আগের রাতেই কেরোসিন ও ম্যাচ রেখেছিল হত্যাকারীরা!(ভিডিও সহ)

0
164

মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে (১৮) যৌন নিপীড়নের পর কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় আগের রাতেই কেরোসিন ও ম্যাচ রেখে এসেছিল হত্যাকারীরা।

অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার দুই সহযোগী নুরুদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম আগের রাতে কেরোসিন ও ম্যাচ রেখে এসেছিল।

তারা দুইজনই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। ইতিমধ্যে নুরুদ্দিন এবং শামীমকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র যুগান্তরকে জানায়, গত ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা কেন্দ্রে রাফিকে পুড়িয়ে মারতে বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার সহযোগীরা অংশ নিয়েছে- এটা এক রকম নিশ্চিত। এমনকি এ ঘটনাটি পুরোপুরি পরিকল্পিত।

ধারণা করা হচ্ছে, তারা দু’জন পরীক্ষার আগের দিন রাতে ঘটনাস্থল ‘শেল্টার হাউস’র ছাদে কেরোসিন এবং ম্যাচ রেখে এসেছিল। এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত যে চারজন বোরকা পরা ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ এবং একজন নারী ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভিডিওঃ ‘ব্রেকিং নিউজঃ পিবিআই’র তদন্তে বেরিয়ে এলো নুসরাত ঘটনার চাঞ্চল্যকর সব তথ্য! (ভিডিও সহ)’


[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

যখন সবাই রাফির শরীরের আগুন নেভাতে ব্যস্ত তখন তারা বোরকা খুলে মাদ্রাসার পূর্ব অথবা দক্ষিণ দিকের দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় শুরু থেকে সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। তাকে প্রত্যাহারের পর তার বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করেছে প্রশাসন।

এদিকে মানবাধিকার কমিশনের সংশ্লিষ্টরা শুক্রবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছে, আগে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হলে রাফিকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা হয়তো ঘটত না।

এদিকে মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেছে তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় শুক্রবার অধ্যক্ষের ঘনিষ্ঠ সহযোগী নুরুদ্দিন ও কাউন্সিলর মাকসুদ আলমকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী জেলা পিবিআইর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, এখন এই মামলায় ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলায় যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। আশা করছি শিগগিরই এ মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে।

প্রসঙ্গত, অগ্নিদগ্ধ শিক্ষার্থী এবং তার পরিবারের অভিযোগ, ৬ আগস্ট সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে যায় ওই শিক্ষার্থী। দুর্বৃত্তরা কৌশলে তাকে ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে ২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা করেন ওই ছাত্রীর মা।

মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। ওইদিনই গুরুতর আহতাবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। বুধবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাফি মারা যান।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ পিবিআইয়ের দাবি জেল থেকে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেন অধ্যক্ষ সিরাজ (ভিডিও সহ)


অধ্যক্ষ সিরাজউদৌলা জেল থেকে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেন বলে দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

শনিবার (১৩ এপ্রিল) দুপুর সাড়ে ১২টায় রাজধানীর ধানমণ্ডির ৪ নম্বর রোডে অবস্থিত নিজ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করে পিবিআই।

সংবাদ সম্মেলনে নুসরাত হত্যার ঘটনা তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা তুলে ধরেছেন মামলার তদন্তকারী সংস্থা পিবিআইয়ের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার।

সাংবাদিকদের বনজ কুমার বলেন, ‘ঘটনার দিন আনুমানিক সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টায় ঘটনাস্থলে ছিলেন নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আবদুল কাদের এবং আরও কয়েকজন।’

তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম বলেননি পিবিআইপ্রধান।

ভিডিওঃ ‘ব্রেকিং নিউজঃ পিবিআই’র তদন্তে বেরিয়ে এলো নুসরাত ঘটনার চাঞ্চল্যকর সব তথ্য! (ভিডিও সহ)’


[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

তিনি বলেন, ‘যৌন নির্যাতনের মামলা হওয়ায় আলেম সমাজকে হেয় করা হয়েছে- এই ধরনের যুক্তি দিয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ জেলে থেকেই তার সাঙ্গপাঙ্গোদের নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেন।’

বনজ কুমার আরও বলেন, ‘নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার আরও একটি কারণ আমরা জেনেছি। তা হলো- নুসরাতকে মামলার এজহারভুক্ত তৃতীয় আসামি শাহাদাত প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে সে প্রস্তাব নুসরাত ফিরিয়ে দেয়। বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি শাহাদাত। মনে মনে প্রচণ্ড ক্ষোভ জন্মে তার। নুরসাতকে পুড়িয়ে মারার পেছনে সেই আক্রোশটাও কাজ করেছে। ’

সংবাদ সম্মেলনে নুসরাত হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত নয় আসামির মধ্যে আটজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে তথ্য দেন তিনি।

গ্রেফতারদের মধ্যে নূর উদ্দিন হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকার করে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে বলে জানান বনজ কুমার।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ নুসরাতের শোকে ভাই রায়হান হাসপাতালে


কথায় আছে- অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর। আর অধিক শোকে পাথর হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন নুসরাত জাহান রাফির ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান। প্রিয় বোনের অসহ্য মৃত্যু যন্ত্রণা আর অতীত স্মৃতি কোনোভাবেই ভুলতে পারছে না রায়হান।

শুক্রবার রাতে ভাই রায়হানকে ফেনীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

পরিবার সূত্র জানায়, শুধু বুক চাপড়িয়ে চাপড়িয়ে কান্না করছে রায়হান। চোখের জল শুকিয়ে গেছে। খাওয়া-ধাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। রাফির জানাজার পূর্ব থেকে বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলায়। জ্ঞান ফিরলে রাফিকে খুঁজছে। প্রিয় বোন রাফির অতীত স্মৃতিগুলো যেন ভুলতেই পারছে না রায়হান।

নুসরাতের মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি শোকাহত হয়েছে ছোট ভাই রায়হান। মাত্র দুই বছরের বড় নুসরাতের সঙ্গে মাদ্রাসায় যাওয়া-আসা করত। সে ওই মাদ্রাসার দশম শ্রেণির ছাত্র। অনেকটা সমবয়সী বলে ভাইবোনের মধ্যে খুনসুটি লেগেই থাকত।

প্রসঙ্গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজীতে পরীক্ষাকেন্দ্রের ভেতর ওই ছাত্রীর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যাচেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা।

শনিবার সকালে সোনাগাজী পৌর এলাকার ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসাকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। ওই ছাত্রী ওই মাদ্রাসা থেকেই আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন।

পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত কক্ষ থেকে ছাদে ডেকে নিয়ে কয়েকজন বোরকাপরা নারী পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ করেছেন ওই শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যরা।

তারা জানান, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে করা মামলা তুলে না নেয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে। এ তথ্য ফেনী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন স্থানীয় পুলিশকেও জানিয়েছেন নুসরাত।

তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় এদিন বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের ১০২ নম্বর কক্ষে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। তাকে লাইফসাপোর্ট দেয়া হয়। এর পর না ফেরার দেশে চলে যান মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ যেভাবে নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যাকারী সিরাজের উত্থান


ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ ও রাফি হত্যা মামলার প্রধান আসামি সিরাজ উদ্দৌলা একজন জামায়াত নেতা। তবে নিজের সুরক্ষা নিশ্চিতে ২০০১ সাল থেকেই ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তিনি গড়ে তুলেছিলেন সুসম্পর্ক।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিনি ম্যানেজিং কমিটিতে সোনাগাজী পৌর বিএনপির সভাপতি আলাউদ্দিন এবং তার সহযোগী জামায়াত নেতা ও পৌর জামায়াতের সাবেক সভাপতি আবদুল মান্নানকে সদস্য করেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সে বিপাকে পড়ে যায়।

পরে ২০১২ সালে আলাউদ্দিন ও আবদুল মান্নানকে বাদ দিয়ে ম্যানেজিং কমিটিতে সদস্য করেন আওয়ামী লীগের উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবদুল হালিম মামুনকে। জামায়াত নেতা আবদুল মান্নানকে ম্যানেজিং কমিটি থেকে সরিয়ে দেয়ার কারণে ব্যাপক ক্ষুব্ধ হন জামায়াতপন্থী শিক্ষকরা।

তখন শেখ মামুনকে হাতে রেখে অন্যদের ঘায়েল করতে ব্যাপক তৎপর হয়ে ওঠেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা। ২০১৫ সালে মাদ্রাসার অর্থনৈতিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে অধ্যক্ষের সঙ্গে মনোমালিন্য শুরু হয় মামুনের। পরে অধ্যক্ষ তার দলে টেনে নেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে।

২০১৮ সালে রুহুল আমিনকে মাদ্রাসা ম্যানেজিং কমিটির সহ-সভাপতি ও তার সহযোগী পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমকে ম্যানেজিং কমিটির সদস্যপদ থেকে সরিয়ে দিয়ে রুহুল আমিনকে সদস্য করেন।

আর এভাবেই কৌশলে প্রভাবশালীদের কব্জা করে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা শিক্ষার্থীদের বছরের পর বছর যৌন হয়রানিসহ নানা অপকর্ম করে পার পেয়ে গেছেন।

এই অধ্যক্ষ নিজে টিকে থাকতে এবং লুটপাট করতে সব সময় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করে অপকর্ম চালিয়ে যেতেন।

উৎসঃ ‌poriborton

আরও পড়ুনঃ বোরখা পরে ছাদে ছিল শাহাদাতসহ চারজন, পাহারায় নূর উদ্দিনরা


সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেফতার হওয়ার পর গত ৪ এপ্রিল ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দেয় একটি মহল।

পরদিন আসামি নুর উদ্দিন, শাহদাতসহ ৫ জন কারাগারে সিরাজের সাথে দেখা করে। সেখান থেকেই মূলত নুসরাতের শরীরে আগুন দেয়ার নির্দেশনা আসে বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

উল্লেখ্য, শাহাদাত হোসেন শামীম সোনাগাজী ইসলামীয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রলীগের সভাপতি। নুসরাত হত্যার প্রধান আসামি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার নিজস্ব বলয়ের অন্যতম সদস্য তিনি।

শনিবার দুপুরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ধানমণ্ডি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার।

তিনি বলেন, আসামিদের ক্ষোভ ছিল অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে আলেম সমাজকে হেয় করেছে নুসরাত।

ডিআইজি আরো জানান, আসামিদের মধ্যে শাহাদাত হোসেন শামীম দফায় দফায় নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু নুসরাত সেই প্রস্তাব গ্রহণ না করায় তার ভেতরেও একটা চাপা ক্ষোভ ছিল।

নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার সময় ছাদে শাহাদাতসহ চারজন ছিল। তাদের মধ্যে একজন নারী। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ওই নারী ৩টা বোরখা ও কেরোসিন এনে শাহাদাতকে দেয়। সেই বোরখাগুলো পরে ঘটনার দিন আসামিরা সাইকোলজি ভবনের টয়লেটে লুকিয়েছিল।

শম্পা নামে আরেক নারী পরিকল্পনা অনুযায়ী পরীক্ষা শুরুর আগে নুসরাতের ক্লাসে গিয়ে তাকে বলে সাইকোলজি ভবনের ছাদে নিশাতকে (নুসরাতের বান্ধবী) মারধর করছে। তখন নুসরাত দৌড়ে সেখানে গেলে আসামিরা তার গায়ে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায়।

এ সময় নুর উদ্দিনসহ ৫ জন নিচে পাহারায় ছিল। আলোচিত ওই ঘটনায় আমরা এখন পর্যন্ত ১৩ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তদন্ত চলছে, এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। এদের মধ্যে এজাহারভুক্ত ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

উৎসঃ ‌poriborton

আরও পড়ুনঃ নুসরাতের কিলিং স্কোয়াড বানানো হয়েছিল কাদের নিয়ে


সবাইকে কাঁদিয়ে গত বুধবার রাত সাড়ে নয়টায় এ জগতের মায়া কাটিয়ে চলে যান মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি। এরপর আরো দুইদিন পার হলেও এখনো জানা যায়নি ওই কিলিং স্কোয়াডে ঠিক কারা ছিল। তবে এ ব্যাপারে পিবিআই জানিয়েছে, বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অচিরেই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের ব্যাপারে জানা যাবে।

গত ঘটনার দিন ৬ এপ্রিল আরবি প্রথম পত্রের পরীক্ষা দিতে ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানকে নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়েছিলেন নুসরাত জাহান রাফি। এ সময় শুধু প্রবেশপত্র ও কলমসহ একটি ফাইল নিয়ে সোনাগাজী সিনিয়র ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসা কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়া হয় তাকে। তার ভাইকে আটকে দেয়া হয় কেন্দ্রের গেটেই। এরপর কাগজপত্র নিয়ে নিজের নির্ধারিত আট নম্বর কক্ষে চলে যান নুসরাত।

এ সময় একজন এসে তাকে জানায়, মাদরাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় সাক্ষী ও নুসরাতের বান্ধবী নিশাতকে ছাদে মারধর করা হচ্ছে। এ কথা শুনে নিজের কাগজপত্র রেখে বান্ধবীকে বাঁচাতে তিনতলার ছাদে চলে যান নুসরাত। সেখানে গিয়ে বোরকা পরা চারজনকে দেখতে পান। এদের মধ্যে দুইজন নুসরাতকে মামলা তুলে নিতে চাপ দেন। কিন্তু নুসরাত তাতে রাজি না হওয়ায় এক পর্যায়ে নুসরাতের দুই হাত দড়ি দিয়ে পেছনে বেঁধে ফেলে তারা। পরে কেরোসিন দিয়ে তার শরীরে আগুন লাগিয়ে দেয় তারা। আগুন লাগানোর পর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে অপরাধীরা।

জানা গেছে, পরীক্ষা শুরুর আগে সকাল সাতটা থেকে সাড়ে নয়টা পর্যন্ত ওই মাদরাসায় দাখিল বিভাগের ক্লাস চলে। সাড়ে নয়টার দিকে একদিকে আলীম পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নিতে কেন্দ্রে প্রবেশ করেন। সে সময় দাখিলের শিক্ষার্থীরা মাদরাসা থেকে বের হয়ে যান। ধারণা করা হচ্ছে, এ সুযোগটিকে কাজে লাগিয়েই অপরাধীরা ওই সময়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করে এবং আগুন লাগিয়ে পালিয়েও যায়। বিশেষ করে বোরকা ও হাতমোজা থাকায় তাদেরকে আর আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়নি।

