লোকসান সামলাতে না পেরে বন্ধ হয়ে গেছে হাজারো কারখানা। বন্ধের পথে আরও কয়েকশ। এসবের পেছনে হাত রানা প্লাজা দুর্ঘটনার সুযোগে বাংলাদেশের ওপর জেঁকে বসা অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স নামক দুটি ক্রেতা গ্রুপের অনৈতিক কার্যক্রম।

দলবাজ-তেলবাজ ব্যবসায়ী নেতাদের রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তির কারণে দেশের গার্মেন্ট খাতের অবস্থা দিন দিন আরও শোচনীয় হচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন করে বাজার হারাচ্ছে দেশের অর্থনীতির প্রধান খাতটি। লোকসান সামলাতে না পেরে বন্ধ হয়ে গেছে হাজারো কারখানা। বন্ধের পথে আরও কয়েকশ গার্মেন্ট কারখানা। এসবের পেছনে হাত রানা প্লাজা দুর্ঘটনার সুযোগে বাংলাদেশের ওপর জেকে বসা অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স নামক দুটি ক্রেতা গ্রুপের অনৈতিক কার্যক্রম। আর সবকিছুর প্রচ্ছন্ন দায় গিয়ে বর্তায় ব্যবসায়ী নেতাদের ওপর, যারা ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তিতেই বেশি মনোযোগী।

সাভারে রানাপ্লাজা ট্রাজেডির নেপথ্যে ছিল দেশের দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি। একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে হাজার হাজার শ্রমিককে কাজে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। ভবন ধসে সহস্রাধিক শ্রমিকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক রফতানী বড় ধরনের আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে।

বাংলাদেশের তৈরী পোশাক নিয়ে দেশি-বিদেশি মহলের ষড়যন্ত্রের যোগসাজশ কোন নতুন ঘটনা নয়। রানা প্লাজা ধসের পর সেই সুযোগসন্ধানী চক্র নতুন ফাঁদ হিসেবে গার্মেন্টস কারখানাগুলোর উপর নানা ধরণের শর্ত চাপিয়ে দেয়। অ্যাকর্ড-এলায়েন্স নামের তৈরী পোশাক ক্রেতাদের জোট অনেকটা জগদ্দল পাথরের মত বাংলাদেশের তৈরী শিল্পের উপর চেপে বসে। গত কয়েক বছরে এই এদের তৎপরতা বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাতকে অনেকটা পিছিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ বিশ্লেষকদের। অ্যাকর্ড-এলায়েন্স নানা ধরনের শর্ত আরোপ করলেও তারা পোশাকের ক্রয়মূল্য বৃদ্ধি বা বাজার স¤প্রসারণে কোন ইতিবাচক ভূমিকা নেয়নি। এ সময়ে শুধুমাত্র ঢাকা, নারায়নগঞ্জ ও গাজীপুরে সহস্রাধিক গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

অন্যদিকে দেশের অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশের তৈরী পোশাক রফতানী নিয়ে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে জোরালো উদ্বেগ প্রকাশিত হলেও সে সময়কার এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিটিএমইএ’র নেতাদের দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলেই বেশী তৎপর দেখা গেছে, এমন মত খাত সংশ্লিষ্টদের। তাদের বক্তব্য, দেশে একটি বিনিয়োগবান্ধব স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করার জন্য এসব বণিক সংগঠন কার্যকর ভূমিরা রাখা উচিত ছিল। এই ভূমিকায় নিরব থেকে প্রকারান্তরে এই খাতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বী ভারতকে বাজার দখলের সুযোগ করে দিয়েছে।

দুই ক্রেতা জোটের প্রেসক্রিপশন না মানলে সংশ্লিষ্ট কারখানা কালোতালিকাভুক্ত করা হয়। এই কালোতালিকার অর্থ হচ্ছে জোটভুক্ত ব্র্যান্ড বায়ারদের সঙ্গে এসব কারখানার ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করা। এর ফলে কোনো উদ্যোক্তা অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের শর্ত মেনে কাজ না করলে ২১৮টি ব্র্যান্ড বায়ারের সঙ্গে কেউ ব্যবসা করতে পারছে না।

ইতিমধ্যে ক্রেতা জোটের রোষানলে পড়ে বিদেশি ক্রেতা হারিয়েছে দেশের ২৪৩ উৎপাদনমুখী কারখানা। এর মধ্যে ১৫৯টি কারখানার সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে অ্যালায়েন্স। অ্যাকডের প্ররোচনায় ব্যবসা হারিয়েছে ৮৪ কারখানা। ক্রেতা না থাকায় এসব গার্মেন্টের উৎপাদন এখন বন্ধ। এমনকি তারা দেশের অন্য রফতানিকারকের হয়ে সাব কন্টাক্টিংয়েও পোশাক তৈরির সুযোগ পাচ্ছে না। সেখানেও এ দুই ক্রেতা জোট সতর্ক নজরের কারণে অর্ডার বাতিলের আশঙ্কায় এসব উদ্যোক্তার কেউ কাজ দিতেও সাহস পাচ্ছে না।

এর বাইরে পরিদর্শনে নানাবিধ ত্রুটির অজুহাত দেখিয়ে অ্যাকর্ডের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে কারখানা বন্ধ হয়েছে ২০৭টি। যার মধ্যে ১০৪টিই স্থানান্তরের অজুহাতে বন্ধ করা হয়। এছাড়া অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের সব শর্ত ও সংস্কারের চাপ সামলে ব্যবসায় টিকে থাকা এসব কারখানার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।

