বিজিবির এ কেমন আত্মরক্ষা!

0
199

আমাদের সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ গুলি চালিয়ে সাধারণত একজন হত্যা করে। কখনও কখনও যে একাধিক হত্যার ঘটনা ঘটেনা তা বলার সুযোগ নেই। কিন্তু সাধারণ হিসেবে দেখা যায় নিহতের সংখ্যা ১। তা যে সীমান্তেই হোক। তবে এভাবে এক এক করে হত্যা করতে করতে এ সংখ্যা ঠিক কততে পৌঁছেছে আজ তা আলোচনা করবো না। ভবিষ্যতে কখনও বিশ্লেষণ ও গবেষণার চেষ্টা করবো।

আজ বিশ্লেষণের বিষয়টা ভিন্ন। ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার বকুয়া গ্রামে গত ১২ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার চোরাচালানে আসা গরু জব্দ করতে গিয়ে আমার দেশের বিজিবি গুলি চালিয়ে আমার দেশের অন্তত চারজন মানুষ হত্যা করেছে। বৃষ্টির মত গুলি চালানোর সময় নারী ও শিশুসহ অন্তত ২০ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এদের মধ্যে এখনও ৪ থেকে ৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সর্বমোট আহতের সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়ে গেছে।

বিজিবি গতকাল ১৩ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছে যে, নিজেদের আত্মরক্ষার্থেই নাকি তারা জনগণের উপর এভাবে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। এই খবর পড়ার পর অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছি। কারণ তাদের এই সংবাদ সম্মেলনের আগেই সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়েছিল। তাতে স্পষ্টই দেখা যায় যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের অনেক ধরণের সুযোগ থাকার পরেও আসলে কিভাবে বিজিবি জনগণের উপর গুলি ছুঁড়েছিল। অনেক ধরনের সুযোগগুলো কি তা পরিস্কার করতে কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই।

প্রথমত: যদি বিজিবির প্রথম দাবিই সত্য ধরে নিই যে, গরুগুলো ভারতীয়। এবং এগুলো সংঘবদ্ধ চোরাকারবারীরা অবৈধ উপায়ে এনেছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে- গরুগুলো যখন সীমান্ত অতিক্রম করেছে তখন বিজিবির এই বীর বাহাদুররা কোথায় ছিলেন? ওপাড়ের বিএসএফ বাবু আর এপাড়ের বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে কিভাবে বাংলাদেশের গ্রামে প্রবেশ করলো গরুগুলো?

দ্বিতীয়ত: তারপরও ধরে নিলাম ওনাদের কোন সুখনিদ্রার সুযোগ নিয়ে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারীরা গোরক্ষক দাদা বাবুদের গরু পাচার করে এনেছে। এবং তা উদ্ধার করে গোরক্ষার মহান দায়িত্ব পালন করতে চায় বিজিবি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- গরু উদ্ধার করতে গিয়ে এতগুলো মানুষকে গুলি করলেন কোন সাহসে? কার ইশারায়?

তৃতীয়ত: গরুগুলো যদি চোরাকারবারীদেরই হবে, তবে তা রক্ষায় কেন পুরো গ্রামবাসী এগিয়ে এল? পুরো গ্রামের মানুষ আপনাদের দাবি অনুযায়ী চোরদের পক্ষ নিয়েছে?

চতুর্থত: মানুষের চাইতেও কি গরুর দাম এত বেশি হয়ে গেল যে, ৫ টি গরু উদ্ধার করতে গিয়ে ৪ জনকে গুলি করে হত্যা এবং ২০ জনকে গুলিবিদ্ধ করতে হলো? অবশ্য বিজিবি দাবি করেছে আত্মরক্ষার্থে তারা ফাঁকা গুলি চালিয়েছে! আর সে ফাঁকা গুলির নমুনা হচ্ছে চার চারটি লাশ!