ওই কিলিং মিশনে অংশ নেয়া বোরকা, হাতমোজা ও চশমা পরা চারজনের কথা উল্লেখ করা আছে মামলার এজাহারে। এদের মধ্যে দুইজনকে নারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আর বাকি দুইজন নারীর ছদ্মবেশে পুরুষ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কিন্তু তিনদিন পার হয়ে গেলেও নুসরাতকে হত্যার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিদের এখনো শনাক্ত করা যায়নি। তবে এক্ষেত্রে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

এদিকে নুসরাতের আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসীর ধারণা ওই কিলিং স্কোয়াডে দুইজন নারী থাকলেও বাকি দুইজন পুরুষ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। বিশেষ করে গতকাল গ্রেফতার হওয়া নুরউদ্দিনের শারীরিক গঠন ছোটখাটো হওয়ায় অনেকেই মনে করছেন সে ওই কিলিং স্কোয়াডে ছিল। কারণ ঘটনার পরপরই তাকে মাদরাসা থেকে বের হতে দেখা যায়। এমনকি সে ছাঁদে ম্যাচ ও কেরোসিন দেখার কথাও জানায়। তবে তাকে দাঁড়াতে বললে, সে জানিয়েছিল, এখন দাঁড়ানোর সময় নেই। এরপর থেকেই সে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। পরে গতকাল শুক্রবার ময়মনসিংহ থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

মাদরাসার শিক্ষক ও স্থানীয়রা ধারণা করছেন অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ দোলাহর ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত নুর উদ্দিন আগুনের ঘটনায় নেতৃত্ব দিতে পারেন। যৌন হয়রানির মামলায় সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেপ্তারের পর তার মুক্তির দাবিতে সংগ্রাম পরিষদও গড়ে তুলেছিলো নুর উদ্দিন। ২০১৭ সালে প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দেয়ায় নুসরাতকে চুনের পানি দিয়ে ঝলসে দিয়েছিলেন শ্রমিক থেকে অধ্যক্ষের কাছের বনে যাওয়া নুর উদ্দিন।

এছাড়া, মামলার আরেক আসামি শাহাদাত হোসেনও এই ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে দাবি করেছেন নুসরাতের পরিবার। সোনাগাজী সিনিয়র ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ অনুমোদিত কোন কমিটি না থাকলেও শাহাদাত ছিলেন অধ্যক্ষ সিরাজ ঘোষিত ছাত্রলীগ সভাপতি। শুক্রবার এ দুজনকেই ময়মনসিংহ থেকে গ্রেফতার করা হয়।

স্থানীয়রা আরো বলছেন, সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবেই এ হত্যাকা- ঘটানো হয়েছে। নইলে পরীক্ষাকেন্দ্রের মতো একটি স্পর্শকাতর স্থানে এ রকম অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার কথা ছিল না। একই সাথে সে সময় কর্তব্যরত পুলিশের গাফলতির কথাও তারা তুলে ধরছেন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআই ও জেলা পুলিশও বিষয়গুলো মাথায় রেখে ঘটনার মূল হোতাদের ধরতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আসামি করা হয়েছে অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দোলাহসহ আটজন ও আরো অজ্ঞাতনামা চারজনকে। এদের মধ্যে একজনকে শম্পা নামে ডাকা হয়েছিল বলে জানিয়ে গিয়েছিল নুসরাত। কিন্তু সেটি তার মূল নাম না কি ছদ্মনাম সে রহস্যের এখনো সমাধান করতে পারেনি পুলিশ।

এদিকে, নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা পিবিআই জানিয়েছে, মামলার তদন্তে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট এগারোজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।এদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে মূল কিলিংয়ে অংশ নেয়াদের বিষয়েও নিশ্চিত হওয়া যাবে।

উৎসঃ ‌নয়াদিগন্ত

আরও পড়ুনঃ নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ড, ভয়ঙ্কর অপরাধী অধ্যক্ষ সিরাজ (ভিডিও সহ)


ফাঁসির দাবিতে সারা দেশে মানববন্ধন * আ’লীগ নেতা পৌর কাউন্সিলর মুকসুদ ও ছাত্রদল নেতা নুরুদ্দিন গ্রেফতার * যৌন হয়রানি ও মাদ্রাসার অর্থ আত্মসাতের তথ্য পেয়েও ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন * হত্যার আগের দিন রাতে শেল্টার হাউসের (ঘটনাস্থল) ছাদে কেরোসিন ও ম্যাচ রাখা হয় * ২০০১ সাল থেকেই স্থানীয় ক্ষমতাসীন নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে চালিয়েছেন অপকর্ম

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ ও রাফি হত্যা মামলার প্রধান আসামি সিরাজ উদ্দৌলা একজন ভয়ঙ্কর অপরাধী। বছরের পর বছর ধরে শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি করেও পার পেয়ে যান তিনি। জামায়াত নেতা হলেও নিজের সুরক্ষা নিশ্চিতে ২০০১ সাল থেকেই ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তিনি গড়ে তুলেছিলেন সুসম্পর্ক। আর কৌশল হিসেবে ওইসব নেতাকে মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করতেন তিনি।

সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষক, কর্মচারী ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্য, এলাকাবাসী এবং স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এসব তথ্য।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, তার (অধ্যক্ষ সিরাজ) বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠলেও কখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। উল্টো তাকে বাঁচাতে বারবারই তার অনুগতরা তৎপর ছিল। এমনকি গত অক্টোবরে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার যৌন হয়রানির বিষয়ে প্রতিবাদ করায় তিন শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসন অবগত হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এমন অন্তত ১০টি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন ওই মাদ্রাসার শিক্ষকরা।

ভিডিওঃ  নুসরাতের আগে সিরাজউদ্দৌলার শ্লীলতাহানির শিকার হন আরও এক ছাত্রী বল্লেনঃ প্রভাসক আবুল কাশেম (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

শুধু তাই নয়, সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্দে মাদ্রাসার অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠলেও এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। এ প্রসঙ্গে ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিকেএম এনামুল করিম যুগান্তরকে বলেন, ২০১৭ সালে অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের যে অভিযোগ উঠেছিল সেটি তদন্ত করে জানা গেছে, সেটি অর্থ আত্মসাৎ নয়, অনিয়ম হয়েছে। এই অনিয়ম রোধে সে সময় আমরা একটা নির্দেশনা দিয়েছিলাম।

অক্টোবরে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছিল সেটি বেনামি অভিযোগ ছিল। ভিকটিম পরিবার তখন বিষয়টি অস্বীকার করেছিল। এ কারণে সেটি ওই সময়ে আর তদন্ত হয়নি। আর আমি তখন মাদ্রাসার গভর্নিং কমিটির সভাপতি ছিলাম না। এখন আমি ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

এদিকে নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার প্রতিবাদে ও হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে ঢাকা ও ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শুক্রবারও অব্যাহত ছিল বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন। এদিন রাফি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি আওয়ামী লীগ নেতা পৌর কাউন্সিলর মুকসুদ আলম ও ছাত্রদল নেতা নুরুদ্দিনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। মুকসুদকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এই মুকসুদ আলমকে রাতেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে তার দুই সহযোগী ছিল পৌর বিএনপির সভাপতি আলাউদ্দিন গঠন ও জামায়াতের পৌর সভাপতি আবদুল মান্নান। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই দুই নেতাকে ম্যানেজিং কমিটি থেকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে অন্তর্ভুক্ত করেন পৌর কাউন্সিলর ও উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবদুল হালিম মামুনকে। শেখ মামুনের সঙ্গে ভাগবাটোয়ারায় দ্বন্দ্ব তৈরি হলে তিনি তাকে বাদ দিয়ে ম্যানেজিং কমিটির সহসভাপতি করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে।