এছাড়া সারা বিশ্বে নতুন নতুন প্রতিযোগীর আবির্ভাব, বিশ্ববাজারে দরপতন, রফতানি আদেশ কমে যাওয়ার পাশাপাশি শ্রম অসন্তোষের মতো ঘটনায় আর্থিক সংকটে পড়েও অনেক গার্মেন্ট উদ্যোক্তাকে ব্যবসা গোটাতে হয়েছে। বন্ধ কারখানার মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য কারখানার সংখ্যা ১ হাজার ২৩১ ও বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত ২৬৯ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ৫৬৯টি গার্মেন্ট অন্যত্র স্থানান্তর বা একীভূত করা সম্ভব হলেও বাকি ৯৩১ গার্মেন্ট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় আড়াই লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে।

বিজিএমইএর তথ্যানুসারে সংগঠনটির নিবন্ধিত তৈরি পোশাক কারখানার সংখ্যা ৬ হাজার ১৯৬টি। এর মধ্যে নানা কারণে ১ হাজার ৭৬৫টি কারখানা বন্ধ করা হয়েছে সংগঠনটির নিজস্ব উদ্যোগে। এসব কারখানা বাদ দিলে নিবন্ধিত কারখানার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ হাজার ৪৩১টি। সর্বশেষ চলতি মাসে বিজিএমইএর মেম্বারশিপ শাখার হালনাগাদ তথ্য মতে, এদের মধ্যে সক্রিয় কারখানার সংখ্যা ৩ হাজার ২০০টি। অর্থাৎ রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর গত সাড়ে চার বছরে রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও আশপাশের এলাকায় ১ হাজার ২৩১ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। যার বেশির ভাগই ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের এবং শেয়ার্ড বিল্ডিং কারখানা (একই ভবনে একাধিক গার্মেন্ট)।

ইপিবির তথ্য অনুসারে, এ খাতের ওপর ভর করে আগামী চার বছরে উচ্চ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আশা করছে সরকার। যদিও বর্তমানে দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তায় দেশের শিল্পবিনিয়োগ ও রফতানীখাত বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারত তৈরী পোশাক রফতানী খাতে ডাবল ডিজিটের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত রফতানী বাজারে বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের অ্যাপারেল বাজার ক্রমে নিচে নেমে যাচ্ছে, সেখানে দ্রুত উপরে উঠছে ভারত। গত কয়েক বছর ধরে ভারতের তৈরী পোশাক রফতানীর প্রবৃদ্ধি শতকরা ১৫ থেকে ১৭ ভাগ, যা চলতি অর্থবছরে ২০ বিলিয়ন ডলারে পৌছবে বলে জানা গেছে। অথচ গত বছরে দেশের গার্মেন্ট খাতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইতিমধ্যেই ভারতের কাছে বাংলাদেশ তার অবস্থান হারিয়েছে। তৈরী পোশাক রফতানীর বাজার স¤প্রসারণে ভারত সরকার ৬ হাজার কোটি রুপির প্রণোদনা ঘোষনা করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা জিইয়ে রেখে দেশের শিল্পবিনিয়োগ ও রফতানীখাতকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, গত ২০১২-১৩ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিলো ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ, ২০১৩-১৪ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। পরের দুই অর্থবছর প্রবৃদ্ধি কমে যথাক্রমে ৪ ও ১০ শতাংশ হয়। সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ।

এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বারবার বলেছেন, ৫০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের দিন থেকেই দেশের পোশাক খাত দাবিয়ে রাখতে নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এ ষড়যন্ত্র রুখতে উদ্যোক্তাদের সতর্ক হতে হবে। তোফায়েল আহমেদ বলেন, ২০১৮ সালের ৩০ মের পর কোনোভাবেই অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সকে দেশে আর কার্যক্রম চালাতে দেয়া হবে না।

আগামি বছর জুরে অ্যাকর্ডের কার্যক্রমের সময়সীমা শেষ হলেও আরও তিন বছর সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল গ্রুপটি। তবে উচ্চ আদালত এই সময়সীমা অনুমতি ছাড়া না বাড়াতে নির্দেশ দিয়েছে অ্যাকর্ডকে।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেছেন, একটা সময় ছিল কিছু বলার ছিল না। এখন সেই সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। কারও কাছে মাথানত করে ব্যবসার দিন ফুরিয়ে গেছে। আমরা জানিয়ে দিয়েছি অতিরিক্ত মেয়াদে বাংলাদেশে তাদের প্রয়োজন নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের তৈরী পোশাক কারখানা ও পোশাক বাজার রক্ষার্থে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদি অর্থনৈতিক বিশ্ব ব্যবস্থায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা জিইয়ে রেখে অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব। তৈরী পোশাক খাতকে ঝুঁকিমুক্ত করতে, অ্যাকর্ড-এলায়েন্সসহ অ্যাপারেল রফতানীখাতের সংস্কারের কাজে মূলতঃ বিজিএমইএ এবং সরকারকে সমন্বিত শক্ত অবস্থান নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার রক্ষায় কারখানার সংস্কার দাবির পাশাপাশি দেশের আভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা, জননিরাপত্তার অভাব ও গণতন্ত্রায়ণের চ্যালেঞ্জ কাজ করছে। এসব বিষয় উপেক্ষা করে অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নিম্নপর্যায়েই যেভাবে ওঠানামা করেছে, তাতে চলতি অর্থ-বছরে তো বটেই, ভবিষ্যতের লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব হয়ে যাবে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে তিনি রপ্তানি বাজারের সমস্যা নিরূপণে সরকারকে শিল্প-উদ্যোক্তা, বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে দ্রæত ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছেন।

উৎসঃ   ইনকিলাব

 

Facebook Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here