এমন পাশবিকতা, বর্বরতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। যৌন নির্যাতন, ধর্ষণের পর অবুঝ শিশুদের গলা টিপে মেরে ফেলা হচ্ছে।

বিচারবহির্ভূত হামলার শিকার হয়ে পঙ্গুত্ব বা পোড়ার দহনে অনেকেই জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে আছেন। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও শালিস কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয় মাসে শুধু বখাটেদের হাতে ১১০ নারী ও ৭ জন পুরুষ লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। প্রতিবাদ করায় বখাটেদের হাতে খুন হয়েছেন ৩ নারী ও ২ পুরুষ। একই সময়ে ধর্ষণ ও গণধর্ষণে ২৮ জন নিহত, ধর্ষণের পর ৩৭ জনকে হত্যা, ১১টি এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।

এ সময় ৬৯২টি শিশু নির্যাতন, ৩৯২ শিশু ধর্ষণ এবং ২০৩ শিশু হত্যা করা হয়েছে। এই ছয় মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ/আটক ও রহস্যজনক নিখোঁজ, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন, হত্যার মতো অনেক নৃশংস ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান বলছে, সারাদেশে গত ৫ বছরে (২০১৪-২০১৮ সাল) নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৫ হাজার ২৭৪ নারী ও কন্যাশিশু। এ সময় ধর্ষিত হয়েছেন ৩ হাজার ৯৮০ জন, গণধর্ষণের শিকার হন ৯৪৫ জন, ধর্ষণের কারণে মৃত্যু হয়েছে ৩৪৯ জনের, আর ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৭৩০ নারী-শিশুকে।

উদ্বেগজনক তথ্য হলো, গত ৫ বছরে যে সংখ্যক নারী-শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সেই সংখ্যার প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ ২ হাজার ৮৩ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতিত হয়েছে গেল ৬ মাসে (জানু-জুন)। এই সময়ে সারাদেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩১ জন নারী ও শিশু। যাদের মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ২৬ জনকে। এ ছাড়া এসিড সন্ত্রাস, যৌতুক, পাচার, শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা তো ঘটছেই। দেশব্যাপী ক্রমবর্ধমান এসব নির্যাতনের ঘটনার বিচার হয়েছে মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। ২৬ এপ্রিল পঞ্চগড় কারাগারে অগ্নিদগ্ধ হন আইনজীবী পলাশ কুমার রায়। চার দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

এরই মধ্যে নরসিংদীতে ফুলন রানী বর্মণ নামে এক কলেজছাত্রী ও জান্নাতি বেগম নামে গৃহবধূকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। নরসিংদী সদর মডেল থানার ওসি সৈয়দুজ্জামান জানান, ফুলন রানী হত্যাকা-ে ৩ জন এবং জান্নাতির ঘটনায় ৫ জন আসামি গ্রেপ্তারের পর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, নৃশংস ঘটনাগুলোর যে কোনো একটি গণমাধ্যমে এলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নড়েচড়ে বসে।

কিন্তু এরপর তদন্ত, চার্জশিট, আদালতে কচ্ছপ গতিতে চলা বিচার কার্যক্রম, সাক্ষীর গরহাজিরের কারণে বছরের পর বছর ধরে ভুক্তভোগীরা বিড়ম্বনার শিকার হন। অনেক সময় ঘুষের কারণে মামলার রায় আসে আসামির পক্ষে বা তারা জামিনে বের হয়। আর যেসব ঘটনার আড়ালে থেকে যায় সেগুলোয় আসামিরা গ্রেপ্তার পর্যন্ত হচ্ছে না। যে কারণে অপরাধীদের মধ্যে ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড করেও পার পাওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হচ্ছে।

সামাজিক অপরাধ, সংহিসতা বা মানুষের মধ্যে ফুটে ওঠা নৃশংসতার চিত্র প্রায় সব জেলাতেই। একটি ঘটনার পর আরেকটি ঘটনার জন্ম হয়। ঢাকা পড়ে আগেরটি। গত ৩ জুলাই সাভারে মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগে সবুজ (২৫) নামে এক তরুণকে মারধর করায় মারা যান। গত ১০ জুলাই কুমিল্লার দেবীদ্বারে দুই নারী ও এক শিশুকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

২ জুলাই রাজধানীর মোহাম্মদপুরে স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করে তার স্বামী। ১১ জুলাই ফেনীর পরশুরামে পারিবারিক কলহের জের ধরে বড় ভাইকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে তার ছোট ভাই ও ভাতিজাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২৩ জুন শরীয়তপুরের নড়িয়ায় যুবলীগ নেতা ইমরান সরদারকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ৪ জুন ভোলা সদর উপজেলার ভেদুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার হাকিম মিঝিকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ৩০ জুন লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে জয়নাল হোসেন (৩৫) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

২৮ মে নোয়াখালীর পশ্চিম মাইজদীতে পারিবারিক কলহের জেরে ছোট ভাইয়ের বঁটির কোপে বড় ভাই মাহে আলম (৪৫) নিহত হন। ২৪ মে নওগাঁর শৈলকূপায় রাসেল হোসেন (১৫) নামে এক স্কুলছাত্রকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