আর এভাবেই কৌশলে প্রভাবশালীদের কব্জা করে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা শিক্ষার্থীদের বছরের পর বছর যৌন হয়রানিসহ নানা অপকর্ম করে পার পেয়ে গেছেন। এমনকি দুই বছর আগে মাদ্রাসার তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের প্রমাণ পেলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এই অধ্যক্ষ নিজে টিকে থাকতে এবং লুটপাট করতে সব সময় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করে অপকর্ম চালিয়ে যেতেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র যুগান্তরকে জানায়, গত ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা কেন্দ্রে রাফিকে পুড়িয়ে মারতে বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার সহযোগীরা অংশ নিয়েছে এটা এক রকম নিশ্চিত। এমনকি এ ঘটনাটি পুরোপুরি পরিকল্পিত।

ঘটনার আগের দিন স্থানীয়রা মামলার এজাহারভুক্ত দুই আসামি এবং অধ্যক্ষের দুই সহযোগী নুরুউদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীমকে মাদ্রাসার আশপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখেছে। তারা দু’জন মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। ধারণা করা হচ্ছে, তারা দু’জন পরীক্ষার আগের দিন রাতে ঘটনাস্থল ‘শেল্টার হাউস’র ছাদে কেরোসিন এবং ম্যাচ রেখে এসেছিল। এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত যে চারজন বোরকা পরা ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ এবং একজন নারী ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভিডিওঃ  শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করবোঃ নুসরাত (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

যখন সবাই রাফির শরীরের আগুন নেভাতে ব্যস্ত তখন তারা বোরকা খুলে মাদ্রাসার পূর্ব অথবা দক্ষিণ দিকের দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় শুরু থেকে সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। তাকে প্রত্যাহারের পর তার বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করেছে প্রশাসন। এদিকে মানবাধিকার কমিশনের সংশ্লিষ্টরা শুক্রবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছে, আগে ব্যবস্থা নেয়া হলে এ ধরনের ঘটনা হয়তো ঘটত না।

এদিকে মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেছে তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় শুক্রবার অধ্যক্ষের ঘনিষ্ঠ সহযোগী নূরউদ্দিন ও কাউন্সিলর মুকসুদ আলমকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী জেলা পিবিআইর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, এখন এই মামলায় ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলায় যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। আশা করছি শিগগিরই এই মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে।

প্রসঙ্গত, অগ্নিদগ্ধ শিক্ষার্থী এবং তার পরিবারের অভিযোগ, ৬ আগস্ট সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে যায় ওই শিক্ষার্থী। দুর্বৃত্তরা কৌশলে তাকে ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে ২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা করেন ওই ছাত্রীর মা। মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। ওইদিনই গুরুতর আহতাবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। বুধবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাফি মারা যান।

ভিডিওঃ  ‘থানার ওসির কাছে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

সোমবার লাইফ সাপোর্টে নেয়ার আগে রাফি অগ্নিসংযোগকারী একজনের নাম বলেছে। দু’জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে চিকিৎসকের কাছে দেয়া বক্তব্যে রাফি বলেছেন, পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে কৌশলে তাকে ছাদে ডেকে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে চার দুর্বৃত্ত তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। একজনের নাম ‘শম্পা’। তারা সবাই নেকাব, বোরকা, হাতমোজা পরা ছিল।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিনি ম্যানেজিং কমিটিতে সোনাগাজী পৌর বিএনপির সভাপতি আলাউদ্দিন এবং তার সহযোগী জামায়াত নেতা ও পৌর জামায়াতের সাবেক সভাপতি আবদুল মান্নানকে সদস্য করেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সে বিপাকে পড়ে যায়। পরে ২০১২ সালে আলাউদ্দিন ও আবদুল মান্নানকে বাদ দিয়ে ম্যানেজিং কমিটিতে সদস্য করেন আওয়ামী লীগের উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবদুল হালিম মামুনকে।

জামায়াত নেতা আবদুল মান্নানকে ম্যানেজিং কমিটি থেকে সরিয়ে দেয়ার কারণে ব্যাপক ক্ষুব্ধ হয় জামায়াতপন্থী শিক্ষকরা। তখন শেখ মামুনকে হাতে রেখে অন্যদের ঘায়েল করতে ব্যাপক তৎপর হয়ে ওঠেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা। ২০১৫ সালে মাদ্রাসার অর্থনৈতিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে অধ্যক্ষের সঙ্গে মনোমালিন্য শুরু হয় মামুনের। পরে অধ্যক্ষ তার দলে টেনে নেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে। ২০১৮ সালে রুহুল আমিনকে মাদ্রাসা ম্যানেজিং কমিটির সহ-সভাপতি ও তার সহযোগী পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমকে ম্যানেজিং কমিটির সদস্য পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে রুহুল আমিনকে সদস্য করেন।

যত অপকর্ম : ২০১৭ সালের ১৬ অক্টোবর মাদ্রাসার তহবিল থেকে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সিরাজের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেন মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিকে এনামুল করিম। অথচ পরে এ নিয়ে আর কিছুই হয়নি।

এমনকি সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ থাকা অবস্থাতে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ফেনীর মহীপালে ২০১৩ সালে উম্মল ক্বুরা নামে একটি মাদ্রাসা এবং ফাউন্ডেশন গড়ে তোলে। ওই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সে। সেখানেও বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আবদুল কাইয়ুম নামে এক ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে এক কোটি ৩৯ লাখ টাকার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে ২০১৫ সালে ফেনীর আদালতে মামলা দায়ের করেন। এই মামলা এখনও বিচারাধীন। এই মামলায় একাধিকবার সে কারাগারেও ছিল।

এদিকে ১৯৯৬ সালে ফেনী সদরের দৌলতপুর সালামতিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে অনিয়ম এবং ছাত্র বলাৎকারের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

ফেনী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন জানিয়েছেন, সিরাজের বিরুদ্ধে তিনটি নাশকতার মামলা আছে।

মুকসুদ জেল হাজতে : রাফি হত্যা মামলার এজহারভুক্ত আসামি মুকসুদ আলমকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তানিয়া ইসলামের আদালতে নিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা ১০ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত আগামী সোমবার শুনানির দিন ধার্য করে তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করেন।

ভাগ-ভাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব : ২০১৫ সালের পর থেকে কলেজের বিভিন্ন অর্থনৈতিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে দুটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে। অধ্যক্ষ নিয়ন্ত্রিত গ্রুপটির নেতৃত্ব দেয় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন। মাদ্রাসার নিজস্ব তহবিল থেকে সাততলা ভবন তৈরির অনুমোদন পাওয়ার পর থেকে এই গ্রুপটি তৎপর হয়ে ওঠে।

