১৩তম তারাবিতে পঠিতব্য আয়াতের সারাংশ

0
141

আজ ১৩তম তারাবিতে সূরা কাহাফের ১০ম রুকুর শেষার্ধ থেকে শুরু করে পূর্ণ সূরা পঠিত হবে। সঙ্গে সূরা মরিয়ম এবং সূরা ত্ব-হা পুরোটুকুই পড়া হবে। পারা হিসেবে আজ পড়া হবে ১৬তম পারা।

পাঠকদের জন্য আজকের তারাবিতে পঠিত অংশের মূলবিষয়বস্তু তুলে ধরা হল।

১৮. সূরা কাহাফ : ৭৫-১১০

১০ম রুকর শেষার্ধ, ৭৫ থেকে ৮২ নম্বর আয়াতে হজরত মূসা (আ.) এবং হজরত খিজির (আ.) এর বাকী ঘটনা বলা হয়েছে।

১১তম রুকু। ৮৩ থেকে ১০১ নম্বর আয়াতে বিশ্বসম্রাট হজরত জুলকারনাইনের ঘটনা এবং এ থেকে আমাদের শিক্ষণীয় কী তা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে ইয়াজুজ-মাজুজের কথাও।
১২তম তথা শেষ রুকু। ১০২ থেকে ১১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ওই সব মানুষের কথা, যাদের আখেরাতে পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত ও ব্যর্থ হবে। এদের পরিচয় কী এবং এ শ্রেণীর বাইরে যারা তাদের প্রতিদান বলেই সূরা শেষ করা হয়েছে।

১৯. সূরা মরিয়ম : ১-৯৮

সূরা মরিয়ম নাজিল হয়েছে পবিত্র মক্কা নগরীতে। রুকু ছয়টি এবং আয়াত সংখ্যা ৯৮। আজকের তারাবিতে পূর্ণ সূরাই পঠিত হবে।

প্রথম রুকু, ১ থেকে ১৫ নম্বর আয়াত। সূরা শুরুই হয়েছে আল্লাহর নবী হজরত জাকারিয়া (আ.) এর সন্তান লাভের দোয়া দিয়ে। আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া কবুল করলেন এবং ইয়াহইয়া নামে একজন পুত্র সন্তান দানের সুসংবাদ দিলেন। এ সন্তান পরবর্তীতে উলুল আজম পয়গম্বর হয়েছিলেন।

দ্বিতীয় রুকু, ১৬ থেকে ৪০ নম্বর আয়াত। হজরত মরিয়ম (আ.) কীভাবে হজরত ঈসা (আ.)কে প্রসব করেছেন, প্রসব পরবর্তী পরিস্থিতি কেমন ছিলো তা বলা হয়েছে বিস্তারিতভাবে।

তৃতীয় রুকু, ৪১ থেকে ৫০ নম্বর আয়াত। এখানে হজরত ইবরাহিম (আ.) এর কথা বলা হয়েছে। তিনি তার পিতার সঙ্গে কীভাবে দাওয়াতি কাজ করেছেন তা জানানোই মূল উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে হয়।

চতুর্থ রুকু। ৫১ থেকে ৬৫ নম্বর আয়াতে হজরত মুসা, ইসমাইল, ইদরিস এবং নূহ (আ.) এর কথা সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে।

পঞ্চম ও ষষ্ঠ তথা শেষ রুকু, ৬৬ থেকে ৯৮ নম্বর আয়াত। এবার আল্লাহপাক বলছেন, আগের এতসব উদাহরণ মানুষের সামনে প্রজ্জোল, তারপরও তারা সত্যের প্রতি ইমান আনে না! যারা সত্যের প্রতি ইমান রাখে না তাদের পরকাল কেমন হবে, আর যারা সত্যের প্রতি বিশ্বাসী তাদের পরকাল কেমন হবে- এ দু’দলের আলোচনার মাধ্যমে সূরা শেষ করা হয়েছে।

২০. সূরা ত্ব-হা : ১-১৩৫

আগের সূরার মত এ সূরাও মক্কায় নাজিল হয়েছে। এর আয়াত সংখ্যা ১৩৫ এবং রুকু মোট আটটি।

প্রথম রুকু। ১ থেকে ২৪ নম্বর আয়াতে কোরআনের মাহাত্ম্য বলার পর হজরত মুসা (আ.) এর আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি কীভাবে নবুয়তি লাভ করেন সে ঘটনা বলা হয়েছ এখানে।

দ্বিতীয় রুকু। ২৫ থেকে ৫৪ নম্বর আয়াতে হজরত মুসা (আ.) নবুয়ত পাওয়ার পর তার কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন তা বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মুসা (আ.)কে এও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন কেমন ছিলো তার অতীত। কীভাবে আল্লাহ তায়ালা জন্মের আগে থেকেই তাকে হেফাজত করে আসছিলেন। অতএব আল্লাহর কাজে তাকে আরো সতর্ক এবং সচেতন হতে হবে।

তৃতীয় ও চতুর্থ রুকু। ৫৫ থেকে ১০৪ নম্বর আয়াতে আগের রুকুর ধারাবাহিকতায় আলোচনা এগিয়ে নেয়া হয়েছে। মুসা (আ.) এর দাওয়াতের পদ্ধতি এবং তার উম্মতের প্রকৃতিও বর্ণনা করা হয়েছে এ অংশে।

ষষ্ঠ রুকু। ১০৫ থেকে ১১৫ নম্বর আয়াতে যারা জানতে চায় কেয়ামত কবে হবে তাদের প্রশ্নের জবাব এবং হেদায়াতি নসিহত করা হয়েছে।