পঞ্চমত: ধরে নিলাম আপনাদের দাবিই সত্য। আপনারা সত্যিই গোরক্ষা করতে গিয়ে এ অদ্ভূত স্টাইলে ফাঁকা গুলি চালিয়েছেন। তো আপনাদের এই ফাঁকা গুলি তখন কোথায় থাকে, যখন স্রোতের মত ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবা দেশে প্রবেশ করে?

কিংবা যখন বিএসএফ এসে এদেশ থেকে এদেশের মানুষ ধরে নিয়ে যায়, সীমান্তে লুটপাট চালায়, পুশইন করে, অন্যায়ভাবে গুলি চালায় তখন এই ফাঁকা গুলি কোথায় থাকে?

ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের দাবি অনুযায়ী গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার জন্য ব্যবহৃত অস্ত্র এসেছে ভারত থেকে। জঙ্গি হামলায় ব্যবহৃত রাইফেল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলায় তৈরি করা হয়। শুধু কি এই অস্ত্র? এখন ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ থেকে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত পাতিনেতাদের হাত পর্যন্ত পৌঁছে গেছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। বিভিন্ন সংঘর্ষের সময় প্রায়শই তাদের এসব অস্ত্রের ছবি পত্রিকার পাতায় ছাপা হচ্ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এসব অস্ত্র বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পাড় হয়ে কিভাবে আসছে? কোথায় থাকে তখন তাদের এই ফাঁকা গুলি?

আমরা যারা সাংবাদিকতা করি তাদের তো কখনও একপক্ষের কথা শুনলে চলে না। আমরা বিজিবির প্রশ্নবিদ্ধ ও হাস্যকর বক্তব্য শুনেছি। এবার চলুন দেখা যাক ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরের বহরমপুর গ্রামবাসী কি বলছেন।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত হরিপুর উপজেলার বকুয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, দুপুর ১২টার দিকে বহরমপুর গ্রামের হুকুম হাজীর ছেলে হবিবর রহমান ২টি গরু ও রুহিয়া গ্রামের নাজিম ৩টি গরু জাদুরানী হাটে বিক্রির জন্য নিয়ে যাচ্ছিলেন। ওই সময় বেতনা সীমান্ত ফাঁড়ির বিজিবি সদস্যরা গরুগুলো আটক করে ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছিল। বৈধ কাগজ থাকা সত্ত্বেও কেন গরুগুলো নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা জানতে চাইলে আরিফ নামে বিজিবির এক সদস্য আমার পেটে রাইফেলের নল ঠেকায়। এ দৃশ্য দেখে গ্রামবাসী প্রতিবাদ করে। এ সময় বিজিবির সদস্যরা উত্তেজিত হয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করতে শুরু করে। এতে ঘটনাস্থলেই নবাব ও সাদেক মারা যান।

চরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এরফান আলী বলেন, এলোপাতাড়ি গুলিতে ৫ম শ্রেণীর ছাত্র জয়নুলের শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়। হরিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

হরিপুর উপজেলার জামুন গ্রামের গরু ব্যবসায়ী খায়রুল বলেন, কয়েকদিন ধরে বিজিবি এলাকায় গিয়ে বৈধ কাগজ থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় গরু দাবি করে ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছে। সোমবার বহরমপুর গ্রামের দাদন আলীর ছেলে ফারুক ও ধুমডাঙ্গী গ্রামের মোজাম্মেলের ছেলে মহবত আলী এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে লিখিতভাবে অভিযোগও করেন। আর পরদিনই এ ঘটনা ঘটল। জামুন গ্রামের কৃষক আবদুল মতিন বলেন, আমরা চোরাকারবার করি না। আমরা অল্প বয়সের গরু কিনে পালন করার পর তা বিক্রি করি। এ দিয়েই ছেলেমেয়েদের লেখাপড়াসহ সংসারের সব খরচ চালাই।

বহরমপুর গ্রামের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো: জহিরুল ইসলাম বলছিলেন, গ্রামের সাধারণ মানুষের ওপর বিজিবি উপর্যপুরি গুলি চালালে একজন এসএসসি পরীক্ষার্থীও নিহত হয়।