পুলিশ বলছে, অপরাধ দমনে তারা বরাবরই তৎপর। এমনকি দুর্বৃত্ত/সন্ত্রাসীদের হাতে তারা নিজেরাও আক্রান্ত হচ্ছে। বগুড়ার সোনাতলার দিগদাইড়ের একটি মেলায় গত ১ মে জুয়ার আসর বন্ধ করতে যান থানা পুলিশ। কিন্তু মেলা কমিটির লোকজন চার পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে আহত করে। ওই ঘটনার পাঁচদিন পর রাজধানীর রামপুরার জামতলা এলাকায় রাসেল (১৯) নামে পুলিশের সোর্সকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় একজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তবে এখনো তদন্তই চলছে।

রামপুরা থানার ওসি আবদুল কুদ্দুস ফকির জানান, ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে রাসেলকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পর্নোগ্রাফি, ফেসবুক ও অনলাইন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমাদের বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। পরিবার, কমিউনিটি অর্গানাইজেশন এখন আগের ভূমিকা পালন করতে পারছে না। তাই অপরাধ প্রবণতাও বদলে গেছে।

মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বলেছেন, দ্রুত বিচারের মাধ্যমে সব অপরাধীকে সমান চোখে দেখে বিচারের আওতায় আনা গেলে অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নুরজাহান খাতুন বলেন, অপরাধ আগে ছিল না সেটা নয়, এখন হার বেড়ে গেছে। সামাজিক অবক্ষয় চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু যেভাবে অপরাধ বাড়ছে সে হিসেবে দ্রুততার সঙ্গে শাস্তি হচ্ছে না। বাংলাদেশে আইন আছে অথচ শাস্তির নিশ্চয়তা নেই। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে পুলিশের তদন্ত থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত বছরের পর বছর ঘুরে ভুক্তভোগীরা বিচার না পেলেও সহিংস অপরাধী বেরিয়ে যাচ্ছে।

এ জন্য রাষ্ট্রকেই সর্বপ্রথম দ্রুততম বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিরোধ ত্বরান্বিত করতে হবে। তিনি বলেন, এক সময় ইভটিজিংয়ের দৌরাত্ম্য ছিল। তখন মানুষ সামাজিকভাবে এটি প্রতিহত করেছে। এখনো সেভাবে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সামাজিকভাবে এসব অপরাধমূলক কর্মকা-ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন আমাদের সময়কে বলেন, পুরো সমাজেই সাধারণের মনে আতঙ্ক। একটা সমাজ যদি আদর্শবিবর্জিত হয়ে যায়। রাষ্ট্র পরিচালনা যখন দুর্বৃত্তদের হাতে চলে যায়। দেশে যখন বিচার থাকে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও মানুষের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক হিংসা অস্থিরতা থাকে। তখন রাষ্ট্র-সমাজকে দুর্বৃত্তরা তাদের স্বর্গরাজ্য মনে করে। এরা দুর্বলের ওপর আঘাত হানে। নারী ও শিশুদের দুর্বল মনে করে সর্বপ্রথম তাদের ওপর আঘাত হানছে।

উৎসঃ আমাদের সময়

আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশে একটি ভয়ঙ্কর চিত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি : সেলিমা রহমান


বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বলেছেন, সরকার শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ছাত্রসমাজকে ধ্বংসের পাঁয়তারা করছে। তিনি বলেন, শিক্ষার মান কমিয়ে দিয়ে আজকে ছাত্রসমাজকে টেন্ডারবাজি এবং দুর্নীতিবাজদের পক্ষে লেলিয়ে দেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে একটি ভয়ঙ্কর চিত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমরা দেখতে পাই ২০ থেকে ২৫ বছরের ছেলেরা আজকে বিভিন্ন তাণ্ডববাজি করছে, বিভিন্ন মানুষ হত্যা করছে। তিনি বলেন, আপনারা যদি বরগুনা হত্যাকাণ্ডের দিকে তাকিয়ে দেখেন এই নয়ন বন্ড ও তার গ্রুপের সকল ছেলেরা দীর্ঘ সময় ওইখানে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতো। তাদেরকে কেউ কিছু বলতেন না। একটি রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় তাদেরকে তৈরি করা হয়েছে।’

আজ শুক্রবার বাংলাদেশ ছাত্র মিশনের দ্বিতীয় কাউন্সিল উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের এই সদস্য বলেন, এই সরকার সম্পূর্ণরূপে গণতান্ত্রিক সকল প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে আতঙ্কগ্রস্ত করে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আপনি বলেছেন, ‘সাহস থাকলে বেগম জিয়াকে মুক্ত করে আনেন’। আপনাদের মুখে বড় কথা মানায় না। কারণ আপনারা নির্বাচন করেন নাই। যদি আপনাদের সাহস থাকত তাহলে ২৯ ডিসেম্বর মধ্যরাতে নির্বাচন করতেন না। আপনাদের যদি জনগণের প্রতি আস্থা থাকতো তাহলে আপনারা ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের দিন জনগণকে ভোট দিতে দিতেন। আপনাদের জনগণের প্রতি আস্থা ছিলো না। কারণ আপনারা জানেন বাংলাদেশের জনগণের থেকে আপনারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন।”