সপ্তম রুকু। ১১৬ থেকে ১২৮ নম্বর আয়াতে হজরত আদম এবং ইবলিসের ঘটনা বলা হয়েছে। ইতিপূর্বে কয়েকটি সূরায় এ বিষয়ে আলোচনা এসেছে। বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির কারন হলো মানুষকে সতর্ক ও সচেতন করা। এরপরও যারা সতর্ক হবে না, শয়তানের ধোঁকায় পড়ে জীবন শেষ করবে তাদের আখেরাতের জীবনের ভয়াবহতা উল্লেখ করা হয়েছে।

অষ্টম রুকু। ১২৯ থেকে ১৩৫ নম্বর আয়াতে মোমিনদের উদ্দেশ্যে সংক্ষেপে নসিহত করা হয়েছে। তারপর হাশরের দিন পাপীদের অবস্থা কী হবে- তা বলেই সূরা শেষ করা হয়েছে।

উৎসঃ ‌‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ ‌আমি যেন পাই জান্নাত


আজ পঞ্চম রোজা। আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাই আমরা সুন্দরভাবে ৪টি রোজা শেষ করতে পেরেছি। প্রিয় পাঠক, রোজা রেখে গুনাহ মাফ করাতে হলে একটি কাজ আমাদের করতেই হবে, তা হল ইহতিসাব।

বুখারি শরিফে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘মান সামা রামাদানা ইমানাও ওয়া ইহতিসাবান গুফিরা লাহু মা তাকাদ্দামা মিন জামবিহি, অর্থ : যে ব্যক্তি বিশ্বাস ও আত্মোপলব্ধির সঙ্গে রোজা রাখবে, আল্লাহতায়ালা তার পেছনের জীবনের সব গুনাহ মাফ করে দেবেন। (বোখারি)।

হাদিসে বর্ণিত ‘ইহতিসাব’ শব্দের অর্থ আত্মোপলব্ধি-আত্মসমালোচনা। আমাদের শুধু রোজা রাখলেই চলবে না। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে নিজেকে নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। রোজার শুরুতে আমি কেমন ছিলাম? এখন কতটুকু উন্নয়ন করেছি? আগে তো আমার ভেতর এ দোষ ছিল। রোজা এসে কি আমাকে একটু হলেও বদলাতে পেরেছে? আগে আমি ঘুষ নিতাম, দুর্নীতি করতাম, মিথ্যা বলতাম, এখন কি তা কমে এসেছে? যদি আস্তে আস্তে কমে আসে, যেমন আগে যদি আপনি দিনে একশ’টা মিথ্যা বলতেন এখন বলেন নব্বইটা, এভাবে নিজেকে চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে একজন ভালো মানুষ হওয়ার প্রাণপণ সাধনা করতে পারেন- তাহলে আল্লাহপাক আপনাকে সুখবর দিচ্ছেন, বান্দা! তোমার পেছনের জীবনের সব ভুল আমি ক্ষমা করে দিলাম।

রোজা রেখে উপলব্ধি করতে হবে, মানুষকে-মানুষের জীবনকে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত না খেয়ে থাকাটা বেশ কষ্টসাধ্য ইবাদত। তো আমি-আপনি তো ১২-১৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকি, যেসব হতভাগা বনি আদম জীবনজুড়েই না খেয়ে থাকে, তাদের কষ্টটা কেমন? আমরা তো রোজা রেখে ইফতারে গলা ডুবিয়ে খেয়ে নিই, কিন্তু ওই গরিব মানুষ, যাদের জীবনে কোনো ইফতারের জমকালো ভোজ নেই, নেই সাহরিতে রাজকীয় আয়োজন, তাদের অবস্থা কেমন? এখানে একটি কথা আপনাদের বলে নিই।

এই যে ইফতারে আমাদের এত বাহারি আয়োজন আর সাহরিতে রাজকীয় ভোজ- এ দুটোর একটাও রোজার নিয়মের সঙ্গে যায় না। নবীজি (সা.) প্রায় সময় শুধু খেজুর, পানি আর দুধ দিয়ে ইফতার করতেন। নতুবা শুধু খেজুর খেয়েই নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন।

সুফিরা বলেন, রোজার উদ্দেশ্য হল, নফসকে দুর্বল করে মানুষের কাম-ক্রোধকে নিভিয়ে দেয়া। রুহকে শক্তিশালী করা। কিন্তু কেউ যদি দিনের বেলা না খয়ে থাকাটা রাতে খেয়ে পুষিয়ে নেন, তাহলে কিন্তু এই রোজা দিয়ে না নফসকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে, না তার রুহকে জাগিয়ে সুন্দর মানুষ হতে পারবে।

আরেকটি বিষয় হল, চিকিৎসাবিজ্ঞানীরাও খুব সতর্ক করে বলেছেন, মানুষ যখন উপবাসব্রত করে, তখন তার কোনোভাবেই অতিরিক্ত খাওয়া উচিত নয়। ওই দিনগুলো সে রাতে অবশ্যই সীমিত খাবার খাবে। তাহলে দেহ সুস্থ থাকবে। ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে। নতুবা, তার দেহে নানান জটিলতা দেখা দেবে।

এবার একটি বাস্তব উদাহরণ দেখুন। প্রতিদিন দুপুরে আমরা ভাবি, এখন বেশ ক্লান্ত লাগছে। ইফতারের পর কাজকর্ম-পড়ালেখা-ইবাদত-বন্দেগি সব করব। কিন্তু ইফতারের পর অবস্থা এমন হয় যে, মাগরিবের নামাজ পড়তেই কষ্ট হয়ে যায়। কেন? ওই যে, রাসূলের মতো ইফতার করি না। রোজা রেখেছি ঠিক, আত্মোপলব্ধি করিনি। ইহতিসাব করিনি।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, শুধু রোজা রাখলেই হবে না, মনের গভীর থেকে রোজা বুঝে উপলব্ধি করলেই আমরা রোজার প্রকৃত বরকত ও ফায়দা অর্জন করতে পারব। যারা এভাবে রোজা রাখবেন, তাদের জন্যই রাসূল (সা.) সুখবর দিয়ে বলেন, জান্নাতের একটি দরজা আছে, রাইয়ান। যে দরজা দিয়ে শুধু রোজাদাররাই প্রবেশ করতে পারবে। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের রাইয়ান দরজা দিয়ে বেহেশতে যাওয়ার তাওফিক দিন।