যে বাড়ি থেকে গরুগুলো উদ্ধার করা হয় সেই বাড়ির হবিবর রহমানের ছেলে ইয়াকুব আলী অভিযোগ করে বলেন, গরুগুলো আমরা নিলাম থেকে কিনেছিলাম। বিজিবিকে নিলাম থেকে কেনার টোকেনও দেখিয়েছি। তারপরও বিজিবি টোকেনসহ আমাদের গরু নিয়ে যায়। তাদের দাবি, টাকা আদায় করতেই দেশি গরুকে ভারতীয় বলছে বিজিবি।

যাইহোক, গোরক্ষা করতে নরহত্যা করার ঘটনা ভারতে প্রায়ই ঘটছে। তবে বাংলাদেশের এই ঘটনা ভারতের গেরুয়াদের নৃশংসতাকেও হার মানিয়েছে। কিন্তু এই ঘটনার পর সরকারের অবস্থান কি? অনেকটা ‘প্যারাসিটেমল দুই বেলা’র মত। চার জন নিহত হলেও পত্রিকায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নিহত তিনজনের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাশ দাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে।

গ্রামবাসীকে চোরাকারবারী আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন বিজিবির অধিনায়ক বীর বাহাদুর(!) লে. কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ। তবে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া উদ্দেশ্যমূলক গুলি চালানোর ভিডিওর ব্যাখ্যা কি তা হয়তো কখনই জানা হবে না আমাদের। হয়তো তাদের দায়ের করা মামলার কাগজ হাতে নিয়ে গ্রামকে অচিরেই পুরুষশূণ্য করবে কোতোয়াল বাহিনী। হয়তো আদালতের বারান্দায় দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে মূর্ছা যাবেন প্রতিবাদে অংশ নেয়া নিরীহ গ্রামবাসী। দিন শেষে আমার মত আপনারাও স্বীকার করে নেবেন যে, এই গোরক্ষক বীর বাহাদুরদের দেশে মানুষ না হয়ে গরু হয়ে জন্মানোই অপেক্ষাকৃত নিরাপদ।

হাসান রূহী
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

উৎসঃ ‌অ্যানালাইসিস বিডি

আরও পড়ুনঃ কার স্বার্থ রক্ষা করছে বিজিবি: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর


ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলায় বিজিবি ও গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষে চারজন গ্রামবাসী হতাহতের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি দাবি করেছেন বিএনপি মহসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এ দাবি জানান। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার বেতবনা সীমান্তে বিজিবি ও গ্রামবাসীদের মধ্যে সংঘর্ষে চারজন গ্রামবাসী নিহত ও অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছে। এ ঘটনায় আমি নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। কোন মানুষকেই বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা আইন সম্মত নয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অস্ত্র থাকলেই তা ত্বরিৎ প্রয়োগ করা সুশাসনের লক্ষণ হতে পারে না। বরং তা বেপরোয়া ও বেআইনী কর্মকান্ডেরই অংশ। মির্জা আলমগীর বলেন, সুদীর্ঘ সময় ধরে ভারতীয় বিএসএফ সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা করে আসছে। এর সঙ্গে দেশের বিজিবি-ও যদি যুক্ত হয় তাহলে সীমান্তবর্তী মানুষজনের জীবনের আর কোন নিরাপত্তা রইল না।