ওবায়দুল কাদেরের উদ্দেশে তিনি আরো বলেন, ‘অবৈধ পন্থায় ক্ষমতায় এসে আপনারা আজকে অনেক কথা বলছেন। আপনারা বিচার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। ধর্ষণ আজকে মহাউৎসবে পরিণত হয়েছে। দুই বছরের শিশু বাচ্চা থেকে ৬০ বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত এর হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। শিশুরা আজকে নিরাপদ না। একজন মা যখন তার সন্তানকে স্কুলে পাঠান আর খেলতে পাঠায় তখন তার মা জানেন না তার সন্তান আর ফেরত আসবে কিনা। আজকে এগুলো কেন হচ্ছে? কোনো বিচার নেই, বিচার ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়ার ফলে আজকে এসব ঘটনা ঘটছে।’

কোনো বিচারক এখন তার ইচ্ছায় রায় দিতে পারেন না মন্তব্য করে সেলিমা রহমান বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন পাবনায় যে রায় দেয়া হয়েছে, ২৫ বছর আগের ঘটনায়, যেখানে কেউ আহত হয় নাই, কারো গায়ে একটু আঁচড় লাগেনি, সেখানে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। জনগণ ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য আদালতে যায়, কিন্তু জনগণ আজকে ন্যায়বিচার পাচ্ছে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘জনগণের নিরাপত্তাকে বাদ দিয়ে উন্নয়নের নামে জনগণের উপর করের বোঝা চাপানো হচ্ছে। আজকে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে যে গ্যাস নাকি মানুষের অপরিহার্য। সেখানে জনগণের পকেট কেটে সে টাকা নেয়া হচ্ছে এবং প্রধানমন্ত্রী বলছে যে, উন্নয়ন পেতে হলে নাকি দাম দিতে হবে। কিসের উন্নয়ন? মানুষের নিরাপত্তা আগে। আমরা অনেক অবকাঠামো উন্নয়ন চাই কিন্তু সেই উন্নয়ন নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে হতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং মানুষের জীবনের নিরাপত্তা এগুলো হল একটি রাষ্ট্রের কাছে জনগণের সবচেয়ে প্রথম মৌলিক চাহিদা। যারা দেশ শাসন করবে সেই শাসকগোষ্ঠীর কাছে জনগণের মৌলিক চাহিদা। কিন্তু আজকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যারা দেশ শাসন করছে, নির্বাচন না করে ক্ষমতায় আছেন তাদের কাছে জনগণের এসব মৌলিক চাহিদার কোনো গুরুত্ব নেই। যেহেতু তারা নির্বাচন না করে ক্ষমতায় এসেছেন, তাই জনগণের কাছে জবাবদিহিতার ব্যাপারে তারা সম্পূর্ণ উদাসীন। আজকে আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে।’

‘এই সরকার বেগম জিয়াকে ভয় পায়, জিয়া পরিবারকে ভয় পায়। তাই অন্যায়ভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে আটকে রেখেছে এবং তারুণ্যের অহংকার দেশনেতা তারেক রহমানকে নির্বাসিত করে রেখেছে। কারণ এই সরকার জানে, গণতন্ত্রের প্রতীক দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যদি মুক্ত থাকেন তবে এই অবৈধ সরকারের মসনদ চুরমার হয়ে যাবে। তাই তারা বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে কারাগারে আটকে রেখেছে। আমরা আশাবাদী এদেশের সকল মুক্তিকামী ছাত্রসমাজকে সাথে নিয়ে দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনবো ইনশাআল্লাহ’, বলেন তিনি।

এ সময় অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, লেবার পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান ইউনুস আলী, যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির, ছাত্র মিশনের নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

উৎসঃ নয়াদিগন্ত

আরও পড়ুনঃ দেশের সম্পদ লুটতেই জনগণকে জুলুম-শোষণ: রুহুল কবির রিজভী


গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ জানিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, জনগণের ওপর জুলুম ও শোষণ নির্যাতন চালিয়ে দেশের সম্পদ লুট এবং জনগণের রক্ত চুষতে একের পর এক গণবিরোধী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যাচ্ছে অবৈধ আওয়ামী সরকার।

আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের বিক্ষোভ মিছিল শেষ সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

রিজভী বলেন, বর্তমান ফ্যাসিবাদী সরকার জনগণের নার্ভ বুঝতে পেরেছে যে, জনগণ আওয়ামী দুঃশাসনের কারণে তাদের ঘৃণা করে। আর ঘৃণা করার প্রতিশোধের অংশ হিসেবে ধারাবাহিক জুলুম চালানো হচ্ছে জনগণের ওপর। সেটিরই আরও একটি নির্মম বহির্প্রকাশ ভোক্তাপর্যায়ে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি।

তিনি আর বলেন, জনগণের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে অবৈধ অর্থ উপার্জন করে সরকারের লোকজন ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হয়ে উঠছে। আর এই অনৈতিক সুযোগ করে দিচ্ছে সরকার।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির গণবিরোধী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে ভোক্তাপর্যায়ে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি বন্ধ করার জন্য দাবি জানান বিএনপির এ নেতা।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিল করা না হলে জনগণের উত্তাল আন্দোলন ও ক্ষোভে-বিক্ষোভে বিএনপি শামিল হতে দৃঢ় অঙ্গীকারাবদ্ধ বলে জানান তিনি।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বলেন, বর্তমান মধ্যরাতের ভোটের সরকার জনগণের ভোটে বিশ্বাসী না হওয়ার কারণে তারা জনগণ নয়; বরং নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের নীতিতেই বিশ্বাস করে।