লেখক : সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক

উৎসঃ ‌‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ ‌অন্তত এ মাসে হালাল খাই


ব্যবসায়ীরা নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে বড়লোক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হন রমজান এলেই। একজন মুসলমান ব্যবসায়ীর রমজানকেন্দ্রিক এমন প্রস্তুতি লজ্জার। কারণ পণ্য মজুদ করে দাম বাড়ালে সে ব্যবসায়ীর প্রতি আল্লাহতায়ালা ক্ষুব্ধ হন এবং তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

সঠিকভাবে ব্যবসা করলে দুনিয়ার রিজিকে বরকত পাওয়ার পাশাপাশি হাশরের ময়দানেও পুরস্কৃত হওয়া যাবে। তাকে করা হবে নবীদের সঙ্গী। রাসূল (সা.) বলেন, ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীদের হাশর হবে নবীগণ, সিদ্দিকগণ ও শহীদগণের সঙ্গে।’ [তিরমিজি : ৩/৫১৫]।

যাদের ওপর জাকাত ফরজ, তাদের আগে থেকেই রমজানকেন্দ্রিক জাকাতের পরিকল্পনা করে নেয়া উচিত। রমজানে ওমরাহর বিশেষ ফজিলত রয়েছে। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘রমজান মাসে একটি ওমরাহ আদায় করা একটি ফরজ হজ আদায় করার সমান।’ [বুখারি : ৩/২২২]। এ জন্য অর্থনৈতিকভাবে সামর্থ্যবানদের উচিত রমজানে ওমরাহের নিয়ত করে এর প্রস্তুতি নেয়া।

রমজানে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি রাখতে হবে হালাল রিজিকের প্রতি। আর এ জন্য প্রয়োজন হালাল উপার্জন করা। অন্তত একটি মাসে হালাল রিজিকের প্রতি যতœবান হোন। এ মাসে যে খাবারটা মুখে যাবে, তা হালাল হওয়া চাই। এমন যেন না হয় যে, রোজা তো রেখেছি আল্লাহর জন্য, কিন্তু ইফতার করছি হারাম দিয়ে। অনেক মানুষ আছেন, যাদের আয়ের উৎস মূলত হারাম নয়, কিন্তু যতœবান না হওয়ার কারণে হারামের সংমিশ্রণ হয়ে যায়। তাদের যত্নশীল হতে হবে।

আবার অনেক মানুষ আছেন, যাদের আয়ের উৎস পুরোটাই হারাম, তাদের জন্য হারাম থেকে বেঁচে থাকাটা খুবই কঠিন। তবে সম্ভব হলে তারা এক মাসের জন্য ছুটি নিয়ে নেবেন এবং অন্য কোনো হালাল পেশা গ্রহণ করবেন।

তা না হলে অন্তত কারও কাছ থেকে ঋণ নিয়ে হলেও নিজের এবং পরিবারের লোকদের জন্য রমজান মাসে হালাল রিজিকের ব্যবস্থা করুন। এটা রমজানের দাবি। আমরা কেউ চাই না দুর্ভাগা হিসেবে নিজেকে দেখতে। তাই আসুন রমজানে পবিত্র হই। হতে পারে রমজানের কল্যাণে চিরদিনের জন্য পবিত্র বনে গেলেন আপনি।

উৎসঃ ‌‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ ‌মাহে রমজানে আসুন নিজেকে বদলে ফেলি


প্রতিবছরই আসে পবিত্র মাহে রমজান। আমরা চেষ্টা করি বেশি বেশি ইবাদত করার। উদ্দেশ্য একটাই, যাতে গুনাহর পরিমাণ কম হয়। কারণ মাহে রমজানে সবকিছুই ৭০ গুণ বেড়ে যায়।

কেউ এ মাসে একটা ফরজ আদায় করলে যেমন বছরের অন্য মাসে ৭০টি ফরজ আদায়ের সওয়াব তার আমলনামায় লেখা হয়, তেমনি এ মাসে একটা গুনাহের কাজ করলেও অন্য মাসের ৭০টি গুনাহ্ তার আমলনামায় যোগ হয়।

কিন্তু সমস্যা হল রোজা আসে, আবার বিদায় নেয়। আমাদের স্বভাবের পরিবর্তন হয় না কেন? এটা বুঝলেই সমাজে ও মানুষের দিলে বা কলবে পরিবর্তন আসবে।

ইবাদতের কতগুলো কঠিন শর্ত রয়েছে যেগুলো পালন করতেই হবে। যেমন- তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করতে হবে। এ তাকওয়া আসবে তখনই যখন আপনি গিবত বা পরনিন্দা করবেন না, হারাম উপার্জন করবেন না। সুদ, ঘুষ, হিংসা থেকে দূরে থাকবেন। সমাজে দেখা যাচ্ছে পবিত্র রমজান মাসেও ঘুষ খাওয়া কমে না, মজুদদারি কমে না, অপরের হক জেনে-শুনে নষ্ট করছি। কারণটা কী?

আমাদের সমাজে, মহল্লায় ও রাষ্ট্রে তাকওয়া অর্জনে সবচেয়ে বড় বাধা গিবত, হারাম খাওয়া এবং হিংসা করা। গিবত মানবদেহের জন্য ক্যান্সারের মতো। ক্যান্সার যেমন শরীরের কোষগুলোকে খেয়ে ফেলে, গিবত তেমনি কুরে কুরে একজন মুসলমানের সব নেকি খেয়ে ফেলে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা একে অপরের গিবত কর না। তোমরা কি কেউ আপন মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করতে পছন্দ কর?’- সূরা হুজরাত (৪৯) : ১২।

নামাজ কবুল হওয়ার প্রতিবন্ধক হল গিবত। তাহলে পবিত্র রমজানে এত কষ্ট করে ২০ রাকাত তারাবির নামাজ পড়ে লাভ কী হবে?