মাদ্রাসা সূত্র জানায়, গত বছর পুরাতন ভবন ভাঙার কাজের ঠিকাদারি পান রুহুল আমিনের সহযোগী মুকসুদ আলম। পরে বিক্ষুব্ধ হয়ে এর বিরুদ্ধে পৌরসভায় অভিযোগ দেন শেখ আবদুল হালিম মামুন। পরে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এ নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। মাদ্রাসা মার্কেট থেকে প্রতি বছর মার্কেটে আয় হতো এক লাখ টাকা। এই টাকার ভাগ-ভাটোয়ারা নিয়েও দুই গ্রুপের দ্বন্দ্ব ছিল।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন যুগান্তরকে বলেন, আমি কাউকে শেল্টার দেইনি। আমি কোনো ভাগ-ভাটোয়ারাতেও নেই। ছয় মাস আগে কেন আমাকে কমিটিতে ঢোকানো হল এটাও রহস্যজনক।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবদুল হালিম মামুন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি অধ্যক্ষের অপকর্মের বিরোধিতা করেন। তিনি কাউকে কখনোই শেল্টার দেননি বলেও দাবি করেন।

যৌন হয়রানির তদন্তে নির্বিকার প্রশাসন : অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত অক্টোবরে বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা আরও এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করেছিল। ওই ছাত্রী স্থানীয় অন্য একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষের মেয়ে। ওই ছাত্রীকে যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করেছিলেন তিন শিক্ষক। পরে অধ্যক্ষ তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ এনে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন।

পরে বিষয়টি ম্যানেজিং কমিটির মিটিংয়ে ওঠে। সেখানে তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও পদাধিকারবলে মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আক্তারুন্নেছা শিউলি ওই মিটিংয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাকে আলটিমেটাম দেন। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। এ বিষয়ে ওই ছাত্রীর বাবা শুক্রবার দুপুরে যুগান্তরকে বলেন, ওই সময় আমি অধ্যক্ষ সিরাজকে বিষয়টি জিজ্ঞাসা করলে তিনি অস্বীকার করেছেন। তখন তিনজন শিক্ষক এর প্রতিবাদ করেছিলেন। পরে তাদের নাজেহাল করতে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। পরে আমরা আর এ নিয়ে লিখিত অভিযোগ দিইনি। তবে জেলা প্রশাসন বরাবর এ নিয়ে একটি অভিযোগ গিয়েছিল। সেটার তদন্ত হওয়ার কথা শুনেছিলাম। পরে আর অগ্রগতি হয়নি।

প্রতিবাদকারী গণিত বিভাগের শিক্ষক বেলায়েত হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আমরা যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করে তিনজন কারণ দর্শানোর নোটিশ পেয়েছিলাম। আমরা চাই কোনো শিক্ষার্থী যেন শিক্ষাঙ্গনে যৌন হয়রানির শিকার না হয়।

এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক অফিসার নুরুল আমিন যুগান্তরকে বলেন, তিন শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিলেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা। এ নিয়ে তদন্ত কমিটি করার দাবি তিনি তুলেছিলেন। পরে আর এ নিয়ে তদন্ত হয়নি।

নুরুদ্দিন ও মুকসুদ গ্রেফতার : রাফি হত্যা মামলার আসামি নুরুদ্দিন ও পৌর কাউন্সিলর মুকসুদ আলমকে গ্রেফতার করেছে পিবিআই। মামলার তদন্ত সংস্থা পিবিআই শুক্রবার তাদের গ্রেফতার করে। পিবিআইয়ের একটি সূত্র জানায়, শুক্রবার দুপুরে ময়মনসিংহের ভালুকা সিড স্টোর এলাকায় অভিযান চালিয়ে নুরুদ্দিনকে আটক করা হয়। পরে তাকে ফেনীতে আনা হয়। অপরদিকে বৃহস্পতিবার রাত ১১টায় রাজধানীর ফকিরাপুল এলাকার মুকসুদকে একটি আবাসিক এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।

সোনাগাজীতে মানববন্ধন : উপজেলা ছাত্রলীগের উদ্যোগে নুসরাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত আগুন সন্ত্রাসী ও কারাবন্দি অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার ফাঁসি দাবি করে সোনাগাজী বাজারের জিরোপয়েন্টে শুক্রবার সকাল ১০টায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আবদুল মোতালেব রবিন, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মীর এমরান, কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি নেয়ামত উল্লাহ ও চরচান্দিয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি জীবন মিয়াজী প্রমুখ। এ সময় তারা নুসরাতের নামে মাদ্রাসাটির নামকরণ করারও দাবি জানান।

কাউন্সিলর মুকসুদ বহিষ্কার : ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার অন্যতম আসামি সোনাগাজী পৌর আ’লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, পৌর কাউন্সিলর মুকসুদ আলমকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। উপজেলা আ’লীগের সভাপতি মো. রুহুল আমিন ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে কারান্তরীণ থাকায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তার স্থলে আমিনুল হক মানিককে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে ঢাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে বৃহস্পতিবার রাতে মুকসুদ আলমকে করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় : নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে মারার ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার সারা দেশ প্রায় উত্তাল ছিল। বিক্ষুব্ধ সাধারণ জনতা রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থানে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণবিরোধী পদযাত্রা, মানববন্ধন ও সভা করেছে। এসব কর্মসূচি থেকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার ফাঁসির দাবি করা হয়। পাশাপাশি তার হুকুমে রাফির গায়ে আগুন ধরানো অপরাধীদেরও ফাঁসি দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া অধ্যক্ষকে প্রশ্রয় দানকারী এবং তার পক্ষাবলম্বনকারীদের বিচার দাবি করা হয়েছে।

এদিন দুপুরে সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন (বিবিএ) বিভাগের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী পুনর্মিলনীর উদ্বোধনকালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন এমপি রাফি হত্যার ঘটনায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ফেনীর নুসরাত হত্যার ঘটনা আমাদের ব্যথিত করেছে। আমরা এ হত্যার বিচার চাই। তিনি বলেন, আমাদের সামাজিকভাবে এ ধরনের ঘটনা প্রতিহত করতে হবে। সমাজের প্রতিটা মানুষ যদি সচেতন হয় তাহলে দেশ আরও এগিয়ে যাবে।

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন ঢেলে হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এ বিক্ষোভ করেন তারা। ‘সর্বস্তরের শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে আয়োজিত কর্মসূচি থেকে ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে নারীদের জন্য নিরাপদ দেশ গড়ার আহ্বান জানানো হয়। এ সময় শামসুন নাহার হল সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক ফাতিমা তাহসিন বলেন, বাংলাদেশের মাটিতে ধর্ষক-নিপীড়কদের জায়গা হবে না। দল-মত নির্বিশেষে আমরা প্রতিবাদ করছি। ধর্ষকদের শাস্তির দাবিতে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

এদিন রাজধানীর শাহবাগ ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে পদযাত্রা ও মানববন্ধন হয়। বেলা ১১টায় শাহবাগ থেকে পদযাত্রা শুরু হয়ে তা শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। গৌরব একাত্তর, পূর্ণিমা ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ এ পদযাত্রায় অংশ নেন।

এর আগে সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), নিরাপদ বাংলাদেশ চাই, নিরাপদ নোয়াখালী চাই, সার্ক মানবাধিকার বাংলাদেশ, মুসলিম সাপোর্ট বাংলাদেশ, আলোকিত গোপালঞ্জ, যুব ঐক্য চট্টগ্রাম, বাংলাদেশের কওমি ছাত্র পরিষদ, ইসলামী ছাত্র সেনাসহ কয়েকটি সংগঠন। এসব কর্মসূচি থেকে নুসরাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তির দাবি করা হয়। এ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, বিভিন্ন অফিস আদালতে যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তোলা হয়। পাশাপাশি শিশুদেরও যৌন নির্যাতনকারীদের প্রকাশ্যে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার দাবি করা হয়েছে।