প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে রিজভী বলেন, সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা এখন বিশ্বজুড়ে যুগে যুগে স্বৈরাচারী শাসকদের জুলুমের শাসনকে ডিঙিয়ে সেরা স্বৈরশাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসন যন্ত্র ও দলীয় সন্ত্রাসীদের ওপর ভর করে দেশে ভয়াবহ নব্য বাকশালী দুঃশাসন জারি রাখা হয়েছে।’

তিনি বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দেশের জনগণ যাতে বর্তমান অবৈধ সরকারের এ জুলুমের শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে না পারে, সে জন্য তাকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে কারান্তরীণ করা হয়েছে।

রিজভী বলেন, মধ্যরাতের ভোটের সরকার বলেই বর্তমান অবৈধ শাসকগোষ্ঠী জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারকে মাটিচাপা দিয়ে বিএনপিসহ সব বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে একদলীয় বাকশালী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

‘কিন্তু জনগণ আওয়ামী শাসকগোষ্ঠীর লালিত অলিক-অবাস্তব স্বপ্ন কোনোদিনই বাস্তবায়িত হতে দেবে না। দেশের আপামর জনগণের আস্থাভাজন নেত্রী খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করে মানুষের মৌলিক মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে জাতীয়তাবাদী শক্তি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।’

এর আগে সকাল ১০টায় মহিলা দলের নেতাকর্মীদের একটি বিক্ষোভ মিছিল বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু হয়ে নাইটিঙ্গেল মোড় ঘুরে আবারও নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনে এসে শেষ হয়।

মিছিলে নেতৃত্ব দেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

মিছিলে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ মহিলা দল সভানেত্রী রাজিয়া আলিম, উত্তরের সভানেত্রী পেয়ারা মোস্তফা, সাধারণ সম্পাদক আমেনা বেগম, সহসাংগঠনিক সম্পাদক তাহমিনা শাহীন, মিলি জাকারিয়া, কেন্দ্রীয় মহিলা দলের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক মিনা বেগম মিনি, স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক জেসমিন জাহান, সহদফতর সম্পাদক গুলশান আরা মিতা, সদস্য স্বপ্না আহমেদসহ কয়েকশ নেতাকর্মী অংশ নেন।

উৎসঃ শীর্ষকাগজ

আরও পড়ুনঃ গ্যাসের দাম আরো বাড়ানো প্রয়োজন ছিল, মানুষের কথা চিন্তা করে বাড়াইনিঃ শেখ হাসিনা


শেখ হাসিনা বলেছেন, গ্যাসের দাম যেটা বৃদ্ধি করার প্রয়োজন ছিল সেটা করা হয়নি।৭৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধির দরকার ছিল সেখানে মাত্র ৩২.৮ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিরাট অংকের ভর্তুকি দিয়ে আমরা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরববরাহ করছি। যারা এখন গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন তারা প্রকৃত অবস্থা চিন্তা করছেন না। তিনি বলেন, আমাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাসের পাশাপাশি আমাদের এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে এখন মিশ্রিত গ্যাসের জন্য যে খরচ পড়ছে তার পুরোটা জনগণের কাছ থেকে নেয়া উচিত সেটাতো আমরা নিচ্ছি না। তিনি গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতন হওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, আমরা প্রি-পেইড মিটারের চিন্তা করছি, যাতে অপচয় রোধ করা যায়।

জাতীয় সংসদের তৃতীয় (বাজেট) অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে বৃহস্পতিবার তিনি এসব কথা বলেন। বক্তব্যে তিনি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। এ সময় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বৈঠকে সভাপতিত্ব করছিলেন।

গত ১১ জুন শুরু হওয়া অধিবেশনটি ২১ কার্যদিবসে বৃহস্পতিবার শেষ হয়। এতে ২০১৯-২০ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেট পেশ ও পাস হয়। এছাড়াও ৭টি বিল পাস হয়্ বাজেটের ওপর ২৬৯ জন সদসপ্রায় ৫৫ ঘন্টা ৩৬ মিনিট বক্তব্য রাখেন।