তার পর আসি হালাল উপার্জন সম্পর্কে। এ ব্যাপারে বহু হাদিস রয়েছে। হাদিসে আছে, ‘হালাল রুজি ইবাদতের পূর্বশর্ত।’ (মুসলিম : ২২১৮)। মাহে রমজানে অনেকে অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে ফেতরা, জাকাত দিয়ে থাকেন। হজরত (সা.) এরশাদ করেন, ‘হারাম উপার্জনের সদকা কবুল হয় না।’ (মুসলিম : ৫৫৭)। আরও আছে, ‘হারাম খেয়ে যে শরীর হৃষ্টপুষ্ট হয় তা জান্নাতে যাবে না।’ (তারগিব : ৯৬৭)।

হিংসা করলেও কোনো ইবাদত কবুল হবে না। বলা হয়, হিংসা সাপের বিষের চেয়েও ভয়াবহ। সাপ কখনও নিজের বিষে মরে না, কিন্তু হিংসুক হিংসায় জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যায়।

কাজেই গিবত, হারাম খাওয়া এবং হিংসা- এ তিনটি কঠিন কবিরা গুনাহ্ থেকে বাঁচতে পারলে লোভ, অহঙ্কার, পরের হক নষ্ট, অশ্লীলতা ইত্যাদি পাপগুলো থেকে আল্লাহ পাকই রক্ষা করবেন, যদি আমাদের নিয়ত সহিহ্ হয়।

অথচ এ সত্যি কথা আজকের বেশিরভাগ ইমাম, মাওলানা সাহেব মসজিদে বলেন না। এ সব কথা বলে মানুষকে সচেতন করবেন তো আলেম ওলামারা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেন। অথচ তাদের সত্য কথা বলা উচিত। কালামে পাকে আছে, ‘আল্লাহ মিথ্যাকে মুছে ফেলেন ও তার বাণী দিয়ে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেন।’ (৪২, সূরা শূরা : ২৪)। আরও বর্ণিত আছে, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিও না আর জেনে-শুনে সত্য গোপন করো না।’ ( ২ সূরা বাকারা : ৪২)। অথচ প্রায় সব ইমাম, মাওলানারা নিজেদের স্বার্থে চুপ করে থাকেন।

আজকাল মসজিদ কমিটিগুলো দখলদারদের হাতে বন্দি। একশ্রেণীর কুটিল চরিত্রের প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রণ করছে অধিকাংশ মসজিদ। তারাই সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ ইত্যাদি। মসজিদ এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আর্থিক লাভ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দেখা যায় বড় নদীর আশপাশে জমি দখল করেই মসজিদ বানায়, পাশেই তিনতলা মাদ্রাসা ভবন তৈরি করা হয়েছে। উদ্দেশ্য যাতে পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ করা না যায়। ধর্মের নামে মানুষের ওপর জুলুম করছে একশ্রেণীর অল্প শিক্ষিত মোল্লা মুনশিরা। পবিত্র ধর্ম ইসলাম আজ অপবিত্র হচ্ছে স্বজনপ্রীতিতে। এসব করলে রমজানে মানুষ শুদ্ধ হবে কীভাবে?

মাহে রমজান হল তাকওয়া অর্জনের মাস। বছরের ১১ মাস হারাম খেয়ে, গিবত করে আর পকেটে ঘুষ নিয়ে শুধু পবিত্র মাহে রমজানে রোজা রেখে, আর রাতে দামি নকশাদার পাঞ্জাবি গায়ে ২০ রাকাত তারাবিহ পড়ে চরিত্র বদলানো যাবে কি? মন পাল্টানো যাবে কী?

হে সায়েম, প্রিয় ভাই আমার আসুন, খাস দিলে তওবা করি। পবিত্র কোরআনে আছে, ‘কিন্তু যারা তওবা করে আর নিজেদের সংশোধন করে এবং আল্লাহ্র আয়াতকে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে, এরাই তো তারা যাদের আমি ক্ষমা করি এবং আমি ক্ষমাকারী, পরম দয়ালু।’ (২, সূরা বাকারা : ১৬০)। এখনই তওবা করে পবিত্র হই, তাকওয়া সম্পন্ন মানুষ হই। পবিত্র মাহে রমজানে নিজেদের এমনভাবে বদলাই যেন বছরের বাকি মাসগুলোয়ও মুমিন বান্দার মতো জীবন কাটাতে পারি।

উৎসঃ ‌‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ ‌পঞ্চম তারাবিতে পড়া আয়াতের সারাংশ


আজ পঞ্চম তারাবিতে সুরা মায়েদার এগারতম রুকুর শেষার্ধ থেকে শুরু করে সুরার শেষ রুকু, ৮৩ থেকে ১২০ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পড়া হবে। সঙ্গে সুরা আনআমের পুরো অংশ এবং পরবর্তী সুরা আরাফের দ্বিতীয় রুকুর প্রথম আয়াত , ১ থেকে ১১ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পড়া হবে।

পারা হিসেবে আজ পড়া হবে সাত পারা থেকে শুরু করে আট পারার প্রথমার্ধ। পাঠকদের জন্য আজকের তারাবিতে পঠিত অংশের মূলভাব তুলে ধরা হল।

৫. সূরা মায়েদাহ: ৮৩-১২০

এগারতম রুকুর শেষার্ধ, ৮৩ থেকে ৮৬ নম্বর আয়াতে আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা সত্যনিষ্ঠ, তাদের প্রশংসা করা হয়েছে।