এখন জনগণ প্রশ্ন করছেÑ বিজিবি কার স্বার্থ রক্ষা করছে? বিএনপি মহাসচিব বলেন, এরকম পরিস্থিতি চলতে থাকলে বাংলাদেশে জঙ্গলের রাজত্ব স্থায়ীভাবে আসন লাভ করবে। গণসম্মতিহীন সরকার প্রতিষ্ঠিত থাকলেই কেবলমাত্র প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেআইনী কর্মকান্ড চালাতে উৎসাহী হয়। কারণ তাদের কোন জবাবদিহিতা করতে হয় না। তিনি বলেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে মধ্যরাতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে মহাভোট ডাকাতির মহা আয়োজন অনুষ্ঠিত করার জন্যই দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আইনানুগ কাজে অনীহা প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। গুম-খুন-অপহরণ-নারী শিশু নির্যাতন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে গিয়েই সামাজিক অপরাধীরা দেশব্যাপী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সামাজিক অনাচার এখন ভয়াবহ মাত্রা লাভ করেছে। আতঙ্ক ও ভয় দেশের মানুষকে গ্রাস করে ফেলেছে। দেশ এখন নৈরাজ্যের অন্ধকারে ডুবে গেছে। রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত সীমান্তবর্তী অঞ্চলেও রক্ত ঝরছে। ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে বলেই রক্তঝরার পরিমান দিনে দিনে বাড়ছে। মির্জা আলমগীর বলেন, এই অরাজক পরিস্থিতি চলতে পারে না। অত্যাচারিত জনগণের অন্ত:রুদ্ধ ক্ষোভ যেকোনো মূহুর্তেই বিস্ফোরিত হবে। দেশের মানুষ সকল ভয়ভীতি অতিক্রম করে দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করবেই। আমি ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার বেতনা সীমান্তে বিজিবি ও গ্রামবাসীদের মধ্যে সংঘর্ষে চারজন গ্রামবাসীর নিহত ও অসংখ্য মানুষের আহত হওয়ার ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শান্তির জোর দাবি করছি।

উৎসঃ ‌মানবজমিন

আরও পড়ুনঃ ঠাকুরগাঁওয়ে বিজিবির গুলির কারণ নিয়ে নানা বক্তব্য


ঠাকুরগাঁওয়ে সীমান্তবর্তী এলাকায় গরু আটক করাকে ঘিরে সংঘর্ষের সময় সীমান্তরাক্ষী বাহিনী বিজিবির গুলিতে তিনজন নিহত হয়েছে। এই ঘটনায় আহত হয়েছে আরো ১৭ জন।

ঘটনাটি ঘটেছে মঙ্গলবার দুপুরের দিকে হরিপুর উপজেলার গফুয়া ইউনিয়নের বহরমপুর গ্রামে। তবে সংঘর্ষের কারণ ও পটভূমি সম্পর্কে পরষ্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য বিপরীতমুখী দাবি সামনে রাখছে। খবর বিবিসি বাংলার

বিজিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্তবর্তী গ্রামে আজ হাটের দিনে কয়েকটি ভারতীয় চোরাই গরু আটক করা হলে ‘সশস্ত্র চোরাকারবারিরা’ বিজিবির সদস্যদের ওপর হামলা চালালে তখন তারা বাধ্য হয়ে গুলি চালায়।

অন্যদিকে, গ্রামবাসী বলেছে, গৃহস্থের বাড়িতে পালিত গরু আটক করা হলে সংঘর্ষ বাঁধে এবং তখন গ্রামের হাটে আসা শত শত মানুষের ওপর বিজিবি উপর্যপুরি গুলি চালায়।

স্থানীয় প্রশাসন ঘটনার একটি নিজস্ব তদন্ত করার কথা বলছে।

স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সংঘর্ষের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা সেখানে গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। স্থানীয় বাসিন্দারা তখন মরদেহগুলোকে নিয়ে সেখানে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন।

উত্তরে ভারতের সাথে সীমান্তবর্তী এই গ্রামটির হাটে দুপুরে যখন জমে উঠতে শুরু করেছে, তখন গরু আটক করা নিয়ে সংঘর্ষে বিজিবির গুলিতে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

ঠাকুরগাঁও জেলার পুলিশ সুপার মো: মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, বিজিবির সদস্যরা ভারতীয় গরু আটক করলে চোরাকারবারিরা সশস্ত্র হয়ে হামলা চালায়, তখন বিজিবি বাধ্য হয়ে গুলি চালালে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

তিনি বলেন, এখানে জাদুরানী নামে একটি হাট ছিল। এই হাটে অনেক সময় চোরাই গরু আসে। সেজন্য বিজিবি চেকপোস্ট বসিয়ে কয়েকটি ভারতীয় গরু চোরাই সন্দেহে আটক করে। আটক করে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার পথে সংঘবদ্ধ গরু চোরাকারবারী কয়েকশ মানুষ ইট-পাটকেল, রামদা নিয়ে বিজিবি সদস্যদের ওপর আক্রমণ করে।