শেখ হাসিনা তার সমাপনী বক্তব্যে বাজেট আলোচনায় অংশ নেয়ার জন্য বিরোধী দলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তারা আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদকে প্রাণবন্ত করেছেন। শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে রুদ্ধ করা হয়েছিল উল্লেখ করে বলেন, পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশকে খাদ্যে স্বয়ং সম্পুণতা অর্জনসহ নানা ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করে।এরপর আবার কলো অধ্যায়ের সূচনা হয় এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর গত এক দশকে বাংলাদেশ উন্নয়নের মহীসোপানে যাত্রা শুরু করেছে। এখন বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নয়নের রোলমডেলে পরিণত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট দেয়ার কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, আমরা এখন ৯৯ ভাগ আমাদের নিজেদের অর্থায়নে করতে পারি। এবার আমর ৯৪ ভাগ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। আমরা নিজেদের স্বাবলম্বী করতে চাই, কারো কাছে হাত পেতে নয়। সেটা আমরা আমাদের কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছি। তিনি দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ডলারে উন্নীত করতে পারবো। তিনি দেশের মানুষের গড় আয়ু পুরুষের ৭২.৮বছর এবং নারীর ৭৩ বছর বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করে বলেন, খাদ্যে ভেজালের কথাও শুনতে হচ্ছে। তারপরও গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়ে যাচ্ছে। শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে সরকারের সার্বিক উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরে বলেন, আর্থসামাজিকভাবে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, গ্যাসের দাম নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে। ভারতে গ্যাসের দাম নাকি কমানো হয়েছে। দাম বাড়ানোর প্রয়োজন কেনো হলো তা ব্যখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, গ্যাসের চাহিদার কারণে আমাদের প্রাকৃতি গ্যাসের পাশাপাশি এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। এ কারণে যেখানে ৭৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধির দরকার ছিল সেখানে মাত্র ৩২.৮ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি ঘনলিটার গ্যাসের দাম নেয়া হচ্ছে ৯.৮০ টাকা। অথচ এই গ্যাস খাতে প্রতিবছর সরকারকে ৩০ হাজার কোটি টাকা দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সেই হিসেবে দাম যেটা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন ছিল সেটা করা হয়নি। আমরা ভর্তুকি দিচ্ছি। প্রতি ঘনলিটার গ্যাসের দাম যেখানে পড়ে ৬১.১২ টাকা সেখানে নেয়া হচ্ছে ৯.৮১ টাকা অথ্যাৎ ৫১.৩২ টাকা সরকার আর্থিক সহায়তা করছে। এই হিসেবে এখনো বছরে ১৯ হাজার ১০ কোটি টাকা ভর্তূকি দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন পেট্রোবাংলা ১০২ শতাংশ দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছিল। দামতো আরো বাড়ানো যেতো, কিন্তু আমরা বাড়াইনি মানুষের কথা চিন্তা করে। তিনি বলেন, আমাদের প্রাকৃতি গ্যাস অপ্রতুল । ফলে এলএনজির সংমিশ্রন করে গ্যাস দিতে হয়। এতে খরচের ব্যাপার আছে।

গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ না নেয়ার অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এই অভিযোগ ঠিক নয়। আমরা গ্যাস অনুসন্ধ্যান অব্যাহত রেখেছি। ৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন গ্যাস রপ্তানীর প্রস্তাব দিয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, আমি তখন বলেছিলাম আমাদের ৫০ বছরের গ্যাস মজুদ রাখার পর যদি থাকে তাহলে চিন্তা করা যেতে পারে। কিন্তু তার আগে আমাকে জানতে হবে আমার কত গ্যাস আছে। এরপর তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আবারো মুচলেকা নিতে চেয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের সম্পদ অন্যের হাতে তুলে দিয়ে ক্ষমতায় আনতে হবে সেই রাজনীতি করি না। আমি মুচলেকা দেইনি, খালেদা জিয়া দিয়েছিল। সেজন্য সেবার আমরা ক্ষমতায় আসতে পারিনি।

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি প্রসঙ্গে সংসদ নেতা আবারো বলেন, এখানে আমাদের আমাদে খরচটাতো বিবেচনায় নিতে হবে। আমাদের এনার্জি ছাড়াতো চলবে না। খরচের পুরোটাইতো জনগণের কাছ থেকে নেয়া উচিত, সেটাতো আমরা নিচ্ছি না। ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে গ্যাসের দামের তুলনামূলক একটি চিত্র তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদেরতো ভারতের তুলনায় দাম অনেক কম। শুধুমাত্র সিএনপি আমাদের ৪৩ টাকা আর ভারতে ৪৪ রুপিজ তাহলে ভারতে দাম কমলো কিভাবে? তারাও কিন্তু গ্যাসে ভর্তুকি দিচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের গ্যাস ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। আগে শিল্প মালিকরা বলেছেন, আমাদের আগে গ্যাস দেন, যত টাকা লাগে দেবো। এখন গ্যাস দেয়ার পর যারা আন্দোলন করছেন তারা প্রকৃত অবস্থা চিন্তা করছেন না। তিনি বলেন, বিদ্যুতেও আমাদের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। সেটার পরিমাণ ৮ হাজার কোটি টাকা। সেটাতো আমরা মানুষের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছি না। এভাবে বিরাট অংকের ভতূর্কি দিয়ে আমরা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করছি। ফলে গ্যাসের ব্যবহারে আমাদের সচেতন হতে হবে। আমরা প্রিপ্রেইট মিটারের চিন্তা করছি যাতে অপচয় রোধ করা যায়।