বলা হয়েছে, এসব জ্ঞানীরা আল্লাহর আয়াত শুনে অশ্রুবিগলিত হয়ে পড়ে। তারা বলে, হে আল্লাহ! এ মহাসত্যের সাক্ষী হিসেবে আমাদের তুমি কবুল করে নাও। এদের পুরস্কার হিসেবে জান্নাত দেয়া হবে বলে ওয়াদা করেছেন আল্লাহ তায়ালা। বারতম রুকু, ৮৭ থেকে ৯৩ নম্বর আয়াতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান দেয়া হয়েছে। কসম-শপথ ভাঙার কাফফারা, মদ-জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্যনির্ণায়ক তীর বা পাশা হারাম করা হয়েছে এ রুকুতে।

তেরতম রুকু, ৯৪ থেকে ১০০ নম্বর আয়াতে ইহরাম অবস্থায় শিকার নিষেধ করা হয়েছে। কেউ যদি ইহরাম অবস্থায় শিকার করে ফেলে তবে তার কাফফারা কী হবে, তাও বলা হয়েছে এ রুকুতে। চৌদ্দতম রুকু, ১০১ থেকে ১০৬ নম্বর আয়াতে অহেতুক প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বলা হয়েছে, অহেতুক প্রশ্ন তোমাদের জন্য অকল্যাণ ডেকে আনে। তাই এ থেকে বিরত থাক। আরো বলা হয়েছে, কারো মৃত্যুর সময় অসিয়ত করা জরুরি। আর অসিয়তের সময় যেন দুজন সাক্ষী রাখা হয়।

সাক্ষীদের থেকে যদি মিথ্যার আশঙ্কা থাকে অথবা অন্য কেউ যদি দাবি করে আমাকে ভিন্নরকম অসিয়ত করা হয়েছে- এমন নাজুক পরিস্থিতি মোকাবেলায় কসমের মাধ্যমে সমাধান করতে বলা হয়েছে। পনেরো ও ষোলতম তথা শেষ রুকু, ১০৯ থেকে ১২০ নম্বর আয়াতে কেয়ামতের দিন হজরত ঈসা (আ.) এবং তার মা হজরত মরিয়ম (আ.) এর সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা কী কথা বলবেন, খ্রিস্টানদের সম্পর্কে কী জিজ্ঞেস করবেন- এ কথা বলে সুরার ইতি টানা হয়েছে।

৬. সুরা আনআম ১-১৬৫

২০ রুকু ও ১৬৫ আয়াত সম্বলিত এ সুরা অবতীর্ণ হয়েছে মক্কায়। আজকের তারাবিতে সম্পূর্ণ সুরাই পড়া হবে।

সুরার প্রথম রুকু থেকে চতুর্থ রুকু, ১ থেকে ৪১ নম্বর আয়াত পর্যন্ত কাফেরদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব, তাদের হঠকারি আচরণের তীব্র নিন্দা করা হয়েছে।

তাদেরকে বলা হয়েছে, তোমরা একটু চোখ মেলে দেখ ও ভাব। তোমরা যা বলছ ও করছ তা কতটুকু সঠিক?

আমিই তোমাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তোমাদের জন্য দিয়েছি একটি নির্দিষ্ট হায়াত, আমি জানি তোমরা কী করছ। তারপরও তোমরা আমার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করছ?

পঞ্চম থেকে দশম রুকু, ৪২ থেকে ৯০ নম্বর আয়াত পর্যন্ত আগের ধারাবাহিকতায় আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস ও ঈমানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

এখানেও কাফেরদের মনে জাগা ও মুখে তোলা অনেক প্রশ্নের জবাব দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, হে নবী! আপনি আমার বান্দাদের জিজ্ঞেস করুন, তারা যখন জলে-স্থলে বিপদে পড়ে, তখন কে তাদের উদ্ধার করে? কার কাছে তারা কাকুতি-মিনতি করে বলে, হে আল্লাহ আমাকে এবারের মত বাঁচিয়ে দাও। তাহলে আমি তোমার কৃতজ্ঞবান্দা ভালো মানুষ হয়ে জীবনযাপন করব। আমিই তাদের প্রার্থনা শুনি। তাদের বিপদ দূর করি। সুতরাং তোমরা আমার অনুগত বান্দা হয়ে সুন্দর-সুখী জীবনযাপন করো।

পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও আখেরাতের বিশালতা উল্লেখ করে মোমিন সম্প্রদায়কে নসিহত করা হয়েছে। এক পর্যায়ে ইবরাহিম(আ.) এর উদাহরণ দেয়া হয়েছে। কীভাবে তিনি ইমানের নিদর্শন পেলেন তা বলা হয়েছে বিস্তারিতভাবে। তার পিতার সঙ্গে যুক্তিতর্কের পুরো দৃশ্য তুলে ধরেছেন বড় নিখুঁতভাবে। এগারতম রুকু, ৯১ থেকে ৯৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহর পক্ষ থেকে কিতাব নাজিলের প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা আলোচনা করা হয়েছে।

যারা কিতাব নিয়ে অযথা তর্কবিতর্কে লিপ্ত তাদেরকে তাদের মত ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, আল্লাহর কিতাব নিয়ে যে মিথ্যা বলে তার চেয়ে বড় জালেম আর কেউ নেই। কেয়ামতের দিন সে ভোগ করবে অপমানজনক-লাঞ্চনাদায়ক শাস্তি।

বারতম রুকু, ৯৫ থেকে ১১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নিজেই নিজের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি কীভাবে বিশ্বরাজ্য পরিচালনা করছেন এর কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে তার প্রতি ঈমান আনার উদাত্ত আহ্বান করা হয়েছে। এরপরও যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে না- তাদের শাস্তি কী হবে তাই বলা হয়েছে।

চৌদ্দ ও পনেরতম রুকু, ১১১ থেকে ১২৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, চোখের সামনে এতসব নিদর্শন দেখেও অনেকেই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে না। তারা উল্টো হঠকারি আচরণ করবে। পরকালে এদের জীবন কত কষ্ট ও যন্ত্রণাদায়ক হবে তাও বলা হয়েছে।