এই আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য বিজিবি গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই দু’জন মারা যায়, আরেকজনকে হাসপাতালে নেয়ার পতে তার মৃত্যু হয়।

সংঘর্ষের খবর পেয়ে জেলা এবং পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেখানে গিয়েছিলেন। সে সময় ঘটনাস্থলে দু’জনের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ পড়েছিল। গ্রামের মানুষ তখনও মৃতদেহ ঘিরে বিক্ষোভ করছিল।

পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, তারা সেখানে স্থানীয়দের সাথে আলোচনা করেছেন এবং ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

স্থানীয় বিজিবির কর্মকর্তারাও বলেছেন, ভারতীয় গরু আটকের পর বিজিবির সদস্যদের ওপর চোরাকারবারি হামলা করলে তাদের শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে তারা বাধ্য হয়ে গুলি চালিয়েছে।

তবে ঐ গ্রামের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো: জহিরুল ইসলাম বলছিলেন, গ্রামের সাধারণ মানুষের ওপর বিজিবি উপর্যপুরি গুলি চালালে একজন এসএসসি পরীক্ষার্থীও নিহত হয়।

কেনা গরু, হয়তো বাড়িতে পালতেছে, এর পারমিট দেখায়। কিন্তু তারা পারমিট মানবে না। ওরা বলতেছে কেনা হলেও এগুলো আমরা নিয়ে যাবো। এগুলো কেনা না। হাটের দিন, এটা প্রধান রাস্তা। এই রাস্তা দিয়ে বহুলোক আবার চলে আসছে। জনগণ যে হাটে যাচ্ছে, এই সময় ওরা এলোপাথাড়ি গুলি করছে। আসলে যে ঘটনাটা ঘটেছে, এটা কিন্তু অমানবিক।

গ্রামবাসীর অভিযোগ কেনা গরুর চালান দেখানোর পরও বিজিবি সদস্যরা আটক করলে লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন গ্রামবাসী বলছিলেন, গ্রাম থেকেই গরু নিয়ে যাচ্ছিল বিক্রি করতে। একজোড়া গরু। দেশী গরুর মতো। সেটা আটক করলে ঝামেলা হয়।

সীমান্তবর্তী গ্রামটিতে মাঝে মাঝে গরু চোরাকারবারির বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। কিন্তু অনেকদিন পর মঙ্গলবার সেখানে হাটের জায়গা ঘিরে বিজিবি কয়েকটি তল্লাশি চৌকি বসিয়ে ব্যাপক অভিযানের প্রস্তুতি নিয়েছিল বলে গ্রামবাসীদের অনেকে বলছেন।

ঠাকুরগাঁওয়ের বিজিবির সংশ্লিষ্ট ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে: কর্নেল তুহিন মো: মাসুদ বলছিলেন, ভারত সীমান্তে চোরাকারবারিদের নিহত হওয়ার যেসব ঘটনা ঘটছে, তা কমিয়ে আনতে সীমান্তবর্তী ঐ অঞ্চলে তারা চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছেন।

তিনি বলছিলেন, কিছুদিন ধরেই সীমান্তে চোরাকারবারি বন্ধের জন্য অভিযান চলছে। এখানে যারা অপরাধী বা দোষী হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, এই চক্রের সাথে জড়িত অনেকে সুবিধাভোগী আছেন, তারা বিজিবির বিরুদ্ধে কিছু একটা করার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন বলে আমরা ধারণা করছি। এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে আজকে এই সংঘবদ্ধ তাদের এই আক্রমণ। তারা আমাদেরকে যেভাবে আক্রমণ করেছে,আমাদের যদি গুলি না করতো, তাহলে আমাদের সদস্যরা লাশ হয়ে ফিরে আসত।

এদিকে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রামটিতে থমথমে পরিবেশ থাকলেও পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

উৎসঃ ‌আরটিএনএন

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here