শেখ হাসিনা চাকুরির বয়সসীমা ৩৫ করার দাবি প্রসঙ্গে বলেন, এখন যে শিক্ষা ব্যবস্থা তাতে ২৩ বছরে একজন শিক্ষাজীবন শেষ করে বিসিএস পরীক্ষা দিতে পারে। এরপর ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিবার পরীক্ষা দিতে পারে। পৃথিবীর কোন দেশে এতো বার পরীক্ষা দিতে পারে না। তিনি শিক্ষাখাতে সরকারি ভতুর্কির কথা উল্লেখ করে বলেন, পৃথিবীর কোন দেশে শিক্ষাখাতে এতো ভর্তুিক দেয় না। তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাথাপিছু শিক্ষার্থীদের ভতুকি প্রদানের পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শিক্ষাঙ্গনে এক সময় অস্ত্রের ঝনঝনানি ছাড়া কিছু ছিল না। এখন সেটা হয় না। আস্তে আস্তে এই পরিবেশ আমরা আরো উন্নত করতে পারবো। তিনি কোটা আন্দোলন প্রসঙ্গে বলেন, ভিসির বাসায় যে আগুন দেয়ার মতো ঘটনা এর আগে দেখিনি। যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে বিচার করা দরকার যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন ঘটনা ঘটাতে সাহস না করে। তিনি বলেন, শিক্ষাখাতে যত টাকা লাগে আমরা দিয়ে যাচ্ছি।

সামাজিক অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, শিশুদের ওপর অত্যাচার হচ্চে। কথায় কথায় মানুষ খুন করা হচ্ছে। এগুলো মিডিয়ায় আসে। পত্রিকায় খবর আসার পর এসব অপরাধ আরো বৃদ্ধি পায়। আমি আশা করবো যারা এসব অপরাধ করে তাদের ছবি যেন দেখানো ও প্রকাশ করা হয় বার বার যাতে অন্যরাও এই ধরণের অপরাধ করতে সাহস না পায়। আর আইনটা আরো কঠোর করার দরকার। পুরুষরা এইসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। তাই এ ব্যাপারে পুরুষদেরও সোচ্চার হতে হবে।

ডেঙ্গুজ্বর প্রসঙ্গে বলেন, এসব মশা ভদ্র জায়গায় থাকে। স্বচ্ছ পানিতে এগুলো জম্মায় বাড়ির আঙ্গিনা, টব, এসির পানি সব পরিস্কার রাখতে হবে যাতে পানি না জমায়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে তা অব্যাহত থাকবে দেশকে আরো সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাবো আমরা। বাংলাদেশকে ২০৪১ সালে মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার সব থেকে উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করবো।

উৎসঃ নয়াদিগন্ত

আরও পড়ুনঃ বিচারপতিদের মনে ভীতি সঞ্চয়ের জন্য সিনহার বিরুদ্ধে মামলা: ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন


বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার এ,এম,মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতে সরকার দুদকের ওপর প্রভাব বিস্তার করে স্বাধীন বিচার বিভাগের গায়ে কালিমা লেপন করেছে। গতকাল সুপ্রিম কোটের এনেক্সে ভবনের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর মামলাগুলোর রায় সরকারের পক্ষে রাখার জন্য এবং বিচারপতিরা যেন স্বাধীনভাবে রায় প্রদান করতে না পারে সেলক্ষ্যে বিচারপতিদের মনে ভীতি সঞ্চর সৃষ্টি করার লক্ষ্যে সরকার/রাষ্ট্রযন্ত্র প্রভাব খাটিয়ে এ মামলা দায়ের করেছেন।

মামলা দায়েরের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক মামলা দায়েরের বিষয়ে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করার লক্ষ্যে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নেয়ার আপিলের রায় নিয়ে মূলত সরকারের সঙ্গে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার দূরত্বের সূত্রপাত হয়। এছাড়া, ২০১৭ সালের ১লা আগস্ট আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হলে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার কিছু পর্যবেক্ষণকে ভালোভাবে নেয়নি সরকার। সরকারি দল ও জোটের নেতা এবং সংসদ ও মন্ত্রীরা ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখান জাতীয় সংসদ ও এর বাইরে সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহাকে উদ্দেশ্য করে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেয়া হয়। সরকারি দলের অনেক নেতা তখন সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হবে বলে হুমকি দেন।

এছাড়া, নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করতে চাওয়ায় সাবেক প্রধান বিচারপতি সরকারের প্রতিহিংসার শিকার হন।

উৎসঃ মানবজমিন

আরও পড়ুনঃ ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগার দুই কর্মকর্তার পকেটেই মাসে ৬০ লাখ টাকা


বন্দি আর দর্শনার্থী যেন টাকা বানানোর মেশিন! তাদের পিষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের কর্মকর্তারা পকেটে ভরেছেন প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা। দুই শীর্ষ কর্মকর্তার কামাই কমপক্ষে ৬০ লাখ টাকা। পদে পদে বাণিজ্যে তাদের এই রোজগার। বন্দি দেখতে আসা দর্শনার্থীদের কাছ থেকে মসজিদের নামে যে ১০ টাকা করে রাখা হয় তাও নিজের পকেটে ঢুকানোর অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক তদন্তে এই কারাগারে রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র ওঠে আসে। বাণিজ্যের খাত থেকে কারা কর্মকর্তারা কত টাকা নিচ্ছেন মানবজমিনের অনুসন্ধানে মিলেছে সেই তথ্য। তিতাস, যমুনা, মেঘনা ও পদ্মা নামের ৪টি কারা ভবনে ওয়ার্ড রয়েছে ১৮টি। প্রত্যেক ওয়ার্ড একজন পুরনো বন্দির নিয়ন্ত্রণে থাকে।