ষোল ও সতেরতম রুকু, ১৩০ থেকে ১৪৪ নম্বর আয়াতে সাধারণ নসিহত করা হয়েছে, যাতে করে মানুষ আল্লাহ, কিতাব, নবী ও আখেরাতের প্রতি ইমান আনতে পারে।

এজন্য আল্লাহ তায়ালা গাছ, বাগান, ফল, ফুল, শস্য ও গবাদি পশু সৃষ্টি করেছেন কীভাবে সে উদাহরণ দিয়েছেন। কেউ যদি তার চারপাশের এসব সৃষ্টিরাজির প্রতি ভাবুক মন ও গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকায় তাহলেই সে বুঝতে পারবে এসব সৃষ্টির পেছনে যে স্রষ্টা রয়েছে, তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তার কাছেই আবার সবাইকে ফিরে যেতে হবে।

আঠার ও উনিশতম রুকু, ১৩০ থেকে ১৫৪ নম্বর আয়াতে উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য আল্লাহ তায়ালা কী খাদ্য হারাম করেছেন আর ইহুদীদের জন্য কী হারাম করেছিলেন তার একটা তুলনামূলক পর্যালোচনা করা হয়েছে।

এরপর আল্লাহ তায়ালা বিকৃত ইহুদি ধর্মের সঠিক রূপ বলে দিয়েছেন। ওই ধর্মে আসলেই কী কী নিষিদ্ধ ছিল তা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। বিশতম রুকু, ১৫৫ থেকে ১৬৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী কিতাব যা হারাম করেছে, কোরআনও তাই হারাম করেছে। তাই কোরআনের দাওয়াত মেনে নেয়ার জন্য আর কোন অজুহাত নেই। এর যৌক্তিকতা তুলে ধরেই সুরা আনআম শেষ করা হয়েছে।

৭. সূরা আরাফ: ১-১১

সুরা আরাফ মক্কায় নাজিল হয়েছে। এর আয়াত সংখ্যা ২০৬ এবং রুকু ২৪টি। আজ পড়া হবে প্রথম রুকুর পুরোটা এবং দ্বিতীয় রুকুর প্রথম আয়াত।

প্রথম রুকু, ১ থেকে ১০ নম্বর আয়াতে কোরআন নাজিলের উদ্দেশ্য বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, এ কিতাব মানুষের হেদায়াতের জন্য নাজিল করা হয়েছে।

এর পর বলা হয়েছে, অতীতে যারাই আল্লাহর কিতাব অমান্য করেছেন, তাদেরকে বিভিন্ন আজাব দিয়ে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। এখনও যারা আল্লাহর কিতাব মানবে না, তাদেরও একইভাবে শাস্তি দেয়া হবে।

দ্বিতীয় রুকুর প্রথম আয়াত, ১১ নম্বর আয়াতে মানব সৃষ্টির ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সুরা বাকারার পর এখানে আবার আদম (আ.) ও ইবলিসের ঘটনা আরেকটু বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

উৎসঃ ‌‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ ‌৪র্থ তারাবিতে পঠিত আয়াতসমূহের সারাংশ


আজ ৪র্থ তারাবিতে সুরা নিসার ১২তম রুকুর শুরু থেকে সুরার শেষ রুকু; অর্থাৎ ৮৮ থেকে ১৭৬ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পড়া হবে। সঙ্গে সুরা মায়েদার প্রথম রুকু থেকে ১১তম রুকুর মাঝামাঝি অংশ, ১ থেকে ৮২ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পড়া হবে। পারা হিসেবে আজ পড়া হবে পাঁচ পারার শেষার্ধ থেকে শুরু করে ছয় পারার পুরো অংশ।

৪. সুরা নিসা: ৮৮-১৭৬

১২তম রুকু। ৮৮ থেকে ৯১ নম্বর আয়াত পর্যন্ত আল্লাহতায়ালা মুমিনদের উদ্দেশ্য করে মোনাফিকদের সম্পর্কে বলেছেন- মোনাফিকদের ব্যাপারে কোনো দ্বিধায় থাকা যাবে না। পাক্বা ইমান আনলে তারা মুমিনদের ভালোবাসা ও সহযোগিতা পাবে, নয়তো তাদের সঙ্গে মুমিনদের কোনো সম্পর্ক নেই।

১৩তম রুকু। ৯২ থেকে ৯৬ নম্বর আয়াতে ভুলক্রমে কোনো মুমিন অন্য মুমিনকে হত্যা করলে কী ক্ষতিপূরণ দিতে হবে সে সম্পর্কে বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধের ময়দানে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে শত্রুমিত্র পার্থক্য করা জানতে হবে। আর যারা সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও জিহাদের ডাকে সাড়া না দিয়ে ঘরে বসে থাকে, তারা কখনব মর্যাদাবান মুমিনদের কাতারে শামিল হতে পারবে না।

১৪তম রুকু। ৯৭ থেকে ১০০ নম্বর আয়াতে নির্যাতনে অসহ্য হয়ে কেউ যেন নিজেই নিজেকে হত্যা না করে বসে। বরং সে যেন অন্য কোথাও হিজরত করে সে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

১৫তম রুকু। ১০১ থেকে ১০৪ নম্বর আয়াতে ভয়কালীন নামাজ ও যুদ্ধকালীন নামাজ পড়ার বিধান ও নিয়ম বলে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে- শত্রুর সঙ্গে মোকাবেলায় কোনো ধরনের শিথিলতা বা দুর্বলতা দেখানো যাবে না।

১৬ থেকে ১৮তম রুকু। ১০৫ থেকে ১২৫ নম্বর আয়াতে মুমিনদের উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন নসিহত করা হয়েছে। অপরাধীদের পক্ষ নিয়ে ওকালতি নয়, বরং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করাই মুমিনদের কর্তব্য। গোনাহ করার পর কেউ ক্ষমা চাইলে অবশ্যই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন। তবে মনে রাখতে হবে, কেউ যদি গোনাহ করে, সে আসলে নিজেরই ক্ষতি করে। তাই গোনাহ থেকে দূরে থাকতে হবে। পাশাপাশি নিজের গোনাহর দায়ভার অন্যের ওপর চাপানো থেকে মুক্ত থাকতে হবে।