ওদিকে রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। রাফি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে শুক্রবার বরিশাল, সিলেট, যশোর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে মানববন্ধন করা হয়। এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, মাগুরা মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থীরা এবং টাঙ্গাইল ও নেত্রকোনায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মানববন্ধন করেছে।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ নুসরাতের হত্যার ঘটনায় ফেঁসে যাচ্ছেন সেই সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন (ভিডিও সহ)


ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ঘটনায় ফেঁসে যাচ্ছেন সেই সময়ের সোনাগাজী মডেল থানা পুলিশের ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, যৌন নিপীড়নের ঘটনাকে ‘নাটক’ ও পরবর্তীতে অগ্নিদগ্ধের ঘটনাকে ‘আত্মহত্যার’ রূপ দিতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়েছিলেন।

এছাড়া দুটি ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদৌলাসহ তার সহযোগীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এ ধরনের আরও অসংখ্য অভিযোগে ১০ এপ্রিল বুধবার সোনাগাজী মডেল থানা থেকে তাকে প্রত্যাহার করা হয়।

ভিডিওঃ  ‘থানার ওসির কাছে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

৬ এপ্রিল শনিবার সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা কেন্দ্রে নুসরাত জাহান রাফি অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘটনাকে নানাভাবে ‘আত্মহত্যা’ বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। ঘটনার পর থেকে প্রকাশ্যে না বললেও আকারে-ইঙ্গিতে এ ঘটনাকে আত্মহত্যা হিসেবে রূপ দেয়ার চেষ্টা করেছেন বলে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।

ওই সময়ে তার রহস্যজনক আচরণে ক্ষুদ্ধ হয়ে পড়লেও ভয়ে কেউ মুখ খুলেননি। পরে ৯ এপ্রিল এ ঘটনা তদন্তে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইডি খন্দকার গোলাম ফারুক সোনাগাজীর ওই মাদ্রাসায় এলে ওসির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ডিআইজি গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাব না দিলেও ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন উত্তেজিত হন। পরদিন দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তাকে প্রত্যাহার করা হয়।

ভিডিওঃ  শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করবোঃ নুসরাত (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

এর আগে ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে অধ্যক্ষ শ্রেণিকক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠলে দুজনকে থানায় নিয়ে যান ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। ওসি নিয়ম ভেঙে জেরা করতে করতেই নুসরাতের বক্তব্য ভিডিও করেন। মৌখিক অভিযোগ নেয়ার সময় দুই পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেলেও সেখানে নুসরাত ছাড়া অন্য কোনো নারী বা তার আইনজীবী ছিলেন না। ভিডিওটি প্রকাশ হলে অধ্যক্ষ ও তার সহযোগীদের সঙ্গে ওসির সখ্যতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

ভিডিওতে দেখা যায়, থানার ওসির সামনে অঝোরে কাঁদছিলেন নুসরাত। আর সেই কান্নার ভিডিও করছিলেন সোনাগাজী থানার ওসি। নুসরাত তার মুখ দু’হাতে ঢেকে রেখেছিলেন। তাতেও ওসির আপত্তি। বারবারই ‘মুখ থেকে হাত সরাও, কান্না থামাও’ বলার পাশাপাশি তিনি এও বলেন, ‘এমন কিছু হয়নি যে এখনও তোমাকে কাঁদতে হবে।’

থানার ভেতরে নুসরাতকে জেরা করে ওসি বলেন, ‘কিসে পড়া? ক্লাস ছিল?’ ঘটনা জানাতে গিয়ে নুসরাত বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। সে সময় তাকে জিজ্ঞেস করা হয়- ‘কারে কারে জানাইসো বিষয়টা?’

নুসরাত যখন জানায়- তাকে অধ্যক্ষ ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। তখন প্রশ্ন করা হয়- ‘ডেকেছিল, নাকি তুমি ওখানে গেছিলা?’ পিয়নের মাধ্যমে ডেকেছিল বলে নুসরাত জানালে প্রশ্ন করা হয়- ‘পিয়নের মাধ্যমে ডেকেছিল? পিয়নের নাম কী?’ নুসরাত সে সময় পিয়নের নাম বলেন- ‘নূর আলম।’

পুরো ভিডিও জুড়েই নুসরাত কাঁদছিলেন। একসময় ভিডিওধারণকারী তাকে ধমকের সুরে বলে- ‘কাঁদলে আমি বুঝবো কী করে, তোমাকে বলতে হবে। এমন কিছু হয়নি যে তোমাকে কাঁদতে হবে।’

ভিডিও’র শেষে নুসরাতের কথা বলা শেষ হলে ধারণকারী বলেন- ‘এইটুকুই?’ আরও কিছু অশালীন উক্তির পাশাপাশি তাকে উদ্দেশ করে বলেন- ‘এটা কিছু না, কেউ লিখবেও না তোমার কথা। আমি আইনগত ব্যবস্থা নেব। কিছু হয়নি। রাখো। তুমি বসো।’

নুসরাতের জেরা করার সময় ভিডিও করা কতটুকু আইনসম্মত এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সর্বমহলে। এ বিষয়ে আইনজীবীরা বলছেন, যৌন হয়রানির অভিযোগ করার সময় ওসির ভিডিও ধারণের ঘটনায় ওসির বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা করার সুযোগ রয়েছে নুসরাতের পরিবারের।

ওসির এ ধরনের আচরণের বিষয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষ বলছে, আইন না মেনে অভিযোগ করতে যাওয়া কারোর ভিডিও করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ আছে।

এর আগে বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় না ফেরার দেশে চলে যান ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি (১৮)। চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টার পরও তাকে বাঁচানো গেল না। টানা ১০৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে হার মানেন এই ছাত্রী।

ভিডিওঃ  নুসরাতের আগে সিরাজউদ্দৌলার শ্লীলতাহানির শিকার হন আরও এক ছাত্রী বল্লেনঃ প্রভাসক আবুল কাশেম (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

প্রসঙ্গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজীতে পরীক্ষাকেন্দ্রের ভেতর ওই ছাত্রীর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যাচেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। শনিবার সকালে সোনাগাজী পৌর এলাকার ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসাকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। ওই ছাত্রী ওই মাদ্রাসা থেকেই আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন।

পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত কক্ষ থেকে ছাদে ডেকে নিয়ে কয়েকজন বোরকাপরা নারী পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ করেছেন ওই শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যরা।

তারা জানান, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে দায়ের করা মামলা তুলে না নেয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে। এ তথ্য ফেনী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্থানীয় পুলিশকেও জানিয়েছেন নুসরাত। তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় এদিন বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের ১০২ নম্বর কক্ষে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। তাকে লাইফ সাপোর্ট দেয়া হয়। এরপর না ফেরার দেশে চলে যান মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি।

উৎসঃ ‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ এক প্রতিবাদী যোদ্ধার বিদায় (ভিডিও সহ)


শেষবারের মতো ফিরলেন তার প্রিয় সোনাগাজীতে। যে পিচঢালা রাস্তা, গ্রামের শ্যামল পথে পায়ে হেঁটে মাদরাসা থেকে ফিরতেন বাড়িতে, সে পথেই ফিরলেন নিজ ভূমে। নিথর দেহে, লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে করে। সাইরেন বাজিয়ে। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন যেন বাজছিল প্রতিবাদের কণ্ঠ হয়ে। জীবন দিয়ে প্রতিবাদ করে নুসরাত জানান দিলেন মানুষ মরলেও প্রতিবাদের ভাষা মরে না।

অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার অন্যায় অবিচারের প্রতিকার চেয়ে থানা-পুলিশে গিয়েছিলেন নুসরাত। মাদরাসা কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছিলেন।

তখন কেউ সাড়া দেয়নি। গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু সন্ত্রাসের আগুনে লাশ হওয়া নুসরাতের শেষ বিদায়ে সাড়া দিয়েছে সোনাগাজীর হাজার হাজার মানুষ। তারা যেন নুসরাতের প্রতিবাদেরই সঙ্গী। হাজারো মানুষ ভালবাসা আর অশ্রুজলে শেষ বিদায় জানিয়েছে প্রতিবাদী নুসরাতকে। নুসরাতের এই শেষ যাত্রায় সঙ্গী পুরো দেশ। পুরো দেশের মানুষ। সবার মুখে মুখে বর্বর এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ। বিচারের দাবি। প্রতিবাদী মানুষজন বলছেন, জীবন দিয়ে নুসরাত প্রতিবাদের যে দ্বীপ শিখা জ্বেলে গেলেন তা হাল সময়ে নির্যাতন নিপীড়নের প্রতিবাদের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

ভিডিওঃ  শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করবোঃ নুসরাত (ভিডিও সহ)’

[সংবাদের ভিডিওটি দেখতে প্লে বাটনে ক্লিক করুন]

গতকাল বিকালে সোনাগাজী সাবের মোহাম্মদ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাদির কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে নুসরাত জাহান রাফিকে। নিজের মাদরাসা অধ্যক্ষের হাতে শ্লীলতাহানির শিকার হয়ে মামলা করার কারণে পরীক্ষা কেন্দ্রে অগ্নি সন্ত্রাসের শিকার হন নুসরাত জাহান। আগুনে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার পর ৫ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে বুধবার রাতে না ফেরার দেশে চলে যান নুসরাত। গতকাল সকালে ময়নাতদন্ত শেষে দুপুরে লাশ নিয়ে সোনাগাজীর উদ্দেশ্যে রওনা দেন নুসরাতের স্বজনরা। এদিকে সকাল থেকে নুসরাতের গ্রামের বাড়িতে ভিড় করতে থাকেন স্বজন ও এলাকাবাসী। বিকালে লাশবাহী গাড়ি গ্রামে পৌঁছার পর এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। কান্নার রোল পড়ে বাড়িজুড়ে। অস্বচ্ছল পরিবারে বেড়ে ওঠা নুসরাত চেয়েছিলেন উচ্চ শিক্ষা শেষে পরিবারের হাল ধরতে। আলীম পরীক্ষা শেষে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং করতে যাওয়ার কথা ছিল। স্বপ্ন ছিল একদিন বাবা-মায়ের কষ্ট ঘোঁচাবেন, পরিবারের পাশে দাঁড়াবেন। কিন্তু এই স্বপ্নচারি তরুণীর কষ্টের জীবন কষ্টেই শেষ হলো। বিকাল পাঁচটা নাগাদ তার মরদেহ বহনকারী গাড়িটি চর চান্দিয়ায় গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়।

প্রিয় কন্যার লাশ নিয়ে ঘরে ফিরলেন বাবা একেএম মূসা মানিক। অশ্রুসজল নয়নে কন্যাহারা পিতার সাথে কথা বলবার ভাষা ছিল না কারো মুখে। নুসরাতের বাবাকে শুধু দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নেন স্বজন, প্রতিবেশিরা। তাতেও শোক যদি কিছুটা কমে। নুসরাতের দুই ভাই রায়হান ও নোমান বোনের শোকে সংজ্ঞা হারাচ্ছিল বারবার। বোনহারা ভাইদের শোকে যেন পাথর চাপা পড়েছে পুরো বাড়িতে। যে পুলিশ, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিরা বেঁচে থাকতে নুসরাতকে নিরাপত্তা দিতে পারেননি তারা ছিলেন সজাগ। চর চান্দিয়া ছোট হুজুরের বাড়িতে নুসরাতদের উঠোন উপচে পড়া মানুষের ঢল।

তবে, স্বজন ও প্রতিবেশি ছাড়া কাউকে নুসরাতের লাশ দেখতে দেয়া হয়নি। নুসরাতকে শেষবারের মতো একনজর দেখতে আসা মানুষদের চাপ সামলাতে বেগ পেতে হয়েছে পুলিশ-প্রশাসনের। প্রাণহীন নুসরাতকে নিয়ে তাদের এমন তৎপরতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে। এলাকাবাসী ও নুসরাতকে দেখতে আসা জনগণ প্রশ্ন তোলেন, প্রতিবাদ জানানোর পরও পুলিশ প্রশাসন কেন ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো পরিকল্পিত আগুন লাগানোর ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন বিক্ষুব্ধ অনেকে। সে সময় উদ্যোগ নিলে হয়তো আজ আর নুসরাতের পৃথিবী ছেড়ে যেতে হতো না। তবে, এরপরও নুসরাত হত্যার ন্যায়বিচার চান এলাকাবাসী। বাদ আছর সোনাগাজী সাবের মোহাম্মদ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজায় অংশ নেন হাজার হাজার মানুষ। তার আগে বক্তব্য রাখেন জেলা পুলিশ সুপার, সোনাগাজী ইউএনওসহ বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি।

নুসরাতের বাবা তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মেয়ের পাশে থাকার জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। চিকিৎসায় সব ধরনের সহায়তা করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান। নুসরাত হত্যার বিচারের জন্য শেষ অবধি লড়ে যাওয়ার কথা বলেন তার ভাই নোমান। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মাঝখানে নুসরাতের হত্যার বিচার নিয়ে কথা উঠলে হাত তুলে সোচ্চার আওয়াজ তোলেন উপস্থিত জনতা। বিকাল ৫টা ৫৫ মিনিটে মেয়ের জানাজা পড়ান বাবা একেএম মূসা মানিক। সন্ধ্যা ছয়টা ২০ মিনিট নাগাদ চর চান্দিয়া ভূঞা বাড়ি পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় সোনাপুর ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে। গত শনিবার সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে কৌশলে ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। গত ২৭শে মার্চ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা করায় তার ওপর এ হামলা হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। গুরুতর অগ্নিদদ্ধ নুসরাতকে প্রথমে সোনাগাজী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরে ফেনী জেলা সদর হাসপাতালে নেয়া হয়।

অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে আনা হয়। তাকে বাঁচাতে ৫ দিন প্রাণান্ত চেষ্টা চালান চিকিৎসকরা। তার চিকিৎসার সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে বুধবার রাত সাড়ে নয়টায় মারা যান নুসরাত।

মর্গে স্বজনদের কান্না

আমাদের স্টাফ রিপোর্টার জানান, জরুরি বিভাগের মর্গ থেকে কেন্দ্রীয় মর্গে নুসরাতের লাশ আনা হয় সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে। লাল কাপড়ে ঢেকে নিয়ে যাওয়া হয় নুসরাতের মরদেহটি। এরপর সাড়ে ৯টার দিকে মর্গে আসেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান। এর পরপরই আসেন নুসরাতের এলাকা সোনাগাজীর চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটন। তিনি বলেন, নুসরাতের পরিবার সুরক্ষিত। তার পরিবারের ওপর নেই কোন চাপ। তিনি বলেন, সোনাগাজীতে যারা ঘাতক শিক্ষকের পক্ষে মিছিল করেছে বা মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছে তাদের সকলকে আইনের আওতায় আনা হবে।