এই নিয়ন্ত্রকরা প্রত্যেকে ১৫ হাজার টাকা করে দেন কারা কর্মকর্তাদের। পরে তারা বন্দিদের নানাভাবে নির্যাতন করে টাকা আদায় করেন। ১৫ হাজার টাকার বাইরে যত টাকা আদায় হবে সবই নেবে নিয়ন্ত্রকরা। কারা ভবন তিতাসে ৪ জন, যমুনায় ৬ জন, মেঘনায় ৪ জন এবং পদ্মায় ৪ জন নিয়ন্ত্রক রয়েছে। নতুন বন্দি এলে কেইস টেবিল থেকে একেকজনকে ৫শ’ টাকা করে কিনে নেন নিয়ন্ত্রকরা। ওয়ার্ডে এক হাত জায়গা পেতে দিতে হয় ৩ হাজার টাকা। আর একটি কম্বল পেতে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয় বলে উল্লেখ রয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে।

সাক্ষাৎকালে সচ্ছল বন্দির মহিলা আত্মীয়দের ফোন নম্বর রেখে দেন কারারক্ষীরা। পরবর্তীতে বন্দির মাধ্যমে টেলিফোন করে নির্যাতন করার কথা বলে বাড়ি থেকে অতিরিক্ত টাকা আনতে বাধ্য করা হয়। কারা হাসপাতালের নিয়ন্ত্রণ ৫ জনের হাতে। হাসপাতালে শয্যা রয়েছে ২১টি। হাসপাতাল নিয়ন্ত্রকদের প্রত্যেকে ১৫/২০ হাজার টাকা দেন কারা কর্মকর্তাদের। এই হাসপাতালের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয় মাসিক ১০-২০ হাজার টাকার বিনিময়ে আর্থিকভাবে সচ্ছল ও প্রভাবশালী বন্দিরা হাসপাতালে অবস্থান করে হাসপাতালটিকে তাদের নিজস্ব বাসাবাড়িতে পরিণত করেছে। ক্যান্টিন রাইটারের দায়িত্বে থাকা ১০ জনের প্রত্যেকে ৫ হাজার টাকা করে দিতে হয় কারা কর্মকর্তাদের।

ক্যান্টিন মেডের দায়িত্বে থাকেন একজন। তাকে দিতে হয় ২০ হাজার টাকা। বাগানের মেড হিসেবে দায়িত্ব পালনকারীকে দিতে হয় ২০ হাজার টাকা। সাক্ষাৎ রুমের সিআইডিকে প্রতি সপ্তাহে দিতে হয় ১০ হাজার টাকা। কারাগারের ভেতর ও বাইরের ক্যান্টিনে প্রতি মাসে ৫০ লাখ টাকা বেচাবিক্রি হয় বলে জানা যায়। এর মধ্যে লাভই হয় ৩০ লাখ টাকা। ক্যান্টিন পরিচালনাতে হিসেবের দুটি খাতা রাখা হয়। এর একটিতে থাকে প্রকৃত মূল্যে বেচাবিক্রির হিসেব, অন্যটিতে থাকে দ্বিগুণ মূল্যে বিক্রির হিসেব। কারাগারের ভেতরের ক্যান্টিন এবং বাইরের ক্যান্টিন পরিচালনার দায়িত্ব পেতে একজন কারারক্ষীকে ৩ মাসের জন্য ৪ লাখ টাকা দিতে হয় কারা কর্মকর্তাদের। কারা ক্যান্টিনে দ্বিগুণের বেশি মূল্যে পণ্য সামগ্রী বিক্রির প্রমাণ পান তদন্ত কর্মকর্তারা।

ক্যান্টিনে এক কেজি গরুর মাংস বিক্রি হয় এক হাজার টাকা। আর মুরগির মাংসের কেজি ৭শ’ টাকা। এক কেজি পুঁটি মাছের দাম ১৬শ’ টাকা। মাম দেড় লিটার ও ফ্রেস ২ লিটার পানি ৩০ টাকার স্থলে বিক্রি করা হচ্ছে ১৪০ টাকা। এভাবে ৩৩টি পণ্য সামগ্রীর সবক’টি দ্বিগুণ মূল্যে বিক্রি করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় কারা নীতিমালা অনুযায়ী ক্যান্টিন থেকে লভ্যাংশের অর্থ কারারক্ষী এবং বন্দিদের কল্যাণে খরচ করার কথা। কিন্তু এখানে তা করা হয়নি। প্রতি মাসেই খরচের ক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষ আর্থিক বিধি বিধান ও পিপিআর ২০১৮ অনুসরণ করেনি। জেলার এবং জেল সুপার ইচ্ছেমাফিক কারা ক্যান্টিনের লভ্যাংশ অর্থ খরচ করে থাকেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়।

বন্দিদের খাবার কমিয়ে দিয়ে মাসে ১০ লাখ টাকা পকেটে ভরেন কারা কর্মকর্তারা। কারাগারের ভেতর ও বাইরে উৎপাদিত সবজি ঠিকাদারের মাধ্যমে সরবরাহ করে এর দাম বাবদ কয়েক লাখ টাকা নিজেদের পকেটে নেন তারা। প্রত্যেক বন্দির প্রাপ্য খাবারের অর্ধেকও দেয়া হয় না। তাছাড়া মোট বন্দির দু-আড়াইশো ক্যান্টিন থেকে খাবার কিনে খাচ্ছে। কিন্তু সকল বন্দির খাবার সরবরাহের হিসেব কাগজপত্র দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করছেন তারা। সূত্র জানায়-বন্দিদের জন্য ঠিকাদারের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ অনেকটাই কাগজপত্রে।