১৯তম রুকু। ১২৭ থেকে ১৩২ নম্বর আয়াতে নারীদের ব্যাপারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক বিধান দেয়া হয়েছে। কোনো নারী যদি তার স্বামী থেকে অবজ্ঞা-অবহেলা পেয়ে থাকে- তা হলে তার করণীয় কী এ সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক যৌক্তিক পরামর্শ দিয়েছেন আল্লাহতায়ালা।

২০ ও ২১তম রুকু। ১৩৫ থেকে ১৫২ নম্বর আয়াতে মুমিনদের সত্যের ওপর অটল থাকার হেদায়েত করা হয়েছে। আর মোনাফিকদের ব্যাপারে সজাগ-সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মোনাফিকরা আল্লাহ ও মুমিনদের ধোঁকা দিতে চায়। কিন্তু তারা নিজেরাই ধোঁকার মধ্যে পড়ে রয়েছে। তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তর।

২২ থেকে ২৪ রুকু। ১৫৩ থেকে ১৭৬ নম্বর তথা শেষ আয়াত পর্যন্ত কাফিরদের প্রশ্নের জবাবে মুসা (আ.) ও অন্যান্য নবীর দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে- ওই সব নবীও সত্যের বাণী প্রচার করতে গিয়ে আরও কঠিন ও জটিল সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। এসব সমস্যা মোকাবেলার জন্য হেকমতের সঙ্গে কাজ করতে হবে। আরও কিছু নির্দেশ ও আইনি বিধান দিয়ে সুরার ইতি টানা হয়েছে।

৫. সুরা মায়েদাহ : ১-৮২

সুরা মায়েদাহ অবতীর্ণ হয়েছে মদিনায়। এর আয়াত সংখ্যা ১২০ এবং রুকু ১৬টি। আজ পড়া হবে ১১তম রুকু পর্যন্ত।

সুরার প্রথম রুকু। ১ থেকে ৫ নম্বর আয়াত পর্যন্ত ইহরাম অবস্থায় শিকার করা নিষিদ্ধ এবং কোন প্রাণী খাওয়া হারাম ও কোন প্রাণী খাওয়া হালাল এসব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় রুকু। ৬ থেকে ১১ নম্বর আয়াতে অজুর বিধান এবং মুমিনদের আল্লাহর অনুগত ও কৃতজ্ঞ বান্দা হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

তৃতীয় রুকু। ১২ থেকে ১৯ নম্বর আয়াতে বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসী, ইহুদি-খ্রিস্টানদের দল-উপদলের বিভিন্ন আকিদার অসারতা সংক্ষিপ্ত ও যুক্তিসঙ্গতভাবে প্রমাণ করা হয়েছে।

৪র্থ রুকু। ২০ থেকে ২৬ নম্বর আয়াতে নির্দিষ্ট করে ইহুদিদের হঠকারিতা সম্পর্কে বলা হয়েছে। তারা মুসা (আ.)-এর সঙ্গে কত নিচু আচরণ করেছে তা এই রুকুতে বিস্তারিত বলা হয়েছে।

পঞ্চম রুকু। ২৭ থেকে ৩৪ নম্বর আয়াতে আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের ঘটনা বলা হয়েছে। কীভাবে এক ভাই অন্যায়ভাবে আরেক ভাইকে হত্যা করে জাহান্নামি হয়ে গেছে- তা বিস্তারিত বলা হয়েছে।

ষষ্ঠ রুকু। ৩৫ থেকে ৪৩ নম্বর আয়াতে মুমিনদের আল্লাহভিরু হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। চোরের হাত কাটার বিধান এবং মোনাফিকদের আচার-আচরণে কষ্ট না পাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

সপ্তম রুকু। ৪৪ থেকে ৫০ নম্বর আয়াতে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। বলা হয়েছে- তাওরাত ও ইঞ্জিলের বিধান ছিল আল্লাহ প্রদত্ত বিধান। আর কোরআন হলো ওই দুই কিতাবের সত্যায়ক। তাই তাওরাত ও ইঞ্জিলের মতো এই সময়ও আল্লাহর কিতাব কোরআন অনুযায়ী পরস্পরের মাঝে ফায়সালা করতে হবে।

ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি নয়; বরং প্রত্যেকে ভালো কাজ করতে থাকুক। কে সত্যবাদী আর কে মিথ্যাবাদী সে ফায়সালা করবেন আল্লাহতায়ালা।

অষ্টম রুকু। ৫১ থেকে ৫৬ নম্বর আয়াতে ইসলাম বিরোধীমনা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বন্ধু না বানানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এ ধরনের কাজ অন্তরে রোগ আছে এমন মোনাফিকরাই করে থাকে। আরও বলা হয়েছে, ইমানদের আসল বন্ধু আল্লাহ এবং তার রাসুল। যারা আল্লাহ, আল্লাহর রাসুল এবং মুমিনদের বন্ধু বানায়, তারাই দুনিয়া ও আখেরাতে সফল হয়।

নবম রুকু। ৫৭ থেকে ৬৬ নম্বর আয়াতেও আহলে কিতাব ও মোনাফিকদের নানান আচরণ ও চরিত্র সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। মোনাফিকরা মুখে বলে আমরা নবীর কথা মেনে নিয়েছি, আর অন্তরে তারা নবীর বিরুদ্ধে, ইসলাম ও কোরআনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। এদের অনেকেই জুলুমবাজ ও হারামখোর। আলেমরা তাদের এসব কাজ নিষেধ না করে বড় ধরনের গোনাহ করছে।