সকাল ১০টা ৪২ মিনিটে নুসরাতের সুরতহাল প্রতিবেদন পেশ করেন শাহবাগ থানার এসআই শামসুর রহমান। ১১টার দিকে মর্গ চত্ত্বরে আসেন নুসরাতের বাবা একে এম মুসা মানিক। এসময় তার কান্নায় ভারি হয়ে উঠে পরিবেশ। তিনি বলেন, আমার মেয়ে হত্যার বিচার চাই। দেশের আইন অনুযায়ী হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ বিচার চাই। বিচার না হলে আমার মেয়ের আত্মা শান্তি পাবে না। এছাড়াও তিনি তার মেয়ের খোঁজ রাখার জন্য সকলের প্রতি ধন্যবাদ জানান। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতার কথা বারবার উল্লেখ করেন। কথা বলার মাঝে তিনি ফের কাঁদতে শুরু করেন।

লাশকাটা ঘরের পাশের ঘরে বসে বোনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। এদিকে বোনের শোকে বারবার মোর্চা যান ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান। নোমান বলেন, আমাদের ঘরের দেয়ালগুলো নুসরাতের দেয়াল লিখনে ভরা। যখনই ইচ্ছে হতো বাসার হার্ডবোর্ডে কলম কিংবা পেন্সিল দিয়ে আপন মনে লিখতেন ‘মা আমার চোখের মনি’। নুসরাত মাকে প্রচন্ড ভালোবাসতো। কোনো কারণ ছাড়াই মাকে জাড়িয়ে ধরতেন। ছোট বাচ্চাদের মতো মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে থাকতেন। মেহেদী পরতে খুব ভালোবাসতো নুসরাত। ও অনেক সুন্দর করে হাতে মেহেদীর আল্পনা আঁকতো। আমাদের একমাত্র বোন হওয়াতে কোনো কিছু বলার আগেই আমরা তা নিয়ে আসতাম। ওর কোনো চাহিদা আমরা অপূর্ণ রাখিনি। নুসরাত দুধ’চা খেতে প্রচন্ড ভালোবাসতো।

মর্গে সমবেদনা জানাতে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রটোকল অফিসার, কেন্দ্রীয় নেতা আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম। তিনি বলেন, আমাদের সমাজে ধর্মীয় লেবাসের কারণে অনেকে নানা ধরণের অন্যায় করে থাকেন। আর এই অন্যায়গুলো করে তারা বারবার পার পেয়ে যান। যার ফলে ধীরে ধীরে বড় অন্যায়ের দিকে ধাবিত হয় তারা।

বেলা ১২ টার কিছু সময় আগে ৩ জন চিকিৎসকের নেতৃত্বে শুরু হয় ময়না তদন্তের কাজ। শেষ হয় ১২টা ১৪ মিনিটে। নুসরাতের ময়না তদন্তের জন্য গঠিত বোর্ডের প্রধান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. সোহেল মাহমুদের সঙ্গে ছিলেন বোর্ডের দুই সদস্য প্রভাষক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস ও প্রভাষক ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস। সাড়ে ১২টার দিকে নুসরাতের কফিন নিয়ে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স ফেনীর সোনাগাজীর উদ্দেশে রওনা দেয়।

নুসরাত হত্যাকান্ডে জড়িতরা বিন্দুমাত্র ছাড় পাবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকান্ডে জড়িত কেউ-ই বিন্দুমাত্র ছাড় পাবে না। গতকাল সচিবালয়ে এক বৈঠক শেষে এ কথা জানান তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পিবিআই তদন্ত করছে, দ্রুত চার্জশিট দেয়া হবে। ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়ায় এবং অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগে প্রত্যাহার হওয়া সোনাগাজীর ওসিসহ যারাই জড়িত ও দোষী তাদের প্রত্যেককেই আইনের আওতায় আনা হবে। নুসরাত হত্যাকান্ডের ঘটনায় দোষী কেউ-ই বিন্দুমাত্র ছাড় পাবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ঘটনায় যারা অভিযুক্ত সিরাজ উদ্দৌলার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন করছেন, হয়তো তারা না জেনে করছেন। তদন্তসাপেক্ষে বিস্তর জানা যাবে। এদিকে নুসরাত হত্যাকান্ডের ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

নুসরাতের মামলা প্রয়োজনে ট্রাইবু্রনালে স্থানান্তর: আইনমন্ত্রী

আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, ফেনীর সোনাগাজীতে মাদরাসা অধ্যক্ষের নিপীড়নের পর আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মামলাটি প্রয়োজনে দ্রুত বিচার ট্রাইবু্রনালে স্থানান্তর করা হবে। গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক একথা বলেন। তিনি বলেন, যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে মামলাটি দ্রুত বিচারে যাবে। এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্নের প্রয়োজন হবে না জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, আপনারা জানেন এ ব্যাপারে মামলা হয়েছে। মামলার তদন্ত শেষে একটি অভিযোগপত্র দিতে হবে। আমি আপনাদের বলছি এ রকম মামলা যখনই হবে এটাকে ফাস্ট ট্রাক করবে। আমি প্রসিকিউশনকে নির্দেশ দেব, যাতে এটাকে ফাস্ট ট্রাক করা হয়। কোনো প্রশ্নেরও প্রয়োজন হবে না। এর আগে ১০৮ ঘণ্টা আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় মারা যান ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি।

নুসরাতের অগ্নিসংযোগকারীদের শাস্তি দাবি করেছে আওয়াজ

ফেনীর সোনাগাজীতে মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির শরীরে অগ্নিসংযোগকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠন আওয়াজ। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে আওয়াজের সভাপতি সেলিমা রহমান ও সাধারণ সম্পাদক ড. শাহিদা রফিক এ দাবি জানান। বিবৃতিতে তারা বলেন, মাদরাসা ছাত্রী নুসরাতকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। নুসরাতের এই মৃত্যু কোনও সভ্য সমাজে মেনে নেয়া যায় না। আর কোন নুসরাতকে যেন এমন পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে না হয় সেজন্য আমরা হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, নুসরাত পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও প্রতিবাদী কন্ঠস্বর হিসাবে বিজয়ীনির বেশে দৃপ্ত মহিমায় বিরাজ করছে আমাদের মাঝে, সারা বাংলাদেশে, সারা বিশ্বে।

নুসরাত নারীর অপমানকে প্রত্যাখান করে আমাদের চেতনাবোধকে উন্মোচিত করেছে, মানবতার জাগরন ঘটিয়েছে। তার এ প্রতিবাদীকন্ঠ এবং বলিষ্ঠ প্রতিবাদ এক উদাহরন হয়ে থাকবে। তারা নুসরাতের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ ও তার রুহের মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। বিবৃতিতে স্বাক্ষরদাতাদের মধ্যে রয়েছেন- বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সংগঠনের সভাপতি সেলিমা রহমান, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ড. শাহিদা রফিক, আওয়াজের সহ-সভাপতি প্রফেসর ড. তাজমেরী এস ইসলাম, সেলিনা রউফ, ফাতেমা সালাম, লায়লা বেগম, ফরিদা ইয়াসমিন, অধ্যক্ষ রফিকা আফরোজ, ওয়াহিদা আক্তার মুক্তা ও নাফিয়া লায়লা প্রমুখ।

উৎসঃ ‌মানবজমিন

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here