সরবরাহ সামান্য করে পুরো সরবরাহের অর্থ লুপাট করা হয়। এদিকে কারাগার থেকে সরবরাহকৃত খাবার অত্যধিক নিম্নমানের বলে উল্লেখ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে। এতে তদন্ত কর্মকর্তারা বলেন ‘বন্দিদের সরবরাহকৃত রুটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে প্রতিটি রুটি খাবার অযোগ্য। সিদ্ধ করা আটার রুটি কোনোভাবে গরম করে বন্দিদের দেয়া হয়ে থাকে। দর্শনার্থীকক্ষ হতে বন্দি সাক্ষাৎপ্রার্থীদের কাছ থেকে মসজিদের নামে ১০ টাকা করে রাখা হয়। এখান থেকে প্রতি মাসে আসে ৫০/৬০ হাজার টাকা। কিন্তু গত ৪ বছরে এই টাকার কোনো হিসাব মেলানো হয়নি।

টাকা কিভাবে খরচ করা হয়েছে তার কোনো হদিস নেই। অথচ প্রত্যেক কারারক্ষীর কাছ থেকে মসজিদের ইমামের বেতনের জন্যে ১শ’ টাকাসহ মোট ১২০ টাকা কেটে রাখা হয় প্রতি মাসে। বিশেষ ব্যবস্থায় বন্দি দর্শন বা অফিস কলের জন্য একজন দর্শনার্থীর কাছ থেকে সর্বনিম্ন ৫শ’ টাকা করে নেয়া হয়। কখনো কখনো এক হাজার টাকাও নেয়া হয়। কারা অভ্যন্তর থেকে জানালা দিয়ে কথা বলার জন্য বন্দিকে ১০০ টাকা প্রদান করতে হয়। এ ছাড়া কোর্টে হাজিরা দিয়ে বন্দিগণ কারাগারে ফেরত আসার সময় তাদের সঙ্গে কোনো মালামাল থাকলে তা টাকার বিনিময়ে কারা অভ্যন্তরে নিতে দেয়া হয়।

বন্দির পরিধেয় জামা কাপড় কারা অভ্যন্তরে নিতেও দিতে হয় টাকা। প্রতিটি জামা-লুঙ্গি নিতে ৩০ টাকা করে প্রদান করতে হয়। সূত্র জানায়- জামিন থেকে ৫ লাখ টাকা আসে মাসে। এই আয়ের টাকা ভোগ করেন ডেপুটি জেলার। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, যেসব বন্দি আদালত থেকে জামিন প্রাপ্ত হয়ে থাকে তাদের মুক্ত হতে অনেক বেগ পেতে হয়। অর্থ প্রদান না করলে জামিননামা আটকে রেখে বন্দিদের মুক্তি বিলম্বিত করা হয়। জামিননামার মাধ্যমে বন্দিদেরকে মুক্তি পেতে হলে সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকা দিতে হয়।

তদন্ত রিপোর্টের সুপারিশ আংশিক বাস্তবায়িত: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের নানা অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কারারক্ষীদের সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছিল তদন্ত কমিটি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কারারক্ষী ছাড়া কর্মকর্তাদের কারো বিরুদ্ধেই নেয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। ৬ই এপ্রিল মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পর ২৬ কারারক্ষীকে কম গুরুত্বপূর্ণ কারাগারে বদলিপূর্বক বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়।

কারা মহাপরিদর্শকের পক্ষে অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক মো. বজলুর রশিদ ২৮শে এপ্রিল চট্টগ্রামের কারা উপ-মহাপরিদর্শকের কাছে এই নির্দেশ পাঠান। তাতে ২৭শে মে’র মধ্যে অভিযুক্ত কারারক্ষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে কারা অধিদপ্তরকে অবহিত করতে বলা হয়। কিন্তু তদন্ত রিপোর্ট পেশের ৩ মাস পরও দায়ী কারা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। তদন্তে কারাগারে সংগঠিত সব অপকর্মের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় জেল সুপার নূরন্নবী ভূঁইয়া, জেলার এজি মাহমুদ, ডেপুটি জেলার হুমায়ুন কবির, হিসাবরক্ষক মো. নাজিম উদ্দিনকে। এ ছাড়া কারা হাসপাতালের সহকারী সার্জন মো. হুমায়ুন কবির রেজা ও ডিপ্লোমা নার্স মো. নাজিরুল ইসলামকে দায়ী করা হয় হাসপাতালকেন্দ্রিক অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত থাকার জন্য। তাদের বিরুদ্ধেও নেয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা।

তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর সর্ব প্রধান কারারক্ষী আবদুল ওয়াহেদকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। এ ব্যাপারে চট্টগ্রামের কারা উপ-মহাপরিদর্শক মো. ফজলুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন- তদন্তের প্রেক্ষিতে অ্যাকশন হয়েছে। নিচের লেবেলের যেটা আমার করার কথা ছিল সেটা আমি করে ফেলেছি। ওইটা আমার অংশ না। ওপরের ব্যাপার। সেখান থেকে হয়তো ব্যবস্থা হচ্ছে।

উৎসঃ মানবজমিন

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here