দশম রুকু। ৬৭ থেকে ৭৭ নম্বর আয়াতে আহলে কিতাবদের পক্ষ থেকে বিশেষ করে হজরত ঈসা (আ.)-এর অনুসারীরা যে ধরনের ভ্রান্ত আকিদা পোষণ করে থাকে, তার অসারতা তুলে ধরা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, আহলে কিতাব অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিস্টান এবং সাবেয়িদের মধ্যে যারাই আল্লাহ এবং পরকালের জবাবদিহিতায় বিশ্বাস করবে, সে অনুযায়ী সৎজীবনযাপন করবে, তাদের কোনো ভয় নেই, তাদের কোনো চিন্তাও নেই।

১১তম রুকুর প্রথমার্ধে অর্থাৎ ৭৮ থেকে ৮২ নম্বর আয়াতে খ্রিস্টানদের মধ্যে যারা হজরত ঈসা ও মরিয়ম (আ) সম্পর্কে ভ্রান্ত আকিদায় বিশ্বাসী, তাদের নিন্দা করে বলা হয়েছে- এ ধরনের কাজে না ঈসা মসিহ (আ.) সন্তুষ্ট, না তার মা মরিয়ম (আ.) তোমাদের ওপর সন্তুষ্ট। এভাবে আহলে কিতাবদের ঘুমন্ত বিবেকের দরজায় কশাঘাত করা হয়েছে।

উৎসঃ ‌‌যুগান্তর

আরও পড়ুনঃ ‌রোজা রেখে ওষুধ ব্যবহার


রোজা রাখা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ। রোজা পালন করা অবস্থায় রোগীর ওষুধপত্র সেবন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।

রোজা রাখা, ওষুধপত্র খাওয়া এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা নিয়ে অনেকের মনে এ সময় সংশয় দেখা দেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগী এসব ব্যবস্থাপত্র নিলে রোজার ক্ষতি হয় না বা রোজা নষ্ট হয় না।

অসুস্থ অবস্থায় রোজা রেখে ওষুধ গ্রহণের ব্যাপারে বিশ্বের ইসলামী চিন্তাবিদ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা ইসলামী আলেম, ওলামা ও চিন্তাবিদদের সঙ্গে কথা বলে কিছু সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, রোজা থাকাবস্থায় বেশ কয়েকটি পন্থায় ওষুধ সেবন ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে রোজা নষ্ট হবে না।

এ ক্ষেত্রে নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ সার্জন অধ্যাপক ডা. এম আলমগীর চৌধুরী বলেন, কয়েক পন্থায় ওষুধ গ্রহণ করলে রোজা ভঙ্গ হয় না। রোজা রাখাবস্থায় চোখ, কান ও নাকের ড্রপ নেয়া যাবে।

রোগীর বুকে ব্যথা হলে নাইট্রোগ্লিসারিন স্প্রে জিহ্বার নিচে নিতে পারবেন। মূত্রথলী পরীক্ষা বা এক্স-রে করার জন্য রোগীর প্রস্রাবের দ্বার দিয়ে ক্যাথেটার অথবা অন্য কোনো যন্ত্র প্রবেশ করানো হলে রোজা ভঙ্গ হবে না।

মেসওয়াক অথবা ব্রাশ দিয়ে কেউ দাঁত পরিষ্কার করার সময় পাকস্থলীতে থুতু অথবা টুথপেস্ট প্রবেশ না করলে রোজা ভাঙবে না।

রোগীর চামড়া, মাংস ও শিরায় ইনজেকশন দেয়া যাবে। কিন্তু এ ইনজেকশন খাদ্যদ্রব্য (যেমন- স্যালাইন, ডেক্সট্রোজ স্যালাইন) হলে চলবে না। যে কেউ রক্ত দিতে পারবেন আবার চিকিৎসা নিতেও পারবেন।

কোনো রোগী অক্সিজেন অথবা অজ্ঞানকারী গ্যাস (এনেসথেসিয়া) নিলে রোজা ভঙ্গ হবে না। চর্মজাতীয় রোগ নিরাময়ে চামড়ায় মলম নেয়া যাবে।

আবার শরীরের কোনো হাড় ভেঙে গেলে সে ক্ষেত্রে প্লাস্টার করলে রোজা ভঙ্গ হবে না। কারও কোনো অসুখ হলে পরীক্ষার জন্য তার শরীর থেকে রক্ত নেয়া যাবে। হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী হার্টের এনজিওগ্রাম করার জন্য আর্টারিওগ্রাফ করতে পারবে না।

রোগীর অপারেশন অথবা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এন্ডোসকপি করলে রোজা ভাঙবে না। মুখ পরিষ্কারের জন্য মাউথওয়াশ বা কুলি করা যাবে, যাতে পাকস্থলীতে কোনো কিছু না যায়।

জরায়ু পরীক্ষার জন্য শরীরে কোনো যন্ত্রপাতি বা অন্যকিছু পরীক্ষার জন্য প্রবেশ করালে রোজায় কোনো সমস্যা হবে না। লিভার বায়োপসি অথবা অন্য কোনো অঙ্গের বায়োপসি করলে রোজা নষ্ট হবে না।

নাকে স্প্রে ও ইনহেলারজাতীয় কিছু নিলে কোনো সমস্যা নেই। রোগীর পায়ুপথে ইনজেকশন অথবা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কোনো কিছু প্রবেশ করালে অথবা শরীর অবশ করালে রোগী যদি ইচ্ছা করেন তা হলে তিনি রোজা থাকতে পারবেন।

রোগীর কিডনি ডায়ালাইসিস করালে রোজা ভাঙবে না। পাকস্থলী পরীক্ষা করার জন্য গ্যাসট্রোস্কপি করা যাবে কিন্তু কোনো তরল প্রবেশ করানো যাবে না।

এ মতামতগুলো নিয়ে অনেক চিকিৎসকের মধ্যে বিভ্রান্তি হতে পারে। তবে এ মতামতগুলো বিশ্বের ইসলামী চিন্তাবিদ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।

উৎসঃ ‌‌যুগান্তর

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here